#মেঘবরণ_প্রেম
পর্ব - ৩০ [এলার্ট]
লেখা - আসফিয়া রহমান
অনুমতি ছাড়া কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ❌
"নন্দিতা, তোমার শরীরটা আবার গরম হচ্ছে কেন, ফুল? আবার কি শরীরটা খারাপ করছে? আর কেঁদো না, প্লিজ... শান্ত হও!"
অনিন্দিতা উত্তর না দিয়ে শুভ্রর বুকের ভেতর সিঁটিয়ে গেল আরেকটু। ওর মাথাটা বনবন করে ঘুরছে, চারপাশের দেয়ালগুলো যেন দুলে দুলে উঠছে। ও শুধু অনুভব করছে শুভ্রর ঠোঁটের উষ্ণতা। কাল রাতের সেই পৈশাচিক স্মৃতির বিপরীতে এক পরম প্রশান্তি। কিন্তু ওর ভেতরের সেই ভয়টা, সেই বিভীষিকাটা এখনো মুক্তি দিচ্ছে না ওকে। ওর নিঃশ্বাসগুলো এখন উত্তপ্ত আর ভারী। ও বিড়বিড় করে বলল,
"শুভ্র... খুব শীত করছে... আমাকে একটু শক্ত করে ধরুন... আমি হারিয়ে যাচ্ছি... শু-ভ্র..."
শুভ্র তড়িঘড়ি করে ওকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে কম্বল দিয়ে ভালোভাবে ঢেকে দিয়ে থার্মোমিটারটা নিয়ে এল। ১০২.৮ ডিগ্রি! অ্যান্টিবায়োটিকের প্রভাব হয়তো শেষ হয়ে এসেছে, অথবা ট্রমাটা ওর শরীরকে কাবু করে ফেলছে আবারও। ট্রমার পাশাপাশি এই অতিরিক্ত কান্নার ধকল সহ্য করতে পারছে না ওর নাজুক শরীর। অনিন্দিতা জ্বরের ঘোরে বিড়বিড় করতে শুরু করল। ওর চোখের মণি দুটো স্থির হয়ে আছে সিলিংয়ের দিকে। জ্বরের তোপে আবার সেই অন্ধকার করিডোরে ফিরে যাচ্ছে ও।
"না... আমাকে যেতে দিন... শুভ্র... শুভ্র আসবে না... আমি নোংরা... ও আমাকে আর ভালোবাসবে না... আমি ওকে ছাড়া থাকতে পারছি না... আমার নিঃশ্বাস আটকে আসছে... শুভ্র কোথায়..."
অনিন্দিতার প্রলাপ শুনে শুভ্রর দুচোখ ফেটে জল আসতে চাইল। ও বাথরুম থেকে ঠান্ডা পানি আর তোয়ালে নিয়ে এসে পাগলের মতো অনিন্দিতার কপালে জলপট্টি দিতে শুরু করল। ও অনুভব করছে, মেয়েটা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার কারণেই কোনো ওষুধে সাড়া দিচ্ছে না ওর শরীর।
অনিন্দিতা জ্বরের ঘোরেই শুভ্রর হাতের আঙুলগুলো খামচে ধরল। ওর নখগুলো শুভ্রর চামড়ায় বসে যাচ্ছে, কিন্তু শুভ্রর কোনো ব্যথাবোধ নেই। ও অনিন্দিতার কানের কাছে মুখ নিয়ে ধরা গলায় বারবার বলতে লাগল,
"আমি এখানেই আছি, নন্দিতা। কোথাও যাইনি। তোমার শুভ্র তোমার পাশেই আছে। তুমি একটু শান্ত হও, আমার ফুল, প্লিজ..."
অনিন্দিতার ঠোঁট দুটো থরথর করে কাঁপছে। ও অস্ফুট স্বরে বলল, "শুভ্র... আপনি আমাকে ঘৃণা করছেন না তো? আমি... আমি আর আগের মতো সুন্দর নেই... ও আমাকে..."
শুভ্র ওর কপালে ঠোঁট চেপে ধরে ভারী গলায় বলল, "কিচ্ছু হয়নি, মেঘফুল। বিশ্বাস করো, কিচ্ছু হয়নি। তুমি আগের চেয়েও হাজার গুণ বেশি সুন্দর আমার কাছে। তুমি আমার আত্মা, আমার অস্তিত্ব। আত্মাকে কি কেউ অপবিত্র করতে পারে, বলো? পারে না। আর কান্নাকাটি কোরো না, সোনা। দেখো, এভাবে কান্নাকাটি করলে তোমার শরীর খারাপ হচ্ছে, নন্দিতা..."
অনিন্দিতা উত্তর দিল না। শুধু শুভ্রর হাতটা নিজের বুকের কাছে টেনে নিয়ে জাপটে ধরল। ওর উত্তপ্ত নিঃশ্বাসগুলো শুভ্রর হাতের তালুতে লাগছে আগুনের হলকার মতো।
ঠিক এই সময়েই নিচের ড্রয়িংরুম থেকে অস্ফুট কান্নার আওয়াজ এলো। অর্ক আর রাবেয়া বেগম এসেছেন সম্ভবত। শুভ্রর এখন ইচ্ছে করছে না অনিন্দিতার হাত ছেড়ে উঠতে, কিন্তু রাবেয়া বেগমকে সামলানোটাও তো ওর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। অনিন্দিতার কপালে দীর্ঘ একটা চুমু খেয়ে আলতো করে নিজের হাতটা অনিন্দিতার মুঠো থেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতেই মেয়েটা জ্বরের ঘোরেই আঁকড়ে ধরল ওকে।
"যেও না... শুভ্র... আমাকে একা রেখে যেও না..."
শুভ্রর বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরোল। ও নিচু হয়ে অনিন্দিতার কপালে আরেকটা চুমু খেয়ে ফিসফিস করে বলল,
"কোথাও যাচ্ছি না, মেঘফুল। আম্মু আর অর্ক এসেছে বোধহয়। আমি জাস্ট ওদের সাথে কথা বলে আবার তোমার কাছে আসছি। প্রমিস!"
শুভ্র রুম থেকে বেরিয়ে দরজাটা ভেজিয়ে দিল। ড্রয়িংরুমে আসতেই ও দেখল রাবেয়া বেগম সোফায় বসে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন। সোনালী বেগম জড়িয়ে ধরে আছেন ও
তাকে। অর্ক ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে মাথা নিচু করে, ছেলেটার চোখদুটোও লাল। শুভ্রকে দেখে রাবেয়া বেগম টলমল পায়ে ছুটে এলেন প্রায়।
"শুভ্র! আমার মেয়েটা কেমন আছে বাবা? ও কি আমার সাথে আর কথা বলবে না?" রাবেয়া বেগমের কণ্ঠস্বরে এক বুক হাহাকার।
শুভ্র ওনার হাত দুটো নিজের শক্ত হাতের মুঠোয় নিল। "আন্টি, শান্ত হোন। অনিন্দিতা ভেতরে আছে। ওর অনেক জ্বর এসেছিল, ডক্টর দেখে গেছেন। এখন কেবল ঘুমাল। আপনি যদি এই অবস্থায় ওর সামনে গিয়ে কান্নাকাটি করেন, ও আবার প্যানিক করবে। ও ভাববে ও সত্যিই কোনো অপরাধ করে ফেলেছে। ওকে এখন আমাদের খুব নরম হয়ে হ্যান্ডেল করতে হবে।"
রাবেয়া বেগম অশ্রুসজল চোখে মাথা নাড়লেন। অর্ক ধীরপায়ে শুভ্রর কাছে এসে দাঁড়াল। ওর গলার স্বরটা ধরা, "ভাইয়া, ডক্টর কী বললেন? খুব সিরিয়াস কিছু?"
শুভ্রর মুখটা মুহূর্তে কঠিন হয়ে উঠল। ও সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে সবার উদ্দেশ্যে বলল, "খুব বড়োসড়ো ফিজিক্যাল ইনজুরি নেই, কিন্তু ওর মনের ওপর দিয়ে যে সাইক্লোন গেছে, তার রেশ কাটাতে সময় লাগবে। তবে আমি একটা ডিসিশন নিয়েছি..."
শুভ্র সবার দিকে একবার তাকাল। আজিজ সাহেব আর সোনালী বেগমও সেখানে দাঁড়িয়ে।
"আমি চাইছি আজই আমাদের আকদটা হয়ে যাক। সমাজ বা কোনো আত্মীয়ের প্রশ্নবাণ যেন এক মুহূর্তের জন্যও বিদ্ধ করতে না পারে অনিন্দিতাকে। ও নিজেও নিজেকে নিয়ে প্রচন্ড ইনসিকিওর ফিল করছে এই মুহূর্তে।"
শুভ্র দাঁতে দাঁত চেপে বলল, "ও ভাবছে, আমি ওকে ঘৃণা করবো, আব্বু-আম্মু আমাদের বিয়েটা আর দিতে চাইবে না... ইনসিকিওরিটি থেকে প্যানিক করতে করতে আবার জ্বর চলে এসেছে। জ্বরের ঘোরেও প্রলাপ বকছে। এভাবে চলতে থাকলে দীর্ঘমেয়াদি ট্রমায় ঢুকে যাবে ও। তাই আমি মনে করছি, আমাদের বিয়েটা এই মুহূর্তে অত্যন্ত জরুরী।"
শুভ্রর প্রস্তাব শুনে এক মুহূর্তের জন্য পিনপতন নীরবতা নেমে এলো ড্রয়িংরুমজুড়ে। আজিজ সাহেব আর আজিজ পত্নী সোনালী বেগম একে অপরের দিকে তাকালেন। রাবেয়া বেগম যেন বিশ্বাসই করতে পারছেন না যে, এই বিপদের দিনেও কোনো ছেলে তার মেয়ের জন্য এমনভাবে ঢাল হয়ে দাঁড়াতে পারে।
অর্ক বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে রইল শুভ্রর দিকে। ও জানে শুভ্র ওর বোনকে ভালোবাসে, কিন্তু এই চূড়ান্ত বিপর্যয়ে শুভ্রর এই দৃঢ়তা ওকে নিয়ে গেল এক অন্য উচ্চতায়। রাবেয়া বেগম ধরা গলায় বললেন,
"শুভ্র... আমি জানি তুমি অনুর ভালো চাও। কিন্তু এই অবস্থায়? তুমি তো একটু আগেই বললে ওর প্রচন্ড জ্বর। জ্বরের ঘোরে প্রলাপ বকছে। তার ওপর ও যে মানসিক অবস্থায় আছে..." রাবেয়া বেগম একটু থেমে আবার বললেন, "তাছাড়া এমন তড়িঘড়ি করে বিয়ে করলে লোকে তো আরও কত কী বলবে! বলবে লুকিয়ে চুড়িয়ে বিয়ে দিয়ে পাপ চাপা দিচ্ছে..."
"কে বলবে আন্টি?" শেষ কথাটা শুনতেই শুভ্রর কণ্ঠস্বর ঘর কাঁপিয়ে গর্জে উঠল, "কে বলবে? ওই আত্মীয়রা যারা কাল ফিসফাস করে রসালো গল্প করছিল? নাকি সমাজ- যারা কেবল কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দিতে পারে? ওদের জন্য আমি অনিন্দিতাকে তিল তিল করে শেষ হতে দিতে পারি না। ও ভাবছে ও কলঙ্কিত, ও ভাবছে আমি ওকে ঘৃণা করব। এই ইনসিকিওরিটি ওকে ভেতর থেকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। ওর মনের এই বিষটা উপড়ে ফেলার একমাত্র উপায় ওকে আইনত এবং ধর্মীয়ভাবে আমার অর্ধাঙ্গিনী করে নেওয়া। যাতে ওর মনের মধ্যে কোনো 'যদি' বা 'কিন্তু' না থাকে।"
আজিজ সাহেব এগিয়ে এসে শুভ্রর কাঁধ স্পর্শ করলেন। ওনার চোখে ছেলের জন্য গর্ব উপচে পড়ছে আজ, "শুভ্র ঠিকই বলেছে, ভাবি। অনিন্দিতার এখন কোনো সিমপ্যাথি দরকার নেই, ওর দরকার একবুক ভরসা। আর সেই ভরসা শুভ্রর চেয়ে বেশি কেউ দিতে পারবে না। আপনি অনুমতি দিলে আমরা আজ বিকেলেই কাজি ডাকি। ঘরোয়াভাবেই আকদটা হয়ে যাক। অনিন্দিতা এই ট্রমাটাইজ অবস্থাটা কাটিয়ে উঠলে তারপর ধুমধাম করে অনুষ্ঠান করব নাহয়।"
সোনালী বেগমও সায় দিলেন, "হ্যাঁ আপা, শুভ্রর সিদ্ধান্তটাই সঠিক। আমরা আমাদের বৌমাকে ওই ট্রমায় ফেলে রাখতে পারি না।"
রাবেয়া বেগম হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন একপর্যায়ে এসে। এই কান্নার আড়ালে লুকানো এক গভীর কৃতজ্ঞতা। তিনি শুধু অস্ফুট স্বরে বললেন, "আমার মেয়ের কপাল কত ভালো যে তোমার মতো একজনকে জীবনে পেয়েছে, শুভ্র। আমার মেয়ের বিপদে তুমি এইভাবে ঢাল হয়ে দাঁড়ালে, তোমার এই ঋণ আমি কক্ষনো শোধ করতে পারবো না, বাবা..."
সোনালী বেগম এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরলেন অনিন্দিতার মা-কে, "এভাবে বলছেন কেন আপা! অনিন্দিতা কি আমাদের মেয়ে নয়? আমাদের তো কোনো মেয়ে নেই, শুভ্র যবে থেকে ওদের সম্পর্কটার কথা জানিয়েছে, আমি আর শুভ্রর বাবা সেইদিন থেকে অনিন্দিতাকে বৌমার চেয়ে বেশি আমাদের মেয়ের জায়গায় বসিয়েছি।"
সোনালী বেগমের কথা শেষ হতে না হতেই দোতলা থেকে কাঁচ ভাঙার একটা তীক্ষ্ণ শব্দ এল। শুভ্র আজিজ সাহেবের দিকে তাকিয়ে উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল,
"আব্বু তুমি যত দ্রুত সম্ভব হুজুর এবং কাজির ব্যবস্থা করো। আর আশেপাশের কোনো মানুষ কিংবা আত্মীয় স্বজনকে খবর দেবার প্রয়োজন নেই। তোমরা এই কয়েকজনই যথেষ্ট।"
বলেই শুভ্র আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না, ঝড়ের বেগে দৌড়ে দোতলায় গেল। রুমে ঢুকেই শুভ্র দেখল অনিন্দিতা বিছানায় উঠে বসেছে। জ্বরের ঘোরে ও বিছানার পাশের টিপয় থেকে পানির গ্লাসটা ফেলে দিয়েছে। কাঁচের টুকরোগুলো ছড়িয়ে আছে মেঝেতে। অনিন্দিতা উন্মাদের মতো একবার নিজের হাতদুটো ঘষছে; পরক্ষণেই গায়ের ঢিলাঢালা গেঞ্জিটার ওপর দিয়েই জোরে জোরে আঁচড় কাটছে বুকে আর পেটে। আর ফিসফিস করে বলছে,
"মুছে যাচ্ছে না কেন? খারাপ লোকটার ছোঁয়াটা মুছে যাচ্ছে না কেন...?"
শুভ্র দরজাটা লাগিয়ে দিয়ে কাঁচের টুকরোগুলো সাবধানে পাশ কাটিয়ে বিছানার অন্যপ্রান্ত দিয়ে উঠে অনিন্দিতার পাশে গিয়ে বসে ওর দুই হাত শক্ত করে ধরে নিজের বজ্রমুঠোয় পুরল। অনিন্দিতা উন্মাদের মতো মাথা ঝাঁকাচ্ছে, ওর চোখদুটো রক্তজবার মতো লাল। শুভ্রর স্পর্শ পেতেই অনিন্দিতা এক তীব্র আতঙ্কে শিউরে উঠে ওর দুই হাত শুভ্রর মুঠোর ভেতর থেকে ছাড়িয়ে নেয়ার জন্য প্রচণ্ড ধস্তাধস্তি শুরু করল।
"ছাড়ুন! আমাকে ছাড়ুন! ওই লোকটার হাত... ওই লোকটার আঙুলগুলো এখনো এখানে বসে আছে! আমি নোংরা হয়ে গেছি... আমার বমি আসছে শুভ্র! গা গোলাচ্ছে আমার..."
অনিন্দিতা উন্মাদের মতো মাথা ঝাঁকাচ্ছে, ওর অবিন্যস্ত চুলগুলো ঘামে ভেজা কপালে লেপ্টে আছে। শুভ্র অনিন্দিতার দুই কব্জি এক হাতে শক্ত করে ধরে অন্য হাত দিয়ে ওর দুগাল চেপে ধরে নিজের চোখের দিকে তাকাতে বাধ্য করল,
"আমার দিকে তাকাও, অনিন্দিতা! এই মুহূর্তে আমার চোখের দিকে তাকাও!"
শুভ্রর গভীর স্বর শুনে অনিন্দিতা থমকাল। ও কাঁপতে কাঁপতে ওর ভয়ার্ত, বিষাদগ্রস্ত চোখদুটো স্থির হলো শুভ্রর চোখের ওপর। শুভ্র ওর গালদুটো ছেড়ে দিয়ে ঘামে ভেজা চুলগুলো সরিয়ে দিল কপালের ওপর থেকে।
"মুছতে চাইছ তো? এই যে দেখো..." শুভ্র নিজের হাতের তালু দিয়ে অনিন্দিতার কপাল, গাল আর ঘাড়ের দাগটা পরম মমতায় মুছতে শুরু করল, "মুছে গেছে। সব মুছে গেছে। সব নোংরা স্পর্শ মুছে দিয়েছি। এখন যা আছে তা কেবল তোমার শুভ্রর ছোঁয়া। আর কিছু নেই এখানে। এবার ঠিক আছে?"
অনিন্দিতা জোরে জোরে দুদিকে মাথা নাড়লো। কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, "না.. না.. আরো আছে। এখানে... এখানে... আমার হাত ছাড়ুন... আমি দেখাই কোথায় কোথায় ছুঁয়েছে ওই খারাপ লোকটা..."
অনিন্দিতা তখন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। ওর মগজে কেবল সেই পৈশাচিক স্মৃতির পুনরাবৃত্তি ঘটছে। ও উন্মাদের মতো কাঁপতে কাঁপতে নিজের গেঞ্জিটা টেনে ওপরে তুলল, "এই যে এখানে... এখানে ওর চটচটে হাতটা আমাকে ছুঁয়েছে, শুভ্র..."
বিশাল টি-শার্টের নিচ থেকে অনিন্দিতার পেটের সাদা চামড়া বেরিয়ে আসতেই শুভ্র দেখল সেখানে কালচে নখের আঁচড় আর নীল হয়ে যাওয়া ছোপ ছোপ দাগ।
"তারপর এখানে..." অনিন্দিতা যখন হিড়হিড় করে টি-শার্টটা টেনে আরও ওপরে তুলে ওর বুকের অংশটা উন্মুক্ত করতে চাইল, শুভ্র ঠিক তার আগমুহূর্তে বিদ্যুৎ বেগে ওর দুই হাত নিজের এক হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরল আবার,
"অনিন্দিতা! স্টপ!"
অনিন্দিতা এক মুহূর্তের জন্য স্থির হলো, কিন্তু পরক্ষণেই আবার ডুকরে কেঁদে উঠল, "কেন বাধা দিচ্ছেন? দেখাতে দিন আমাকে আমি কতটা নোংরা হয়ে গেছি! আপনার ঘৃণা লাগছে না শুভ্র? আমার নিজেরই তো বমি আসছে..."
শুভ্রর সহ্যসীমা ছাড়িয়ে গেল। ও আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। এক ঝটকায় অনিন্দিতাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে ঝুঁকে পড়ল ওর ওপর। ঝুঁকে এসে অনিন্দিতার দুইহাত গেঁথে ধরল বিছানায়, মাথার ওপর যাতে আর নিজের গায়ে নখ বসাতে না পারে মেয়েটা।
"অনেক হয়েছে অনিন্দিতা! অনেক হয়েছে! আর না..."
শুভ্র নিচু হয়ে অনিন্দিতার পেটের তপ্ত চামড়ায় নীল হয়ে যাওয়া আঁচড়গুলোর ওপর নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল। অনিন্দিতা শিউরে উঠে কুঁকড়ে গেল,
"শুভ্র... না... ঘেন্না লাগবে আপনার..."
"নিচে একটু আগে আমি তোমার আম্মুর কাছে কী প্রমিজ করে এলাম জানো? শুভ্র মাথা তুলে অনিন্দিতার চোখের দিকে তাকাল, "আজই আমি তোমাকে হালালভাবে আমার অস্তিত্বের অংশ করে নেব, মেঘফুল। একটু পরেই আমাদের বিয়ে..!"
অনিন্দিতা থমকে গেল। ওর সেই জ্বরের ঘোরে লাল হয়ে যাওয়া চোখদুটো শুভ্রর চোখের ওপর স্থির হলো। ও কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল, "বি-বিয়ে? আজ? কেন?কিন্তু আমি তো..."
"কোনো 'যদি', 'কিন্তু' নয় মেঘফুল। আমি চাই," শুভ্র ওর কপালে নিজের কপাল ঠেকাল, "এরপর যখন তুমি ওই নোংরা স্পর্শের কথা বলবে, আমি আমার ভালোবাসা দিয়ে তোমাকে বুঝিয়ে দেব যে, তোমার শরীরের প্রতিটি ইঞ্চি কেবল এই তাহমিদ রায়হান শুভ্রর অধিকারে। আমি তোমার সম্মান বাঁচাতে তোমাকে বিয়ে করছি না নন্দিতা, আমি তোমাকে বিয়ে করছি তোমার এই ক্ষতবিক্ষত মনের ভেতরে শান্তির একটা ঘর বানানোর জন্য। যাতে তুমি আয়নায় নিজেকে দেখলে ওই পিশাচটার মুখ নয়, তোমার স্বামীর ভালোবাসার চিহ্ন দেখতে পাও।"
অনিন্দিতা কিছুক্ষণ পাথরের মতো তাকিয়ে রইল। তারপর ওর দুচোখ বেয়ে শান্ত জলের ধারা নামল। ও অস্ফুট স্বরে বলল, "আপনি কি সত্যিই আমাকে ঘেন্না করেন না, শুভ্র? আমার এই দাগগুলো দেখার পর আপনার... আপনার বমি আসবে না?"
শুভ্র ওর ঠোঁটের কোণে আঙুল বুলিয়ে ম্লান হাসল। তারপর আবার নিচু হয়ে পরম ভালোবাসায় অনিন্দিতার পেটের আঁচড়ের দাগগুলোর ওপর একের পর এক চুমু দিয়ে ভরিয়ে দিতে দিতে বলল, "এখনো তোমার মনে হচ্ছে আমার বমি আসবে?"
শুভ্র ওর নাভির ওপর শেষ একটা চুমু খেয়ে অবিন্যস্ত টি-শার্টটা ঠিক করে দিয়ে ওর মুখোমুখি উঠে এলো। অনিন্দিতা কেঁপে উঠে খুব দুর্বল হাতে খামচে ধরল শুভ্রর গেঞ্জির কলারটা। ওকে আরও কাছে টেনে নিয়ে প্রসস্থ বক্ষে মুখ লুকিয়ে অস্ফুটে বলল,
"শুভ্র... আমাকে ছেড়ে দেবেন না তো কখনো? আপনি যদি কখনো ছেড়ে দেন আমাকে, আমি মরে যাব। সত্যিই মরে যাব..."
শুভ্র অনিন্দিতার কপালে নিজের ঠোঁট চেপে ধরে অনেকক্ষণ স্থির হয়ে রইল অনেক্ষণ। দুজনেই নিস্তব্ধ। ঘরের এসির গুঞ্জন আর অনিন্দিতার ভারী নিশ্বাসের শব্দ ছাড়া আর কিছু নেই।
৪৪.
ঠক ঠক ঠক...
"শুভ্র? অ্যাই শুভ্র?"
শুভ্র ফট করে চোখ মেলে তাকাল। সারা রাত না ঘুমানোর দরুন অনিন্দিতার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে থাকা অবস্থাতেই কখন যে চোখ লেগে এসেছে টের পায়নি ও। দরজায় আরেকবার শব্দ হতেই শুভ্র অনিন্দিতাকে বুকের ওপর থেকে সরিয়ে উঠতে চাইল। কিন্তু শুভ্রর টিশার্টের একটা অংশ তখনো অনিন্দিতার হাতে মুঠো করে ধরা। শুভ্র খুব আলতো করে অনিন্দিতার হাতের ওপর নিজের হাত রাখল। শরীরটা এখনো উত্তপ্ত। আলতো চাপে আঙুলগুলো ছাড়িয়ে নিতে চাইতেই অনিন্দিতা ঘুমের ঘোরেই ডুকরে উঠল,
"উমম... ন-না..."
বাধ্য হয়ে শুভ্রকে আবার শুয়ে পড়তে হলো ওর পাশে। দরজায় আবার টোকা পড়ল। সোনালী বেগমের গলা ভেসে এলো দরজার ওপাশ থেকে,
"শুভ্র, শুনছিস?"
শুভ্র গলার স্বর সামান্য উঁচু করে জবাব দিল,
"দরজা খোলা আছে আম্মু। ভেতরে এসো..."
পরপর দরজার নব ঘুরিয়ে ভেতরে ঢুকলেন সোনালী বেগম। ঘরে ঢুকেই দেখলেন শুভ্র এক হাত অনিন্দিতাকে আগলে শুয়ে আছে। দৃশ্যটা দেখে ওনার বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল। অত্যন্ত যত্ন করে তুলে রাখা নিজের বিয়ের মেরুন রঙা কাতান শাড়িটা আলমারি থেকে বের করে এনেছেন তিনি। এই শাড়িটার সাথে ওনার অনেক আবেগ জড়িয়ে আছে, আজ সেটা তিনি তুলে দিতে চান তাঁর একমাত্র বৌমার হাতে। সোনালী ধীরপায়ে বিছানার কাছে এগোতে চাইলে শুভ্র সাবধান করলো মাকে,
"মেঝেতে কাঁচ পড়ে আছে, আম্মু, দেখে এসো..."
সোনালী বেগম মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা কাঁচের টুকরোগুলো সাবধানে এড়িয়ে বিছানার পাশে এসে দাঁড়ালেন। হাতের ভাঁজ করা ধ্রুপদী মেরুন শাড়িটা বিছানার কোনায় রেখে অনিন্দিতার পাশে বসলেন।
"জ্বরটা কি একটু কমেছে রে?"
সোনালী বেগম নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করে অনিন্দিতার কপালে হাত ছোঁয়ালেন। ঠান্ডা হাতের ছোঁয়া পেতেই অনিন্দিতা কুঁকড়ে গিয়ে শুভ্রর বুকে মুখ গুঁজল সাথে সাথে। শুভ্র দীর্ঘশ্বাস ফেলে মায়ের দিকে তাকালো,
"কমে নি, আম্মু। আগের মতোই আছে..."
সোনালী বেগম ছেলের দিকে তাকিয়ে চিন্তিত মুখে বললেন, "তোমার আব্বু কাজি নিয়ে এলো বলে... অনিন্দিতার যে অবস্থা, ও কি এখন উঠে বসতে পারবে?"
"পারবে। আমি আছি ওকে সামলে নেওয়ার জন্য..."
সোনালী বেগম খুব সন্তর্পনে একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করে বিছানায় রাখা মেরুন কাতান শাড়িটা দেখিয়ে বললেন, "এটা আমার বিয়ের শাড়ি, শুভ্র। আমি চেয়েছিলাম আমার বৌমা এটা পরে খুব ধুমধাম করে এই ঘরে আসবে। কিন্তু আজ পরিস্থিতির চাপে এভাবেই দিতে হচ্ছে। তুমি ওকে একটু ফ্রেশ করিয়ে নিয়ে এসো, আমি শাড়িটা পড়িয়ে দেই..."
শুভ্র একবার অনিন্দিতার দিকে তাকাল। মেয়েটা জ্বরের ঘোরে একদম নিস্তেজ। ওর হাতে এখনো শুভ্রর গেঞ্জির কলারটা শক্ত করে ধরা। শুভ্র দীর্ঘশ্বাস ফেলে মায়ের বিয়ের শাড়িটার ওপর হাত রেখে নরম গলায় বলল,
"শাড়িটা থাক, আম্মু? ও এখন শাড়ি পরার মতো অবস্থায় নেই। প্রচন্ড সেনসিটিভ কন্ডিশনে আছে। গায়ে কোনো ভারী কাপড় বা অপরিচিত ছোঁয়া নিতে পারছে না। শরীরটাও খুব দুর্বল। আমি বরং ওকে ফ্রেশ করিয়ে দেই। আপাতত এই টি-শার্টেই থাকুক। মাথায় শুধু একটা ওড়না দিলেই চলবে।"
সোনালী বেগম মাথা নাড়লেন, "তা কি করে হয়, শুভ্র! আজকের এই দিনটা ওর স্পেশাল একটা মোমেন্ট। আজকের দিনে এভাবে থাকলে সারা জীবন ওর মধ্যে একটা আফসোস থেকে যাবে। যদিও পরে আমরা বড় করে অনুষ্ঠান করব কিন্তু আজকের দিনটা অন্যরকম।"
"আম্মু..."
সোনালী বেগম বাচ্চাদের মত আবদার জুড়ে বসলেন, "আচ্ছা ঠিক আছে, তাহলে একটা কাজ করো, তুমি ওকে ফ্রেশ করিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করো ও শাড়ি পড়তে চায় কী না..."
শুভ্র কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মায়ের আকুতিটা বুঝল। ও অনিন্দিতার কপালে গালে হাত ছুঁইয়ে দেখল উত্তাপ এখনো বেশ ভালোই। তারপর খুব সাবধানে অনিন্দিতার হাতের মুঠো থেকে নিজের গেঞ্জিটা ছাড়িয়ে নিতে চাইলে অনিন্দিতা আবার অস্ফুট শব্দ করে নিভু নিভু চোখে তাকালো। জ্বরের ঘোরে মেয়েটার দৃষ্টি ঘোলাটে। ও শুভ্রকে সামনে দেখে খুব ক্ষীণ স্বরে ডাকল,
"শুভ্র... পানি..."
সোনালী বেগম টেবিল থেকে নতুন একটা গ্লাসে পানি ঢেলে শুভ্রর হাতে দিলেন। শুভ্র ওর মাথায় হাত দিয়ে একটু উঁচু করে ধরল। কয়েক চুমুক পানি খেয়ে অনিন্দিতা আবার শুভ্রর বুকে মাথা রাখতে চাইলে শুভ্র আলতো গলায় ডাকলো, "অনিন্দিতা? শুনছো? একটু উঠে বসবে, ফুল? আম্মু তোমার জন্য কী এনেছে দেখো..!"
অনিন্দিতা খুব ধীরলয়ে চোখের পাতা মেলল, "আম্মু..."
জ্বরের ঘোরে চারপাশটা এখনো ওর কাছে ঝাপসা। ও উঠে বসার চেষ্টা করতেই শুভ্রর একটা শক্ত হাত ওর পিঠের দিকটা আগলে ধরে পিঠের নিচে বালিশ দিয়ে দিল।
সোনালী বেগম পরম মমতায় অনিন্দিতার চিবুক ছুঁয়ে দিলেন, "এখন কেমন লাগছে, আম্মু? শরীরটা কি খুব বেশি খারাপ লাগছে, সোনা?"
অনিন্দিতা সোনালী বেগমের হাতের স্পর্শ পেয়ে এক মুহূর্তের জন্য শিউরে উঠল, কিন্তু শুভ্রর শক্ত হাতের বাঁধন আর চেনা ঘ্রাণ ওকে পুরোপুরি প্যানিক করতে দিল না। ও ঘোলাটে চোখে তাকিয়ে সোনালী বেগমকে চেনার চেষ্টা করল।
"আম-আম্মু.. আমার আম্মু কোথায়?"
সোনালী বেগম নরম গলায় বললেন, "তোমার আম্মু আসছে, এক্ষুনি চলে আসবে.."
বিছানায় রাখা মেরুন শাড়িটা হাতে তুলে অনিন্দিতার সামনে ধরে সোনালী বেগম বললেন, "এটা আমার বিয়ের শাড়ি, মা। আমার সবচেয়ে প্রিয় জিনিসগুলোর মধ্যে একটা। আজ আমার সবটুকু দোয়া, সবটুকু ভালোবাসা দিয়ে এই শাড়িটা তোমায় দিতে চাই। তুমি কি এটা পরে আজ আমার ছেলের পাশে বসবে?"
অনিন্দিতা একবার শাড়িটার দিকে তাকাল, তারপর শুভ্রর দিকে। শুভ্র ওর চোখের ভাষা পড়তে পারল যেন। ও জানে অনিন্দিতা এখন যেকোনো অপরিচিত স্পর্শ বা পরিবর্তনের কথা ভাবলে ভয় পাচ্ছে। শুভ্র ওর হাতটা একটু চেপে ধরে চোখের ইশারায় অভয় দিল।
অনিন্দিতা ক্ষীণভাবে মাথা নাড়লো, "পড়ব.."
To be continued...