ফন্ট সাইজ:
থিম:
জমিদার মহল

৩৬তম পর্ব

লেখক: শ্যামলী রহমান

#জমিদার_মহল

#শ্যামলী_রহমান

#অন্তিম_পর্ব

অতিবাহিত সময় আর প্রাণহীন মানুষ কখনো ফিরে আসে না।দিনের পর দিন পেরিয়ে গেলো।দিন কেটে রাত প্রহর এলো।এভাবে কত দিন কেটে গেলো।জমিদার মহলে আজ খুশির বন্যা বইছে।আনন্দে মেতে উঠেছে মহল।জমিদার ইমতিয়াজ নওয়াজ খান আজ সবচেয়ে খুশি।তার অধঁর জুড়ে বিস্তার হাঁসি।সেই আনন্দে সামিল হতে পুরো রাজ্যে মিঠাই বিতরন করতে বলেছে সে।মুবিন জমিদার মহলে ছিলো।আনন্দের খবর শুনে তড়িঘড়ি করে ঘরে ফিরে গেলো।আঙ্গিনায় প্রবেশ করতেই দেখলো মালিনী উনুনে রন্ধন চড়িয়েছে।আগুন লাগছে না বিধায় ধোঁয়া উঠছে।মুবিন এগিয়ে গিয়ে বসলো তারই পাশে।উনুন জ্বালিয়ে দিয়ে মালিনীর সুস্নিগ্ধ হাঁসিমাখা মুখের দিকে তাকালো।ভারি কন্ঠে বলল,

“তোমায় সুখে রাখতে পারছি মালিনী?জমিদার কন্যা হয়ে এমন পরিবেশ তোমায় কষ্ট দিচ্ছে না তো?”

মালিনীর অঁধরের হাঁসির শব্দে মুবিন মুগ্ধ হলো। মালিনী উনুনে হাঁড়ির দিকে চেয়ে প্রতিত্তোর করল,

“সুখ বলতে শুধু অর্থ আর আরামপ্রদ জীবন বুঝালে আমি তা চাইনা।যতটুকু তোমার আছে ততটুকুতে আমি সুখ খুঁজে নিবো।নিজেকে অপারগ ভেবো না।তুমিই আমার সুখ,তুমিই আমার অ-সুখ।তুমি সঙ্গে থাকলে বাঁচার ইচ্ছে বেড়ে যায় দ্বিগুণ।

মুবিন হাঁসলো।মুগ্ধ হলো মালিনীর কথায়।নিজেকে অতি ভাগ্যবান মনে হয়।কেউ ভাগ্যবান না হলে কি জমিদার কন্যার ভালোবাসা পায়?তার চেয়ে বড় কথা মালিনীর মতো বেগম ক'জন বা পায়?স্বামীর কুঁড়েঘরে থেকে সুখের হিসাব করে জমিদার মহল ছেড়ে আসে।আসলেই কি সুখে আছে মালিনী?

নিজ প্রশ্নেের উত্তর কে দেবে?হ্যাঁ মালিনীর ওই মুখের হাঁসিই উত্তর।অ-সুখে থেকে কেউ এমন মুগ্ধকর হাঁসতে পারে না?

“শোনো তোমায় যে কথা বলতে এসেছি।

মালিনী লাকড়ি দিয়ে নাড়ছে আর উনুনে জ্বালানি দিচ্ছে।না তাকিয়ে শুধলো,

“কি কথা বলো।

“আনন্দের কথা আছে।তাড়াতাড়ি রন্ধন শেষ করো জমিদার মহলে যেতে হবে।

“কেন?

“কারণ তুমি ফুফু হবে।জমিদার মহলে নতুন অতিথি আসতে চলেছে।

মালিনীর হাতের লাকড়ি থেমে গেলো। তাকালো মুবিনের দিকে।প্রথমে বুঝতে সময় নিয়েও খনেই বুঝে নিলো।উচ্ছাসিত কন্ঠে শুধালো,

“সত্যি বলছেন?

“তোমার মালি সাহেব কখনো মিথ্যে বলে?

মালিনী মাথা নাড়ালো।শব্দ করে হেঁসে বলল,

“আর কিছুক্ষণ তাহলেই শেষ।আপনি একটু অপেক্ষা করুন আমার হয়ে যাবে।

”তোমার জন্য সারাজীবন অপেক্ষা করবো মালিনী।

“সারাজীবন অপেক্ষা করতে হবে না,শুধু সারাজীবন ভালোবেসে সুখে-অসুখে পাশে থাকলেই হবে।”

মুবিন মালিনীর বাম হাতটা ধরলো।ললাটে চুম্বন এঁকে দিয়ে বলল,

“তোমার জন্য তোমার মালি মৃত্যুর দ্বারে না যাওয়া পর্যন্ত এই হাত ধরে সঙ্গে থাকবে।”

মবিন উঠে গেলো বাহিরে।মালিনী রন্ধনে মনযোগ দিলো।তার পর হুট করে আনমনে হেঁসে ফেললো।মনে মনে বলল,

“মালির যত্ন,ভালোবাসা,বিস্তার সুখের চেয়ে নাই কোনো কমতি।

ইমতিয়াজ মেহেরনাজের কোলে মাথা রেখে হাঁটু গেড়ে বসে আছে।মেহেরনাজ তখন থেকে তার পাগলামি দেখছে আর মিটিমিটি হাঁসছে।ইমতিয়াজ উদরে হাত ভাজ করে তাকালো মেহেরনাজের চোখের দিকে।হাঁসিমাখা মুখখানা নজরে আসতেই শুধলো,

“তুমি হাঁসছো কেন?

“আপনার পাগলামি দেখে।

“এসব পাগলামি মনে হচ্ছে?

“তাছাড়া আর কি?আপনি জমিদার মশাই একটু বেশি তোড়জোড় করছেন।

ইমতিয়াজ নড়েচড়ে বসলো।মেহেরজানের পেটে হাত রেখে বলল,

“জমিদার ইমতিয়াজ নওয়াজ খান পিতা হবে।পৃথিবীর সবচেয়ে খুশি আজ সে।এতটুকু পাগলামি না-হয় করলো,তাতে কার কি আসে যায় হ্যাঁ?

“আপনার আনন্দ চিরন্তন হোক।আমাদের সন্তান সুষ্ঠ মতো পৃথিবীর আলো দেখুক।আর কোনো অশুভ ছাঁয়া মহলের উপর না পড়ুক।

মেহেরনাজের চিন্তিত মুখ ইমতিয়াজের হাঁসি বিলীন করালো।বলল,

“আমি আর তুমি আমাদের সন্তানের ঢাল হবো।শত্রুর আগমন ঘটলেও একসাথে লড়বো।

শত্রুর আগমনের শঙ্কা তো আর নেই।জমিদার মহলে আর ক'জন বা আছে?যারা ছিলো সকলে বন্ধি কারাগারে।

মেহেরনাজ অতীতে ডুবলো।যেদিন শিহাবের আসল রুপ বেরিয়ে এসেছিলো।শারমিন বেগমের ক্ষিপ্ততা প্রকাশিত হয়েছিলো।সেদিন তিনি যে খঞ্জর মেহেরজানের দিকে ছুঁড়ে মারেছিলেন তা গিয়ে বিঁধে তনিমার পেটের এক কোনে।গলগলিয়ে যখন রক্ত পড়ছিলো।সকলে তখন আতঙ্কে আঁতকে উঠলো।দৌড়ে গেলো তনিমার কাছে।

শারমিন বেগম নিজেও আহাম্মক হলো।সে চেয়েছিলো মেহেরনাজ কে মারতে কিন্তু তনিমা কে লাগলো কেন তা ভেবে আফসোস করলো।তনিমা কে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে অনেক কয়দিন পর সুস্থ হয়ে মহলে ফিরে। শিহাব আর শারমিন বেগম কেও ততদিনে বন্ধি করে রাখা হয়েছে জমশেদ আর জাভেদের কাছে।শিহাব ছিলো জ্বলন্ত আগুন।সে আগুনে ঘি ঢেলেছে শারমিন বেগম।তার শান্ত স্বভাবের আড়ালে হিংস্র রুপ ঢাকা পড়ে ছিলো।তার এমন হিংস্রতা কারণ শামসুদ্দিন নওয়াজ খান এর কারণে হয়েছে।বাঈজী গৃহে আসক্ত হয়ে যখন তাকে অবহেলা অবজ্ঞা করতে শুরু করলো তখনই জানতে পারে বাঈজী গৃহে বাঈজীর সঙ্গে তার সম্পর্ক আছে।এ কথা সাইফুদ্দিন নওয়াজ খান কে জানান তবে তিনি ভাইকে এ পথ থেকে সরিয়ে আনতে ব্যর্থ হন।শারমিন বেগম চেয়েও থামাতে পারে না। তখন তিনি নিশ্চুপ হয়ে যান।ভেতরে পুষেন শুধু হিংস্রতা।স্বামীর এমন পাপ কেউ-ই বরদাস্ত করবে না।

অনেকদিন পর একদিন বাঈজী গৃহে লুকিয়ে গিয়ে খবর নিয়ে জানতে পারে ছোট বাঈজী কণ্যা তারই স্বামীর অবৈধ সন্তান।শারমিন বেগম সেদিন কষ্ট পান,কেঁদে পেরিয়ে দেয় রাত্রি দিন।একদিকে সন্তান আরেকদিকে স্বামী।বেশিদিন গেলে সে বাঈজী মহলে তুলতে পারে এই ভয়ে তার ভোঁজনের সঙ্গে ঔষুধ মিশিয়ে দিতো।যে ঔষুধে ধীরে ধীরে মানুষ শেষ হয়ে যায়।হ্যাঁ একদিন শামসুদ্দিন নওয়াজ খান শেষ হয়ে গেলেন।প্রাণহীন দেহ এক প্রভাতে মিললো।শিহাব কে বড় করে ভিন্ন কাহিনি শোনালো।জমিদার সাইফুদ্দিন নওয়াজ খান এর প্রতি তার আলাদা একটা ক্ষোভ রয়েছিলো।

শারমিন বেগমের সঙ্গে যা হয়েছে তা ঠিক হয়নি।কিন্তু তিনি স্বামী কে হত্যা করার মতো মহাপাপ করারও ঠিক হয়নি।আল্লাহ সকল কে প্রাণ দিয়ে এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন।প্রাণ কেবল সে নিজে নিবে।তার বান্দাদের বলেনি অপরাধ করলে হত্যা করতে।অপরাধের শাস্তি পরপারে গিয়ে পাবে।

“ভাবি বেগম মা বেগম আপনাকে বাহিরে যেতে বললেন।

দাসির কন্ঠে মেহেরজানের ভাবনাচুত হলো।ইমতিয়াজ তার কাঁধে মাথা দিয়ে বসে আছে।কত কথা সে বলছে।মেহেরনাজ তাকে উঠতে বলল।

“আম্মা ডাকছেন চলুন যাই।

মেহেরনাজের সঙ্গে ইমতিয়াজ ও বেরিয়ে আসলো।

হৃদয় ও অঁধর জুঁড়ে আনন্দের ঝিলিক দেখা মিললো।এ যেন ঈদ আনন্দের চেয়েও বেশি উচ্ছাসিত।সকলের কি ছোটাছুটি,হাঁসা হাসি মহল জুড়ে হাঁসির শব্দে মুখরিত পরিবেশ।

জমিদার মহলের রসুইঘরে নানান পদের ভোজ।

সুবাসে বিমোহিত সকলে।মালিনী মহলে প্রবেশ মাত্র মেহেরনাজের খোঁজ করলো।সালেহা বেগমের কক্ষে আছেন জেনে সেখানে গেলো।কক্ষের দরজার কাছে গিয়ে মেহেরনাজ কে চোখে পড়তেই দৌঁড়ে গিয়ে আলিঙ্গন করলো।মেহেরনাজ হঠাৎ আলিঙ্গনে কিছুটা হকচকিয়ে গেলেও পরে স্বাভাবিক হলো।মালিনী উচ্ছাসিত কন্ঠে বলল,

“জমিদার মহলে নতুন অতিথি আসতে চলেছে আমি খুবই আনন্দিত।ভাবি বেগম আমি কিন্তু ফুফু হবো তাকে কোলে নিয়ে পুরো মহল ছুটে খেলা করবো।

মেহেরনাজ হাঁসলো।লজ্জা মিশ্রিত কন্ঠে বলল,

“যা তোর খুশি।

ইমতিয়াজ আর সালেহা বেগম কথা বলছে।

তনিমা ওয়াসিফ মুবিনের সঙ্গে কিছু আলোচনা করছে।মেহেরনাজ মালিনীর সঙ্গে কথা বলতে বলতে খেয়াল করলো সকলের আনন্দ।সকলে কত খুশি।সবচেয়ে বেশি খুশি হলো তার স্বামী।

ইমতিয়াজের দিকে চেয়ে মেহেরজান ভাবলো,

“এই কি সে ইমতিয়াজ নওয়াজ খান?যার জন্য মনে ঘৃণা পুষতাম,নিকাহ করবো না বলে সর্বোচ্চ চেষ্টা করলাম?

অথচ আজ সেই মানুষটাই আমায় সব থেকে বেশি ভালোবাসে,তার জন্য আমার হৃদয়ে ভালোবাসার অথৈ সাগর গড়ে উঠেছে।”

কক্ষ থেকে বেরিয়ে নিজ নিজ গন্তব্যে গেলো।তনিমা আর ওয়াসিফ ও তাদের কক্ষের দিকে পা বাড়িয়েছে।তনিমার হঠাৎ মুখ ভার দেখতে পেলো।

ওয়াসিফ হয়তো কারণটা বুঝতে পারলো।এমন পরিস্থিতি তো তারও জীবনেও এসেছিলো।মনে মনে ভাবলো, “আমাদের ভাগ্যটা কেমন একই না?দুজনের আপন মানুষদের ঘৃণা করার মতো পরিস্থিতি এসে দাঁড়িয়েছে।অথচ তাদের ঘৃণা করতে গেলে নিজের প্রতিও ঘৃণা আসে।

ওয়াসিফ নিজের মন খারাপ দূরে পাঠালো।তনিমার মন ভালো করতে বলল,

“চলো বাগানে যাই?

“বাগানে কেন?

ওয়াসিফ আশে পাশে তাকিয়ে বলল,

“দুজনে একান্তে নির্জন বাগানে প্রকৃতির সানিধ্যে কিছু সময় কাঁটাই।নয়তো চলো কক্ষেই যাই।ভাইজান পিতা হলে আমাদের ভাইজানের পুত্র কিংবা কন্যার খেলার সঙ্গী আনা উচিত না?

তনিমা বিস্মিত বনে গেলো।না চাইলেও চোখ বড় করে তাকালো।আশে পাশে তাকিয়ে বলল,

“আপনাকে আমি ভালো মানুষ ভাবতাম।

“তো কি আমি খারাপ?

“হ্যাঁ।আপনি আজকাল যা শুরু করেছেন তাতে ব্যক্তিত্ববান পুরুষের তকমা আপনার থেকে তুলে নিতে হবে।আপনি র্নিলজ্জ হচ্ছেন তা কি টের পাচ্ছেন?

“হ্যাঁ পাচ্ছি।আমি শুধু আমার তনিমার হতে চাচ্ছি।

ওয়াসিফ কথা শেষ শব্দ করে হেঁসে উঠলো।তনিমা তাকালো ভ্রু কুঁচকে।তার হাঁসির শব্দ বরাবরই পছন্দ। তাই তো দৃষ্টি সিথীল হলো।ওয়াসিফ হাঁসি থামিয়ে তনিমার হাত ধরে যেতে যেতে বলল,

“এই হাত ছেড়ো না কভু,

যতদিন থাকবে জীবন প্রদ্বীপ।

“প্রানহীন দেহ ব্যতীত আলাদা হবো না কভু।”

_____

শীতের আগমন আবারো ঘটছে।চারিদিকে হাল্কা কুয়াশা পড়ে।এবারের কৃষকদের ফসল বেশ ভালো হয়েছে।পরের বৃষ্টি জন্য কৃষকের মুখে হাঁসি ফুঁটেছে।ইমতিয়াজ প্রজাদের হাঁসিতে আনন্দিত।

ভোররাতে কিছুটা কুয়াশার দেখা মিলে।চারদিকে মিশে মিশি দেখা যায়।গায়ে অল্প শীত ও অনুভব হয়।সময়টা ভোর রাত।ইমতিয়াজ আর মেহেরনাজ উঠে পড়েছে।মেহেরনাজের ঘুম আর আসছে না।গল্প করছে খানিক্ষন থেকে।ইমতিয়াজের নানান কথায় মেহেরনাজ হাঁসছে।এর চেয়ে সুন্দর মহূর্ত কি আর কিছু হতে পারে?হুট করে ইমতিয়াজ বলে উঠলো, “চলো বাহিরে যাই।

“কোথায় যাবো?

“একবার বলেছিলে না?ভোররাতে আবারো বেরোবে,পাহাড় চূড়ায় না উঠা হোক,তোমার নিয়ে কুয়াশা ঢাকা গ্রামই ঘুরবো।পদ্ম ফুলের পরিবর্তে বুনো ফুলই না-হয় এনে দিবো।

যেই বলা সেই কাজ।মেহেরজান আর ইমতিয়াজ দুজনে মহল থেকে বেরিয়ে পড়লো।ভোরের আলো প্রতিফলিত হয়নি।খানিক বাদেই হয়তো সূর্যের আলো প্রতিফলিত হবে।আলোকিত হবে ধরনী।

ইমতিয়াজ আর মেহেরনাজ পাশাপাশি হেঁটে চললো।ঘোড়া শাল থেকে ঘোড়া নিলো না।টগবগিয়ে ঘোড়ার পিঠে চড়লে মেহেরনাজের সমস্যা হতে পারে।ইমতিয়াজ সে ভেবেই হেঁটে ঘুরতে বেরিয়েছে।প্রিয় মানুষের সঙ্গে হেঁটে চলার মধ্যেও শান্তি আছে,তা কেবল দুজনে বুঝছে।

ইমতিয়াজ মেহেরনাজের গায়ে শাল টা ভালো করে জড়িয়ে দিলো।নিজের গায়ের শালের একাংশ তার গায়ে জড়িয়ে দিলো।কাছাকাছি,পাশাপাশি হাঁটতে মেহেরনাজের বেশ ভালো লাগছে।দুজনে জমিদার মহল পেরিয়ে কিছুটা সামনে গিয়েছে।মেহেরনাজের দৃষ্টি তখন বাঈজী গৃহে।সেদিকে তাকিয়ে মেহেরনাজ শুধলো,“তাদের কি নিস্তার নেই?কেন তারা পড়ে আছে এই মহলে?

“এ তো বংশ পরম্পরায়।নিস্তার তাদের নিজেদের নিতে হবে।নিজ ইচ্ছার যে পথ বেঁচে নেয় তা কি কেউ বদলাতে পারে?

“বাঈজী কন্যার গর্ভে জন্ম নেওয়া জমিদার মহলের কন্যা হয়েও স্বকৃীত পেলো না এ যে বড় দুঃখের কথা।”

ইমতিয়াজ ব্যঙ্গ হাঁসলো।বলল,

“অবৈধ সম্পর্ক,আড়ালেই মৃত্যু হয়েছে।জমিদার মহলের কন্যা হলেও সমাজ তাকে মেনে নিবে না।

কলঙ্কিত হবে মহল,কলঙ্কিত হবো আমি।

“স্বার্থ আর কলঙ্কের ভয়ে সে কন্যা কেন বঞ্চিত হবে?”

“কিছু বিষয়ে স্বার্থ দেখতে হয়,মেহেরনাজ।জমিদারি সুনাম ধরে রাখতে আমাকে চুপ থাকতে হবে।তুমি চিন্তা করিও না।বাঈজী কণ্যা তার কিছু পাপ্য আড়ালেই পাবে।”

মেহেরনাজ চুপ হয়ে গেলো।মনে মনে ভাবলো,“ অবৈধ সম্পর্কের পাপের ফল জন্ম নেওয়া সন্তান ভোগ করে,অথচ দোষী সে নয়।

পৃথিবী সুখকর না হয়ে এমন হবে সে কি আর জানতো আগে?

দমকা হাওয়া এসে মেহেরনাজের চুল উড়িয়ে দিলো।শাল কিছুটা উড়তে নিলে ইমতিয়াজ শাল সহ মেহেরনাজ কে আগলে নিলো।পথ চলতে চলতে বলল,

“আজ তুমি শুধু আমাকে আর আমাকে নিয়ে ভাবো।ভবিষ্যতে আমাদের সন্তান কে নিয়ে ভাববো।তার সুস্থ জীবনের জন্য তোমাকে চিন্তিত নয় আনন্দিত থাকতে হবে।

মেহেরনাজ সব ভুলে হাঁসলো।ছোট্ট জীবনে দুঃখের হিসাব না করে সুখ কে জড়িয়ে ধরা ভালো।

“মেহেরনাজ?

“হুমম।

আপনমনে চলতে গিয়ে মেহেরনাজের আকুল কন্ঠের ডাকে থেমে গেলো।কখন কিছুটা পথ এগিয়েছে তা টের ও পায়নি।পিছু তাকিয়ে বলল,

“পিছিয়ে কেন?সঙ্গে আসুন।”

ইমতিয়াজ ধীর পায়ে তার সামনে আসলো।আশে পাশে ঠান্ডা হাওয়ায় ঝাপটায় গাছের পাতা নড়ছে।শো শো শব্দে মুখরিত হচ্ছে।মেহেরনাজ এসে ইমতিয়াজ হাত ধরলো।সে ঠাঁই দাঁড়িয়ে মহলের দিকে ফিরলো।মেহেরজান কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“তোমার ঘৃনিত চোখে যেদিন ভালোবাসা দেখেছি,সেদিন ভেবেছি তুমি আমার হয়ে গেছো।”

মেহেরনাজ অদূরে মহলের দিকে চেয়ে আছে।ইমতিয়াজ নিশ্চুপ থেকে আবারো বলে উঠলো,

“যে চোখে ভালোবাসা আশা করা যায়,সে চোখে ঘৃণা কতটা কষ্টকর তা কি জানো,মেহেরনাজ?”

“সে চোখে এখন কেবল আপনার জন্যই ভালোবাসা আছে।হৃদয় অরণ্যে আপনারই বসবাস আছে।তা কি এতোদিনে টের পাননি?

ইমতিয়াজ মহলের দিক থেকে নজর সরিয়ে মেহেরজানের দিকে তাকালো।মেহেরনাজ ও তার দিকে চেয়ে আছে।মহল থেকে কিছুটা দূরে হওয়াতে মহলের মশাল জ্বলছে তা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।সূর্য উঠবে বলে প্রস্তুতি নিচ্ছে।ইমতিয়াজ প্রতিত্তোর করল, “তোমার ভালোবাসায় সিক্ত আমি, বেগম জান।তুমি আমি পরিপূর্ণ হবো তোমার গর্ভে আমাদের সন্তান এই পৃথিবীতে এলে।

মেহেরনাজ ইমতিয়াজ কে জড়িয়ে ধরলো।এক শালের ভেতরে দুজনে রইলো।খানিক নিরবতার পর মেহেরনাজ বলে উঠলো,

“এই বুকে ঠাঁই হোক মৃত্যুর দ্বার পর্যন্ত,

আমি মরণ ও চাই আপনার বুকের উপর মাথা রেখে।”

“আমি চাই তোমার আগে আমার মৃত্যু হোক,

তোমার ভালোবাসা আমার বড্ড প্রয়োজন।”

“পরপারে আপনার সঙ্গেই যেতে চাই।ভালোবাসা নামক বস্তুর ইতি আল্লাহ একসাথেই না-হয় টানুক।

ইমতিয়াজ অঁধর প্রসারিত করে নিঃশব্দে হাঁসলো।অদূরে তাকিয়ে রইলো।মেহেরনাজ উত্তরের অপেক্ষা করলো।ইমতিয়াজ তাকে মাড়িয়ে এগিয়ে গেলো।সূর্য উঠতে শুরু করেছে।সোনালী সূর্যের কিরণ ধরনীর বুকে ছড়িয়ে পড়ছে।ইমতিয়াজ একটা ছোট্ট বুনো ফুল ছিঁড়ে আনলো।মেহেরনাজের সামনে দাঁড়ালো।অকপটে নামহীন বুনো ফুল টা গুঁজে দিলো মেহেরনাজের চুলে।স্থির দৃষ্টিতে মেহেরনাজের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,

“আমাদের জীবনের সমাপ্তি যেভাবেই হোক,

এক জীবনে আমি শুধু তোমার হয়ে বাঁচতে চাই।

ভালোবাসতে চাই,যুদ্ধের ময়দানে তোমার সাহসী আওয়াজ শক্তি হিসাবে চাই।”

মেহেরনাজ মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো।এতো ভালোবাসা,এতো ভাগ্যবতী হবো তা কি কখনো কল্পনা করেছিলাম?না করিনি।মেহেরনাজের চোখে জল এসেছে।মানুষ শুধু দুঃখে নয়,সুখেও কাঁদে।তার জলজ্যান্ত প্রমাণ সে নিজে।মেহেরনাজ টলমল চোখে বলল,

“জীবনের শুরু কিংবা সমাপ্তি,সবকিছুতেই আমি থাকবো আপনার সঙ্গী।”

“এই কথাটা আমায় সবচেয়ে সুখি অনুভব করালো।তুমি আমার জীবনে শ্রেষ্ঠ নারী,বেগম জান।আল্লাহ তোমায় সারাজীবন আমার সঙ্গে থাকার তৌফিক দান করুক।তোমায় নিয়ে আমার প্রতিটি দিন-রাত আনন্দে কাটুক।”

_____সমাপ্তি______

[শেষ পর্বে সকলের অনুভূতি জানতে চাই।কেমন লেগেছে অবশ্যই কমেন্ট জানাবেন।]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৬তম পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন