#জমিদার_মহল
#পর্বসংখ্যা–২৪
#শ্যামলী_রহমান
জমিদার মহলের আকাশে নেমে এলো এক অদৃশ্য অন্ধকারের পর্দা।প্রভাতের আলো জন্ম নিলেও মহলের প্রতিটি ইট পাথর যেন আলোকে প্রত্যাখ্যান করে গভীর শোকের রঙে রঙিন হয়ে আছে।একসময় যেখানে রাজকীয় কোলাহলে মুখর থাকত প্রাসাদের চত্বর,আজ সেখানে নেমে এসেছে মৃত্যু–পরবর্তী ভয়াল সুনসান। মশালের আলো পর্যন্ত যেন উজ্জ্বল হয়ে উঠতে ভয় পাচ্ছে।জ্বলে উঠলেও কাঁপতে কাঁপতে নিভে যেতে চাইছে বারবার।উঠোনের মাটিতে মানুষের পায়ের ধুলা শুকিয়ে ধূসর স্তর তৈরি করেছে ঠিক তেমনি মানুষের চোখের জলও শুকিয়ে মুখে লেগে আছে, যাদের আর কান্নার শক্তিও নেই।মহলের প্রতিটি বারান্দা শোকে আচ্ছন্ন।দেয়ালের কোণে কোণে জমে থাকা অন্ধকার যেন বাড়িয়ে দিয়েছে মৃত্যুর গন্ধ।রসাই ঘরে নেই দৈনন্দিন ব্যস্ততা,নেই হাঁড়ি–পাতিলের শব্দ,নেই আগুনের উষ্ণতা।যেন উনুন ও দুঃখে নিস্তব্ধ হয়ে আছে। দাস–দাসীদের তৎপরতা থেমে গেছে,তাদের চোখের কোণে শুধু উদ্বেগ আর শূন্যতা।
রাত নামার পরে মহল জুড়ে আলো জ্বলে উঠেছে, কিন্তু মানুষের মনে কোনো আলো নেই।নেই আশার ক্ষুদ্র স্ফুলিঙ্গও।কেউ মনে মনে অনুভব করছে।এই শোকের মাঝেই কেউ যেন মহলের দিকে তীক্ষ্ণ নজর রেখে দাঁড়িয়ে আছে।অদৃশ্যভাবে হাসছে,আর অপেক্ষা করছে পরবর্তী অঘটনের।
মনে হচ্ছে জমিদার মহল আজ শুধু প্রিয়জন হারানোর শোকে ডুবেনি, ডুবে গেছে এক অদৃশ্য আতঙ্কে,এক ভয়ঙ্কর,আসন্ন বিপদের পূর্বাভাসে।
দু'দিন কেঁটে গেছে।উচ্ছাসিত মহল নিস্তব্ধ হয়ে আছে।ইমতিয়াজ একদম ভেঙে পড়েছে।মেহেরনাজ নিজেকে শক্ত রাখার বৃথা চেষ্টা করছে।
ইমতিয়াজ সামলাতে গিয়ে ভাবছে শক্ত হতে হবে।দরকার পড়লে নিজে একা রহস্য ভেদ করবে।
এর মধ্যে ঘটেছে আরেক অঘটন।কাল একজন সাধু বাবা জমিদার মহলে হাজির হয়।মহলে প্রবেশ করে আতঙ্কিত হয়ে বলতে শুরু করে,
“জমিদার মহল মৃত্যুপুরীতে পরিনত হবে।সাবধানে থেকো।জমিদার আসনে বসবে যে তাকে আগলে রেখো।
সেই সাধুর কথা ইমতিয়াজ বিশ্বাস না করলেও সালেহা বেগম মনপ্রাণে বিশ্বাস করলেন।ভয়ে আঁতকে উঠলেন।পুত্র কে আগলে রাখলে দিনরাত আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে শুরু করলো।মহলের বাহিরে কড়া প্রহরী বসাতে ওয়াসিফ কে নির্দেশ দিলো।পুত্রের নিরাপত্তায় তাকে চোখের সামনে রাখতে বললো।
ইমতিয়াজ দুদিন থেকে খাচ্ছে না,কক্ষ থেকে বেরোচ্ছে না।মেহেরনাজ কি করবে বুঝতে পারছে না। তার ভেতরেও হাহাকার করছে।আব্বাজান কে হারানোর ব্যথা তার মধ্যেও আছে।কিন্তু ভেতরের সত্তা বলছে,
“মেহেরনাজ ভেঙে পড়লে চলবে না।আব্বাজানের খু*নি,মহলের বিনাস চায় কে তাকে তোমাকেই বাহির করতে হবে।নিজেকে শক্ত রেখে লড়তে হবে।
“বুবু খাবারটুকু খেয়ে নেও।না খেয়ে থাকলে আরো অসুস্থ হয়ে পড়বে।
সালেহা মুখ ফিরিয়ে নিলো।হামিদা পাশে জাভেদের দিকে তাকালো।চোখ মুখ দেখে বুঝা যাচ্ছে তার খাওয়ানোর কোনো ইচ্ছে নেই।কিন্তু জাভেদ চোখের ইশারা করতেই দাঁত চেপে আরেকবার বললো।
“এরকম করো না।তুমি ভেঙে পড়লে ইমতিয়াজ কে আগলে রাখবে কি করে?
“আমি খাবো না হামিদা।তুই থালা নিয়ে যা।মালিনী কে জোর করে হলেও একটু খাওয়া।
হামিদা উঠে পড়লো।বিরক্তির শ্বাস ফেলে চলে গেলো।দরজার কাছো স্বামীর সামনে এসে থামলো।ফিসফিস করে বলল,
“এসব নাটক ভালো লাগছে না।না খেলে মুখে জোর করে দিবো?
“ধৈর্য ধরো হামিদা।নুন খাচ্ছো তার প্রতিদান দিবে না?
হামিদা মুখ বেঁকিয়ে চলে গেলো।সামনে তনিমা পড়লে তার হাতে খাবারের থালা দিয়ে চলে গেলো।
তনিমা মাত্র ওয়াসিফের সঙ্গে কথা বলে আসলো।মহলের সকল কে কিভাবে সামলাবে,কি করবে এইসব পরামর্শ করলো।মালিনীর কক্ষে গিয়ে দেখলো সে শুয়ে আছে।ডেকে তুলে খাবার মুখের সামনে ধরলো।খেতে না চাইলেও জোর করে খাওয়ালো।সকালে মেহেরনাজ খাইয়েছিলো।
“তোর মালি আজ খবর নিতে এসেছিলো।
মালিনী নিরবতা ভাঙলে।বলল,
“ক কে?
“মুহিব এসেছিলেন।
মালুনীর চাহনী দেখে হাঁসলো।
“আমাকে না বললেও আমি জানি।
“কে বলেছে?
“ভাবি বেগম।
মালিনী আর কিছু বললো না। তনিমা খাওয়ানো শেষ করে থানা নিয়ে উঠলো।যাওয়ার আগে বলে গেলো।
“মালির বসত আজ মহলে হয়েছে।কিছুজন রান্ধনী মহলে আনা হয়েছে তাদের দায়িত্ব তার উপর পড়েছে।কাল ভাইজানের জমিদার হিসেবে অভিষেক হবে।চাইলে তার সঙ্গে কথা বলতে পারিস।আসার সময় দেখলাম অন্দরমহলের দিকে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে।
মেহেরনাজ সবে ওই মহল হতে ফিরছে।মাহবুবা বেগম কে খাইয়ে বেরিয়ে আসলো।শান্তনা দিলো,কিন্তু নিজের মন ও মানলো না।রাত্রি হওয়াতে মহলের সিংহদ্বার হতে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে বাঈজী গৃহের দিকে তাকালো।আলো জ্বলছে মিটি।কেউ একজন এদিকে তাকিয়ে আছে।মেহেরনাজের কিছুটা ঘৃণা লাগলো।এরা এমন কেন?নারীর সম্মান বুঝি এতই ঠুনকো?
নিজ সত্তায় জাগলো।প্রতিত্তোর পেলো।
“দোষ কি শুধু নারীর?এই সমাজ কি কেবল নারীর কলঙ্ক,দোষ সবকিছুর ভার অত্যাবশকীয় করে রেখেছে?
পুরুষ সাধু সন্ন্যাসী?তাদের স্পর্শ ছাড়া নারী কলঙ্কিত হয় কি করে?
মেহেরনাজের রাগের মাথায় এমন নিচ ভাবনা নিজেকে ঘৃণা লাগলো।
‘নারী পুরুষ উভয়ের দোষ কিংবা পাপ হলেও।কলঙ্কিত হয় কেবল নারী।পুরুষ হয় সত্যবাদী।
পলক ফেলে পা বাড়ালো।আবার থেমে গেলো।পিছনে ঘুরে তাকালো কিন্তু কেউ নেই। মনে হলো কেউ ছিলো।আবার হাঁটতে গিয়েও হাঁটলো না।অন্ধকারে গাঁছের আড়ালে লুকায়িত কারো কাপড়ের অংশ দেখতে পেলো।সে এগিয়ে গেলো।
“কে ওখানে?কে?বাহির হন।
লোকটি ধীরে ধীরে বাহির হলো।মেহেরনাজ লোকটিকে দেখে চমকে উঠলো।এ কেমন অবস্থা হয়েছে?লোকটি ইশারায় কিছু বলতেই সেও আড়াল হলো।অন্ধকারে আলাপ চললো।কেউ তা দেখতে পেলো না।জানতে পারলো না কে ছিলো।
“মেহেরনাজ কি ভাবছো?
ইমতিয়াজের ডাকে মেহেরনাজ ঘোর থেকে ফিরে আসলো।
“হ হু।কি বলছেন?
“কি হয়েছে তোমার?এমন আনমনে লাগছে কেন?
তখন থেকে দেখছি নিশ্চুপ হয়ে কিছু ভাবছো।
“আপনার কাল দায়িত্ব নেওয়ার দিন।আপনি প্রস্তুত হন।কক্ষে নিজের দূর্বলতা প্রকাশ করলেও বাহিরে নিজেকে শক্ত রাখবেন।রাজ্যের দায়িত্ব নিতে হবে।প্রজাদের সুখ দুঃখ শুনবে হবে।আব্বাজানের মতো আপনার নামেও জয় জয়কার শুনতে চাই।
ইমতিয়াজ হুট করে মেহেরনাজ কে জড়িয়ে ধরলো।এতো শক্ত বাঁধনে মেহেরনাজের দম বন্ধের মতো অনুভব হলেও চুপ করে থাকলো।অনুভব করলো অস্তিত্বে মিশে থাকা মানুষটার কষ্ট।চোখ দিয়ে জল ঝরছে তা না দেখলেও টের পাচ্ছে।
পুরুষ মানুষ ও কাঁদে তা অনেকের আড়ালে থাকে।
মেহেরনাজ ইমতিয়াজ কে সামনে দাঁড় করালো।হাতটা শক্ত ধরে ভরসা দিলো।
“আমি আছি সব সময় আপনার পাশে।যেকোনো পরিস্থিতিতে।আপনিও থাইকেন আমার শেষ নিশ্বাস ত্যাগের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত।”
থাকবেন তো?
ইমতিয়াজ মেহেরনাজের হাতটা দুহাতে আগলে নিলো।মাথা ঝাকালো।বলল,
“শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত সঙ্গে থাকবো।
মেহেরনাজ বিষাদ মুখেও হাঁসার চেষ্টা করলো।সামনের মানুষটাকে বড় দায়িত্ব নিতে হবে।এই সময় ভেঙে পড়া নিজেকে উপস্থাপন করলে সেও আরো ভেঙে পড়বে।ইমতিয়াজ তার দিকে চেয়ে জানতে চাইলো,
“এতো শক্ত কিভাবে আছো বলোতো?এককন নারীও এতো কঠোর হতে পারে?
“মানুষের সামনে নিজেকে যত ভেঙে পড়া প্রকাশ করবেন,মানুষ তত দূর্বল ভাববে।দুঃখ কষ্ট কি মানুষ কে দেখানোর জিনিস?আমি কতটা কষ্ট পাচ্ছি তা কেবল আমি জানি।
“আমিও জানি।কালকের দিনটা যাক মেহেরনাজ তার পর আমরা আসল কাজে নামবো।আব্বাজানের মৃত্যু কি সত্যি স্বাভাবিক ছিলো?
তা ও যদি হয় তবে তোমার আব্বাজানে খু*নি কে বাহির করবো।মহল এবং আমাদের ক্ষতি কে চায় তা জেনে ছাড়বো।
মেহেরনাজ সহমত পোষণ করলো।রাত হয়েছে তাই দুজনে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিলো।পালঙ্কে শুতেই ইমতিয়াজ ঘুমিয়ে পড়লো।কিন্তু মেহেরনাজের ঘুম আসছে না।কিছু কথা বার বার মনে পড়ছে।ইমতিয়াজ কে বলতে না পেরে হাসফাস লাগছে।কিন্তু এখন তাকে বলাও যাবে না।কালকের দিনটা পেরিয়ে গেলেই বলবো।এখন বললে চিন্তা আরো বাড়বে।ভাবতে ভাবতে এক পলক ঘুমন্ত ইমতিয়াজের দিকে তাকালো।না ঘুম আর এলো না।অনেকটা সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর মেহেরনাজ উঠে পড়লো।তাকিয়ে দেখলো হ্যারিকেনের আলো ফুরিয়ে গেছে।একেবারে অন্ধকার কক্ষ মেহেরনাজের ভালো লাগে না।
তাই পা বাড়ালো বাহিরে।কক্ষের দরজা খুলে সোজা গেলো সবার শেষের এক কক্ষে।যেখানে কেরোসিন রাখা আছে।রসুই ঘর পেরিয়ে যেতে হয়।
হ্যারিকেনে তেল ভরিয়ে আলো না জ্বালিয়ে মেহেরনাজ আসছিলো।হঠাৎ পিছনে কারো পায়ের শব্দে পা থেমে যায়।পিছনে তাকিয়ে কাউকে দেখতে না পেলেও আওয়াজ পেতে থাকলো।হাতে হ্যারিকেন নিয়ে পিছনে ঘুরে এগিয়ে গেলো।অন্দরমহলের পরিত্যক্ত কক্ষ গুলোর দিকে যেতেই কাউকে দেখতে পেলো।এই গরমে গায়ে শাল জড়ানো।মুখ দেখা যাচ্ছে না পিছন দিকটা মেহেরনাজের দিকে।সামনে দাঁড়িয়ে কি যেন দেখছে।মেহেরনাজ প্রস্তুতি নিলো লোকটিকে ধরবে।সন্দেহ জনক লাগছে।তাই তো হ্যারিকেন টা নিঃশব্দে পাশে রাখলো।লোকটির কাছে দৌঁড়ে গেলো।মুহূর্তে চিৎকারের আওয়াজে মুখরিত হলো মহল।মহলের সকলে সেই চিৎকারে জেগে উঠলো।দৌঁড়ে আসলো অনেকে।এসেই যা দেখলো তাতে সকলে স্তব্ধ হয়ে গেলো।
চলবে.....................?