#মেঘবরণ_প্রেম [ভ্যালেন্টাইন-ফাল্গুন স্পেশাল]
পর্ব - ৩৪ [১৮+ রোমান্টিক এলার্ট ⛔]
লেখা - আসফিয়া রহমান
অনুমতি ছাড়া কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ❌
সেদিন রাতের সেই পৈশাচিক স্মৃতিতে কেউ অনুমতি নেয়নি, কেউ ওর ইচ্ছের পরোয়া করেনি। কিন্তু তাহমিদ রায়হান শুভ্র-- যে এখন আইনত এবং ধর্মীয়ভাবে অনিন্দিতার ওপর পূর্ণ অধিকার রাখে-- সেও এক পরম শ্রদ্ধার সাথে ওর মনের সায় খুঁজছে।
শুভ্রর তপ্ত নিঃশ্বাস অনিন্দিতার অধরযুগলের খুব কাছে। অনিন্দিতা কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে, ও শুধু নিজের দুচোখ বন্ধ করে নিল খুব ধীরলয়ে। শুভ্রর জন্য এটাই সম্মতির সবচেয়ে সুন্দর ভাষা।
শুভ্রর ওষ্ঠাধরের কোমল স্পর্শ অনিন্দিতার ঠোঁটে লাগতেই এক নিমেষে কয়েকশ ভোল্টের বিদ্যুৎ খেলে গেল মেয়েটার শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। সেদিন রাতের সেই রুক্ষ, পাশবিক স্মৃতির বিপরীতে শুভ্রর এই ছোঁয়া যেন এক শীতল চন্দনের প্রলেপ।
শুভ্র তাড়াহুড়ো করল না। খুব সন্তর্পনে শুষ্ক অধরযুগলের ফাঁকে নিজের পুরু ওষ্ঠদ্বয় গুঁজে দিয়ে স্থির হয়ে রইল কিছুক্ষণ। অনিন্দিতার শ্বাস-প্রশ্বাস অনিয়মিত, বুকের খাঁচায় হৃদপিণ্ডটা যেন ডানা ঝাপটানো পাখি। শুভ্র অনুভব করল অনিন্দিতার আঙুলগুলো ওর পিঠের পাঞ্জাবিটা খামচে ধরছে।
শুভ্র এবার মেয়েটার অধরের ওপর নিজের অধিকার বাড়াতে শুরু করল একটু একটু করে। পালকের মতো নরম ছোঁয়া থেকে স্পর্শটা এখন গাঢ় হতে শুরু করেছে আস্তে আস্তে। পুরু ওষ্ঠাধরের নিপুণ কারুকাজে শুষ্ক ঠোঁটজোড়া প্রাণ ফিরে পাচ্ছে যেন। অনিন্দিতার মনে হলো, ও যেন একটা গভীর ঘূর্ণিবর্তে তলিয়ে যাচ্ছে, যেখানে কোনো ভয় নেই, কেবল এক অদ্ভুত অবশ করা ভালোলাগা।
শুভ্র নিজের ওষ্ঠদ্বয় সামান্য সরিয়ে নিয়ে অনিন্দিতার থুতনিটা একটু উঁচিয়ে ধরল। অনিন্দিতা চোখ মেলেনি, ঠোঁট দুটো তিরতির করে কাঁপতে কাঁপতে হঠাৎ শূন্যতাকে গ্ৰাস করতে বেরোলো অস্ফুট একটা শব্দ। শুভ্র আবার ঝুঁকে পড়ল ওর ওপর। এবারের চুমুটা সীমাবদ্ধ রইল না কেবল শুষ্ক অধরে।
শুভ্রর ওষ্ঠজোড়া নরম অধরযুগলে পরম আবেশে নিজের আধিপত্য বিস্তার করতে করতে নেমে এলো মসৃণ গ্ৰীবাদেশে। গ্ৰীবার সংবেদনশীল ভাঁজে তপ্ত নিঃশ্বাস আর ভিজে স্পর্শ লাগতেই অনিন্দিতা এক তীব্র শিহরণে নিজের ঘাড়টা কাত করে ফেলল একদিকে। ঘন পাপড়ি ভিজিয়ে গড়িয়ে পড়া নোনা জল একাকার হয়ে গেল শুভ্রর চওড়া কপালে।
"শুভ্র..." অনিন্দিতার কণ্ঠস্বরটা শোনালো কাতর অনুরোধের মতো।
শুভ্র ওর কানের লতিতে দাঁত দিয়ে মৃদু একটা কামড় বসিয়ে ফিসফিস করে বলল, "আর ইউ ওকে, চেরি? সরে যাব?"
অনিন্দিতা উত্তর না দিয়ে শুভ্রকে নিজের সাথে জাপটে ধরল আরও জোরে। মেয়েটার এহেন সাহসী সমর্পণ অবাক করলো শুভ্রকে। বলিষ্ঠ হাত দুটো অনিন্দিতার টি-শার্টের ওপর দিয়ে মেয়েলি পিঠের বাঁক বেয়ে নিচে নেমে এল। অনিন্দিতার শরীরটা ধনুকের মতো বেঁকে উঠল এই স্পর্শে।
শুভ্র অনুভব করল অনিন্দিতার গায়ের সুবাস-- অনিন্দিতার গলায় মুখ গুঁজে দিয়ে খুব গভীর একটা শ্বাস নিল ও। তারপর ওর কলারবোন বরাবর ঠোঁট বুলিয়ে দিতে দিতে আবার ফিরে এল সেই আকাঙ্ক্ষিত অধরজোড়ায়।
আধো শুষ্ক অধরজোড়ায় স্পর্শ ফিরে পেতেই শিউরে উঠল অনিন্দিতার অসাড় শরীর। এক অপার্থিব শিহরণ মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে গেল পায়ের পাতা পর্যন্ত। শুভ্রর স্পর্শটা এতই মোলায়েম, যেন খুব সন্তর্পণে আঙুল চলছে কোনো পিয়ানোর রিডজুড়ে।
এবার চুমুটা অনেক বেশি প্রখর, অনেক বেশি তৃষ্ণার্ত। অনিন্দিতার ভেতরের সবটুকু জড়তা আর কুৎসিত স্মৃতি যেন এই মূহূর্তে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে আগুনের লেলিহান শিখায়।
বেশ কিছুক্ষণ পর শুভ্র যখন নিজেকে একটু সরিয়ে নিল, দুজনের ঘন নিঃশ্বাস পড়ছে অবিরত। শুষ্ক ফ্যাকাশে অধরযুগল ফুলে উঠেছে টকটকে লাল হয়ে, মেয়েটার দৃষ্টির ভয়ার্ত শূন্যতার বদলে জায়গা করে নিয়েছে এক অদ্ভুত মোহাচ্ছন্ন ঘোর।
ল্যাম্পশেডের মায়াবী হলদে আলোয় ঘরটা যেন নিস্তব্ধ মায়াপুরী। শুভ্র ওর কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে মৃদু হাসল। তারপর শেষ একটা লম্বা চুমু খেয়ে মেয়েটাকে জাপটে ধরল নিজের প্রসস্থ বুকের সাথে।
"ঘুমাই?"
প্রসস্থ বুকে মুখ ঘষে সম্মতি জানাল অনিন্দিতা। ওর মনে হলো, অনেক বছর পর আজ রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারবে ও। শান্ত হয়ে একে অপরের হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি শুনতে শুনতে একসময় গভীর ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে গেল দুজনই।
৪৮.
জানালার পাশে থাকা আমগাছটার ডালে কয়েকটা ফিঙে পাখির ঝগড়ায় অনিন্দিতার ঘুম ভাঙল। আলোর তীব্রতা চোখে লাগতেই চোখ কুঁচকে পাশ ফিরল মেয়েটা। পাশ ফিরতেই অনুভব করল শুভ্র নেই বিছানায়। মুহূর্তের মধ্যেই আতঙ্ক গ্রাস করলো ওকে। গতরাতের শান্ত স্থির ভাবটা উড়ে গেল কর্পূরের মতো। ধরফর করে উঠে বসে চারপাশটা দেখল ও।
অপরিচিত ঘর, কাঠের বড় আলমারি, ড্রেসিং টেবিল-- সবই যেন স্থির হয়ে ওকেই দেখছে। অনিন্দিতার বুকটা ধড়ফড় করতে লাগল। ও কি আবার একা হয়ে গেল?
"শুভ্র? শুভ্র... আপনি কোথায়?" ওর কণ্ঠস্বরটা আতঙ্কে কাঁপছে।
গাছের পাতাগুলো দুলছে মৃদুমন্দ হাওয়ায়। বারান্দার রেলিংয়ে ভর দিয়ে নিচু স্বরে ফোনে কথা বলছিল শুভ্র। ডক্টর আদিলের সাথে শেষ মুহূর্তের আলোচনা-- কীভাবে শুরু হবে আজকের প্রথম সেশন।
হঠাৎ ঘরের ভেতর থেকে অনিন্দিতার আর্তনাদ আর আতঙ্কে জড়ানো ডাক কানে আসতেই শুভ্রর বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। ফোনটা কেটে পকেটে ঢুকিয়েই এক ঝটকায় স্লাইডিং ডোর খুলে ভেতরে ঢুকল ও।
"এই তো আমি এখানে, নন্দিতা..."
হাঁটুদুটো বুকের সাথে মিশিয়ে জড়সড় হয়ে বিছানায় বসে থাকা অনিন্দিতা শুভ্রকে দেখামাত্রই তড়িৎবেগে ঝাঁপিয়ে পড়ল ওর ওপর। শুভ্র ওকে দুই হাতে বুকের সাথে চেপে ধরল শক্ত করে। অনুভব করল মেয়েটার পলকা শরীরটা কেমন কাঁপছে থরথর করে।
"ক-কো-কোথায়.. কোথায় গিয়েছিলেন আপনি? আম-আমি ভেবেছি... ভেবেছি আপনি চলে গেছেন আমাকে ফেলে..." অনিন্দিতার গলার স্বর শুভ্রর বুকের টি-শার্টে মিশে বুজে এলো।
শুভ্র ওর পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে মাথায় ঠোঁট ছোঁয়াল, "বোকা মেয়ে! তোমাকে ফেলে আমি যাব কোথায়? আমি তো বারান্দায় ছিলাম, তুমি ঘুমাচ্ছিলে, তাই ডাকিনি।"
পরিচিত বুকের ওমে অনিন্দিতার হৃদস্পন্দন স্বাভাবিক হয়ে এলো সময় নিয়ে। শুভ্র ওর চিবুকটা উঁচিয়ে ধরে কপালে একটা হালকা চুমু খেয়ে বললো, "চলো, ফ্রেশ হয়ে নাও। আমরা বাগানে বসে ব্রেকফাস্ট করব আজকে..."
***
ফার্ম হাউসটা যেন কোনো এক শিল্পীর তুলিতে আঁকা একটা সবুজ ক্যানভাস। ডুপ্লেক্স মতোন বাড়িটার পেছনের দিকটায় বিশাল বাগান। ফল গাছের পাশাপাশি ফুল গাছের সংখ্যাও কম নয়। বাড়ি থেকে বেরিয়ে দু'পা হাঁটলেই একটা চত্বর মতন জায়গায় বড় একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ। শীতের শেষ দিকে এসে ফুল ফুটতে শুরু করেছে গাছটায়। তার নিচেই একটা কাঠের গোল টেবিলের চারপাশে চারটে লোহার ভারি চেয়ার পাতা।
শিশিরভেজা ঘাসের সোঁদা গন্ধ আর পাখির কলকাকলিতে বাগানে পা রাখতেই অনিন্দিতার মনটা ভালো হয়ে গেল মুহূর্তেই। সোনালী রোদের ঝিলিক গাছের পাতার ফাঁক-ফোকর দিয়ে ঠিকরে পড়ছে ঘাসের ওপর। জোহরা খালা ইতিমধ্যে গরম গরম পরোটা, ডিম ভাজি আর সুজির হালুয়া সাজিয়ে রেখছেন টেবিলে।
একটা চেয়ার টেনে অনিন্দিতাকে বসিয়ে পাশের চেয়ারে বসলো শুভ্র। শুভ্র যত্ন করে পরোটা ছিঁড়ে এক লোকমা হালুয়া-পরোটা তুলে দিল ওর মুখে।
অনিন্দিতা চোখ ঘুরিয়ে চারপাশটা দেখতে দেখতে আনমনে চিবোচ্ছিল, এমন সময়—
"শুভ্র! দেখুন... ওই দেখুন ওটা কী!"
অনিন্দিতার হঠাৎ উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে শুভ্র চমকে উঠল। দেখল, অনিন্দিতা এক হাত দিয়ে সামনের বিশাল আমগাছটার দিকে ইশারা করছে। ডাল বেয়ে একটা ছোট্ট কাঠবেড়ালী লেজ উঁচিয়ে তরতর করে ওপরে উঠে যাচ্ছে। অনিন্দিতার কন্ঠস্বর শুনতে পেয়ে মাঝপথে থেমে গিয়ে লেজ নাড়িয়ে পিটপিট করে তাকাচ্ছে এখানকার নতুন মানুষদুটোর দিকে।
অনিন্দিতার চোখদুটো বিস্ময়ে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। মরা গাঙের মতো চাউনিতে প্রাণের স্পন্দন ফিরে এলো অনেকদিন পর। শুভ্রর হাতটা খামচে ধরে মেয়েটা উত্তেজিত গলায় বলে উঠল, "শুভ্র! শুভ্র... ওই দেখুন! কাঠবিড়ালী! কী কিউট না ওটা?"
তিন-তিনটে দিন পর প্রিয় নারীর কন্ঠস্বরের এই প্রাণোচ্ছ্বলতা মুহূর্তের জন্য থমকে দিল শুভ্রর প্রশস্ত বক্ষের নিচে ধুকপুক করতে থাকার হৃদপিন্ডটাকে। আজ, একটু আগ পর্যন্ত যে মেয়েটা আতঙ্কে কুঁকড়ে ছিল, এই মুহূর্তে সে সামান্য একটা কাঠবিড়ালী দেখে ছোট বাচ্চার মতো উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছে। শুভ্রর মনে হলো, এই হাসিটার জন্যই বোধহয় জনম জনম অপেক্ষা করে যেতে পারে ও।
স্ত্রীর হাসিমাখা মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে শুভ্র বিড়বিড় করে বলল, "হ্যাঁ, সুন্দর, খুব সুন্দর। পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য..."
"শুভ্র..?" চকচকে চোখে শুভ্রর দিকে তাকালো অনিন্দিতা।
কাঠবিড়ালীটা তখনো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে ওদের। পাতার ফাঁক থেকে তার আরেকজন সঙ্গিও উঁকি দিচ্ছে বোধহয়।
"বলো, ফুল?" শুভ্র আবার বলল, "তুমি কি ওকে কিছু খাওয়াবে?"
অনিন্দিতা প্রবল উৎসাহে মাথা নাড়ল। শুভ্রকে মাত্র এটাই বলতে চাইছিল ও।
শুভ্র মুচকি হেসে মাটি থেকে একটা শুকনো পাতা উঠিয়ে প্লেট থেকে সামান্য হালুয়া ছোট করে দলা বানিয়ে পাতায় রেখে বাড়িয়ে দিল অনিন্দিতার দিকে। অনিন্দিতা যেন হাতে চাঁদ পেল। ও পাতাটা হাতের তালুতে নিয়ে খুব সাবধানে চেয়ার ছাড়ল, বিড়ালের মতো পা টিপে টিপে এগোলো লাগল গাছটার দিকে।
শুভ্র একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল ওর দিকে। মনে হলো, এই মুহূর্তটুকু যদি কোনোভাবে ফ্রেমে বন্দী করে রাখা যেত! ভাবতে ভাবতেই ফোন বের করলো ও। ক্যামেরায় ধারণ করতে শুরু করল স্নিগ্ধ মুহুর্তটা।
অনিন্দিতা পা টিপে টিপে আমগাছটার দিকে এগোচ্ছে। কাঠবিড়ালীটা তখনো ডালের ওপর থমকে আছে, কুচকুচে কালো চোখদুটো দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে অনিন্দিতার প্রতিটি নড়াচড়া। অনিন্দিতা গাছের খুব কাছে গিয়ে নিচু হয়ে পাতাটা মাটিতে রেখে একটু পিছিয়ে এল। তারপর খুব আদুরে গলায় ডাকল, "এই যে... শোনো! দেখো, তোমার জন্য কী এনেছি... এসো, খেয়ে যাও..."
কাঠবেড়ালীটা অনিন্দিতার দিকে তাকিয়ে নাক দিয়ে বাতাস শুঁকল একবার। অনিন্দিতা ওটার দিকে তাকিয়ে আছে রুদ্ধশ্বাসে। মনে মনে ওর ভীষণ আশা ছিল যে কাঠবিড়ালীটা নেমে আসবে। কিন্তু বুনো স্বভাবের ছোট্ট প্রাণীটা বোধহয় প্রথম দেখায় বিশ্বাস করতে পারলো না মানুষকে। একবার ইতিউতি তাকিয়ে লেজ ফুলিয়ে এক ঝটকায় তড়তড় করে ডাল বেয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল মগডালে।
অনিন্দিতার উজ্জ্বল মুখটা মলিন হয়ে গেল মুহূর্তেই। মেয়েটা অসহায় চোখে শূন্য ডালটার দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। বদনজুড়ে মন খারাপের মেঘ নিয়ে ফিরে এলো শুভ্রর কাছে। শুভ্র ততক্ষণে ভিডিও সেভ করে ফোনটা ঢুকিয়ে ফেলেছে পকেটে।
"ও চলে গেল, শুভ্র! ও কি আমাকে ভয় পেল?" অনিন্দিতার কণ্ঠে রাজ্যের বিষণ্ণতার সাথে একরাশ অভিমান।
শুভ্র ওর হাতটা টেনে উল্টো পিঠে ঠোঁট ছুঁইয়ে চেয়ারে বসাল, "ভয় পায়নি, সোনা! ও লুকোচুরি খেলছে তোমার সাথে। তুমি খেয়ে নাও, ও আবার আসবে।"
অনিন্দিতা প্লেটের হালুয়া-পরোটার দিকে তাকাল নিরুৎসাহী ভঙ্গিতে। মেয়েটার চোখ বারবার চলে যাচ্ছে আমগাছটার ফাঁকা ডালটার দিকে।
শুভ্র ওর চিবুকটা ধরে মুখটা নিজের দিকে ফেরাল, "মন খারাপ করে না, ফুল। ও হয়তো হালুয়া খাবে না, তাই চলে গেছে। তুমি খাওয়াটা শেষ করো, কালকে আমরা ওর জন্য বাদাম নিয়ে আসব, ঠিক আছে?"
অনিন্দিতা মুখ ভার করে খাবারটা শেষ করলো। তারপর শুভ্রর খাওয়া শেষ হতে না হতেই পকেটে থাকা ফোনটা কেঁপে উঠল ওর। শুভ্র ফোনটা বের করে একবার দেখে সাইলেন্ট করে রাখলো। হৃৎপিণ্ডটা একবার সজোরে ধাক্কা খেল ওর। এটাই সেই মুহূর্ত যে মুহূর্তের জন্য সকাল থেকে মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছিল ও।
"ফুল, শোনো..." শুভ্র খুব কোমল গলায় ডাকল।
অনিন্দিতা তখন মাটিতে পড়ে থাকা কৃষ্ণচূড়া কুড়িয়ে জমাচ্ছে হাতের মুঠোয়। চারটে পাপড়ি ওয়ালা একটা ফুল এনে শুভ্রর হাতে দিল ও, "এটা তোমাকে দিলাম, শুভ্র!"
শুভ্র হাসলো, ফুলটা অনিন্দিতার হাত থেকে নিয়ে ওর চুলগুলো গুছিয়ে দিয়ে ফুলটা কানে গুঁজে দিতে দিতে বলল, "আমি আমার 'মেঘফুল'-কে দিলাম..!"
অনিন্দিতা মিষ্টি করে হাসলো স্বামীর চোখে চেয়ে। শুভ্র ওর কপালে একটা চুম্বন এঁকে দিয়ে নরম গলায় বলল,
"আমার একটা বন্ধু কল দিয়েছে, নন্দিতা। ওর নাম আদিল। ও এখানেই থাকে, আমরা এখানে এসেছি শুনে বোধহয় খোঁজ-খবর নিতে কল দিয়েছে। আমি কি একটু কথা বলব ওর সাথে?"
অনিন্দিতা হাতের ফুলগুলো নাড়াচাড়া করতে করতে অন্যমনস্ক গলায় বলল, "হ্যাঁ, বলুন..."
"তুমিও একটু হাই দিও?"
মুহূর্তের মধ্যে আড়ষ্ট হয়ে উঠলো মেয়েটা। অপরিচিত পুরুষের সাথে কথা বলার কথা শুনেই ফ্যাকাসে হয়ে এলো স্বাভাবিক মুখটা। অনিন্দিতা হাতের ফুলগুলো টেবিলের ওপর রেখে দিয়ে নিচু স্বরে বলল, "আমি... আমি কথা বলব না, শুভ্র? আপনি বলুন..."
শুভ্র দেখল অনিন্দিতা আবার খোলসের ভেতর ঢুকে যাওয়ার চেষ্টা করছে। ও খুব আলতো করে অনিন্দিতার কাঁপতে থাকা হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নখ দিয়ে ওর তালুতে সুড়সুড়ি দিল।
"ভয় পাচ্ছ কেন, নন্দিতা? ও আমার খুব ছোটবেলার বন্ধু। ও জাস্ট আমার সাথে কথা বলবে, তুমি এখানে আমার কাছে বসে থাকবে। তোমার যদি ভালো না লাগে, আমি ক্যামেরা ঘুরিয়ে দেবো, প্রমিজ!"
অনিন্দিতা নিরুত্তর। নিজের হাতের আঙুলগুলো মোচড়াচ্ছে মেয়েটা। শুভ্র পকেট থেকে ফোন বের করে ভিডিও কল ডায়াল করল। দ্বিতীয়বার রিং হতেই স্ক্রিনে ভেসে উঠল সাইক্রিয়াটিস্ট আদিল রেদওয়ান। ছেলেটা শুভ্রর বয়সীই হবে বোধহয়। নীল শার্ট পরিহিত আদিলের মুখটা হাসি হাসি। যেন সত্যি সত্যি অনেক দিন পর পুরোনো বন্ধুর সাথে কথা হচ্ছে তার। ঘরের ব্যাকগ্রাউন্ড দেখে মনে হচ্ছে একটা বিশাল লাইব্রেরীতে বসে আছে সে।
"কিরে, কেমন আছিস, শুভ্র? ওয়েলকাম টু রাজশাহী!" আদিলের কণ্ঠস্বর বন্ধুসুলভ। শুনে বোঝার উপায় নেই পুরোটাই সাজানো নাটক!
টেবিলের ওপর ফোনটা দাঁড় করিয়ে রাখল শুভ্র, যাতে ক্যামেরায় ওদের দুজনকে একসাথে দেখা যায়। তারপর হেসে বলল, "থ্যাংকস! আমরা ভালো আছি। তোর কী খবর?"
"এই তো চলছে... পাশে কে?" শেষের প্রশ্নটা করতে গিয়ে আদিল কন্ঠস্বর নিচু করে ফেললেন ইচ্ছে করেই। যেন অনিন্দিতাকে চেনেন না।
শুভ্র অনিন্দিতার দিকে তাকালো। মেয়েটা শরীর শক্ত করে বসে আছে ওর গা ঘেঁষে। একটা হাত শক্ত করে চেপে রেখেছে ওর বৃহৎ হাতের তালু।
"ও অনিন্দিতা। আমার নববধূ..."
আদিল অবাক হবার ভান করলেন, "তুই বিয়ে করলি কবে? ওহ্ মাই গড, শুভ্র! আমাকে তো একবার জানালিও না..!"
আদিলের উচ্ছ্বসিত কণ্ঠস্বর শুনে অনিন্দিতা একবার আড়চোখে তাকাল ফোনের স্ক্রিনের দিকে। ছেলেটা খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হাসছে। এই প্রথম অনিন্দিতাকে স্ক্রিনের দিকে তাকাতে দেখে ওপাশ থেকে এক গাল হেসে হাত নাড়ল আদিল।
"হাই, অনিন্দিতা ভাবি!" আদিল অভিযোগের সুরে বলল, "আপনার হাসব্যান্ড কিন্তু ভীষণ পচা। এত মিষ্টি একটা মেয়েকে বিয়ে করে ফেলল, অথচ আমার মতো একজন লয়াল ফ্রেন্ডকে দাওয়াত তো দূর.. একটা মিষ্টি পর্যন্ত খাওয়ালো না! আমি কিন্তু ওর ওপর মারাত্মক চটেছি। আপনি আমার হয়ে ওকে একটু বকে দেবেন তো..."
অনিন্দিতা উত্তর দিল না, শুধু শুভ্রর দিকে তাকিয়ে একটু ম্লান শুধু ম্লান হাসার চেষ্টা করল। অনিন্দিতাকে উত্তর দিতে না দেখে আদিল এবার শুভ্রর উদ্দেশ্যে বললেন, "শুভ্র, তুই আমার মিষ্টি বোনটাকে বকেছিস নাকি সত্যি করে বল তো? মন খারাপের জন্য ভাবি আমার সাথে কথাই বলছে না..."
আদিলের কথায় অনিন্দিতা আড়ষ্ট হয়ে মাথা নিচু করে নিল। শুভ্র পরিস্থিতি সামাল দিতে আদিলের দিকে তাকিয়ে হাসল।
"আরে না, ও এমনিতেই একটু শান্ত। আর আজ আমার মেঘফুলের মনটাও একটু খারাপ.." শুভ্র অনিন্দিতার কাঁপতে থাকা হাতের ওপর আঙুল বোলাতে বোলাতে বলল।
আদিল কপালে কয়েকটা ভাঁজ ফেলে দারুণ চিন্তিত হওয়ার ভান করল, "সে কী! এত সুন্দর একটা জায়গায় এসে মন খারাপ কেন?"
শুভ্র অনিন্দিতার দিকে তাকিয়ে বলল, "আরে-- একটু আগে আমাদের বাগানের একটা কাঠবেড়ালীকে অনিন্দিতা আদর করে খাবার দিতে গিয়েছিল, কিন্তু পাজি কাঠবিড়ালিটা আমার মেঘফুলকে পাত্তাই দিল না! এক দৌড়ে পালিয়ে গেছে। সেই থেকে আমার ফুলের মনটা ভীষণ খারাপ।"
কথাটা শুনেই যেন দারুণ অবাক হলো আদিল, "বলিস কী, শুভ্র! ভাবির মতো একটা মিষ্টি মেয়েকে ইগনোর করেছে? কাঠবিড়ালিটা তো বড্ড আনকালচারড! ভাবি, আপনি একদম মন খারাপ করবেন না। আমার কাছে না.. একটা বুদ্ধি আছে..!"
অনিন্দিতা এবার কৌতূহলী হয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকাল। আদিলের গলার সহজ রসবোধ ওর মনের ভেতরের অদৃশ্য দেয়ালটাকে যেন আলগা করে দিচ্ছে একটু একটু করে। ও খুব নিচু স্বরে, প্রায় ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, "কী বুদ্ধি?"
প্রথমবার অনিন্দিতার কণ্ঠ শুনতেই শুভ্র-আদিল একসাথে একে অপরের দিকে তাকালো। শুভ্রর চোখে কৃতজ্ঞতার দৃষ্টি।
আদিল একটা কলম দিয়ে নিজের চিবুক চুলকে ভাবল কিছুক্ষণ, "কাল সকালে না, আপনি অন্য খাবারের সাথে দুটো আস্ত কাঠবাদাম রেখে দেবেন। কাঠবিড়ালীরা বাদাম দেখলে নিজেকে সামলাতে পারে না। আরেকটা সিক্রেট বলি-- ও যখন আসবে, আপনি ওর চোখের দিকে তাকাবেন না। তাহলে ও ভাববে আপনি বুঝি ওকে ধরতে আসছেন। আপনি ডালপালার দিকে তাকিয়ে থাকবেন, দেখবেন ও গুটিগুটি পায়ে এসে বাদাম নিয়ে পালাচ্ছে।"
অনিন্দিতার ঠোঁটের কোণে এবার খুব ক্ষীণ একটা হাসির রেখা ফুটে উঠল, "সত্যিই? বাদাম দিলেই কি ও আসবে?"
আদিল একটা প্রশস্ত হাসি দিয়ে বলল, "হান্ড্রেড পার্সেন্ট! আপনি শুভ্রকে বলবেন, আজকেই যেন বাদাম আনিয়ে রাখে। কাল সকালে এই সময়ে দেবেন..."
অনিন্দিতা এবার শুভ্রর দিকে ফিরল, "আমাকে আজকে বাদাম এনে দেবেন, শুভ্র?"
অনিন্দিতার নিজ থেকে করা স্বাভাবিক এই আবদারটুকু শুনতেই শুভ্রর বুকের ওপর থেকে বিশাল এক পাথরের ভার নেমে গেল যেন। মেয়েটার চোখের কাঁচের মতো নির্লিপ্ততা সরিয়ে সেখানে ফিরে এসেছে শিশুর মতো কৌতূহল। অনিন্দিতার হাতটা উঁচিয়ে আলতো করে উল্টো পিঠে ঠোঁট ছোঁয়াল ও।
"অবশ্যই এনে দেব, ফুল। আমি এখনই রবি চাচাকে পাঠাচ্ছি একদম ফ্রেশ কাঠবাদাম নিয়ে আসার জন্য।"
স্ক্রিনের ওপাশে আদিল মুচকি হাসল। ওদিকে আদিলের সামনে শুভ্র এমন করায় লজ্জা পেল অনিন্দিতা।
সাইক্রিয়াটিস্ট আদিল রেদওয়ান খুব সুক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করে গেলেন অনিন্দিতার প্রতিটি অভিব্যক্তি-- চোখের মণির নড়ন থেকে শুরু করে শুভ্রর সাথে ওর অ্যাটাচমেন্ট পর্যন্ত। প্রথম সেশনটা মোটামুটি সফল বলা যায়। অপরিচিত পুরুষের ভীতিটা কাটিয়ে উঠে আস্তে আস্তে কথা বলতে শুরু করেছে মেয়েটা।
আদিল খুব সাবধানে কথার মোড় ঘুরিয়ে ফেললেন।
"ভাবি, শুভ্রর কাছে শুনলাম, আপনাদের ঢাকা থেকে আসাটা নাকি একেবারেই হুটহাট-- মানে আগে থেকে কোনো প্লান ছাড়াই? তো আজ সকালে যখন ঘুম ভেঙছে, তখন কি আপনার মনে হচ্ছিল যে ঢাকাতেই আছেন?"
প্রশ্নটা খুব সাধারণ শোনাল, কিন্তু অনিন্দিতার অবচেতন মনে একটা নাড়া দিয়ে গেল। ও একটু ইতস্তত করে ধীরে ধীরে বলল, "সকালে উঠেই খুব ভয় পেয়েছিলাম। শুভ্র ছিল না, আমি ভেবেছিলাম ও আমাকে ফেলে গেছে।"
আদিল খুব মন দিয়ে কথাগুলো শুনল, "হুমম, এটা স্বাভাবিক। নতুন জায়গায় গেলে আমাদের মস্তিষ্ক একটু কনফিউজড থাকে। আচ্ছা ভাবি, যখন ভয় লাগে, তখন কি গলার কাছে কিছু আটকে যাওয়ার মতো মনে হয়? মানে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়?"
শুভ্রর হৃৎপিণ্ডটা দ্রুত চলতে শুরু করল। ও বুঝতে পারছে, আদিল এখন মূল সেশনে ঢুকছে। অনিন্দিতা একটু কুঁকড়ে গিয়ে শুভ্রর দিকে তাকালো, শুভ্র শান্ত চোখের ইশারায় ভরসা দিল ওকে। টেবিলের কৃষ্ণচূড়া ফুলগুলর দিকে তাকিয়ে ও খুব নিচু কন্ঠে বলল, "মনে হয়... যেন চারপাশের সব অক্সিজেন শেষ হয়ে গেছে। বুকটা কেমন ভারি ভারি লাগে।"
আদিল স্ক্রিনের ওপাশে খুব শান্ত ভঙ্গিতে কলমটা টেবিলের ওপর রাখল। তারপর শান্ত গলায় বলল, "মনে হয়, কেউ যেন অদৃশ্য কোনো শক্তিতে আপনার গলাটা চেপে ধরেছে? কিংবা চারপাশের বাতাসটা হঠাৎ করে বিষাক্ত হয়ে গেছে?"
অনিন্দিতা অবাক হয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকাল। আদিল ঠিক ওর মনের কথাটাই বলেছে। আস্তে করে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো ও।
"ভাবি, একটা মজার তথ্য দিই আপনাকে," আদিল খুব হালকা মেজাজে বলতে শুরু করল, "আমাদের মস্তিষ্ক না মাঝেমধ্যে খুব দুষ্টু হয়ে যায়। ও যখন বুঝতে পারে আমরা কোনো কারণে খুব ভয় পাচ্ছি বা কষ্ট পাচ্ছি, তখন ও আমাদের একটা ভুল সিগন্যাল পাঠায়। ও বলে-- 'তাড়াতাড়ি বাতাস নাও, বাতাস শেষ হয়ে যাচ্ছে!' অথচ বাতাস কিন্তু আগের মতো চারপাশেই থাকে। তখন আমরা বেশি জোরে শ্বাস নিতে গিয়ে আরও অস্থির হয়ে পড়ি। এটাকে বলে 'মাইন্ড গেম'। আপনার মস্তিষ্ক আপনার সাথে একটা গেম খেলছে।"
অনিন্দিতা উৎসুক হয়ে শুনছে। আদিলের বলা 'মাইন্ড গেম' শব্দটা ওর কাছে নতুন। ও ফিসফিস করে বলল, "এটা গেম? কিন্তু আমার তো দম বন্ধ হয়ে আসে..."
"একদম ঠিক," আদিল হেসে বলল, "তবে গেমের যেমন লেভেল থাকে, এটারও একটা ট্রিক আছে। যখনই আপনার মনে হবে বাতাস ফুরিয়ে আসছে, আপনি জাস্ট আপনার পাশে থাকা ওই ছেলেটার হাতটা শক্ত করে ধরবেন। নিজেকে বলবেন-- 'আমার ব্রেন আমাকে মিথ্যা বলছে, আমার কাছে অক্সিজেন আছে।' এরপর আমার একটা ফেভারিট ব্যায়াম করবেন। ব্যায়ামটা এখন আমরা তিনজন একটু করি একসাথে? জাস্ট টু মিনিটস।"
অনিন্দিতা একটু ইতস্তত করে শুভ্রর দিকে তাকাল। শুভ্র ওর হাতটা একটু শক্ত করে ধরে মাথা নেড়ে সায় দিল। অনিন্দিতা আবার ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে মাথা নাড়লো।
আদিল স্ক্রিনের ওপাশে সোজা হয়ে বসল। অনিন্দিতা আড়চোখে শুভ্রর দিকে তাকাল আবার, শুভ্রর চোখের আশ্বস্ত করা চাহনি দেখে একটু সহজ হওয়ার চেষ্টা করল ও।
"দেখুন ভাবি," আদিল খুব শান্ত গলায় শুরু করল, "ব্যায়ামটাকে আমরা বলি '৪-৭-৮ টেকনিক'। এটা একদম ম্যাজিকের মতো কাজ করে। যখনই বুকটা ভারী লাগবে, আপনি এই পদ্ধতিটা ব্যবহার করবেন। আমরা এখন একটু প্র্যাকটিস করব.. একটা হাত নিজের পেটের ওপর রাখুন।"
আদিল শুভ্রর দিকে তাকিয়ে বলল, "শুভ্র, তুইও কর ভাবির সাথে।"
শুভ্র অনিন্দিতার হাতটা নিজের মুঠোয় একটু শক্ত করে চেপে ধরল। আদিল বলতে শুরু করল, "প্রথমে নাক দিয়ে খুব ধীরে ধীরে ৪ সেকেন্ড ধরে শ্বাস নিন... আমি গুনছি... এক... দুই... তিন... চার। এবার শ্বাসটা পেটের ভেতরে আটকে রাখুন ৭ সেকেন্ড... এক... দুই... তিন... চার... পাঁচ... ছয়... সাত। এবার ফুঁ দেওয়ার মতো করে ৮ সেকেন্ড ধরে বাতবের করে দিন। মনে করুন আপনার ভেতরের সব দুশ্চিন্তা বেরিয়ে যাচ্ছে ওই বাতাসের সাথে... এক... দুই... তিন... চার... পাঁচ... ছয়... সাত... আট।"
অনিন্দিতা প্রথমবার করতে গিয়ে একটু খাবি খেল, বুকটা ধড়ফড় করে উঠল ওর। শুভ্র ওর বাহু জড়িয়ে অভয় দিল, "আবার করো নন্দিতা, আমার সাথে সাথে..."
দ্বিতীয়বার অনিন্দিতা বেশ গুছিয়ে করল। তিন-চারবার করার পর ও অনুভব করল, ওর শরীরের যে টানটান ভাবটা ছিল, সেটা অনেকটা শিথিল হয়ে এসেছে। মাথাটা ঝরঝরে লাগছে।
আদিল হাসল, "কেমন লাগছে এখন?"
অনিন্দিতা একটা লম্বা নিঃশ্বাস নিয়ে বলল, "একটু... একটু হালকা লাগছে।"
"দারুণ!" আদিল উৎসাহিত হয়ে বলল, "ভাবি, আপনার কিন্তু কনসেন্ট্রেশন পাওয়ার খুব ভালো। এবার আপনাকে একটা হোমওয়ার্ক দিই। যখনই মন খারাপ হবে বা ভয় লাগবে, ওই কাঠবেড়ালী বন্ধুটার কথা ভাববেন। আর একা থাকলে চারপাশটা দেখবেন-- দেখবেন আকাশে কয়টা পাখি উড়ছে, বা বাগানে কয় রঙের ফুল আছে। মানে আপনার মস্তিষ্ককে গেমটা খেলার সুযোগই দেবেন না। আপনিই হবেন গেমের বস!"
অনিন্দিতার ঠোঁটের কোণে এবার স্পষ্ট এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। ও নিচু স্বরে বলল, "চেষ্টা করব।"
আদিল এবার শুভ্রর দিকে তাকাল, "কিরে শুভ্র, তুই কি বাদাম আনতে পাঠালি কাউকে? নাকি আমার ভাবি কালকে আবার মন খারাপ করবে?"
শুভ্র হাসতে হাসতে বলল, "রবি চাচাকে বলে দিচ্ছি এখনই। আজকের মধ্যেই ঝুড়ি ভর্তি ফ্রেশ বাদাম চলে আসবে।"
"গুড। আজ তাহলে আসি, ভাবি? আপনার জন্য হোমওয়ার্ক রইল-- কাঠবেড়ালীকে বাদাম দেওয়া আর ভয় পেলেই ওই ব্রিদিং এক্সারসাইটা প্রাকটিস করা। কাল আমি আবার কল করব শুনতে যে, কাঠবেড়ালীটা আপনার সাথে বন্ধুত্ব করল কি না।"
To be continued...