ফন্ট সাইজ:
থিম:
মেহেরুন্নেছা

৩য় পর্ব

লেখক: শ্যামলী রহমান

#মেহেরুন্নেছা

#শ্যামলী_রহমান

#পর্ব—৩

দরবার বসেছে আজ। সুবিশাল দরবারখানার মাঝখানে অলংকৃত সিংহাসনে বসে আছেন সুলতান আলাউদ্দিন শাহ। দুই পাশে সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে আছেন উজির, কাজী, আমির ও অন্যান্য রাজকর্মচারীরা। একে একে রাজ্যের নানা বিষয় উপস্থাপন করা হচ্ছে—কোথাও খরার কারণে ফসল না হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রজাদের সহায়তার আবেদন, কোথাও সীমান্তে দস্যুদের উৎপাতের সংবাদ, যা গত পরশুর। আবার কোথাও দূরদেশ থেকে আগত বণিকদলের বাণিজ্যের অনুমতির প্রার্থনা। সবকিছু মনোযোগ দিয়ে শুনে সুলতান প্রয়োজনীয় পরামর্শ নিলেন উজির এবং আমিরের কাছ থেকে। তারপর দৃঢ় কণ্ঠে ফরমান জারি করলেন। কাজীকে বিচারকার্য সম্পন্ন করার নির্দেশ দিলেন, সীমান্তে আরো অতিরিক্ত সৈন্য পাঠানোর আদেশ দিলেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত প্রজাদের জন্য কোষাগার থেকে সাহায্য বরাদ্দ করলেন। দরবারের লিপিকার দ্রুত সেই ফরমান লিপিবদ্ধ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

দূর দেশ থেকে কিছু বৈদেশিক বণিক এসেছে। এ রাজ্যে তারা মশলা,সুগন্ধি ও রেশমের বানিজ্য করতে চান। এর আগেও অনেকে এসেছে, আসে। আলাউদ্দিন শাহ তাদের পণ্য যাচাই করতে আদেশ দিলেন। উন্নতমানে পণ্য হলে তবেই অনুমতি পাবেন। তিনি নিজেও যাবেন পন্যের যাচাইকরণে।

_______

দরবার শেষে আলাউদ্দিন শাহ শেহরাবের সঙ্গে দেখা করলেন। তখন সে তীব্র গতিতে তলোয়ার শূন্যে চালাচ্ছিলো। সুলতান কে দেখে থেমে গেলো। সালাম জানিয়ে বলল,

“কিছু কি বলবেন?"

“তোমার অস্ত্র চালনা সঠিক পথে এগোচ্ছে। তোমার নানাজান একজন দক্ষ সৈনিক ছিলেন।

বহুবছর দেখা হয়নি, আসেনি কখনো প্রাসাদে। এখন কোন গ্রামে থাকো যেন? তার শিক্ষা কিছুটা তোমার মধ্যে বিরাজ করছে। আরেকটু হলেই পুরোপুরি পাবে।"

“ দক্ষিণ সিমান্তের বন জঙ্গলের থেকে খানিকটা আগে রাইপুর গ্রামে।"

“ উজির আলী মোহাম্মদ তোমায় সঙ্গ দিবে। মাহতাব ফিরলে তার সঙ্গে একবার সৈন্য নিবাস ঘুরে আসবে। যেহেতু তোমার ঘর বহুদূরে তাই তুমি সৈন্য নিবাসে থাকতে চাও নাকি প্রাসাদে?"

শেহরাব কি বলতে বুঝতে পারছে না। কিছু বলতে নিয়েও বলছে না। দ্বিধাদ্বন্দে পড়লো। আলাউদ্দিন শাহ অভয় দিলেন।

" বলো যা মন চায়।"

শেহরাব তাকালো প্রাসাদের কক্ষগুলোর দিকে। সারি সারি জানালা। লাল পর্দা গুলো বাতাসে উড়ছে। উপর তলায় নজরে পড়লো মেহেরুন্নেছা একটা ছোট কন্যা কে কোলে নিয়ে হাসছে আর হাঁটছে। সে হাসি স্নিগ্ধকর। শাহজাদীর দিকে এমন নজরে তাকানোও অন্যায় এইভেবে সেদিক থেকে চটপট নজর সরিয়ে নিলো। চোখ বন্ধ করে আবার খুললো তার পর বলল,

“ আমি প্রশিক্ষণ নিতে চাই,আরো দক্ষ হাতে চাই। আপাতত প্রাসাদে থাকি। আপনাদের সমস্যা হলে অতিথি শালায় না রেখে প্রহরীদের সঙ্গেও থাকতে দিতে পারেন। অতিথি হয়ে আসলেও এখন তো কাজের তাগিদে থাকবো।"

আলাউদ্দিন শাহ খুশি হলেন। হেসে হাত রাখলেন কাঁধে।

“তুমি আমার কন্যার জন্য আঘাত শয়েছো, বাঁচিয়েছো তাকে। এর জন্য কৃতজ্ঞতা সব সময় থাকবে। অতিথি শালা তোমার জন্য উন্মুক্ত । যখন সময় হবে অন্য কোথাও কক্ষ পাবে।"

আলাউদ্দিন শাহ চলে গেলোও শেহরাব দাঁড়িয়ে রইলো। দৃষ্টি সামনে চলে যাওয়া মানুষটার পানে।

আগে কখনো প্রাসাদে আসেনি,দেখেনি সুলতান কে তবে শুনেছে বহু প্রশংসা। যেগুলো আসলেই সত্যি। সামান্য প্রজার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ,কে করে? কে-ই বা হাসিমুখে রাজ্যের জন্য সবকিছু বিলিয়ে দিতে পারে? প্রজাদের দুঃখের কথা এতো ভাবে? এতো উদার আর ভালো মনের সুলতান পাওয়া প্রজাদের জন্য শুধু সৌভাগ্যের নয় অতি সৌভাগ্যের তা বললেও ভুল হবে না।

____

মসজিদ থেকে নামাজ আদায় করে প্রাসাদে ফিরছিলেন আলাউদ্দিন শাহ । পথে রহমত শাহ এর সঙ্গে দেখা হলো। তাকে দেখে ডেকে বলল,

“তোমার ছোট পুত্রের ভ্রমণ শেষ হলে তাকে খবর পাঠাও ফিরুক প্রাসাদে। বন জঙ্গল,পাহাড় পর্বত বাদেও তার অনেক দায়িত্ব আছে। আমার কাজে সাহায্য করবে।"

“ ঠিক আছে ভাইজান আজই চিঠি পাঠাবো তার নানা বাড়িতে। কাল পরশু ফিরে আসবে।"

আলাউদ্দিন শাহ এই বলে চলে গেলেন। কক্ষে এসে দেখে ফাহিমা জায়নামাজ হাতে দাঁড়িয়ে। সবে নামাজ আদায় শেষ করে উঠেছে। সুলতান কে দেখে জায়নামাজ নিদিষ্ট স্থানে রেখে দিয়ে এসে তার সামনে দাঁড়ালো। বলল,

“সুলতান আমার একটা কথা ছিলো।"

“ হ্যাঁ বলো।"

আলাউদ্দিন শাহ পালঙ্কে বসতে বসতে জানতে চাইলো। ফাহিমা ও পাশে বসে তাকালো স্বামীর পানে। দুজনের নজর একে অপরের দিকে।

“মেহেরুন্নেছার নিকাহ নিয়ে বলছিলাম। বয়স হয়েছে নিকাহ দিতে হবে। চারদিকে এতো শত্রু আমি চাই সবকিছুর বাহিরে ভালো থাকুক আমার কন্যা।"

“ নিকাহ দিতে হবে সুলতানা কিন্তু সবকিছুর বাহিরে কিভাবে সম্ভব? আমার পরে এই রাজ্যের দায়িত্ব মেহেরুন্নেছা কে-ই নিতে হবে। কোনো পুত্রের চেয়ে কম নয় তার সাহস ও অস্ত্র চালনায় পারদর্শিতা।।

“এমন কারো সঙ্গে নিকাহ দিতে হবে যে মেহেরুন্নেছার মতোই সাহসী এবং তাকে রক্ষা করবে।"

আলাউদ্দিন শাহ ফাহিমার হাতের উপর হাত রাখলেন। ভরসা দিয়ে বললেন,

“খুঁজবো আমি তেমনই কাউকে। যে আমার মেহেরুন্নেছার যোগ্য হবে। ধন সম্পদ নয়, যে আমার কন্যা কে সকল বাঁধা বিপত্তি থেকে রক্ষা করবে,আগলে রাখবে,ভালোবাসবে এবং ষড়যন্ত্র, যুদ্ধ, লড়াইয়ে একে অপরের ঢাল হয়ে দাঁড়াবে।"

__________

"হুজুর প্রাসাদের বাহিরে উত্তরের গ্রাম থেকে কিছু প্রজা এসেছে। তারা আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান।"

আজমির খান মাত্র ভোঁজন সেরে কক্ষ থেকে বেরিয়েছে তখনই প্রহরীর ডাক পড়লো। এগিয়ে যেতেই তারা এ কথা বলে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন,

“কেন এসেছে? কি প্রয়োজন শুনেছো?"

“জ্বী হুজুর। তারা এসেছে সাহায্য চাইতে। বৃষ্টি না হওয়াতে খরার কারণে ফসল এবার ভালো হয়নি। তাই....

কথা শেষ না হতেই আজমির খান হাত উঁচিয়ে থামিয়ে দিলেন। মুখশ্রী মূহুর্তে বিরক্তি আর রাগে পরিনত হলো। এগিয়ে গেলো সিংহদ্বারের দিকে। যেখানে বেশ কিছু প্রজা দাঁড়িয়ে আছে। সকলে সুলতান কে দেখে হুমড়ি খেয়ে আসতে নিলো। সালাম দিয়ে আশায় হাত জোর করে আর্জি জানালো,

“হুজুর বৃষ্টি না হওয়ার ফলে ফসলের ফলন হয়নি এবার। যদি এবারের কর টা মৌকুফ করতেন তাহলে কোনো মতো স্ত্রী, কন্যা নিয়ে বাঁচতে পারতাম। যদি দয়া করে কিছু অর্থ প্রদান করেন তাহলে তিনবেলা দুমুটো খেতে পারতাম।"

“ নায্য কর প্রদান করতে হবে। কোষাগার উন্মুক্ত নয় যে বললেই অর্থ দিয়ে দিবো। প্রহরী সিংহদ্বার বন্ধ করে দাও।"

" সুলতান এমন বলবেন না। দয়া করুন আমাদের উপর। কর দিতে গেলে আমাদের অনাহারে মরতে হবে।"

সকলে আজমির খান এর পায়ের নিচে বসে হাত জোর করলো। টলমল চোখে অনুরোধ করতে থাকলো। তাদের আহাজারিতে মন গললো না। তাদের অনুরোধ, আহাজারি পায়ে মাড়িয়ে প্রসাদের দিকে পা বাড়ালো। প্রহরীরা তাদের বাহির করে দিয়ে দ্বার বন্ধ করে দিলো। তারা আজমির খান এর কন্ঠে শুনতে পেলো, “ আমির রাজ্যের উত্তরের সকল গ্রামের কর আদায় করতে যাবে কালই।"

এই কথায় কৃষকেরা ভয় পেলো। স্ত্রী সন্তানদের কথা ভেবে। যাদের ফসলি জমি বেশি তাদের তবুও ভয় কম কিন্তু যাদের ফসলি জমি সামান্য তাতে যদি ফসল অর্ধেকের চেয়েও কম হয় তাহলে কিভাবে কর দিবে?৷ আর দিলেই ঠিকমতো খাবেই বা কি?

প্রজাদের মধ্যে আফসোস করে কান্না মিশ্রিত কন্ঠে এক বৃদ্ধ অভিশাপ ন্যায় বলল,

“আল্লাহ বিচার করবেন। এতো অত্যাচার,অনাচার কবে বন্ধ হবে খোদা? কি এমন পাপ করেছিলাম সকলে যার কারণে এমন সুলতান জন্মেছে এই রাজ্যে? সুলতান সরাফত খান তো এমন ছিলেন না। তার পুত্র জন্মিলে নিশ্চয়ই তারই মতো ভালো হতো। আমাদের র্দূভাগ্য কন্যা জন্মিলো আর সিংহাসন পেলো জামাতা আর সে হলো জালিম।"

__________

মেহেরুন্নেছা অন্দরমহল থেকে সামনের ফটকে অতিথিশালার দিকে পা বাড়ালো। কিছুক্ষণেই একটি কক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে ঠকঠক আওয়াজ করলো। দরজা খুলে দিতেই শেহরাবের ক্লান্ত মুখশ্রী নজরে এলো। মেহেরুন্নেছার হাতে একটি কাঁসার ছোট বাটি। সেখানে কিছু একটা আছে। শেহরাব নিজের কাঁধ একহাতে চেঁপে ধরে আছে। চোখ মুখ খিঁচে রেখেছে ব্যথায়। হাতের আঙ্গুল বেয়ে রক্ত ঝরছে। মেহেরুন্নেছার চিন্তা খানিকটা আরো বাড়লো। কক্ষে প্রবেশ করে তক্ষণাৎ বলল,

“ আঘাতে প্রলেপ লাগিয়ে নিন। র*ক্ত ক্ষরণ বন্ধ হবে, সারবে তাড়াতাড়ি।"

শেহরাব বাটিটা হাতে নিলো। বসলো গিয়ে পালঙ্কে।

মেহেরুন্নেছা দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে রয়েছে। বাটি থেকে প্রলেপ হাতে নিয়ে লাগাতে শুরু করলো। কাঁধ বাদেও পিঠেও আঁচড় লেগেছে। সেখানে হাত আর পৌঁছালো না। পড়লো মুসকিলে। এ আঘাত প্রশিক্ষণ নিতে গিয়ে অসাবধানতায় কারণে লেগেছে। কাঁধের আঘাতটা বেশ গভীরই।

“ সাবধানে লড়বেন না? লড়াই করার সময় অপরপ্রান্তের মানুষটা সহ আশে পাশেও খেয়াল রাখতে হবে,নজর ঘুরাতে হবে হওয়ার গতিতে।"

শেহরাব অনুভব করলো পিঠে কেউ শীতল তরল কিছু ছুঁইয়ে দিচ্ছে। সে তক্ষণাৎ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো। মেহেরুন্নেছা নরম তুলির মাধ্যমে প্রলেপ লাগিয়ে দিচ্ছে। হাতের স্পষ্ট লাগেনি শরীরে।

শেহরাবের থেকে সরে আসতে নিলে দৃষ্টি পড়লো তার দিকে। কেমন একচিত্তে চেয়ে আছে। মেহেরুন্নেছা ভ্রু উঁচু করে শুধায়, কি?"

শেহরাব তড়িৎ গতিতে মাথা নাড়ায়। উঠে দাঁড়ায় মুহূর্তে। মেহেরুন্নেছা ভ্রু কুঁচকে তাকালো। তার পর কি মনে করে তড়িঘড়ি করে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলো। শেহরাব দরজার পানে তাকিয়ে আছে। স্থির পা, দৃষ্টি নিশ্চুপ। তখনই আবারো মেহেরুন্নেছার কন্ঠ ভেসে আসলো,

“ আপনার খাবার পাঠিয়ে দিচ্ছি আপনি খেয়ে বিশ্রাম নিবেন। আজ আর প্রশিক্ষণ নেওয়ার প্রয়োজন নেই আব্বাজান বলেছেন।"

এই বলে মেহেরুন্নেছা চলে গেলো। শেহরাব উত্তর দিলো না। কেবল ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে আবারো পালঙ্কে বসলো। দুহাত কপালে ঠেকে গভীর শ্বাস নিলো। কিছু একটা ভেবে উতলা লাগছে তার। নিঃশ্বাস পড়ছে দ্রুত। শরীরের আঘাত নয় ব্যথার অন্য কারণ।

__________

সমুদ্রের মোহনার এক দুর্গম খাঁড়িতে বসে আছে কিছুজন। চারদিকে ঘন বন আর আঁকাবাঁকা জলপথ। কাঠের খড়িতে দাউদাউ করে আগুল জ্বলছে। সেই আগুনে ঝলসে যাচ্ছে কাঁচা অনেকগুলো মাছ। তাদের মধ্যে একজন আরেকজন কে বলে উঠলো,

“ সর্দার বণিকরাও তাদের জাহাজ নিয়ে পৌঁছে গেছে ঘাটে। লুট করতে পারলাম না এবার কি হবে?"

পথরের উপরে উদম পায়ে বসা থাকা লোকটি ধীর ও কর্কশ কন্ঠে উত্তর দিলো,

“ দুদিন পেরোক তার পর অভিযান শুরু হবে। সুলতান আলাউদ্দিন শাহ বেশ চতুর হয়েছে।"

সকলে সহমত পোষণ করলো। নির্জন এই ঘাঁটিতে তারা নোঙর করে রাখেছে নিজেদের নৌযান, লুকিয়ে রেখেছে লুণ্ঠিত ধনসম্পদ, আর এখান থেকেই পরিকল্পনা করে পরবর্তী অভিযানের।

__________

"ভাইজান আপনি প্রজাদের দুঃখ একটু বুঝার চেষ্টা করুন। এভাবে তাদের মুখের উপর দ্বার বন্ধ করলে যাবে কোথায়? আপনি তো তাদের সুলতান। আপনার দায়িত্ব,কর্তব্য প্রজাদের দুঃখ বোঝা এবং সাহায্য করা।"

ছোট ভাইয়ের কথায় বেশ বিরক্ত বোধ করলো আজমির খান। বিরক্তিতে বন্ধ করা দৃষ্টি মেলে পাশের মানুষটার দিকে তাকালো। তার পর রাগান্বিত কন্ঠে বলল,

“শাহমির আমাকে শেখাতে আসবি না কোনটা সঠিক আর কোনটা ভুল। এদের মিছে চোখের জলে ভুললে আমার রাজত্ব চলবে না। কোষাগার ভরতে হবে কালই কর আদায় করতে যাবি রাজ্যের দক্ষিণে।"

“ কিন্তু ভাইজান....

“ উহু কোনো কথা শুনতে চাই না।"

আজমির খান হাত উঁচিয়ে থামিয়ে দিলো তাকে। তার পর চলে গেলো সেখান থেকে। শাহমির খান দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বড় ভাইজান কে শত বলেও সঠিক পথে নিয়ে আসতে পারেনা সে। ক্ষমতা,লোভ প্রজাদের দুঃখের কারণ। রাজ্যের সুলতান দুঃখ না বুঝলে কে বুঝবে? এটা সে এতো বছর ধরেও বুঝাতে পারেনি। আর পারবেও না, তার পুত্র ও হয়েছে তেমন। বানিয়েছে নিজের মতোন। পরবর্তী সুলতান ও প্রজাদের জন্য সুখজনক হবে না এটাও নিশ্চিত।

“ শুনছেন?"

ভাবনায় মত্ত মন আচমকা ডাকে আচমকা উত্তর দেয়।

“ হুম?"

খনিকের মধ্যে হুস ফিরতেই শাহমির খান পেছনে ফিরলেন। দেখলেন তারই স্ত্রী তাহমিনা দাঁড়িয়ে আছে। ধীর পায়ে এগিয়ে এলো। বলল,

“মহলে আসা এক গায়িকাকে হামিদ অন্য কক্ষে টেনে নিয়ে যেতে দেখলাম একটু আগে। সে হাত ছাড়াতে চাচ্ছিলো বার,বার হামিদ শুনছে না তার কথা। করুন দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলো আমার দিকে।

ছি আমার ঘৃণা হয় এমন মানুষদের সঙ্গে বসবাস করতে হয় ভেবে। আপনাকে কতবার বলি চলুন আমরা অন্য কোথাও চলে যাই। আপনি কেন শোনেন না?"

“ তুমি আসরের দিকে কেন যাও তাহমিনা? ওখানে পুরুষ ব্যতীত আর কারো যাওয়া নিষেধ জানো না?"

“ আমি কেবল গান শুনতে গিয়েছিলাম আড়াল থেকে। কিন্তু এমন দৃশ্য নজরে পড়বে কখনো ভাবিনি।"

ঘৃণায় তার শরীর কাঁপছে। শাহমির খান চিন্তায় পড়লেন। হামিদ নারীর প্রতি আসক্ত এ্যাও দেখতে হবে ভাবেনি আগে। সে গমগমিয়ে চলে গেলো আসর ঘরের দিকে। তাকেই কিছু একটা করতে হবে।তাহমিনা স্বামীর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো।

“ কি করছিস তাহমিনা? এদিকে আয় তো।"

হামিদার ডাকে সে এগিয়ে গেলো। আজমির খানের সুলতানা সে। খুব একটা চতুর নয় বোকা প্রকৃতির মানুষ কিছুটা। তাই তো আড়ালে কতকিছু ঘটে টের ও পায় না। স্বামী, সন্তান কেউ মূল্য ও দেয় না। তার আর একটা ছোট বোন আছে যার নিকাহ হয়েছে আজমিরের ছোটবেলার মিত্রর সঙ্গে। সে অবশ্য চতুর। সেই চতুরতা লোভের। তার স্বামী ভালো মানুষ বলেই চুপ করে থাকতে হয় এই মহলে।

__________

"আয়েশা দাঁড়াও বলছি। এভাবে ছুঁটলে পড়ে ব্যথা পাবে। দাঁড়াও।"

আয়েশা শুনছে না তার কথা। বিশাল বাগানে ছুঁটছে সে মুক্ত পাখির মতন। মেহেরুন্নেছা তারই পিছে ছুটছে তাকে ধরতে কিন্তু পারছে না।

“ তুমি আমাকে ধরতে পারবে না ফুফিজান।"

“ যদি পারি তবে কি হবে?"

“ যা বলবে তাই শুনবো।"

মেহেরুন্নেছা পায়ের গতি বাড়ালো। ও এতোক্ষণ ইচ্ছে করে ধীরে ছুঁটছিলো। ধরতে পারছে না ভেবে আয়েশা যে আনন্দ মাতছিলো সেটা ওর ভালো লাগছিলো। এক সময় তার আম্মাজান ও এভাবে ছুটতো পিছু কিন্তু থামতো না মোটেও। ছোট বেলার কথা মনে পড়তেই হেসে উঠলো আনমনে। খনিকের জন্য ভুলে গেলো উদ্দেশ্য। দাঁড়িয়ে পড়েছে সে।

“ আহহহ।"

আয়েশার চিৎকারে মেহেরুন্নেছার ভাবনা ছুটে যায়। সামনে তাকায়। তড়িৎ গতিতে ছুটে যায় তারই কাছে। গিয়ে দেখে আয়েশা মাটির উপরে বসে আছে।

“ কি হয়েছে আয়েশা?"

উচুঁ জায়গায় হোটচ খেয়ে পড়ে গিয়েছে। হাঁটুতে সামান্য ব্যথা পেয়েছে দেখেই বুঝা যাচ্ছে। আয়েশা কাঁদোকাঁদো মুখ নিয়ে তার দিকে চেয়ে আছে।

এমন মুখশ্রী দেখে মেহেরুন্নেছা শব্দ করে হেসে উঠলো।

“হাসছো কেন? আমি ব্যথা পেয়েছি আর তুমি হাসছো?"

মেহেরুন্নেছা ওকে ধরে দাঁড় করালো। পোশাকের ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে বলল,

“ ছুঁটতে নিষেধ করেছিলাম না? শুনোনি কেন?"

“ দাদি জানের কাছে শুনেছি তুমিও শুনতে না নিষেধ। আমার চেয়েও বেশি দুষ্টু ছিলে তুমি।"

" তাহলে যাও আবার ছুটো।"

আয়েশা আর গেলো না। কিছু একটা ভেবে বলল,

“ এবার তুমি ছুঁটবে আমি ধরবো। আমি তোমার মা হবো।"

মেহেরুন্নেছা হেসে ফেললো। আয়েশার নাক টিপে দিলো।

“ ওরেহ আমার ছোট আম্মাজান। ঠিক আছে আমি ছুটছি আপনি ধরতে পারবেন তো?"

“ হ্যাঁ।"

ছোট বেলার আনন্দের কিছু মুহূর্তের জন্য ফিরে পেতে ছুটলো সে। আর আয়েশা তাকে ধরতে ছোট ছোট ধাপ ফেলে পিছনে দৌঁড়াতে লাগলো। এ দৃশ্য অন্য রকম অনুভূতি। বাগানে শত ফল ফুলের গাছের মধ্যে একটি গাছের আড়ালে হতে কেউ একজন সবটাই নজরে রাখলো।

হঠাৎ মেহেরুন্নেছা পড়তে গেলো। আয়েশা তার থেকে অনেকটা দূরে। গাছের আড়ালে থাকা মানুষটা ছুটে আসতে নিবে তার আগেই কেউ একজন হাজির হলো। মেহেরুন্নেছার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

“ যুদ্ধে লড়াই করা শাহজাদী আজ ছোট বেলায় হারিয়ে গেছে? পড়ে যাচ্ছে সামান্য দৌঁড়াতেই? এভাবে দেখলে কে বলবে সে যুদ্ধ জয় করার মতো সাহস রাখে মেহেরুন্নেছা।"

মেহেরুন্নেছা বাড়িয়ে দেওয়া হাতে হাত রেখে উঠে পড়লো। তার পর প্রতিত্তোর করলো,

“ সাহস থাকে ভেতরে। আর ভেতরের রূপ সব সময় উন্মুক্ত করে রাখতে নেই। সময় এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী জাহির করতে হয়।"

“ জ্বি শাহজাদী।" এই বলেই মানুষটা মাথা নিচু করে হাত কপাল বরাবর রেখে সম্মতি জানালো।

মেহেরুন্নেছা হেসে উঠলো তার এমন কান্ডে। এমনটা অবশ্য প্রায়শই ঘটে।

ততক্ষণে আয়েশাও এসে পৌঁছালো।"

“চাচাজান কখন ফিরলেন? আর ফুফিজান দেখলে তুমিও আমার মতো পড়ে গেলে কিন্তু তখন আমাকে কত কথা শোনালে।"

“ মাত্রই আসলাম। প্রাসাদে যাওয়ার আগেই ভাইজানের থেকে জানতে পারলাম তোমারা বাগানে তাই আসলাম।"

আয়েশা খুশি হলো। ছুটে গিয়ে মোহসীন এর কোলে চড়লো। এবার মেহেরুন্নেছা উত্তর দিলো,

“ছোট বেলায় যেহেতু ছুটছি তাই পড়ে যাওয়া অত্যাবশ্যক তাই না?"

আয়েশা মাথা নাড়ালো। মেহেরুন্নেছা ইচ্ছে করে পড়ে গেছিলো। মোহসীন পথের দিকে চেয়ে বলল,

“ চলো অন্দরমহলে যাই?"

“ হ্যাঁ চলো।"

মেহেরুন্নেছা সহ ওরা চলে যেতেই গাছের আড়াল হতে শেহরাব বেরিয়ে আসলো। হুট করে মনের ভেতর কেমন জানি অনুভব করলো। মনে মনে ভাবলো,

“ কে এই ব্যক্তি?

চলবে..............?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন