ফন্ট সাইজ:
থিম:
জমিদার মহল

৩১তম পর্ব

লেখক: শ্যামলী রহমান

#জমিদার_মহল

#পর্বসংখ্যা–৩১-৩২

#শ্যামলী_রহমান

ইমতিয়াজ সালেহা বেগম এর কক্ষ থেকে বেরিয়ে সোজা মালিনীর কক্ষে গিয়েছে।মেহেরনাজ ও পিছু নিয়েছে।না জানি কি হয় এই ভয়ে বুক ধুকপুক করছে।সামনে যেতেই দেখলো ইমতিয়াজ ফিরে আসছে।মুখশ্রী স্বাভাবিক আছে।তবে কি মালিনী কিছু বলেনি?নাকি ইমতিয়াজ কে দেখে ভয় পেয়ে চুপ করে আছে।মেহেরনাজ এগিয়ে যেতেই ইমতিয়াজ আগে প্রশ্ন করলো,

“মালিনী কোথাই?

“কেন কক্ষে নেই?

“না।দেখতে পেলাম না।তনিমার কক্ষে দেখো আছে কিনা।

মেহেরনাজ সবে পা বাড়িয়েছে তনিমার কক্ষের দিকে।তখন দেখলো তারা আসছে।তনিমা আর ওয়াসিফ একই সঙ্গে এদিকে আসছে।তনিমার চোখে মুখে ভয়।ওয়াসিফ বরাবরের ন্যায় স্বাভাবিক দাম্ভিকতায় ন্যায়।খুব একটা হাঁসে না কিনা।দুজনে কাছাকাছি আসতে মেহেরনাজ শুধালো,

“মালিনী কোথাই জানো?

“কক্ষেই তো থাকার কথা।

“তোমার ভাইজান ভাবলো তোমার সঙ্গে আছে এজন্য মাত্র তোমায় কাছেই যাচ্ছিলাম।

তনিমার উত্তরের আগেই ওয়াসিফ বলল,

“বাগানের দিকে দেখো।তার আবার বাগান ভীষণ পছন্দের।হতে পারে ফুলের সঙ্গে গল্প করছে।নয়তো মালির করা ফুলের যত্ন দেখছে।আবার ছাঁদেও দেখতে পারো।

ওয়াসিফের কথা শুনে ইমতিয়াজ সেদিকে গেলো।মেহেরনাজ ও পিছুপিছু ছুটলো। তবে তার কথার সঠিকতা কেবল তনিমাই বুঝতে পারলো।একটু আগেই তনিমা মালিনী আর মালির কথা বলে দিয়েছে।এবং তাদের দুজনের নিকাহ সম্পর্কে ওয়াসিফ আগে থেকে অবগত ছিলো।ইমতিয়াজ তার সঙ্গে পরামর্শ করেই প্রকাশ করেছে।তনিমা বুঝতে পারছে না সে কি বলে ভুল করলো?ওয়াসিফের প্রতিক্রিয়া বুঝা যাচ্ছে না।মালিনীর ভালোবাসার কথা শুনে কেবল স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলো।তারপরই এখানে ছুটে আসলো।তনিমা এবার ধীর কন্ঠে শুধালো,

“আপনি ভাইজান কে বুঝাবেন নাকি সঙ্গ দিবেন?তিনি নিশ্চয়ই মানতে চাইবেন না।

“সঙ্গ দেওয়া নিশ্চয়ই ভুল নয়।ভাইজান সে আমার।আর জমিদার বংশের মর্যাদা এতো ঠুনতো নয় তা ভুলে গেলে কি করে?

“ভালোবাসা ভুল বলছেন তাহলে?

“ভালোবাসা ভুল নয় তনিমা,কিন্তু বংশ মর্যাদা বলেও কিছু একটা আছে।জমিদার কন্যার প্রণয় সামান্য এক মালির সঙ্গে?এটা কেমন শুনাচ্ছে?প্রজারা হাসবে,জমিদার শাহবাজ খান কে কি বলবে?

“ওই সামান্য মালিই কিন্তু আপনার আমাদের প্রাণ বাঁচিয়েছিলো।

ওয়াসিফ তনিমার চোখের দিকে তাকালো।তার প্রতিত্তোরে আর কিছু বলতে পারলো না।বাগানের দিকে উদিত হলো।কিছুটা সামনে গিয়ে আবারো থামলো,বলল,

“তর্কে শুধু কথা বাড়ে,

ভালোবাসা প্রমাণ করতে লাগে।

মালিনী দুপুরের পর পর মহল থেকে বেরিয়ে এসেছে।কয়েকজন প্রহরী কোথায় যাচ্ছে জিজ্ঞেস করলেও বলেছে মাহবুবা বেগমের মহলে যাচ্ছেন।সঙ্গে এক দাসিও আছে।তাকেও জিজ্ঞেস করলেও একই উত্তর দেয়।প্রহরী আর আঁটকায়নি দুজনে চলে গেলো।মালিনীর উদ্দেশ্য মালির বাড়ি যাবে।শুনেছিলো রসুলপুর পেরিয়ে ধর্মপুরে তাদের বসতি।তাই তো বাড়ি চিনতে সেখানে বসবাসরত এক দাসিকে সঙ্গে এনেছে।মালিনীর গায়ে শাল জড়ানো,মুখ পর্যন্ত শালের অংশ দিয়ে আবৃত জরে রেখেছে যাতে মানুষ চিনতে না পারে।দাসি এবার থেমে গেলো।মালিনী পিছনে তাকালো, শুধালো,

“থামলে কেন?

“আমার ভয় করছে।যদি জমিদার ভাইজান জানতে পারে?তোমায় নিয়ে এসেছি শুনলে আমাকে আর মহলে কাজে রাখবে না।তুমি জমিদার কন্যা হয়ে কেন মুবিনের মতো একজন কে ভালোবাসলে?তোমার ভাইজান কেন যে কেউ হলেও এটা মেনে নিবে না।আপনি কেন বুঝেন না?

মালিনী হাঁসলো।আনমনে বলল,

“মনের উপর কি কারো হাত থাকে?ভালোবাসা কি কখনো বলে কয়ে আসে?ভালোবাসা এমন একটি জিনিস যা মনের অজান্তেই হৃদয়ে বাসা বাঁধে।

‘মরণের ভয় পর্যন্ত ছুঁতে পারে না।সেখানে এতটুকুর ভয়ে ছেড়ে দিবো?আমিই সবই বুঝি,বুঝে না কেবল আমার এই হৃদয়,যেখানে রয়েছে মালির জন্য ভালোবাসার সর্বর।সর্বরের একমাত্র ফুল ও আমি।তার যত্ন করার জন্য আমার মালি'কেই চাই।বাঁধা যত আসুক তা অতিক্রম করতে হবেই।

দাসি আর কোনো উত্তর দিতে পারলো না। কেবল আফসোস করলো এই ভেবে,‘ জমিদার কন্যার সঙ্গে সত্যিই কি মিলন হবে?যদি না হয়?তবে দুটো হৃদয় ভাঙবে।জমিদার কন্যা সে তার সাত খু*ন মাফ হবে।হয়তো পাবে অন্য কোনো জমিদার পুত্রের ভালোবাসা।কিন্তু মালি?সে তো রবে মালিনীট দুঃখে আজীবন দুঃখী।একই গ্রামের হওয়াতে মুবিন কে সে ভালোই চিনে।তার মতো মানুষ গ্রামে কমই আছে।সকলের বিপদে একমাত্র তাকেই পাশে পাওয়া যায়।হয়তো অর্থ সম্পদ নেই,কিন্তু মহৎ প্রাণ বটে।

“কি হলো এসো?

দাসির ভাবনা ছুটলো।চললো মালিনীর সঙ্গে,সঙ্গে।গ্রামের কতজনে জিজ্ঞেস করছে কে সে?

উত্তর দিচ্ছে জমিদার মহলের দাসি সখী সে।এমনটা মালিনীই বলতে বলেছে।

ইমতিয়াজ সহ ওয়াসিম,তনিমা,মেহেরনাজ মিলে ছাঁদ এমনকি বাগানেও পেলো না। পরে প্রহরীদের জিজ্ঞেস করে জানলো পারলো মালিনী নাকি দাসিকে নিয়ে মাহবুবা বেগম এর কাছে যাবেন বলে গিয়েছে।মেহেরনাজ আর ইমতিয়াজ চললো সে মহলে।ওয়াসিফ আর তনিমা মহলের ভেতরে গেলো।ওয়াসিফ চুপচাপ হয়ে আছে।তনিমা তার ভাবমূর্তি বুঝার চেষ্টা করছে।শারমিন বেগম আর শিহাব তখনই উপস্থিত হলো।কি হয়েছে তা জানতপ চাইলো।তনিমা সবটা বললেও শারমিন বেগম চিন্তিত হলো কিছুটা।ওয়াসিফ শিহাব কে বলল,

“ব্যবসা কেমন চলছে?চালের ব্যবসায় ভালো অর্থ আসে?মহলের জমিদারি সাহায্য না নিয়ে নিজে সাধারণ ব্যবসা করো এটায় তোমার প্রতি আমার গর্ব হয় শিহাব।তোমার জন্য দোয়া রইলো।শুহাব হাঁসলো।

“তোমার দোয়া কবুল হোক ভাইজান।ব্যবসায় অধিক লাভবান হতে চাই না।সকলের কথা ভেবে চলার মতো হলেই হলো।জমিদারি আভিজাত্যের বাহিরের জীবনটাও বড় সুন্দর।সাধারণ মানুষদের সঙ্গে মিশলে তা টের পাই।

ওয়াসিফ সমর্থন করলো।নজরে পড়লো দুজন দাসি সহ হামিদা খাবার নিয়ে যাচ্ছে।বুঝতে বাকি রইলো না কোথাই যাচ্ছে।ওয়াসিফ তাদের পেরিয়ে ওপাশে গেলো।তনিমাকে শিহাব তার নতুন খড়ম জোড়া আনতে বললো।সে নাকি কোথাও বেরোবে।ব্যবসার কাজে যেতে হবে।

______

“এই ঘর তো?

মালিনীর কথায় দাসি মাথা নাড়ালো।মালিনী সোজা গিয়ে প্রবেশ করলো ছাউনির ঘেরা বাড়িতে।

প্রথমে নজরে পড়লো মালি আর একজন বৃদ্ধা।

সম্ভবত মালির প্রতিবেশী হবেন।কারণ মুবিনের মা নেই।মুবিন অপ্রত্যাশিত মালিনী কে দেখে অবিশ্বাস্য চোখে তাকালো।ভুল দেখছে কিনা পরোখ করতে চোখ বন্ধ করে আবার খুললো।মালিনী ততক্ষণে এগিয়ে আসলো।বলল,

“আমিই এসেছি।আপনি ভালোবাসেন কথা দিয়ে আর মহলে যাননি।আপনি কি আমায় ছেড়ে দিলেন?ভালোবাসা মিথ্যে প্রমানিত করলেন?

মুবিন তড়িৎ গতিতে মাথা নাড়ালো।সহজ সোজা উত্তরে বলল,

“মিথ্যে ভালোবাসা নয় জমিদার কন্যা।আপনাকে আমার মনে ধরে কিন্তু আপনাকে ভালো রাখতে পারবো না তা বারবার মনে পড়ে।

“এই কারণে পালিয়ে বাঁচতে মহলে যাননা?

“আব্বাজান আবারো অসুস্থ হয়ে পড়েছে তাই।আর জমিদার মহলে কাজ আমি ছেড়ে দিয়েছি।

“জানেন ভাইজান আমার নিকাহ দিতে প্রস্তুত হচ্ছে।আজই আমি শুনেছি ওয়াসিফ ভাইজানের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করছে।

মুবিন চমকে উঠলো।অন্য কারো সঙ্গে নিকাহ'র কথাটুকু শুনতেই বুকের মধ্যে চিনচিন ব্যথা অনুভব করলো।মনে হলো কেউ একাংশ কেঁটে নিয়ে যাওয়ার তোড়জোড় করছে।

“আপনি চলুন।

“কোথায়?

“জমিদার মহলে।ভাইজানের সামনে আমাকে চাইবেন।রাজি না হলে আপনার এই হাত ধরে আমি বেরিয়ে আসবো।বিসর্জন দিবো জমিদারি আভিজাত্যময় জীবন।

মালিনী মুবিনের হাত ধরে আছে।সে এখনো দ্বিধায় কি করবে?যাদের জন্য খেয়ে বেঁচে আছে তাদের বিপক্ষে যেতে কি বিবেকে বাঁধবে না?কিন্তু মালিনী কে একবার হারিয়ে ফেললেও যে আর পাবে না।

মনের ভেতরে যুদ্ধ চললো।অবশেষে মুবিন সিদ্ধান্ত নিলো, বলল,

“চলো।

মালিনী হেঁসে উঠলো।হাতখানা শক্ত করে ধরে বেরিয়ে গেলো।তার ঠোঁটের হাঁসির দিকে তাকিয়ে মুবিন মুগ্ধ হলো।ভাবলো।

“ভালোবাসার যুদ্ধে কি জয়ী হতে পারবো?অস্ত্র হিসাবে মালিনী ছাড়া আমার আর নেই কেউ।”

ইমতিয়াজ রেগে আগুন হয়ে আছে।মাহবুবা বেগম এর ওখান থেকে ফিরে এসেছে কিছুক্ষণ আগেই।মালিনী সেখানেও নেই।মেহেরনাজের অনুমান হলো মালির ঘরে যায়নি তো?সে অনুমানে মেহেরনাজ ইমতিয়াজ কে বলে দিয়েছে মালিনী মুবিন কে ভালোবাসে।এতটুকু শুনেই ইমতিয়াজ লাথি মারলো কক্ষের থাকা কেদারায়।মেহেরনাজ শান্ত হতে বলেও কাজ হলো না।বরং দোষারোপ করলো সে সব জেনেও কেন তাকে জানালো না?মেহেরনাজের পরিস্থিতি বুঝলো না। এককালের সখি সে,সে হিসাবে গোপনীয়তায় কথা রাখা ভুল কিসে?ইমতিয়াজ কক্ষে থেকে বেরিয়ে গেছে।মহলে কানা ঘোষা চলছে মালিনী কে নিয়ে।মেহেরনাজ বসে ভাবছিলো কিভাবে ইমতিয়াজ কে বুঝাবে।তখনই বাহিরে থেকে ইমতিয়াজের রাগত্ব চিৎকারের কন্ঠ ভেসে আসলো।মেহেরনাজ দৌঁড়ে বাহিরে গেলো।দেখলে অন্দরমহলের দ্বারর সামনে মালিনী দাঁড়িয়ে আছে পাশে মালিও রয়েছে।ইমতিয়াজ রেগে চিৎকার করছে ওয়াসিফ তাকে সামলাচ্ছে।মালিনী বলছে,

“ভাইজান আমি মালি কে ভালোবাসি।আপনি মেনে না নিলে আমি এই মহল ছেড়ে মালির হাত ধরে বেরিয়ে যাবো।ভালোবাসা বিহীন রাজপ্রাসাদের চেয়ে ভালোবাসার মানুষ কে নিয়ে কুড়ে ঘরে থাকা শান্তির আছে।

ইমতিয়াজ নিজেকে শান্ত করলো।রাগেট বশবতী হওয়া তাকে মানায় তা মিজ সত্তা বলে দিলো।অতঃপর বলল,

“ভুলে গেলে তোমার জমিদারি ঐতিহ্য?তুমি জমিদার কন্যা তা মনে আছে?মানুষ কি বলবে একবার ভেবে দেখেছো?যেখানে জমিদার পুত্রের সঙ্গে নিকাহ'র সমন্ধ আসে সেখানে সামান্য মালির সঙ্গে প্রণয় কিভাবে মানবো?

“আপনি কিভাবে ভুলে গেলেন যে আপনার বোন এবং ভ্রাতাদের এই মালিই বাঁচিয়েছে।যদিও ভালো আমি তার আগেই বেসে ফেলেছি।তার জমিদার মহল নেই কিন্তু সুন্দর একটা মন আছে।সংসারে অর্থের প্রয়োজন আছে তা আমি মানি।এতটুকু অর্থ উপার্জনের মতো সামর্থ মালির আছে।

“বংশের মান এভাবে ডুবাবে?এখনো সময় আছে এদিকে আসো।

“আপনি ভাবি বেগম কে ছাড়তে পারবেন?যদি পারেন তবে আমিও যাবো।

ইমতিয়াজ রাগে ঘনঘন শ্বাস নিচ্ছে। মেহেরনাজ শুধু তাকিয়ে দেখছে।ওয়াসিফ এবার কথা বলে উঠলো।

“মালিনী কক্ষে যা।

“কেন ভাইজান?আপনি তনিমা আপনাদের ভালোবাসা পাবেন তবে আমি কেন নয়?ওহ হ্যাঁ।সে মালি আর আপনি জমিদার ভ্রাতা বলে?

মালিনীর প্রতিত্তোরে ওয়াসিফ থমকে গেলো।এই কথাটুকু তার ব্যক্তিত্ব কে নাড়িয়ে দিলো।কিন্তু বংশ মর্যাদা রক্ষা করাও দায়িত্ব।

“কি হলো বলুন?বংশ মর্যাদা রক্ষার জন্য জমিদার কন্যা কে জমিদার পুত্রই নিকাহ করতে হবে এমন কোথাই লেখা আছে?আপনারা বরং বংশ মর্যাদা নিয়ে থাকুক আমি চলে যাচ্ছি।

ইমতিয়াজ আটঁকাতে চেয়েও গেলো না।ওয়াসিফ আর কোনো কথা বলল না।মালিনী মুবিনের হাত ধরে যেতে নিলো।হাতে টান পড়তেই পিছনে ঘুরলো।মুবিন এক জায়গায় স্থির দাঁড়িয়ে।

“কি হলো চলুন?

মুবিন নড়লো না।বরং ধীর পায়ে ইমতিয়াজ আর ওয়াসিফের দিকে এগিয়ে গেলো।হাত জোড় করে মাথা নিচু করে বলল,

“মালিনী কে আমিও ভীষণ ভালোবাসি।আপনাদের মতো আভিজাত্যে রাখতে পারবো না জানি। এজন্য দূরত্বেও যেতে চেয়েছি কিন্তু পারিনি।তার চোখের দিকে তাকালে নিজের জন্য যে ভালোবাসা দেখি তার জন্য বড্ড লোভ হয়।তার স্নিগ্ধ মুখের দিকে তাকালে নিজেকে অন্য জগতের একমাত্র সুখী ব্যক্তি মনে হয়।এতো ভালোবাসা ফিরিয়ে দেওয়ার সাধ্যি কি আমার আছে?যে শুধু আমার জন্য জমিদার মহলে ছাড়তে রাজি আছে,তার মধ্যে কতটুকু ভালোবাসা আছে তা আপনি বুঝেন নিশ্চয়ই।ভালোবাসতে আমি আগে আসিনি আপনার বোনই এসেছিলো সঙ্গে আমাকেও ভালোবাসতে বাধ্য করেছিলো।তার শিশুসুলভ ব্যবহার আমার মুগ্ধ করেছিলো।সবশেষে এতটুকু বলতে চাই আপনি যদি মালিনী কে আমার হাতে তুলে দেন তবে আমি সুখে রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো।নিজেকে পুড়িয়ে হলেও তাকে ভালো রাখবো।আপনি শুধু তাকে আমায় দিন।

“যদি না দিই তবে?

ইমতিয়াজের প্রশ্নে মুবিন হাঁসলো।হাতজোড় করে রাখা হাতটা উপরে তুলে বলল,

“আল্লাহর কাছে মন থেকে কিছু চাইলে তিনি নাকি ফেরান না।আপনি তো তারই বান্দা আপনি না-হয় স্বার্থের জন্য দিন।আপনার বোন হাঁসবে এটা কি আপনার স্বার্থ নয়?আমি আপনার কাছে মালিনী কে চাচ্ছি আপনার বোনের ভালোবাসার জন্যও দিবেন না?যদি আপনি আপনার বোনের চোখের জলই সহ্য করতে পারেন তবে আমি ফিরে যাবো।চাইবো না আপনার বোন কে।ভাববো জমিদার ইমতিয়াজ নওয়াজ খান গরীব প্রজাদের ভালোবাসা দেখান কিন্তু ভালোবাসেন না।

ইমতিয়াজ নিশ্চুপ শুনলো।মুঠো করে রাখা হাত দুটো ছেড়ে দিলো।বলল,

“চলে যাও।

মুবিনের শেষ আশার আলো টুকু নিভে গেলো।নয়ন ভরা জল নিয়ে নিয়ে মালিনীর সামনে দাঁড়ালো,বলল,

“ভালো থাকবেন জমিদার কন্যা।আপনাকে পাওয়া আমার ভাগ্যে রইলো না।

মুবিন যেতে নিলে মালিনী পথ আঁটকে দাঁড়ালো। কাঁদতে কাঁদতে বলল,

“কথা দিয়ে কথা রাখলেন না?আপনাকে ছাড়া আমার ভালো থাকা হবে না।

মুবিন তীর্যক ব্যাঙ্গ হাঁসলো।পাশ কাঁটিয়ে যেতে যেতে বলল,

“তোমার ভালোবাসা পাওয়ার মতো সৌভাগ্য আমার নেই।সবাই কে কষ্ট দিয়ে সুখি হওয়া যায় না মালিনী।তুমি সুখী হইয়ো শুধু এই প্রার্থনাই করবো।

মালিনীর কান্নার রেস বাড়লো।মুবিন কিছুটা এগিয়ে গিয়েও জল টলমল চোখে মালিনীর দিকে তাকালো।সেই চোখের জল আড়াল করে সামনের পানে ঘুরলো।স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার ইমতিয়াজ নড়ে দাঁড়ালো।মেহেরনাজ কে বলল মালিনী কে কক্ষে নিয়ে যেতে।মেহেরনাজ এসে ইমতিয়াজ কে কিছু বললো কিন্তু সে শুনলো না।শেষে মেহেরনাজ বলে উঠলো,

“মালিনীর যদি মালি কে পাওয়ার যোগ্যতা না থাকে তবে আমারো নেই আপনাকে পাওয়ার ।সে যেমন মহলের একজন সামান্য মালির পুত্র।তেমনই আমিও জমিদার মহলের কর্মরত একজনের কন্যা।

ইমতিয়াজ মেহেরনাজের দিকে তাকালো।ওয়াসিফ তার চোখের ইশারায় তনিমা কে মালিনী কে নিয়ে যেতে বললো।মালিনী কিছুতেই গেলো না। দৌঁড়ে গেলো সিংহদ্বারের পথে যে দিকে মালি হেঁটে চলেছে।

ইমতিয়াজ তনিমা কে থামিয়ে দিলো।ওয়াসিফ কে বলল সামনে এগিয়ে যেতে।মেহেরনাজের দিকে তাকিয়ে শুধালো,

“তুমি কি তবে আমায় ছাড়বে?

মেহেরনাজ তার এহেন কথায় চমকালো।সে কেবল ব্যখ্যা দিতেই এই কথা বলেছিলো।

“কি হলো বলো?

“আপনি ছেড়ে থাকতে পারবেন?

“তোমার ইচ্ছে কি তবে?

“ওদের মেনে নেন।প্রয়োজন পড়লে মহলে রাখেন।

মালিনীর চোখের জল আপনায় অভিশাপ দিক তা আমি চাই না।

ইমতিয়াজ আর কোনো শব্দ উচ্চারণ করলো না।সোজা চলে গেলো মহলের ভেতরের দিকে।হামিদা আর সালেহা বেগম সবে আসছিলেন এদিকে।ইমতিয়াজ কে দেখে দাঁড়ালো।সে বলল,

“আম্মাজান আপনার সঙ্গে কথা আছে চলুন।আপনার কন্যা কি অঘটন ঘটিয়েছে তা শুনবেন।

কিছুক্ষণ বাদেই সালেহা বেগম সহ ইমতিয়াজ বেরিয়ে আসলো।মা পুত্র গিয়ে দাঁড়ালো অন্দরমহলের বৈঠক খানায়।সেখানে ওয়াসিফ, তনিমা,মালিনী,মেহেরনাজ সাথে এক কোনো মুবিন ও দাঁড়িয়ে রয়েছে।তাকে আবার কেন ডেকে আনা হয়েছে তা বুঝতে পারলো না।তবে কি রাজ্য থেকে বিতারিত করবে?ইমতিয়াজ হুট করে হেঁসে উঠলো।

তার হাঁসি সকলের কাছে আশ্চর্য লাগলো।মালিনীর চোখের জল গড়িয়ে পড়ছেই।মেহেরনাজ ইমতিয়াজ কে শুধরানো আগেই সে মুবিনের সামনে দাঁড়ালো।মুবিন সামনে ইমতিয়াজ কে দেখে মাথা নিচু করলো।ইমতিয়াজ তার কাঁধে হাত রাখলো।সে কিছুটা ভয় পেলো।যদি রাজ্য হতে বিতারিত করে তবে কোথাই যাবে?মুবিনের ধারনাকে ভুল করে ইমতিয়াজ হেঁসে বলে উঠলো,

“আজ থেকে ঠিক চারদিন পরে জমিদার মহলে দুই কন্যা আর এক পুত্রের নিকাহ হবে।সেখানে তুমি আমন্ত্রিত থাকবে।

মালিনী পুরো কথা শোনার আগেই বলে ফেললো।

“আমি মালি ব্যতীত আর কাউকে নিকাহ করবো না।হয় মালি নয়তো কেউ না।

ইমতিয়াজ শব্দ করে হেঁসে ফেললো। ওয়াসিফ পাশ থেকে বলল,

“নিকাহ মালির সঙ্গেই হবে।

মুবিন চমকে তাকালো ইমতিয়াজের দিকে।সে তার দিকেই চেয়ে আছে।চোখ বন্ধ করে কাঁধে হাত চাপড়ে বাহবা দিলো,বলল,

“মালিনীর প্রতি তোমার ভালোবাসা দেখে আমি মুগ্ধ,আব্বাজানের প্রিয় তুমি হয়েছিলে সে হিসাবে তুমি আমারো প্রিয়ই হবে।তোমার হাতেই তুলে দিবো মালিনীর হাত, শুধু ওকে ভালো রাখবে।

মুবিন জল ছলছল চোখে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানো।সে যেন কথা হারিয়েছে।মালিনীর তো বিশ্বাস হচ্ছে না সত্যিই তার ভাইজান মপনে নিয়েছে।তনিমা মেহেরনাক আর তনিমা তাকে জড়িয়ে কত কথা বলছে।সে স্তব্ধের ন্যায় দাঁড়িয়ে এদিক সেদিক দেখছে।মালির জল ছলছল চোখ তার নজরে আসছে।মালিনী সকল কে ছাড়িয়ে ইমতিয়াজের কাছে গেলো।ইমতিয়াজ বোনর মাথায় হাত রাখলো,বলল,

"তোর সুখে আমার দুঃখ নামুক,

তবুও তোর চোখের জল না গড়ুক।

আব্বাজানের শেষ কথা রাখবো।তোকে কাঁদতে দিবো না। আ..

এতটুকু বলতেই মালিনী শব্দ করে কান্না জুড়ে ইমতিয়াজের হাত জড়িয়ে ধরলো।মাথায় রাখা হাতটা ঘষলো।ভাই বোনের ভালোবাসা দেখে সকলে মুগ্ধ হলো।মুহূর্তে বিষাদময় গল্প যেন আনন্দে পরিনত হলো।

চলবে................?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন