#মেহেরুন্নেছা
#শ্যামলী_রহমান
#পর্ব—৬
রক্তাক্ত দেহটা নিয়ে কয়েকজন সৈন্য দ্রুত সিংহদ্বার পেরিয়ে ভেতরে ঢুকল। সামনে ছুটে চলেছেন মাহতাব। তাঁর গম্ভীর কণ্ঠ বারবার গর্জে উঠছে,
“পথ ছাড়ো হাকিম কে খবর দাও। শিগগির!"
প্রাসাদের অলিন্দে মুহূর্তেই হুলস্থুল পড়ে গেল। দাস-দাসী, প্রহরী যে যার জায়গা ছেড়ে সরে দাঁড়াল। মেহেরুন্নেছা এতক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ যেন কান পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে। শায়িত করা নিয়ে আসা মানুষটার মুখ আধারে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। এদিকে তার পিতাকেও নজরে পড়েনি। ভয় পেলো আরো। এই বুঝি সেই হবে। কাঁপা পায়ে সে আরেকটু এগিয়ে এলো।
ঠিক তখনই আহত মানুষটার মাথা সামান্য কাত হয়ে পড়ল। কাছাকাছি আসতেই মশালের আলো মুখের ওপর পড়লো মেহেরুন্নেছার বুক কেঁপে উঠল।
শেহরাব!" ঠোঁট নড়লেও কোনো শব্দ বেরোল না। চোখের পলকে মুখের সমস্ত রঙ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। ভয় যাকে নিয়ে সে আহত হয়নি এটা যেমন স্বস্থির ঠিক এটাও কষ্ট দিচ্ছে তাকে। ভয় লাগছে বুকে।
আলাউদ্দিন শাহ তখনই দ্রুত ছুটে আসলেন।বললেন,
“দেরি কোরো না। অতিথিশালার পাশের চিকিৎসাকক্ষে নিয়ে যাও। তীরগুলো এখনই কেউ স্পর্শ করবে না। রাজহাকিম না আসা পর্যন্ত যেমন আছে তেমনই থাকবে।"
চারজন বলিষ্ঠ সৈনিক সাবধানে শেহরাবকে নিয়ে চিকিৎসাকক্ষে প্রবেশ করল। দুটি তীর বিঁধেছে শরীরে। একটি তার কাঁধের নিচে ও আরেকটি কোমরে গভীরভাবে বিদ্ধ, সেখান থেকে অবিরাম রক্ত ঝরছে।
মেহেরুন্নেছা দেখতে পেলো তার পিতার কাঁধেও র*ক্ত তবে তিনি এগিয়ে গিয়েছেন। তাকে লক্ষ্য করলেও কথা বলার সুযোগ হলো বা।
কিছুক্ষণের মধ্যেই বৃদ্ধ রাজহাকিম এসে উপস্থিত হলেন। সঙ্গে দুইজন শিষ্য। শেহরাবের নাড়ি পরীক্ষা করে তিনি গম্ভীর মুখে বললেন,
“গরম পানি আনো। পরিষ্কার সুতির কাপড়, মধু, হলুদের গুঁড়ো আর ঔষধি পাতার প্রলেপ প্রস্তুত করো। প্রদীপের আলো আরও বাড়াও।"
সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে তিনি সতর্ক দৃষ্টিতে তীরটি পরীক্ষা করলেন।
“একবারেই বের করতে হবে। না হলে ক্ষত আরও ছিঁড়ে যাবে।"
দুইজন শেহরাবকে শক্ত করে ধরে রাখল। নয়তো ব্যথায় কুঁকড়ে উঠবে তখন আরো ব্যথা পানে।
হাকিম ধীরে ধীরে তীর দুটো টেনে বের করতেই শেহরাব যন্ত্রণায় অচেতন অবস্থাতেই কেঁপে উঠল। ক্ষতস্থান থেকে আরো গলগলিয়ে রক্ত বেরিয়ে এলো। হাকিম সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে ঔষধি বাটা লাগিয়ে শক্ত করে কাপড় দিয়ে বেঁধে দিলেন। তারপর গভীর নিঃশ্বাস ফেলে বললেন,
“আল্লাহর রহমতে তীরটি প্রাণঘাতী স্থানে লাগেনি। অনেক রক্তক্ষরণ হয়েছে। আজকের রাতটাই সবচেয়ে সংকটের। জ্ঞান ফিরলে বেঁচে থাকার আশা অনেক বেড়ে যাবে।"
চিকিৎসাকক্ষের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মেহেরুন্নেছা অজান্তেই দু'হাত তুলে নীরবে দোয়া করল। তার মুখে তখন একটাই প্রার্থনা,
"হে আল্লাহ....মানুষটাকে সুস্থ করে দিন।"
________
শুনশান পাহাড়ে কেবল হাওয়ার শব্দই শোনা যাচ্ছে। চারদিকে অন্ধকার তার মধ্যে জ্বলছে মশাল। এই হাওয়া কিছুটা শীত দিচ্ছে। পাশে জঙ্গল হওয়াতে তাবুর সামনে আগুন জ্বালিয়ে রেখেছে আর ভেতরে অস্ত্র। কেউ ঘুমাবে কেউ পাহারা দিবে এই প্রস্তুতি। কারণটা হিংসা জন্তুর থেকে নিরাপদের। এখন ভোঁজ চলছে।
সর্দার খাওয়া শেষে উঠে পড়লো। আপনমনে বলে উঠলো,
“ আমরা ছাড়াও সুলতানের আর শত্রু কে আছে? যে আজ তাকে আঘাত করতে আক্রমণ করেছিলো আড়াল থেকে?"
“ কিজানি সর্দার আমরাও তো বুঝতে পারছি না। গেলাম যে কাজে তা হলো না অন্য কেউই করে দিলো। তবে ভাবার বিষয়!"
“ শত্রুর শত্রু কে খুঁজে বাহির করতে হবে হাসিম। শত্রুর শত্রু আমাদের মিত্র।"
কথা শেষ করেও আবারো বলল,
“সুলতান আলাউদ্দিন শাহ কে মরণ যন্ত্রণায় ছটফট করতে দেখতে পেলে শান্তি লাগতো কিন্তু এসে গেলো আরেকজন। কে ওই যুবক? খোঁজ নেও। তার বুদ্ধিমাত্রা বেশ! কিন্তু মুখটা দেখতে পাইনি ঢাকা ছিলো কালো কাপড়ে।"
“ তবে সর্দার মনে হচ্ছিলো দেখেছি কোথাও।"
জাজিম কপাল কুঁচকে তাকালো উত্তর দেওয়া মানুষটার দিকে। তার কিছু একটা ভাবলো। বলল,
“ হয়তো লড়েছে কখনো। হতে পারে প্রাসাদেরই কেউ, আলাউদ্দিন শাহ এর আপনজন।"
“ প্রাসাদে কি হচ্ছে তার খবর কাল পাওয়া যাবে।
ওরা দুজন ছদ্মবেশে এতক্ষণে পৌঁছে গেছে।"
জাজিম পাথরের উপর বসে পড়লো। ভাবতে লাগলো তখনের ঘটনা গুলো। আড়ালের মানুষগুলো কে ছিলো তা দেখতে পায়নি। নিজেরা আক্রমণ না করেও পালাতে হয়েছিলো।
পরিকল্পনা করলো আজ আঘাত কাল লুট। কারণ সুলতান আপাতত প্রাসাদে থাকবে। আমরা এতো কাছে এসেছি তা ভাবতেও পারবে না।
__________
রাতের দ্বিতীয় প্রহর চলছে। আলাউদ্দিন শাহ ঘুমোননি। মাহতাব আর আলী মোহাম্মদের সঙ্গে কিছু বিষয়ে আলোচনা করে কক্ষ থেকে বেরোলেন। বেরোতেই মেহেরুন্নেছা কে দেখতে পেলো। তার চোখে মুখে উদ্বিগ্নতা এখনো। জানার আগ্রহ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মাহতাব আর আলী মোহাম্মদ কে বিদায় দিয়ে কন্যা কাছে গিয়ে দাঁড়ালো।
“চলো কক্ষে।"
মেহেরুন্নেছা কথা না বাড়িয়ে পিছু নিলো। আলাউদ্দিন শাহ এর কাঁধে কাপড় বাঁধা।
তিনি এক বার চারপাশ দেখে নিলেন। তার পর বললেন,
“ বলো কি জানতে চাও?"
মেহেরুন্নেছা পিতার পাশাপাশি হলো। তবে পা থালামো না।
“ তারা কে ছিলো আব্বাজান?"
“ জানিনা। দেখতে পাইনি।"
“ তাদের উদ্দেশ্য....
“ আমি ছিলাম। গ্রাম থেকে ফেরার পথে ছোট একটা জঙ্গল পড়ে। ও পথ জঙ্গলের ভেতর দিয়ে। আগে কখনো গ্রামের ভেতর আক্রমণের শিকার হইনি তাই ধারণা ছিলো না। হুট করে দক্ষিণ,পশ্চিম থেকে তীর ছুঁড়ে শুরু করে। প্রথমে না বুঝতে পারলেও পরে যখন বুঝতে পারলাম তখন দেখি পাশে কেউ নেই। সামান্য পিছনে পড়েছিলাম আমি মাহতাব আর দুজন সৈন্য। তারা প্রথমেই কাবু হয় লুটিয়ে পড়ে মাটিতে। তাদের নিশানা আমি ছিলাম তাই তো তীরগুলো ছুড়ে আসছিলো আমারই দিকে। শেষে মাতবর এদিকে আসতে নিলে তাকে সরে যেতে বলি এবং সকলকে ডাকতে ইশারা দিই । ও চিৎকার করে ডাকে এগিয়ে গিয়ে। ততক্ষণে আমি কৌশলে অশ্ব ছুটিয়ে চলি কিন্তু ওরা অশ্বের পায়ে তীর বিঁধে থামিয়ে দেয়। স্থির হয়ে গেলেই জীবন বিপন্ন হতে পারে। শত্রুর দেখা না পেলে লড়বো কি করে? তবুও কিছু মুহূর্তে কৌশল করে বাঁচছিলাম কিন্তু কতক্ষণ? সেই সময়েই শেহরাব ছুটে আসে। ভাগ্যিস ও আমাদের আরো পিছনে ছিলো। ঢাল আমার দিকে তুলে ধরে এবং তার অশ্বে স্থানান্তর করে ছুটে আসতে চায়। কিন্তু তখনই দুটো তীর এসে বিঁধে শেহরাবের শরীরে। চিৎকার করে উঠে, লুটিয়ে পড়তে চাইলে আমি আগলে ধরি দুহাতে। সেই সময়ই আলী মোহাম্মদ সৈন্য নিয়ে ছুটে আসে। চারদিকে ছড়িয়ে গেলে কাউকে পাওয়া যায় না ততক্ষণে তীর ছোড়া বন্ধ হয়েছে, হয়তো পালিয়ে গিয়েছিলো সকলে। "
মেহেরুন্নেছা মনোযোগ দিয়ে শুনলো। তার অভিব্যক্তি বুঝা দায়। চলন্ত পা ততক্ষণে থেমে গেছে। কক্ষের ভেতর প্রবেশ করে আবারো প্রশ্ন করলো,
“ আপনার কাদের সন্দেহ হয় আব্বাজান?"
“ ডাকাত দল?"
“ না। আমার মনে হয় এর ভেতরে অন্য কারো কারসাজি আছে। ডাকাত দলের উদ্দেশ্য শুধু আক্রমণ করা নয় লুট করাও হতো। আপনাদের কাছে তো কিছু ছিলো না তাছাড়া...
মেহেরুন্নেছা থেমে গেলো। আলাউদ্দিন কন্যার থেমে যাওয়ায় জানতে চাইলো,
“ তাছাড়া কি?"
“ আপনি প্রাসাদে নিরাপত্তার জন্য সৈন্য বাড়িয়ে দিন। কোথাও বেরোলে সঙ্গে করে নিয়ে যাবেন মাহতাব ভাইজান সহ আরো সৈন্য। আপাতত রাতে আর কখনো জঙ্গল পথ পেরোনোর প্রয়োজন নেই। আগে শত্রুর বিন্যাস করতে হবে।"
আলাউদ্দিন সম্মতি জানালেন। শুধু নিজের জন্য নয় সকলের জন্য চিন্তা আছে। যদিও ডাকাতদের এতো সাহস হয়নি প্রাসাদে হামলা করবে। তাদের আস্তানা খুঁজতে হবে।
________
“ বড় আব্বাজান শেহরাবের জ্ঞান ফিরেছে।"
আলাউদ্দিন শাহ কন্যার সঙ্গে আরো কিছু আলোচনা শেষ করে সবে কক্ষ থেকে বাহির হবে তখনই মাহতাব এসে এ খবর জানালো। আলাউদ্দিন চিন্তামুক্ত শ্বাস নিলেন। মেহেরুন্নেছা খুশি হলো।
“ চলো দেখা করে আসি। হাকিম কি এখনো আছে?"
“ হ্যাঁ আছেন।"
“ আব্বাজান আমিও যাবো?"
আলাউদ্দিন শাহ এবং মাহতাব দুজনে পিছনে তাকালো। মেহেরুন্নেছা অনুমতির অপেক্ষা না করে কক্ষ থেকে বেরোলো।
“ এসো।"
তিনজনে হেঁটে চললো। পথে রহমত শাহ আর মোহসীন দাঁড়িয়ে আছে। ওরা নাকি দেখে আসলো শেহরাব কে। আলাউদ্দিন ওদের সঙ্গে মাহতাব কেও পাঠিয়ে দিলেন বিশ্রাম নিতে তার পর পিতা আর কন্যা চলে গেলো দুজনে।
আলাউদ্দিন শাহ আগে প্রবেশ করলেন। মেহেরুন্নেছা দরজার সামনে এসে থমকে গেলো।
ভেতর এখনো কাঁপছে। কিন্তু তাকে কি এতো ভয় পাওয়া মানায়? উত্তর মিললো না।
“ এখন কেমন লাগছে শেহরাব?"
পালঙ্কে চোখ বন্ধ করে শুয়ে ছিলো সে। ব্যথায় টনটন করছে কাঁধ এবং পেট ও কোমরের আশে পাশের অংশ। নড়তে পারছে না, ব্যথায় মুখ দিয়ে কথা বেরোতেও চাচ্ছে না তবুও কষ্টে উত্তর দিলো,
“ এখন ঠিক আছি।"
হাকিম তখনই বলল,
“ ব্যথা এবং আঘাত সারতে সময় লাগবে। যত্ন ও বিশ্রাম নিতে হবে। আমি তো আছিই আসবো প্রতিদিন।"
এই বলে আলাউদ্দিন শাহ এর থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলো হাকিম। শেহরাব সোজা হয়ে শুয়ে আছে। ঘাড় ঘুরাতে পারছে না তবে আলাউদ্দিন শাহ কাছাকাছি আসাতে কোনা চোখে দেখতে পাচ্ছে। তিনি পাশে বসলেন। মাথায় হাত রেখে বললেন,
“ তুমি বাহাদুরি দেখিয়েছো, বাঁচিয়েছো আমার প্রাণ। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ও কম হয়ে যাবে। তোমার কি প্রাণের ভয় ছিলো না? আমাকে বাঁচাতে নিজে যে সামনে পড়লে ? এখন এতো ব্যথা সহ্য করতে হচ্ছে।"
শেহরাব হাসলো। ব্যথায় ভেতর ছারখার হচ্ছে তা বুঝতে দিলো না। বলল,
“ আপনি কত আঘাত সহ্য করেছে, লড়াই করে রাজ্য বাঁচিয়েছেন কাদের জন্য? প্রজাদের জন্য তাই তো? একজন সৈন্য না হোক সাধারণ প্রজা কিংবা মানুষ হিসাবে সুলতান কে বাঁচানো আমার দায়িত্ব মনে হয়েছে তাই বাঁচিয়েছি।"
আলাউদ্দিন শাহ মুগ্ধ হলো। এমন নিঃস্বার্থ মানুষ ও হতে পারে? এমন সুন্দর মনের মানুষ ক'জন বা আছে? একজন আর্দশ মায়ের পুত্র বলে ভাবলো।
শেহরাব কে নিয়ে ভাবনা শেষ হলে মনে পড়লো মেহেরুন্নেছা সঙ্গে এসেছিলো। তড়িৎ গতিতে তাকালো দরজার পানে। সেখানে মেহেরুন্নেছা ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে। তার অধর জুড়ে মুগ্ধকর হাসি হয়তো শেহরাবের কথাগুলো শুনেই।
“মেহেরুন্নেছা ভেতরে এসো।"
ভাবনায় মত্ত সে চমকে উঠলো যেন। পিতার কথায় কক্ষের ভেতর পা বাড়ালো । শেহরাব মেহেরুন্নেছার নাম শুনেই ব্যথার কথা ভুলে গেলো। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে গিয়ে 'আহহহ'করে উঠলো। আলাউদ্দিন শাহ বিচলিত হলো মেহেরুন্নেছা সামান্য টুকু ছুটে এলো।
“ কি হয়েছে শেহরাব?"
সে চুপ করে থাকলো। মেহেরুন্নেছার দিকে তাকালো। চোখ মুখ মলিন স্পষ্ট।
“ ব্যথা লাগছে একটু নড়াচড়া করলেই।"
“ তাহলে নড়াচড়া করবেন না, চুপচাপ শুয়ে থাকুন।"
অবশেষে মেহেরুন্নেছার দেখা এবং কন্ঠ দুই শুনতে পেলো। কিছুটা ভালো অনুভব করলো। যেন ব্যথার উপশম শাহজাদীর আগমন।
“ আপনি রাতের খেয়েছেন?"
“ না, মাত্র তো জ্ঞান ফিরলো।"
আলাউদ্দিন শাহ উঠে পড়লো। বলল,
“ মেহেরুন্নেছা তুমি একটু থাকো আমি দাসিদের বলে খাবার নিয়ে আসছি। ও নিশ্চয়ই নিজে হাতে খেতে পারবে না আমিই খাওয়াবো।"
এই বলে তিনি বেরিয়ে গেলেন। তার পর নিরবতাময় কক্ষ। কারো মুখে কোনো কথা নেই।
কেউ তাকিয়ে আছে কেউ-বা ভাবছে। নিরবতা ভেঙে মেহেরুন্নেছা বলে উঠলো,
“ আপনার সাহসীকতা দেখছি আমার থেকেও বেশি।"
“ আপনার থেকে বেশি সাহসী হলে কি আর...
থেমে গেলো। ব্যথায় চোখ বন্ধ করলো। মেহেরুন্নেছা বুঝতে পারলো শরীরের ব্যথা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়েছে তাই কথা বলতেও কষ্ট হচ্ছে।
“ থাক কথা বলতে হবে না।"
শেহরাব চোখ খুললো। কথা বলতে ইচ্ছে করলেও বলতে পারছে না। ব্যথায় খিঁচে রেখেছে দাঁত ও মুখ।
“ আমি তাহলে আসি? আব্বাজান আসছেন হয়তো।"
মেহেরুন্নেছা কক্ষ থেকে বেরোনোর জন্য ঘুরিয়ে দাঁড়ালো। পা বাড়াতেই ওড়নায় টান অনুভব করলো। যেতে পারলো না। মাথা থেকে ওড়না খুলে যাবে এই ভেবে সামনের ওড়নার কোন চেপে ধরলো। তড়িঘড়ি করে পেছনে তাকালো। দেখলো শেহরাব ওড়নার কোন ছাড়িয়ে দিচ্ছে বাম হাতে। আঁটকেছিলো পালঙ্কের এক কোনে। মেহেরুন্নেছা সরে এলো। শেহরাব বলল,
“ আপনার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে।"
“ বলুন?"
“ একান্তে।"
“এখনই তো কেউ নেই।"
“ আছে।"
মেহেরুন্নেছা পেছনে তাকিয়ে চুপচাপ মেনে নিলো। শেহরাবের দিকে ভালো করে তাকলো। কেমন নিতেজ হয়েছে শরীর, ব্যথা মুখশ্রীতে স্পষ্ট। শেহরাবের দৃষ্টি তো আগে থেকেই তার পানে ছিল। হুট করে সে বলে উঠলো,
“আপনার নিশানভেদী দৃষ্টি শুধু শত্রু নয়, হৃদয় ও ছারখার করে দিতে পারে আপনি কি তা জানেন শাহজাদী?
মেহেরুন্নেছা হয়তো মজা পেলো তাই তো হেসে উঠলো। এ যাবত অনেক চিঠিই পেয়েছে সে। তবে হৃদয়ে কাখনো অনুভূতি আসেনি।
“ এসব জানার আগ্রহ কখনো জাগেনি।"
“ কাউকে কখনো ভালোবাসেননি?"
“ বেসেছি।"
মেহেরুন্নেছার উত্তরের শেহরাবের হৃদয়ে তোলপাড় শুরু হলো। কাকে ভালোবেসেছে সে? উত্তর জানতেই প্রশ্ন করেছিলো তবে এই উত্তর আশা করেনি।
মেহেরুন্নেছা ঝঙ্কার তুলে হেসে উঠলো। শেহরাবের চাহনী দেখে হাসতে হাসতে বলল,
“ ভালো আমি কেবলমাত্র আমার পরিবার কে বাসি। আপনি যা বুঝাতে চেয়েছেন তা অকল্পনীয়।"
শেহরাবের মুখখানা থমথমে হলো। আর কিছু বলার আগেই আলাউদ্দিন শাহ থালা ভর্তি খাবার নিয়ে উপস্থিত হলো। দাসি সবগুলো দিয়ে চলে যেতেই মেহেরুন্নেছাও যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো। দরজার কাছে গিয়ে আরেকবার পিছনে তাকালো। শেহরাব তা দেখে চোখ বন্ধ করলো। মনে মনে আওড়ালো,
“ তীরে আহত আমি, আর ওই দৃষ্টিতে পরাজিত আমার হৃদয়।"
চলবে..............?