ফন্ট সাইজ:
থিম:
মেঘবরণ প্রেম

২৯তম পর্ব

লেখক: আসফিয়া রহমান

#মেঘবরণ_প্রেম

পর্ব - ২৯

লেখা - আসফিয়া রহমান

অনুমতি ছাড়া কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ❌

"মেয়েটার জ্ঞান ফিরেছে, শুভ্র?"

আজিজ সাহেব এবং সোনালী বেগম অস্থির পায়ে ভেতরে ঢুকলেন। শুভ্র গম্ভীর মুখে মাথা নেড়ে না বোধক ইশারা করল, "প্রচন্ড জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে.."

জ্বরের কথা শুনে আঁতকে উঠলেন দুজনই, "সেকি! জ্বর আসবে কেন! টেম্পারেচার কত, মেপে দেখেছো?" চিন্তিত মুখে জিজ্ঞেস করলেন সোনালী বেগম।

"১০৪-এর ওপরে আম্মু।"

কথা বলতে বলতেই কলিংবেল বেজে উঠল। শুভ্র দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দিল। ডক্টর ভেতরে ঢুকেই শুভ্রর বিধ্বস্ত চেহারা দেখে থমকালেন কেমন, তবে পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে কথা না বাড়িয়ে সরাসরি এগিয়ে গেলেন শুভ্রর বেডরুমের দিকে। আজিজ সাহেব আর সোনালী বেগমও ঢুকলেন পিছু পিছু। শুভ্র দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে রইল পাথরের মূর্তির মতো। ওর চোখদুটো স্থির বিছানায় শায়িত ওই ছোট্ট অচেতন শরীরটার ওপর।

ডক্টর খুব মনোযোগ দিয়ে অনিন্দিতাকে চেকআপ করলেন। ওর গালের কালশিটে দাগ আর ঘাড়ের ক্ষতটা দেখে ডক্টরের কপালে ভাঁজ পড়ল। শুভ্র পাথরের মতো এক কোণে দাঁড়িয়ে দেখছিল সব। চেকআপ শেষ করে ডক্টর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শুভ্রর দিকে তাকালেন,

"শুভ্র, ওর ফিজিক্যাল ইনজুরি খুব বেশি সিরিয়াস না হলেও মেন্টাল শকটা প্রচণ্ড। এই হাই ফিভারটা আসলে বডির একটা ডিফেন্স মেকানিজম। ওর শরীর ট্রমা থেকে লক করে ফেলেছ নিজেকেে।"

শুভ্রর কণ্ঠস্বর বুজে এল, "এখন কী করব ডক্টর?"

"আমি একটা ইনজেকশন দিচ্ছি যাতে টেম্পারেচারটা নেমে যায়। তবে জ্ঞান ফিরলে ও খুব ভায়োলেন্ট রিঅ্যাক্ট করতে পারে বা অতিরিক্ত শান্ত হয়ে যেতে পারে। সময়টা খুব ক্রুশিয়াল। প্রচন্ড পরিমানে মেন্টাল সাপোর্ট দরকার ওর।"

ডক্টর ইনজেকশনটা পুশ করার পর আরও কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করলেন অনিন্দিতাকে। প্রেসক্রিপশনটা শুভ্রর হাতে ধরিয়ে দিয়ে যাওয়ার আগে ওর কাঁধে হাত রাখলেন,

"শুভ্র, ছেলে হিসেবে তুমি বেশ শক্ত, কিন্তু আজ তোমাকে একজন ধৈর্যশীল মানুষের পরিচয় দিতে হবে। মেয়েটা যখন চোখ মেলবে, ও হয়তো নিজেকে অপরাধী ভেবে নিজেকে গুটিয়ে নিতে চাইবে। ওর সেই ভুল ধারণা ভাঙানোর দায়িত্বটা কিন্তু তোমার।"

ডক্টর চলে যাওয়ার পর ঘরে একটা থমথমে নীরবতা নেমে এলো ঘরজুড়ে। সোনালী বেগম বিছানার একপাশে বসে অনিন্দিতার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিলেন। ওনার চোখ দিয়ে টপ টপ করে জল পড়ছে। আজিজ সাহেব জানালার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছেন, সম্ভবত নিজের চোখের জল আড়াল করার চেষ্টা করছেন। শুভ্র এখনো সেই দরজার চৌকাঠে একইভাবে দাঁড়িয়ে। ওর দৃষ্টি অনিন্দিতার ওপর থেকে সরছে না। সোনালী বেগম ধরা গলায় বললেন,

"শুভ্র, তুই একটু ফ্রেশ হয়ে আয় বাবা। তোর সারা গায়ে রক্ত লেগে আছে। অনিন্দিতা চোখ মেলে যদি তোকে এই অবস্থায় দেখে, ও আরও ভয় পাবে।"

শুভ্র নিজের পাঞ্জাবির দিকে তাকাল। রায়ানের নোংরা রক্ত এখন কালচে হয়ে শুকিয়ে গেছে সেখানে। ও কোনো কথা না বলে নিজের রুমের লাগোয়া ওয়াশরুমে ঢুকল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে ওর নিজেরই ঘেন্না হলো। শাওয়ার নিয়ে বাইরে বেরিয়ে দেখল শুভ্র সোনালী বেগম আর আজিজ সাহেব অনিন্দিতার মাথার দুপাশে বসে আছেন দুজন। ও এগিয়ে এলো মায়ের কাছে,

"আম্মু, তোমরা রুমে গিয়ে একটু রেস্ট নাও, আমি ওর কাছে আছি।"

সোনালী বেগম প্রথমে আপত্তি করতে চাইলেও শুভ্রর চোখের দিকে তাকিয়ে আর কিছু বলতে পারলেন না। অনিন্দিতার জ্বরতপ্ত কপালে একটা দীর্ঘ চুমু খেয়ে আজিজ সাহেবকে নিয়ে উনি বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে। বাবা-মা বেরিয়ে যাওয়ার পর শুভ্র রুমের লাইটটা আরও ডিম করে দিল। সারা ঘরে শুধু এসি-র মৃদু গুঞ্জন। ও অনিন্দিতার পাশে বিছানায় এসে বসল। রাত বাড়ছে। চারপাশ নিঝুম। ইনজেকশনের প্রভাবে জ্বরের তীব্রতা কিছুটা কমেছে, কিন্তু অস্থিরভাবে এপাশ-ওপাশ করছে মেয়েটা।

শুভ্র খুব কাছে সরে এসে পাশে শুয়ে বুকে টেনে নিল মেয়েটাকে। শুভ্রর প্রশস্ত বুকের উত্তাপটুকু পেতেই অনিন্দিতার অস্থিরতা যেন জাদুমন্ত্রের মতো কমে গেল এক নিমেষে। শুভ্র ওর ঘামে ভেজা চুলে আঙুল চালাতে চালাতে ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,

"আমাকে ক্ষমা করে দিও, মেঘফুল। আমি ওই দুঃসহ কঠিন মুহূর্তে তোমার কাছে থাকতে পারিনি.."

শুভ্রর শরীরের পরিচিত ঘ্রাণটা অবচেতনে গিয়ে পৌঁছাল অনিন্দিতার স্নায়ুতন্ত্রে। মেয়েটা ঘুমের ঘোরেই আরও একটু সেঁধিয়ে গেল শুভ্রর বুকের ভেতর। শুভ্রর হাতের আঙুলগুলো যখন অনিন্দিতার কপালে লেপ্টে থাকা চুলগুলো সরিয়ে দিচ্ছিল, তখন ওর মনে হচ্ছিল-- এই মেয়েটাকে ও সারাজীবন শাসন আর সোহাগ দিয়ে আগলে রাখতে চেয়েছিল, তার জীবনের ভয়াবহ মুহূর্তটায় শুভ্র পাশে থাকতে পারল না।

ভোর হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে অনিন্দিতার জ্বরটা ঘাম দিয়ে ছেড়ে দিল। শরীরের সেই আগুনের মতো উত্তাপ এখন স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। শুভ্র অনুভব করল, ওর গেঞ্জির বুকের দিকটা ভিজে উঠছে। অনিন্দিতা চোখ মেলেনি ঠিকই, কিন্তু ওর বন্ধ চোখের কোণ দিয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে। শুভ্র অস্থির কন্ঠে ডাকলো অনিন্দিতাকে,

"নন্দিতা, সোনা.. কী হয়েছে, কাঁদছ কেন তুমি..? দেখো, চোখ মেলে দেখো, তুমি এখানে, তোমার শুভ্রর কাছে আছো... ইউ আর কমপ্লিটলি সেফ, মেঘফুল... দেখো..?"

শুভ্রর ডাকে অনিন্দিতার চোখের পাতা দুটো কেঁপে উঠল। খুব ধীরে ধীরে, যেন এক যুগ পর চোখের ভারী পর্দা সরাল মেয়েটা। প্রথম কয়েক সেকেন্ড ও ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল সিলিংয়ের দিকে। কেমন যেন শূন্য, আতঙ্কিত দৃষ্টি। চারপাশটা বড্ড অচেনা লাগছে ওর কাছে। ভোরের আবছা অন্ধকার আর ল্যাম্পশেডের ম্লান নীল আলোয় সামনে ঝাপসা কোনো অবয়ব দৃশ্যমান হতেই প্রবলভাবে কেঁপে উঠল ওর সারা শরীর। কয়েক সেকেন্ডের জন্য ওর মস্তিষ্কে প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠল সেই অন্ধকার করিডোর আর রায়ানের পৈশাচিক অট্টহাসি।

শুভ্র ওর অস্থিরতা টের পেয়ে কপালে একটা চুমু খেয়ে ওকে আরও একটু নিবিড়ভাবে নিজের দিকে টানতে চাইল,

"ঘুম ভেঙেছে তোমার, নন্দি..."

কথাটা শেষ করতে পারল না শুভ্র। তার আগেই অনিন্দিতা এক ঝটকায় ছিটকে সরে গেল শুভ্রর বুকের ওপর থেকে। শরীরের ওপর একটা হাতের অস্তিত্ব অনুভব করতেই গত রাতের পৈশাচিক স্মৃতিগুলো তীরের মতো বিঁধেছে ওর মগজে। ওর মনে হয়েছে, এখনো কেউ জোর করে চেপে ধরে আছে ওকে। অনিন্দিতা ছিটকে গিয়ে বিছানার একদম কোণায় গিয়ে কুঁকড়ে বসল। ওর চোখ দুটো বিস্ফোরিত, সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে জমাটবদ্ধ আতঙ্কে। ও দুহাতে নিজের শরীরটাকে আড়াল করার চেষ্টা করতে করতে চিৎকার করে উঠল,

"না! না! আমাকে ছোঁবেন না বলছি! দূরে যান!"

অনিন্দিতার গলা চিরে আসা সেই আর্তনাদে খানখান হয়ে গেল ভোরের নিস্তব্ধতা। শুভ্র হকচকিয়ে গিয়ে ওকে সামলাতে চাইল,

"অনিন্দিতা, শান্ত হও! আমি শুভ্র! দেখো আমার দিকে, আমি তোমার শুভ্র..."

অনিন্দিতা কোনো কথা কানে নিচ্ছে না। ও বিছানার এক কোণে গুটিসুটি মেরে বসে নিজের দুই হাত দিয়ে শরীরটা আড়াল করার চেষ্টা করছে। ওর দৃষ্টির ওই শূন্যতা আর আতঙ্ক যেন শুভ্রর কলিজা ছিঁড়ে ফেলছে। অনিন্দিতা কাঁপতে কাঁপতে নিজের গায়ের টি-শার্টটার দিকে তাকাল। শুভ্রর বিশাল টি-শার্টটা নিজের গায়ে দেখে আরও বেশি প্যানিক করতে শুরু করল মেয়েটা।

"আমার শাড়ি কোথায়? আপনি কে? কেন আমাকে আটকে রেখেছেন এখানে? আমাকে যেতে দিন, প্লিজ আমাকে যেতে দিন!"

অনিন্দিতা ডুকরে কেঁদে উঠল। ওর মনে হচ্ছে ও এখনো সেই নরককুন্ডে আটকে আছে। শুভ্র দ্রুতগতিতে বিছানা থেকে নেমে দুই হাত তুলে আত্মসমর্পণ করার ভঙ্গিতে দাঁড়ালো,

"মেঘফুল, আমি তোমাকে ছোঁব না, প্রমিজ। তুমি জাস্ট একবার ভালো করে তাকাও আমার দিকে। এটা আমার বাসা, তুমি কাল রাতে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলে তাই তোমাকে এখানে নিয়ে এসেছি। আমি তোমার কোনো ক্ষতি করব না, ট্রাস্ট মি।"

অনিন্দিতা কাঁপছে। কাঁপতে কাঁপতে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে শুভ্রর দিকে। রায়ানের নোংরা স্পর্শ ওর স্নায়ুকে এতটাই বিষাক্ত করে দিয়েছে যে প্রিয় মানুষকেও শত্রু ভাবতে শুরু করেছে মেয়েটা। ও হেঁচকি তুলে কাঁদতে কাঁদতে মাথা নাড়ছে,

"ম-মিথ্যে ক-থা! মি-থ্যে.. ক-থা! সবা-ই খারাপ! আমাকে ধরবেন না... আমাকে নোংরা করে দেবেন না, প্লিজ। শুভ্র.. শুভ্র ঘৃণা করবে আমাকে... আমাকে.. আমাকে আর কখনো ভালোবাসবে না... শুভ্র... আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাও, শুভ্র..."

শুভ্রর হার্টবিট যেন থেমে গেল এক মুহূর্তের জন্য। অনিন্দিতা ওর সামনেই বসে আছে, অথচ ওকে চিনতে পারছে না মেয়েটা! ট্রমা ওকে কতটা গভীরে নিয়ে গেছে ভেবেই শুভ্রর বুকের বাঁ পাশটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠলো। ও স্থির গলায়, খুব নরম স্বরে আবার ডাকল,

"আমার চোখের দিকে তাকাও, অনিন্দিতা... দেখো, তোমার শুভ্র তোমার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে, সে একটুও ঘৃণা করে না তোমাকে..."

শুভ্র এক পা এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেই অনিন্দিতা আরও বেশি সিঁটিয়ে গেল বিছানার কোণায়,

"ন-না.. ক-কাছে আস-বেন না... দ-দূরে যা-যান..."

বলতে বলতেই ওর দৃষ্টি স্থির হলো দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা শুভ্রর মা-বাবার ওপর। সাথে সাথেই ওর সমস্ত শরীর এক ঝটকায় শক্ত হয়ে গেল পাথরের মতো। অনিন্দিতার হঠাৎ পাথর হয়ে যাওয়া দৃষ্টি দেখে শুভ্রর পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল। সোনালী বেগম আর আজিজ সাহেব শব্দ শুনে দৌড়ে এসেছিলেন, দরজায় দাঁড়িয়ে তাঁরাও বাকরুদ্ধ। অনিন্দিতা যেভাবে ভয়ে কুঁকড়ে আছে, তা দেখে সোনালী বেগম আর থাকতে পারলেন না। তিনি অস্থির পায়ে অনিন্দিতার দিকে এগিয়ে যেতে চাইলে শুভ্র হাত বাড়িয়ে থামিয়ে দিল মাকে।

"আম্মু, প্লিজ! এখন না। ও প্যানিক করছে। কাউকেই সহ্য করতে পারছে না। "আম্মু, আব্বু.. তোমরা ঘরে যাও প্লিজ..!"

শুভ্র আবার অনিন্দিতার দিকে ফিরল। ও অনুভব করতে পারছে, অনিন্দিতার মস্তিষ্কে এখন এক প্রচণ্ড লড়াই চলছে। একদিকে ওর ওপর হয়ে যাওয়া পাশবিক অত্যাচারের স্মৃতি, আর অন্যদিকে শুভ্রর চিরচেনা কণ্ঠস্বর। ও কাঁপতে কাঁপতে নিজের দুহাতে মুখ ঢেকে ডুকরে কেঁদে উঠল।

"শুভ্র... শুভ্র আমাকে দেখলে ঘৃণা করবে... আমি অপবিত্র হয়ে গেছি... আমার শাড়ি নেই... আমাকে নোংরাভাবে ছুঁয়েছে ওই লোকটা.. শুভ্র আমাকে আর ভালোবাসবে না..."

অনিন্দিতা বিড়বিড় করে কাঁদছে আর নিজের শরীরটাকে ছোট করার চেষ্টা করছে। শুভ্রর বুকের ভেতরটা যেন কেউ ধারালো ছুরি দিয়ে ফালি ফালি করে কাটছে। ও আর নিজেকে আটকে রাখতে পারল না। অনিন্দিতা ওকে চিনতে না পেরে পর ভাবছে-- এটা সহ্য করার ক্ষমতা ওর নেই। ও খুব ধীরে, খুব সাবধানে আবার বিছানায় বসল। অনিন্দিতা আবারও পিছিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু এবার শুভ্র আর সুযোগ দিল না। ও এক ঝটকায় অনিন্দিতার দুই হাত শক্ত করে নিজের হাতের মুঠোয় পুরে নিল।

"অনিন্দিতা, তাকাও আমার দিকে! তাকাও বলছি! কে বলেছে আমি তোমাকে ঘৃণা করি? কে বলেছে আমি তোমাকে আর ভালোবাসব না? কার সাধ্য আছে তোমাকে অপবিত্র বলার? তুমি অপবিত্র নও। ওই জানোয়ারটা তোমাকে অপবিত্র করতে পারেনি, তার আগেই আমি আগলে নিয়েছি তোমাকে। তুমি আমার ছিলে, আছো এবং সারাজীবন থাকবে।"

অনিন্দিতা একটু স্থির হলো যেন। ঝাপসা চোখে তাকাল শুভ্রর রক্তিম চোখজোড়ার দিকে। তীব্র অধিকারবোধ আর চোখের কোণের নোনা জলটুকু দেখে অনিন্দিতার স্মৃতিগুলো ধীরে ধীরে ফিরতে শুরু করল বোধহয়।

"শু-শুভ্র..?"

খুব অস্ফুট স্বরে জিজ্ঞেস করল মেয়েটা। গলার স্বরটা একদম ভেঙে এসেছে ওর। শুভ্রর ঠোঁটে এক চিলতে বিষণ্ণ হাসি ফুটল।

"হ্যাঁ, মেঘফুল। আমি তোমার শুভ্র।"

অনিন্দিতা হঠাৎ করে শক্তি খাটিয়ে নিজের হাত দুটো ছাড়িয়ে নিল শুভ্রর হাতের মুঠো থেকে, "আমাকে.. আমাকে ধরেছেন কেন, শুভ্র? ছেড়ে দিন আমাকে.. আমি নোংরা হয়ে গেছি। ওই লোকটা আমার... আমার সব..."

অনিন্দিতার কথাগুলো শেষ হওয়ার আগেই শুভ্র এক ঝটকায় ওকে নিজের বুকের ভেতর টেনে নিল। অনিন্দিতা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করল, ছোট ছোট হাতদুটো দিয়ে শুভ্রর বুকে ধাক্কা দিতে চাইল, কিন্তু শুভ্রর ইস্পাতকঠিন আলিঙ্গনের সামনে ও বড্ড অসহায়। শুভ্র ওকে এমনভাবে নিজের সাথে পিষে ধরেছে যেন শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে অনিন্দিতার মনের ভেতর জমে থাকা কালশিটে দাগগুলো মুছে দেবে ও।

"চুপ! একদম চুপ!" শুভ্রর কণ্ঠস্বর ভারী হয়ে এলেও তাতে যেন এক অমোঘ আদেশ, "ওসব শব্দ আর একবারও মুখে আনবে না। কোন পিশাচ তোমাকে কী বলেছে বা কী করেছে, তাতে কিচ্ছু যায় আসে না। শুভ্রর মেঘফুল শুধু শুভ্ররই আছে।"

অনেকক্ষণ ছটফট করার পরেও যখন শুভ্রর হাতের বাঁধন বিন্দুমাত্র ঢিলে হলো না, অনিন্দিতার নিস্তেজ দেহটা তখন এক অদ্ভুত শীতলতায় স্থির হয়ে এলিয়ে পড়লো শুভ্রর বুকের ভেতর। ওর ছটফটানি থেমে গেছে, কিন্তু এই নিস্তব্ধতা যেন আগের অস্থিরতার চেয়েও বেশি ভীতিপ্রদ। ও কাঠের পুতুলের মতো স্থির হয়ে রইল শুভ্রর আলিঙ্গনে। শুভ্রর প্রশস্ত বুকের ধুকপুকানি ও অনুভব করতে পারছে, কিন্তু ওর নিজের ভেতরটা তখন যেন এক জনশূন্য শ্মশান।অনিন্দিতা শূন্য দৃষ্টিতে শুভ্রর কাঁধের ওপর দিয়ে ঘরের দেয়ালের দিকে তাকিয়ে আছে।

"আপনি কেন আমায় ছুঁয়েছেন, শুভ্র? কেন এখনো আগের মতো এমন আদুরে ব্যবহার করছেন আমার সাথে?" অনিন্দিতার কণ্ঠস্বরে একরাশ ক্লান্তি, "আমি তো আর আগের মতো নেই, শুভ্র। আপনার ঘৃণা লাগছে না?

অনিন্দিতার নিস্প্রাণ প্রশ্নগুলো শুভ্রর কানে তপ্ত সীসার মতো লাগল। ও উত্তর দেওয়ার আগেই অনিন্দিতা আবার বলতে শুরু করল,

"আমার গলার কাছে, আমার কাঁধে... ওই লোকটার নোংরা দাঁতের চিহ্ন আছে, শুভ্র। আমার বুকে, পেটে ওই চটচটে কোল্ড ড্রিংকসের সাথে ওই লোকটার হাতের ছোঁয়া মিশে আছে। আপনি কেন আমাকে ছুড়ে ফেলে দিচ্ছেন না?"

বলতে বলতেই অনিন্দিতা খানিকটা সরে এসে সরাসরি শুভ্রর চোখের দিকে তাকালো। শুভ্র ওর মুখটা আলতো করে নিজের দুহাতের তালুতে তুলে ধরল। অনিন্দিতার গালের পাঁচ আঙুলের কালশিটে দাগটা শুভ্রর চোখের সামনে। ও নিজের বুড়ো আঙুল দিয়ে খুব সাবধানে সেই দাগটা স্পর্শ করল। অনিন্দিতা চোখ বুজে ফেলল। যন্ত্রণায় নয়, নিজের প্রতি তীব্র ঘৃণায়।

"ঘৃণা?" শুভ্রর কণ্ঠস্বরটা কেঁপে উঠল সহসা, "ঘৃণা কেন লাগবে আমার, মেঘফুল? কার ওপর লাগবে? তোমার ওপর? যে মেয়েটা একা ওই পিশাচটার সাথে লড়াই করেছে নিজের সম্মান বাঁচাতে? ঘৃণা তো আমার নিজের ওপর লাগছে, আমি সেই মুহূর্তে তোমার ডাকে সাড়া দিতে পারিনি বলে। কিন্তু তোমাকে? তোমাকে ঘৃণা করার কথা ভাবা মানে আমার নিজের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা, নন্দিতা।"

অনিন্দিতা একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল শুভ্রর দিকে। ওর ঠোঁট দুটো কাঁপছে। শুভ্র আবার বলতে শুরু করল,

"তুমি বললে তুমি আগের মতো নেই? ঠিকই তো বলেছ। তুমি এখন আগের চেয়েও অনেক বেশি আমার। কাল রাতের ঘটনার পর আমি উপলব্ধি করেছি, তোমাকে ছাড়া আমার পৃথিবীটা ঠিক কতটা অন্ধকার। তুমি কি মনে করো আমার ভালোবাসা এতই ঠুনকো যে একটা পশুর লালসা সেটাকে ধুলোয় মিশিয়ে দেবে? নন্দিতা, তুমি বিন্দুমাত্র নোংরা নও। যদি কেউ নোংরা হয়ে থাকে, তবে সেটা ওই জানোয়ারটা। তুমি আমার কাছে কালও যা ছিলে, আজও তাই আছো। ফুলের চেয়েও বেশি পবিত্র, সুন্দর!"

শুভ্রর বুকের ধুকপুকানিটা স্পষ্ট অনুভব করছে অনিন্দিতা। এই শব্দটা এত চেনা, এত নিরাপদ অথচ ওর মনের এক কোণে সেই কর্কশ হাসির প্রতিধ্বনি বাজছে এখনো।

"আমার মনে হচ্ছে ওই নোংরা হাতগুলো এখনো আমার শরীরে..."

নিচু স্বরে বিরবির করতে করতেই হঠাৎ নিজের গলায় হাত দিয়ে গলা টিপে ধরলো অনিন্দিতা। উন্মাদের মতো নিজের শরীরের কাল্পনিক ছোঁয়াগুলো মুছে ফেলতে চাইল ঘষতে ঘষতে। শুভ্র আঁতকে উঠে অনিন্দিতার নিজের গলায় চেপে ধরা হাতদুটো ঝটকা দিয়ে সরিয়ে দিল,

"অনিন্দিতা! কী করছো তুমি? স্টপ ইট! লুক অ্যাট মি!"

শুভ্র দুহাতে অনিন্দিতার কাঁধ ধরে ওকে সামান্য ঝাঁকানি দিল, যেন ওকে ওই দুঃস্বপ্ন থেকে টেনে বের করে আনতে চায়। নখগুলো গলার নরম চামড়ায় বসে গিয়ে সরু লাল দাগ তৈরি করেছে। শুভ্রর বুকটা ফেটে যাচ্ছে মেয়েটার অবস্থা দেখে। ও অনিন্দিতার দুই কব্জি শক্ত করে ধরে ওকে একদম নিজের মুখের কাছে টেনে আনল। তারপর খুব আলতো করে অনিন্দিতার ঘাড়ের সেই কালশিটে দাগটার ওপর ঠোঁট ছোঁয়াল। অনিন্দিতা শিউরে উঠে পিছিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু শুভ্র শক্ত করে জাপটে ধরল ওকে।

"তোমার শরীরের প্রতিটি ক্ষত আমি আমার ভালোবাসা দিয়ে ধুয়ে দেব, অনিন্দিতা। গত রাতের ওই পৈশাচিক স্মৃতিগুলোকে আমি আমাদের আগামীর সহস্র সোহাগ দিয়ে চাপা দিয়ে দেব। তোমার শরীরের প্রতিটি ইঞ্চি আমার সোহাগ দিয়ে এমনভাবে ভরিয়ে দেব যে, ওই পিশাচটার স্মৃতি তোমার মগজে ঢোকার জায়গাটুকুও পাবে না। তুমি নিজেকে ঘৃণা করলে আমি তোমাকে দ্বিগুণ ভালোবাসব। তুমি নিজেকে সরিয়ে নিলে আমি তোমাকে তিনগুণ বেশি জাপটে ধরব। পালিয়ে তুমি যাবে কোথায়?"

অনিন্দিতা আর পারল না। এতক্ষণ যে বাঁধ ও বহু কষ্টে আগলে রেখেছিল নিজের ভেতর, তা এবার ভেঙে পড়ল হুড়মুড় করে। ও ডুকরে কেঁদে উঠে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরল শুভ্রকে। কান্নার তোড়ে সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে মেয়েটার।

"শুভ্র... আমি মরে গেলাম না কেন বলুন তো..? আপনি কেন আমাকে নিয়ে এলেন ওখান থেকে..? আমার যে খুব ঘেন্না হচ্ছে নিজের ওপর... আমি.. আমি কলঙ্কিত হয়ে গেছি, শুভ্র। সবাই.. সবাই জেনে গেছে আমি কলঙ্কিত হয়ে গেছি। আন্টি... আঙ্কেল... ওনারা তো আমাকে আর নিজের বাড়ির বউ করতে চাইবে না.. আমার কী হবে, শুভ্র? আমি আপনাকে ছাড়া কেমন করে থাকবো..?"

অনিন্দিতার এই অসহায় আর্তনাদ শুভ্রর বুকটাকে যেন ভেঙে দিল সহস্র টুকরোয়। ও আরও নিবিড়ভাবে অনিন্দিতাকে নিজের বুকের পাঁজরে পিষে ধরল। ওর কান্নার তোড়ে শুভ্রর গেঞ্জির কাঁধের দিকটা ভিজে একাকার হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু শুভ্রর সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। ও পরম মমতায় অনিন্দিতার পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল।

"কলঙ্কিত? কে বলেছে তুমি কলঙ্কিত?" শুভ্রর কণ্ঠস্বর এখন গম্ভীর, "ওই নোংরা হাতদুটো তোমাকে ছুঁতে পারেনি মেঘফুল। তার আগেই আমি ছিনিয়ে এনেছি তোমাকে... আর আব্বু-আম্মুর কথা বলছো? ওরা কাল রাতে তোমার শিয়ারে বসে কেঁদেছে। ওই দুজন মানুষ অলরেডি তোমাকে এই বাড়ির বউ নয়, বাড়ির মেয়ে হিসেবে মেনে নিয়েছে।"

শুভ্র অনিন্দিতার চুলের ভাঁজে একটা দীর্ঘ চুমু খেয়ে ওর হাতদুটো ঠোঁটে চেপে ধরলো। দীর্ঘক্ষণ চুমু খেল ওর আঙুলের ডগায়, হাতের তালুতে। হাতের তালুতে ঠোঁট ছোঁয়াতে ছোঁয়াতে শুভ্র অনুভব করলো মেয়েটার শরীর গরম হয়ে আসছে আবার। শুভ্রর বুকের ভেতরটা অজানা শঙ্কায় কেঁপে উঠল। দীর্ঘক্ষণের মানসিক ধকল আর কান্নার চোটে জ্বরের তীব্র আঁচটা যেন আগ্নেয়গিরির লাভার মতো আবার ফিরে আসছে অনিন্দিতার শরীরে। একটু আগে যে কান্নার বেগ ছিল, তা এখন নিস্তেজ গোঙানিতে রূপ নিয়েছে। অনিন্দিতার শরীরটা শুভ্রর হাতের ওপর ভারী হয়ে পড়ছে ক্রমশ। শুভ্র অনিন্দিতার গালে হাত ছোঁয়ালো,

"নন্দিতা, তোমার শরীরটা আবার গরম হচ্ছে কেন, ফুল? আবার কি শরীরটা খারাপ করছে? আর কেঁদো না, প্লিজ... শান্ত হও!"

To be continued...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন