#মেঘবরণ_প্রেম
পর্ব - ৩৫ [রোমান্টিক এলার্ট ‼️]
লেখা - আসফিয়া রহমান
অনুমতি ছাড়া কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ❌
"নন্দিতা?"
কলটা কেটে লম্বা শ্বাস ফেলে অনিন্দিতার দিকে তাকালো শুভ্র। মেয়েটা মনোযোগ সহকারে কৃষ্ণচূড়ার পাপড়িগুলো গুনছে বোধহয়।
"হুঁ..?"
"আমার বন্ধুটার সাথে কথা বলে কেমন লেগেছে? খুব বেশি কথা বলে, না?"
"না, ভালো লেগেছে... সুন্দর কথা বলে..."
শুভ্রর ঠোঁটে এক চিলতে বিজয়ের হাসি ফুটল। প্রথমধাপে সফল হয়েছেন সাইক্রিয়াটিস্ট আদিল রেদওয়ান। অনিন্দিতার ভেতরে যে পুরুষ-ভীতিটা দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিল, আদিলের বন্ধুসুলভ আর সাবলীল আচরণ সেই দেয়ালে প্রথম ফাটল ধরাতে পেরেছে।
"সুন্দর কথা বলে? ও তো খালি পটরপটর করে সারাদিন!" শুভ্র হালকা করে খোঁচা দিল আদিলকে, "আমি তো ভয় পাচ্ছিলাম, ওর বকবকানিতে তোমার মাথা না ধরে যায় আবার!"
অনিন্দিতা এবার শব্দ করে একটু হেসেই ফেলল। শুভ্রর বক্ষস্থলজুড়ে ফাগুনের দখিনা পবনের মতো দোলা দিয়ে গেল সেই হাসির রেশ। "না, একদমই না। ও তো আপনার মতো গম্ভীর নয়। আপনার বন্ধুটা বেশ ফানি।"
শুভ্র কৃত্রিম অভিমান করে বুক থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল, "বাহ! মাত্র আধ ঘন্টার কথায় বন্ধুর পয়েন্ট আমার চেয়ে বেড়ে গেল? এটা তো ভারি অন্যায়, মেঘফুল!"
অনিন্দিতা লজ্জা পেয়ে শুভ্রর হাতটা চেপে ধরল। নিজের অজান্তেই শুভ্রর ওপর অনেকটা ভর দিয়ে বসল ও। "আরে, ওটা তো এমনি বললাম। আপনি কি হিংসে করছেন?"
শুভ্র তৎক্ষণাৎ উত্তর দিল না। অপলক চোখে তাকিয়ে রইল অনিন্দিতার হাসি মুখটার দিকে। কতদিন পর মেয়েটার চোখে কৌতুক দেখতে পাচ্ছে ও! শুভ্র আলতো করে অনিন্দিতার গালটা ছুঁয়ে দিল।
"হিংসে করব না? আমার জগতটা যাকে ঘিরে, তার ঠোঁটে অন্য কেউ হাসি ফুটিয়ে দেবে, তাতে আমার হিংসে হবে না?" শুভ্রর কণ্ঠস্বর হঠাৎ করেই অন্যরকম হয়ে উঠল, "আমার তো এখন হিংসুটের মতো তোমার ঠোঁট দুটোকে নিজের দখলে নিতে তীব্র ইচ্ছে করছে..."
অনিন্দিতার হৃদপিণ্ডটা সজোরে একটা ধাক্কা খেল কেমন। গালদুটো মুহুর্তেই কৃষ্ণচূড়ার মতো রক্তিম হয়ে উঠলো। তড়িৎ গতিতে ও চোখ সরিয়ে নিল শুভ্রর তীব্র দৃষ্টি থেকে।
ও অনুভব করল শুভ্রর মুখটা খুব ধীরলয়ে ওর কাছে এগিয়ে আসছে। শুভ্রর গভীর দৃষ্টি নিবদ্ধ অনিন্দিতার ফোলা ওষ্ঠদ্বয়ের ওপর। মাঝখানের দূরত্বটা এখন কেবল কয়েকটা তপ্ত নিশ্বাসের। খসখসে বৃদ্ধাঙ্গুলটা গাল থেকে সরে এসে স্থির হলো নরম ঠোঁটের ওপর।
শুকনো ঠোঁটে খসখসে আঙুলের স্পর্শ পেতেই কেঁপে উঠে শুভ্রর টি-শার্টের কলারটা খামচে ধরলো অনিন্দিতা। শুভ্র আলতো করে ওর থুতনিটা একটু উঁচিয়ে ধরল। সকালে রোদের ঝিলিক কৃষ্ণচূড়া গাছের ডালপালার ফাঁক দিয়ে এসে পড়েছে মেয়েটার মুখে।
ওর আঙুলের নিচে ফোলা ফোলা ঠোঁট দুটো কাঁপছে তিরতির করে। আঙুলটা সরিয়ে নিয়ে খুব সন্তর্পণে কম্পমান অধরযুগলকে নিজের ঠোঁটজোড়ায় বন্দি করল ও।
অনিন্দিতা চোখ বুজে ফেলল পুরোপুরি। অনুভব করল শুভ্রর হাত দুটো ওর কোমরজুড়ে চেপে বসেছে শক্ত হয়ে। ঠিক তার পরমুহূর্তেই নিজেকে বলিষ্ঠ পুরুষের কোলে আবিষ্কার করল আবেশে ডুবে থাকা মেয়েটা।
অস্ফুট স্বরে একটা শব্দ করে দুহাতে অবচেতনেই শুভ্রর চওড়া কাঁধ আঁকড়ে ধরল অনিন্দিতা। মেয়েটাকে পাঁজাকোলে তুলে নিয়ে কৃষ্ণচূড়া গাছের নিবিড় ছায়া থেকে বেরিয়ে শুভ্র ধীরপায়ে এগোলো বাংলোর দিকে।
চারপাশের বাগান, পাখিদের কিচিরমিচির আর মিষ্টি রোদ-- সবই যেন এই মুহূর্তে আবছা হয়ে গেছে অনিন্দিতার কাছে। পুরুষালি ঠোঁটজোড়া তখনো সরেনি। নিবিড়ভাবে সেঁটে আছে প্রিয় নারীর তুলতুলে অধরে। অনিন্দিতার সমস্ত ইন্দ্রিয় এখন কেবল শুভ্রর ওষ্ঠাধরের উষ্ণতা আর ওর বলিষ্ঠ বাহুবন্ধনেই নিবদ্ধ।
শুভ্র যখন ওকে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে আসছিল, অনিন্দিতার মনে হলো ও যেন কোনো এক মায়াবী স্বপ্নের ঘোরে উড়ছে। দরজাটা পা দিয়ে খুলে ভেতরে ঢুকে শুভ্র বিছানায় নামিয়ে দিল ওকে, কিন্তু ঠোঁটের বাঁধন সরাল না। পিঠের নিচে নরম বিছানা, ওপরে শুভ্রর শরীরের ভার অনুভব করতে করতে আবেশে তলিয়ে গেল মেয়েটা।
দীর্ঘক্ষণ পর শুভ্র যখন নিজেকে একটু সরিয়ে নিল, অনিন্দিতার চোখ দুটো তখনো ঘোরে আচ্ছন্ন। কপোলজোড়া সগৌরবে পাল্লা দিচ্ছে কৃষ্ণচূড়ার রঙের সাথে। লজ্জায় চোখ মেলতে পারছে না মেয়েটা। ওর দ্রুত ওঠানামা করা বুক আর কৃষ্ণচূড়ার বর্ণ ধারণ করা গাল দেখে শুভ্রর বুকের ভেতরটা তোলপাড় করে উঠলো কেমন। আদুরে ভঙ্গিতে অনিন্দিতার নাকের সাথে নিজের নাক ঘষে ফিসফিস করে শুভ্র জিজ্ঞেস করল, "এখন বলো ফুল, কার পয়েন্ট বেশি? আমার নাকি আদিলের?"
অনিন্দিতা বড় বড় করে শ্বাস নিতে নিতে লাজুক হেসে শুভ্রর বুকের ভেতর মুখ লুকিয়ে খুব নিচু স্বরে বলল, "বড্ড বেশি পাগলামি করেন আপনি..."
শুভ্র হাসল শব্দহীন। সাদা টি-শার্টের ভেতর হাত গলিয়ে মেয়েলি পিঠের মসৃণ চামড়ায় আঙুল বোলাতেই মেয়েটা শিউরে উঠে দুহাতে জাপটে ধরলো শুভ্রকে।
"আপনি... আপনি খুব দুষ্টু হয়ে গেছেন, শুভ্র!"
আদুরে অভিযোগে শুভ্রর হাসির শব্দ প্রতিধ্বনিত হলো ঘরজুড়ে। আলতো করে মেয়েটার ধোঁয়া ছুটতে থাকা কানের কাছে তপ্ত ঠোঁট ছুঁইয়ে শুভ্র গাঢ় স্বরে বলল, "নিজের অর্ধাঙ্গিনীর সাথে একটু দুষ্টুমি করার অধিকার কি আমি এখনো পাইনি, বউ?"
প্রিয় পুরুষের কণ্ঠে প্রথমবারের মতো 'বউ' ডাকটা শুনে অনিন্দিতার শরীরের ভেতরটা যেন কেমন মোচড় দিয়ে উঠল। মুহূর্তের মধ্যে বিদ্যুৎ তরঙ্গের মতো এক অদ্ভুত শিহরণ খেলে গেল ওর পায়ের নখ থেকে শুরু করে চুলের গোড়া পর্যন্ত। শুভ্রকে জাপটে ধরে ও আরেকটু সেঁধিয়ে গেল শুভ্রর চওড়া বুকে গভীরে।
উত্তর না দিয়ে প্রসস্থ বক্ষে মুখ ঘষল ও, যেন লজ্জার সবটুকু আভা লেপে দিতে চাইছে ওই চওড়া বুকের টি-শার্টে। শুভ্রর হাতের দুষ্টু আঙুলগুলো তখনো অনিন্দিতার পিঠের মখমলি চামড়ায় এক অদ্ভুত নকশা এঁকে চলেছে, যা প্রতি ক্ষণে ক্ষণে জাগ্রত করে দিচ্ছে অনিন্দিতার শরীরের লোমকূপগুলোকে।
নববধূর এই লজ্জাটুকু দারুণভাবে উপভোগ করতে করতে শুভ্র অনিন্দিতার ঘাড়ের কাছে নিজের মুখটা ডুবিয়ে দিয়ে গভীর শ্বাস টেনে ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করল, "কী হলো? উত্তর দিচ্ছ না যে? অধিকার কি আমি পাইনি?" শুভ্রর গাঢ় কণ্ঠস্বরটা শেষদিকে এসে নিচু হয়ে এলো।
অনিন্দিতা কোনোরকমে নিজেকে সামলে খুব ক্ষীণ স্বরে বলল, "অধিকার তো আপনার প্রথম থেকেই ছিল, শুভ্র। আপনি শুধু... আপনি শুধু বড্ড বেশি ধৈর্য দেখাচ্ছেন আমার জন্য..." অনিন্দিতার কণ্ঠস্বরটা প্রতিধ্বনিত হলো চওড়া বুকের ভেতর।
শুভ্রর বুকের ভেতরে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেল যেন। ওর ভেতরে বয়ে চলা গত কয়েকদিনের সমস্ত হাহাকারকে প্রশান্তিতে রূপ দিল অনিন্দিতার এই স্বীকারোক্তি। শুভ্র ওর মুখটা নিজের আঁজলায় তুলে ধরল। মেয়েটার চোখ দুটো সজল, কিন্তু সেখানে আগের মতো ভয়ের ছায়া নেই; বরং শুভ্রর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা আর ভালোলাগা খেলে যাচ্ছে সেখানে।
শুভ্র ওর কপালে নিজের ঠোঁটদুটো আলতো করে চেপে ধরে ফিসফিস করে বলল, "ধৈর্য? তোমার জন্য আমি গোটা একটা জীবন, অনন্তকাল ধরে অপেক্ষা করতে পারি, নন্দিতা। তোমার শরীর জয় করার আগে মনটাকে জয় করতে চাই আমি। আমি চাই, আমার স্পর্শে তুমি আতঙ্কিত নয়, প্রতিস্ফুটিত হও।"
শুভ্রর চোখের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ কোল ঘেঁষে একফোঁটা গরম তরল গড়িয়ে পড়ল মেয়েটার। এই ছেলেটা কি সত্যিই রক্ত-মাংসের কোনো মানুষ? নাকি স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত কোনো বিশেষ দূত, ও জানে না, জানতেও চায় না। শুধু জানে এই মানুষটা না থাকলে এই কয়েকদিনে অতল অন্ধকারে তলিয়ে যেত ও। তলিয়ে যাওয়ার আগেই মানুষটা নিজে হাতে টেনে ধরেছে ওকে।
বিষন্ন চোখদুটো থেকে গড়িয়ে পড়া অশ্রুর নোনা স্বাদটুকু শুভ্রর ঠোঁটে মিশে যেতেই অনিন্দিতার ভেতরে জমে থাকা শেষ অবদমিত যন্ত্রণাটুকুও যেন গলে জল হয়ে গেল। ও অনুভব করল, এই মানুষটার কাছে ওর কোনো আবরণ নেই, কোনো লজ্জা নেই, এমনকি ওর দগদগে ক্ষতগুলোও এখানে সুরক্ষিত।
শুভ্র ওর গাল থেকে মুখ তুলে খুব কোমল গলায় বলল, "কান্না কেন, ফুল? আমি কি কষ্ট দিলাম তোমাকে?"
অনিন্দিতা দুদিকে মাথা নাড়ল। কোমল কণ্ঠস্বরটা কানে যেতেই শুভ্রর টি-শার্টের কলারটা নিজের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরে ফুঁপিয়ে উঠল মেয়েটা।
"আমাকে.. আমাকে কেন এত ভালোবাসেন, শুভ্র? আমার মাঝে মাঝে খুব ভয় হয়.. আমি যদি আপনার এই পাহাড় সমান ভালোবাসার প্রতিদান--"
"শশশ্... ভালোবাসায় প্রতিদান বলে কোনো শব্দ হয় না, নন্দিতা।" শুভ্র ওর কথা শেষ করতে দিল না। কম্পমান ঠোঁটের ওপর তর্জনী স্থির করে থামিয়ে দিল সব আশঙ্কার কথা। সিক্ত চোখের কোল মুছে দিয়ে গাঢ় গলায় বলল, "তুমি শুধু আমার পাশে থেকো, এভাবেই শক্ত করে আমাকে আঁকড়ে রেখো--এটাই আমার পরম পাওয়া। আর কোনো প্রতিদান আমার চাই না।"
৪৯.
দুপুরের খাবারের পর অনিন্দিতা ঘুমিয়েছে ঘন্টাখানেক হলো। কিছুক্ষণ আগে ল্যাপটপ নিয়ে বিছানা ছেড়ে সোফা এসে বসেছে শুভ্র। গত ৪-৫ দিন ধরে অফিসে যায়নি ও। সামনে আরো কতদিন যাওয়া হবে না কে জানে। আজিজ সাহেব মুখে কিছু না বললেও শুভ্র জানে, বাবার একার পক্ষে এত বড় বিজনেস সামলানো এই বয়সে কষ্টকর। অনিন্দিতার দিকটা গুছিয়ে আনার পাশাপাশি ওকে আবার কাজেও ফিরতে হবে।
ল্যাপটপটা কোলের ওপর নিয়ে দীর্ঘক্ষণ মেইলের ইনবক্স ঘাটল শুভ্র। গত কয়েকদিনে পুরোপুরি অনিন্দিতার ওপর মনোনিবেশ করায় অফিসের অনেক কাজই স্থবির হয়ে আছে। 'রায়হান ক্রিয়েশনস'-এর নতুন সিজনাল কালেকশন লঞ্চ করার কথা ছিল এই সপ্তাহেই। ডিজাইনগুলো প্রায় চূড়ান্ত, কিন্তু সোর্সিং আর মার্কেটিং টিমের সাথে মিটিংগুলো পিছিয়ে যাওয়ায় ওলটপালট হয়ে গেছে সবকিছু। সেন্টার টেবিল থেকে ফোনটা তুলে আজিজ সাহেবকে কল দিল শুভ্র।
--- আসসালামুয়ালাইকুম, আব্বু...
--- ওয়াইকুমুস সালাম। কেমন আছো তোমরা? অনিন্দিতা কেমন আছে?
--- ভালো আছে। আগের চেয়ে বেটার। সাইক্রিয়াটিস্টের সাথে আজ সকালে কথা হয়েছে। প্রথম সেশনটা বেশ পজিটিভ ছিল। ও হাসছে, নিজ থেকে টুকটাক কথা বলছে। আম্মুকে বোলো টেনশন না করতে।"
--- আলহামদুলিল্লাহ!
আজিজ সাহেবের গলায় স্বস্তি ঝরে পড়ল। মনে মনে নিজেও একবার আল্লাহর শোকর আদায় করে শুভ্র বলল,
--- অফিসের কী অবস্থা, আব্বু? আমি তো কয়েকদিন ধরে কোনো খোঁজই নিতে পারিনি...
--- অফিসের চিন্তা করতে হবে না, শুভ্র। ডিজাইন ডিপার্টমেন্টের কাজ শেষ। মার্কেটিং টিমের সাথে আমি নিজে কথা বলেছি। তুমি বরং অনিন্দিতার দিকে খেয়াল দাও। তাড়াহুড়ো করো না। দরকার হলে ওখানেই মাসখানেক থাকো। অফিসের কাজ নিয়ে চিন্তা করতে হবে না।
--- তাড়াহুড়ো করবো না। অনিন্দিতার যতটুকু সময় প্রয়োজন-- আমি আছি ওর জন্য। কিন্তু অফিসের সব কাজ তো তুমি একা সামলাতে পারবেনা। এখান থেকে আমি যতটুকু পারি চেষ্টা করব।
শুভ্রর কথা শুনে আজিজ সাহেব একটু হাসলেন। ছেলের দায়িত্ববোধ দেখে ভালো লাগলো তার।
--- শোনো শুভ্র, আধুনিক প্রযুক্তির যুগে তুমি রাজশাহীতে বসেও তো অনেক কিছু করতে পারো। তবে আমি বলব, অনিন্দিতার সময়টুকুকে ভাগ করো না। ওর সুস্থতা আমাদের কাছে এখন প্রথম প্রায়োরিটি। অফিসের গুরুত্বপূর্ণ মেইল বা কোনো সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হলে আমি জানাব তোমাকে। আরেকটা কথা...
আজিজ সাহেব একটু থেমে আবার বললেন,
--- আইওসি আজ সকালেও ফোন করেছিলেন অনিন্দিতার স্টেটমেন্ট নেওয়ার জন্য। ভিকটিমের স্টেটমেন্ট ছাড়া নাকি কেইস শক্ত হচ্ছে না। আমি বলেছি মেয়েটা এখন কথা বলার মতো অবস্থায় নেই।
শুভ্রর চোয়াল শক্ত হয়ে এল মুহুর্তেই। ল্যাপটপের উজ্জ্বল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা স্থির চোখে ফুটে উঠল এক অদ্ভুত কাঠিন্য।
--- অসম্ভব আব্বু! অনিন্দিতা এখন পুলিশের মুখোমুখি হওয়ার মতো অবস্থায় নেই। ওকে সেই রাতের কথা আবার মনে করিয়ে দেওয়া মানে ওকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া। অনিন্দিতা বর্তমানে 'Severe PTSD' এর মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং যেকোনো ধরনের জেরা এই মুহূর্তে ওর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ-- আদিল অলরেডি একটা মেডিকেল সার্টিফিকেট রেডি করছে এর ওপর। পুলিশকে সিসিটিভি ফুটেজসহ ফরেনসিক রিপোর্ট আর আমার স্টেটমেন্ট দিয়েই কাজ চালাতে বলে দাও।
--- আমি তাই বলেছি, কিন্তু ওরা বলছে নিয়ম অনুযায়ী অন্তত একবার ভিকটিমের কথা শোনা দরকার।
--- নিয়ম আমার স্ত্রীর জীবনের চেয়ে বড় নয়, আব্বু। দরকার হলে লইয়ারকে হাই কোর্ট থেকে রিট করতে বলো। এই মুহূর্তে অনিন্দিতাকে কিছুতেই আবার ওই অন্ধকার স্মৃতির জাঁতাকলে ফেলতে পারব না আমি।
আজিজ সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে একটু থামলেন। তারপর গলার স্বর আরও নামিয়ে বললেন,
--- রায়ানের বিষয় নিয়ে কাল লইয়ারের সাথে কথা হয়েছে আমার। পুলিশি পাহারার মাঝেই নাকি জেল হাসপাতালে সুইসাইড অ্যাটেম্পট করেছে। বিছানার চাদর ছিঁড়ে গলায় ফাঁস দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। অবস্থা ক্রিটিক্যাল।
খবরটা শোনামাত্র শুভ্রর হাতের আঙুলগুলো ল্যাপটপের কিবোর্ডে শক্ত হয়ে বসল। ঘৃণা এবং ক্রোধের মিশ্রিত প্রতিক্রিয়ায় রি রি করে উঠল ওর পুরো শরীর।
--- সুইসাইড অ্যাটেম্পট? এত সহজে পার পেয়ে যেতে চায় ও? ওকে তো তিলে তিলে ভোগাতে চেয়েছিলাম আমি। এই কাপুরুষতা দিয়ে কি নিজের অপরাধ ধামাচাপা দিতে পারবে ওই শয়তান?
--- আইন নিজের গতিতে চলবে শুভ্র। কিন্তু অনিন্দিতার কানে যেন এই খবর কোনোভাবেই না পৌঁছায়। ওর জবানবন্দি নেওয়ার চাপ আর রায়ানের এই আত্মহত্যার খবর—দুটোই ওকে আবার ট্রমার ভেতরে ঢুকিয়ে দেবে।
আজিজ সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন,
--- আইন নিজের গতিতে চলবে শুভ্র। কিন্তু অনিন্দিতার কানে যেন এইসব খবর কোনোভাবেই না পৌঁছায়। ও এখন যে মানসিক অবস্থায় আছে, তাতে পুলিশের জেরার কিংবা রায়ানের নাম— দুটোই আবার ট্রমার ভেতরে ঢুকিয়ে দেবে ওকে।
--- ও জানবে না, আব্বু। এক বিন্দু বিষাক্ততাও ওকে ছুঁতে দেব না আমি। ওর চারপাশে আমি এমন এক দেয়াল তুলব যেখানে ওই জানোয়ারটার ছায়াও পৌঁছাবে না।
ফোন রেখে গভীর চিন্তায় নিমগ্ন হলো শুভ্র। রায়ান নামের ওই নরপশুটা এখনো ওদের জীবন বিষিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে, এমনকি নিজের প্রাণ দেওয়ার নাটক করে হলেও। ল্যাপটপটা বন্ধ করে বিছানায় ঘুমন্ত অনিন্দিতার দিকে তাকাল ও। মেয়েটা নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে, ওর মুখে এখন কোনো ভয়ের চিহ্ন নেই।
কোথা থেকে কী হয়ে গেল, জানেনা শুভ্র। সেদিন ইরার এনগেজমেন্ট শেষে ছাদে অনিন্দিতার সাথে কথা বলতে চেষ্টা করেছিল রায়ান। ছুঁতেও চেয়েছিল বোধহয়। শুভ্র চলে আসায় তড়িৎ হাত সরিয়ে নেওয়াটা স্পষ্ট দেখেছিস শুভ্র। তারপর, অল্পতেই মাথা গরম হয়ে যাওয়া আর প্রিয় নারীর প্রতি অতিরিক্ত প্রটেকটিভ মনোভাবের কারণে ওর গায়ে হাত তুলতেই যাচ্ছিল ও। অনিন্দিতা আটকেছে মাঝপথে।
সেদিন যদি অনিন্দিতার বাধা না মেনে রায়ানকে ওর জায়গাটা বুঝিয়ে দিত শুভ্র, তাহলে কি রায়ান এতখানি সাহস দেখানোর স্পর্ধা পেত? নাকি প্রতিশোধের আগুনে দগ্ধ হয়ে আরো বেশি ক্ষতি করার চেষ্টা করত শুভ্রর মেঘফুলের?
শুভ্র উঠে গিয়ে বিছানায় বসলো। অনিন্দিতার একটা হাত এলিয়ে পড়ে আছে বালিশের বাইরে। শুভ্র খুব সাবধানে সেই হাতটা তুলে নিয়ে নিজের গালে ঠেকাল। পরমুহূর্তেই ছোট ছোট ভিজে চুমুতে ভরিয়ে দিল নরম হাতের তালু।
শুভ্রর মনে এক অদ্ভুত দহন শুরু হয়েছে। রায়ানের আত্মহত্যার চেষ্টার খবরটা ওকে স্বস্তি দিচ্ছে না, বরং এক অদৃশ্য ক্রোধে শক্ত হয়ে আসছে ওর চোয়াল। ওর মনে পড়ল সেই বীভৎস রাতের কথা। সেদিন যদি ও আর কয়েকটা সেকেন্ড দেরি করে পৌঁছাত? ভাবতে গেলেই শরীরের রক্ত হিম হয়ে আসে শুভ্রর। ইচ্ছে করে এই মেয়েটাকে নিজের প্রসস্থ বক্ষে সন্তর্পণে লুকিয়ে ফেলতে।
অস্থিরতার এক তীব্র স্রোত বয়ে গেল শুভ্রর শিরায় শিরায়। ঘুমন্ত অনিন্দিতাকে ও প্রায় জাপটে ধরল নিজের বলিষ্ঠ দুই বাহু দিয়ে। যেন এখনই কেউ কেড়ে নিয়ে যাবে ওর মেঘফুলকে, ওর প্রিয়তমা স্ত্রীকে।
ঘুমের মাঝে হঠাৎ এহেন চাপ অনুভব হওয়ায় ভ্রু দুটো কুঁচকে গেল অনিন্দিতার। শুভ্র তখন পাগলের মতো অনিন্দিতার কপালে, নাকে, ঠোঁটে, গালে ছোট ছোট চুমু খাচ্ছে। ঘুমের ঘোরেই অনিন্দিতা অনুভব করল একজোড়া তৃষ্ণার্ত ঠোঁট অস্থিরভাবে বিচরণ করছে ওর সারা মুখে।
সাথে সাথেই তন্দ্রা টুটে গেল ওর। চোখ মেলে দেখল শুভ্র পাগলের মতো আদর করে চলেছে ওর সমস্ত মুখশ্রী জুড়ে। অনিন্দিতা প্রথমে চমকে উঠলেও পরমুহূর্তেই অনুভব করল শুভ্রর স্পর্শের তীব্রতা। রক্তিম চোখ দুটোয় কিসের যেন এক তীব্র হাহাকার।
"ক-কী হয়েছে, শুভ্র? ঠিক আছেন আপনি?"
অনিন্দিতার কন্ঠস্বর কানে যেতেই শুভ্রর পাগলামি খানিকটা স্তিমিত হলো যেন। উত্তর না দিয়ে মসৃণ গ্ৰীবাদেশে মুখ গুঁজে একটা নিঃশ্বাস টেনে বিরবির করল ও, "আমি তোমাকে কোত্থাও যেতে দেব না নন্দিতা.. কক্ষনো না..."
শুভ্রর বক্ষস্থলের বেড়ে যাওয়া ধুকপুকানি স্পষ্ট টের পেল অনিন্দিতা। সদ্য ঘুম ভাঙ্গা মস্তিষ্ক বুঝে উঠতে পারল না শক্ত সামর্থ মানুষটা হঠাৎ করে এমন নুইয়ে পড়েছে কেন। অগোছালো চুলের ভাঁজে হাত গলিয়ে দিয়ে নরম স্বরে অনিন্দিতা জিজ্ঞেস করল, "আমার দিকে তাকান, শুভ্র। খারাপ কোনো স্বপ্ন দেখেছেন?"
চুলের মাঝে নরম হাতের স্পর্শ পেতেই আরেকটু নিবিড়ভাবে মেয়েটাকে নিজের শরীরের সাথে পিষে ধরল শুভ্র। প্রসস্থ বুকের ধড়ফড়ানি তখনো আছড়ে পড়ছে অনিন্দিতার শরীরে। মসৃণ গ্রীবাদেশ থেকে মুখ না তুলে সময় নিয়ে নিজেকে শান্ত করল শুভ্র। তারপর সেথায় একটা ভিজে চুমু খেয়ে মুখ তুলে তাকালো অনিন্দিতার চিন্তিত বদনে।
"আ'ম সরি, ফুল! খুব ভয় পাইয়ে দিয়েছি না তোমাকে?"
দুহাত দিয়ে শুভ্রর গাল দুটো আগলে ধরল অনিন্দিতা। পুরুষালি গালের খোঁচা খোঁচা দাড়িগুলো বিঁধছে নরম হাতের তালুতে, তা উপেক্ষা করে শুভ্রর রক্তিম চোখের কোণে একদৃষ্টে চেয়ে অনিন্দিতা নরম গলায় জিজ্ঞেস করল, "কী হয়েছে, আমাকে বলবেন না, শুভ্র?"
শুভ্র কয়েক মুহূর্ত অপলক তাকিয়ে রইল অনিন্দিতার মায়াবী চোখের দিকে। যে মেয়েটা নিজেই কেবল এক মহাসমুদ্র ট্রমা পার করে এসেছে, সে এখন বিচলিত হচ্ছে শুভ্রর অস্থিরতা দেখে। শুভ্র আলতো করে হাসল। সেই হাসিতে বিষণ্ণতার চেয়ে ভালোবাসাই বেশি। নরম হাতের তালুতে নিজের পুরু ঠোঁট দুটো ঠেকিয়ে ও বলল, "তোমাকে ঘুমাতে দেখে হঠাৎ মনে হলো-- যদি এটা স্বপ্ন হয়? যদি চোখ মেললে দেখি তুমি পাশে নেই? ভয়টা আমাকে আচমকাই পাগল করে দিয়েছিল, নন্দিতা। আই অ্যাম জাস্ট ঠু মাচ পজেসিভ অ্যাবাউট ইউ। আমি বোধহয় তোমাকে উম্মাদের মতো ভালোবেসে ফেলেছি, মেঘফুল।"
অনিন্দিতার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল এক নিমিষে। যে মানুষটা হিমালয়ের মতো অটল থেকে গত কয়েকদিন ওকে আগলে রেখেছে, তার ভেতরেও এমন এক চোরাবালির মতো ভয় লুকিয়ে আছে?
"পাগল!" অনিন্দিতা আলতো করে নিজের কপাল ঠেকালো শুভ্রর কপালে, "যে মায়াবী জালে আপনি আমাকে জড়িয়েছেন, সেখান থেকে পালিয়ে যাওয়ার সাধ্য আছে আমার?"
শুভ্রর উত্তপ্ত নিঃশ্বাস আছড়ে পড়ছে অনিন্দিতার ওষ্ঠাধরে। অনিন্দিতা শুভ্রর একটা হাত টেনে নিয়ে রাখল নিজের বুকের বাঁ পাশে। সহসা দ্রুতলয়ে স্পন্দিত হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি আছড়ে পড়ল শুভ্রর হাতের তালুতে।
"শুনতে পাচ্ছেন?" অনিন্দিতার কণ্ঠস্বরটা মখমলের মতো কোমল শোনাল, "এই ধুকপুকানিটা কেবল মেঘফুলের শুভ্র-র জন্য। সে যতক্ষণ এই মেঘফুলের সাথে আছে, এই হৃদপিণ্ডটা ততক্ষণই সচল। সে না থাকলে এই স্পন্দনও থাকবে না।"
শুভ্র স্তব্ধ হয়ে অনুভব করে গেল হাতের তালুর নিচে নরম বুকের খাঁচায় হৃদপিণ্ডের উদ্দাম নৃত্য কম্পন সৃষ্টি করছে ওর নিজের ধমনীতেও। সেই স্পন্দন ভয়ের নয়, আতঙ্কের নয়-- এ স্পন্দন এক গভীর অনুরাগের প্রতিধ্বনি।
"আমাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা স্বপ্নেও ভাববে না, মেঘফুল। আমি সহ্য করতে পারব না," শুভ্র ওর ঠোঁটের খুব কাছে মুখ নিয়ে এসে ধরা গলায় বলল, "আমি স্বার্থপর হতে চাই, তোমাকে সারা পৃথিবীর কাছ থেকে লুকিয়ে নিজের মনের গহীনে বন্দি করে রাখতে চাই আমি।"
অনিন্দিতা মৃদু হাসল। এই প্রথম ওর হাসিতে কোনো ম্লান ভাব নেই। শুভ্রর ঠোঁটে নিজের একটা আঙুল ছুঁইয়ে দিল মেয়েটা, "আমি তো বন্দি হয়েই আছি.. আপনার ভালোবাসার এই সোনার খাঁচায় আমি আজীবনই বন্দি থাকতে চাই।"
৫০.
"শুভ্র.. শু-শুভ্র... শুনছেন..?"
ডিনার সেরে ঘরে এসে মাত্রই ল্যাপটপটা নিয়ে বিছানায় বসেছিল শুভ্র। অনিন্দিতার অস্থির কণ্ঠস্বর কানে যেতেই ল্যাপটপ রেখে উঠে এলো ও।
"কী হয়েছে, ফুল?"
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অনিন্দিতা তখন উন্মাদের মতো নিজের বাম হাতের আঙুলগুলো দেখছে, যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না জায়গাটা শূন্য। চিরুনিটা হাত ফসকে নিচে পড়ে যেতেই শুভ্র উবু হয়ে উঠিয়ে ড্রেসিং টেবিলে রাখল ওটা।
"কী হয়েছে, নন্দিতা? আর ইউ ওকে?"
"শু-শুভ্র... আমার আংটিটা নেই! আমাদের এনগেজমেন্টের আংটিটা নেই! আমার আঙুলে নেই..!"
অনিন্দিতার কণ্ঠস্বর কাঁপছে। হন্যে হয়ে ড্রেসিং টেবিলের ওপর হাতড়াতে শুরু করল ও। চিরুনি, পাউডারের কৌটো, পারফিউমের বোতল-- সব তছনছ করে ফেলল এক নিমেষে। শুভ্র দ্রুত ওর বাহুতে হাত রাখল, "নন্দিতা, রিল্যাক্স! দেখো আমার দিকে!"
অনিন্দিতা ফুঁপিয়ে উঠলো, "কোথায় গেল? আজ সকালেও তো ছিল.. নাকি কাল ছিল? আমি.. আমি মনে করতে পারছি না শুভ্র! আমি কি ওটা কোথাও খুলে রেখেছি? না কি.. না কি ওটা ওই রাতে..?"
'ওই রাতে' শব্দটা উচ্চারণ করতেই অনিন্দিতার চোখের মণি স্থির হয়ে গেল। ওর মনে পড়ে গেল ওয়াশরুমের সেই ধস্তাধস্তির কথা। ও কি তখনই হারিয়ে ফেলেছে ওদের এনগেজমেন্টের আংটিটা? সহসাই শরীর কাঁপতে শুরু করল মেয়েটার।
"শুভ্র... ওই লোকটা... ওই লোকটা আমার আংটিটা কেড়ে নিয়েছে। আমার কাছ থেকে আপনার শেষ চিহ্নটুকুও মুছে দিতে চেয়েছে ও..."
অনিন্দিতার শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হয়ে এল। আয়নার প্রতিবিম্বে নিজের খালি আঙুলটার দিকে তাকিয়ে ওর মনে হলো, সেই জঘন্য রাতের প্রতিটা মুহূর্ত। রায়ানের শক্ত হাত-- ওর কব্জি চেপে ধরা, আর অনিন্দিতার আপ্রাণ ছাড়িয়ে নেওয়ার লড়াই। উন্মাদের মতো নিজের বাম হাতটা ডান হাত দিয়ে ঘষতে লাগল মেয়েটা।
শুভ্র তড়িৎগতিতে ওর দুই হাত শক্ত করে ধরে ফেলল। ওর সচেতন মস্তিষ্ক ওকে পরিষ্কার ইঙ্গিত দিচ্ছে কী হতে চলেছে এই মুহূর্তে। "নন্দিতা! তাকাও, আমার দিকে তাকাও! আংটিটা হারায়নি, ওটা আমি খুলে রেখেছি!"
অনিন্দিতা থমকে গেল। শুভ্রর মুখে অবিশ্বাসের দৃষ্টি ফেলে অস্থির কন্ঠে বলল, "আপনি খুলে রেখেছেন? কোথায়? দিন আমাকে... এখনই দিন!"
শুভ্র ফাঁকা ঢোক গিলল। ও জানত এই দিনটা আসবে, কিন্তু এত দ্রুত আসবে ভাবেনি।
"নন্দিতা, শোনো... আংটিটার পাথরটা না, একটু আলগা হয়ে গিয়েছিল, আমি খেয়াল করেছিলাম। তাই কাল এখানে আসার আগে ওটা আলমারিতে তুলে রেখে এসেছি। ঠিক করতে দিতে হবে তো, তাই না?"
"মিথ্যে!" অনিন্দিতা ঝটকা দিয়ে শুভ্রর হাত ছাড়িয়ে নিল, "আপনি মিথ্যে বলছেন শুভ্র! আমি জানি... আমি দেখেছি... আমি যখন ওর হাত থেকে বাঁচার জন্য ছটফট করছিলাম, তখন আমার আঙুলে ব্যথা লেগেছিল... ওটা পড়ে গেছে! ওটা ওই রক্তমাখা মেঝেতে পড়ে আছে। ওই... ওই ন-নরপশুটা আমার সব কিছু কেড়ে নিয়েছে, আম-আমার... আমার আংটিটাও বাদ দেয়নি! শুভ্রর দেয়া আংটি--"
বলতে বলতেই অনিন্দিতা নিজের গলা চেপে ধরল। আবার সেই অক্সিজেনের অভাব। ও হাঁ করে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করছে, অথচ বাতাস যেন বিষ হয়ে গেছে। ধপ করে মাটিতে বসে পড়ার আগেই শুভ্র দুহাতে জাপটে ধরলো ওকে।
"নন্দিতা! কাম ডাউন! কাম ডাউন! আমি মিথ্যে বলছি না সোনা! বিশ্বাস করো.. আংটিটা বাসায় আছে। আমি আনতে ভুলে গেছি। আমরা রাজশাহী থেকে ফিরে ওটা আবার পরব।"
শুভ্র তড়িঘড়ি করে পাঁজাকোলে তুলে বিছানায় শুইয়ে দিল অনিন্দিতাকে। মেয়েটা তখনও হাঁ করে নিঃশ্বাস টানার চেষ্টা করছে। গলার শিরাগুলো ফুলে উঠছে অক্সিজেনের অভাবে। ও বেমালুম ভুলে বসলো সকালে আদিলের শেখানো সেই '৪-৭-৮' টেকনিক। প্যানিক যখন মগজ দখল করে নেয়, তখন কোনো যুক্তিই আর কাজ করে না।
"আম-আমা-র আং-টি... ওই লো-লোকটা নিয়ে ন-নিয়েছে। আম-আমি হার-হারিয়ে ফে-লেছি শুভ্রর আংটি.. না-না-না..."
"আংটিটা সেফ আছে, ফুল! ওটা স্রেফ একটা হীরে, একটা পাথর, ওটা তোমাকে ডিফাইন করে না! লুক অ্যাট মি, সোনা! দেখো, তাকাও..."
কিন্তু অনিন্দিতা তখন ট্রমার অতল গহ্বরে। ওর কানের কাছে বাজছে রায়ানের পৈশাচিক, নোংরা হাসি। দুহাতে নিজের কান চেপে ধরল মেয়েটা,
"স-সরাও.. সরাও ওকে! ও আ-আসছে... ও আম-মার আংটিটা নিয়ে হাসছে... না-আ-আ... শুভ্র বাঁচাও! ও আমাকে মেরে ফেলবে!"
অনিন্দিতার সারা শরীর ঘামে ভিজে জবজবে হয়ে গেছে। অনবরত দুপাশে মাথা নাড়ছে মেয়েটা।
"রক্ত.. শুভ্র.. আংটিটা রক্তে ডুবে আছে..." বলতে বলতেই ঝাঁকুনি দিয়ে একবার শিউরে উঠল মেয়েটা।
শুভ্র ওর শরীরটা দুহাতে শক্ত করে চেপে ধরে পাগলের মতো ঝুঁকে এল ওর বুকের ওপর, "ফুল! আমার কথা শোনো! রায়ান নেই! কেউ নেই এখানে! জাস্ট ব্রিদ... আমার সাথে সাথে শ্বাস নাও!"
অনিন্দিতার চোখের মণি উল্টে সাদা অংশ দৃশ্যমান প্রায়। শুভ্রর কোনো কথাই কানে যাচ্ছে না ওর। ভয় পেয়ে গেল শুভ্র। সেদিন আব্বু-আম্মু কাছে ছিল, আজ শুভ্র একা। মেয়েটাকে কীভাবে সামলাবে এই চিন্তায় অস্থির শুভ্রর কপালে ঘামের বিন্দু। প্রায় বর্ণহীন মুখটা একহাতে আগলে ফ্যাকাশে গালে চাপড় দিতে দিতে অস্থির গলায় ডাকলো শুভ্র,
"নন্দিতা, এমন কোরো না সোনা! দেখো.. একটাবার শোনো আমার কথা.. ফোর-সেভেন-এইট... মনে করো আদিল কী শিখিয়েছে! বড় করে শ্বাস নাও!"
To be continued...