ফন্ট সাইজ:
থিম:
জমিদার মহল

৪র্থ পর্ব

লেখক: শ্যামলী রহমান

#জমিদার_মহল

#পর্বসংখ্যা—৪

#শ্যামলী_রহমান

প্রভাতের শুরুতেই মেহেরনাজের ঘুম ভাঙলো।চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে দেখলো ভোরের আলো সবে ফুৃটছে।বিশাল জানালার পর্দার ফাঁক গলে আলো ঢুকছে।হাল্কা বাতাসে পর্দা উড়ছে।মহল থেকে দূরে বিশাল আকারের বটগাছটা দেখা যাচ্ছে,সেখানে লাল একটা কাপড় উড়ছে।বেশ ভাবুক লাগলো।লাল কাপড় বাঁধা কেন?লাল কাপড় কোথা থেকে আসলো?মেহেরনাজ উঠে বসলো।পালঙ্কের উপর দুই পা প্রসারিত করে বসে রইলো।

পুরো কক্ষে নজর বুলালো কেউ নেই।ইমতিয়াজ কিংবা তার তলোয়ারটাও নেই।তবে কি আজও সে বাঈজী গৃহে?সে নিজের ভাগ্য নিয়ে উপহাস করলো,বলল,

নিজ হাস্তে নিজ ভাগ্য নষ্ট করলাম।

কয়লার মধ্যে আসলেই কি আছে হীরে?নাকি শুধুই নিকষ কালো কয়লাই রয়েছে?”

কক্ষের বাহির থেকে দরজায় ঠকঠক শব্দ হলো।মেহেরনাজ পালঙ্ক থেকে নেমে দরজা খুলে দিলো।চোখের সামনে উদয় হলো ইমতিয়াজের মুখখানা।

বরাবরের ন্যায় ঠোঁটের কোনো তীর্যক হাঁসি লেগে আছে।মেহেরনাজের রাগ লাগলো,ঘৃণা হলো কিছুটা।ইমতিয়াজ বলল,

“আমাকে খুঁজছিলে?

“ফিরলেন কেন?সেখানে থাকতেন। নিকাহ করার ও কোনে দরকার ছিলো না বাঈজী তো আছে। তাদের মহলে এনে থাকতেন।আমাকে কি প্রয়োজন?আপনার লজ্জা করে না?ছি আপনার আব্বাজান কেমন আর আপনি কেমন?ভাবেন না এসব?অবশ্য লজ্জার আস্তরণ থাকলে তো মাতাল হয়ে আনন্দ ফূর্তি করতে যেতেন না।

ইমতিয়াজ মেহেরনাজের কথা শুনেও কিছু বলে না।দরজা পেরিয়ে পালঙ্কে গিয়ে বসে।গাঁয়ের শালটা ছুঁড়ে মারে কক্ষের একপাশে।এবার মেহেরনাজের উদ্দেশ্য বলল,

“এক গ্লাস পানি দেও তো।

মেহেরনাজ শুনলো না।পানি না পাওয়াতে ইমতিয়াজ বন্ধ চোখ জোড়া খুললো।ভ্রু কুঁচকে তাকালো।মেহেরনাজ ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে।

সে উঠে দাঁড়ালো কক্ষের দরজা বন্ধ করলো। মেহেরনাজের দিকে চেয়ে কুটিল হাসলো।হুট করে তাকে পাঁজা কোলে নিলো।মেহেরনাজ হকচকিয়ে গেলো,হুট করে নেওয়াতে ভয় পেয়ে ইমতিয়াজের গলা জড়িয়ে ধরলো।মাথা ঠেকলো শক্ত বক্ষে।

যখন খেয়াল করলো সে গলা জড়িয়ে ধরেছে তখনাৎ ছেড়ে দিলো।বলল,

“ছেড়ে দিন।”

ইমতিয়াজ ধপ করে ছেড়ে দিলো।মেহেরনাজ পড়লো পালঙ্কের উপর।কোমরে একটু ব্যথা পেলেও প্রকাশ করলো না। চোখ গুলো তার জ্বলে উঠলো।জ্বলজ্বলে চোখ দুটো ইমতিয়াজের দিকেই। সে মুঁচকি হাসছে। এবার মেহেরনাজের পাশ বসলো।একদম কাছ ঘেঁষে গাঁয়ে গাঁ লাগিয়ে।

মেহেরনাজ সরে যেতে চাইলেও সরে যেতে দিলো না। বাহু চেপে নিজের দিকে ঘোরালো,উদরে হাত রাঁখলো।কাঁধে থুঁতনি রেখে বলল,

“ সারারাত কক্ষেই ছিলাম।তাকিয়ে ছিলাম এক ঘুমন্ত নারীর পানে।অপরুপ সৌন্দর্যের অধিকারী সে নারীই,আমাকে বলছে আমি নাকি ছিলাম অন্য গৃহে।দেখো তবে নিজের দিকে। চুলের বন্ধনী আর হাতের বালা কোথাই?

মেহেরনাজ চুলে হাত দিলো,হাতেও দেখলো নেই।

ইমতিয়াজ হাসলো,বলল,

“আমি খুলে দিয়েছি।হাতে মাথায় রেখে ঘুমানোর অভ্যাস আছে ব্যথা পাচ্ছিলে,অসুবিধে হচ্ছিলো।

এবার থেকে আর অসুবিধা হবে না।

আজ থেকে স্বামীর বক্ষে মাথা রেখে ঘুমাবে।ঠিক আছে?

মেহেরনাজের লজ্জা লাগলো সাথে কিছুটা ঘৃনাও।

আজ না যাক কোনোদিন তো যায় সে গৃহে।

তার ভাবনার মাঝেই কাঁধে ঠোঁট ছোঁয়ালো ইমতিয়াজ।মেহেরজান কেঁপে উঠলো,চোখ বন্ধ করলো আবেসে।প্রথম কোনো পুরুষের স্পর্শ সে পেলো।কিছু মনে হতেই ছিটকে সরে গেলো। ইমতিয়াজ কিছু বলার আগেই দরজার বাহির থেকে মালিনীর কন্ঠ ভেসে আসলো।মেহেরনাজ দরজা খুলে দিলো।কক্ষে মালিনী উপস্থিত হলো। মেহেরনাজ দম ফেললো।বাঁচলো সে।আর একটু কি হচ্ছিল?

মালিনী বলল,

“শাড়ি বদলিয়ে রসুইঘরে চলো।আম্মাজান তোমাকে ডাকছে।নতুন বউ আজ রান্না করতে হবে।মেহেরনাজ ভ্রু কুঁচকে তাকালো মালিনীর দিকে।মালিনী হয়তো বুঝতে পারলো তার তাকানোর অর্থ।তাই জিজ্ঞেস করার আগেই উত্তর দিলো।

“আম্মাজান বলেছেন ভাবি বেগম আর তুমি ডাকতে।তুমি আমার সম্পর্কে এখন বড় ভাইজানর

স্ত্রী সেই মর্যাদা দিতে হবে আম্মিজানের আদেশ।

মেহেরনাজ প্রতিত্তোর করলো না।পিছিনে ইমতিয়াজের দিকে তাকালো।সে তারই পানে চেয়ে আছে।মালিনী তার হাতে থাকা শাড়িখানা মেহেরনাজের হাতে দিলো।

ভাইজান আছে তাই মালিনী চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলো।পিছন থেকে ইমতিয়াজ ডেকে বলল,

“তুই থাক আমি যাচ্ছি।

মালিনী আবার কক্ষে মধ্যে আসলো।ইমতিয়াজ বেরিয়ে গেলো।মেহেরনাজ নিঃশ্বাস ছাঁড়লো।দরজা বন্ধ করে এসে বসলো। মালিনী এবার প্রাণ খুলে সখীর সাথে কথা বলতে শুরু করলো।তার তো বকবকানির শেষ নেই। কথায় কথায় সে বলে উঠলো,

“তুমি নাকি পায়ে ব্যথা পেয়েছিলে?ক্ষত হয়েছে?

মেহেরনাজ চমকালো।দৃষ্টি আশ্চর্যের ন্যায় মালিনীর পানে।সে তো অবুঝের ন্যায় চমকানো চেহারার দিকে চেয়ে আছে।জিজ্ঞেস করলো,

“চমকালে কেন?”

“তোকে কে বলেছে আমার পায়ে ক্ষত হয়েছে?

“কে আবার?ভাইজান বললো এবং ঔষুধ লাগানোর জন্য আমাকে বলে আনলো।

মালিনীর কথা শুনে সে স্তব্ধ হলো। সঙ্গে সঙ্গে বাম পায়ের উপর থেকে খানিকটা শাড়ি উঠালো। প্রায় হাঁটুর কাছে ছোট একটি ক্ষত। কিন্তু ইমতিয়াজ জানলো কিভাবে? মেহেরনাজ একটু ভয় পেলো।ক্ষত তো.. বলতে গিয়েও আঁটকে গেলো।তার মানে সে রাতে এই কক্ষে ছিলো।আমি ঘুমিয়ে যাওয়ার পর এসব করেছে।মালিনী আবারো জানতে চাইলো,

“কিভাবে ক্ষত হয়েছে?

“ ও ওই কালকে পড়ে গেছিলাম ধারালো মতো কিছু একটার উপরে তাই।আজকে মনে হয় মহলে আসার সময় এক বাচ্চা দৌঁড়ে এসে ঝাপটে ধরলো তখনই আঘাতের উপরের পাতলা আস্তরণটা উঠে গিয়েছিলো।

“ওহ আচ্ছা।আমি ভাবলাম অন্য কিছু।

মেহেরনাজ ভ্রু কুঁচকালো।কপালে সুক্ষ ভাজঁ ফেলে জিজ্ঞেস করলো,

“ অন্য কিছু কি?”

“মধুচন্দ্রিমা বাদ দিয়ে ভাইজানের সাথে যুদ্ধ করছিলে নাকি।

কথাটুকু বলেই মালিনী দাঁত বাহির করে হেঁসে ফেললো।মেহেরনাজের কপালের ভাঁজ সিথিল হলো। হাতের শাড়িখানা রাখলো।মালিনী নিয়ে চললো পুষ্কুনিতে গোসল করতে।

রসুইঘরে রান্না বসিয়েছে মেহেরনাজ। মোটামুটি সব রান্না পারে বলে ঝামেলা পোহাতে হলো না।

পোলাও মাংস আরো দু পদ রান্না হয়েছে।এখন বাকি শুধু মিষ্টি কিছু বানানো।তারপাশে রয়েছেন সালেহা ও শারমিন।রেবেকা দাঁড়িয়ে আছে দেখছে আর মুখ বেকাচ্ছে।রসুইঘরের সাহায্যকরী নতুন একজন এসেছে নাম সাবিনা। সে প্রচুর কথা বলে।তাই তো মেহেরনাজ কে জিজ্ঞেস করে বসলো,

“নতুন বউ তুমি কি সুন্দর।নতুন পোশাকের মতো তকতকে তোমার চেহারা। চুলের কি বাহার,শাড়িতে রূপবতী রাজকন্যা লাগছে।জমিদার পুত্র তোমার রুপ দেখে নিকাহ করেছে?

মেহেরনাজের লাকড়ি ধরা হাতখানা থেমে গেলো।

তার মনে প্রশ্ন জাগলো। সালেহা চোখ গরম করে তাকালো।তাহেরা আর ফাহিমা ফিসফিস করে চুপ করতে বললো।সাবিনা চুপ হয়ে গেলো।হামিদা পাশ থেকে বলে উঠলো,

“রুপবতীর চেয়েও রুপবতী আছে তাই বা....

বলতে গিয়েও থেমে গেলো।সালেহা আছে সে কি করে ভুলে বসলো?সালেহা তাকাতেই ইশারায় বলল সে বলতে চায়নি।শারমিন নিশ্চুপ বসে ছিলো। খাবারগুলো বাড়ছে একজন।মিষ্টি বানানো শেষ হলো।একটু বাদেই খাবার জায়গায় উপস্থিত হলো সাইফুদ্দিন নওয়াজ,ওয়াসিফ,জাভেদ ও জমশের।

আসেনি কেবল ইমতিয়াজ। সকলে মাদুর পাতানো আসনে বসে পড়লো।সালেহা মালিনী কে পাঠালো ইমতিয়াজ কে ডাকতে।

“এই তো নাম নিতে না নিতেই হাজির হয়েছে।

মালিনীর কথায় সকলে তাকালো।ইমতিয়াজ আসছে এদিকেই।এসে বসলো ওয়াসিফের পাশে।

সালেহা ইশারা করতেই মেহেরনাজ খাবার পরিবেশন শুরু করলো।শারমিন ও তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে গেলো। সবাই কে খাবার দেওয়া শেষে ইমতিয়াজ কে দিতে গিয়ে বিপত্তি ঘটলো।

ভাঁজি বাসনে দিতে হাত এগিয়ে নিতেই হাতখানা ধরলো। সেকেন্ডে ছেড়ে দিলো যেন কেউ না দেখে।

মেহেরনাজ সামনে থাকায় সবাই না দেখতে পেলেও একজনের নজর এড়ালো না।

মেহেরনাজ সেখানে থেকে সরে আসলো।মনে মনে কয়টা কথা শুনিয়ে দিলো।হঠাৎ মনে হলো দৃষ্টি কারো দৃষ্টি তার দিকে এক ধ্যাঁনে চেয়ে আছে। সামনে চারজনেই তো মাথা নিচু করে খাচ্ছে।

“মাংসটা আরেকটু দিন তো।

জাভেদের কথায় মেহেরনাজ ভাবনা থেকে বেরেলো।অচেনা পুরুষদের সামনে তার অসস্থি লাগছে কিছুটা তবুও এগিয়ে গিয়ে মাংস বাটিতে দিলো।ওয়াসিফ চাইলো পোলাও।

সালেহা দূর থেকে তার কান্ড দেখে বলল,

“ইমতিয়াজ কি নেবে শোনো।

মেহেরনাজ এবার তাকালো তারই স্বামীর পানে। ধীরে বলল,

“কি নেবেন?”

“দাও মিষ্টি।

মেহেরনাজ মিষ্টির বাটি এনে রাখলো তার সামনে।

বাটি রেখে সরে আসতে নিবে ঠিক তখনই ফিসফিস কন্ঠে শুনতে পেলো,

“ আমি নিতে চাই তোমাকেই বেগম জান।তুমি কি আমার হবে?

মেহেরনাজ হতবিহ্বল হয়ে আশে পাশে তাকালো।

কথাটুকু তার কর্ণগোচর হতেই অদ্ভুত এক অনুভূতি হলো।যে অনুভূতির নাম অজানা।ইমতিয়াজ তার বেগমের অস্থিরতা দেখে মুঁচকি হাঁসলো।এতো মানুষের মধ্যেও কেউ তাদের উপর লক্ষ্য রাখলো।দুজনের এহন কান্ডে জ্বলে উঠলো বিভীষিকার ন্যায়।মেহেরনাজ উঠে আসলো আর এক মূহুর্ত সেখানে থাকলো না।এক প্রকার দৌঁড়ে চলে গেলো।কাউকে বলে না যাওয়াতে সালেহা অসন্তোষ হলো।মনে মনে রাগ পুষলো ঘি ঢাললো হামিদা।এতে আরো আগ্নেয়গিরির সৃষ্টি হলো সালেহার মনে। ইমতিয়াজ বেগমের যাওয়ার পানে চেয়ে ছিলো।তার গমনের দিকে চেয়ে থাকলো।তাকে তার দেখা যাচ্ছে না।হয়তো কক্ষে পৌঁছে গেছে।

তাকে দেখা না গেলেও সে পথের দিকে চেয়ে আওড়ালো,

“তেজস্ক্রিয় বেগম জান।”

চলবে.................?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪র্থ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন