#মেহেরুন্নেছা
#শ্যামলী_রহমান
#পর্ব—৪-৫
শীতের আগমন ঘটেছে এমনই বার্তা দিচ্ছে প্রকৃতি।
এখন স্বল্প শীত আর কুয়াশার দেখা মিলে শেষ রাতের দিকে। শিশির বিন্দুর ছোঁয়া পাওয়া যায় ভোরের আবহে। আর কয়টা দিন পেরোলেই জাঁকিয়ে শীত পড়বে। কিছুদিন আগে শীতের জন্য আনা বস্তু আজ রাজ্যের সামর্থহীন প্রজাদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া হবে, যারা গরম বস্তুের অভাবে পাতলা চাদর জড়িয়ে থাকে কিংবা শীতের তোপে কাঁপে।
আলাউদ্দিন শাহ, মেহেরুন্নেছা, মাহতাব, উজির, শেহরাব সহ আরো কিছুজন কে নিয়ে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে উদ্দেশ্য রওনা দিবেন। আজ যতটুকু পারে নিজে দিবেন পরবর্তী চারদিকে এই কাজের বরাদ্দ কিছু মানুষ দিতে যাবে।
এই কিছুদিনেই শেহরাব আলাউদ্দিন শাহ এর আরো অনেকটা প্রিয় হয়ে উঠেছে। কয়দিন আগে আলাউদ্দিন শাহ রাজ্যের বাহিরে যান বাণিজ্যের জন্য আসা বণিক কে প্রাসাদে আমন্ত্রণ জানাতে। অস্ত্র সহ আরো অনেককিছু পাওয়া যায় তাদের কাছে। ফেরার পথে জলদস্যু সেবার লুট করেছিলো প্রায়। সকলে আত্মসমর্পণ করতে বাঁধ্য হয়েছিলো। কিন্তু শেষ মুহূর্তে শেহরাব বুদ্ধি করে হুট করে সামান্য দূরে থাকে তলোয়ার হাতে তুলে নেয় এবং জলদস্যুর সর্দারের গলায় চেপে ধরে। ভয়ে কেপে উঠে সকলে। সুলতান ইশারায় কিছু একটা বলে নিজেও হুট করে তলোয়ার তুলে লড়াই শুরু করে। তুলুম অস্ত্রের আঘাতে কিছুজন লুটিয়ে পড়ে। পরিস্থিতি বেদিক দেখে সর্দার সহ পালিয়ে যায় সুযোগ বুঝে। যাদের ধরতে পেরেছে সকলে এখন অন্ধকার কারাগারে বন্ধি আছে।
আজ প্রথমদিন যতটুকু সম্ভব সুলতান নিজ হাতে বস্তু দান করবেন সঙ্গে থাকবেন শাহজাদী মেহেরুন্নেছা।
তার উপস্থিতি কেবল কাছের কিছু গ্রামেই হবে তার পর ফিরে আসবে প্রাসাদে।
মেহেরুন্নেছা অলংকৃত পালকিতে যাত্রা করছে। সঙ্গী হিসাবে তনুজা ও এসেছে। সামনে ও পেছনে অশ্বারোহী সৈনিকদের কড়া প্রহরা। সঙ্গে এক বোঝাই বলদগাড়িতে দানের সামগ্রী বহন করা হচ্ছে। সুলতান সহ আরো কিছুজন অশ্বের পিঠে চড়ে যাচ্ছেন। শেহরাব হাঁটছে পালকির সঙ্গে সঙ্গে। তার মাথায় কিছু ভাবনা খেলা করছে। মুখ ভার। তখনই কারো কন্ঠে ভাবনা উবে গেলো। পালকির রঙিন পর্দা সরিয়ে মেহেরুন্নেছা আশপাশ দেখছে। রাজ্যের অনেক মানুষ দেখতে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ দূর থেকে সালাম দিচ্ছে। মেহেরুন্নেছা জবাব দিয়ে আন্তরিকতায় অধরে হাসি রাখছে। শেহরাব লক্ষ্য করলো সাহসিকতার ঘেরা শাহজাদী অবস্থান ও পরিস্থিতি অনুযায়ী পরম ভালোবাসাও দয়াময়ী।
মেহেরুন্নেছার হাতে টান পড়লো। তনুজা তাকে টানছে। যার কারণে পালকির পর্দা ছেড়ে দিতে হলো, ঢেকে গেলো দুজনে।
“ কি হয়েছে?"
“ সোজাসুজি চলতে থাকা যুবক টা কে? যে তোমাকে বাঁচিয়েছিলো?"
তনুজা ধারণা করে প্রশ্ন করেছিলো। তবে ধারণা ভুল ও হতে পারে।
মেহেরুন্নেছা ফেরার দিন প্রাসাদে গেলেও তার পর কয়েকদিন আর যায়নি। সে গিয়েছিলো তার নানাবাড়িতে কালই ফিরে এসেছে। মেহেরুন্নেছা আবারো পালকির পর্দা উঠালো। সোজাসুজি তাকাতেই প্রথমেই নজরে পড়লো শেহরাব কে। সে সামনে তাকিয়ে হাঁটছে। কোমরে তলোয়ার ঝুলছে।
পায়ের তলায় পিষ্ট হয়ে যাওয়া মাটির উপরের ধুলো উড়ছে। মেহেরুন্নেছার তাকানোর মাঝেই শেহরাব ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো। দুজনের দৃষ্টি মিলিত হলো। একজনের দৃষ্টি বিস্মিত। শেহরাব অল্পক্ষণ তাকিয়ে থাকতেই নজর নিচু করলো। মেহেরুন্নেছার দৃষ্টি তার ভেতর কম্পন তুলে, ধুকপুক করে বুক। তাকিয়ে থাকতে পারে না বেশিক্ষণ।
“ কি হলো বলো?"
তনুজার কন্ঠে মেহেরুন্নেছা ঘুরে তাকালো। পর্দা ছেড়ে উত্তর দিলো,
“ হ্যাঁ উনিই সে।"
“ নাম কি যেন?"
“ শেহরাব, শেহরাব সিকান্দার।"
“ নামটার মতো মানুষটাও সুন্দর। "
তনুজার কথায় মেহেরুন্নেছার ভ্রু কুঁচকে এলো। অচেনা মানুষের সুনাম? জানতে চাইলো,
“ পছন্দ হয়েছে?"
“ অপছন্দ কেউই করতে পারবে না।"
“ বাহ্যিক সৌন্দর্য দেখে মানুষ কে বিচার করলে ঠকবে।"
“ভেতর, মন সুন্দর না হলে কি আর তোমাকে বাঁচাতো? সাহায্য করতো?"
মেহেরুন্নেছা কিছু বলতে নিয়েও থেমে গেলো। অঁধরে আসা শব্দ গুলো গিলে নিলো। ঠিকই তো, ভেতর সুন্দর না হলে কেই-বা মানুষের বিপরে এগিয়ে আসে,সাহায্য করে? তনুজার মতামত যথার্থ। যার কারণে মেহেরুন্নেছা আর যুক্তি দিতে পারলো না। তনুজার কন্ঠে আরো কিছু শব্দ শুনতে পেলো সে,
“ যে পুরুষের মন সুন্দর তার বাহ্যিক সৌন্দর্যের প্রয়োজন পড়ে না। ব্যবহার আর কাজই মুগ্ধ হতে বাঁধ্য করে।"
আর তার তো' “ মন এবং বাহ্যিক দই'য়ই সুন্দর সখী। আব্বাজান ও প্রশংসা করছিলো তার।"
____________
পালকি থেমেছে। মেহেরুন্নেছা আর তনুজা এগিয়ে গেলো নিদিষ্ট স্থানে। যেখানে গ্রামের মানুষরা লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে। আলাউদ্দিন শাহ কন্যা কে পাশে নিলেন। প্রাসাদের কাছাকাছি গ্রাম হওয়াতে সকলে শাহজাদী কে চিনে। তনুজা মেহেরুন্নেছার পাশেই। মাহতাব অদূরে দাঁড়িয়ে আছে। উজির আলী মোহাম্মদ প্রজাদের কিছু একটা বলছে। তখনই হুট করে মোহসীনের আগমন ঘটলো সেখানে। আলাউদ্দিন শাহ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকে দেখলো।
“ তুমি না আসবে না বললে?"
“জ্বি বড় আব্বাজান, কিন্তু এখন মন চাইলো তাই আসলাম।"
“ তোমার দায়িত্ব ভারি করা উচিত। আজ প্রাসাদে ফিরে একটা কাজ দিবো।"
মোহসীন মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো। দাঁড়ালো মেহেরুন্নেছার একপাশে। দুজনের কথা হলো হেসেই। সামান্য দূর থেকে শেহরাব কেবল তাকিয়ে রইলো। প্রায় মাস পূর্বে পরিচয় না জানলেও এখন জানে, মোহসীন রহমত শাহ এর ছোট পুত্র। যার সঙ্গে মেহেরুন্নেছা বেশ খাতির। যা ওকে ব্যথিত করে, কিন্তু কেন? এই কেনর উত্তর শেহরাব পায় না, যেমনটা পায় আবার তেমনটা মানতে চায় না। এ যে অন্যায়, কিংবা চোখের নেশা।
শুরু হলো বস্তু বিতরণ। মেহেরুন্নেছা আর আলাউদ্দিন শাহ সকল কে এক এক করে দিতে লাগলো। এভাবে প্রায় ঘন্টার মধ্যেই শেষ হলো সে গ্রামের বিতরণী কাজ। এর পর গেলো পাশের গ্রামে। এভাবে কয়েক গ্রামে দিয়ে বিকেল গড়িয়ে যাবার আগেই মেহেরুন্নেছা কে প্রাসাদে পাঠিয়ে দিলো। সঙ্গে গেলো মোহসীন। শেহরাব চেয়েও যেতে পারেনি। মেহেরুন্নেছা যাওয়ার আগে শেহরাব কে একান্তে জিজ্ঞেস করেছিলো,
“ আপনার কি মন খারাপ? "
শেহরাব আনমনা ছিলো। হুট করে আসা প্রশ্নে চমকে উঠলো। বলল,
“ না।"
“ কিছুদিন যাবত লক্ষ্য করছি আপনি বেশ নিশ্চুপ।"
“বাড়ির কথা মনে পড়ছে হুট করে।" মিথ্যা বাহানা ছিলো এটা।
“আমি আব্বাজান কে বলবো আপনি তাহলে বাড়ি থেকে ঘুরে আসুন দুদিনের জন্যে।"
“ শাহজাদী আসুন।"
কারো ডাকে মেহেরুন্নেছা পিছনে তাকালো । পালকি তার জন্য অপেক্ষা করছে। তনুজা তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। মেহেরুন্নেছা আবারো সামনে শেহরাবের দিকে তাকালো। তার উত্তরের অপেক্ষা না করে আবারো বলল,
“ বিষন্ন মন নিয়ে কোনো কাজই ঠিক মতো করা যায় না।"
“ বিষন্নতা দূর করাও সম্ভব না।"
“ কি এমন কারণ শুনি?"
“ সব কারণ নিজেরও জানা থাকে না আবার কিছু কারণ বলাও যায় না শাহজাদী।"
ঘুরানো পেচানো কথা মেহেরুন্নেছা ঠিক বুঝলো না। এমনিতে না বলতেও অনেকিছু বুঝে ফেলে কিন্তু এখন বলেও বুঝতে পারছে না। হয়তো এ বিষয়ে ধারণা কম তাই।
মেহেরুন্নেছার কপালে ভাঁজ পড়েছে তবে আর পাল্টা প্রশ্ন করলো না। ওদিকে ডাকছে পরে কখনো শুনবে ভেবে চলে গেলো সামনের পানে। শেহরাব ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইলো।
“ যা অসম্ভব তা কেন মনে ঘর বাঁধে? কেন চোখের নালিশ জুড়ে তারই ছবি আঁকে?"
_________
আজমির খান বসে আছেন দরবারে। আজ আরো বেশি প্রজা এসেছিলো কর মৌকুফের আর্জি নিয়ে।
শাহমির খানের কথা শুনে অনেকটা বুঝার পর সাহায্যের কথা জানালো। পরিস্থিতি অনুযায়ী ভালো সাজার জন্য হলেও এমনটা করতে হবে।
প্রজারা খুশি হলো। এই প্রথম হয়তো সুলতান তাদের কথা ভাবলো। প্রজারা যেতেই শাহমির আবারো বলল,
“ ভাইজান সুন্দরগড়ের সুলতান সহ অন্যান্য রাজ্যের সুলতান রা বস্তু বিতরণ করে, এতে প্রজারা খুশি হয়। তোমার ও উচিত হবে এমনটা করা। এতে হবে কি তোমার উপর সকলের ধারণা পরিবর্তন হবে। ভবিষ্যতে কোনো কিছু হলে প্রজারা তোমার পক্ষে থাকবে।"
আজমির খান তড়িৎ গতিতে দৃষ্টি রাখলেন ছোট ভাইয়ের পানে। শাহমির নড়লো না,বুঝতে চেষ্টা করলো তারই অভিব্যক্তি। তিনি কিছুটা ভাবনার পর বললেন,
“ ঠিক আছে ব্যবস্থা কর।"
শাহমির খান আনন্দিত হলো। এই প্রথম ভাইজান কে বুঝাতে সক্ষম হলো। এভাবে বুঝাতে পারলে এই রেশারেশি,হিংসা আর থাকবে না মনে।
মেনে নেওয়ার কারণ অবশ্য আরো আছে। তখনই হামিদের আগমন ঘটলো সেখানে। চাচাজানের দিকে দৃষ্টি পড়তেই ক্ষেপে উঠলো। অনেকে আছে বলে রাগ নিয়ন্ত্রণ করলো। দরবার শেষ করে আজমির খান সিংহাসন থেকে উঠে দাঁড়ালো। এগিয়ে এলো পুত্রের দিকে। বেরিয়ে গেলো সেখান থেকে। চলতে চলতেও হামিদ ফুঁসছে। তা দেখে শাহমির হেসে উঠলো। বলল,
“ ভালো হও হামিদ। ধ্বংসের দিকে পা বাড়ালে ধ্বংস হয়ে যাবে। অস্তিত্ব থাকবে না একটুও অবশিষ্ট।"
এই কথাতেই আগুন ধরে গেলো হামিদের শরীরে।দাঁত পিষে কিড়মিড় উঠলো।
“ তুমি আমার বিষয়ে নাক গলাবে না,আমার যা ইচ্ছে করবো।"
“ক্ষমতার অপব্যবহার করলে একদিন সে ক্ষমতা হারিয়ে যাওয়ার সম্ভবনা থাকে। ইচ্ছের বিরুদ্ধে নারীর গায়ে হাত দিতে যাও কোন সাহসে?"
হামিদ সম্মান দিতে জানে না তাই তো তেড়ে আসলো মুহূর্তে। আজমির খান এতক্ষণ চুপ থাকলেও এবার ক্ষেপে গেলো। চড় মারলো হামিদের গালে। গালে হাত দিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো সে।
“ তোমারা দুজনে চুপ থাকবে? হামিদ তোমাকে বলিনি প্রকাশ্যে আসবে এমনকিছু করবে না।
যে রাজি না তাকে টানো কেন? দাঁড়াও শিগগিরই তোমার নিকাহের ব্যবস্থা করবো। শাহমির খবর পাঠাও তাকে শিগগিরই যেন প্রাসাদে ফিরে।
তুমি খোঁজ নিতে যাবে কন্যার, যে হামিদের যোগ্য হবে।"
আজমির খান হামিদ কে নিয়ে এগিয়ে গেলো। শাহমির গেলো নিজ কক্ষের দিকে। পথে দেখা হলো জুবায়েদের সঙ্গে। তিনি হলেন সুলতানার ছোট বোনের স্বামী। মানুষ হিসাবে খুবই ভালো শাহমির খানের পছন্দের একজন। তাকে একটু আগে ঘটে যাওয়া সবকিছু বললো। সে শুনেই কিছুটা চিন্তিত হলো। বলল,
“যে কন্যার সঙ্গে নিকাহ হবে তার জীবন সুখের হবে তো? নিকাহের পরও যদি ভালো না হয়?"
“ভাইজানের কথা হামিদ অমান্য করতে পারে না তাই চেষ্টা করতে হবে ভালো করার। আমাদের এতটুকু স্বার্থপর হতেই হবে জুবায়েদ।"
__________
মেহেরুন্নেছা প্রাসাদে ফিরে এসেছে। এসেই আয়েশা ছুটে এলো তার কাছে। কোলে চড়লো এক লাফে। টলমল চোখে অভিযোগ জানালো। মেহেরুন্নেছা কেবল শুনলো তার আদর করে জড়িয়ে নিলো। ওর সাথে সাথে লতিফাও আসলো। তাকে দেখে মেহেরুন্নেছা বলল,
“ ভাবিজান আপনি আয়েশা কে মেরেছেন কেন?"
লতিফা হাফাতে হাফাতে রাগী চেহারার উত্তর দিলো,
“ সে তোমার ভাইঝি কে জিজ্ঞেস করো। এতো বিচ্ছু।"
মেহেরুন্নেছা আয়েশা কে চোখাচোখি সামনে আনলো।
“ কি করেছে আমার আয়েশা শুনি?"
আয়েশা চুপ করে আছে। মিটিমিটি চোখে মায়ের দিকে তাকাচ্ছে। মুখ দেখে বুঝা যাচ্ছে ভয়ে আছে।
“তোমার ভাইঝি কক্ষের আলমিরা থেকে খঞ্জর বাহির করেছে এবং দাসির এক কন্যার সঙ্গে খেলতে গিয়ে সেটা দিয়ে আঘাত করেছে। কেঁটে গিয়েছে হাত।"
মেহেরুন্নেছা অবাহ হলো। নিজেও এবার চোখে মুখে রাগ নিয়ে আসলো। আয়েশা কে কোল থেকে নামিয়ে দিলো। শাসনের সময় প্রশয় দেওয়া ঠিক নয়। তাই তো কড়া কন্ঠে বলল,
“ তুমি কেন খঞ্জর বাহির করেছো? আর করলেও কেন আঘাত করেছো? বলো?"
মেহেরুন্নেছার কন্ঠে ভয়ে কেপে উঠলো আয়েশা। অতি আদরে এমন ধমক কখনো দেওয়া হয়নি।
যদি এখনো ধীরে বলতো তবে ভয় পেতো না, পরবর্তী একই কাজ করতে সাহস করবে।
আয়েশা ভয় পেলো। কান্নাও করে দিলো মুহূর্তে। কান্না মিশ্রিত কন্ঠে উত্তর দিলো,
“ আমি ইচ্ছে করে আঘাত করিনি। তোমার হাতে দেখেছিলাম ওই জিনিসটা এজন্য বাহির করেছিলাম। আঘাত লেগেছে ভুল করে।"
ছোট আয়েশা চোখে অনুশোচনা আর ভয় দুই-ই।
মেহেরুন্নেছা বুঝতে পারলো তার কথা। আয়েশা কখনো মিথ্যা বলেনা। এ শিক্ষা মেহেরুন্নেছা নিজে দিয়েছে। সে আবারে কোলে নিলো। চোখের জল মুছিয়ে দিলে বলল,
“ আরেকটু বড় হও তার পর অস্ত্র চালনা আমি নিজে তোমায় শেখাবো। আঘাত শত্রু কে করতে হয় মিত্র কে নয়। সে তোমার সঙ্গী না? তোমার সঙ্গে খেলা করে।"
আয়েশা মাথা নাড়ালো। মেহেরুন্নেছা ইশারায় লতিফা কে যেতে বলল। সে চলে গেলো চুপচাপ।
আয়েশার দাদিজান মাসুরা হলে শাসনের পরিবর্তে এড়িয়ে যেতো তবে মেহেরুন্নেছার উপর পুরো বিশ্বাস আছে।
___________
টগবগিয়ে অশ্বের দল ছুটে চলেছে। পিঠে মানুষ চড়ে আছে। পাহাড়ের আস্তানা ছেড়ে স্থান পরিবর্তন করেছে দুদিন আগে। পশ্চিমের পাহাড় হতে বহু কষ্ট লুকিয়ে বাহির হয়েছে দূর্গম নদী মাড়িয়ে। পাহারাদার ছিলো সবদিকে। কেবল একদিকে ফাঁকা ছিলো। নদী আর জঙ্গলের ভেতর দিয়ে সে পথ। যেখানে মরণ ফাঁদ ও থাকতে পারে।
নদীতে নেই জাহাজ কিংবা নৌকা, জঙ্গলের ভেতরে ঘন গাছ আর ঝোপ। তবুও সেসব মাড়িয়ে চললো সকলে। দিন হলেও সে জঙ্গলের ভেতর রাত মনে হচ্ছে। রাতের দিকে এদিকে মানুষ ভুলেও আসে না। ডাকাত সর্দার তলোয়ার, ধনুক সহ যাবতীয় অস্ত্র হাতে এগিয়ে যাচ্ছে। হুট করে সামনে হিংস্র নেকড়ের সামনে পড়ে। ঝাপিয়ে আসার আগেই ধনুক ছুড়ে বুক বরাবরে। তবুও নেকড়ে থামে না ব্যথা যেন কমই লেগেছে। দ্বিতীয় বার ঝাপিয়ে আসতে নিলে আরো কয়েকটা তীর বিঁধে শরীরে। এবার থেমে যেতে বাঁধ্য হয়,নেতিয়ে পড়ে শরীর। পথ তৈরি করে আবারো সকলে ছুটে যায় দক্ষিণের পাহাড়ে।
“সর্দার দূর গ্রামেও পাহারাদার বসানো আছে। এখান থেকে প্রাসাদ খুব কাছে। খবর পেয়েছি সুলতান আজ বস্তু বিতরণ করছে পুরো রাজ্যে।"
জাজিম তখন আহারের জন্য বন থেকে পেড়ে আনা ফুল খাচ্ছিলো। দলের কারো কথায় তাকালো সেদিকে। মুখে নেওয়া ফুলটা শেষ করে বলল,
“ তুমি আর কফিল যাবে সাধারণ বেসে প্রাসাদের ভেতরের খবর নিয়ে আসবে রাতের আঁধারে। আমার পরিকল্পনা করা শেষ। অনেক লুকিয়ে থাকলাম এবার একটু বেরোনো যাক।
___________
ধরণীতে আঁধার নেমে আসতেই রাজপ্রাসাদের প্রতিটি অলিন্দ, বারান্দা ও দরবারখানায় একে একে জ্বলে উঠল পিতল ও ব্রোঞ্জের ঝুলন্ত তেলের প্রদীপ। প্রধান ফটকের দু'পাশে প্রহরীদের হাতে দাউদাউ করে জ্বলছে মশাল। প্রদীপের সোনালি আলো মার্বেল পাথরের মেঝে, খিলান আর কারুকার্যময় স্তম্ভে পড়ে এক অপার্থিব আবহ সৃষ্টি করেছে। মৃদু বাতাসে প্রদীপের শিখাগুলো দুলে উঠছে, আর সেই আলো-ছায়ার পুরো প্রাসাদ যেন মোহনীয় হয়ে উঠেছে।
প্রাসাদের পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত শাহজাদী মেহেরুন্নেছার কক্ষটিও স্নিগ্ধ আলোয় ভরে উঠেছে। ছাদের মাঝখানে ঝুলছে নকশাখচিত ব্রোঞ্জের একটি বড় তেলের প্রদীপ। চার কোণে রাখা পিতলের প্রদীপগুলো থেকে ছড়িয়ে পড়া কোমল সোনালি আলো রেশমি পর্দা, খোদাই করা সিন্দুক, অলংকারের বাক্স আর নরম গালিচার ওপর মায়াবী আভা ছড়িয়ে দিয়েছে। জানালার জাফরি ভেদ করে আসা শীতল রাতের হাওয়ায় প্রদীপের শিখা আলতো কেঁপে উঠছে। মেহেরুন্নেছা গ্রাম থেকে এসে বিশ্রাম নিচ্ছিলো কক্ষে। একটু আগেই দাসিরা এসে প্রদ্বীপ জ্বালিয়ে দিয়ে গেলো।
মেহেরুন্নেছা পালঙ্কে শোয়া থেকে উঠে পড়লো। দাঁড়ালো গিয়ে জানালার পাশে। বাহিরে মৃদু হাওয়া বইছে। দক্ষিণা হওয়া তার চুল উঠিয়ে দিলো। চোখের সামনে ছোট চুলগুলো ছড়িয়ে পড়লো। মেহেরুন্নেছা সেগুলো কানের পিঠে গুঁজলো। তার পর চোখ বন্ধ করে হাওয়ার স্নিগ্ধতা অনুভব করতে লাগলো। হঠাৎ চোখের পাতায় ভেসে উঠলো দুটো চোখ। সেই প্রথম দেখা জোছনার আলোতে জ্বলে উঠা দৃষ্টি। আজকাল সে রাত্রি নামলে ঘুমের ঘোরে স্বপে দেখে চারপাশে শত্রু তাকে আঘাত করতে আসছে, কিন্তু কেউ একজন তাকে বাঁচাতে লড়াই করছে,আগলে রাখছে। যার মুখ দেখতে পায় না। কেবল স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পিছন দিক নজরে আসে, চেনা মনে হয় কিন্তু বুঝতে পারে না ঠিক কে সে।
কিছুটা সময় অতিবাহিত হওয়ার পর দৃষ্টি মেললো, মেহেরুন্নেছা। নজরে পড়লো প্রাসাদের দক্ষিণে দিকে কেউ একজন একেলা হেঁটে চলছে। ওদিকে কোনো বসত-বাড়ি নেই, আছে শুধু ছোট একটা নদী। যার সমাপ্তি হয়েছে চন্দ্রগড়ে। মাঝিরা নৌকা বায়, জেলেরা ধরে মাছ, তবে সেখানে কাজ কি তার?
হয়তো মাছ নিয়ে আসতে গিয়েছে কিন্তু পরক্ষণে আবার ভাবলো, মাছ তো জেলেরা নিজে এসে দিয়ে যায়। আর সে তো যাওয়ার মানুষ ও নয়।
“ শাহজাদী সুলতানা আপনাকে ডাকছেন।"
দাসির ডাকে ধ্যান ভাঙলো মেহেরুন্নেছার। পিছনে তাকিয়ে জানালা থেকে সরে এলো। বলল,
“ যাচ্ছি। আপনি যান।"
সে আবার জানালার দিকে তাকিয়ে বেরিয়ে গেলো কক্ষ থেকে। চলতে চলতে ভাবলো কিছু একটা। একেবারে থামলো গিয়ে অতি পরিচিত তার আম্মাজানের কক্ষের সামনে। অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করলো। সেখানে আগে থেকে মাসুমা বেগম ছিলেন বসে।
“ আম্মাজান ডেকেছেন?"
“ হ্যাঁ বসো।"
মেহেরুন্নেছা তার আম্মাজানের পাশে বসলো।
কন্যার দিকে চেয়ে হাসলো। মুগ্ধ হয় নিজ কন্যা কে দেখেই। বিভিন্ন রাজ্য থেকে তার জন্য নিকাহের প্রস্তাব আসে। কিন্তু সুলতান নিজ রাজ্যের বাহিরে কন্যা কে পাঠাতে ইচ্ছুক নন। অনেকে এখানে থাকতেও রাজি হলেও যখন জানতে পারে ভবিষ্যৎ সুলতানা হবে মেহেরুন্নেছা তখনই পিছু হাঁটে।
নারীর শাসনে থাকতে রাজি নয় শাহজাদা'রা।
স্ত্রী সুলতানা হবে,রাজ্য শাসন করবে আর স্বামী কি করবে? কেবল সম্পর্কের নাম নিয়ে নারীর মতো কক্ষে থাকবে? এমন মতামত শুনেই আলাউদ্দিন শাহ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি নিজে দেখে কন্যার নিকাহ দিবেন। যে সব শর্তে রাজি হবে, সুন্দর মনের মানুষ হবে এবং তার কন্যার উপযুক্ত হবে তাকেই জামাতা বানাবেন।
সুলতানা কন্যার কপালে চুমো এঁকে দিলেন। কিছুটা সরে এসে বললেন,
পরশু তোমার চাচিজানের ভাইপো'র নিকাহ।
কাল তোমার চাচিজান তোমাকে নিয়ে যেতে চাচ্ছেন তুমি কি যাবে?"
মেহেরুন্নেছা এক পলক চাচিজানের দিকে তাকালো। তার উত্তরের আগেই মাসুরা বলল,
“ চলো আম্মা। আমার একা যেতে ভালো লাগছে না। তুমি গেলে তবেই মোহসীন আর আয়েশাও যাবে।তোমার চাচাজান নিকাহের দিন যাবে বড় ভাইজান কে নিয়ে। ভাবিজান তো যাবেন না বলছেন।"
“ আমি আব্বাজানের সঙ্গে কথা বলে জানাবো তিনি আগে আসুক। আমি না গেলেও মোহসীন ভাইজান আর আয়েশা যাবে আমি তাদের বুঝিয়ে বলবো।"
মাসুরা মাথা নাড়ালো। তখনই প্রাসাদের বাহিরে থেকে অশ্বের পায়ের আওয়াজ শোনা গেল। বুঝতে পারলো সকলে ফিরে এসেছে হয়তো। তবে আনন্দের নয় দুঃখ সংবাদ আসলো। দুজন দাসি দৌড়ে এসে জানালো,
“ সুলতানা, সুলতান রা ফিরেছেন তবে...
বলতে গিয়েও থেমে গেলো। ভয়ে ফাহিমা বেগমের বুক ধুক করে উঠলো। দাসির মুখশ্রী আর কন্ঠ শুনে বুঝা যাচ্ছে খারাপ কিছু ঘটেছে। মেহেরুন্নেছা আগেই জিজ্ঞেস করলো,
“ তবে কি হয়েছে?"
“ফেরার পথে রাতের আঁধারে কেউ তাদের আক্রমণ করেছিলো। "
দাসির পুরো কথা আর শোনা হলো না। মেহেরুন্নেছা ছুটে বেরিয়ে গেলো কক্ষ হতে। ফাহিমা আর মাসুরাও পিছু নিলো তার। তিনজনেরই ভয়ে অস্থির। কার কি হয়েছে? প্রিয়জন আছে তাদের সকলেরই।
মেহেরুন্নেছা ছুটছে ঠিকই তবে ভিতু হয়ে। ভয়ে ধুকপুক করছে বুক। মনে হাজারো শঙ্কা। পিতার কিছু হলে সে বাঁচবে না।
মানুষ সাহসীকতা ভুলে যায় মযখন আপন মানুষদের বিপদের শঙ্কা মাথায় আসে। তখন ভয় বাসা বাসে মনে।
মেহেরুন্নেছা সকলের আগে গিয়ে উপস্থিত হলো প্রাসাদের সিংহদ্বারের ঠিক কিছুটা আগে। সামনেই দ্বার। তার পা থামে চিৎকার চেচামেচি শুনে। কেউ তাড়া দিচ্ছে, কাউকে ডেকে নিয়ে আসতে বলছে শিগগিরই। তখনই মেহেরুন্নেছার নজরে পড়লো, কাউকে কে ধরে নিয়ে তড়িঘড়ি করে ভেতরের দিকে ছুটে আসছে কিছুজন। কেউ একজন সোজা লম্বালম্বি শায়িত আছে তাদের হাতের আজলার মধ্যে। তার শরীর থেকে র*ক্ত গড়িয়ে পড়ছে মাটিতে। যেখান দিয়ে ছুটে আসছে র*ক্তের লাল রেখা এঁকে যাচ্ছে।
চলবে....................?