ফন্ট সাইজ:
থিম:
মেঘবরণ প্রেম

৩৩তম পর্ব

লেখক: আসফিয়া রহমান

#মেঘবরণ_প্রেম

পর্ব - ৩৩ [রোমান্টিক এলার্ট ‼️]

লেখা - আসফিয়া রহমান

অনুমতি ছাড়া কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ❌

৪৬.

ঢাকার অতি পরিচিত কোলাহলকে পেছনে ফেলে শুভ্রদের গাড়িটা এগিয়ে চলেছে ধূসর পিচঢালা পথ ধরে। জানালার বাইরে দ্রুত গতিতে পেছনে সরে যাচ্ছে চেনা দালানকোঠা আর ল্যাম্পপোস্টগুলো। শুভ্রর কাঁধে মাথা ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে অনিন্দিতা। শুভ্র এক হাতে ওর কোমর জড়িয়ে আর এক হাতে ধরে আছে অনিন্দিতার একটা হাত।

অনিন্দিতা মাঝেমধ্যেই শিউরে উঠছে। জানালার বাইরে বাস কিংবা ট্রাকের হর্নের শব্দ কিংবা ঝাপসা কোনো অবয়ব দেখলেই ও অজান্তেই শুভ্রর শার্টের হাতা খামচে ধরছে। শুভ্র প্রতিবারই ওর হাতে আলতো চাপ দিয়ে মনে করিয়ে দিচ্ছে যে ও আছে, ওর কোনো ভয় নেই।

গাড়ি থেমে যেতেই চোখ মেলল অনিন্দিতা। গাড়ি থেমেছে টার্মিনালের মেইন গেটের সামনে। গাড়ির কাঁচের ওপাশে মানুষের জটলা আর যান্ত্রিক ব্যস্ততা চোখে পড়তেই চোখের মণি দুটো স্থির হয়ে গেল অনিন্দিতার। শুভ্র অনুভব করল, ওর হাতের ভেতর থাকা অনিন্দিতার আঙুলগুলো বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আসছে।

"নামবো আমরা?" অনিন্দিতার ঠান্ডা আঙুলগুলোয় মৃদু চাপ দিয়ে শুভ্র খুব নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল।

"আমি... আমি পারব না শুভ্র। ওখানে অনেক মানুষ... ওরা সবাই আমার দিকে তাকিয়ে আছে।" অনিন্দিতার গলার স্বর কেঁপে উঠল ভয়ে। কথা বলতে বলতেই শুভ্রর হাতটা খামচে ধরলো ও।

শুভ্র ওর অস্থিরতা বুঝতে পেরে হাতটা টেনে নিয়ে চুমু খেল। অনিন্দিতার সানগ্লাসটা ঠিক করে দিয়ে ওর কান ঘেঁষে খুব নিচু স্বরে বলল, "কারো দিকে তাকাবে না, জাস্ট ফোকাস অন মি, ওকে?"

গাড়ির দরজা খুলতেই বাতাসের ঝাপটা আর মানুষের কোলাহল আছড়ে পড়ল ভেতরে। অনিন্দিতা এক পা-ও নড়তে চাইল না। ও সিটের সাথে নিজেকে আরও সেঁধিয়ে নিল। শুভ্র দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে অন্যপাশে এসে দরজা খুলল। তারপর কোনোরকম অনুমতির অপেক্ষা না করেই অনিন্দিতাকে পাঁজাকোলে তুলে নিল। অনিন্দিতা ভয় পেয়ে ওর গলা জড়িয়ে ধরল তৎক্ষণাৎ। মুখ লুকিয়ে ফেলল শুভ্রর গলার খাঁজে।

সিকিউরিটি চেক আর স্ক্যানিংয়ের লাইনে দাঁড়িয়ে শুভ্রর কোলে থাকা অবস্থাতেই অনিন্দিতা ঘামতে শুরু করেছে। ওর মনে হচ্ছে চারপাশের প্রতিটি পুরুষ ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। এক জোড়া লোলুপ দৃষ্টি যেন হাজার জোড়া হয়ে ফিরে এসেছে এখানে।

অনিন্দিতার শ্বাস-প্রশ্বাস ক্রমশ অনিয়মিত হয়ে আসছে। মানুষের কোলাহল আর অপরিচিত পুরুষদের গলার স্বর যেনহাতুড়ির মতো আঘাত করছে ওর মগজে।

শুভ্রর বুকের ভেতরে হৃদপিণ্ডটা সজোরে একটা ধাক্কা খেল। ও অনুভব করতে পারছে অনিন্দিতার শরীরটা আবার আড়ষ্ট হয়ে আসছে, ঠিক যেমনটা ভোরের প্যানিক অ্যাটাকের সময় হয়েছিল। ওর উত্তপ্ত আর দ্রুত নিঃশ্বাসগুলো শুভ্রর গলার চামড়ায় বিঁধছে আগুনের হলকার মতো।

"অনিন্দিতা, ব্রিদ... জাস্ট ব্রিদ। রিল্যাক্স.. আমি আছি তো!" শুভ্র ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, কিন্তু অনিন্দিতার কানে তখন কেবল নিজের হৃদপিণ্ডের ড্রাম বাজছে।

লাইনের আগে-পিছের দু-একজন উৎসুক চোখে তাকাতেই অনিন্দিতা শুভ্রর শার্টটা এত জোরে খামচে ধরল যে বোতাম ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম। শুভ্র দেখল পরিস্থিতি হাতের বাইরে যাচ্ছে। ও আর লাইনের তোয়াক্কা করল না। সামনে থাকা সিকিউরিটি অফিসারকে নিজের কাগজপত্র দেখিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, "মাই ওয়াইফ ইজ ভেরি সিক। আমাদের ইমার্জেন্সি অ্যাসিস্ট্যান্স দরকার। ক্যান ইউ প্লিজ ক্লিয়ার দ্য ওয়ে?"

শুভ্রর ব্যক্তিত্ব আর অনিন্দিতার অবস্থা বিবেচনায় অফিসার পথ ছেড়ে দিলেন দ্রুত। শুভ্র প্রায় দৌড়ে সিকিউরিটি পার হয়ে লাউঞ্জের এক কোণায় তুলনামূলক নিরিবিলি একটা জায়গায় গিয়ে বসল। অনিন্দিতাকে কোল থেকে নামাল না ও। মুখটা একহাতে উঁচু করে শুভ্র ওর কাছাকাছি ঝুঁকে এলো।

"মেঘফুল! আমার দিকে তাকাও! ইনহেল... এক্সহেল... লম্বা শ্বাস নাও!"

অনিন্দিতার মুখটা ফ্যাকাসে থেকে এখন কালচে হয়ে আসছে অক্সিজেনের অভাবে। ও হাঁ করে বাতাস টেনে নেওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু প্রতিটি নিঃশ্বাস যেন গলার মাঝপথে আটকে যাচ্ছে। ওর চোখের মণি দুটো স্থির হয়ে গেছে আতঙ্কে।

শুভ্র অনিন্দিতার একটা হাত টেনে নিজের বুকের বাঁ পাশে চেপে ধরলো, "ফিল মাই হার্টবিট, নন্দিতা। আমার সাথে সাথে শ্বাস নাও। ওয়ান... টু... থ্রি..."

শুভ্র খুব জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগল যাতে অনিন্দিতা শব্দটা অনুসরণ করতে পারে। বেশ কয়েকবার চেষ্টার পর অনিন্দিতা একটা দীর্ঘ, কষ্টকর শ্বাস নিতে পারল। ফুসফুসে অক্সিজেন পৌঁছানো মাত্রই নিস্তেজ হয়ে শুভ্রর বুকে এলিয়ে পড়লো দূর্বল শরীরটা।

লাউঞ্জের কোণায় শুভ্র প্রায় দশ মিনিট ওভাবেই ধরে বসে রইল অনিন্দিতাকে। অনিন্দিতার শরীরটা তখনো কাঁপছে, তবে সেটা এখন ভয়ের চেয়েও বেশি দুর্বলতার। ওর কপালে জমে থাকা ঘামের বিন্দুগুলো শুভ্র নিজের রুমাল দিয়ে মুছে দিয়েছে শুভ্র।

"একটু ভালো লাগছে এখন?" শুভ্র খুব নরম স্বরে জিজ্ঞেস করল।

অনিন্দিতা উত্তর না দিয়ে শুভ্রর শার্টের কলারটা আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরল শুধু। ওর চোখদুটো বোজা, যেন চোখ মেললেই আবার সেই হাজার জোড়া লোলুপ দৃষ্টি গিলে খাবে ওকে।

ফ্লাইট অ্যানাউন্সমেন্ট হতেই শুভ্রর কপালে দুশ্চিন্তার রেখা ফুটে উঠল। এই অবস্থায় মেয়েটাকে প্লেনে তোলা কতটা নিরাপদ হবে বুঝতে পারছে না ও। ওর কানে বাজছে ডক্টর সিকদারের কথাটা-- 'পরিবেশ বদলানো জরুরি'। ঢাকা শহরটা এখন অনিন্দিতার জন্য একটা জীবন্ত বিভীষিকা।

শুভ্র অনিন্দিতাকে হুইলচেয়ারে বসানোর কথা ভেবেছিল, কিন্তু এখন দেখল সেটা সম্ভব নয়। অনিন্দিতা ওকে এক সেকেন্ডের জন্যেও ছাড়তে নারাজ। অগত্যা ও অনিন্দিতাকে আবার পাঁজাকোলে তুলে নিয়েই গেটের দিকে এগোলো। মানুষ তাকাচ্ছিল, ফিসফাস করছিল কেউ কেউ, কিন্তু শুভ্রর চোয়াল ইস্পাতকঠিন। ওর দৃষ্টিতে যেন স্পষ্ট করে লেখা-- 'আমার পৃথিবীর দিকে তাকালে আমি ছারখার করে দেব সবকিছু'।

প্লেনে উঠে শুভ্র অনিন্দিতাকে উইন্ডো সিটে বসিয়ে নিজে বসলো পাশের সিটে। অনিন্দিতা চোখ মেলে তাকালো, শুভ্র পাশে আছে কিনা নিশ্চিত হতে। ওকে তাকাতে দেখেই শুভ্র ওর গালে হাত রেখে ঝুঁকে এসে কপালে একটা উষ্ণ পরশ এঁকে দিল।

"কষ্ট হচ্ছে এখনো?"

অনিন্দিতা ক্লান্ত চোখে দুদিকে মাথা নাড়লো। এয়ার হোস্টেস এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন কোনো হেল্প লাগবে কিনা। শুভ্র শান্ত গলায় একটা পানির বোতল চাইল।

প্লেন যখন রানওয়েতে ট্যাক্সিং শুরু করল, ইঞ্জিনের সেই তীব্র ঘরঘর শব্দে অনিন্দিতা আবার কুঁকড়ে গেল। ওর মনে হলো চারপাশটা প্রচণ্ড বেগে কাঁপছে, যেন কোনো এক বিশাল ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হতে যাচ্ছে। ও দুই হাত দিয়ে নিজের কান চেপে ধরে চোখ বুজে ফেলল সজোরে।

শুভ্র তৎক্ষণাৎ সিটবেল্টের ওপর দিয়েই অনিন্দিতাকে নিজের এক বাহু দিয়ে জড়িয়ে ধরে ওর দুই হাত নিজের একটা হাতের মুঠোয় নিয়ে আরেকটা হাত ওর কানের ওপর চেপে ধরে আড়াল করে নিল সব শব্দ থেকে।

"নন্দিতা, আমার দিকে তাকাও। স্রেফ কয়েক সেকেন্ড.. আমরা মেঘের ওপর চলে গেলেই সব শান্ত হয়ে যাবে।"

প্লেন যখন রানওয়ে ধরে তীব্র গতিতে দৌড়াতে শুরু করল, অনিন্দিতার বুকটা ধক করে উঠল। ওপরের দিকে ওঠার 'জি-ফোর্স' ওর অসুস্থ শরীরে অসহ্য এক চাপ তৈরি করল। ওর মনে হলো ও নিচে পড়ে যাচ্ছে, কেউ ওকে সজোরে ঠেলে দিচ্ছে অতল গহ্বরে। ও অস্ফুট একটা চিৎকার দিয়ে শুভ্রর শার্টটা খামচে ধরল।

শুভ্র এবার সিটবেল্টের তোয়াক্কা করল না। সিটের মাঝখানের হ্যান্ডরেস্টটা তুলে দিয়ে অনিন্দিতাকে একপ্রকার নিজের শরীরের সাথে লেপ্টে ধরল। ওর মুখটা অনিন্দিতার কানের খুব কাছে নিয়ে ফিসফিস করে বলতে লাগল, "তাকাও জানালার বাইরে, ফুল। দেখো, ওই বিষাক্ত শহরটা কেমন ছোট হয়ে যাচ্ছে। তোমার সব ভয়, সব কান্না ওই নিচে ফেলে আসছি আমরা।"

শুভ্রর শরীরের পরিচিত ঘ্রাণটা ধীরে ধীরে কাজ করতে শুরু করল অনিন্দিতার ওপর। প্লেন যখন মেঘের স্তর ভেদ করে ওপরে উঠে এল, চারপাশটা হঠাৎ করেই অদ্ভুত শান্ত হয়ে গেল। জানালার বাইরে তুলোর মতো সাদা মেঘের ভেলা আর পড়ন্ত বিকেলের সোনালী আভা দেখে অনিন্দিতা মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে রইল জানালার বাইরে।

"এখন ঠিক লাগছে?" শুভ্র ওর কানের লতিতে ঠোঁট ছুঁইয়ে জিজ্ঞেস করল।

অনিন্দিতা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানালা থেকে মুখ ফিরিয়ে শুভ্রর বুকে মুখ গুঁজল। শরীরটা ক্লান্তিতে ভেঙে আসছে ওর। শুভ্র ওর চুলের ভাঁজে হাত বুলালো।

জানালার বাইরে মেঘের গালিচায় অস্তগামী সূর্যের শেষ আভাটা যখন লুকোচুরি খেলছে, অনিন্দিতার চোখের পাতা দুটো তখন বুজে এল ক্লান্তির ভারে। ভোরের প্যানিক অ্যাটাক, সারা দুপুরের অস্থিরতা আর বিমানবন্দরের দমবন্ধ করা ভিড়-- সব মিলিয়ে ওর ছোট্ট শরীরটা আর ধকল নিতে পারছে না।

শুভ্র অনুভব করল ওর শার্টের ওপর থেকে অনিন্দিতার মুঠোটা ধীরে ধীরে আলগা হয়ে আসছে। ভারী নিঃশ্বাসগুলো এখন নিয়মিত হয়ে শুভ্রর বুকে আছড়ে পড়ছে। শুভ্র খুব সাবধানে ওর মাথাটা নিজের বুকে সুবিধাজনকভাবে গুছিয়ে নিল, যাতে ঘাড়ে ব্যথা না লাগে। তারপর একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ঘুমন্ত স্ত্রীর ফ্যাকাশে মুখটার দিকে।

ঢাকা থেকে রাজশাহীর ৪৫ মিনিটের ফ্লাইটে অনিন্দিতা একবারের জন্যও নড়ল না। ওর শরীরটা শুভ্রর ওপর সম্পূর্ণ ভর দিয়ে নিস্তেজ হয়ে ঘুমিয়ে রইল পুরোটা সময়।

শুভ্র জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখল দিগন্তের সূর্যটা তখন টকটকে লাল হয়ে হারিয়ে যাচ্ছে মেঘের আড়ালে। ওর মনে হলো, এই সূর্যাস্তের সাথে সাথে অনিন্দিতার জীবনের বিভীষিকাময় অধ্যায়টাও যেন চিরতরে ডুবে যায়।

৪৭.

ঢাকা টু রাজশাহীর ডোমেস্টিক ফ্লাইটটা যখন শাহ মখদুম বিমানবন্দরে ল্যান্ড করল, তখন রাস্তার দু'ধারে ফুটে থাকা নাম না জানা ঘাসফুলগুলোর ওপর তখন শোভা পাচ্ছে গোধূলির ম্লান আলো। শুভ্র খুব সন্তর্পণে ওর সিটবেল্ট খুলে দিয়ে অনিন্দিতার মাথাটা নিজের কাঁধে রেখে ওর কপালে একটা দীর্ঘ চুমু খেল। পুরো প্লেন খালি হওয়ার অপেক্ষায় ও কিছুক্ষণ বসে রইল ওভাবেই। এয়ার হোস্টেস এগিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করতে চাইলে শুভ্র হাতের ইশারায় চুপ থাকতে বললো তাকে।

সবাই নেমে যাওয়ার পর শুভ্র অনিন্দিতাকে পাঁজাকোলে তুলে নিল। এয়ারপোর্টের কর্মীদের সহায়তায় ওকে নিয়ে বাইরে আসতেই দেখল ওদের ফার্ম হাউসের বিশ্বস্ত কেয়ারটেকার রবিউল মিয়া দাঁড়িয়ে।

শুভ্রকে দেখেই রবিউল মিয়া এগিয়ে এলেন,

"আসসালামুয়ালাইকুম, ছোট সাহেব! আম্মাজানের শরীর কি খুব খারাপ?" রবিউলের গলায় অকৃত্রিম উদ্বেগ।

"ওয়ালাইকুম আসসালাম রবি চাচা। ও একটু ক্লান্ত, ঘুমোচ্ছে। আপনি দ্রুত গাড়ি ছাড়ুন..."

শুভ্রর কথা শুনে রবিউল মিয়া দ্রুত গাড়ির পেছনের দরজা খুলে দিলেন। শুভ্র অনিন্দিতাকে নিয়ে পেছনের সিটে বসল, অনিন্দিতার মাথাটা নিজের কোলে নিয়ে ও রবিউলকে ইশারা করল রওনা হতে।

শহরের যান্ত্রিকতা ছাড়িয়ে গাড়ি যখন আমবাগানের ভেতরের পথ ধরে এগোতে শুরু করল, চারপাশটা তখন ঢেকে গেছে গাঢ় অন্ধকারে। গাড়ির হেডলাইটের আলোয় মাঝে মাঝে কেবল দৃশ্যমান হচ্ছে রাস্তার ধারের সারি সারি গাছগুলো। অনিন্দিতা ঘুমের মধ্যেই একবার কেঁপে উঠে বিড়বিড় করল, "যেও না..."

শুভ্র ওর চুলে আঙুল চালিয়ে ফিসফিস করে বলল, "আমি এখানেই আছি, নন্দিতা। কোথাও যাচ্ছি না।"

লোহার গেটের সামনে এসে দুবার হর্ণ দিতেই রবিউল মিয়ার স্ত্রী এসে গেট খুলে দিল। ফার্ম হাউসের পোর্চে থামতেই চারপাশের নিস্তব্ধতা যেন আরও ঘনীভূত হলো। এখানকার বাতাস একদম স্বচ্ছ, মৃদুমন্দ বাতাসে পাতার খসখস শব্দ হচ্ছে থেকে থেকে। ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা ডাকের শব্দে মুখরিত সন্ধ্যের অন্ধকার।

শুভ্র খুব সাবধানে অনিন্দিতাকে কোলে নিয়ে গাড়ি থেকে নামল। রবিউলের স্ত্রী জোহরা ততক্ষণে এগিয়ে এসেছে গাড়ির কাছে। কৌতূহলী চোখে দেখছে শুভ্র কোলে ঘুমিয়ে থাকা অনিন্দিতাকে। শুভ্র রবিউল মিয়াকে লাগেজটা ঘরে নিয়ে আসতে ইশারা করে দোতলার দক্ষিণ দিকের বড় ঘরটাতে উঠে এলো। এই ঘরটা শুভ্রর খুব প্রিয়; জানালার ঠিক পাশেই বিশাল একটা আমগাছ, ডালপালাগুলো ছেয়ে রাখে বারান্দাটাকে।

ঘরটা পরিপাটি করে গুছিয়ে রাখা। বিছানায় বেগুনি রঙের চাদর পাতা, বিছানার পাশের টেবিলে পানিভর্তি জগ-গ্লাস। সোনালী বেগম সম্ভবত আগে থেকেই সব বলে রেখেছিলেন।

ঠান্ডা বিছানায় শরীর ঠেকতেই চমকে উঠে চোখ মেলল অনিন্দিতা। এক মুহূর্তের জন্য চোখদুটোতে সেই পুরনো আতঙ্কটা চিকচিক করে উঠতে চাইলেও চোখ মেলতেই শুভ্রর শান্ত মুখটা নজরে আসতেই থিতিয়ে এলো সেটা। তবে অপরিচিত ঘর আর চারপাশটা চিনতে না পেরে ও হুট করে খামচে ধরল শুভ্রর হাতটা।

"এটা কোথায়, শুভ্র? আমরা কোথায়?" ওর কণ্ঠে চাপা আতঙ্ক।

শুভ্র ওর পাশে বসে ওকে নিজের সাথে জড়িয়ে ধরল, "শান্ত হও ফুল। এটা আমাদের ফার্ম হাউস। আমরা পৌঁছে গেছি আমাদের রূপকথার রাজ্যে।"

অনিন্দিতা বিমূঢ় হয়ে জানালার দিকে তাকাল। চাঁদের ম্লান আলো এসে পড়েছে গাছের মাথায়। ঝাউ আর আমগাছের পাতারা বাতাসের তোড়ে এমনভাবে মাথা দোলাচ্ছে মাঝে মাঝে যেন কোনো প্রাচীন রহস্যের কথা বলছে ওরা। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকটা এখানে এত স্পষ্ট যে মনে হচ্ছে ঘরের ভেতর থেকেই আসছে একটানা শব্দটা।

"আমরা... আমরা কি আসলেই ঢাকার বাইরে চলে এসেছি শুভ্র?" অনিন্দিতার কণ্ঠে ঘোর। যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না যে দু-তিন ঘণ্টার ব্যবধানে ও সেই দমবন্ধ করা পরিবেশ থেকে মুক্তি পেয়েছে।

শুভ্র ওর কপালে এসে পড়া কয়েকটা অবাধ্য চুল সরিয়ে দিয়ে ম্লান হাসল, "হ্যাঁ নন্দিতা। এই রূপকথার রাজ্যে এবার নতুন করে আমাদের জীবন শুরু করবো আমরা..."

দরজায় টোকা পড়লো। অনিন্দিতা কুঁকড়ে গেল আগন্তুক নারীকে দেখতেই। রবিউলের স্ত্রী জোবেদা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে নরম গলায় বলল, "ছোট সাহেব, আমি ওনার জন্য একটু গরম দুধ আর খাবার নিয়ে আসি? আম্মাজান তো সারা পথ কিছুই খাননি।"

শুভ্র অনুভব করল মেয়েটার কাঁপুনি। ও জোবেদাকে উদ্দেশ্য করে বলল, "হ্যাঁ জোবেদা খালা, খাবারটা রেডি করে দিন। তবে এখানে নয়, আমরা ফ্রেশ হয়ে ড্রয়িংরুমে আসছি।"

জোহরা চলে যেতেই অনিন্দিতা শুভ্রর শার্টের হাতা টেনে ধরল। "আপনি যে বললেন এখানে কেউ নেই, তাহলে ওটা কে, শুভ্র? আমার খুব ভয় করছে, এখানে কি আরো অনেক মানুষ আছে?"

শুভ্র বুঝতে পারল, অনিন্দিতার মস্তিষ্কে 'অপরিচিত মানুষ' মানেই এখন এক প্রবল ভীতির উৎস। ও অনিন্দিতার দুহাতে নিজের মুখটা আগলে ধরল, যাতে ওর দৃষ্টি কেবল শুভ্রর চোখের ওপর স্থির থাকে।

"কেউ নেই, নন্দিতা। রবি চাচা আর জোবেদা খালা এ বাড়ির মানুষ নয়, এ বাড়ির অংশ। আমি যখন ছোট ছিলাম, এই আমবাগানে পড়ে গিয়ে হাঁটু ছিলে ফেলতাম, জোবেদা খালাই তখন হলুদ বাটা লাগিয়ে দিতেন। ওরা শুধু আমাদের খেয়াল রাখবেন। এছাড়া এই পুরো সীমানায় তৃতীয় কোনো মানুষ নেই।"

শুভ্রর শান্ত গলার স্বরে অনিন্দিতার বুকের ধুকপুকানি কিছুটা স্তিমিত হলো। জানালার ওপারে অন্ধকারে দুলতে থাকা ছায়াগুলোর দিকে মেয়েটা একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। শুভ্র ওকে পাঁজাকোলে তুলে নিয়ে বাথরুমের দিকে এগোলো।

নিজ হাতে ওকে ফ্রেশ করিয়ে দিয়ে নিজের একটা বড় টি-শার্ট আর পাতলা প্লাজু পরিয়ে দিল। অনিন্দিতার ফ্যাকাশে চেহারায় তখন রাজ্যের ক্লান্তি।

শুভ্র ওকে ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসিয়ে ওর চুলের জটগুলো ছাড়িয়ে দিতে শুরু করল। চিরুনির প্রতিটি টানে অনিন্দিতার শরীরটা একবার করে কেঁপে উঠছে। শুভ্র ওর ঘাড়ের কাছে ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বলল, "দেখো তো, এই সাদা টি-শার্টে আমার মেঘফুলকে ঠিক কার মতো লাগছে? মনে হচ্ছে কোনো একটা শুভ্র মেঘের খণ্ড ভুল করে এই মাটিতে নেমে এসেছে।"

নিজের প্রতিবিম্ব থেকে এতক্ষণ মুখ ফিরিয়ে থাকা অনিন্দিতা এবার পিটপিট করে আয়নায় চাইলো।

সেই প্রাণোচ্ছ্বল মেয়েটা যেন কোথায় হারিয়ে গেছে। আয়নার প্রতিবিম্বে যাকে দেখা যাচ্ছে তার চোখের নিচে কালচে ছায়া, ঠোঁটের শুষ্কতা সাক্ষ্য দিচ্ছে চরম বিধ্বস্ততার। বড়োসড়ো টি-শার্টের ভেতর ছোট্ট শরীরটা প্রায় অদৃশ্য যেন।

নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে পাথর হয়ে রইল অনিন্দিতা। শুভ্র আয়নার ভেতর দিয়েই অনিন্দিতার চোখের ভাষা বুঝলো বোধহয়। চিরুনিটা সরিয়ে রেখে পেছন থেকে ওকে জড়িয়ে ধরে মাথায় একটা চুমু খেয়ে নরম গলায় বললো, "চলো, জোবেদা খালা খাবার সাজিয়ে অপেক্ষা করছেন..."

ড্রয়িংরুমটা বড়সড়, কাঠের ভারী আসবাবে সাজানো। এক কোণে একটা পুরোনো গ্রামোফোন আর অন্য কোণে বিশাল একটা বুকশেলফ। ড্রয়িংরুমের পাশেই ডাইনিং।

কাঠের পুরনো ডাইনিং টেবিলে ধোঁয়া ওঠা জাউ ভাত, পাতলা করে রান্না করা দেশি মুরগির ঝোল সাজানো। অনিন্দিতার সামনে একটা ধোয়া কাঁসার প্লেটে খাবার বেড়ে নিয়ে শুভ্র ওর পাশের চেয়ারে বসল।

"একটু খাও, ফুল। দেখো, জোবেদা খালা খুব যত্ন করে রান্না করেছেন।"

অনিন্দিতা প্লেটের দিকে তাকিয়ে রইল। জোবেদা খালা দূর থেকে পানির জগ নিয়ে আসছিলেন, সেটা দেখেই অনিন্দিতা মাথা নিচু করে শুভ্রর গা ঘেঁষে বসল। শুভ্র ইশারায় জোবেদা খালাকে চলে যেতে বলল। খালা বুঝতে পেরে জগটা টেবিলে রেখেই নিঃশব্দে রান্নাঘরে গেলেন।

প্লেটের দিকে একপলক তাকিয়েই অনিন্দিতা মুখ ফিরিয়ে নিল। কণ্ঠনালীটা যেন সংকুচিত হয়ে আসছে কিসের এক আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধনে। একটু আগে দেখে আসা বিধ্বস্ত প্রতিবিম্বটা বারবার ভেসে উঠছে ওর চোখের সামনে। ওই ফ্যাকাসে মুখ, চোখের কোণের কালি-- সব যেন ওকে বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে ও আর আগের মতো নেই।

শুভ্র ভাতের সাথে সামান্য ঝোল মাখিয়ে ছোট একটা লোকমা ওর ঠোঁটের কাছে ধরল, "নাও, হা করো.."

"আমার বমি আসছে, শুভ্র। আমি খেতে পারব না..." অনিন্দিতার স্বরটা কান্নার মতো শোনাল, টলটলে দৃষ্টি স্থির টেবিলের এক কোণে।

শুভ্র আলতো করে ওর চিবুক ধরে নিজের দিকে ফেরালো। চোখের কার্নিশে নোনা জল টলমল করছে মেয়েটার। বৃদ্ধাঙ্গুলে নোনা জলটুকু উপচে পড়ার আগেই মুছে দিয়ে কপালে ঠোঁট ছোঁয়ালো শুভ্র।

"নিজের জন্য না হলেও আমার জন্য খাও। একটু খাবে, খুব বেশি না, ঠিকাছে? এই খাবারটা জোবেদা খালা অনেক আশা নিয়ে রান্না করেছেন। তুমি না খেলে উনি ভাববেন ওনার রান্না পছন্দ হয়নি..."

এক মুহূর্ত শুভ্রর চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে হার মানল অনিন্দিতা। খুব অনিচ্ছাসত্ত্বেও মুখ খুলল ও। এক লোকমা, দু লোকমা-- প্রতিটি গ্রাস যেন গলায় কাঁটার মতো বিঁধছে। তিন-চার লোকমা যেতেই শুভ্রর হাত সরিয়ে দিল ও।

জোর করলে হিতে বিপরীত হতে পারে ভেবে শুভ্র আর জোর না করে পানির গ্লাসটা ওর ঠোঁটে ধরল।

"পাঁচ মিনিট বসো। আমার খাবারটা শেষ করেই একসাথে উপরে যাব আমরা, ঠিক আছে?"

অনিন্দিতা মাথা নাড়ল। পরপরই প্লেটের দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠল। শুভ্র ওর এঁটো করা প্লেটে নিজের ভাত বাড়ছে। খপ করে শুভ্রর বাঁ হাতটা চেপে ধরল ও।

"শুভ্র... কী করছেন কী? ওটা তো আমার এঁটো প্লেট... আমি মাত্র ওখান থেকে খেলাম।" অনিন্দিতার চোখেমুখে রাজ্যের বিস্ময়, "আপনি নতুন প্লেটে খাবার নিন!"

শুভ্র ওর হাতের বাঁধন ছাড়াল না, বরং ওর আঙুলগুলোর ওপর নিজের বুড়ো আঙুলটা আলতো করে ঘষতে ঘষতে নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল, "অর্ধাঙ্গিনীর খাওয়া খাবার এঁটো হয় না, নন্দিতা। বরং তার ছোঁয়া থাকলে খাবারটা আরও বেশি সুস্বাদু হয়..."

অনিন্দিতা নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইল। ও গল্পে শুনেছে, ভালোবাসার মানুষের এঁটো খেলে নাকি ভালোবাসা বাড়ে। কিন্তু এই অন্ধকার সময়ে, যখন ও নিজেই নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে অপবিত্র আর কুৎসিত বস্তু মনে করছে, তখন শুভ্রর এই সহজ স্বাভাবিকতা ওর হৃদপিণ্ডের ওপর থেকে বিশাল এক পাথর সরিয়ে দিল যেন। শুভ্র ওকে ঘৃণা করছে না, ওর উচ্ছিষ্ট খেতেও সংকুচিত হচ্ছে না-- এই অতি সাধারণ কাজটুকুই অনিন্দিতার হীনম্মন্যতার মূলে কুঠারাঘাত করল।

শুভ্র নিজের প্লেট থেকে এক লোকমা ভাত মেখে অনিন্দিতার ঠোঁটের কাছে ধরল আবার।

শুভ্রর 'অস্বাভাবিক' সহজ ভঙ্গিটা অনিন্দিতাকে এক অদ্ভুত মোহে আবিষ্ট করে ফেলেছে যেন। মেয়েটা নিঃশব্দে মুখ খুলল। মুখের খাবারটুকু শেষ করতেই শুভ্র আরেক লোকমা তুলে ধরল। বাড়িয়ে ধরার লোকমাটা মুখে তুলে অনিন্দিতা অস্ফুট স্বরে বলল, "আর না। আপনি খাওয়া শেষ করুন।"

গরম দুধ ভর্তি গ্লাস নিয়ে জোবেদা খালাকে ড্রয়িংরুমে ঢুকতে দেখেই অনিন্দিতা আড়ষ্ট হয়ে গেল আবার।

শুভ্র খালার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, "খালা, দুধের গ্লাসটা ওপরের ঘরে রেখে দিন। আমরা হাত ধুয়েই আসছি।"

জোবেদা খালা নিঃশব্দে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে গেলেন। শুভ্র বেসিনে হাত ধুয়ে এসে অনিন্দিতার হাতদুটোও ধুইয়ে দিল। শুভ্র আবার ওকে কোলে তুলে নিতে চাইলে অনিন্দিতা এবার মৃদু প্রতিবাদ করল, "শুভ্র... এতটুকু হাঁটতে পারব আমি।"

শুভ্র ওর কথা কানে তুলল না। সাবধানে ওকে পাজাকোলে তুলে নিয়ে নাকের ডগায় টুপ করে একটা চুমু খেয়ে সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে মৃদুকন্ঠে বলল, "হাঁটতে পারলেই আমি দেবো কেন? নিজের নববধূকে কোলে নেয়ার পূর্ণ অধিকার আছে আমার..!"

অনিন্দিতা লজ্জায় মুখ লুকাল শুভ্রর গলার খাঁজে। ঘরে ঢুকে অনিন্দিতাকে বিছানায় নামিয়ে দিয়ে বেড সাইড টেবিল থেকে দুধের গ্লাসটা নিয়ে ওর পাশে বসলো শুভ্র।

"লক্ষ্মী মেয়ের মতো দুধটুকু শেষ করে আমরা ঘুমাবো, নাও..."

অনিন্দিতা বাড়িয়ে ধরা গ্লাসটার দিকে এক পলক তাকিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিল, "এটা খাব না, শুভ্র! ভাল্লাগে না আমার..."

শুভ্র হাসল। প্রশ্রয় মাখানো হাসি। গ্লাসটা নিজেই অনিন্দিতার ঠোঁটের কাছে ধরে নরম গলায় বলল,

"উম... ভেবেছিলাম, কাল সকালে তোমাকে পুরো জায়গাটা ঘুরিয়ে দেখাবো। কিন্তু তোমার শরীর যদি এরকমই দুর্বল থাকে তাহলে যাবে কী করে, বলো?"

অনিন্দিতা আরও একবার হার মানল শুভ্রর চোখে তাকিয়ে। ওই চোখের মনিতে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে ওর কেন যেন মনে হলো, এই মানুষটার অবাধ্য হওয়া ওর সাধ্যের বাইরে। বাধ্য মেয়ের মতো ছোট ছোট চুমুকে অর্ধেকটা দুধ খেয়ে নিয়ে গ্লাসটা সরিয়ে দিল ও।

দুধের সাদা ফেনার একটা সূক্ষ্ম রেখা লেগে আছে অনিন্দিতার ওপরের ঠোঁটে। শুভ্র নিজের বুড়ো আঙুল দিয়ে খুব আলতো করে সেই রেখাটা মুছে দিয়ে নিজের আঙুলে একটা চুমু খেল। অনিন্দিতার ফ্যাকাশে গালে এক চিলতে রক্তিম আভা ফুটে উঠল মুহূর্তেই।

ফ্যাকাশে গালের রক্তিম আভাটা ল্যাম্পশেডের মৃদু আলোয় একটা অপার্থিব মায়া তৈরি করল। শুভ্র গ্লাসটা টেবিলে রেখে অনিন্দিতার দিকে ফিরল গভীর দৃষ্টি নিয়ে।

অনিন্দিতা কি করবে বুঝতে না পেরে চট করে চোখ সরিয়ে জানালার বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকাল। শুভ্র অতি সন্তর্পণে অনিন্দিতার কোমর জড়িয়ে ধরে নিজের কাছে টেনে নিল ওকে।

"নন্দিতা..."

তপ্ত নিঃশ্বাস কানের লতিতে লাগতেই শিউরে উঠল অনিন্দিতা। এই শিহরণ ভয়ের নয়, অজানা আবেশের। অনিন্দিতা মাথা নিচু করে শুভ্রর শার্টের বোতাম নিয়ে অস্থিরভাবে আঙুল নাড়াতে লাগল।

"উমম..."

শুভ্র ওর চিবুকটা ধরে মুখটা একটু উঁচিয়ে ধরল। ল্যাম্পশেডের মায়াবী হলদেটে আলোয় অনিন্দিতার মুখটা কোনো এক প্রাচীন কাব্যের বিষণ্ণ নায়িকার মতো লাগছে। শুভ্রর আঙুলগুলো স্থির হয়ে পড়লো মেয়েটার শুষ্ক ঠোঁটের কোণে এসে।

"আজকের চাঁদটা দেখেছো? আমগাছের পাতার ফাঁক দিয়ে ঠিক তোমার মতো করেই আড়চোখে তাকাচ্ছে।"

অনিন্দিতা অস্ফুটে বলল, "আপনি খুব বানিয়ে কথা বলতে পারেন, শুভ্র!"

শুভ্র খুব ধীরলয়ে অনিন্দিতার কপালে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল। লম্বা সময় ধরে উষ্ণতা ধরে রাখল সেখানে। অনিন্দিতা চোখ বুজে ফেলেছে। শুভ্রর ঠোঁটের স্পর্শে এক অদ্ভুত জাদুমন্ত্র আছে, ওর মস্তিষ্কের প্রতিটি দুশ্চিন্তাকে এক নিমেষে অসাড় করে দেয় সেই জাদুমন্ত্র।

শুভ্র কপাল থেকে নেমে এল ওর চোখের পাতায়, তারপর নাকের ডগায়। অনিন্দিতার শ্বাস-প্রশ্বাস ভারী হয়ে আসছে। ও অনুভব করছে শুভ্রর হৃদপিণ্ডের পরিচিত ধুকপুকানিটা এখন অনেকটা দ্রুত। শুভ্র অনিন্দিতার ঘাড়ের কাছে মুখ গুঁজে দিয়ে খুব অস্ফুট স্বরে বলল, "আমি কি তোমায় খুব বেশি বিরক্ত করছি, মেঘফুল? যদি তোমার অস্বস্তি হয়, আমি সরে যাচ্ছি..."

অনিন্দিতা উত্তর দিল না, বদলে শুভ্রর পিঠের ওপর দিয়ে নিজের হাত দুটো জড়িয়ে ধরে শুভ্রর গলার খাঁজে মুখ লুকিয়ে খুব ক্ষীণ স্বরে বলল, "না..."

শুভ্র আলতো করে বালিশে শুইয়ে দিল ওকে। ডান হাতের তর্জনীটা নাকের ডগা ছুঁয়ে শুষ্ক ফ্যাকাশে ঠোঁটের ওপর স্থির হয়ে মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করল, "ক্যান আই হ্যাভ আ কিস, মাই ডিয়ার ওয়াইফি?"

সহসা হৃদপিন্ড লাফিয়ে ওঠে ভাঙাচোরা মেয়েটার। চুমুর অনুমতি চাওয়ার প্রশ্ন শুনে, নাকি 'মাই ডিয়ার ওয়াইফি' ডাকটা শুনে ও জানে না।

অনিন্দিতার ঘন চোখের পাপড়িগুলো কেঁপে উঠল একবার। ল্যাম্পশেডের হলদেটে মায়াবী আলোয় ফ্যাকাশে কাঁপছে ঠোঁট দুটো তিরতির করে। শুভ্রর প্রশ্নটা অনিন্দিতার ভেতরকার সেই সঙ্কুচিত সত্তাটাকে বিশাল এক আকাশ মুক্তি দিল যেন।

To be continued...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন