ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রণয়বেলায় তোমার আগমন

২১তম পর্ব

লেখক: জেরিন আক্তার

#প্রণয়বেলায়_তোমার_আগমন (২১)

#জেরিন_আক্তার

অধরা আগে চলে গিয়েছে বলে রুদ্র, আদ্র, সোহা তিনজনেই অবাক। তবে এই নিয়ে আর কোনো কথা হলো না খাবার টেবিলে। খাবার খেয়ে যে যার যার মতো চলে গেলো।

সোহা কলেজে এসে আগে অধরার ক্লাসের দিকেই গেলো। সেখানেই অধরাকে দেখতে পেলো। সোহা হাই তুলে অধরাকে ডাকলো। অধরা বাহিরে আসতেই সোহা জিজ্ঞাসা করলো,

“আপু আজ একা একাই চলে এলে? আমাকে একটা বার বললেও না।”

অধরা হেয়ালি করে বলল,

“আরে একটা কাজ ছিলো তাই চলে এসেছি।”

“ওহ। কি কাজ?”

“ও তোর শুনতে হবে না। ক্লাসে যা!”

“যাচ্ছি। আর যাওয়ার সময় দাড়িও কিন্তু। সকালের মতো চলে যেও না প্লিজ।”

“ঠিক আছে, এখন ক্লাসে যা!”

সোহা চলে যেতেই অধরা যেই ক্লাসের দিকে যাবে ঠিক সেই সময় সামনে এসে দাড়ালো রাকিব, সাথে ওর বন্ধু আলামিন। সেদিন রুদ্রর হুমকির পরে রাকিব আর অধরার সামনে আসেনি। নিজেকে অধরার থেকে দূরে রাখতে চাচ্ছে কিন্তু কোনোমতেই পারছে না। এমনকি আজকে দূর থেকে অধরাকে দেখে সামনে না এসে থাকতে পারছিলো না। শুরুতে অধরা রাকিবকে দেখেও কিছু বলল না। রাকিবই বলল,

“অধরা তোমার সাথে কিছু কথা বলতে চাই। বেশি না জাস্ট টেন মিনিটস সময় আমাকে দিবে?”

অধরা ক্লাসের দিকে একনজর তাকিয়ে রাকিবকে বলল,

“ক্লাস শুরু হতে ৫ মিনিট বাকি আছে। ছুটির পরে বলি!”

রাকিব অধরার থেকে সম্মতি পেয়ে খুশি হয়ে বলল,

“ঠিক আছে। আমি ওয়েট করবো। এখন ক্লাসে যাও তুমি।”

রাকিব আলামিনকে সাথে নিয়ে চলে গেলো। অধরা হাফ ছেড়ে ক্লাসে ঢুকলো।

আবার কলেজ ছুটির ঘন্টাখানিক আগে অধরা ড্রাইভারকে কল দিয়ে তাকে ছুটির আগেই আসতে বলল।

দুপুরবেলা রুদ্র অফিস থেকে বেরিয়ে গেলো। চলে এলো অধরার কলেজে। সকাল থেকে অধরাকে দেখতে পাচ্ছে না। এরপরে কতবার মেসেজ দিয়েছে। কিন্তু কোনো রিপ্লাই নেই। হয়তো ক্লাসে ছিলো। তবুও রুদ্রর মনে কেমন একটা খুঁতখুঁত লাগছিলো। অতঃপর ওকে নিতে চলে এলো ওর কলেজে। অনেকক্ষন দাড়িয়ে রইলো বাহিরে গেটের সামনে। অধরা, সোহা কাউকেই দেখতে পাচ্ছে না। অতঃপর অধরাকে কল দিলো। কিন্তু ফোনটা সুইচ অফ বলছে। রুদ্র রাগে দাঁত চেপে সোহাকে কল দিলো। সোহা আবার সাথে সাথেই কল রিসিভ করলো। রুদ্র রাগী কণ্ঠে বলল,

“এই তোরা কই রে?”

“আমরা তো বাড়িতে যাচ্ছি।”

“কিসে করে যাচ্ছিস?”

“ড্রাইভার এসেছিলো।”

“ড্রাইভারকে আসতে কে বলেছে? তোরা জানিস না আমি আসি প্রতিদিন?”

“জানি তো।”

“অধরা কই?”

“পাশেই আছে।”

“ওকে ফোনটা দে!”

সোহা অধরার কাছে ফোনটা দিলো। রুদ্র রেগেই বলল,

“প্রতিদিন আমি নিয়ে যাই সেটা জানিস না নাকি? ড্রাইভার এলো আর চলে গেলি? আর তোর ফোন কই? বন্ধ বলছে কেনো?”

অধরার ছোট্ট জবাব,

“চার্জ নেই।”

“বাড়িতে গিয়ে ফোন চার্জ করে কল দিবি।”

অধরা উত্তরে হ্যা বা না কিচ্ছু বলল না। রুদ্রই ওপাশে থেকে কলটা কেটে গাড়িতে উঠল।

অধরা বাড়িতে গিয়ে ফোন আর কি চার্জ দিবে। ও তখন তো ইচ্ছে করেই বন্ধ করে রেখেছিলো। ড্রাইভার দুজনকে বাড়িতে নিয়ে এলো। আজ অধরা সোহার সাথে তেমন কোনো কথা না বলে চলে গেলো উপরে। রুমে এসে ড্রেস চেঞ্জ করে শাওয়ার নিয়ে বের হলো। সোহা ততক্ষনে শাওয়ার নিয়ে অধরাকে ডাকতে এসেছে। দুজনে একসাথে খাবে। কিন্তু অধরা বলেছে ৫ মিনিট পরে আসছে। সোহা চলে গেলো। অধরা এসে আয়নার সামনে দাড়ালো। চুলগুলো মুছতে মুছতে আয়নার দিকে নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে শুরু করলো। সাথে ইফতির কথাগুলোও ভাবতে লাগলো। মনে মনে ভাবলো,, আচ্ছা ও কি রুদ্রর যোগ্য না নাকি? ওর মধ্যে তো আল্লাহ কোনো কমতি দেয়নি। তাহলে ইফতি কেনো এমন বলল? কই ও তো রুদ্রকে বিয়ে নিয়ে জোর করে বলেনি যে, আপনার আমাকেই বিয়ে করতে হবে। তাহলে কেনো আমার কথা? রুদ্র নিজের ইচ্ছেতেই তো চলে এসেছে। ও তো আসতে বলেনি। আর না বলেছে যে, আপনি থাকবেনই।

অধরার মনটা কেমন একটা খারাপ হয়ে গেলো। ইফতি যখন বলেছিলো যে ঐরকম হাজারটা অধরা তোকে পেতে চাইবে তখন অধরার বুকটা ছিঁড়ে যাচ্ছিলো। ইফতি আর পাঁচটা মানুষের সাথে ওকে কেমন করে তুলনা করতে পারলো তা ওই জানে।

অধরা আয়নার দিকে তাকিয়ে শক্ত কণ্ঠে বিড়বিড় করলো, “আমি তো দেখিয়েই দিবো আমি ওরকম না। আমাকে তুচ্ছ করে কথা বলারও তো রাইট নেই ইফতির। ধুর, লাগবে না রুদ্র ভাইকে আমি তার প্রতি কোনোরকম কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাবো না। যদি রুদ্র ভাই নিজে থেকে এগোয় তাহলেই সবাই বুঝবে এই সম্পর্কে ভালোবাসা আছে কি নেই? আর ওই ইফতির বাচ্চাকে যদি না কেলিয়েছি আমিও নেওয়াজ বাড়ির মেয়ে না। আব্বুকে বললে ওর হাড্ডিগুড্ডি একটাও রাখবে না। আমাকে নিয়ে হেয়ালি করে কথা বলা না.. আমাকে কি আব্বু কম ভালোবাসে। শুধু সুযোগ পাই আব্বুকে বলে দিবো।”

মিনিট ১৫ পরে অধরা নিচে নামলো। মেজাজটা একদম ভালো নেই। অনিমা অধরাকে দেখে বললেন,

“কখন থেকে ডাকছি শুনতে পাসনি?”

“না।”

“খেতে বস!”

“খাবো না।”

“কেনো?”

“কি রান্না করেছো?”

“মাছ আছে, মাংসও আছে।”

অধরা সোফায় গিয়ে বসে মর্জি ধরে বলল,

“খাবো না। বিরিয়ানি খাবো।”

অনিমা রেগে গিয়ে বললেন,

“চুপচাপ খেতে আয়! আবার যেনো বলতে না হয়।”

অধরা সাথে সাথে ওর বাবাকে কল দিলো। আরিফ নেওয়াজ আরমান নেওয়াজের কেবিনে বসে কাজ নিয়ে কথা বলছিলেন। অধরার কল পেয়ে রিসিভ করলেন,

“হ্যালো আব্বু কই তুমি?”

“অফিসে। কেনো?”

অধরা সোজা গলায় বলল,

“আমি বিরিয়ানী খাবো। আর আম্মু বলছিলো তোর আব্বুকে নিয়ে আসতে বল।”

অনিমা তো কথাটা শুনতে পেয়ে হা হয়ে তাকিয়ে রইলেন। এপাশে আরিফ নেওয়াজ কপাল কুঁচকে নিয়ে বললেন,

“এখন খাবে?”

“এখন মানে এখনই। আমি দুপুরে কিচ্ছু খাইনি, সকালে খেয়েছিলাম। এখন খিদে পেয়েছে। যদি এখন কিছু খাই তাহলে বিরিয়ানিই খাবো।”

“ঠিক আছে আমি নিয়ে আসছি।”

“আচ্ছা, তাড়াতাড়ি এসো।”

আরিফ নেওয়াজ কল কেটে দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। আর বললেন,

“আমি একটু বাড়ি থেকে আসছি।”

রুদ্র জিজ্ঞাসা করলো,

“কিছু হয়েছে নাকি?”

আরিফ নেওয়াজ হেসে বললেন,

“ওই একটু যেতে হবে। এসে বলছি!”

“ঠিক আছে যাও।”

আরিফ নেওয়াজ চলে যেতেই আরমান নেওয়াজ হেসে হেসে বললেন,

“ও চলে গেলো অধরা হয়তো ওকে কিছু নিয়ে যেতে বলেছে।”

রুদ্র ভাবুক গলায় বললেন,

“অফিস টাইমেও মেয়ের প্রতি এতো কেয়ার?”

আরমান নেওয়াজ শ্বাস ছেড়ে বললেন,

“তুমি তো মাত্র ৪-৫ দিন হলো অফিসে ঢুকেছো। তাই এমন বলছো। আসলে আরিফ মেয়েকে কতটা বললে কমই হবে। কতটা না নিজের জীবন দিয়েই বেশি ভালোবাসে। ওদের ভালোবাসা দেখে আমার একেকসময় আফসোসই লাগে, এই ভেবে যে অধরা আমাদের ঘরে কেনো হলো না।”

রুদ্র নাক-মুখ কুঁচকে নিয়ে বলল,

“ভালোই হয়েছে হয়নি। নাহলে আমি কাকে বিয়ে করতাম।”

“ওহ ভালো কথা। আজকে দেখি আরিফের সাথে বিয়ের ব্যাপারে কথা বলবো। দেখি ওর উত্তর কি হয়!”

“বাবা, মেঝো আব্বু যাই বলুক, আমার কিন্তু অধরাকেই চাই। ওকে চাই মানে ওকেই লাগবে।”

আরমান নেওয়াজ হেসে বললেন,

“কেনো আরও বিদেশ যাও। আরও জেদ ধরে থাকো। আমি একটা বছর ধরে তোমাকে পইপই করে বলছি দেশে এসো, অধরাকে দেখো কিন্তু তোমার এক উক্তি ছিলো। এখন বুঝলে তো কেনো বলেছিলাম।”

“হুমম বুঝতে পেরেছি।”

এদিকে আরিফ নেওয়াজ বিরিয়ানি নিয়ে এলেন। অধরা সোফায়ই বসেছিলো। অনিমা খাবার টেবিলের চেয়ারে বসেছিলেন। আরিফ নেওয়াজ অনিমার দিকে একবার তাকিয়ে মেয়ের কাছে এলেন। বিরিয়ানির প্যাকেটগুলো দিয়ে বললেন,

“তোমার বিরিয়ানি নিয়ে এসেছি। এখন খেয়ে নাও।”

অধরা অনিমার দিকে তাকিয়ে বিশ্বজয় করা একটা হাসি দিলো। আরিফ নেওয়াজ অনিমার দিকে তাকিয়ে বললেন,

“ওকে খাবারগুলো বেড়ে দাও। না জানি সেই কখন খেয়েছে খিদেও পেয়েছে হয়তো।”

অনিমা উঠে দাড়িয়ে বললেন,

“আমাকে তো একবারও জিজ্ঞাসা করেন না যে অনিমা তুমি খেয়েছো কিনা। আর মেয়ের বেলায় উড়ে উড়ে এলেন। বাড়িতে খাবার থাকা সত্ত্বেও ওর বিরিয়ানি খেতে মন চাইবে আর এনে দিবেন? কালকে নাহয় আমিই রান্না করে দিতাম।”

আরিফ নেওয়াজ অবাক কণ্ঠে বললেন,

“তুমি এক মুখে কয় কথা বলছো? তুমিই না অধরাকে বলেছো তোর আব্বুকে বল বিরিয়ানি নিয়ে আসতে। আর এখন পোল্টি নিচ্ছো?”

অনিমা কথা বাড়ালেন না। চুপচাপ অধরাকে খাবার বেড়ে দিলেন। এই পর্যন্ত আরিফ নেওয়াজের সাথে কথায় পেরে উঠেননি। আর আজও পেরে উঠতে চান না। আরিফ নেওয়াজ সোফায় বসলেন। আর অনিমাকে কফি বানিয়ে দিতে বললেন। কফি খেয়েই চলে যাবেন। অধরা আবার সোহাকেও ডাকলো। কিন্তু সোহা খেলো না, একটু আগেই খেয়ে নিয়েছে। বলল পরে খাবে। তাই অনিমা ওর জন্য বিরিয়ানি রেখে দিলেন। অনিমা অধরাকে খেতে দিয়ে আরিফ নেওয়াজের জন্য কফি বানিয়ে নিয়ে এলেন। আরিফ নেওয়াজ কফিটা নিতে গিয়ে অনিমার মুখের দিকে তাকালেন। অনিমা রাগে গটগট করে চলে গেলেন। আরিফ নেওয়াজ সেদিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে কফিতে চুমুক দিলেন। অনিমার এই রাগ কতই দেখে এলেন, এ আর নতুন কি। মা ও যেমন রাগী, তার মেয়েও তেমন।

অধরা আবার ওর মায়ের রাগের মধ্যে ঘি ঢেলে দিতে হেসে বলল,

“আম্মু বিরিয়ানি খাবে?”

অনিমা শুধু তাকিয়েই রইলেন।

*********

সন্ধ্যার দিকে বেশ উড়াতাড়া করে বাড়িতে ঢুকলো রুদ্র। ভীষণ রেগে আছে। রাগের কারণও আছে, রুদ্র সেই দুপুরে অধরাকে বলেছিলো কল দিতে। সে আর কলই দেয়নি। আর না কল ধরেছে। ও ধুপধাপ পা ফেলে চলে এলো উপরে অধরার ঘরে। অধরা ঘরে নেই। রুদ্র রুম থেকে বেরিয়ে সোহার ঘরে গেলো, সেখানেও পেলো না। পরপর আদ্রর রুমে, সেখানেও নেই। এরপরে চলে এলো ছাদে। অধরা ছাদেই ছিলো। দোলনায় বসে থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে গিয়েছে। রুদ্র ডাকলো না। নিচে চলে এলো। রুমে এসে শাওয়ার নিয়ে খেতে এলো।

রাত তখন সাড়ে ৭ টা। রুদ্র ছাদেই বসে আছে। রুকাইয়া এসেছিলেন অধরাকে ডাকতে। কিন্তু রুদ্র ডাকতে দেয়নি। আজ ও দেখবে এই মেয়ের ঘুম কতদূর। বেশ রেগে আছে রুদ্র।

এভাবেই আরও মিনিট বিশেক কেটে গেলো। অধরার ঘুম ভাঙলো, চোখ পিট পিট করে তাকিয়ে উঠে বসলো। এরপরে দোলনায় থেকে পা নামিয়ে মিনিট দুই বসে থেকে স্বাভাবিক হলো। এরপরে উঠে দাড়িয়ে সামনের দিকে হাঁটা দিতেই দেখলো রুদ্র উঠে ওর দিকেই আসছে। অধরা এড়িয়ে চলে যেতে নিলো। রুদ্র কিছু বলার জন্য প্রস্তুত হলো কিন্তু কল বেজে উঠায় পারলো না। ফোনের দিকে নজর নিতেই অধরা ততক্ষনে চলে গেলো। রুদ্রও ফোন রেখে ওর পিছু পিছুই এলো। ছাদের সিঁড়ির মাঝখানে এসে রুদ্র অধরার হাতটা ধরলো।

চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন