ফন্ট সাইজ:
থিম:
হৃদয় অরণ্যে তুমি

১১তম পর্ব

লেখক: শ্যামলী রহমান

#হৃদয়_অরণ্যে_তুমি

লেখিকা:#শ্যামলী_রহমান
পর্ব: ১১
ভোরের আলো ফুটেছে অনেকক্ষণ আগেই।সকালের সোনালী বলো বালির উপর পড়ে চিকচিক করছে।অঁধরা এখনো ঘুমচ্ছে।কিন্তু সে ঘুম আর রইলো না।জানালার পর্দার ফাঁক গলে নরম আলো এসে পড়ছে অঁধরার মুখে।ঘুম ভাঙলেও চোখ খোলেনি এখনও। শরীরটা বিছানায় এলিয়ে, কিন্তু মনের ভেতর চলছে এক অদ্ভুত আলোড়ন।
হাতে আংটির স্পর্শ অনুভব করে হঠাৎ চোখ মেলে। কয়েক সেকেন্ড কোনো কিছু না বুঝেই তাকিয়ে থাকে আংটির দিকে।
তারপর এক চিলতে হাসি খেলে যায় ঠোঁটের কোণে।
"সবটা সত্যি?"
আঙুলের ছোঁয়ায় সেই সোনালী আংটির স্পর্শ যেন বেঁধে রাখে এক নতুন বন্ধনে, এক নতুন পরিচয়ে।
দরজায় হালকা শব্দ হলো। জাহানারা বেগম চা হাতে দাঁড়িয়ে।
-জেগে পড়েছিস? চা রাখলাম এইখানে।
"-মা!
অঁধরার কণ্ঠটা যেন ভিজে গলায় আটকে গেলো।জাহানারা বেগম দাঁড়িয়ে গেলেন।
-'কি হইছে?
-“মা আমি কি স্বপ্ন দেখতেছি?
মানুষ বোধ-হয় অসম্ভব কিছু পেয়ে গেলে এমনই হয়।অতি খুশি হয়ে ভাবতে থাকে সত্যি কি বাস্তবে পেলাম?
জাহানারা বেগম চুপচাপ মেয়ের কাছে গিয়ে বসলেন। মাথায় হাত রেখে বললেন,
'-যে স্বপ্ন তুই এত বছর ধরে কাঁপা কাঁপা হাতে জমিয়ে রেখেছিলি, আজ সেই স্বপ্নই তো বাস্তবে পরিণত হইছে মা।
"-তাহলে আমি সত্যিই তার হবো?
-তুই তো অনেক আগেই তার হইয়া গেছিলি,শুধু তোর জানার বাকি ছিলো।
অঁধরা চুপ। বুকের ভেতর গর্জে ওঠা আবেগ আনন্দ যেন কথায় ধরা দেয় না।
সকাল ১০টা।
অঁধরা যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছে। আজ সামিয়া আর রাসেল ভাইয়ার রিসিপশন আছে। সেখানে যাওয়ার জন্য তাড়াহুড়ো করে রেডি হওয়া।এর মধ্যে সামিয়া কয়েকবার ফোন দিয়েছে তাড়াতাড়ি যাওয়ার জন্য।লাভলু একটু আগে ফোন করেছিলো ও যাচ্ছে রাস্তায় আছে।
একা গেলি বলতেই লাভলুর উত্তর রেডি ছিলো"-মানুষের জামাই আছে তারা নিয়ে যাবে আমি মাঝে বসে হাড্ডি হতে চাই না। নতুন প্রেমে বাঁধা হলে অভিশাপ দিস যদি?তখন আর আমার জামাই হইতো না। তাছাড়া ইরফান স্যার কে একটু ভয় লাগে।উনার সামনে নিজেকে তোর সাথে সহজলভ্য মনে হয় না।স্যার দুলাভাই হিসাবে কেমন হবে জানি তাই আর গেলাম না।
অঁধরার রেডি হওয়া শেষ।বেডের উপর ফোন বাজছে। 
অঁধরা চোখে কাজল দেওয়া শেষ করে। দৌঁড়ে এলো বেডের কাছে।ফোন রিসিভ করতেই প্রিয় পুরুষের কোমন কন্ঠ শুনতে পেলো"-কোথাই তুমি? রেডি হওয়া শেষ হয়নি?আমি নিচে অপেক্ষা করছি। 
অঁধরা ধীরে শুধু বললো"-আসছি দুই মিনিট। 
কল রাখলো ইরফান গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। 
'কেডা বাবা তুমি?এহানে দাঁড়িয়ে কি করছো?এই বাড়ির মাইয়ার লগে চক্কর টক্কর চলে নাকি?আইজ কাইলকার মাইয়ারা যা বেহায়া ছোকরাদের বাড়ির সামনে ডেকে এনে ড্যাংড্যাং করে ঘুরে বেড়ায়, কিন্তু জাহানারার মাইয়ারা তো ভালো ভাবছিলাম। 
হঠাৎ অনাকাঙ্ক্ষিত এক মহিলার কথা শুনে ইরফান উনার দিকে তাকায়।কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে কত শত মন্তব্য করলেন।ততক্ষণে অঁধরা এসে পড়েছে। 
অঁধরাকে মহিলা আরো বললো'-কি গো মাইয়া পোলা লইয়া ঘুরতে যাইবা?বাপ মায়ের সম্মান খোয়াইয়া?মানুষ দেখলে কি কইবো?তোমারে ভালো ভাবছিলাম। 
ইরফান এতক্ষণ চুপচাপ মহিলার কথা শুনলেন।এসব মহিলা কেমন আচরণ আর কথা শুনে বুঝা যাচ্ছে।উনার কাজ মানুষের নামে বদনাম করা আর এর কথা ওকে লাগিয়ে বেড়ানো।বি লাইক পাশের বাড়ির কাকিমা।
সব জায়গায় এমন কিছু মহিলা থাকেই।
অঁধরা কি বলবে বুঝতে পারছে না। ইরফান সমস্ত কথা শুনে এবার মুখ খুললো,হেঁসে বললো"-আসসালামু ওয়া আলাইকুমুস কাকিমা।ভালো আছেন?
মহিলা ভড়কে গেলেন। এই ছেলে হাঁসছে কেন?আর এসব জিজ্ঞেস করছে কেন?
-হ্যাঁ ভালো ছিলাম কিন্তু চোখের সামনে এসব দেখে আর ভালো থাকা যাচ্ছে না। দিন দুনিয়া আর ঠিক নেই। 
"-কাকিমা দিন দুনিয়া ঠিকই আছে। ঠিক নেই আপনার মন মানসিকতা।আপনাদের মতো মহিলার কাজ হচ্ছে এসব করে বেড়ানো।আপনি কি বলছিলেন?ওহ হ্যাঁ আমি কে?তো শুনুন আমি কোনো ছোকরা নয় এই যে দাঁড়িয়ে আছে অঁধরাকে দেখিয়ে দিয়ে বলে"-ওর ভবিষ্যৎ জামাই।ও আপনার বাড়ির মেয়েদের থেকে শতগুনে ভালো আছে।আগে নিজের বাড়ির মেয়েদের ঠিক করবেন তার পর অন্য কে বলতে আসবেন।
মহিলার মুখ চোখ কালো হয়ে এসেছে।মনে মনে রাগে ফুলছে।চোখ মুখ বিষিয়ে হনহনিয়ে চলে যেতে নেয়।ইরফান পিছু ডেকে আবার বলে"-কাকিমা সময়গুলো ভালো কাজে লাগান। এসব করে সময় নষ্ট না করে কাকার যত্ন নেন,সংসারের কাজ করেন।
এসব করে আপনার ইমান নষ্ট ছাড়া আর কিছু হবে না। 
মহিলা আরো রেগে মেগে হনহনিয়ে চলে গেলো।
একটা প্রবাদ আছে, জোকের মুখে নুন পড়েছে, এমন অবস্থা।
মহিলা যেতেই অঁধরা হাঁসিতে ফেঁটে পড়লো।হাৃসে হাঁসতে দম আঁটকে যাওয়ার মতো অবস্থা। 
'-আ আপনি একদম জোকের মুখে নুন এটে দিয়েছেন।মহিলা কি যে বদমাইস। শুধু অন্যের মেয়ে সংসারের সমালোচনা করে বেড়ায় অথচ নিজের সংসার নেই। 
মেয়ে নিয়ে বাপের বাড়ি এসে পড়ে আছে। শুনেছি স্বামী অন্য জায়গায় বিয়ে করছে মহিলার ব্যবহার ভালো নয় বলে।
অঁধরার হাঁসি ঢ়েন থামছে না। 
ইরফান নিষ্পলক তাকিয়ে রইলো।অঁধরা হঠাৎ লক্ষ্য করলো ইরফান তার দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে।
অঁধরা লজ্জা পেলো। চোখের ইশারায় জানতে চাইলো কি?
"-তোমাকে সুন্দর লাগছে। 
'-কেমন সুন্দর? 
"-যে সুন্দরের ব্যখ্যা নেই,শুধু জানি সুন্দর লাগছে যাকে বলে নজরকাড়া সুন্দর। 
অঁধরা লজ্জায় মুখশ্রী লাল হলো।সাথে আনন্দ হলো।মেয়েরা প্রশংসা শুনলে একটু বেশি খুশি হয় তাই বলে মিথ্যা প্রশংসা করলেও বুঝতে পারে আর ফ্ল্যাটিং করে বুঝতে পারে।তবে যদি একান্ত মানুষ বলে তবে সেটা মিথ্যে হওয়ার চান্স নেই। 
সামিয়া আবার কল দিয়েছে দেরি হচ্ছে মনে হতেই। অঁধরা গাড়িতে গিয়ে বসলো।ইরফান গাড়ি স্টাট দিলো। 
এক ঘন্টার রাস্তা যেতে হবে।আব্বু আম্মু পরে আসবে যেহেতি রিসিপশন সন্ধ্যায় তাই এতো আগে তারা যাবে না। গাড়ি চলছে অঁধরা বাহিরে তাকিয়ে আছে। পাকা রাস্তা পেরিয়ে একটা কাঁচা রাস্তা পড়লো কি অসম্ভব সুন্দর সে রাস্তা। কাঁচা রাস্তার দুই ধারে সবুক গাছপালা তার পাশে ধান ক্ষেত। পুরো মাঠ জুড়ে সবুজের খেলা। 
'-এটা কোথাই?এদিক দিয়ে কি রাসেল ভাইয়াদের বাসায় যায়?
"-মেইন রোড দিয়ে যায় আবার এই কাঁচা রাস্তা দিয়ে যাওয়া যায় বাট দেরি হয়। এজন্য কেউ এদিক দিয়ে আসে না। জায়গাটা আমার খুব প্রিয় তাই আসলাম তোমার ভালো লাগবে হয়তো তাই।
অঁধরা আসলেই মুগ্ধ হলো।শহরের পাশে এমন গ্রাম আছে কখনো শুনেনি।ইরফান গাড়ি থামালো।অঁধরাকে নামতে বলে কিছু একটা আনতে রাস্তার ওপাশে গেলো।অঁধরা তাকিয়ে রইলো বুঝতে চেষ্টা করলো কি করতে গেলো?
কিছুক্ষণের মধ্যে ফিরে আসলো।অঁধরা তখন রাস্তার পাশে গাছের ডালে এক জোড়া শালিক পাখির দিকে তাকিয়ে ছিলো।কি সুন্দর এক সাথে বসে ডানা দিয়ে জড়িয়ে আছে।মানুষের চেয়ে তাদের ভালোবাসা আরো বেশি সুন্দর লাগছে।
হঠাৎ কানের কারো ছোঁয়া অনুভব করতেই চোখ ফিরে তাকালো।ইরফান তাকিয়ে হাঁসছে কানের পাশে গুঁজে দিয়েছে একটি ঘাসফুল।সম্ভবত রাস্তার পাশে জন্মায় তবে ফুলটা অনেক সুন্দর। সেই ফুলের নাম জানিনা আগে কখনো দেখিনি তার পর ভালো লাগলো।
ইরফান ফুল এবং অঁধরার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বললো,
-" ফুলের মতো স্নিগ্ধ তোমার হাঁসি,
বাতাসের মতো চঞ্চল,
প্রকৃতির মতো শান্ত তোমার মুখশ্রী। 
নিরবে হোক প্রেমের কথা,
হৃদয়ে জাগুক ভালোবাসার খাতা,
তুমি হও আমার জীবনের লাজুকলতা। 
অঁধরা হাঁসলো।তাতে ইরফান ও হাঁসলো ও আবার বললো,
"-এই ফুলটা একদম তোমার মতো, একদম সাধারণ তাকালেই চোখ আটকে যায়,
— “আপনি এত কাব্যিক কথা কবে থেকে বলতে শিখলেন?
ইরফান হেসে ফেলে।
— “ভালোবাসা মানুষকে কবি করে তোলে।তাছাড়া প্রিয়জনের কাছে সব সময় মানুষ ব্যক্তিগত কবি,গায়ক হতে পারে। হয়তো কবিতার ছন্দ মিলে না,গানের সুর ভালো হয় না তাই বলে কি শোনাবে না?
সবকিছুর আগে ভালোবাসাটাই বড়। ভালোবেসে কিছু করলে সেটা অন্যদের ভালোর উর্ধে হওয়া উচিত। 
ফোনের রিংটোন বাজলো।দুজনের আগ্রহ ফোনে।
হঠাৎ অঁধরা বললো,“চলেন। লাভলু ফোন দিয়েছে।না হয় সামিয়া আমাকে আবার ফোন দিয়ে বকা দেবে। আপনার প্রশংসার পালা আজকের মতো শেষ হোক।”
গাড়িতে উঠে বসল তারা। গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চললো। গাড়ির ভেতরে একটা স্বস্তির নীরবতা। মাঝেমধ্যে দু’জনের চোখাচোখি হচ্ছে, কিন্তু কেউ কিছু বলছে না। কিছু মুহূর্ত থাকে, যেগুলো শব্দ ছাড়াই পরিপূর্ণ হয়।
গন্তব্যের পৌঁছানোর কিছু সময় আগে ইরফানের ফোন বাজলো কিন্তু ধরলো না।পর পর দুইবার বেজে কেটে গেলো।গাড়িও এসে থামলো গন্তব্যে কিন্তু অঁধরা সিটের উপর রাখা ফোনটার দিকে তাকিয়ে আছে।কারণ ফোনের ওয়াল পেপারে তার ছবি।কলেজে থাকাকালিন কোন সময়ে তোলা ছবি তা মনে পড়ছে না তবে গায়ে কলেজ ড্রেস মুখে হাঁসি নিয়ে হাত রাখা ঠোঁটের উপর। 
ছবিটা বেশ সুন্দর কিন্তু তুলেছে কে?কখন?
এসব প্রশ্ন করার সময় নেই। সামনে লাভলু অঁধরার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। 
ইরফান গাড়ি থেকে নেমে অঁধরার কাছে এসে শুধু বলে,
"-হৃদয়ের গভীরে যার বাস,
ফোনের ওয়াল পেপারে থাকা এমন কোনো অবিশ্বাস্য ব্যাপার নয়।
তুমি যাও আমি আসছি।
অঁধরা শুনলো আর চুপচাপ লাভলুর কাছে গেলো।
ওর কাছে যেতেই শুরু করলো রাজ্যের প্রশ্ন। অবশ্য সব প্রশ্ন তার স্যারকে নিয়ে। 
চলবে..................?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন