#হৃদয়_অরণ্যে_তুমি
লেখিকা: #শ্যামলী_রহমান
পর্ব: ১২
সময়ের সাথে বদলে গেছে দিন।
শরতের শুভ্রতা এখন স্মৃতি হয়ে গেছে। তার জায়গা দখল করেছে হেমন্তের হাল্কা কুয়াশাভেজা ভোর। সকালের আলোটা আর আগের মতো উজ্জ্বল নয়, বরং একটু ঝাপসা, একটু মলিন তবে তার মাঝেও একধরনের শান্ত সৌন্দর্য রয়েছে।
আকাশে মেঘের খেলা কম, কিন্তু বাতাসে শীতের চিলেকোঠার হিমছোঁয়া।
ধানের গন্ধ মিশে যাচ্ছে হালকা কুয়াশায়। ঘরের পাশের কাঠগোলাপ গাছে দু-একটা পাতা ঝরে পড়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে, যেন প্রকৃতিও নতুন কিছুর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।
আর এই নতুন কিছুর নাম-বিয়ে।
আজ বাদে কাল ইরফান আর অঁধরার বিয়ে।
চারদিকে তারই তোরজোরের শেষ নেই। বাড়ির প্রতিটি কোণে উৎসবের রঙ লেগেছে।
গেটের সামনের উঠানে লাইটিং করা হচ্ছে, ছাদে গায়ে হলুদের জন্য জায়গা ঠিক করছে মেয়েরা, বাগানের এক পাশে বিশাল প্যান্ডেল করছে।জাহানারা বেগম কাজে ব্যস্ত। নুরুল সাহেব তার বোন জামাইয়ের সাথে কিছু লিস্ট করছে হয়তো খাবার ব্যবস্থার কিংবা অন্য কিছুর।
জাহানারা বেগম সকাল সকাল উঠেই মেয়ের জামা কাপড় গোছাচ্ছেন। বার বার প্যাক খুলে আবার দেখছেন, সব ঠিকঠাক আছে তো?
অঁধরা কেমন এক আবেগে বুঁদ হয়ে আছে।
সে এখনো পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছে না ইরফান, যার চোখে সে প্রথম স্বপ্ন দেখেছিল, যার সামনে দাঁড়াতে গিয়ে কাঁপত, যার একটা বাক্যে তার দিন কেটে যেত কিংবা মন খারাপ হতো সে মানুষটাই এখন তার হবু স্বামী।আজ বাদে কাল পুরোপুরি তার নিজের হয়ে যাবে।
সামিয়া আর লাভলু কালকে রাতেই এসেছে।ওরা দুজন মিলে অঁধরার পাশে বসে নানান কথা বলছে আর হাসাহাসি করছে।দুজনের লজ্জাজনক কথা শুনে অঁধরা চোখ পাকায়,'-আম্মু আছে চুপ কর।
ওরা দুজনে চুপ হলো সামিয়া তবুও ফিসফিস করে বললো"-বান্ধবী স্যার কতটা রোমান্টিক গল্প শুনাস।
"-,ছি এসব বলতে তোদের লজ্জা লাগছে না?উনি তোদের স্যার হন।
-আমাদের স্যার হয় আর তোর কি হয়?ও তুই বিয়ে করতে পারছিস আমরা শুনতে পারবো না?কি দিনকাল আসলো নিজে যেটা মানে না সে জ্ঞান অন্যদের দেয়।তাছাড়া আমি কি স্যার হিসাবে জানতে চেয়েছি?আমি তো দুলাভাই হিসাবে জানতে চাইছি।
"-তাহলে কত সাহস আছে দুলাভাই কে জিজ্ঞেস করিস।
সামিয়া মুখ বন্ধ হয়ে গেলো।দুলাভাই হওয়ার আগে স্যার।
উনাকে এসব কি সাধারণ কিছু বলার সাহস ও হয়না।
দুপুরে রোদে ঘেমে ছুটে আসলো একটি মেয়ে। হাফাতে হাফাতে ঢুকলো অঁধরার রুমে।অঁধরা বেডের উপর বসে ফোনে কথা বলছিলো।সামিয়া আর লাভলু নেই একটু আগে খেতে ডেকে নিয়ে গেলো জাহানারা বেগম।
'উফফ ভাবি!তোমার ব্লাউজ আনতে আমারআনার এই রোদ গরমে আসতে হলো।তোমার জামাই আমাকে নাজেহাল করিয়ে ছাড়লো।
অঁধরা ফোন রেখে সাউদা কে বসতে দিলো।
-আপু তুমি কষ্ট করতে গেলে কেন?ওটায় সমস্যা হতো না। সামান্য একটু ঢিলে হচ্ছিলো।
'তোমার জামাই শুনলে তো?তার বউয়ের সব পারফেক্ট হওয়া চাই।
অঁধরা হাঁসলো।আসলে হয়েছে কি গায়ে হলুদের জন্য শাড়ি ব্লাউজ গহনা সব ওই বাড়ি থেকে পাঠানো হয়েছে কালই।বিয়ের শাড়ি অঁধরা সহ কিনলেও গায়ে হলুদের শাড়ি ইরফান একা কিনেছে কিন্তু সমস্যা ব্লাউজের সাইজ ভুল শুনে এক নাম্বার বেশি বড় এনেছে। ইরফান সেটা শুনে এতো সিরিয়াসলি নিয়ে আবার পাঠাবে তা ভাবতে পারেনি অঁধরা। আর সাউদা হলো ইরফানের সেই বোন যাকে দেখে ভুল বুঝেছিলো।মেয়েটা ভীষণ মিষ্টি আর মিশুক।আগের কথা মনে হলে অঁধরার নিজেরই লজ্জা লাগে। সাউদা গুনে গুনে বয়সে এবং ক্লাসে দুবছরের বড়।
কিন্তু সম্পকে বড় অঁধরা তাই ওকে ভাবি ডাকে আর অঁধরা ডাকে আপু।
'ভাবি শোনো আমার না একটা প্ল্যান আছে ওটা বিয়ের পর বলবো।আজ আসি কালকে দেখা হবে এবং আমাদের বাড়ি নিয়ে যাবো।
মেয়েটা যেভাবে ছুটে এসেছিলো ঠিক সেভাবেই ছুটে গেলো।অঁধরাকে কিছু বলার সুযোগ দিলো না। বয়সে ওর বড় হলেও কেমন ছটফটে স্বভাবের বাচ্চা মেয়ে মতো।
দুপুর গড়িয়ে বিকেলের শেষ ভাগ একটু পরে সন্ধ্যা নামবে।ইরফান তার ঘরে বসে ফোনে মেসেজে অঁধরার সাথে কথা বলছে কিন্তু সে তো জানেনা ওটা অঁধরা নয় লাভলু আর সামিয়া শয়তানী করে অঁধরা কে না দিয়ে ওরা রিপ্লাই দিচ্ছে। লাভলুর রিপ্লাই দিচ্ছে আর হাঁসছে।অঁধরা চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে আছে,"-ফোনটা দে তাড়াতাড়ি।
'থাম পরে দিচ্ছি আগে একটু মজা নেই। সালিকা হয়ে মজা না করলে কারা করবে?
অঁধরা বুঝতে পারলো ওরা ফোন দিবে না।তাই আর চাইলো না ব্যস্ত হলো নিজের কাজে।শাড়ি পরা সাজগোছ সব শেষ হয়েছে কিছুক্ষণ আগেই।
ইরফান হঠাৎ কল দিলো। লাভলু সামিয়াকে ইশারায় বলছে'-এবার কি করবো?
-ধর।
'-আমি?যদি কিছু বলে?ভয় লাগছে।
-কিছু বলবে না। বিয়ের আগে আর দেখা নেই বলবি।
লাভলু কিছুটা ভয় নিয়ে কল ধরলো।ইরফান অঁধরার জায়গায় লাভলু কে দেখে কিছুটা অপ্রস্তুত হলো তার পর জিজ্ঞেস করলো "-অঁধরা কোথাই?
-মা মানে স্যার অঁধরা তো নিচে গেলো। কি একটা নিয়ৃ আছে আগে করতে হয়।
"-আসলে কল দিতে বলিও আর হ্যাঁ আমাকে ভয় পাওয়া,অপ্রস্তুত হওয়া কিংবা স্যার বলার দরকার নেই। স্যারের সম্পর্ক কলেজে থাকাকালীন ছিলো এখন নতুন সম্পর্কে নতুন সম্মোধনে ডাকবে।
লাভলু সাহস পেলো। এবার হেঁসে বললো"-সরি দুলাভাই মিথ্যে বলেছি।অঁধরা এখানে আছে কিন্তু বড়রা বলেছে বিয়ের আগে আর দেখা নেই।
"-ঠিক আছে রাখি তাহলে কাল দেখবো অপেক্ষা করি।
ইরফান সহজে মেনে নিলো এবং কল কাঁটলো এতে একটু অবাকই হলো।লাভলু তো মজা করেই বলেছিলো।
ইরফান ফোন রাখতেই ওর দুজন বন্ধু সাহিল আর মাহিন আসলো।সাহিল কাঁধে ধ্বাক্কা দিয়ে জানতে চাইলো"-ভাবির মুখ খানা দেখতে দিলো না কি কষ্ট রে মাহিন।দুজনে মজা নেওয়ার জন্য বলছে আর হাঁসছে।
ইরফান হেঁসে ফেলে।
তারপর আয়নার দিকে তাকায়। নিজের প্রতিচ্ছবিকে দেখে ওদের শুনিয়ে বলে ওঠে,
“আজ বাদে কাল সে আমার হবে।
কত যুগের অপেক্ষা শেষে, এই বেলা আসছে।
এই মেয়েটার হাসি, চোখের ভাষা, অভিমান সব কিছু আমার হবে।আমার দায়িত্ব, আমার ভালোবাসা।”
তাকে দেখতে তো যাবোই গায়ে হলুদ ও লাগাবো। শুধু রাতটা হতে দে।অনুষ্ঠান এদিকে শেষ হোক।
রাত নেমেছে ধীরে ধীরে। হেমন্তের শীতলতা যেন একটু করে ঢুকে পড়েছে বাতাসে। অঁধরার বাসার উঠানে রঙ-বেরঙের লাইট জ্বলজ্বল করছে, মাঝে মাঝে হালকা হাওয়ায় ঝিমিয়ে পড়ছে বাতিগুলো, আবার জ্বলে উঠছে উৎসবের আলোয়।
ঘরের ভেতরে চলছে মেয়েদের হুল্লোড়, হাসাহাসি, গান গাওয়া আর বিয়ের রেওয়াজে লেগে থাকা ব্যস্ততা।
জাহানারা বেগম এবং নুরুল সাহেব প্রথম হলুদ দিয়ে শুরু হয়েছিলো অনুষ্ঠান।বন্ধু-বান্ধব,আত্নীয়স্বজন,কাজিন সবাই আনন্দ মেতে উঠেছে।
এখন রাত বারোটা বেজে চল্লিশ মিনিট। অনুষ্ঠান প্রায় শেষের দিকে।
বাড়ির বড়রা হুকুম দিলেন হলুদের অনুষ্ঠান সমাপ্ত করতে।এবং সকলে ঘুমিয়ে যেতে সকালে তাড়াতাড়ি উঠতে হবে আবার।
ধীরে ধীরে ছাঁদ ফাঁকা হলো ঘুমোতে গেলো সকলে।
কিছু মানুষের সমাগম রইলো বাগানের ওখানে অন্যান্য কাজের জন্য।
রাত প্রায় দুটো বাজছে।বাড়ির পেছনের ছোট গেটটা ধীরে খুলে গেলো।হুডি পরা এক পুরুষ দাঁড়িয়ে এক হাতে ছোট একটা ব্যাগ নিয়ে ভিতরে ঢুকলো। সঙ্গে আরো দুজন একজন ধীর কন্ঠে বললো "-দোস্ত দেখিস বিয়ের আগের রাতে বউ কে হলুদ দিতে এসে শশুড় বাড়িতে চোর হিসাবে মাইর খেতে যেন না হয়।তোর না থাক আমাদের তো একটা মান সম্মান আছে।
ইরফান বিরক্ত হলো।
"-সালা চুপ থাক।এমনি রাগ উঠছে নিজের ব্যকিত্বে বাঁধছে শিক্ষক এমন অবুঝ প্রেমিকদের মতো করতে হচ্ছে। অবশ্য ভালোবাসা অনেক কিছু করাতে বাঁধ্য করতে।বউ তো আমারই লজ্জার কিছু নেই।
ইরফান দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে।তখনি কেউ আসছে মনে হলো।
-এই রাতে ঘুম বাদ দিয়ে লুকিয়ে কই আনছিস?আব্বু দেখতে পেলে বক....
সামনের ব্যক্তিকে দেখে অঁধরার কথা থেমে গেলো।সে কি সঠিক দেখছে?উনি এখানে কেন?
“ভাই, আমরা পাহারা দিচ্ছি। কিন্তু কেউ দেখে ফেললে বলবে, আপনি পাগল!
ইরফান হেসে ফেলে।
"-প্রেম মানুষ কে পাগল করে।
লাভলু সহ বাকি দুজন অন্য সাইডে গেলো।বাগানের পিছনের দিকে হওয়ার কেউ আসেনা সবাই ওইদিকে ব্যস্ত তবুও সাবধানের মার নেই।
মাহিন গেছে বাম দিকে ডানদিকে সাহিল ওর পাশে লাভলু দাঁড়িয়ে আছে।
এখানে এতো মশা। লাভলু পা নাড়াচ্ছে। সব রক্ত খেয়ে ফেলবে এমন অবস্থা। ফট করে কিছুর শব্দ হলো সাহিল চমকে তাকালো"-এই মেয়ে শব্দ করছো কেন?আমাদের ধরা খাইছে চোর ভেবে মাইর খাওয়াতে চাও নাকি?
'চোরই তো মাঝরাতে অন্যের বাড়িতে এসেছেন।
'-আজ রাত দেখে বেঁচে গেলেন। কালকে দিনে সব কথার জবাব দিবো।
—“চুপচাপ এভাবে একা দাঁড়িয়ে কী ভাবছো, হবু বউ?
অঁধরা ভড়কে পেছনে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো।
"- আপনি এখানে?এখন কেন?
-"-এসেছি হলুদ দিতে। নিজের হাতে দিতে চাইছিলাম। গোপনেই এসেছি। ভয় নেই, কেউ জানে না।
অঁধরা কিছু বলার আগেই সে ছোট ব্যাগটা থেকে একটা কাপড়ে মোড়ানো ছোট কৌটা বের করলো।খুলে একটুখানি হলুদ নিয়ে ধীরে ধীরে অঁধরার নিকট গেলো।এতোটা কাছাকাছি আসার কারনে নিশ্বাসের ভার পড়ছে অঁধরার মুখের উপর।ইরফান ডান হাতে হলুদ ছোঁয়ালো গালে এবং ডানপাশের কোমরে। অঁধরা তীব্র অনুভূতিতে চোখ বন্ধ করে নিলো।নিশ্বাস পড়ছে ঘনঘন,বুক ধুকপুক করছে।
অঁধরার হলুদ মিশ্রিত মুখশ্রীর দিকে স্থির হয়ে তাকিয়ে আছ।বন্ধ চোখের উপর ফুঁ দিতেই অঁধরা চোখ খুললো।
ইরফানের হাত কোমর থেকে দু গাল স্পর্শ করলো।
"-এই হলুদের ছোঁয়ায় আমার যতটুকু ভালোবাসা আছে,সব মিশে থাকুক।কাল থেকে তোমার প্রতিটি দিন, প্রতিটি সকাল আমার হয়ে উঠুক।ভালোবাসসর বিস্তার অনুভূতি তোমার অঙ্গে সঁপুক।
অঁধরা চুপচাপ অনুভূতি বিমোহিত। ইরফান পিছনে পা বাড়ালো যেতে।সাহিল আর মাহিন কে ডেকে চলে গেলো ঠিক যেভাবে এসেছিলো।লাভলু অঁধরার কাছে আসলো। তাড়া দিয়ে বললো"-চল তাড়াতাড়ি ঘুমতে হবে দুটো বিশ বাজে। কেউ দেখলে খবর আছে।
অঁধরা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ডান হাত রাখলো ইরফানের হলুদ দেওয়া গালে।হলুদটুকু তুলে ধরলো নাকের সামনে।
হলুদের গন্ধের সাথে লেগে আছে মানুষটার স্পর্শ অনুভূতি তা অনুভব করলো।
চলবে.....................?