#মেঘবরণ_প্রেম
পর্ব - ৩১ [বিবাহ স্পেশাল ✨]
লেখা - আসফিয়া রহমান
অনুমতি ছাড়া কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ❌
সোনালী বেগম বেরিয়ে যেতেই শুভ্র অনিন্দিতাকে ফ্রেশ করিয়ে নিয়ে এসে বিছানায় বসালো। মেঝেতে ছড়ানো কাঁচের টুকরোগুলো পরিষ্কার করা হয়ে গেছে ইতিমধ্যেই। সোনালীর সাথে রাবেয়া বেগমও ঘরে ঢুকলেন। মেয়ের অবস্থা দেখে আবার কান্না উথলে উঠতে চাইছিল বুকের ভেতর, শুভ্রর কথা স্মরণ করে বহু কষ্টে নিজেকে সংবরণ করলেন তিনি। এগিয়ে এসে মেয়ের গালে হাত রেখে কপালে চুমু খেলেন।
রাবেয়া বেগম যখন পরম মমতায় অনিন্দিতার কপালে ঠোঁট ছোঁয়ালেন, অনিন্দিতা হাউমাউ করে কেঁদে উঠল তখন। মায়ের বুকের উষ্ণতা পেতেই কাল রাতের সেই রুদ্ধশ্বাস মুহূর্তগুলো যেন আবার ঝাপসা হয়ে এল। ও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল মাকে, যেন হারানো প্রাণ ফিরে পেয়েছে।
"আম-আ-ম্মু... আম্মু... আম-আমি খুব.. ভয় পেয়েছিলাম আম্মু... ওই-ওই লোকটা.. ওই..." কথা শেষ করার আগেই গলার স্বর বুজে এলো ওর।
রাবেয়া বেগম মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে উঠলেন, কিন্তু পরক্ষণেই শুভ্রর সতর্ক দৃষ্টির কথা মনে করে একহাতে চোখের জল মুছে ফেললেন, "শশশ... কিচ্ছু হয়নি মা, কিচ্ছু হয়নি। এই দেখো আম্মু এসেছি না? দেখো, আমার দিকে তাকাও, আমার লক্ষ্মী বাচ্চা না তুমি?"
অনিন্দিতা মায়ের বুকে মুখ গুঁজে রেখেই মাথা নাড়লো উপরনিচ। রাবেয়া মেয়ের মাথায় চুমু খেয়ে নিজের চোখের কোণার জলটুকু মুছে নরম গলায় বললেন, "এই দেখো, আম্মু নিজের বিয়ের ওড়না নিয়ে এসেছি তোমার জন্য, এটা না তোমার খুব পছন্দের? ছোটবেলায় ওড়নাটা মাথায় দিয়ে তুমি কী বলতে মনে আছে?"
অনিন্দিতা রক্তিম চোখজোড়া উঠিয়ে মায়ের দিকে তাকালো। রাবেয়া আবার বললেন, বলতে 'আমি যখন বড় হবো, তখন আম্মুর এই ওড়নাটা পড়ে বিয়ে করব!'"
রাবেয়া বেগমের কথা শুনে অনিন্দিতার ঠোঁটদুটো একবার কাঁপল। ছোটবেলার আবছা স্মৃতিটা যেন এক মুহূর্তের জন্য সরিয়ে দিল কাল রাতের পৈশাচিক অন্ধকারকে। ও ম্লান চোখে মায়ের হাতের সেই মেরুন ওড়নাটার দিকে তাকাল। ওড়নাটা কত শতবার আলমারি থেকে বের করে নিজের মাথায় জড়িয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছে ও, আজ সেই ওড়নাটাই ওর জীবনের সবচেয়ে কঠিন আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ওর সঙ্গী হতে এসেছে।
অনিন্দিতা অস্ফুট স্বরে বলল, "আজকে আমার বিয়ে আম্মু? এই অবস্থায়? আমি তো... আমি তো ঠিক নেই আম্মু..."
রাবেয়া বেগম মেয়ের চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরলেন। তাঁর নিজের চোখের কোণেও জল জমছিল, কিন্তু আজ হার মানলে চলবে না। তিনি পরম মমতায় অনিন্দিতার ঘামভেজা চুলগুলো কানের পিছে গুঁজে দিয়ে বললেন,
"কে বলেছে তুমি ঠিক নেই? শরীরের রোগ দিয়ে কি মনের ঠিক-বেঠিক বিচার হয় বোকা মেয়ে? জ্বর তো সেরে যাবে। কিন্তু এই যে শুভ্র তোমাকে নিয়ে আজ যে সিদ্ধান্তটা নিয়েছে, এর চেয়ে বড় 'ঠিক' তো আর কিছু হতে পারে পারে না। ও চাইছে তুমি যাতে নিজেকে কখনো একা মনে না করো, যাতে দুনিয়ার কারোর ক্ষমতা না থাকে তোমাকে নিয়ে একটা কটু কথা বলার।"
অনিন্দিতা এক পলক তাকাল শুভ্রর দিকে। শুভ্র তখন দরজার কাছে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওর দিকেই। সেই শান্ত চোখে কেবল এক সমুদ্র ভরসা। অনিন্দিতা মাকে আবার জড়িয়ে ধরে বুকে মুখ গুঁজলো। সোনালী বেগম শুভ্রর কাছে গিয়ে নিচু গলায় বললেন,
"তুমি নিচে গিয়ে একটু দেখো তো, তোমার বাবা কাজী সাহেবকে নিয়ে পৌঁছেছেন কিনা। অর্কটাও একা একা বসে আছে... আমি আর রাবেয়া আপা মিলে অনিন্দিতাকে রেডি করিয়ে দিচ্ছি।"
কথা শেষ করে সোনালী বেগম পেছন ফিরতেই তার আরেকটা কথা মনে পড়লো, "আর হ্যাঁ, তুমিও এই টি-শার্ট বদলে একটা পাঞ্জাবি পরো। ওই সাদা পাঞ্জাবিটা আছে না, গত ঈদে তোমার আব্বু গিফট করেছিল যে? ওটা পরো।"
শুভ্র মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে আলমারি থেকে সাদা পাঞ্জাবিটা নিয়ে থেকে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। ড্রয়িংরুমে আসতেই ও দেখল আজিজ সাহেব কাজী সাহেবকে নিয়ে সোফায় বসে আছেন। অর্ক সোফার একপাশে বসে আছে জড়সড় হয়ে। শুভ্রকে দেখে আজিজ সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। কাজী সাহেবের সাথে পরিচয় করিয়ে দিযশুভ্রকে ইশারা করলেন তৈরি হতে। শুভ্র নিজের রুমে না গিয়ে পাশের গেস্ট রুমে গিয়ে দ্রুত শাওয়ার নিল।
সারারাত না ঘুমানোর দরুন শরীরে যে ক্লান্তি জমেছিল, শাওয়ারের ঠান্ডা পানির স্পর্শে তা যেন কিছুটা হলেও স্তিমিত হলো। সাদা পাঞ্জাবিটা পরে আয়নার সামনে দাঁড়াল শুভ্র। নিজের প্রতিবিম্ব দেখে ওর মনে হলো, গতকাল বিকেলের সেই শুভ্র আর আজকের এই শুভ্রর মাঝে যেন এক যুগের ব্যবধান। কাল বিকেলের সেই হিংস্রতা আজ ওর চোখে নেই, সেখানে এখন কেবল এক গভীর দায়িত্ববোধ আর প্রেম। আজ ও কেবল একজনের প্রেমিক নয়, আজ ও হতে যাচ্ছে অনিন্দিতার সবচেয়ে কাছের মানুষ, ওর স্বামী।
"ভেতরে আসতে পারি, আম্মু?"
বন্ধ দরজায় হালকা টোকা পড়তেই ভেতর থেকে দরজা খুলে দিলেন সোনালী বেগম। পাঞ্জাবির হাতা ঠিক করতে করতে শুভ্র রুমে ঢুকেই দাঁড়িয়ে পড়ল স্থির। অনিন্দিতা বিছানায় বসে আছে। হবু শাশুড়ির মেরুন কাতান শাড়িটা ওর পরনে, মায়ের আবেগময় মেরুন ওড়নাটা জড়ানো মাথায়। মেরুন রঙে অনিন্দিতাকে যেন কোনো এক প্রাচীন রাজ্যের বিষণ্ণ রাজকুমারীর মতো লাগছে। জ্বরের তোপে নাকের ডগাসহ গালদুটো রক্তিম দেখাচ্ছে। তাতেই যেন মেয়েটার সৌন্দর্য বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণ। ডাগর চোখদুটোর কোণ এখনো ভেজা, অথচ সাদা পাঞ্জাবিতে প্রেমিক পুরুষকে দেখে ক্ষণিকের জন্য অপলক তাকিয়ে রইল মেয়েটা।
শুভ্র ধীরপায়ে ওর সামনে গিয়ে বসল। অনিন্দিতার হাত কাঁপছে মৃদু মৃদু। শুভ্র পরম নির্ভরতায় কাঁপা হাতদুটো নিজের হাতের হাতে তুলে নিয়ে একে একে দুহাতের পৃষ্ঠে ঠোঁট ছোঁয়াল,
"বসতে কষ্ট হচ্ছে, ফুল? বালিশে হেলান দেবে?"
অনিন্দিতা মাথা নেড়ে সায় দিতেই শুভ্র পেছনের বালিশ দুটো উঁচু করে ওকে আধশোয়া করে বসালো। সোনালী আর রাবেয়া একে অপরের দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। ঘরটা আবার নিস্তব্ধ।
অনিন্দিতা বালিশে হেলান দিয়ে চোখ বুজতেই শুভ্র ওর কাছ ঘেঁষে এসে মাথাটা বুকের সঙ্গে চেপে ধরলো,
"বেশিক্ষণ লাগবে না, জাস্ট দশ মিনিট। এরপর আমরা ঘুমাবো, ঠিক আছে?"
অনিন্দিতা কিছু বলল না। শুভ্র আবার বলল,
"কিছু খাবে তুমি? ক্ষুধা লেগেছে? সেই ভোরবেলা কয়েক চামচ স্যুপ খেয়েছিলে, তারপর তো আর কিছু খাওনি। কী খাবে বলো, কী খেতে ইচ্ছা করছে?"
অনিন্দিতা নিস্তেজভাবে মাথা নাড়ল। শুভ্রর বুকের হাড়ের ওপর গাল ঠেকিয়ে খুব অস্ফুট স্বরে বলল,
"কিচ্ছু খেতে ইচ্ছে করছে না, শুভ্র। আমার বুকটা কেমন যেন খালি খালি লাগছে... বড্ড ভয় করছে।"
শুভ্র ওর পিঠে হাত বুলিয়ে আশ্বস্ত করল,
"ভয় নেই, মেঘফুল। আমি তো আছি।"
শুভ্রর কথার মাঝেই দরজার নক করার শব্দ হলো; সাথে আজিজ সাহেবের কণ্ঠস্বর,
"শুভ্র..."
আজিজ সাহেবের কণ্ঠস্বর কানে আসতেই অনিন্দিতার শরীরটা শক্ত হয়ে গেল এক ঝটকায়। শুভ্রর সাদা পাঞ্জাবিটা শক্ত করে খামচে ধরল মেয়েটা। ডাগর চোখদুটো ভয়ার্ত হরিণীর মতো তাকাচ্ছে ভেজানো দরজার দিকে। তাকিয়ে থাকতে থাকতেই ছোট্ট শরীরটা থরথর করে কাঁপতে শুরু করল আবার। দরজার ওপাশে পুরুষের উপস্থিতি টের পেতেই গত রাতের অন্ধকার আর রায়ানের কর্কশ কণ্ঠস্বর যেন ড্রাম বাজাতে শুরু করল ওর মগজে।
"শুভ্র... কে এসেছে? কেন এসেছে? ওদেরকে চলে যেতে বলুন... আ-মার ভয় করছে.."
অনিন্দিতার কণ্ঠস্বর বুজে আসছে চরম আতঙ্কে। আতঙ্কে শিউরে উঠে শুভ্রর বুকের ভেতর মুখ লুকাতে চাইল মেয়েটা।শুভ্র বুঝতে পারছে অনিন্দিতা আবার প্যানিক অ্যাটাকের শিকার হতে যাচ্ছে। ও দরজার দিকে তাকিয়ে একটু জোরে বলল,
"আব্বু, দুই মিনিট!"
শুভ্র দুই হাতের আঁজলায় অনিন্দিতার মুখটা তুলে ধরে ওর চোখে চোখ রেখে খুব শান্ত গলায় বলল,
"নন্দিতা, আমার দিকে তাকাও। দরজার বাইরে আমার আব্বু আর কাজি সাহেব আছেন। কেউ তোমার কাছে আসবে না, তোমাকে স্পর্শও করবে না। জাস্ট দশ মিনিট। এই দশ মিনিট তুমি আমার বুকে মুখ লুকিয়ে থাকো, কারো দিকে না তাকালেও চলবে। শুধু কাজী সাহেবের কথা শুনে 'কবুল' বলবে। ঠিক আছে?"
অনিন্দিতা শুভ্রর বুকের ভেতর থেকে মুখ তুলে তাকালো না। ওর মনে হচ্ছে চারপাশের বাতাস বিষাক্ত হয়ে উঠছে, প্রতিটি পুরুষের কণ্ঠস্বর যেন একেকটা শাণিত ছুরির মতো ধেয়ে আসছে ওর দিকে। ওর ছোট্ট শরীরটা কেঁপে কেঁপে উঠছে কেমন। শুভ্র ঝুঁকি নিল না। অনিন্দিতাকে পাঁজাকোলে তুলে নিয়ে নিজের শক্ত বুকের সঙ্গে মিশিয়ে ধরল। তারপর বাইরে দাঁড়ানো সবার উদ্দেশ্যে গম্ভীর গলায় বলল,
"ভেতরে আসুন।"
দরজা খুলে আজিজ রায়হান, কাজী সাহেব, রাবেয়া বেগম, সোনালী বেগম আর অর্ক ভেতরে ঢুকল। অনেক মানুষের উপস্থিতি টের পেতেই অনিন্দিতা কুঁকড়ে গেল আরো বেশি। ওর মাথার ওড়নাটা এমনভাবে ওর মুখ আড়াল করে রেখেছে যে বাইরে থেকে শুধু ওর থরথর করে কাঁপতে থাকা কাঁধদুটো দেখা যাচ্ছে।
শুভ্র ওকে কোলে নিয়েই বিছানায় পিঠ ঠেকিয়ে বসল। কাজী সাহেব বসলেন বিছানা থেকে বেশ খানিকটা দূরে থাকা ডিভানে। ঘরজুড়ে এক অপার্থিব নীরবতা। কাজী সাহেব খাতা খুলে বসলেন। তারপর গলার স্বর পরিষ্কার করে অনিন্দিতার পূর্ণ নাম এবং বাবার নাম উচ্চারণ করে মোহরানা ঘোষণা করলেন। তারপর অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে জিজ্ঞেস করলেন,
"অনিন্দিতা তাসনিম, আপনি কি নগদ দশ লক্ষ টাকা দেনমোহর ধার্য করিয়া জনাব আজিজ রায়হানের একমাত্র পুত্র জনাব তাহমিদ রায়হান শুভ্রকে আপনার স্বামী হিসেবে কবুল করিতে রাজি আছেন? রাজি থাকিলে বলুন, আলহামদুলিল্লাহ, কবুল।"
পুরো সময়টা অনিন্দিতা শুভ্রর বুকের ভেতর মুখ লুকিয়ে ছিল। এই প্রশ্নেও সামান্য কেঁপে উঠল মেয়েটা। শুভ্রর মা-বাবা, অনিন্দিতার মা রাবেয়া এবং অর্ক-- অনিন্দিতার উত্তরের অপেক্ষায় রুদ্ধশ্বাসে দাঁড়িয়ে রইল সবাই। শুভ্র অনুভব করল অনিন্দিতার আঙুলগুলো ওর পাঞ্জাবির বুকের অংশটা ছিঁড়ে ফেলতে চাইছে যেন। ও নিচু হয়ে অনিন্দিতার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
"ভয় পাচ্ছ কেন, ফুল? আমার চোখের দিকে তাকাও। এই চোখে তোমার জন্য এক আকাশ পরিমাণ ভালোবাসা ছাড়া আর কিছু দেখতে পাও কি? তাহলে ভয় কীসের? সবাই তোমার উত্তরের অপেক্ষা করছে, বলে ফেলো..."
অনিন্দিতা খুব ধীরলয়ে শুভ্রর বুক থেকে মুখটা তুলল। শুভ্রর চোখের গভীরতা আর ওই অটল নির্ভরতাটুকু যেন এক নিমেষে ওকে টেনে বের করে নিয়ে এলো সেই অন্ধকার কালকুঠুরি থেকে। অনিন্দিতার ঠোঁট দুটো কয়েকবার কাঁপল, গলার কাছে এক দলা কান্না এসে ভিড় করছিল বারবার। ও শুভ্রর পাঞ্জাবিটা শক্ত করে মুঠো করে ধরে বন্ধ চোখেই খুব ক্ষীণ কিন্তু স্পষ্ট স্বরে বলল,
"আলহামদুলিল্লাহ... ক-কবুল।"
শুভ্রর বুকের ভেতরটা শীতল হয়ে এলো মুহূর্তেই। অনুভব করল, এক নিদারুণ ঝড়ের পর অবশেষে ও ওর মেঘফুলকে টেনে নিতে পেরেছে নিজের নিরাপদ আশ্রয়ে। এরপর কাজী সাহেব শুভ্রর দিকে তাকিয়ে ইজাব-কবুল সম্পন্ন করলেন। শুভ্র এক মুহূর্ত দেরি না করে, অনিন্দিতার পাংশুটে মুখটার দিকে তাকিয়ে পূর্ণ আত্মবিশ্বাসের সাথে গম্ভীর গলায় তিনবার বলল,
"আলহামদুলিল্লাহ, কবুল।"
কাজী সাহেব খাতাটা এগিয়ে দিলে শুভ্র প্রথমে সই করল। তারপর অনিন্দিতার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে ওকে সাহায্য করল সই করতে। অর্ক আর আজিজ সাহেব সই করলেন সাক্ষী হিসেবে। মোনাজাতসহ বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে বেরিয়ে যাওয়ার আগে একে একে আজিজ সাহেব, সোনালী বেগম এবং অনিন্দিতার মা রাবেয়া-- প্রত্যেকেই আলাদা আলাদা করে দোয়া করে গেলেন নব দম্পতির জন্য।
আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর ঘরটা যখন আবার খালি হয়ে গেল, শুভ্র অনিন্দিতাকে বিছানায় শুইয়ে দিতে চাইল, কিন্তু অনিন্দিতা কিছুতেই ওকে ছাড়ল না। ও শুভ্রর পাঞ্জাবিটা খামচে ধরেই কাঁপা গলায় বলল,
"শুভ্র... আমি কি এখন সত্যি সত্যি আপনার?"
ওর নাকে নাক ঘষে ম্লান হাসল শুভ্র,
"তুমি তো প্রথম থেকেই আমার, ফুল। আজকে থেকে আমাদের সম্পর্কটা পুরোপুরি পবিত্র। আর কেউ নেই মাঝে।"
শুভ্র একে একে ওর কপাল, গাল, গলা ছুঁয়ে দেখল। জ্বরটা কমেনি এখনো। টেবিলের ওপর থেকে থার্মোমিটারটা নিয়ে টেম্পারেচার চেক করতেই ওর কপালে চিন্তার ভাঁজগুলো গভীর হলো। ১০৩.২ ডিগ্রি! জ্বর নামার কোন নাম গন্ধই নেই! অনিন্দিতার গায়ে কম্বলটা ভালো করে টেনে দিতে ওর উত্তপ্ত কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল,
"তুমি একটু শুয়ে থাকো, আমি তোমার খাবারটা নিয়েই আসছি। এখন চোখ বুজবে না, খাবারটা খেয়ে আমরা একসাথে ঘুমাবো, ওকে?"
শুভ্র রুম থেকে বেরিয়েই ডক্টরকে ফোন লাগাল প্রথমে। ডক্টর সব শুনে বললেন, "শুভ্র, ওর মেন্টাল ট্রমার কারণে এই হাই ফিভারটা কমছে না। আমি একটা ড্রিপ (স্যালাইন) দেওয়ার ব্যবস্থা করছি, ওটা দিলে জ্বরটা নিয়ন্ত্রণে আসবে এবং শরীরটাও কিছুটা এনার্জি পাবে। আসছি আমি।"
ফোন রেখে শুভ্র নিচে রান্নাঘরে গেল। সোনালী বেগম আর রাবেয়া বেগম তখন অনিন্দিতার জন্য হালকা জাউ ভাত আর স্যুপ তৈরি করছিলেন। শুভ্রকে দেখে রাবেয়া বেগম ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
"শুভ্র, অনুর জ্বর কি কমেছে বাবা?"
শুভ্র মাথা নেড়ে ম্লান হাসল, "এখনো ১০৩-এর উপরে আন্টি। ডক্টর আসছেন স্যালাইন দিতে। আপনারা খাবারটা রেডি করুন, আমি ওকে খাইয়ে দেব।"
শুভ্র খাবার নিয়ে রুমে ফিরে দেখল অনিন্দিতা আধো-ঘুমে প্রলাপ বকছে। ও শিয়রে বসে খুব আলতো করে অনিন্দিতার মাথায় হাত রাখতেই অনিন্দিতা চোখ মেলে তাকাল। শুভ্রকে দেখে খুব ক্ষীণ স্বরে বলল, "তিতা... সব তিতা লাগছে, শুভ্র। আমি খাব না।"
"অল্প একটু খেতে হবে ফুল, না খেলে ওষুধ কাজ করবে না তো.."
কোনরকমে পাঁচ-ছয় চামচ খেয়ে অনিন্দিতা আর খেতে চাইল না। তখনই দরজায় কড়াঘাতের শব্দে দুইজনেই একসাথে তাকালো বন্ধ দরজার পানে। শুভ্র স্যুপের বাটিটা রেখে উঠে গিয়ে দরজা খুলল। ডক্টর সিকদার এসেছেন। দরজায় অপরিচিত একজন পুরুষকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ওর দুচোখে এক লহমায় আবার সেই ভয়াবহ আতঙ্ক ফিরে এলো্। আতঙ্কিত চোখে সেই অপরিচিত পুরুষের পাশে দাঁড়ানো শুভ্রর দিকে তাকিয়ে চাপা গলায় আর্তনাদ করে উঠলো ও।
শুভ্র ঝড়ের গতিতে বিছানায় উঠে অনিন্দিতাকে জাপটে ধরে নিজের বুকের ভেতর আড়াল করে ফেলল। অনিন্দিতা উন্মাদের মতো কাঁপছে, ওর নখগুলো শুভ্রর হাতের চামড়ায় বসে যাচ্ছে।
"শশশ... মেঘফুল, শান্ত হও। উনি ডক্টর আঙ্কেল, সোনা। উনি তোমার জ্বরটা কমাতে এসেছেন শুধু। তাকাও আমার দিকে, আমি তো আছি এখানে। কেউ তোমাকে টাচ করবে না, প্রমিজ!"
ডক্টর সিকদার পরিস্থিতি বুঝে দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে রইলেন। তিনি অভিজ্ঞ মানুষ, জানেন এই ট্রমার গভীরতা কতটুকু। তিনি মৃদু স্বরে শুভ্রকে বললেন, "শুভ্র, ওর প্যানিক অ্যাটাক হচ্ছে। তুমি ওকে রিলাক্স করো, আমি বাইরে অপেক্ষা করছি। শান্ত না হলে স্যালাইন পুশ করা যাবে না।"
***
শুভ্রর ইশারায় ডক্টর সিকদার খুব সন্তর্পণে ঘরে ঢুকলেন। শুভ্র অনিন্দিতার মাথাটা নিজের বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরে রাখল, যাতে ইনজেকশন কিংবা স্যালাইন কোনোটাই দেখতে না পায় ও।
ডক্টর সিকদার অনিন্দিতার উল্টো পাশে বসে শুভ্রকে চোখের ইশারায় বললেন ওর বাম হাতটা আলতো করে বের করে দিতে। শুভ্র বাম হাতটা বাড়িয়ে ধরে অনিন্দিতার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে কথা বলতে লাগল, যাতে ওর মনোযোগ অন্যদিকে থাকে।
"তুমি আমাকে কতখানি ভালোবাসো, নন্দিতা?"
অনিন্দিতা ওর বুকে মুখ গুঁজে থেকেই বিরবির করে বলল,
"এত্ত এত্ত ভালোবাসি.."
কথা বলতে বলতে অনিন্দিতা একটু অন্যমনস্ক হতেই ডক্টর সেই সুযোগে খুব দক্ষ হাতে স্যালাইনের নিডলটা অনিন্দিতার শিরার ভেতর পুশ করে দিলেন। ব্যথার একটা সূক্ষ্ম অনুভূতি হতেই অনিন্দিতা শুভ্রর পাঞ্জাবিটা খামচে ধরে একটা অস্ফুট চিৎকার করে উঠল।
"উমম... শুভ্র!"
"এই তো শেষ, ফুল, উই আর ডান..! দেখো আমি আছি তো..."
শুভ্র ওর মাথায় হাত বুলালো। স্যালাইন চলতে শুরু করার মিনিট দুয়েকের মাঝেই ওষুধের প্রভাবে অনিন্দিতার চোখের পাতাগুলো ভারী হয়ে এলো। প্রচণ্ড ক্লান্তি আর জ্বরের ধকল ওকে যেন ক্রমশ অতলে তলিয়ে দিচ্ছে। শুভ্রর হাতের ওপর ওর মাথাটা ছেড়ে দিতেই শুভ্র খুব সন্তর্পনে ওকে বালিশে শুইয়ে দিয়ে ডক্টর সিকদারের সাথে বাইরে এলো।
বাইরে আসতেই ডক্টর গম্ভীর মুখে বললেন, "শুভ্র, ড্রিপটা চলছে, ঘন্টাখানেকের মাঝেই জ্বরটা নেমে যাবে আশা করি। সাথে আমি একটা মাইল্ড সিডেটিভ দিয়েছি, তার প্রভাবে খানিক্ষণ ভালোই ঘুমাবে। কিন্তু ওর মেন্টাল কন্ডিশন স্টেবল নয়। ও বারবার ফ্ল্যাশব্যাকে ফিরে যাচ্ছে। ওর মনের ভেতর যে ভয়টা ঢুকেছে, সেটা প্রফেশনাল হেল্প ছাড়া কাটানো মুশকিল। ওর মেন্টাল কন্ডিশন দেখে আমি মনে করছি, ওকে যত দ্রুত সম্ভব একজন সাইক্রিয়াটিস্ট দেখালে ভালো হয়। পাশাপাশি আমি সাজেস্ট করব, ওকে কিছুদিনের জন্য এই পরিবেশ থেকে দূরে কোথাও নিয়ে যাও। বিয়েটা হয়েছে খুবই ভালো কথা, কিন্তু ওর মগজে এখনো গতকালের স্মৃতিটা টাটকা। ওকে একটা নতুন মেমোরি দিতে হবে যাতে ও আগেরটা ভুলতে পারে। আই হোপ, আমি কী বলতে চাইছি, তুমি বুঝতে পারছ?"
শুভ্র ডক্টর সিকদারের কথাগুলো খুব গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনল। তারপর জিজ্ঞেস করল, "আপনার পরিচিত ভালো কোন সাইক্রিয়াটিস্ট আছে, আঙ্কেল? যে খুব মন দিয়ে অনিন্দিতার সমস্যাগুলো শুনবে এবং বুঝবে.."
ডক্টর সিকদার কিছুক্ষণ ভেবে বললেন, "আমার একটা স্টুডেন্ট ছিল-- আদিল। আদিল রেদওয়ান। ছেলেটা বর্তমানে নামকরা সাইক্রিয়াটিস্টদের মধ্যে একজন। তবে সমস্যা হলো, ও আছে রাজশাহীতে। ওর কাছে কাউন্সিলিং করাতে হলে তোমাদেরকে রাজশাহীতে যেতে হবে..."
শুভ্র কোন কিছু না ভেবেই বলল, "কিন্তু আঙ্কেল, অনিন্দিতা তো কোনো অপরিচিত পুরুষকেই নিজের আশেপাশে সহ্য করতে পারছে না... আপনি তো নিজে চোখেই দেখলেন..."
ডক্টর সিকদার স্মিত হাসলেন, তবে সেই হাসিতে দুশ্চিন্তার রেশ। তিনি শুভ্রর কাঁধে হাত রেখে বললেন,
"জানি শুভ্র। ট্রমাটা এমনই। তবে আদিল খুব সেনসিটিভলি হ্যান্ডেল করে এসব কেস। প্রথমদিকে ভিডিও কলে কন্সাল্টেশনের মাধ্যমে সেশন শুরু করে, যেখানে পেশেন্ট নিজের পরিচিত পরিবেশে নিজের সবচেয়ে কাছের মানুষের পাশে বসে কথা বলতে পারে। আদিল সরাসরি ট্রিটমেন্টে না গিয়ে প্রথমে একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করবে। ও হয়তো প্রথম দু-তিনদিন অনিন্দিতার সাথে কোনো কথাই বলবে না, জাস্ট তোমার সাথে কথা বলবে আর অনিন্দিতা সেটা দূর থেকে দেখবে বা শুনবে। এতে ওর অবচেতন মনে একটা মেসেজ যাবে যে-- এই লোকটা ক্ষতিকর নয়।"
শুভ্রর কপালে চিন্তার রেখাগুলো কিছুটা শিথিল হলো। ও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "ঠিক আছে আঙ্কেল। আপনি ডক্টর আদিলের সাথে একটু কথা বলে দিন। ও যদি কাল থেকেই একটু সময় দিতে পারে... অনিন্দিতার এই অবস্থা আমি আর সহ্য করতে পারছি না।"
ডক্টর সিকদার মাথা নাড়লেন। "আমি আজকেই ওর সাথে কথা বলে নিচ্ছি। তুমি শুধু ওকে একটু সময় দাও শুভ্র। আর হ্যাঁ, ওর সাথে এখন অতীত নিয়ে কোনো কথা বলবে না। ও যদি নিজে থেকে কিছু বলতে চায়, জাস্ট শুনবে। কোনো জাজমেন্ট বা অতিরিক্ত সিমপ্যাথি দেখাবে না। জাস্ট লেট হার নো দ্যাট ইউ আর দেয়ার।"
ডক্টর চলে যাওয়ার পর শুভ্র ড্রয়িংরুমে ফিরে এল। সেখানে আজিজ সাহেব, সোনালী বেগমসহ অনিন্দিতার মা তখনও বসে আছেন সোফায়। শুভ্রকে দেখে আজিজ সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, "ডক্টর সিকদার কী বললেন রে?"
"উনি একজন ভালো সাইকিয়াট্রিস্টের সাথে কনসাল্ট করার কথা বললেন। রাজশাহীতে একজন সাইকিয়াট্রিস্ট আছে ওনার পরিচিত, ভাবছি তার সাথেই কনসাল্ট করব। আর সাইক্রিয়াটিস্টের পাশাপাশি পরিবেশ পরিবর্তনটাও জরুরি। কাল বা পরশু যদি আমরা রাজশাহীতে যাই... তোমরা কী বলো?"
আজিজ সাহেব কিছুক্ষণ গুম মেরে থেকে মাথা নাড়লেন, "রাজশাহী বেশ শান্ত শহর। ডক্টর সিকদার যখন বলছেন, তখন ওনার ওপর ভরসা রাখা যায়। আর পরিবেশ বদলালে হয়তো ওর ওই বদ্ধ পরিবেশের স্মৃতিগুলো ঝাপসা হবে।"
আজিজ সাহেব আবার বললেন, "তাহলে তোমরা এক কাজ করো, অপরিচিত হোটেল-টোটেলে না উঠে আমাদের ফার্ম হাউসেই ওঠো। বেশ কিছুদিনের ব্যাপার, তাছাড়া ফার্ম হাউসটা তো ফাঁকাই পড়ে আছে। আমি রবিউলকে বলে দিচ্ছি, ওসব ব্যবস্থা করবে। তোমরা সুবিধামতো কাল বা পরশু রওনা হও.."
"সবই ঠিক আছে, কিন্তু মেয়েটা এই শরীরে এতটা রাস্তা জার্নি করতে পারবে, শুভ্র?" সোনালী বেগমের কথায় শুভ্র একটু ভাবল। অনিন্দিতার যা শরীর, এত লম্বা জার্নি ওর জন্য সত্যিই কষ্টকর হবে। শুভ্র মায়ের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, "ঢাকা থেকে রাজশাহী যাওয়ার ডোমেস্টিক ফ্লাইট আছে আম্মু। মাত্র ৪৫-৫০ মিনিট সময় লাগবে। আই থিঙ্ক ইট উইল বি বেটার.."
"কবে যাওয়ার কথা ভাবছো, শুভ্র?" রাবেয়া বেগমের প্রশ্নে শুভ্র নরম গলায় বলল, "কাল সকালে ডক্টর আদিলের সাথে কথা বলে দেখি, আন্টি উনি কী বলে। ততক্ষনে অনিন্দিতার জ্বরটাও একটু কমুক।"
শুভ্র ঘরে ফিরে এলো। তরলের টপটপ শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দ নেই। শুভ্র আলগোছে অনিন্দিতার পাশে গিয়ে বসলো মেয়েটা অঘোরে ঘুমোচ্ছে। স্যালাইনের ড্রপগুলো একটা নির্দিষ্ট ছন্দে পড়ছে, আর সেই ছন্দের সাথে তাল মিলিয়েই যেন অনিন্দিতার বুকের ওঠা-নামাটা এখন অনেক বেশি স্বাভাবিক। ওষুধের প্রভাবে ওর মুখমণ্ডল থেকে যন্ত্রণার ছাপটা অনেকটা মুছে গেছে। শুভ্র ওর গালে হাত রাখল। তাপমাত্রা আগের তুলনায় বেশ কম। শরীর ঘামতে শুরু করেছে।
শুভ্র ওর ঘামভেজা গাল-কপাল খুব আলতো করে মুছে দিয়ে পাশে শুয়ে পড়লো। গতকাল রাত থেকে একফোঁটা ঘুম হয়নি ওর। শরীরটা ক্লান্তিতে ভেঙ্গে আসতে চাইছে যেন।
ঘুমের মধ্যেই হঠাৎ করে শুভ্র অনুভব করল, পাশে শুয়ে থাকা শরীরটা অস্বাভাবিকভাবে নড়াচড়া করছে। অনিন্দিতার অস্ফুট গোঙানি আর হাঁসফাঁস করা শব্দে শুভ্রর ক্লান্ত মস্তিষ্কে পৌঁছানো মাত্রই ঘুমটা এক পলকেই চটকে গেল ওর।
শুভ্র ধড়ফড় করে উঠে বসে ল্যাম্পশেডের আলোটা একটু বাড়িয়ে দিল। দেখল অনিন্দিতা দরদর করে ঘামছে। জ্বরটা ঘাম দিয়ে ছেড়েছে বলেই এই অবস্থা। অনিন্দিতা ঘুমের ঘোরেই হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে কপাল মুছছে আর বিড়বিড় করছে, "গরম... খুব গরম লাগছে... সরাও এটা... সরাও!"
শুভ্র দ্রুত ওর গায়ের ওপর থেকে কম্বলটা সরিয়ে দিল। গায়ের মেরুন কাতান শাড়িটা ঘামে ভিজে শরীরের সাথে লেপ্টে আছে। শুভ্র ভুলেই গিয়েছিল এটা পাল্টে দেবার কথা। মেয়েটার ফর্সা মুখটা ঘামে চকচক করছে, ঘাড়ের কাছের চুলগুলো ভিজে একাকার। শুভ্র তড়িঘড়ি করে এসি-র তাপমাত্রা তিন-ডিগ্রি কমিয়ে দিল। তারপর উঠে গিয়ে নরম একটা তোয়ালে পানিতে ভিজিয়ে নিয়ে খুব যত্ন করে ওর মুখ আর গলা মুছিয়ে দিতে লাগল।
তোয়ালের শীতল স্পর্শে অনিন্দিতা কিছুটা আরাম পেল যেন। ও খুব ধীরে ধীরে চোখের পাতা মেলল। জ্বরের ঘোরটা কেটে যাওয়ায় ওর দৃষ্টি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বচ্ছ। চোখ মেলতেই ও দেখল শুভ্র খুব অস্থির হয়ে ওর ঘাম মুছে দিচ্ছে।
"শুভ্র..." ওর কণ্ঠস্বর একদম নিচু, দুর্বল।
"এই তো আমি, সোনা। জ্বরটা ছেড়েছে, তাই একটু বেশি গরম লাগছে। শরীরটা একদম হালকা লাগছে না এখন?"
শুভ্র হাসার চেষ্টা করল, যদিও ওর চোখে তখনো রাজ্যের দুশ্চিন্তা। অনিন্দিতা কিছুক্ষণ শুভ্রর চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর নিজের পরনের ভারী শাড়িটার দিকে তাকিয়ে অস্বস্তিতে উসখুস করতে করতে বলল,
"এটা বড্ড ভারী... চুলকাচ্ছে সব জায়গায়। আমি এটা পরে থাকতে পারছি না..."
"সরি, ফুল! আমার উচিত ছিল আরো আগেই এটা বদলে দেওয়া। তাহলে শুধু শুধু তোমার ঘুমটা ভাঙতো না। এখন কি তুমি নিজে চেন্জ করতে পারবে, নাকি আমি হেল্প করব?"
অনিন্দিতা ক্লান্ত চোখে শুভ্রর দিকে তাকাল। ওর শরীর এতটাই দুর্বল যে উঠে দাঁড়ানোর শক্তিটুকুও নেই। ও খুব ক্ষীণ স্বরে বলল,
"আপনিই করে দিন... আমি পারব না, শুভ্র!"
"ওকে, ফাইন। তুমি জাস্ট একটু কো-অপারেট করো, কেমন?"
শুভ্র আলমারি থেকে নিজের আরেকটা ঢিলেঢালা, নরম সাদা টি-শার্ট বের করে আনল। পড়নেরটা ঘামে ভিজে লেপ্টে আছে গায়ের সাথে। দ্রুত না বদলালে ঠান্ডা বসে যাবে আবার। ও খুব সাবধানে অনিন্দিতাকে ধরে বসাল। অনিন্দিতা ক্লান্তিতে শুভ্রর কাঁধের ওপর মাথা ছেড়ে দিল।
শুভ্র ওর কাঁধের নিচ থেকে সেফটিপিনটা খুলে আঁচলটা নামিয়ে দিতেই অনিন্দিতা লজ্জা পেল। ফ্যাকাশে গাল দুটো জ্বরের লাল আভা ছাপিয়ে অপার্থিব এক আরক্তিম আভা ধারণ করল তৎক্ষণাৎ।
শুভ্রর হাত দুটো কাঁপছে মৃদু মৃদু, বুকের ভেতর ড্রাম বাজছে। ও নিজেকে যথাসম্ভব সামলে রেখে শাড়ির কুঁচিগুলো আলগা করল। শুভ্র যখন শাড়ির প্রতিটি প্যাঁচ একে একে আলগা করছিল, অনিন্দিতা ওর পাঞ্জাবির হাতাটা খামচে ধরে মুখ নিচু করে রইল। ওর ফর্সা ঘাড় আর কান লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছে।
শুভ্র বুঝতে পারল অনিন্দিতার লজ্জাটুকু। জ্বরের তপ্ত আচ্ছন্নতা কেটে যাওয়ার পর এখন বাস্তবতার প্রতিটি মুহূর্ত ওর কাছে অনেক বেশি প্রখর হয়ে ধরা দিচ্ছে।
শুভ্র শাড়িটা পুরোপুরি খুলে পাশে সরিয়ে রাখতেই অনিন্দিতা নিজের দুই হাত দিয়ে বুক আঁকড়ে ধরে কুঁকড়ে গেল। ওর পরনের ঘামভেজা গেঞ্জিটা পুরোপুরি ভিজে লেপ্টে আছে শরীরের সাথে। শুভ্র খুব আলতো করে অনিন্দিতার থুতনিটা উঁচিয়ে ধরল।
"লজ্জা পাচ্ছ কেন, মেঘফুল? আমি তোমার স্বামী। এখন থেকে তোমার প্রতিটি যন্ত্রণার ভাগ যেমন আমার, তোমার প্রতিটি সংকোচ মোচন করার দায়িত্বও তো আমার। তোমার পুরোশরীর ঘামে ভিজে গেছে, বেশিক্ষণ এভাবে থাকলে আবার ঠান্ডা লেগে জ্বর আসবে। তুমি কি চাও আমি আবার ডক্টর আঙ্কেলকে ডাকি?"
অনিন্দিতা দুদিকে মাথা নাড়ল। শুভ্র যখন টি-শার্টটা পরাতে যাবে, তখনই ওর নজর পড়ল অনিন্দিতার বাম হাতে লাগানো ক্যানোলাটার দিকে। স্যালাইনের পাইপটা তখনো যুক্ত, ফোঁটায় ফোঁটায় জীবনদায়ী তরল মিশছে রক্তে। শুভ্র এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। এই অবস্থায় টি-শার্টটা বদলানো বেশ ঝক্কির কাজ।
অনিন্দিতা ক্লান্ত চোখে শুভ্রর দিকে তাকিয়ে আছে। ওর লজ্জাটা এখন কিছুটা কমে গিয়ে এক অদ্ভুত অসহায়ত্বের রূপ নিয়েছে। শুভ্র ওর দিকে তাকিয়ে ধীরস্থিরভাবে বলল,
"নন্দিতা, আমি এক মিনিটের জন্য লাইনটা ডিসকানেক্ট করব, তারপর টি-শার্টটা পরানো হলেই আবার লাগিয়ে দেব। তুমি ভয় পাবে না, কেমন?"
অনিন্দিতা ক্ষীণ স্বরে বলল, "উঁহু... রক্ত বেরোবে তো!"
"কিচ্ছু হবে না, সোনা। জাস্ট কয়েক সেকেন্ডের ব্যাপার.."
শুভ্র স্যালাইনের কন্ট্রোলারটা অফ করে অনিন্দিতার বাম হাতটা খুব সাবধানে নিজের পায়ের ওপর রাখল। তারপর স্যালাইনের পাইপটা ক্যানুলা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে টি-শার্টের স্লিভ দিয়ে সেটা বের করে নিল। অনিন্দিতা ব্যথার ভয়ে চোখ বুজে শুভ্রর পাঞ্জাবিটা খামচে ধরে কাঁপা গলায় বলল,
"শুভ্র, আপনি.. আপনি চোখ বন্ধ করুন, প্লিজ!"
শুভ্র ম্লান হাসল। ও জানে অনিন্দিতার এই লজ্জাটা ওর স্বাভাবিক জীবনে ফেরার প্রথম ধাপ। নিজের চোখদুটো শক্ত করে বন্ধ করে নিয়ে ও ধীর স্বরে বলল,
"এই যে, বন্ধ করলাম। এবার খুশি?"
চোখ বন্ধ থাকা অবস্থাতেই ও ভেজা টি-শার্টটা অনিন্দিতার মাথার ওপর দিয়ে টেনে খুলে ফেলল। অনিন্দিতা শিউরে উঠল মুহূর্তের জন্য। এই শিউরে উঠা আতঙ্কের নয়, বরং এক অচেনা শিহরণের।
শুভ্র অন্ধের মতো পাশে রাখা শুকনো তোয়ালেটা দিয়ে অনিন্দিতার পিঠ আর বুক খুব সন্তর্পণে মুছে দিল। তোয়ালের খসখসে স্পর্শে অনিন্দিতা সিঁটিয়ে গেল শুভ্রর বুকের ভেতর। শুভ্র অনুভব করতে পারছে অনিন্দিতার তপ্ত নিঃশ্বাস ওর গলার কাছে আছড়ে পড়ছে। শুভ্র শুকনো ঢোক গিলে নিজের কাজ শেষ করল। ঘাম মুছে দেওয়ার পর শুভ্র নিজের ঢিলেঢালা সাদা টি-শার্টটা অনিন্দিতার মাথার ওপর দিয়ে গলিয়ে দিয়ে ওর ডান হাতটা আগে ঢোকাল। তারপর খুব সন্তর্পণে বাম হাতটা, যে হাতে ক্যানোলা লাগানো, সেটা স্লিভের ভেতর দিয়ে বের করে আনল।
পুরো প্রক্রিয়াটা সাবধানে শেষ করে শুভ্র আবার স্যালাইনের পাইপটা ক্যানুলার মুখে সেট করে কন্ট্রোলারটা অন করে দিল।
"হয়ে গেছে! দেখলে কিচ্ছু হয়নি!"
অনিন্দিতা লম্বা একটা শ্বাস নিল। শুকনো টি-শার্টের নরম ছোঁয়ায় ওর শরীরটা অনেক আরাম বোধ করছে এখন। ও ধীরলয়ে আবার শুভ্রর বুকে মাথা রাখল। শুভ্র ওকে শুইয়ে দিয়ে স্যালাইনের ড্রিপটা একবার চেক করল ঠিকঠাক চলছে কিনা।
জ্বর ছেড়ে যাওয়ার পর অনিন্দিতার ফ্যাকাসে মুখটায় এখন শান্ত একটা ভাব ফিরে এসেছে। ও একদৃষ্টিতে শুভ্রর ক্লান্ত মুখ আর বিশ্রামহীন রক্তিম আঁখি যুগলের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মৃদু গলায় বলল, "আপনি কাল থেকে একটুও ঘুমাননি, শুভ্র? বড্ড ক্লান্ত দেখাচ্ছে আপনাকে।"
শুভ্রর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটল। অনিন্দিতার কপালে লেপ্টে থাকা কয়েকটা চুল সরিয়ে দিয়ে ও নরম গলায় বলল,
"ক্লান্তি? যেখানে আমার আস্ত জগতটা যন্ত্রণায় ছটফট করছিল, সেখানে আমার চোখের পাতা এক হওয়ার সাধ্যি আছে, বলো তো? তোমার এই শান্ত মুখটা না দেখা পর্যন্ত আমার ক্লান্তিগুলোও যেন জেদ ধরে বসে ছিল, নন্দিতা।"
শুভ্রর কথা শুনে অনিন্দিতার বুকের ভেতরটা অজানা হাহাকারে দুমড়ে-মুচড়ে উঠল কেমন, "এভাবে রাত জাগলে আপনিও তো অসুস্থ হয়ে পড়বেন, শুভ্র। তখন আমাকে দেখবে কে?" অনিন্দিতা দুর্বলভাবে ওর দিকে একটা হাত বাড়িয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলল, "এখানে আসুন, শুভ্র। আমার কাছে..."
শুভ্র থমকে গেল। মেয়েটার চোখেমুখে রাজ্যের মায়া। ওর বুকের ভেতরটা তোলপাড় হয়ে গেল মুহূর্তেই। মনে হলো, এতক্ষণের সব লড়াই, সব দুশ্চিন্তা আর নির্ঘুম রাতের ক্লান্তি এই একটা ডাকে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেল। ও কথা না বাড়িয়ে একটু ঝুঁকে এসে অনিন্দিতার বাড়িয়ে রাখা দুর্বল হাতটা নিজের গালের ছোঁয়ালো।
পরপর আলতো করে অনিন্দিতার হাতের তালুতে একটা চুমু খেতেই অনিন্দিতা ওর মাথাটা টেনে নিয়ে এলো নিজের বুকের ওপর। তারপর কাঁপাকাঁপা হাতে শুভ্রর অগোছালো চুলে আঙুল চালিয়ে বিলি কাটতে শুরু করল। অনিন্দিতার ঠান্ডা আঙুলগুলো যখন শুভ্রর প্রশস্ত কপাল আর চোখের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছিল, শুভ্রর মনে হলো যেন এক জনম পর শান্তির নিঃশ্বাস ফেলছে ও।
"একটু ঘুমান, শুভ্র... আমি আর ভয় পাবো না। আপনার চোখদুটো খুব লাল হয়ে আছে..." অনিন্দিতা বিড়বিড় করে বলল। ওর আঙুলগুলো তখন শুভ্রর কপালের ভাঁজগুলো মুছে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
শুভ্র অনিন্দিতার কোমরে এক হাত রেখে ওকে ভালোভাবে জড়িয়ে ধরল। তারপর ওর বুকে মুখ গুঁজে দিয়ে একটা তৃপ্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখদুটো বুজে ফেলল। অনিন্দিতার হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি শুনতে পাচ্ছে ও। এই শব্দটাই যেন এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর সুর ওর কাছে।
মিনিটের মধ্যেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল শুভ্র। অনিন্দিতা তাকিয়ে রইল মানুষটার দিকে, যে ওর অন্ধকার জগতটাকে এক নিমেষে আলোয় ভরিয়ে দিয়েছে। ওর মনে হলো, এই মানুষটার বুকের চেয়ে নিরাপদ আশ্রয় এই পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই।
শুভ্রর চুলে হাত বুলাতে বুলাতে অনিন্দিতাও একসময় ঘুমের অতলে তলিয়ে গেল। দুজনের নিশ্বাসের ছন্দ এক হয়ে মিশে রইল নিস্তব্ধ ঘরের বাতাসে। এক ভয়াবহ ঝড়ের পর অবশেষে শান্ত হলো দুজনার পৃথিবী।
To be continued...