#হৃদয়_অরণ্যে_তুমি
লেখিকা:#শ্যামলী_রহমান
পর্ব:২
চারদিক কেমন নিস্তব্ধতায় চাপা পরিবেশ।কলেজের সব স্টুডেন্ট অলরেডি চলে গেছে। শুধু রয়ে গেছে ওরা তিনজন।একটু আগে রোদ ছিলো এখন আকাশে সূর্যের আলো নেই, যেন মেঘে ঢাকা কোনো ক্লান্ত দুপুর। অঁধরার মনেও সেই রকম একটা ভারী ঘোর। স্যারের ধমক, কলের সেই 'আই লাভ ইউ', আর গার্জিয়ান ডাকার হুমকি।সব মিলিয়ে সে যেন নিজের জীবন নাটকের কোনো অদৃশ্য দর্শক। নিজেকেই চিনতে পারছে না।
সামিয়া পাশে দাঁড়িয়ে কাঁধে ধাক্কা দিলো।
— “এই অঁধরা, কেমন লাগছে নায়ক স্যারের প্রেমে পড়ে আবার ওনার কাছেই অপদস্থ হয়ে?
কথাটা বলে সামিয়া মুখ চেপে হাঁসলো।
অঁধরা মুখ ঘুরিয়ে রাগি গলায় বললো,
— “তোর দাঁত থাকলে চেপে রাখ! তুই বুঝবি না, প্রেমের রঙ একেকজনের জন্য একেক রকম।
লাভলু হেঁসে বললো,
— “রঙ তো বুঝলাম, কিন্তু এখন তো দেখতে হচ্ছে কালো মেঘে ঢাকা বৃষ্টির মতো অবস্থা।
অঁধরা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। নিজের মনের জটলা নিজেই খুলতে পারছে না। সত্যিই কি এটা প্রেম? নাকি নিছক একতরফা ভালো লাগা? সে জানে না। তবে এটুকু জানে ইরফান স্যারের রাগী চোখে তাকানোর মাঝেও একটা অদ্ভুত আকর্ষণ আছে, যেটা তাকে গুঁড়িয়ে দেয় আবার কাছেও টেনে রাখে।
বাসায় ফিরে এসে সে দেখে জাহানারা বেগম আর নুরুল সাহেব বসে আছেন। কপাশে বাবার কিছু পুরোনো কাগজপত্র গুছানো।
অঁধরা এসেই বাবার পাশে বসলো।ব্যগটা রাখতেই নুরুল সাহেব মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন। হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলেন,-ক্লাস কেমন হচ্ছে এখন?
অঁধরা বাবার হাত জড়িয়ে আহ্লাদে আপ্লূত হয়ে উত্তর দিলো,
"-ক্লাস ভালো হচ্ছে (কিন্তু আমি ক্লাস করিনি)মনে মনে।
"-ঠিক আছে মা ভালো করে পড়াশোনা করো। যাও আগে ফ্রেশ হয়ে এসে খেয়ে নিবে। আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।
অঁধরা চট করে উঠে পড়লো।এক দৌঁড়ে উপরে নিজের রুমে গেলো।আব্বুর সাথে খাওয়া মানে নিজের হাতে খাইয়ে দিবে কি মজা!
নুরুল সাহেব অঁধরা কে প্রচন্ড ভালোবাসেন।শুধু একমাত্র মেয়ে বলে না।
অঁধরা তাদের অনেক সাধনার পর পাওয়া সন্তান।
জাহানারা বেগম প্রথম যখন কনসিভ করেন সে সন্তান প্রসব হওয়ার আগে মারা যায়। এভাবে পর পর আরো দুটো মারা যায়। অনেক চিকিৎসা করে শেষে অঁধরা একমাত্র তাদের আঁধার ঘরে আলো হয়ে এসেছে।
আলো নাম রাখা উচিত ছিলো তবে জাহানারা বেগমের পছন্দের নাম অঁধরা এজন্য রাখা।
রাত আটঁটা অঁধরা রুমে বসে পড়ছে কিন্তু পড়ায় মন বসছে না।বার বার স্যারের কথা মাথায় ঘুরছে। কিন্তু না পড়তেই হবে।
কালকে স্যারের ক্লাস আছে। পড়া না হলে নিশ্চিত কান ধরিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখবে।
পড়ায় মন দিতেই সামিয়ার কল আসলো।অঁধরা বিরক্ত হয়ে গেলো ভেবেছিলো হয়তো তখনকার ছেলেটা কল দিয়েছে তাই নাম্বার না দেখেই রিসিভ করে গালি দিতে যাবে তার আগেই বলে উঠে,
"_দোস্ত কালকে আন্টিকে নিয়ে কলেজে আসবি?নাকি অন্য কিছু করবি?যদি না নিয়ে আসিস তাহলে স্যার রেগে যাবে।
" সেসব চিন্তা তুই আমার উপর ছেড়ে দে।কালকে আসুক তার পর দেখ কি হয়।
"_তোর মাথায় কি চলছে বলতো?
" ঘোড়ার ডিম! খাবি?
সামিয়া থতমত খেয়ে উত্তর দিলো।
"_আমি ঘোড়ার ডিম খাইনা তুই খা।
" সর ফোন রাখ পড়া আছে। অঁধরা ফোন কেঁটে দিয়ে আবার পড়ায় মন দিলো।আজকে ক্লাসে না থাকার কারণে পড়া না জানলেও নিধির থেকে জেনে নিয়েছে।
তার সাথে তেমন বন্ধুত্ব না হলেও মোটামুটি সম্পর্ক।
সামিয়া আর লাভলু তো জানের জান বলা যায়।
বন্ধুত্বের ডেফিনেশন আসলে কি তা জানিনা, তবে
যে মানুষগুলো নির্বাক মুহূর্তেও পাশে থেকে যায়,
না বলা কথাগুলো বুঝে ফেলে চোখের চাহনিতেই,
তাদের সাথেই যেন বন্ধুত্ব শব্দটার মানে খুঁজে পাই। সুখে-দুঃখে যে ভাগ বসায় নিঃশব্দে,
নিজের সমস্যার পাহাড় গোপন করে শোনে আমার ছোট্ট দুঃখ,অফুরান ব্যস্ততার মাঝেও সময় করে,আর বলে তুই ঠিক আছিস তো?কখনো রাগে, কখনো অভিমানে দূরে সরে যায়,তবুও ভেতরে ভেতরে কেবলই অপেক্ষা করে,
একটা মেসেজ, একটা ফোনকলের আশায়,যেন বন্ধুত্বের সুতোর টান কখনোই আলগা না হয়।যেকোনো
সুখ,দুঃখের মূহুর্তে তাদের উপস্থিতি না থাকলে সবই ফাঁকা লাগে। বন্ধুত্ব মানে তাকে ছাড়া কিছুই পূর্ণ নয়।
অঁধরা রাতের খাবার শেষ করে রুমে আসে।বেলকনিতে গেলে নজরে পড়ে সুন্দর চাঁদ খানা ঝলমল করছে।অঁধরার মুখে হাঁসি ফুঁটলো। এই চাঁদের সাথে নিশ্চিত আমার কোনো সম্পর্ক আছে নয়তো তাকে দেখলে কেন বিষন্ন মন খারাপ ও ভালো হয়ে যায়?কেন তাকে দেখতে আমার ভালো লাগে?
হয়তো আমি যাকে হৃদয় অরণ্যে রাখি সেও চাঁদ দেখে বলে।
আমি চাঁদের দিকে তাকিয়ে তাকে নিয়ে ভাবি আর হাঁসি আর অপরপ্রান্তের মানুষটি আমায় ভাবেও না।
কথাটা এমন,
"যে মানুষটি আমার হৃদয় ও মতিষ্ক জুড়ে রয়েছে,
আমি তার হৃদয়ের দূরপ্রান্তের ভাবনায় ও নেই।
বেলকুনি থেকে ফিরে আসলো।তাড়াতাড়ি ঘুমাতে হবে বিছানায় গাঁ এলিয়ে দিলেও ঘুম আসলো না।আর ঘুম না আসলে ওর কাজ কানে হেডফোন লাগিয়ে চোখ বন্ধ করে রেখে গান শোনা।
অঁধরা আজকেও তাই করলো। হেডফোনে একটানা একটা গান বাজতে থাকলো-
"তুমি যে আমার হৃদয়ের রাজা,
চুপিচুপি এলে স্বপ্ন সাজা.....!
গানের লিরিক্সে যেন মিশে যায় তার মনের কথা।
সে জানে, ভালোবাসা সহজ নয়। তবু এই অরণ্যের গহীন ছায়ায়, সে তার ‘হৃদয় রাজা’র ছায়াকেই খুঁজে ফেরে বারবার।
সকালের আলোটাও আজ যেন অন্যরকম। অঁধরার মনটা আজ ফুরফুরে।দক্ষিণা বাতাস বইছে। সকালের শীতল বাতাস যেন প্রেমের গান গাইছে।
প্রেমময় হৃদয়ে অবশ্য গ্রীষ্মের কড়া রোদ ও শীতল লাগে,
কাকের বেসুরো কন্ঠ ও তখন মধুর মনে হয়।
অঁধরা কলেজে পৌঁছানোর আগেই সামিয়া আর লাভলু এসেছে। ওরা দুজন অঁধরার জন্য অপেক্ষা করছিলো।
কলেজ গেটের পাশে দাঁড়িয়ে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছিলো অঁধরা আসছে কিনা।
কিন্তু অঁধরায় আশায় থাকতে ওর আগে আসলো ইরফান স্যার। উনাকে দেখে সামিয়া আর লাভলু কোনো মতো সালাম দিয়ে দূরে গিয়ে দাঁড়ালো।স্যার মানুষরা সুবিধার নয় এনার থেকে দূরে থাকা ভালো।
সামিয়ার সাথে কন্ঠ মিলিয়ে লাভলু বললো,
কেন যে অঁধরা কর্কশ,নিরামিষ,রাগি স্যারকে ভালোবাসতে গেলো।ও নিশ্চিত বাঁশ খাবে।
কিছুদূর গিয়ে ইরফান পিছিয়ে আসলো।সামিয়া আর লাভলু কে উদ্দেশ্য করে বললো,
_" তোমাদের ওই বাঁদর বন্ধুবী কোথাই?এখনো আসেনি?
আসলে গার্জিয়ান কে নিয়ে আমার সাথে দেখা করতে বলবে।
সামিয়া মিনমিনিয়ে মাথা দুলিয়ে বললো-'ঠিক আছে স্যার।
সরি রে আজ দেরি হলো আসতে।আব্বু না খেয়ে আসতে দিবে না জানিস তো আব্বুর কথা না শুনে থাকতে পারি না। চল তাড়াতাড়ি আজকে প্রথমে তো ইরফান স্যারের ক্লাস আছে।
অঁধরার এক নিঃশ্বাসে সব কথা বলে ওদের দুজনের হাত ধরে ছুটলো ক্লাস রুমের দিকে।
সামিয়া কিছু বলতে চাইলো কিন্তু ও শুনলো না।
আজকে ওরা তিনজনে ক্লাসে চুপচাপ বসে আছে। কালকের অপমান ভুলেনি।আজকে আর সেই ভুল করা যাবে না। কিছুক্ষণের মধ্যে ইরফান স্যার ক্লাস রুমে প্রবেশ করলো।এতেই যেন পুরো রুম নিস্তব্ধ হলো।কারো কোনো কথা নেই তবে কিছু মেয়ে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে। অঁধরা তাদের নজর লক্ষ্য করে জ্বলে উঠলো।কিছু বলতে পারবে না তাই নিজের মনে বকতে থাকলো সব গুলোকে।
আরো বললো,-একবার শুধু স্যার কে পেয়ে যাই তার পর তোদের তাকানো বুঝাবো।
আজকে ক্লাসে অঁধরা কোনো কথা বলেনি।স্যার পড়া ধরলেও সব পেরেছে। প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় ইরফান স্যার যখন তাকিয়ে ছিলো তখন কি যে ভালো লাগছিলো তা বলে বোঝানো যাবে না।
ক্লাস শেষ হলো এখন চল্লিশ মিনিট ক্লাস নেই আর্টসের ক্লাস আছে।
ক্লাস শেষ করে সবাই বেরোচ্ছে আর স্যার দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ অঁধরা কিছু মনে হতেই তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে যেতে নিলো কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। পিছন থেকে স্যারের গম্ভীর কন্ঠ ভেঁসে আসলো।
_"তোমার গার্জিয়ান কোথাই?তাদের নিয়ে তাড়াতাড়ি অফিস রুমে আসো।
স্যার বেরিয়ে গেলো।সামিয়া, লাভলু জানতে চাইলো'-এবার কি হবে?আংকেল আন্টিকে তো আনিসনি তবে কি করবি?
অঁধরার ঠোঁটের কোনো দুষ্টু হাঁসি দেখা গেলো।মানে কোনো দুষ্টু বুদ্ধি আছে।
"আগে যাই তার পর দেখ কি হয়।
অফিস রুমে দাঁড়িয়ে আছে অঁধরা।আশে পাশে সামিয়া, লাভলু কেউ নেই মূলত ওরা ভয়ে আসেনি।
অঁধরা অনুমতি নিয়ে রুমে ঢুকতেই ইরফান চৌধুরী চোখ তুলে তাকালো। অঁধরাকে একা দেখে ভ্রু কুচকে আসলো।জিজ্ঞেস করলো-" অভিভাবক কোথাই?
অঁধরা ইনোসেন্ট ভাব নিয়ে একটু মন খারাপের ভঙ্গিতে উত্তর দিলো,
"-আসলে হয়েছে কি স্যার আমার দাদা অসুস্থ তাই আবু আম্মু গ্রামে গেছে দেখতে তাই আসতে পারেনি।
_" দাদা অসুস্থ তবে তুমি যাওনি কেন?
অঁধরা লজিক তৈরি করতে থাকলো একটু পর আবার উওর দিলল,
"স্যার আমার পড়াশোনা আছে এজন্য আমায় রেখে গেছে আর দাদু একেবারে বেশি অসুস্থ না তাই যাইনি।
অঁধরার কথা শেষ হতেই ইরফান বেঙ্গ করে বললো,
_" এতো পড়াশোনায় টান তাহলে আমার সাবজেক্টে সবচেয়ে কম নাম্বার তুমি পেয়েছো কেন?এতো কম নাম্বার কেউ পায়?আমি তো এমন পড়াই না যে কম নাম্বার পাবে।এজন্য তোমার গার্জিয়ান ডেকেছিলাম।
"স্যার আমি তো আগে ক্লাস করিনি কিছু পড়া হয়নি তাই এতো ক......
কথা শেষ কতে না দিয়েই ইরফান স্যার বলে উঠলো,
_" কোনো এক্সকিউজ দিতে হবে না। কয়দিন পর আবার ক্লাস টেস্ট নিবো তখন দেখবো আর হ্যাঁ তোমার আব্বুুর সাথে আমিই কথা বলে নিবো।
"আপনি আমার আব্বুকে চিনেন?
_" না শুধু নুরুল কবির সাহেব কে চিনি।
"ওমা আপনি আমার বাবার নাম ও জানেন?
_" দাদার নাম ও জানি শুনবে?
অঁধরা মুখ বাঁকালো।
"আমি আমার দাঁদার নাম জানি আপনাকে বলতে হবে না হু।
_" এই মেয়ে তুমি মুখ ভেঙ্গাচ্ছ?
অঁধরা দাঁত বাহির করে উত্তর দিলো"-না স্যার সে সাহস কি আর আমার আছে?
ইরফান চোখ ছোট ছোট করে তাকালো বুঝতে পারছে মেয়েটা তার সাথে ফাজলামো করছে। কিন্তু আশে পাশে আরো দুজন মানুষ আছে বলে কিছু বললো না।
"স্যার আমি কি যাবো?না মানে পা ব্যাথা হয়ে গেলো।এমনিতে কালকে গিয়ে ব্যথা পেয়েছিলাম।
_" যাও।
গম্ভীর উত্তর শুনে অঁধরা আসার সময় বেঙ্গ করল আওড়ালো য্যাঁও।
_" কি বললে?
অঁধরা মুখে হাত দিলো। কথা চাপার জন্য হেঁসে বললো।
"-কিছু না।ধন্যবাদ স্যার আপনি অনেক ভালো সাথে কষ্ট বুঝেন।
রুম থেকে বাহির হয়ে মুখ বেঁকিয়ে বলে উঠলো।
"-ধন্যবাদ না ছাঁই দিবো।ভালো ভ নেই কষ্টের ক বুঝে না।
লাভলু ওর একা বকবক করা দেখে জিজ্ঞেস করলো কাকে বলছিস?
"-কাকে আবার স্যার কে।
'-তাহলে স্যারের পিছনে ছুটেছিস কেন?
অঁধরা রেগে তাকালো।কোমরে হাত দিয়ে বললো।
"-ভালোলাগা,ভালোবাসার জন্য ভালোর প্রয়োজন হয়না।
বাহ্যিক দেখে ভালো মনে হয় না কারণ স্যাররা কড়া হবে এটা স্বাভাবিক।তবে হৃদয় কতটা নরম তা শুধু কাছে আপনজন আর পরিবারের মানুষই বলতে পারবে। তাই আমি উনার কাছের কেউ হতে চাই,খুব কাছের,হোক সেটা কল্পনায়।
চলবে....................?
নেক্সট গল্প পেতে পেইজে ফলো দিবেন।
লেখিকার পেইজ লিংক:https://www.facebook.com/profile.php?id=61557427230773&mibextid=ZbWKwL