#হৃদয়_অরণ্যে_তুমি
লেখিকা: #শ্যামলী_রহমান
পর্ব: ৫
অঁধরা যেন কিছুতেই বুঝতে পারছে না।
ইরফান স্যার এখানে!কিন্তু কেন?এদের সাথে বা কি সম্পর্ক?এতোসব প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে তখনি রিশাদ নামে ব্যক্তি হাঁসি মুখে অঁধরার সামনে দাঁড়ালো।মুখে সেই হাঁসি নিয়ে বললো,
-চলো।
হাত দিয়ে সামনে দেখিয়ে বুঝালো কেক কাঁটা হবে সেখানে যেতে।
এই আয়োজন, এই ভিড়,পাত্রের বাড়ির সব কিছু যেন হঠাৎ থেমে গেছে ওর জন্য।ইচ্ছে না থাকার পরেও যখব এসেছে তাহলে যেতে হবে। তাই বাঁধ্য হয়ে রিশাদের সাথে হাঁটা ধরলো।
জাহানারা বেগমের পাশে দাঁড়াতে তিনি হাত টেনে ধরলেন।মেয়ের চোখে মুখে স্পষ্ট বিরক্তি ভাব দেখতে পেলেন।ফিসফিস করে মেয়েকে বুঝালেন,
-আর একটু সময়।এতো মানুষের মধ্যে মুখ এমন করে রাখিস না।মানুষ কি ভাববে?
অঁধরা উত্তর দিলো না তবে চোখ মুখ শক্ত করে বুঝালো তাতে ওর কিছু যায় আসে না।
অনুষ্ঠান প্রায় শেষের দিকে।সবাই খাওয়া নিয়ে ব্যস্ত। অঁধরা ওর বাবা, মা এখনো খেতে যায়নি।মানুষ একটু কমলে যাবে কারণ অঁধরার অচেনা মানুষের ভীড় ভীষণ অপছন্দ। যদি আশে পাশের মানুষ গুলো পরিচিত হতো তবে দেখতে পেত চুপ করে বসা থাকা মেয়েটার চঞ্চলতা।
— “তুমি ঠিক আছো তো মা?
জাহানারা বেগম অঁধরার কাঁধে হাত রাখলেন।
অঁধরা মাথা নিচু করে বললো,
— “হ্যাঁ আম্মু, একটু গরম লাগছে।
নুরুল সাহেব পাশে এসে বললেন,
— “তাহলে একটু বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াও, হাওয়া খাও, আমি শরবত এনে দিচ্ছি।
বারান্দায় এসে অঁধরা জানালার গ্লাসের ওপাশে নীল আকাশের দিকে তাকালো।দেখতে পেল নীল আকাশে কিছু শুভ্র পাখি ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছে।অঁধরার পাখি গুলোর নাম ঠিক জানা নেই তবে ভীষণ সুন্দর লাগছে দেখতে।মনে হচ্ছে নীল সাগরের বুকে সচ্ছ জল।
এদিকে তেমন কেউ নেই বললে চলে।অঁধরার হঠাৎ মুখে আচমকা হাঁসি ফুঁটলো! গুনগুন করে গান ও ধরল,
আমার একলা আকাশ থমকে গেছে,
রাতের স্রোতে ভেসে,
শুধু তোমায় ভালবেসে...!
"শুধু ভালোবেসে থমকে গেলে হবে না,পড়ালেখা টাও ঠিক মতো করতে হবে।এসব ভূত মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলো! সামনে পরীক্ষা সেটা মাথায় রাখো।
ভরাট কন্ঠের মানুষটিকে দেখার জন্য অঁধরা ধপ করে ঘুরে দাঁড়ালো।
আচমকা কারো কন্ঠ শুনে বুক ধড়ফড়িয়ে উঠলো।বুকে হাত দিয়ে ভয়ার্ত কন্ঠে বলে উঠলো,
-ইরফান স্যার আপনি?
"হ্যাঁ আমি।স্বপ্ন না, বাস্তব!
আর তখন কি ভুল বকছিলে?
অঁধরার কণ্ঠটা ভেঙে গেলো।
কি উত্তর দিবে?
আশে পাশে তাকালো পালানোর পথ নেই।যেদিক দিয়ে যাওয়া যায় সেখানে ইরফান স্যার দাঁড়িয়ে আছেন।
অঁধরা উপায় না পেয়ে চোখ বন্ধ করে বললো,
-তখন আপনাকে বলিনি তো আমি ভেবেছিলাম অন্য কেউ তাই।
চোখ খুলে দেখি ইরফান স্যার সন্দিহান দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন।কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করার পর বাঁকা চোখে চেয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
" শাড়ি পরে এসছো কেন?আজ কি কারো বিয়ে ছিলো?আমার জানা মতে তো আজ বার্থডে ছিলো।তবে?
-কেন স্যার শাড়িতে ভালো লাগছে না?
"জঘন্য লাগছে।এখানে এতো মানুষ তোমার বয়সের কোনো মেয়ে শাড়ি পরে আসেনি অথচ তুমি এসছো এজন্য একদম বাজে লাগছে।
অঁধরার মনে কালো মেঘের ছায়া দেখা দিলো।মানুষ বলে শাড়ি পরলে সব মেয়েকে সুন্দর লাগে অথচ তিনি বলছে জঘন্য লাগছে।সে তো আশা করেছিলো সুন্দর লাগবে বলবে কিন্তু তা আর হলো কই? হলে তো উল্টোটা।
ইরফান বোধ-হয় কিছু বলতে চাইলো তখনি এক ভদ্রমহিলা আসলেন। পিছু ডাকলেন-" ইরফান তুই এখানে তোকে সব জায়গায় খুঁজছি আমি।
স্যারের দৃষ্টি ভদ্রমহিলার দিকে।আমিও সেদিকে তাকিয়ে আছি ভাবছি তিনি কে?
ততক্ষণে ভদ্রমহিলা আমাদের কাছে এসে দাঁড়িয়েন।
ইরফান কে কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেলো।চোখ পড়লো পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার দিকে। কিছু সময় তাকিয়ে থাকলো তার পর একবার ইরফান একবার অঁধরা দুজনের দিকে তাকাচ্ছেন।
ইরফান দৃষ্টি লক্ষ্য করে মহিলাকে বললেন,
"কি হয়েছে আম্মু?কি দেখছো?
অঁধরা বুঝতে পারলো এ মহিলা উনার মা।
ভদ্রমহিলা ইরফান কে জিজ্ঞেস করলেন
:মেয়েটা কে? চিনিস নাকি?
"-ও অঁধরা আমার স্টুডেন্ট আম্মু।
ইরফানের সোজা উত্তর। অঁধরা চুপ করে আছে। ভদ্রমহিলা গাল ভরে হাঁসলেন। অঁধরার দিকে তাকিয়ে ওকে উদ্দেশ্য করে বললো,
:স্যারকে দেখে বুঝি গল্প করতে আসছো?স্যার স্টুডেন্ট এক জায়গায় দাওয়াতে আসছো।
অঁধরা কোনো মতো জ্বী বললো।
ভদ্রমহিলা আবারো প্রশ্ন করলেন,
: তা তোমার বাবার নাম কি মেয়ে?
-নুরুল আমিন।
অঁধরার উত্তর দেওয়া শেষ না হতেই আরো কিছু জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিলেন তার আগে ডাক আসে জাহানারা বেগম ডাকছেন।অঁধরা আসছি বলে ছুটে যায়।
সেদিকে তাকিয়ে রয় মা ছেলে।
:কি গল্প করছিলি বলতো?
ইরফান মায়ের দিকে নজর দিলো তার দৃষ্টি সন্দিহান তা বেশ বুঝতে পারলো।
"-কি আর গল্প করবো।পড়াশোনার বিষয়ে বলছিলাম।
:মেয়েটা কি সুন্দর তাই না?শাড়ীতে বাচ্চা লাগলেও সুন্দর লাগছে।মওর বাবা মায়ের সাথে কথা বলিয়ে দে তো।
" কেন?
:তোর রাশেদা খালা তার ছেলের জন্য একটা মেয়ে দেখতে বলেছিলো তা....
কথা শেষ করার আগেই ইরফান থামিয়ে দিলো ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,
"-ওয়েট!
তুমি কি ঘটকালি করতে চাচ্ছো নাকি?নাকি আমাকে বলছো?
:হ্যাঁ সমস্যা কই?
"-নো ওয়ে আমি পারবো না।
:তুই পারবি টা কি?বিয়ে করতে বললেও শুনিস না,কেউ পছন্দ আছে কিনা জিজ্ঞেস করলেও বলিস নাই।যদি তুই বিয়ে করতে রাজি হতি তাহলো এরকম সুন্দর একটা বউ আমার ঘরে আসতো দেখ কি সুন্দর হাঁসছে।
ইরফান মায়ের ইশারা অনুযায়ী তাকালো।অঁধরা তখন একটা বাঁচ্চার সাথে খেলছিল তাকে হাঁসানোর চেষ্টা করছিলো সাথে নিজেও হাঁসছিলো।
সে কি মায়াবী হাঁসি যাতে খুন হতে পারে শত যুবকের রাতের ঘুম।
ইরান নজর সরালো। মায়ের দিকে বিরক্তি চাহনী নিয়ে তাকিয়ে হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলো অন্য দিকে।
এমন সময় নাজিম আঙ্কেলের স্ত্রী আবার এসে পড়লেন,
— “অঁধরা মা, চলো একটা ছবি তুলি রিশাদের সাথে। সব্বাই চাইছে একটা ছবি।
তার চোখে মুখে স্পষ্ট খুশি।
অঁধরা কাঁপা গলায় বললো,
— “আমি একটু অসুস্থ ফিল করছি আন্টি, পরে তুলবো।
ইরফান স্যার একপাশে দাঁড়িয়ে সব শুনছিলেন।
হঠাৎ বলে উঠলেন,
— “আন্টি, ওকে ছেড়ে দিন। ওর শরীরটা একটু ভালো নেই মনে হচ্ছে।
আন্টির মুখটা একটু কালো হলো, তবুও বললেন,
— “আচ্ছা, ঠিক আছে বাবা, আর জোর করবো না।
তারা চলে যেতেই ইরফান স্যার ধীরে ধীরে বললেন,
— “তুমি সবকিছুর চাপে হারিয়ে যেও না, অঁধরা। কখনো নিজের পছন্দকে ভুল বুঝো না। সময় এলে, মানুষ বুঝে নিতে পারে কার জন্য হৃদয়ের একান্ত জায়গাটা খালি রেখে দিয়েছে।
অঁধরা শুধু তাকিয়ে রইলো ওর চোখের দিকে।
চোখে কথা জমে আছে, কিন্তু বলার সাহস নেই।
পরেরদিন কলেজের সামনে সামিয়া আর লাভলু।আশে পাশে বারবার তাকিয়ে দেখছে।অপেক্ষা করছে কারো জন্য। যে অপেক্ষা শেষ হচ্ছে মনে হচ্ছে।
ঠিক তখনই কাঙ্খিত মানুষটির দেখা মিললো।সামিয়া জোরে বললো,
'ওই তো অঁধরা আসছে।
লাভলু সেদিকে তাকালো। দুজনের মুখে হাঁসি উপচে পড়ছে তবে সে হাঁসি স্থায়ী হলো না।যখন দেখলো অঁধরা রিকশা থেকে নেমে ওদের না দেখার ভান করে গমগমিয়ে কলেজ গেট পেরিয়ে যেতে লাগলো।
ওর মুখটা গম্ভীর।সামিয়া লাভলু পিছন,পিছন ছুটলো ওকে দাঁড়াতে বলেও লাভ হচ্ছে না। শেষে উপায় না পেয়ে দৌড়ে সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। অঁধরা থমকে যায় ওরা দুজনে কান ধরে বলতে শুরু করে,
— “অঁধরা আমরা সত্যি দুঃখিত। আমি জানি আমার ও লাভলুর এমন কাজ করা উচিত হয়নি।আমরা জাস্ট না বুঝে মজা করেছি বুঝতে পারিনি তুই কষ্ট পাবি। তুই যা শাস্তি দেওয়ার দে কিন্তু আমাদের ক্ষমা কর।
অঁধরা এক দৃষ্টিতে তাকালো ওদের দিকে।
— “একটা মানুষ যদি অনুভব করে, তার আবেগ নিয়ে কেউ খেলেছে, তখন ক্ষমা শুধু মুখের কথা হয় না। সময়ই বলে দেয় কে কতটা কাছের।
সামিয়া লাভলু চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলো।অঁধরার কঠিন ভাব দেখে আর কিছু বলার সাহস পাচ্ছে না।
হঠাৎই আবার ইরফান স্যারের কণ্ঠ,
— “তোমার বন্ধু ভুল করেছে, কিন্তু ওদের চোখে অনুশোচনা সত্যি ছিল। মানুষ ভুল করেই শেখে।
অঁধরা একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো।অতঃপর দুজনের কাচুমাচু ফেসের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ হেঁসে উঠে।দুহাতে জড়িয়ে ধরে দুজনকেই।তার পর হেঁসে বলে উঠে,
-'দেখলাম তোরা আমার রাগ দেখে ভয় পাস কিনা?
ইরফান কথাটা বলে ততক্ষণে চলে গেছে নিজের স্থলে।
সামিয়া লাভলু এবার সস্তি পেল।মনের উপর থেকে ভার কমলো মনে হলো।আবার আগের মতো খুনসুটিতে মেতে উঠলো তিনজনে।
বন্ধুত্বের আরেক অংশ হলো মান অভিমান।শেষ পর্যন্ত এমন বন্ধুত্ব থাকলেই মন্দ নয়।
ভালোবাসা,বন্ধুত্ব দুটোতেই মান অভিমান থাকে।
এক সময় দুটোই হারিয়ে যায়।
কোনোটা ব্যস্ততায় আবার কোনোটা বাস্তবতায়।
আবার কারো ভালোবাসা,বন্ধুত্ব দুটোই থেকে যায়।
সবই পরিস্থিতির খেলায় মহাজগতের মেলায়।
চলবে..............?