#জমিদার_মহল
#পর্বসংখ্যা—৩
#শ্যামলী_রহমান
গভীর রজনী।শুনশান গ্রাম,স্তব্ধ জমিদার মহল।
কোনো শোরগোল নেই।বাহির হতে হওয়ার বেগ ছুটে আসছে।দমকা হাওয়ার নাড়িয়ে দিচ্ছে অন্দরমহলে থাকা সমস্ত পর্দা।হাওয়ার বেগ বাড়ল, বৃক্ষের পাতারা যেন টিকে থাকতে পারলো না।দুলতে থাকলো সমান তালে।প্রচন্ড শব্দে কারো নিদ্রা ভঙ্গ হলো।পলঙ্ক হতে উঠে বসলো।কারো পদচারণের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। নিঃশব্দ সে পদচারণ তবে কেউ একজন জাগনা পাওয়াতে কানে পৌঁছালে সেই আওয়াজ।
মহলের ভেতরো মিটিমিটি আলো জ্বলছে।মহলের সিংহদ্বারে ও ঘোড়া শালে মশাল জ্বলছে।
নিঃশব্দে পদচারণ করা লোকটি ধীরে ধীরে মহল থেকে বাহির হলো।গেলো একদম মহলের পিছন দিকে।ভয়ে ভয়ে পিছু নিলো কেউ।সামনের লোকটি তা খেয়াল করলো না।ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলো লোকটির পিছু নিয়ে। ভীর রাত এদিকটায় বেশ অন্ধকার।সামনের লোকটির গায়ে কালো শাল জড়ানো তাই বুঝা মুসকিল কে সে?হুট করে হওয়ার বেগ বাড়লো।চোখে বালু পড়তে চোখর সামনে হাত মেলে ধরলো।একটু পর চোখ খুলে দেখে সামনে কেউ নেই।চারপাশে নজর দিলো না কেউ নেই!কোথায় গেলো?আশাহত হয়ে পিছনে ঘুরলো।গন্তব্য নিজ স্থান।পা বাড়ালো সেদিকেই কিন্তু কারো উপস্থিতি টের পেয়ে পিছিয়ে তাকালো, চিৎকার দিয়ে উঠলো।
ভোরের সূচনা ঘটেছে।ধরনীতে সূর্যের আলো সঞ্চার করেছে সবে।কুয়াশার চাঁদরে ঢাকা পড়ে আছে সূর্যের রশ্মি।রোদ নেই,কনকনে শীতে কাঁপছে বাহু।রাজ্যের বহু প্রজা আছে যাদের শীতের পোশাক কেনার সামর্থ্য নেই।জমিদার সাইফুদ্দিন নওয়াজ খান মাঝে মধ্যে রাজ্যের মানুষদের সাথে সাক্ষাৎ করতে যান।আজও এমনই একটি দিন।ঘোড়াশাল হতে তার প্রিয় ঘোড়া নিয়ে বেরিয়ে পড়লো পাশের এক গ্রামে।বেশ কয়েক মাস হলো সে গ্রামে যাওয়া হয়নি।আজ ঘুরবে,প্রজাদের দুঃখের কথা শুনবে নিজ কানে।
ইমতিয়াজ উপস্থিত হলো।সামনে তার আব্বাজানের ছুটে যাওয়া ঘোড়াটির পানে রইলো।
সিংহদ্বারের প্রহরিকে জিজ্ঞেস করলো,
“আব্বাজান কোথাই গেলেন?”
“জমিদার মশাই পাশের গ্রামে গেলেন।সেখানে নাকি উনার কিছু বিশেষ কাজ আছে সাথে প্রজাদের সাথে দেখাও হবে।
ইমতিয়াজ আর উত্তর করলো না।আশ পাশ তিক্ষ্ণ নজর ঘুরালো।আগত হলো মনস্থির করে আসা স্থানে।স্বাভাবিক ভাবে হেঁটে চললো সামনের পানে।কেউ তাকে দেখে আশ্চর্য হলো!কিভাবে সে স্বাভাবিক?
এক পা দু পা করে এগিয়ে গেলো।থামলো গিয়ে হবু বেগমের মহলের সামনে।নেত্রপল্লব ঠেকলো একটি কক্ষের উপরে।হাতে তার একখানা খঞ্জর রয়েছে। পা এগিয়ে নিতে গিয়ে কিছু অনুভব করলো। সামনে আর এগুলো না।ছুটলো তার নিদিষ্ট স্থানে নিদিষ্ট ভঙ্গিতে।পিছন থেকে কেউ আড়াল হলো,চেয়ে রইলো,বুঝার চেষ্টা করলো আসলো আবার চলেও গেলো কেন?
মহলের ছাঁদে দাঁড়িয়ে আছে মালিনী আর ইমতিয়াজ।দুজনে নিশ্চুপ। মালিনী অনেকক্ষণ আগেই ছাঁদে এসেছিলো।ছাঁদ থেকে তার নজর পড়লো বাগানের দিকে।কালকের ছেলেটি আজকেও এসেছে।ফুলের গাছগুলোতে পানি দিচ্ছে।গাঁয়ে আজকে খয়েরি রঙের একখানা ফতুয়া তার উপর শাল জড়ানো।শীতের প্রকোপ বেড়েছে কিনা,এজন্য ভর দুপুরেও শীত করছে।
রোদের মুখ কুয়াশায় ঢাকা,একটুখানি উঁকি দিচ্ছে বটে।তখনই আগমন ঘটে কারো। মালিনী চট করে ঘুরে তাকালো।তার থেকে খানিকটা দূরে ইমতিয়াজ কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলো।ধীর পায়ে সে বোনের পাশে দাঁড়ালো।মালিনী বাগানের দিক থেকে নজর সরিয়েছে ভাইজানের আগমনের সঙ্গে সঙ্গেই।ভাই বোনের নিরবতা যেন অন্য কিছু বলছে।মালিনী কিছু জিজ্ঞেস করাই আগেই ইমতিয়াজ বলে উঠলো,
“তোর সখী এই নিকাহে রাজি না বললি।কিন্তু তার মতামত জানতে কাল সন্ধ্যায় গেলাম সে তো কোনো কথাই বললো না।বললো কেবল ‘যা কথা হবে নিকাহের পরে।এতো তেজি কন্ঠ আমাকে বিমোহিত করেছে।আব্বাজানের কাছে শুনলাম প্রথমে রাজি না বলে মহলে এসে কথা শুনিয়ে গেছে।পরে এমন কি হলো?যে রাজি হলো?
মালিনী চুপচাপ শুনলো।একটা কথা বলবে ভাবছে কিন্তু ভয়ে আবার বলতে পারছে না।যদি ভাইজান রাগ করে?মনস্থির করলো।চোখ বন্ধ করে নিজেকে সাহস যুগিয়ে ভাইজানের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ভাইজান বাঈজী মহলে না গেলে হয় না?মদ্যপান হারাম সেসব পান না করলে হয় না?আপনি আগের মতো হয়ে যান না।এখন তো ঠিকঠাক আছেন মাঝে মধ্যে আপনার কি হয়?কেন আপনি ওমন করেন?কি কারণ?এটা বলুন?আপনার যদি অন্য কাউকে বলতে দ্বিধা থাকে তবে আমায় বলুন,নয়তো আম্মিজান কে বলুন।আপনার পরিবর্তনে সবাই কষ্ট পায়।আব্বাজান চিন্তিত পরবর্তী জমিদার হিসাবে আপনাকেই তো আসনে বসতে হবে।প্রজাদের কথা ভাবতে হবে,এভাবে চললে আব্বাজানের মতো ন্যায়পরায়ণ, নিষ্ঠাবান জমিদার কিভাবে হবেন?তাছাড়া আজ আবার হবেন কারো স্বামী হবেন।মেহেরনাজ কেমন আপনি হয়তো তা জানেন না।তার কাছে আপনি ঘৃণিত ব্যক্তি তার পরেও কেন রাজি হয়েছে তা জানিনা।
ইমতিয়াজ এক দৃষ্টে চেয়ে আছে ছোট বোনের চোখের দিকে।এতক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে শুনলো সব কথাই।মালিনী গড়গড় করে সব বললেও এখন কিছুটা ভয় ও লাগছে।ভাইজানের দৃষ্টি উপেক্ষা করে নিচু করে রাখলো।দেখতে পেলো এক জোড়া পা ছাঁদ ত্যাগ করলো।মালিনী মাথা তুললো, ততক্ষণে ইমতিয়াজ চলে গেছে।উত্তরবিহীন প্রশ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো সে।কেন তার ভাইজান প্রতিত্তোর করলো না?আছে কি এর মধ্যে কোনো রহস্য?
আছরের আযান পড়তেই সবার তাড়াহুড়ো শুরু হলো।নামাজ শেষ হলেই নিকাহ পড়ানো শুরু হবে।
মেহেরনাজ কে সাঁজানে হয়েছে জমিদারি ঐতিহ্যের দামি শাড়ি,কত কত গহনা।সালেহা বেগম নিরস মুখে নিজ হাতে সাজিয়েন পুত্রবধূকে।হামিদা আর শারমিন ও ছিলো তারা শুধু দেখেছে।মালিনী মেহেরনাজের পাশে বসে আছে।সখীর হাত খানা জড়িয়ে নিলো।একদৃষ্টিতে তার পানে চেয়ে মুচকি হেসে বলল,
“মাশাল্লাহ ভাবিজান আপনাকে বেনারসিতে সুন্দর লাগছে।যে কেউ দেখলে নজর সরাতে পারবে না।
রেবেকা চোখ মুখ বিষালো,মুখ বাঁকানো কারো নজরে পড়লো।মেহেরনাজের দৃষ্টি সালেহার পানে।
বুঝার চেষ্টা করছে তার অভিব্যক্তি।দূর থেকে কন্যার পানে চেয়ে আছে মাহবুবা বেগম।আমিরাত স্ত্রী'কে ডাকতে এসে থমকে গেলেন।কক্ষের দরজা থেকে মেয়ের মুখখানা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।দামি অলংকার আর শাড়িতে চকচক করছে।অপরুপ সুন্দর লাগছে তাদেরই কণ্যা কে।আমিরাত স্ত্রী'র কাঁধে হাত রাখলেন।মাহবুবা বেগম চমকে উঠলেন।পিছনে ঘুরে আমিরাত কে দেখে শান্ত হলো। চোখের জল মুছে বলল,
“নামাজ শেষ?উনারা এসেছে?
আমিরাত মাথা নাড়ালো।মাহবুবা বেগম ছুটলেন।
খাবারের ব্যবস্থা কেমন তা দেখতে।আমিরাত জমিদার সাইফুদ্দিন নওয়াজ কে নিয়ে এলেন,বসলেন সোফায়।ইমতিয়াজ ও উপস্থিত হয়েছে। অবশেষে কাঙ্ক্ষিত সময় এলো।
সমস্ত নিয়ম মেনে তিন কবুলে নিকাহ সম্পূর্ণ হলো। মেহেরনাজ কবুল বলতে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়েছিলো।আমিরাতের মুখ পানে চেয়ে চোখ বন্ধ করে বলে ফেললো, “ কবুল,কবুল,কবুল।
সে জড়িয়ে গেলো ইমতিয়াজ নওয়াজ খানের সঙ্গে।আজ থেকে সে তার বেগম।জমিদার পুত্রের নামে নিজেকে সপে দিলো নাকি বলি দিলো?ভেবে পেলো না মেহেরনাজ।এর মধ্যে খাবার পরিবেশন শুরু হলো। সকলে খাবারে ব্যস্ত। মেহেরনাজ বসেই রয়েছে।তখনই আমিরাত আর জমিদার সাইফুদ্দিন নওয়াজের আগমন ঘটে।তিনি মালিনী এবং সকলের উদ্দেশ্য বললেন,
“তোমরা সকলে বাহিরে যাও।মেহেরনাজের সাথে গোপন কথা আছে।সকলে আদেশ পাওয়া মাত্র বেরিয়ে গেলো।কক্ষে রয়ে গেলো তিনজন। আমিরাত নিশ্চুপ। সাইফুদ্দিন নওয়াজ মেহেরনাজের সামনে দাঁড়ালো।সেও তাকালো জমিদারের দিকে,দৃষ্টি লক্ষ্য করে বুঝতে পারলো কিছু কথা আছে যা বাতাসকেও শোনানো যাবে না।
বাতাসের কান আছে,বয়ে যেতে পারে সে কথা।
গভীর রজনী মেহেরনাজ জমিদার মহলে নতুন কক্ষের পালঙ্কে বসে আছে।হ্যাঁ এটা ইমতিয়াজ নওয়াজের কক্ষ।কক্ষ জুড়ে রয়েছে হ্যারিকেনের আলো,ফুলের সমাহার।মেহেরনাজ পালঙ্ক থেকে নামলো।পা বাড়ালো বিশাল কক্ষের বিশাল জানালার দিকে।সেখান থেকে দেখা যায় মহলের
সামনের পুরো দৃশ্য।হঠাৎ চোখে পড়লো কিছু।
ভ্রু কুঁচকে এলো মেহেরনাজের। হুট করে হারিয়ে গেলো।সে ভ্রম নাকি বিভ্রান্তি?
মেহেরনাজ জানালা হতে কক্ষের ঠিক মাঝখানে দাঁড়ালো।ভারি শাড়ি অলংকার তার ভালো লাগছে না।খুলে ফেললো সব অলংকার।হঠাৎ চোখ পড়লো অর্ধ খোলা আলমিরার দিকে।কিছু একটা ঝুুলে আছে।ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলো আলমিরায় হাত দেওয়ার আগেই কেউ তার হাতখানা ধরে ফেললো।মেহেরনাজ প্রথমে চমকে উঠলেও কে সেই ব্যক্তি তার বুঝতে পরলো।মেহেরনাজের পিঠ ঠেকেছে ইমতিয়াজের বক্ষ বরাবর।হাতের আঙ্গুল গুলো তার আঙ্গুলের ফাঁকে।ছাড়ানোর চেষ্টা করলো কিন্তু পারলো না।ইমতিয়াজ মেহেরনাজ কে সামনে ঘুরিয়ে হাত দুটো চেপে ধরলো উদরে গিয়ে ঠেকলো।
“অনুমতি ছাড়া আলমিরার হাত দিচ্ছিলে কেন?কি আছে ওখানে তোমার?পোশাক তো এখনো রাখোনি তবে?
মেহেরনাজ ধ্বাক্কা দিয়ে ছাড়িয়ে নিলো।বলল,
“কেন গোপন কিছু রয়েছে?যা আমি জানলে ক্ষতি হবে?অবশ্য গোপন তো সব কিছুই জানি।
ইমতিয়াজের অঁধরে ঠাড্ডার হাসি দেখা দিলো।সেই হাঁসিতে মুগ্ধ হয়ে যেতে পারে কত নারী।সে মেহেরনাজের কাছে এসে বলল,
“গোপন সবকিছু জেনেছো এবার আমায় জানো।
মেহেরনাজ যেন ছিঁকটে গেলো,বলল,
“যে হাতে অপবিত্র নারী স্পষ্ট করেন সে হাতে আমায় ছুঁতে আসবেন না।ঘৃণা লাগবে।
“অন্য নারীকে ছুঁয়েছি তুমি দেখেছো?
“অন্য নারীর গৃহে অর্ধ রাত্রি যাপন করেন নিশ্চয়ই সাধু পুরুষ সাঁজতে নয়।
মেহেরনাজের স্পষ্ট উত্তর।কোনো ভনিতা ছাড়া কথা বেশ উপভোগ করলো।ইমতিয়াজ ঠোঁট প্রসারিত করে অট্টহাসি হাসলো।
পালঙ্কে বসে জবাব দিলো,
“মসজিদে যারা যায় সবাই কি সাধু ব্যক্তি?
তাদের অন্তরে পাপ নেই?
পবিত্র স্থানে পাপ নিয়ে যেতে পারলে,অপবিত্র স্থানে পূর্ণ নিয়ে যাওয়া যায় না?”
মেহেরনাজ কড়া দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো।ভাবলো কিছুক্ষণ।সে মূলত এই কড়া কথা ইমতিয়াজের অভিব্যক্তি জানতেই বলেছে।
“কি হলো উত্তর পেলে না?নিশ্চুপ থাকাকে হার মানা ধরে নেবো?
“ধর্ম টেনে আনছেন?ধর্ম মানেন?মানলে তো এই জমিদারি থাকবে না,জমিদারি অনেক প্রথা ধর্মের বিরুদ্ধে।তবে কি জমিদারি ছেড়ে দিবেন নাকি প্রথা বর্জন করবেন?
ইমতিয়াজ বেশ আয়েশ করে পা জোড়া দোলাচ্ছে আর শুনছে।উত্তর দেওয়ার জন্য হাসি মুখখানা খুলতে যেতেই হাসিমাখা মুখটা মুহূর্তে নিঃশেষ হয়ে গেলো।কক্ষের বাহিরে কারো ছাঁয়ার দেখা মিললো। ইমতিয়াজ তড়িৎ গতিতে দরজা খুলে বাহির হয়ে গেলো।যাওয়ার আগে হাতে তুলে নিলো পালঙ্কের পাশে থাকা তলোয়ারটাও।মেহেরনাজ কেবল তাকিয়ে রইলো আর বুঝার চেষ্টা করলো কি হলো?
আর একটু আগে জবাব না দিতে পারা কথাটুকু কেন বললো?কিছু রহস্য তো আছে সবকিছুর মধ্যে।বিশাল জমিদার মহলের আনাচে কানাচের রহস্য সে খুঁজে বাহির করবে।
চলবে...........?