ফন্ট সাইজ:
থিম:
হৃদয় অরণ্যে তুমি

১০ম পর্ব

লেখক: শ্যামলী রহমান

#হৃদয়_অরণ্যে_তুমি

লেখিকা:#শ্যামলী_রহমান
পর্ব: ১০
আকাশ যেন এক লহমায় থেমে গেছে।
চারপাশের গুঞ্জন, হাসির শব্দ,ক্যামেরার ক্লিক সবই কেমন নিষ্প্রভ হয়ে পড়েছে অঁধরার কানে।
সে শুধু তাকিয়ে আছে সেই মুখটার দিকে যে মুখটা কখনো স্বপ্নে দেখেছে, কল্পনায় রং তুলেছে, আবার নিজের অজান্তে চোখের পানি দিয়েও স্নান করিয়েছে।
সেই চেনা চোখ, সেই মৃদু হাসি, সেই স্নিগ্ধ কণ্ঠস্বর,
"Will you marry me?"
অঁধরার ঠোঁট কাঁপছে। হাত-পা যেন অসাড়। কিছু বলতে চায়, কিন্তু ভাষা হারিয়ে গেছে।
আশেপাশের মানুষজন থমকে গেছে, কেউ ফিসফিস করছে, কেউ হাসছে।
লাভলু এগিয়ে এসে বললো,
— “কি রে, বাকরুদ্ধ নাকি? উত্তর দিবি না?
সামিয়া মুখে ওড়না চেপে হাঁসি দিয়ে বলে উঠলো,
— “আহ্, আমি জানতাম কিছু একটা হবেই। কিন্তু এত সুন্দর করে হবে ভাবিনি।”
অঁধরা সবার দিকে তাকায়।মাথাটা একটু নিচু করে চোখ দুটো আবার তুলে তাকায় ইরফানের চোখে।সে চোখ তারই দিকে চেয়ে আছে।
— “আ আপ আপনি এখানে? এইসব কি? কিন্তু আপনি তো.. আপনি তো অন্য কারো।
অঁধরার যেন সব গুলিয়ে যাচ্ছে। কি বলবে? কি করবে বুঝতে পারছে না।সবকিছু স্বপ্ন মনে হচ্ছে ঘুম ভেঙে গেলে হারিয়ে যাবে।
ইরফান অঁধরার রিয়াকশন দেখে নিঃশব্দে হাঁসে।
ধীর কন্ঠে বলে"-আগে উত্তর দেও তার পর বাকি সব বলছি।
আপাতত এতটুকু জেনে রাখো তোমার চোখের চাহনিতে যে আকাঙ্ক্ষা দেখেছি তা আমার ভেতরে একটা অদৃশ্য ঘর তৈরি করেছে, যেখানে শুধুই তুমি ছিলে।
তোমার বাবা-মায়ের কাছে গিয়েছিলাম অনেক আগেই, কিন্তু চেয়েছিলাম সঠিক সময় আসুক।
আজ সেই দিন।
সবাই নিঃশব্দ। কেউ যেন নিশ্বাস নিতে ভুলে গেছে।
অঁধরার বাবা-মা একটু পেছন থেকে এগিয়ে এসে দাঁড়ালেন। জাহানারা বেগম হেসে বললেন—
— “কি রে মা, এতদিনের গুছিয়ে রাখা স্বপ্ন যদি আজ সত্যি হয়, তবে তার উত্তর তো এখনি দিতে হয় তাই না?”
অঁধরার চোখ ভিজে উঠলো।যাকে ভোলার চেষ্টায় করলো কতকিছু সে আজ তার সামনে হাত বাড়িয়ে আছে।এখন শুধু হাত বাড়ালেই তার নাগালে।অবাঁধ্য অনুভূতি আবারো একটু একটু জেগে উঠলো।সে ধীরে ধীরে মাথা নিচু করে বললো'
— “হ্যাঁ, আমি রাজি।”
এক মুহূর্তে চারপাশে করতালির শব্দ, হাসির রোল।
ইরফান স্যার ধীরে অঁধরার হাতের অনামিকায় সেই সোনালী আংটি পরিয়ে দিলেন।
ক্যামেরার ফ্ল্যাশ যেন সেই মুহূর্তটাকে স্থির করে রাখলো অনন্ত সময়ের জন্য।
লাভলু চিৎকার করে বললো,
—"এবারের গেট মানি আমি একা নিবো।বন্ধুর বিয়ে বলে কথা। শুধু আমার বিয়েটা আর হবে না। 
সামিয়া আর লাভলুর হাসির রোল চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো।
অঁধরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলেও, চোখের কোণে লুকানো এক বিন্দু জল যেন বলে দিলো,
“আজও, এই হৃদয় অরণ্যে তুমি আমার।”
রাত দশটা বাজে।
আকাশের তারা যেন আজ একটু বেশি ঝিকিমিকি করছে। বিয়ে বাড়ির আলোগুলো এখনও জ্বলজ্বল করছে, মানুষের কোলাহল খানিকটা কমলেও, অঁধরার মনে যেন এখনও ঝড় বয়ে যাচ্ছে।প্রায় এক ঘন্টা আগে বরযাত্রী বউ নিয়ে চলে গেছে।বাড়িটা অনেকটা ফাঁকা হয়ে গেছে। লাভলু ওর বাবা মায়ের সাথে চলে গেলো একটু আগেই। 
অঁধরা থমকে বসে আছে সোফায়।বাম পাশে ওর মা।এখনো সব ঘোরের মধ্যে। যতটা খুশি ঠিক ততটা প্রকাশ করতে পারছে না।আংটি পরার পর সবার থেকে জানতে পেরেছে সবাই সবকিছু জানতো।এন্ড সব প্ল্যান করা ছিলো আমার অজান্তেই।সামিয়া লাভলু যেনেও কি নাটকটাই না করেছে।এ নিয়ে ওদের সাথে একটু রাগ দেখানোর মতো অভিযোগ হলো।এসব প্ল্যান আমার পরীক্ষার আগে থেকে হয়েছিলো।সামিয়া আর লাভলু স্যার কে সব বলতো আর তিনি ওদের কে জানিয়েছিলো উনার ও নাকি আমাকে পছন্দ। তার পর এসব নাটক কারণ আমার পরীক্ষা আর কলেজে পড়াকালীন এমন কিছু হলে মানুষ বদনাম করতো।যদিও মানুষের কাজই অন্যের সমালোচনা করা।কেউ যদি শিক্ষক ও হয় অবিবাহিত অবস্থায় তাহলে সে তো বিয়ে করবেই।সে মেয়ে নিশ্চয়ই পড়াশোনা করবে?হয়তো সে অন্য কলেজ কিংবা ভার্সিটির স্টুডেন্ট হবে।এক কলেজের স্টুডেন্ট বলে বিয়ে করা যাবে না এমন নিয়ম কোথাই আছে?
যদি প্রেম করতো তবে না বদনাম করতো এজন্য একবারে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার প্ল্যান 
অঁধরা ডান পাশে একটু দূরে ইরফান আর নুরুল কি যেন কথা বলছে।শশুড় জামাইয়ের সে কি হাঁসিমাখা কথা।অঁধরা সেদিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ ইরফান এদিকে তাকাতেই দুজনের চোখাচোখি হলো।
সে ব্যক্তির নজর স্থির তবে অঁধরা তাকিয়ে থাকতে পারলো না। চোখ নামিয়ে নিলো।
তখনি নুরুল সাহেব ওদের সামনে আসলো।জাহানারা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বললো "-চলো এবার বাসায় ফিরে যাই।রাত হচ্ছে সবাই তো চলে গেলো।
সেখানে সামিয়ার বাবা মা ছিলেন তাদের কে বলে বিদায় নিতে হলো।
গেটের সামনে এসে দাঁড়িয়ে আছি।আব্বু আটো খুঁজতে গেলেন।মায়ের পাশে আমি হঠাৎ আমার পাশে কাউকে অনুভব করলাম তাকিয়ে দেখি তিনি দাঁড়িয়ে আছে। 
দৃষ্টি সামনে নুরুল সাহেব আটো নিয়ে আসছে।
জাহানারা বেগম উঠলেন অঁধরা উঠতে গেলো কিন্তু জাহানারা বেগম থামিয়ে দিলেন,"-তুই উঠছিস কেন?
-তো কি আমি বাসায় যাবো না?
'তুই জামাই বাবার সাথে আসবি। আমরা যাচ্ছি তোরা সাবধানে আসিস।বাবা তুমি সময় মতো রেখে যাইও।
ভদ্রলোক বেশ ভদ্রভাবে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিলো।
আটো নজরের বাহিরে চলে গেলো মিনিটের মধ্যেই।
এখন শুধু দুজন মানব মানবী দাঁড়িয়ে রইলো।
ইরফান অঁধরার কাছে গেলো।আলগোছে হাতটা ধরলো।
অনুভূতির শিহরণে কেঁপে উঠলো অঁধরা।প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে এই প্রথম কোনো পুরুষের হাত ধরার অনুভূতি। 
আলতোভাবে ধরা সেই হাতটা অঁধরার হৃদয়ের গভীর কোনো স্থানে কম্পন তোলে।তবু সে কিছু বলে না। চুপচাপ হেঁটে চলে পাশের গাড়ির দিকে।
গাড়িতে উঠে বসতেই দরজাটা বন্ধ করে দেয় ইরফান।
ড্রাইভ শুরু হয়। ভেতরে গাঢ় নীরবতা।
শুধু গাড়ির সামান্য শব্দ, আর মাঝেমধ্যে ইরফানের চোখের চাহনি।
অঁধরা জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে, অথচ কিছুই দেখছে না।
মনের ভেতর তোলপাড় চলছে, অনেক না বলা কথা, অনেক না জিজ্ঞাসা করা প্রশ্ন।
ইরফান প্রথম মুখ খোলে, কণ্ঠটা স্থির, কিন্তু কোমল—
— “কি প্রশ্ন আছে এখন বলতে পারল।সবকিছুর উত্তর দিবো।
অঁধরা একটু ঘাড় কাত করে তাকায়, তারপর চোখ সরিয়ে নেয়।
— “আপনি এসব কিভাবে সম্ভব হলো?আমি তো মনে করেছিলাম আপনি অন্য কাটো।
ইরফান ধীরে গাড়ি থামিয়ে দেয় রাস্তায়।অঁধরার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকে তার পর উত্তরে বলে,
—"যাকে কেউ মনে করে দূরে গেছিলে।ফেসবুকে দেওয়া ছবিতে যে মেয়েটা ছিলো সে আমার ছোট বোন।আমার জীবনে যেহেতু কেউ ছিলো না তাই প্রথম ভালোবাসা হিসেবে মা আর দ্বিতীয় আমার বোন হবে নিশ্চয়ই?
অঁধরা স্তব্ধ।আল্লাহ বোন কে সে কি সব মনে করেওএসব ভেবেই লজ্জা লাগলো।
সে মাথা নিচু করে ফেললো। 
ইরফান ঝঙ্কার তুলে হাঁসলো।গাড়ি আনার স্টাট দিলো।
ইরফান নীরব।সে কেবল হাতটা ধরে রাখে।
গাড়িটা আবার চলতে চলতে কিছুক্ষণের মধ্যেইগন্তব্য এসে যায়।গাড়ির ব্রেক কষতেই অঁধরা বাহিরে তাকালো।
হ্যাঁ তাদের বাসায় চলে এসেছে।ইরফান আগেই নেমে পড়েছে।অঁধরাকে নামার জন্য দরজা খুলে দিতে নেমে পড়লো।
এখন বাজে রাত এগারোটা।রাস্তায় কেউ নেই বললেই চলে।যেহেতু মেইন রাস্তা না তাই খুব একটা আলো নেই। 
চারদিক নিস্তব্ধ,দূরে কোথাও মিটিমিটি আলো ভেসে আসছে।হাল্কা আলোয় দেখা যাচ্ছে দুজন মানুষের মুখাবয়।বাসার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মুহূর্তটাও যেন নিঃশ্বাস থামিয়ে রাখা এক অনুভূতি।
"যাও।কালকে দেখা হবে।
ইরফানের কথা মেনে নেয়।আজ যেন মুখে কথা আসছে না।
অঁধরা যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়।আবার যেতে গিয়েও থমকে দাঁড়ায়।কিছু বলার আশায়।
ইরফান এখনো দাঁড়িয়ে তার স্নিগ্ধ চাহনি তার দিকেই।
— “কিছু বলবে?
অঁধরা ততক্ষণে ইরফানের কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছে। 
তার কন্ঠ কিছু বলতে যাচ্ছে কিন্তু ঠোঁট কাঁপছে হয়তো ভয়ে নয়তো লজ্জায়।
অঁধরা চোখ বন্ধ করে মুখ ফুঁটে একটা আবদার করে বসে,"-আপনাকে একবার জড়িয়ে ধরি?সবকিছু স্বপ্ন লাগছে। সবকিছু ভালো হচ্ছে এ যেন অবিশ্বাস্য। 
ইরফান আবারো হাঁসলো।দূরত্ব কমিয়ে হাত রাখলো দু গালে।অতঃপর শীতল কন্ঠে বললো, 
_" স্বপ্ন নয় মেয়ে এ হলো কঠিন বাস্তব। 
বাস্তবতা কঠিন তাই হয়তো স্বপ্ন মনে হচ্ছে। 
এই যে আমি এতো কাছাকাছি,হাতে হাত রেখে আছি।
এসব কি এখনো স্বপ্ন মনে হচ্ছে?যদি হয়ে থাকে তাহলে বাসায় গিয়ে ফ্রেশ হয়ে একটা ঘুম দাও। তার পর কয়েকদিন পর যখন বিয়ে করে বাসায় নিয়ে যাবো তখন বিশ্বাস কইরো।
অঁধরা বোধহয় লজ্জা পেল।মাথা নিচু করে আবার উঠালো।
__"এবার যাও।
অঁধরা এবার পা বাড়িয়ে এগোয়।আর পিছনে তাকায় না।সোজা বাড়ির ভেতর চলে যায় 
আর ইরফান সেখানে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকায়।
মনের আনন্দ হেঁসে নিঃশব্দে বলে ওঠে,
"এই হৃদয় অরণ্যে তুমি ছিলে, আছো, থাকবে।"
চলবে........................?
পরবর্তী গল্প পেতে ফলো দিন।
পেইজ লিংক:https://www.facebook.com/profile.php?id=61557427230773&mibextid=ZbWKwL

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১০ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন