#হৃদয়_অরণ্যে_তুমি
লেখিকা: #শ্যামলী_রহমান
অন্তিম পর্ব
আজকের সকালটা অন্যরকম।চারদিকে আনন্দ মূখর পরিবেশ। ভোরের আলো এখনও পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি, তবুও পুরো বাড়ির প্রতিটি কোণে আলো জ্বলে উঠেছে যেন আনন্দের প্রতিচ্ছবি হয়ে।
ঘড়িতে তখন সকাল আটটা বাজে।
জাহানারা বেগম আর নুরুল সাহেব অনেক আগেই জেগে গেছেন।বলা যায় ঘুমোননি। রান্নাঘরে তখন ধোঁয়া উঠছে গরম গরম খিচুড়ি আর মাংসের হাঁড়ি থেকে।
সকাল পেরিয়ে দুপুর হতেই মানুষের সমাগম আরো বেশি হলো।আত্নীয়স্বজন সব আসতে শুরু করেছে।আপ্যায়নের দায়িত্বে থাকা মানুষ গুলো সেদিক খেয়াল রাখছে।
বাড়ির মেয়েরা ব্যস্ত অঁধরার সাজসজ্জার প্রস্তুতিতে। শাড়ি,গয়না, ফুল সব এক জায়গায় সাজানো। একটা বিশেষ কৌটা জাহানারা বেগম নিজ হাতে রাখছেন,অঁধরার দাদির শেষ স্মৃতিচিহ্ন,দুটো হাতের বালা, যা তিনি অঁধরার বিয়েতে পরাতে চেয়েছিলেন।কিন্তু আফসোস আজকের দিন তিনি দেখে যেতে পারলেন না। আজ সেই চুড়ি অঁধরার হাতে উঠবে।
পার্লার থেকে দুটো মেয়ে এসেছে সাঁজাতে।শাড়ি পরা কমপ্লিট হয়েছে।এখন শুধু সাঁজ বাকি।চুল বাঁধছে একজন,আরেকজন মেকআপ করাচ্ছে।অঁধরা বার বার বলছে,"-,আপু বেশি গর্জিয়াস সাঁজ দিয়েন না। পরে দেখা যাবে সুন্দর দেখাতে গিয়ে আরো বাজে লাগবো।
-ঠিক আছে আপু।শাড়ির সাথে যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু দিবো।
ওদিকে,ইরফান রেডি হয়ে গেছে। গোল্ডেন কালার শেরওয়ানি পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে। সাহিল আর মাহিন ব্যস্ত তার পাশে।সাহিল পাঞ্জাবি পরছে মাহিনের বরের মাথার পাগড়িটা এনে ইরফানের মাথায় দিয়ে। হেঁসে বলে"-আজ তোকে তো আসলেই রাজপুত্র লাগছে!
ইরফান মুচকি হেসে বলল,
“আমার রাজ্য আজ শুরু হবে। রাজকন্যা আমার জন্য অপেক্ষা করছে।রাজরানী করে নিয়ে আসবো।সাম্রাজ্যের অধিকারী না হলেও হৃদয়ের ভেতরের সমস্ত ভালোবাসা এবং জায়গা জুড়ে শুধু তারই রাজত্ব থাকবে।
ঘড়ির কাঁটা তখন বিকেল তিনটে পেরিয়েছে।
অঁধরার বসার ঘরে সাজানো হয়েছে বিয়ের আসর।
বউয়ের সাজ শেষ হয়েছে কিছুক্ষাণ আগেই। লাল-সোনালি বেনারসি পরে মাথায় ওড়না টেনে বসে আছে অঁধরা। গাল, চোখ, ঠোঁট সব কিছুতে যেন লাজুকতা লেগে আছে।সব কিছু মিলিয়ে অসম্ভব সুন্দর লাগছে।
আশে পাশের মানুষের কথা ভেঁসে আসছে অঁধরার কানে।অনেকে বলছে"-বিয়ের সাজে মাশাল্লাহ কি সুন্দর লাগছে।মনে হয় বিয়ের সাজে এক ধরনের ম্যাজিক থাকে তাই সবাই কে বিয়ের সাজে একটু বেশিই সুন্দর লাগে।
লাভলু নিচে গেছে জামাই আপ্যায়নের জন্য যে থালা সাজানো হয় সেটাই করতে।সামিয়া বসে আছে অঁধরার পাশে।রাসেল ভাইয়া নিচে কাজে ব্যস্ত। তিনি খুব দায়িত্বশীল মানুষ।কীরকম আপন ভেবে সবকিছু করছে।ইরফানদের আত্নীয় হয়েও সেখানে না গিয়ে এখানে এসেছে।
সবাই যখন ব্যস্ত বিভিন্ন কাজে।তখনই হুল্লোড় শুরু হলো।জামাই এসেছে, জামাই এসেছে।বাসার নিচে গাড়ির শব্দ হলো।সে শব্দে অঁধরার অজানা অনুভূতি হলো।সবাই ছুটলো জামাই দেখতে,কেউ বা গেট ধরতে,আবার কেউ অন্য কাজে।লাভলু সেই কখন দৌঁড় দিয়েছে।আজ সে মহা ব্যস্ত। সামিয়াও যাওয়ার জন্য বেড থেকে উঠলো।অঁধরার কানে,কানে বললো"-চাইলে জানালার পর্দা সরিয়ে আড়াল থেকে দেখতে পারিস।ওই যে নাটক সিনেমায় দেখায় জামাই আছে আর বউ রুম থেকে নিচে তাকিয়ে দেখে আর হাঁসে।
"-,আমি কি তাদের মতো অধৈর্য কিংবা লজ্জাহীন নাকি?
'ওরেহ আমার লজ্জাবতী। আজ লজ্জার বাঁধ ভাঙবে তবে।
কথাগুলো বলে সামিয়া ছুটলো।অঁধরা একটু অসস্থি লাগে তবে কিছু বলে না।
জামাই নামানোর সমস্ত নিয়ম মেনে বাসার ভেতরে আনা হলো। বসতে দেওয়া হলো সাজিয়ে রাখা সোফায়।ইরফান চারদিকে এক নজর বুলালো।মাহিম মাথা নিচু করে দাঁত কেলিয়ে বললো"-সবুর কর ভাই।আসবে একটু পরই তখন দেখিস প্রাণ ভরিয়া।সাহিল ও পাশে দাঁড়িয়ে ছিলো।হঠাৎ কল আসাতে বাহির হয়ে যায় এক সাইডে কিন্তু তবুও কথা শোনা যাচ্ছে না, চারদিকে এতো আওয়াজ। তাই ফাঁকা জায়গা হিসাবে চোখ পড়লো প্যান্ডেলের অন্য এক সাইডে।সেদিকে কথা বলতে বলতে যাচ্ছিলো।হঠাৎ ধ্বাক্কা খেয়ে পড়ে গেলো মাটিতে।ফোনটা পড়লো ওর পাশে।ফোনের অবস্থা শেষ তা দেখে বুঝাই যাচ্ছে।
সাহিল রেগে বললো"-কোন কানার বাচ্চা রে?আমাকে ধ্বাক্কা দিয়ে ফেলে দিলো?আমার সাধের ফোনটার গ্লাচটা ভেঙে ফেললো।সাহিল ফোনটা নিয়ে হাত দিয়ে ধুলো গুলো পরিষ্কার করতে করতে বলছিলো।সামনে কে আছে তখনি দেখেছি।ফোনের অবস্থা দেখে রাগে উঠে দাঁড়ায়। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তির দিকে তাকিয়ে দেখে রাগে ফুঁসছে লাভলু।
"-এই আপনি আমাকে কি বললেন?কে কানা?আপনি কানা,আপনার নানা,দাদা চৌদ্দ গুষ্টিসহ কানা।
সাহিলের এমনিতে রাগ উঠে আছে তার মধ্যে লাভলুর কথাতে আরো রাগলো।
"-ভালো ভাবে কথা বলুন, নয়তো থাপ্পড় দিয়ে ছোট ছোট দাঁত গুলো ফেলে দিবো,তার পর সেগুলো দাতিকে খাওয়াবো,যাতে আপনার হাতির মতো দাঁত হয় আর আপনাকে কেউ যেন বিয়ে না করে।
লাভলু কোমরে হাত দিয়ে কিছুটা কাছে এসে আঙ্গুল তুলে বলে"-শকুনের দোয়ায় কোনোদিন গরু মরে না।আর কি বললেন?হাতির মতো দাঁত হলে কেউ বিয়ে না করলে তখন আপনার গলায় ঝুলে যাবো তার পর সেই দাঁত দিয়ে আপনাকে চিবিয়ে খাবো।
"-শাঁকচুন্নির মতো দেখতে,মানুষ চিবিয়ে খেতে পারবেন এতে কোনো সন্দেহ নেই।
লাভলু রেগে মারার জন্য কিছু খুঁজলো। সাহিল ওর মতলব বুঝতে পেরে দিলো দৌঁড়। মেয়ের মতলব সুবিধার না,বলা যায় না ইট ছুড়ে মাথা ফাটিয়ে দিতে ও পারে।
বিয়ে বাড়ির সমস্ত আয়োজন যে কারণে, সেই কাঙ্ক্ষিত সময়টা এসে গেলো।বিয়ে পড়ানো শেষ এখন শুধু কবুল বলা বাকি।
ইরফান কোনো দ্বিধা ছাড়াই বলে উঠে,
“কবুল,
“কবুল,
“কবুল।
অঁধরাকে বলা হলো"-বলো মা কবুল!
অঁধরা চুপ করে আছে।
ইরফানের দৃষ্টি অঁধরার দিকে।অঁধরার মুখে একরাশ বিস্ময় আর ঘোর লাগা অনুভূতির মাঝে কণ্ঠস্বর শুনা যায়,
“কবুল,কবুল,কবুল।
আলহামদুলিল্লাহ। চারদিকে একই শব্দ শোনা গেলো।
চারদিকে শুরু হলো মিষ্টি বিতরণ আর হাঁসির রোল পড়লো।এ হাঁসি আনন্দের,কারো জীবনের সুখী কামনার।
এতো আনন্দের মধ্যে অঁধরার চোখে পানি টলমল করছে।
এখন ছেড়ে যেতে হবে এই বাড়ি।নিজের শৈশবের সমস্ত স্মৃতি,বাবা,মায়ের ভালোবাসার বাঁধন ছিড়ে যেতে হবে।আবার আসবে তবে তখন সে অতিথি হয়ে,ক্ষণিকের তরে।
বিদায় বেলায় নুরুল সাহেব বুকের মধ্যে হওয়া কষ্ট, কান্না চাঁপা দিলেন। কোনো মতে মাথায় হাত রেখে দোয়া করলেন"-সুখি হও।
ইরফানের হাতে তুলে দিয়ে আবারো বললো"-ভালো রেখো আমার মেয়েকে।
এই কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেললেন তিনি।অঁধরা বাবার কান্না দেখে আরো ভেঙে পড়লো।বাবাকে জড়িয়ে কান্নার রেস বেশি হলো।পাশে জাহানারা বেগম শাড়ির আঁচলে চোখের পানি মুচছেন।মেয়েকে জড়িয়ে ধরে শান্তনা দিয়ে বিদায় দিলেন।গাড়ি চলে গেলো তাদের গন্তব্যে।একে একে বিদায় নিলো আত্মীয়স্বজনরাও।থেকে গেলো শুধু কয়েকজন।
মুহূর্তের আনন্দ পরিনত হলো কান্নায়,পুরো বাড়ি হইচই থেকে হলো নিস্তব্ধ।
গাড়ির জানালার পাশে বসে অঁধরা অপলক তাকিয়ে আছে বাইরে। ওর চোখে পানি শুকিয়ে গেছে,মন খারাপের রেস পাওয়া যাচ্ছে।
পাশের সিটে বসে থাকা ইরফান ধীরে হাতটা বাড়িয়ে অঁধরার হাতের ওপর রাখে।
'-মন খারাপ করো না।পৃথিবীর নিয়ম এটাই, বিয়ের পর মেয়েদের ঘর ছাড়তে হয়, বাসা বাঁধতে হয় অন্য ঠিকানায়।আমাদের একটা নীড় হবে যেখানে তুমি আমি থাকবো। আমাদের ও সংসার হবে।
অঁধরা মুখ ঘুরিয়ে ইরফানের চোখে তাকায়।
চোখের পানিটুকু মুছে নেয়।স্বাভাবিক হয়ে বসে থাকে গাড়িতে।
ঘড়ির কাঁটা তখন রাত ১২ ছুঁইছুঁই।
ঘরভর্তি সাদা ফুলের গন্ধ, হালকা নরম আলো, আর মেঝেতে লাল গোলাপের পাঁপড়ি ছড়িয়ে রাখা।
অঁধরা লাল বেনারসিতে বিছানার এক কোণে বসে আছে। মাথায় ওড়না টানা, চোখ নিচু, বুক ধুকপুক করছে।
শব্দহীন এক অনুভূতির মাঝেও যেন আশ্চর্য এক প্রশান্তি।
কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে ইরফান ঘরে প্রবেশ করে।দরজা বন্ধ করে দিয়ে তার পর অঁধরার দিকে পা বাড়ায় ধীরে ধীরে।
ইরফান নিঃশব্দে গিয়ে বসে পড়ে অঁধরার সামনে।
অঁধরার মাথায় রাখা ওড়নাটা দুহাতে উপরে তুলে।তাকিয়ে রয় অঁধরার পানে।
অঁধরার শ্বাস থেমে যায়। এতদিন যে মানুষটার চোখে চোখ রাখতেও ভয় পেত আজ সে তার জীবনসঙ্গী।
ইরফানের নেশাক্ত কন্ঠ,
"এই লাল বেনারসি,এই ফুলের ঘ্রাণ সব ফিকে হয়ে যায় তোমার পাশে বসলে।
অঁধরা একটু লাজ্জায় মাথা নিচু করে নেয়।
একটু সময় পরে সে ধীরে হাতে তুলে নেয় অঁধরার গাল।
তার চোখে একটানা তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ।
তারপর বলে,
“এই চোখদুটোতে আমি আমার পৃথিবী খুঁজে পাই।
ভালোবাসার শুরু অনেক আগেই ছিল,আজ থেকে তার নাম হলো,একটা ঘর হলো,এখন হবে সুখের সংসার।
মাথার ওড়না সরিয়ে অঁধরার কপালে ঠোঁট ছোঁয়ায়।
অঁধরার গা কেঁপে ওঠে এক অজানা আবেগে।
শরীরে, মনে, আত্মায় একটাই স্পর্শ বয়ে চলে।
ইরফান হাত বাড়িয়ে তার হাতটা নিজের হাতে নেয়।
– “চলো আজ থেকে একসাথে চলা শুরু হোক।
এই রাত তোমার আমার,শুধু আমাদের।”
কথা বাড়ে না আর।
ঘরের বাতাসে কেবল নিঃশ্বাসের শব্দ, মৃদু ফুলের সুবাস আর নরম মাটির মতো ভালোবাসা মিশে যেতে থাকে দু’জনার হৃদয়ে।
ভোর হতে শুরু করেছে।
আকাশে ফিকে আলো, চারপাশে পাখির ডাক আর বাতাসে নতুন জীবনের ঘ্রাণ।
অঁধরার চোখ খুলতে একটু সময় লাগে।
অচেনা ঘর, অচেনা বিছানা কিন্তু পাশের মানুষটা যে চিরচেনা।
ইরফান এক হাত দিয়ে অঁধরার কাঁধ জড়িয়ে রেখেছে।
ঘুমন্ত মুখটা এতটা শান্ত, যেন পৃথিবীর সব শান্তি এখানেই জমে আছে।
অঁধরা ধীরে উঠে বসে।এলোমেলো চুলগুলো বেঁধে নেয়। তার পর ওয়াশরুমে যায় ফ্রেশ হতে।কিছু সময় বাদে অঁধরা মাথায় টাওয়ার পেচিয়ে বেরিয়ে আসে।গায়ল জড়ানো থ্রিপিস। শাড়ি পরতে হবে কিন্তু একা পারবে না তাই আপাতত এটাই পরা।
অঁধরা বেরিয়ে দেখে ইরফান উঠে পড়েছে। দৃষ্টি তার দিকেই।
"-কি দেখছেন?
-" নববধূর নতুন অপরূপ সৌন্দর্য,যা আমাকে বিমোহিত করে রাখছে প্রতিক্ষণ।
অঁধরা তার কথায় কিছু না বলে টাওয়াল মেলতে যায় বেলকনিতে।
সবে ভোরের আলো ফুঁটছে। এই সময়টা দারুন সুন্দর।বাসার পাশটা অনেকটা ফাঁকা হওয়ার কারণে, বেলকুনি থেকে দেখা যাচ্ছে সূর্যদয়।অঁধরা সেদিকে তাকিয়ে আছে বহুক্ষন।পাশে কখন ইরফান এসে দাঁড়িয়েছে বুঝতে পারেনি।কিন্তু হঠাৎ তার কন্ঠ শুনে তাকায়,কথাগুলো এমন ছিলো,
"-আজকের মতো প্রতিটি দিন সুন্দর হোক,প্রতিটি সকাল হাস্যজ্বল হোক,রাতের পর ভোর হোক,পাখির কিঁচির মিঁচিরে ঘুম ভাঙ্গুক এক জোঁড়া কবুতরের।
সে কথায় কি মুগ্ধতা,ভালোবাসায় ভরা চাহনী,একসাথে থাকার প্রবল আকাঙ্ক্ষা হৃদয়ের ঘরে।
অঁধরা পিছন ফিরে ইরফানের বুকে মাথা রাখে।আলতোভাবে জড়িয়ে ধরে,বলে"-আপনার বুকের বা পাশে জায়গা হোক মৃত্যুর আগে পর্যন্ত।
ইরফান অঁধরাকে দু'হাতের শক্ত বাঁধনে বেঁধে, মুঁচকি হেঁসে বলে," আমার #হৃদয়_অরণ্যে_তুমি শুধু তুমি থাকবে প্রিয়তমা।
_____সমাপ্ত_____