#অন্তিম_পর্ব
গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি
#লেখিকা_রশনি_করিম
[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
কল্পনা সাহিত্যের রুমের জিনিসগুলো হাত দিয়ে ছুঁয়ে-ছুঁয়ে দেখছে।এই রুমটায় এখন মনটা আসার জন্য কেন জানি খুব ইচ্ছা করে।তাই তো আজ সুযোগ পেয়ে এসেছে সে।সাহিত্য অফিসে গিয়েছে।সেই সুযোগেই রুমটা ঘুরে-ঘুরে দেখছে।
হঠাৎই কল্পনার মনে এক খটকা লাগলো।সাহিত্য এতোগুলো পেইন্টিং করেছে।অথচ একটাও এখন দেখছে না কেন?পেইন্টিংগুলো রাখে কই সাহিত্য?
কল্পনা এবার ভ্রু জোড়া কুচকেই পুরো রুম ঘাটতে লাগলো।মনযোগ দিয়ে ঘটছে সেজন্যই হয়তো পেল।আলমারি উপর কিছু দেখা যাচ্ছে।হাত হালকা উঁচু করতেই কয়েকটা ক্যানভাসে হাত পড়ল কল্পনার।একটা কোণা টান দিতেই সব হুড়মুড়িয়ে পড়ে গেল মেঝেতে।
হঠাৎ সব ক্যানভাস মেঝেতে পড়ায় কল্পনা যতটা না চমকেছে,তার থেকেও বেশি চমকেছে ক্যানভাসে থাকা ছবিগুলো দেখে।প্রতিটা ক্যানভাসে যেন একজনই ফুটে উঠেছে।আর সে হলো সাহিত্যের একমাত্র প্রেয়সী।
একেকটা ছবি একেক দিকে থেকে আর্ট করা।কোনোটাতে কল্পনা হাসছে তো কোনোটাতে নিশ্চুপ সামনে তাকিয়ে আছে।কোনোটাতে চুল ঠিক করছে তো কোনোটাতে চুলগুলোর আড়ালেই লুকিয়ে আছে।
এতো-এতো ছবি থেকে কল্পনা মাঝারি সাইজের একটা ছবি তুলে হাতে নিল।শুধুমাত্র এই ছবিটাতেই যেন কল্পনার সাথে সাহিত্যও ক্যানভাসে উপস্থিত।কল্পনার কোমল চাহনি সাহিত্যের মধ্যে আবদ্ধ।আর সাহিত্য ব্যস্ত হয়ে আছে তার প্রেয়সীর কানের পেছনে ফুল গুজে দিতে।ক্যানভাসটা এক দিকে সাহিত্য আর কল্পনার ছবি।আর আরেক দিয়ে কবিতার দুটো লাইন অনেক সুন্দর করে লিখে রেখেছে সাহিত্য।
🥀
আমি অন্য কল্পনায় করব কিভাবে ভ্রমণ?
যেখানে আমার পুরো কল্পনা জুড়ে শুধু তোমারই বিচরণ।
🥀
লাইন দুটো পড়ল কল্পনা।সেটা পড়ে ছবিটার দিকে দেখে আছে সে।নজর ঘুরিয়ে নিচে তাকিয়ে দেখতে লাগলো পুরো মেঝেতে এলোমেলো হয়ে থাকা ক্যানভাসগুলোর দিকে।কবিতার লাইন দুটো পড়েই বুঝা সক্ষম সাহিত্যের ক্যানভাসগুলোতে শুধুই কল্পনা কেন।
"জানপাখি?"
পেছনে হঠাৎ সাহিত্যের কন্ঠ শুনে চমকে উঠল কল্পনা।নজর দিল সাহিত্যের দিকে।
আজ বেশি কাজ না থাকায় সাহিত্য বিকেলের দিকেই বাড়ি ফিরেছে।বাড়িতে ফিরেই যেন বেশ অবাক হলো সে।সাহিত্য নিচের ক্যানভাসগুলোকে এক নজর দেখে আবার কল্পনার দিকে তাকালো,
"তুই এখানে কি করছিস?"
কল্পনা সাহিত্যের দিকে নজর রেখেই হাতের ছোট ক্যানভাসটা হালকা বাড়িয়ে ধরল সাহিত্যের দিকে।কাপা কন্ঠে বলে উঠল সে,
"এ-এগুলো...কি-ক-কখন করেছেন?"
মৃদু ঠোঁট বাকালো সাহিত্য।কল্পনার কমোর ধরে নিজের কাছে টানতে নিয়ে বলে উঠল সে,
"তুই যখন তোর নানাবাড়িতে তখন তোকে ছাড়া আর কিছু নিয়েই চিন্তা করতে পারছিলাম না"
সাহিত্য কথাটা বলতে নিয়েই কল্পনার হাতের ক্যানভাসটায় এক নজর দেখে নিল।অতঃপর কল্পনার কপালে কপাল ঠেকিয়ে চোখ বুজে নিল সে।নেশালো কন্ঠে বলে উঠল,
"আমি অন্য কল্পনায় করব কিভাবে ভ্রমণ?যেখানে আমার পুরো কল্পনা জুড়ে শুধু তোমারই বিচরণ"
কল্পনা ও সাহিত্যের মাঝে ক্যানভাসটা আটকা পড়েছে।সেটা পাশে রাখতে নিয়েই কল্পনা মৃদু হেসে উঠল,
"আপনি একটা পাগল"
সাহিত্য এখনো কল্পনার কপালের সাথে কপাল ঠেকিয়ে রেখেছে।কল্পনাকে আরো একটু নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে বলল সে,
"তুই কাছে থাকলে তোর প্রেমে পাগল হই।আর তুই কাছে না থাকলে তোর অভাবে পাগল হই"
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
ফাহাদ শেখ ছাদে পায়চারি করছেন।নিজের মনকে সে এখনো স্থির করতে পারেননি।তারউপর সাহিত্য যেমন করে কল্পনাকে শেখ ভিলায় ফেরত এনেছেন সেটাতে তো তিনি আরো রাগের চোটে ফুসছেন।সাহিত্যকে আরো বেয়াদবের কাতারে ফেলেছেন।
আর কল্পনার সেদিনের ব্যবহারে তো তিনি আরো অবাক।তার মেয়েটা কি বুঝছে না যে ওই ছেলের সাথে সংসার করলে ভালো ঠেকবে না।ফাহাদ শেখ থমকালেন যেন।সাহিত্য কি আসলেই এতোটা খারাপ?নাকি ফাহাদ শেখ নিজে তা বুঝছেন?নিজেকে কি বুঝ দিচ্ছেন তিনি?এতো বছরের রাগের প্রভাবটাই হয়তো এখন পড়ছে।
আর ভাবলেন না ফাহাদ শেখ।ছাদ থেকে নেমে এলেন তিনি।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
শীত হালকা একটু কমে এসেছে এতোদিনে।তবে কল্পনা শরীরে একটা শাল পেচিয়ে শেখ ভিলার কেচি গেটের দিকে আগাতে ব্যস্ত।সাহিত্য কিছুক্ষণ আগেই কল দিয়েছিল তাকে।কি যেন দরকার তাই কল্পনাকে দ্রুত শেখ ভিলার বাইরে আসতে বলে।তাই তো কল্পনা হুটিপুটি পায়ে বাসার কাপড় পড়েই বেড়িয়ে আসে।
সাহিত্যের রয়েল গ্রিন অ্যাস্টন মার্টিনটা দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার উপর।কল্পনা আসতেই সাহিত্য দরজা খুলে ধরল।কল্পনা ভ্রু কুচকে দাঁড়িয়ে থাকলে তাকে তাড়া দিল সাহিত্য।একপ্রকার জোর করেই উঠালো গাড়িতে।
কল্পনার শরীরটা বড্ড ক্লান্ত লাগছে।তাই তো গাড়িতে উঠেই সিটে এলিয়ে পড়ে সে।সাহিত্যের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে ক্লান্ত চাহনি নিয়েই বলে উঠল,
"হঠাৎ কই নিয়ে যাচ্ছেন?আমার ঘুম পেয়েছে অনেক।শরীরটাও খুব ক্লান্ত লাগছে"
কল্পনা সেকথা বলার পরপরই সাহিত্য তার কপালে হাত ছোয়ালো,
"কেন কি হয়েছে?জ্বর এসেছে নাকি?"
ঠোঁট উল্টালো কল্পনা,
"জানি না।গত সপ্তাহ থেকে এমন লাগছে।কিছু খেতেও ইচ্ছা করছে না"
"দেখি কালকেই মুহিত আঙ্কেলের কাছে নিয়ে যাবো তোকে"
উঠে বসলো কল্পনা,
"ওসব এখন বাদ দেন।কই নিয়ে যাচ্ছেন সেটা বলেন আগে"
ঠোঁট বাকালো সাহিত্য,
"বাসায় তোর দিকে যখনই দেখতে যাই তখনই শশুর আব্বা গিলে খায় আমায়।আমার বউকে আমি একটু শান্তি মতো দেখবোও না?তাই ক্যাফেতে নিয়ে যাচ্ছি।ওখানে সামনাসামনি বসে একটু ভালো করে দেখতে তো পারবো"
সাহিত্যের কথা শুনে কল্পনা শব্দ করেই হেসে উঠল।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
ক্যাফেতে বসে সাহিত্য তার পছন্দের সুগার ফ্রি হট ব্লাক কফি খাচ্ছে আর সামনে বসে থাকা তার প্রেয়সীর দিকে দেখছে।যে কিনা টমেটো সস দিয়ে ব্রেড চাবাতে ব্যস্ত।কফিতে বিরতি দিয়ে ভ্রু কুচকে বলে উঠল সাহিত্য,
"মানুষ জ্যাম ব্রেড খায়।তুই সস ব্রেড কেমন করে খাচ্ছিস?"
খাবার চাবাতে নিয়েই কল্পনা সাহিত্যের দিকে নজর দিল।মুখ ভর্তি খাবার নিয়েই বলল সে,
"কেন?খাওয়া যাবে না নাকি?আমার খেতে ইচ্ছা করেছে তাই খাচ্ছি"
সাহিত্য চোখ উল্টালো।এই মেয়েটা আসলেই পাগল হয়ে গিয়েছে।কল্পনা সাহিত্যের দিকে দেখে মিটিমিটি হাসছিল।এমন সময় তার নজর গেল সাহিত্যের পেছনে।ভ্রু কুচকে দেখে থাকলো সে।সাথে বলেও উঠল,
"অন্ত ভাইয়া?"
সাহিত্যও ভ্রু কুচকালো।নজর দিল পেছনে।অমনি আতকে উঠল ছেলেটা।অন্ত প্রীতির সাথে বসে কফি খেতে ব্যস্ত।সাহিত্য সেটা দেখে স্বাভাবিকভাবেই সামনে ঘুরলো।আজ অন্তর ভান্ডা ফুটতে চলেছে।কল্পনা আর দ্বিতীয় কিছু ভাবলো না।উঠে সোজা এগিয়ে গেল প্রীতিদের দিকে।
অন্ত আর প্রীতি ক্যাফেতে বসেছিল একটু কফি খেতে।কিন্তু এখন মনে হয় বাঁশও খেতে হবে।কল্পনা তেরে এসে দাড়ালো তাদের সামনে।কোমরে হাত দিয়ে বলল সে,
"অন্ত ভাইয়া!"
চমকে উঠল অন্ত আর প্রীতি।কল্পনার দিকে ঘুরা মাত্রই দুজনে ধরফরিয়ে উঠে দাড়ালো।আমতা-আমতা করছে দুজনে।এর মাঝেই কল্পনা অন্তর দিকে দেখে বলে উঠল,
"তুমি তো দেখছি তলে তলে টেম্পু চালাও।আবার সেই টেম্পুর প্যাসেঞ্জার আমারই বেস্টফ্রেন্ড?"
শেষের কথাটা বলতে নিয়েই কল্পনা কটমটিয়ে প্রীতির দিকে দেখলো।অমনি প্রীতি আতকে উঠে বলে উঠল,
"কল্পনা দেখ,অমন কিছুই না..."
"তাহলে কেমন?"
"আমি তোকে অনেকবার বলার চেষ্টা করেছি।কিন্তু সিচুয়েশন প্রতিবারই এমন হয়ে দাড়াচ্ছিল যে বলাই হয়ে উঠেনি।আমি তোর কাছ থেকে লুকাতে চাইনি একদমই"
কল্পনা ভারী এক শ্বাস ফেলল,
"দেখ,কয়েকদিন থেকে শরীরে একদমই এনার্জি নেই আমার।এখন ঝগড়া করতে মন চাচ্ছে না।পরে ঝগড়া করব"
অন্ত আর প্রীতি বেশ ভ্যাবাচেকা খেল।পর মুহুর্তেই বলে উঠল কল্পনা,
"তবে আমি কিন্তু রাগ হয়েছি!আমার ভাই আমার বেস্টফ্রেন্ডকে আমার ভাবি বানাচ্ছে!এই খুশির খবর আমাকে বলেনি কেন?"
প্রীতি এসে কল্পনাকে জড়িয়ে ধরে।কাঁদো গলায় বলে উঠে সে,
"সরি।আমার আগেই বলার প্লান ছিল।কিন্তু তোর লাইফে বর্তমানে যে ড্রামা চলছে,তাই তোকে আর টেনশন দিতে চাইনি"
"আরে!এটাতে টেনশনের কি আছে?আমি তো আরো খুশি হতাম"
সাহিত্য ওদিকে চেয়ার ঘুরিয়ে নিয়ে বসেছে সার্কাস দেখার জন্য।সব মিটমাট হয়েছে দেখে কল্পনার উদ্দেশ্যে বলে উঠল সে,
"হয়েছে অত পিরিত দেখাতে হবে না।আমার কাছে আয়।ওদেরকে একটু কোয়ালিটি টাইম স্পেন্ড করতে দে।আমার বউকে দেখার সময় চলে যাচ্ছে।আবার অফিসেও যেতে হবে আমাকে"
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
সাহিত্য বেশ ক্লান্ত হয়ে অফিস থেকে ফিরছে।আজ কাজ একটু বেশি হয়ে গিয়েছে অফিসে।ব্লেজার হাতে নিয়ে ক্লান্ত শরীরেই রুমের দরজা খুলল সাহিত্য।মাথা তুলে বেশ চমকালো সে।কল্পনা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে লাল-খয়েরি রঙা একখানা শাড়ি পড়ছে।সেটা দেখেই সাহিত্য ধাম করে দরজাটা আবার লাগিয়ে দিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে রইল।ভিতরে এখনে সে কি দেখলো তার বিশ্বাস হচ্ছে না যেন।এবার ধীরেসুস্থে দরজা খুলল সে।নজর দিল বড় ড্রেসিং টেবিলটার দিকে।
সাহিত্য ক্ষণিক আগে যে ধাম করে দরজা লাগিয়ে দিয়েছে সেটাতেই কল্পনা শাড়ি পড়া থামিয়ে নজর ফেলে দরজার দিকে।মেয়েটা শাড়ি পড়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে।লাল-খয়েরি হাতা কাটা ব্লাউজের উপর শাড়ির আঁচল কোনো মতে নিয়ে কুচি করায় ব্যস্ত কল্পনা।হাত খোপাটা তো সেই খুলে গিয়েছে যখন সাহিত্যের দিকে নজর ফেলে সে।
প্রেয়সীর এমন শাড়ি পড়া দেখে মুগ্ধ হলো সাহিত্য।হাতের ব্লেজার বিছানায় রেখে।কালো শার্টের হাতা মুড়াতে নিয়ে এগুলো কল্পনার দিকে।মৃদু হেসে বলল সে,
"শাড়ি কিজন্য পড়ছিস?"
কল্পনা আয়নার দিকে ঘুরে আবারো শাড়ি পড়ায় মন দেয়,
"শিখছিলাম একটু"
সাহিত্য আর কিছু বলে না।কল্পনাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে শাড়ির কুচি হাতে নেয় সে।
অবাক হলো কল্পনা,
"আপনি শাড়ি পড়াতে পারেন?"
"হুম?"
"কই শিখেছেন?"
"সুবা চড় খাইয়ে শিখিয়েছিল"
কল্পনা ফিক করে হেসে উঠল।সেদিকে এক নজর দেখে মৃদু ঠোঁট বাকালো সাহিত্য।ব্যস্ত হয়ে পড়ল প্রেয়সীকে শাড়ি পড়াতে।কল্পনার এলোমেলো নজর ফেলছে।সাহিত্যের এমন করে শাড়ি পড়ানোতে লজ্জা বোধ করছে মেয়েটা।কিন্তু কেন জানি আবার ভালোও লাগছে বেশ।
সাহিত্য কল্পনার কাধের আঁচল ঠিক করে দিচ্ছে।এমন সময় কল্পনা আমতা-আমতা করেই বলে উঠল,
"একটা কথা বলার ছিল"
সাহিত্য কল্পনা কাধে কাছে আলত করে চুমু বসালো এক।সাথে বলেও উঠল,
"হুম বল"
কল্পনা এখনো আমতা-আমতা করছে,
"সেদিন মুহিত আঙ্কেলের কাছে গিয়ে টেস্টগুলো করিয়েছিলাম না?রিপোর্ট এসেছে ওগুলোর?"
সাহিত্য ভ্রু কুচকালো,
"রিপোর্টের রেজাল্ট কি?কিছু হয়েছে?"
সাথে-সাথেই বলে উঠল কল্পনা,
"না না!রিপোর্ট একদম নরমাল"
"তো টেনশনে দেখাচ্ছে কেন তোকে?"
কল্পনা আবারো আমতা-আমতা করে উঠল,
"ওই...আসলে...আমি...আমি প্রেগন্যান্ট"
কল্পনা মাথা নিচু করে কথাটা বলেই চোখ-মুখ খিচে নেয়।কল্পনার কাধে আঁচল ঠিক করতে নিয়েই থমকালো সাহিত্য।একদমই যেন নড়ছে না ছেলেটা।বিস্ময় ভরা নজর ফেলল কল্পনার দিকে।সাথে-সাথেই কল্পনাকে পাজা কোলে তুলে ঘুরানি দিতে শুরু করল।ছেলেটার মুখে যেন হাসি থৈ থৈ করছে,
"সত্যি জানপাখি?ভালোবাসি তোকে!অনেক ভালোবাসি!"
সাহিত্যের এমন করে কোলে তুলে নেওয়ায় ভড়কেছিল কল্পনা।চোখ খিচে নিয়ে বলে উঠল সে,
"আরে কি করছেন?থামেন।মাথা ঘুরছে আমার"
ভড়কে উঠে থেমে গেল সাহিত্য।এসময় সাবধানে থাকতে হবে সেটা যেন পর মুহুর্তেই স্মরণে এলো তার।কল্পনাকে কোলে করে নিয়েই বিছানায় বসে পড়ল সে,
"সরি সরি!"
কল্পনা মাসুম নজর ফেলল সাহিত্যের দিকে,
"আপনি রাগ হননি?"
"আমি কেন রাগ হবো?"
কথাটা বলেই কল্পনার অধরে আলত করে অধর ছোঁয়ালো সাহিত্য।অতঃপর বলে উঠল,
"থ্যাংক ইউ জানপাখি"
নাক টানতে নিয়েই ফুপিয়ে কেঁদে উঠল কল্পনা।সেটা দেখে সাহিত্য যেন আবারো ভড়কালো,
"কি হয়েছে?তুই কাঁদছিস কেন?তুই খুশি হসনি?"
উপর-নিচ মাথা ঝাকালো কল্পনা,
"হ্যাঁ"
"তাহলে কাঁদছিস কেন?বোকা মেয়ে"
ডানে-বামে মাথা ঝাকালো কল্পনা,
"জানি না"
কল্পনার চোখের জল মুছে দিল সাহিত্য।সাথে ভেজা গালে দুটো টুকরো চুমুও বসিয়ে দিল,
"আর কেউ জানে?
" না।শুধু আপনাকেই বলেছি"
"কেন বলিসনি?আমি সবাইকে বলব এখন।চাচু কি বলছে বলুক"
বাধা দিল কল্পনা,
"না!আ-আমি বলব।আপনি এখনে কিছু বলিয়েন না"
সাহিত্য সম্মতি দিয়ে মৃদু হাসলো।এক ছোট্ট প্রাণ আসতে শেখ ভিলায়।যা সাহিত্য ও তার কল্পনার ভালোবাসার প্রমাণ।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
শুক্রবারের দিন আজ।ফাহাদ শেখ দুপুরের খাবার খেয়ে কেবলই রুমে ঢুকলেন।হঠাৎ দরজায় শব্দ শুনে পিছনে ঘুরলেন তিনি।হেনা শেখ দরজা লাগিয়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।
"কি হয়েছে হেনা?কিছু বলবে?"
সাথে-সাথেই কিছু বললেন না হেনা শেখ।সময় নিয়ে এগিয়ে এলেন ফাহাদ শেখের দিকে।স্বামীর দিকে করুন নজর ফেললেন তিনি।ছলছল করছে তার আখি জোড়া।কোমল কন্ঠে বলে উঠলেন,
"আজ আমি আপনার কাছে একটা জিনিস চাইবো।দিবেন?"
মৃদু ঠোঁট বাকালেন ফাহাদ শেখ।কোমল তার কন্ঠ,
"কি হয়েছে বলো তো?"
"সাহিত্য আর কল্পনার বিয়েটা মেনে নিন না"
মুখের হাসিটা যেন দপ করেই নিভে গেল ফাহাদ শেখের।হেনা শেখ আবার বলে উঠলেন,
"আমার মেয়েটার এতো কষ্ট আমি আর দেখতে পারছি না।তাদের সংসারটা মেনে নিন একটু"
শক্ত হলো ফাহাদ শেখের কন্ঠ,
"এটা সম্ভব নয় হেনা"
এবার হেনা শেখের কন্ঠ বদলে গেল যেন।কড়া কন্ঠে বলে উঠলেন তিনি,
"আমি যদি জানতাম আমার মেয়ের জীবন এমন নরক বানাবেন আপনি তাহলে কখনোই আমি আপনাকে বিয়ে করতাম না!আমি তো এই ফাহাদকে ভালোবাসিনি।আমি এই ফাহাদকে যেন চিনিও না!কে আপনি?আমার ফাহাদ এতোটাও নির্দয় নয় যে নিজের ক্ষোভ মিটাতে তার নিজের সন্তানকে কোরবান করবে!"
ফাহাদ শেখ ভড়কে উঠলেন একদম।এই প্রথমবার হেনা শেখ তার মুখের উপর কথা বলছেন।চোখের জল ফেলতে নিয়ে কঠোর কথা বলছেন তিনি।আজ ফাহাদ শেখ নিজের প্রেয়সীর এমন রূপ দেখে যেন বদলে গেলেন।রগচটা লোকটা আজ তার প্রেয়সীকে একটুকো রাগ দেখালেন না।বরং হেনা শেখের আদলখানা দুই হাতের মাঝে আবদ্ধ করে কোমল কন্ঠে বললেন,
"তুমি এগুলো কি বলছো হেনা?আমি আমাদের মেয়ের খারাপ চাইবো কেন?আমি শুধু চাই আমাদের মেয়েটা যেন সুখে-শান্তিতে থাকুক"
ফাহাদ শেখের হাত এক ঝটকায় সড়িয়ে দিলেন হেনা শেখ,
"একদম ছুবেন না আমাকে!আপনি শুধু নিজের দিকে দেখছেন!আমার মেয়েটা আজ পেটে বাচ্চা নিয়ে আমার কাছে এসে কান্না করছে।মা হওয়ার খুশি পাশে ফেলে দিয়ে আপনি মানবেন কিনা সেটা নিয়ে কাঁদছে আমার বাচ্চাটা।
হেনা শেখের কথায় চমকালেন ফাহাদ শেখ।কাপা কন্ঠে বলে উঠলেন তিনি,
" ক-কি বললে তুমি?"
চোখের পানি ফেলতে নিয়েই মুখে হাসি নিয়ে হেনা শেখ বলে উঠলেন,
"আপনার ছোট্ট মেয়েটা মা হতে যাচ্ছে"
ফাহাদ শেখ যেন এক ধাপ পিছাতে বাধ্য হলেন।হেনা শেখ স্বামী বুকে ঢলে পড়লেন একদম।বুকের গেঞ্জি খামচে হাউমাউ করে কেঁদে উঠে বললেন তিনি,
"তাদের সংসারটা মেনে নিন সুবার আব্বু।কল্পনা সাহিত্যকে অসম্ভব ভালোবাসে।আমি নিজ চোখে দেখেছি।শুধুমাত্র এবং শুধুমাত্র আপনাদের দুই ভাইয়ের জন্য আমার মেয়েটা নিজের দিকটা দেখে না।এটা আমার শেষ আবদার আপনার কাছে।আমি আর কখনো কিছু চাইবো না।তাদের সংসারটা মেনে নিন"
ফাহাদ শেখ আর কিছু বলছেন না।বিস্ময়ে ভরা স্তব্ধ নয়নে একদিকে দেখে আছেন তিনি।কি ভাবছেন,কে জানে?
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
সাহিত্য নিজের রুমে বসে অফিসের কিছু কাজ করছিল।এমন সময় এক অপ্রত্যাশিত ডাক শুনতে পেল সে।কেউ তার নাম ধরে ডাকছে।কন্ঠ চিনতে পেরে বেশ ভড়কালো সাহিত্য।বেশ দ্বিধা-দন্ধে করিডোরে এলো সে।তার শুনতে ভুল হয়নি।আসলেই ড্রইং রুমে বসে থাকা ফাহাদ শেখ সাহিত্যের নাম ধরে ডেকে যাচ্ছেন।আরো আশ্চর্যজনক বিষয় হলো,তোফায়েল শেখ ফাহাদ শেখের পাশে বসে।
সাহিত্য বেশ দ্বিধায় আছে এখনো।সিড়ি দিয়ে নেমে ড্রইং রুমে এলো সে।ফাহাদ শেখের সামনে দাঁড়িয়ে বলে উঠল,
"ম-মেঝো চাচু,ডাকলে?"
ফাহাদ শেখ নজর দিলেন সাহিত্যের দিকে।ঠোঁট বাকিয়ে হাসলেন তিনি।তোফায়েল শেখের কাধে হাত রেখে সাহিত্যের উদ্দেশ্যে বলে উঠলেন,
"বাবা হতে যাচ্ছো,মিষ্টি খাওয়াবা না"
সাহিত্য যেন পর মুহুর্তেই কিছু বুঝে উঠল না।নজর দিল আমেনা শেখের দিকে,যে কিনা হেনা শেখের পাশে দাড়িয়ে ছলছল চোখ নিয়ে সাহিত্যের দিকে দেখছেন।মুখে তার হাসি ফুটছে।সোফায় রঞ্জক শেখ-লতিফা শেখও বসে আছেন।তাদের মুখেও হাসি ফুটছে।সাহিত্য যেন এবার বুঝলো কি হচ্ছে এখানে।ফাহাদ শেখের দিকে ঘুরে মুখে বড় হাসি নিয়েই বলল,
"হ্যাঁ!আমি মিষ্টি নিয়ে আসছি"
কথাটা বলে আর এক মুহুর্তও দাড়ালো না সাহিত্য।নিজের রুমের দিকে ছুটলো গাড়ির চাবি নেওয়ার উদ্দেশ্যে।আজ পুরো ঢাকার মিষ্টি কিনবে সে।
চাবি নিয়ে রুম থেকে বের হতেই কল্পনাকে দেখলো সাহিত্য।কল্পনা ভ্রু কুচকে তার দিকে দেখে আছে,
"কি হয়েছে?শুনলাম বাবা আপনাকে ডাকছে"
সাহিত্য কল্পনাকে জাপ্টে ধরল,
"জানপাখি সব ঠিক হয়ে গিয়েছে!"
সাহিত্যের হাসি মাখা কথায় কল্পনা যেন কিছুই বুঝে উঠল না।ভড়কালো সে,
"ম-মানে?"
"মেঝো চাচু মেনে গিয়েছে!"
কল্পনা স্তব্ধ হলো যেন।এই সুযোগেই সাহিত্য কোলে তুলল তাকে।সিড়ি দিয়ে দ্রুত পায়ে নেমে কল্পনাকে সোফায় বসিয়ে দিল।অতঃপর নিজে ছুটলো মিষ্টি আনার উদ্দেশ্যে।কল্পনা যেন এখনো দ্বিধায় আছে।কাপা নজর ফেলল তার বাবা আর বড় বাবার দিকে।যারা এই প্রথমবার পাশাপাশি বসেছে।ফাহাদ শেখ তো বড় ভাইয়ের কাধে হাত দিয়ে রেখেছেন।
তোফায়েল শেখ কল্পনার দিকে নজর রেখেই আমেনা শেখের উদ্দেশ্যে বলে উঠেন,
"আমেনা।বউমার নজর কাটবো।কিছু টাকা নিয়ে আসো দেখি।ভাইয়ের মেয়েকে ঘরের বউ বানাচ্ছি।কম টাকা আনিও না আবার"
তোফায়েল শেখের মুখে এমন কথা শুনে কল্পনার চোখ জোড়া থেকে ঝড়ঝড় করে পানি গড়াতে লাগলো।অতঃপর মাথা নিচু করে ফুপিয়ে উঠল মেয়েটা।ফাহাদ শেখ উঠে গিয়ে মেয়ের পাশে বসলেন।তার চোখ থেকেও যেন পানি কণা গড়াতে শুরু করেছে।কোমল কন্ঠে বললেন তিনি,
"আমাকে ক্ষমা করে দিও মা।নিজের রাগের দিকে দেখতে গিয়ে তুমি কোনটাতে খুশি থাকবা সেটাই যেন দেখতে ভুলে গিয়েছি"
কল্পনা কাঁদতে নিয়েই ফাহাদ শেখকে জড়িয়ে ধরল।চোখের পানি ফেলতে নিয়েই ফাহাদ শেখ তোফায়েল শেখের দিকে ঘুরলেন,
"ভাইজান।আমার মেয়ে কিন্তু এই শেষ কাঁদছে।আপনার ছেলে যদি তাকে কাঁদায় তাহলে কিন্তু পিটোন শুরু করব সাহিত্যের আমি।আমার আদরের মেয়েকে আপনার হাতে তুলে দিচ্ছি কিন্তু"
তোফায়েল শেখ বলে উঠলেন,
"ওটা এখন তোর জামাই।পিটালে পিটাবি"
তোফায়েল শেখের এমন কথা শুনে উপস্থিত সবাই ঘোলা চোখেই হেসে উঠল।কল্পনা তো এখনো তার বাবাকে জড়িয়ে ধরে হাউওমাউ করে কাঁদতে ব্যস্ত।মেয়েটার চোখে আজ থেকে যেন সুখের জলই দেখা যাবে শুধু।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
অন্ত অফিস জয়েন করেছে এই তো কিছুদিন আগেই।নিজের পছন্দ মতো এক সরকারি চাকরি পেয়েছে সে।সপ্তাহ খানেক হচ্ছে ডেইলি অফিস শুরু করেছে।বিকেলের দিকে ক্লান্ত শরীর নিয়ে শেখ ভিলায় প্রবেশ করল সে।নজর গেল ড্রইং রুমের দিকে।তিন শেখ আহমেদ এবং সাথে সাহিত্যও বসে রয়েছে।সেই দৃশ্য দেখতেই যেন অন্তর মুখে হাসি ফুটল।প্রশান্তির এক শ্বাস বেড়িয়ে এলো ভেতর থেকে।
সাহিত্য অন্তকে দেখা মাত্রই রঞ্জক শেখের উদ্দেশ্যে বলে উঠল,
"এই তো অন্ত এসেছে"
সবাই নজর দিল অন্তর দিকে।সেটাতে বেশ থতমত খেল অন্ত।রঞ্জক শেখ উঠে এলেন ছেলের কাছে।ঠোঁটে তার হাসি ঝুলছে,
"ভালো সময় এসেছো।তোমার ব্যাপারেই কথা হচ্ছিল"
ভ্রু কুচকালো অন্ত,
"আমার ব্যাপারে?"
"হ্যাঁ"
"কি নিয়ে?"
রঞ্জক শেখ সময় নিয়ে বললেন,
"চাকরিতে তো ঢুকেছো।এখন বিয়ে করতে হবে না?"
ভড়কালো অন্ত,
"আ-আমার বিয়ে?আব্বু আমি এখনে বিয়ে করব না তো"
"করবে না মানে?সাহিত্য তো বলল তুমি নাকি না করবে না।আমরা তো তোমার জন্য মেয়েও দেখে ফেলেছি"
অন্ত এবার হাতে-পায়ে চমকে উঠল।এই সেরেছে!প্রীতির কি হবে এখন?অন্ত তো এখনে প্রীতির ব্যাপারে কিছু বলতে চাচ্ছিল না।কিন্তু এরা তো মেয়েও নাকি ঠিক করে ফেলেছে।
অন্ত কথায় জোর দিল,
"আব্বু আমি এখনে বিয়ে করব না!আগে এক দুই বছর নিজের টাকা তো খাই"
রঞ্জক শেখ মুখ গম্ভীর করলেন,
"এসব কি কথা অন্ত?বাড়ির সবাই আমরা মেয়ে পছন্দ করেছি।এমনকি মেয়ের বাবার সাথে কথাও হয়েছে আমাদের।আর তুমি এখন এসে এই কথা বলছো?"
রঞ্জক শেখ সাহিত্যের দিকে ঘুরলেন,
"এই সাহিত্য!তুই না বললি অন্ত রাজি হবে,তো এখন এ কথা বলছে কেন?"
অন্ত যেন বিভ্রান্তে পড়ল বেশ,
"আমি কেন বিয়ে করতে রাজি হবো?!"
কল্পনা ডাইনিংয়ে বসে বিস্কিট চাবাচ্ছে।অন্তর কথায় মিটিমিটি হাসলো সে।কিন্তু লতিফা শেখ রান্নাঘর থেকে এগিয়ে এলেন অন্তর দিকে।ছেলের মাথায় হাত বুলাতে নিয়ে বললেন,
"কি হয়েছে বাবা?মেয়ে পছন্দ হয়নি?অন্য মেয়ে দেখবো?"
রঞ্জক শেখ বলে উঠলেন,
"তোমার ছেলে তো মেয়ের নাম পর্যন্ত শুনেনি"
কথাটা বলেই রঞ্জক শেখ আবার অন্তর দিকে দেখলেন,
"কল্পনার বেস্টফ্রেন্ড প্রীতিকে চিনো?কল্পনার জন্মদিনে বাসায় এসেছিল যে।তার কথা বলছি"
অন্ত যেন একপ্রকার চমকে উঠল প্রীতির নাম শুনে।বিস্ময় ভরা নজর একবার সাহিত্যের দিকে ফেলল।সাহিত্য অন্তর দিকে দেখে ঠোঁট টিপে হাসছে।
রঞ্জক শেখ আবার বলে উঠলেন,
"কি, তুমি কি আসলেই বিয়ে করবে না?তাহলে আমি কি বিয়ের কথা বন্ধ করে দিব নাকি?"
"না!না!"
অন্তর এমন হঠাৎ কথা বলায় উপস্থিত সবাই ভড়কালো।অন্ত এলোমেলো নজর ফেলে মিনমিনিয়ে বলে উঠে,
"তোমরা যেহেতু মেয়ে পছন্দ করেছো তাহলে অবশ্যই মেয়ে ভালো হবে।আমি আর কি বলব এখানে?"
অন্ত আর কিছু বলল না।মাথা নিচু করে গটগটিয়ে রুমে চলে গেল।সেপাশে দেখে হাসলো সবাই।এর মাঝেই সাহিত্য উঠে কল্পনার কাছে এসেছে।সবার চোখের আড়ালে টুপ করে কল্পনার গালে একটা চুমু বসিয়ে দিল সে।কল্পনা গাল ফুলালো।তবে পর মুহুর্তে আবারো বিস্কিটে মন দিল।হাতের বিস্কিট মোটা পেটটার কাছে নিয়ে বলল সে,
"আমার সোনাটার কি বিস্কিট পছন্দ হচ্ছে?"
কথাটা বলার পরপরই কল্পনা একটা লাথি অনুভব করে পেটে।সাহিত্যের উদ্দেশ্যে ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলল মেয়েটা,
"আবার কিক দিয়েছে!"
অমনি সাহিত্য মেঝেতে হাটু গেড়ে বসে কল্পনার পেটে হাত দিল।সাথে-সাথেই আরো একটা পায়ের ছোঁয়া পেটে দিয়ে দিল কল্পনার ভেতরে থাকা ছোট্ট প্রাণটা।আর সাহিত্য সেথায় মুখ গুজে দিল।
কিছুদিন আগেই ন'মাসে পড়ল কল্পনা।এখন সচরাচর এমন হুড়ুমদুড়ুম চলে তার পেটে।সাহিত্যের হাতের ছোঁয়ায় যেন সে কাজ আরো বেশি হয়ে থাকে।
কল্পনা সাহিত্যের মাথায় হাত দিয়ে বাচ্চাদের মতো বলে উঠল,
"শুনেন না।আমার না খুব ম্যাংগো ফ্লেভারের চিপস খেতে ইচ্ছা করছে"
সাহিত্য না বুঝেই মাথা ঝাকালো,
"ঠিকাছে,এনে দেব"
পর মুহুর্তেই মাথা তুলে কল্পনার দিকে দেখলো,
"ম্যাংগো ফ্লেভারের চিপস হয়?"
ঠোঁট উল্টালো কল্পনা,
"আমি কি জানি"
লতিফা শেখ রান্নাঘরে ঢুকতে নিয়েই বললেন,
"আমার তো মনে হয় না ম্যাংগো ফ্লেভারের কোনো চিপস থাকে।আমি আম কেটে ভাজি করে দেই?"
কল্পনা মুখ বিকৃত করল,
"ছি,না।আমি ম্যাংগো ফ্লেভারের চিপস খাবো"
সাহিত্য এতক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে।লতিফা শেখ হতাশার শ্বাস ফেলে সাহিত্যের দিকে দেখলেন,
"দেখ কোথাও ম্যাংগো ফ্লেভারের চিপস পাস কিনা।তোর বউ এতো আজগুবি-আজগুবি জিনিস খেতে চায় রে বাবা!আমার সময়ও আমি এতো কিছু খাইনি"
কথা শেষেই রান্নাঘরে ঢুকলেন তিনি।
কল্পনা নড়েচড়ে উঠল।কিন্তু উঠে দাড়াতে পাড়ছে না সে।এখন হাঁটতে বেশ কষ্ট হয় তার।ভারী পেটটা নিয়ে নড়তে পারে না বেশি।এই দিক দিয়ে দেখতে গেলে সাহিত্যের বেশ সুবিধা হয়েছে।কল্পনাকে যখন-তখন কোলে তুলে নিবে।যেমন এই মুহুর্তেও সে কাজ করে বসলো।কল্পনা উঠতে পারছে না দেখে সটান কোলে তুলে নিল একদম।কল্পনা ভড়কালো বেশ।হিসহিসিয়ে বলল,
"কি করছেন?বাবারা ড্রইং রুমে আছে তো"
"বাবারা বছর ধরে জমে রাখা গল্প করতে ব্যস্ত।কারো এদিকে দেখার সময় নেই"
কথাটা বলেই সিড়ির দিকে এগুলো সাহিত্য।আর কল্পনা মৃদু হাসি ঠোঁটে নিয়ে দেখে থাকলো সাহিত্যের দিকে।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
২ বছর পর..........
সকালের স্নিগ্ধ কোমল হাওয়া বরাবরের মতোই ছুঁয়ে চলেছে গাছের সবুজ পাতাদের।সেই হালকা হাওয়ার ছোঁয়ায় মৃদুভাবে নড়ে যাচ্ছে উচু গাছের পাতারা।সেই পাতার ফাঁক দিয়েই যেন দেখা মিলল ধরণীর মাটি।সেখানেই তো দাঁড়িয়ে আছে কল্পনা।শুভ্রা রঙা শাড়ি পড়েছে সে।মাথার শিথি পর্যন্ত শাড়ির আঁচল।সকালের স্নিগ্ধতা যেন তাকেও ছুঁয়ে দিচ্ছে।তবে তার বন্ধ চোখের সুক্ষ্ম পানি কণারা সেই স্নিগ্ধতাকে ছাড়িয়েই যেন গড়িয়ে পড়তে ব্যস্ত।
দুই হাত দিয়ে মায়ের শাড়ি ধরে রেখেছে জারবেরা।নজর তার সামনের কারো একজনের কবরে।পাথরে তো খোদাই করে লিখে রাখা মহুয়া শেখ।আর তার পাশে আরো একটা কবর।কিন্তু জারবেরা তো সেগুলো বুঝছে না।সে তো এটাও বুঝছে না যে তারা পাপার আর্ট এক্সিভিশনে না গিয়ে এখানে কেন এসেছে।
মাথা উচু করে নিজের মায়ের দিকে একবার নজর ফেলল জারবেরা।তার মা দুই হাত জোর করে আছে।দাদির শেখানো অনুযায়ী সেটাকে মোনাজাত বলে।জারবেরার তো সেটাই স্মরণে আছে।জারবেরার মাম্মা কিছুক্ষণ যাবত মোনাজাতই করছিল।কিন্তু কেন জানি এখন চোখের পানি ফেলছে।ছোট্ট মাথায় কিছু না ঢুকার দরুন এবার জারবেরা মাথা ঘুরিয়ে পেছনে দেখলো।কিছু দুরেই তার পাপা প্যান্টের পকেটে হাত গুজে দাড়িয়ে রয়েছে।নজর তার জারবেরার মাম্মার দিকে।
জারবেরা তার মায়ের শাড়ি ছেড়ে দিয়ে এলোমেলো পা ফেলে এগিয়ে গেল তার পাপার কাছে।ছোট নরম হাত দুটো দিয়ে তার পাপার কালো প্যান্ট ধরে টানতে লাগলো।উদ্দেশ্য পাপার দৃষ্টি আকর্ষণ করা।হলোও সেটা।সাহিত্য কল্পনার দিক থেকে নজর ঘুরিয়ে চাহনি ফেলল তার ছোট্ট প্রিন্সেসের দিকে।মৃদু ঠোঁট বাকিয়ে পায়ের উপর ভর দিয়ে বসলো সে।আদরের মেয়েটার মাথার করা দুই ঝুটির একটাতে হাত বুলিয়ে কোমল কন্ঠে বলে উঠল,
"কি হয়েছে আমার প্রিন্সেসের?"
জারবেরা মাথা উচু করল।সাহিত্যের মতোই মাটিয়া-সবুজাভাব রঙা ডাগর ডাগর চোখগুলো দিয়ে দেখতে লাগলো সাহিত্যকে।লাল টুকটুকে ঠোঁট উল্টিয়ে এলোমেলো কথায় বলে উঠল বাচ্চা মেয়েটা,
"মাম্মা..কাদে কিনো?"
সাহিত্য কোলে তুলে নেয় জারবেরাকে।নরম ফুলকো গাল আলতো করে ছুঁয়ে দিয়ে বলল সে,
"মাম্মা..বড় আম্মুর..কবর...জিয়ারত করছে।মাম্মা বড় আম্মুকে অনেক মিস করছে তো,তাই কাঁদছে।আমি অফিসে গেলে আমার প্রিন্সেস আমাকে যেমন মিস করে তেমন"
জারবেরাকে বুঝানোর জন্যই সাহিত্য প্রথম বাক্যখানা ধীরে-ধীরে বলল।জারবেরা মনে হয় খুব বুঝলো সাহিত্যের পুরো কথাটা।বুঝদারের মতো ছোট লাল ঠোঁট জোড়া গোল করে 'ও' বলে উঠল সে।আবার নজর দিল কল্পনার দিকে।কল্পনা এতক্ষণে মোনাজাত শেষ করে পিছনে ঘুরেছে।চোখের পানি মুছতে নিয়েই নজর পড়ল সাহিত্যের দিকে।যে কিনা জারবেরাকে কোলে নিয়ে তার দিকেই তাকিয়ে।কল্পনার মুখে হাসি দেখে জারবেরা তার দিকে হাত বাড়িয়ে খিলখিলয়ে উঠলো,
"মাম্মা!"
এগিয়ে এলো কল্পনা।জারবেরাকে কোলে নিতেই মাথার আঁচলটা আলগোছেই যেন পড়ে গেল।দেখা মিলল হাটু অব্দি বাধন হারা ঝলমলে চুলগুলোর।জারবেরা কল্পনার কোলে উঠতেই লাফাতে লাগলো।ডাগর ডাগর চোখগুলো বড় বড় করে অস্ফুটস্বরে বলে উঠল,
"চুলো!পাপার ডোরোইং দেখবু!!"
কল্পনা হাসি মুখে দেখে থাকলো জারবেরার মাটিয়া-সবুজাভাব চোখ জোড়ার দিকে।বাবার চোখ জোড়া হুবাহু পেয়েছে মেয়েটা।
মেয়ের নরম গালে একটা চুমু বসিয়ে দেয় কল্পনা,
"হ্যাঁ মাম্মা,আমরা এখন ওখানেই যাবো তো"
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
রয়েল গ্রিন অ্যাস্টন মার্টিনটা এসে থামলো ধানমন্ডির "ঢাকা আর্ট সেন্টার"-এর সামনে।মানুষজন গিজগিজ করছে একদম।সকাল ১১টার দিকেও এমন ভিড় যেন কেউই আশা করেনি।তবে হওয়াটা যেন খুবই স্বাভাবিক।"দ্যি O.S.S. গ্রুপ এ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিস"-এর সি.ই.ও. অহিয়াম শেখ সাহিত্যের আর্ট এক্সিভিশন হচ্ছে আজ এই সেন্টারে।মানুষজন খুবই আগ্রহী সেইসব আর্ট দেখার জন্য।
কল্পনা জারবেরাকে কোলে নিয়েই গাড়ি থেকে নামলো।শাড়ির কুচি ঠিক করতে নিয়েই সামনে এগুলো সে।জারবেরা তো একদম লাফাচ্ছে কল্পনার কোলে।তার পাপার আর্ট দেখবে সে।কল্পনা আর্ট গ্যালারির সামনে আসতেই দেখা মিলল অন্ত আর প্রীতির।প্রীতি তার দুমাসের মেয়ে তিতলিকে কোলে নিয়ে।ফুটফুটে মেয়েটা চোখ পিটপিট করে দেখছে আশেপাশে।জারবেরা তাকে দেখে আরেক দফা লাফিয়ে উঠল,
"তিতি!!"
ফাজিল মেয়েটার নড়াচড়ায় কল্পনার বেহাল দশা।তারপরও তাকে সামলাতে নিয়েই প্রীতির সামনে এসে দাড়ালো সে।তার পরপরই বলে উঠল প্রীতি,
"এতটুকু রাস্তা আসতে এতক্ষণ লাগে?বাসার সবার পুরো গ্যালারি ঘুরা শেষ।আর আমি তোর জন্য অপেক্ষা করছি"
কল্পনা বলল,
"একটু দাদির কবরের কাছে গিয়েছিলাম।তাই দেরি হয়ে গেল"
সাহিত্য পেছন থেকে এসে জারবেরাকে নিজের কাছে নিতেই নিয়েই বলল,
"তুই ঘুরে আয়।আমি ওকে নিয়ে আছি"
কল্পনা পেছনে ঘুরলো,
"সমস্যা নেই তো।ওকে নিয়েই ঘুরতে পারবো আমি"
সাহিত্য জারবেরার মাথায় মাথা ঠেকিয়ে বাচ্চাসুলভ কন্ঠে বলল,
"আমার প্রিন্সেসকে আমি একটু আমার আর্টগুলো বুঝিয়ে দিব না?ওর মাম্মার আর্টগুলোর হিস্ট্রি বলবো না?"
জারবেরা মুচকি হাসলো।সাহিত্যের হালকা দাড়ি যুক্ত গালে নরম দুই হাত ঠেকিয়ে উপর-নিচ মাথা ঝাকালো,
"হুম!হুম!"
এতটুকু মেয়ে যেন ভালোই বুঝে তার পাপার কথা।
বাবা-মেয়ের কান্ড দেখে কল্পনা হাসলো হালকা।অতঃপর এগুলো প্রীতির সাথে।প্রীতি তো তিতলিকে অন্তর হাতে ধরিয়ে দিয়েছে,
"দুই ভাই এখন মেয়েদেরকে সামলান।আমরা দুই বান্ধুবী গেলাম ঘুরতে"
প্রীতির কথা শেষেই কল্পনা আর প্রীতি হেসে উঠল।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
আর্ট গ্যালারিটা বিশাল বড়।সাহিত্য এতোদিন ধরে যেই আর্টগুলো করেছে সবগুলোই এখানে উপস্থিত।অন্যান্য সবাই বাকি সব আর্টগুলো দেখতে ব্যস্ত।কিন্তু কল্পনা আটকে গেল পাশাপাশি রাখা দুটো পেইন্টিংয়ের সামনে।ডান পাশের ক্যানভাসের উপরে লিখা "My nightmare"। আর বামপাশের ছবিটার উপর লিখা "সাহিত্যের কল্পনা"
ঠোঁটে সুক্ষ্ম হাসি নিয়েই পেইন্টিং দুটোর দিকে দেখে আছে কল্পনা। নজর ঘুরিয়ে খানিক দূরে দেখল সে।তিন শেখ আহমেদ পাশাপাশি দাড়িয়ে একটা ছবি পর্যবেক্ষণ করছেন।ছবিটা পুরো শেখ ভিলার।এহনাফ শেখ ও মহুয়া বেগম সহ সবাই সেই ছবিতে উপস্থিত।কিন্তু তিন শেখ আহমেদ পকেটে হাত গুজে নিজেদের ছবি পর্যবেক্ষণ করতে ব্যস্ত।মাঝেমধ্যে কিছু নিয়ে হেসেও উঠছেন তারা।সেই দৃশ্য দেখে কল্পনা এক স্বস্তির শ্বাস ফেলল যেন।তার স্বপ্ন অবশেষে পুরন হয়েছে।তার দাদির স্বপ্ন অবশেষে পুরোন হয়েছে।সাহিত্য আর কল্পনা এখন একটা স্বাভাবিক সংসার করতে সক্ষম।কল্পনার আর কোনো ইচ্ছা পুরোনের বাকি নেই।
হঠাৎ পাশে কিচিরমিচির শুনতেই ভাবনা থেকে বেড়িয়ে এলো কল্পনা।অন্য পাশে ঘুরলো সে।বেশ কিছু মিডিয়ার লোক সাহিত্যকে ঘিরে ধরে রয়েছে।সাহিত্যের সাথে বিভিন্ন আলাপ চলছে তাদের।সাহিত্য হাসি মুখেই তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে ব্যস্ত।তবে কল্পনার নজর যেটা কাড়ল সেটা হলো জারবেরা।মেয়েটা বাবার কোলে জুবুথুবু হয়ে ঘুমাচ্ছে।ফ্লোরাল ফ্রকটা পড়ায় মনে হচ্ছে সাহিত্য কোলে কোনো একটা ফুলকে নিয়ে ঘুরছে।বাবা-মেয়েকে কি সুন্দরটাই না লাগছে দেখতে!
কল্পনা এগুলো সেদিকে।উদ্দেশ্য তার জারবেরাকে নেওয়া।সাহিত্যের নিশ্চয়ই অসুবিধা হচ্ছে ঘুমন্ত বাচ্চাটাকে এমন কোলে নিয়ে কথা চালাতে।কিন্তু কাছে যেতেই থেমে গেল কল্পনা।মিডিয়ার লোকেরা সাহিত্যকে ঘিরে ধরেছে একদম।কল্পনা যেন কিছুতেই সাহিত্যের কাছে যেতে পারছে না।
মিডিয়ার লোকরা সাহিত্যের ছবি তুলায় ভারী ব্যস্ত।মিস্টার সাহিত্য শেখকে সচরাচর তার মেয়ের সাথে দেখা যায়না।আর আজ কিনা তার নিজের আর্ট এক্সিভিশনে সাধারণ এক বাবার মতো মেয়েকে কোলে নিয়ে ঘুরেঘুরে আর্ট দেখছেন।সেটা দেখেই তো মিডিয়ার লোকরা একদম হুমড়ি খেয়ে পড়ে।
এক জার্নালিস্ট মেয়ে বলেই উঠল,
"আপনার মেয়েটা তো মাশাআল্লাহ পুরো ফুলের মতো দেখতে।ওর নাম কি রেখেছেন?"
সাহিত্য মৃদু হেসে বলল,
"জারবেরা শেখ"
"আপনার ওয়াইফকে দেখছি না মিস্টার সাহিত্য"
সাহিত্য নজর দিল কল্পনার দিকে,
"আপনারাই তো তাকে আসতে দিচ্ছেন না"
সাহিত্যের কথায় থমকালো সবাই।নজর দিল পেছনে।হঠাৎ এতগুলো চোখ নিজের উপর পড়ায় ভড়কালো কল্পনা।মিডিয়ার লোকগুলো বিব্রত হয়ে সাহিত্যের কাছে এগুনোর জন্য কল্পনাকে রাস্তা ফাঁকা করে দিল।এর মাঝেই এক জার্নালিস্ট বলে উঠে,
"নো ওয়ান্ডার আপনার মেয়ে এমন ফুলের মতো হয়েছে কেন।মা-বাবা দুজনই এতো সুন্দর হলে তো মেয়ে ফুলের মতো হবেই"
মৃদু হেসে উঠল উপস্থিত সবাই।কল্পনা সাহিত্যের কাছে গিয়ে দাড়াতেই হিসহিসিয়ে বলল,
"জারবেরাকে নিয়ে অসুবিধা হচ্ছে না?ওকে আমাকে দিন"
বাধা দিল সাহিত্য।ঠোঁট বাকিয়ে কল্পনাকে আগলে নিয়ে এক হাতে আবদ্ধ করল,
"সমস্যা নেই।ও ঘুমাক"
সাহিত্য নজর দিল সামনে।মিডিয়ার লোকদের উদ্দেশ্যে বলে উঠল সে,
"আমার পুরো পৃথিবী এখন আপনাদের সামনে।আর এটা আমার চাঁদ"
শেষের কথাটা বলতে নিয়েই সাহিত্য জারবেরার দিকে দেখলো।বাচ্চা মেয়েটা ঘুমের মধ্যে তার নরম আঙুল চুসতে ব্যস্ত।কল্পনা মৃদু হাসলো।জারবেরার দিকে দেখে সাহিত্যের সিনার নিচে এক হাত ঠেকিয়ে দিল সে।অমনি যেন ছবি তুলার হিরিক পড়ে গেল মিডিয়ার লোকদের মাঝে।
মিডিয়ার লোকরা সামনে থেকে চলে যেতেই কল্পনা সাহিত্যের কোল থেকে জারবেরাকে নিয়ে নেয়।সাহিত্য অনেকক্ষণ থেকে নিয়ে আছে তাকে।হয়তো হাত ব্যাথা হয়ে গিয়েছে।সেটা ভেবেই নেওয়া।আর্ট এক্সিভিশনের সকালের টিপের সময় প্রায় শেষের দিকে।প্রীতি কিছুক্ষণ আগেই কল করেছিল।সবাই নাকি শেখ ভিলার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে।কল্পনা জানিয়েছে তারাও কিছুক্ষণের মধ্যে রওনা দিবে।জারবেরাকে নিয়ে কল্পনা সামনেই এগুতে নিচ্ছিল।হঠাৎই পা থেমে গেল তার।শাড়ির সুতা নূপুরে আটকা পড়েছে।সাহিত্যের উদ্দেশ্যে বলে উঠল সে,
"জারবেরাকে একটু ধরেন তো।আমার নূপুরে সুতা লেগেছে মনে হয়"
সাহিত্য জারবেরাকে নিল না।ফট করে হাটু গেড়ে নিচে বসে পড়ল সে।সেটা দেখে ভড়কালো কল্পনা,
"কি করছেন?এটা পাবলিক প্লেস?"
সাহিত্য মাথা তুলে কল্পনার দিকে দেখলো,
"তো?"
কথাটা বলতে নিয়েই কল্পনার পাটা হাতে তুলে হাটুতে রাখলো সে।কল্পনা টাল সামলাতেই সাহিত্যের মাথায় হাত রাখলো।
এই দৃশ্য চোখে পড়ল দুই মেয়ের।সাহিত্যের অফিসের স্টাফ তারা।সাহিত্যের কান্ড দেখে এক মেয়ে হকচকিয়ে গেল বেশ,
"ভাই!স্যার তার বউকে কত ভালোবাসে,তাই না?"
তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটি বলে উঠল,
"শুধু ভালোবাসা?He literally worships his wife!"
পাশের মেয়ে আবার হকচকিয়ে গেল।নজর দিল পাশে,
"মানে?"
"অফিসের সবাই জানে সেটা।তুমি নতুন জয়েন করেছো তো,তাই বুঝছো না।কিছুদিন যাক তারপর আমার কথার মানে খুব ভালো করেই বুঝবা।সাহিত্য স্যার কল্পনার জন্য পুরো পাগল"
কিছু দিন আগে অফিসে জয়েন হওয়ার দরুন যেন কিছুই বুঝছে না মেয়েটি।সাহিত্য এতক্ষণে কল্পনার শাড়ির কুচি ঠিক করে উঠে দাড়িয়েছে।সেই মেয়ে আবারো নজর দিল অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা সাহিত্য ও তার কল্পনার দিকে।হয়তো সে এটাই চিন্তা করছে,যে সাহিত্য কল্পনাকে কতটা ভালোবাসে যে বাহিরের মানুষের চোখেও তা ভালো করে স্পষ্ট।শুধু যেন স্পষ্ট নয়,বরং নিজের বউয়ের প্রতি পাগলামির কারণে "He literally worships his wife"-এর মতো একখানা ভারী বাক্যের টাগ নিজের উপর লাগিয়ে নিয়েছে।
সাহিত্য আর কল্পনা ইতোমধ্যেই গ্যালারি থেকে বের হয়ে যেতে লাগলো।হয়তো শেখ ভিলার উদ্দেশ্যে রওনা দিবে তারা।অতি মানুষের ভীড়ে আবছা দেখা মিলছে তাদের।সেপাশে নজর রেখেই ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটালো মেয়েটি,
"পুরাটাই যেন #একখণ্ড_আসক্তি,তাই না?"
❀—সমাপ্ত—❀
#একখণ্ড_আসক্তি গল্পের সমাপ্তি এখানেই।আশা করছি সাহিত্য ও তার কল্পনা আপনাদের মনে জায়গা করে নিতে পেরেছে।যদি সেটা হয়ে থাকে তাহলে কমেন্ট বক্সে অবশ্যই নিজের মনের কথা বলে যাবেন।
আর যেহেতু এটা লেখিকার প্রথম গল্প তাই গল্পের মধ্যে ভুল-ত্রুটি অনেক আছে সেটা আমিও শিকার করছি।আশা করছি সেটি ক্ষমার নজরে দেখবেন।
গল্প পড়ে ফুড়ুৎ করে পালাবেন না।বিভিন্ন পাবলিক গ্রুপে গল্প সম্পর্কে আলোচনা-সমালোচনা করে নিজের মতামত দিয়ে অন্যদেরও পড়ার সুযোগ করে দিবেন।
🚫Edited:আপনাদের অনেকেরই হয়তো মনে হচ্ছে গল্পের শেষটা একটু খাপছাড়া বা তাড়াতাড়ি শেষ করা হয়েছে।আসল কথা বলতে,গল্পের ৮১-৮২ পর্ব তে আসার পর থেকে কেন জানি গল্পটা লিখতে পারছিলাম না আমি।নিজের লেখা নিজের কাছেই রোবটিক মনে হচ্ছিল।এতো বড় গল্প এই প্রথম লিখলাম তো,তাই ধৈর্য কুলাচ্ছিল না।তাই অনেকগুলো সিন বাদ দিয়ে গল্পের শুধু মূল পয়েন্ট টা লিখেছি।সেটার জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত।তবে আশা করছি অতটাও খাপছাড়া হয়নি।আমি যথেষ্ট চেষ্টা করেছি সেটা না করার।লেখিকার পরবর্তী গল্পগুলো এরকম হবে না,আশা করছি।
ধন্যবাদ💖