#প্রণয়বেলায়_তোমার_আগমন (২৮)
#জেরিন_আক্তার
কিছু সময় যাওয়ার পরে রুদ্রই অধরাকে ছাদ থেকে চলে যেতে বলল। অধরা বায়না ধরে বলল,
“আরেকটু থাকি?”
“রাত হচ্ছে তো!”
“একটু হলে কিছু হবে না।”
রুদ্র চট করে অধরার কোলে মাথা রেখে শুলো। আর ওর মুখপানে তাকিয়ে বলে উঠল,
“মাথাটা ধরেছে। একটু টিপে দে তো!”
অধরা মাথায় হাত রেখে আলতো করে টিপে দিতে শুরু করলো। রুদ্রর কোনো মাথা ব্যাথাই করেনি। অধরা যেনো মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় তার জন্যই বলেছে মাথাটা ধরেছে। রুদ্র কিছু একটা ভাবতে ভাবতে বলল,
“অধরা তোর আমার বিয়ে হলে আমাদের একটা ছোট্ট সংসার হবে। আমি অফিস থেকে ফিরবো তু্ই দরজার সামনে দাড়িয়ে অপেক্ষা করবি। রান্না করবি আমার জন্য। আমার সাথে ঘুরতে বের হবি। আরও কত কি।”
অধরাও মুচকি মুচকি হাসছিলো। পরপর রুদ্র বলল,
“তু্ই খুব চাপা স্বভাবের। ঠিক তোর বাপের মতো। আমি দেখেছি অফিসে বা বাড়িতে, কোনো হাসির কথা হলে তোর বাপ যেমন হাসতে গিয়েও চুপ থাকে তু্ইও তেমন। তবে মাঝে মাঝে হাসিস ঠিকই কিন্তু ভালোবাসা প্রকাশ করিস না।”
অধরা ঘাড় কাত করে বলল,
“আচ্ছা! আমার কাছে আমার নামেই অভিযোগ করছেন।”
“হুমম করছি। এন্ড একশো বার করবো।”
কিছুক্ষন পরে রুদ্র গভীর গলায় বলে উঠল,
“তুমিই একজন, যে আমার জীবনে এসে
ধীরে ধীরে আমার সবকিছু হয়ে উঠলে।”
অধরা মনে মনে বলল—একবার তু্ই, একবার তুমি। আসলে বিয়ের পরে যে কি বলবে আল্লাহ ভালো জানে।
রাত সাড়ে ১১ টা,
রুদ্র অধরাকে নিয়ে ছাদ থেকে বের হলো। অধরা আগে নামলো রুদ্র ছাদের দরজা লাগিয়ে পরে নামলো। অধরা রুমে ফিরে দরজা লাগিয়ে শুয়ে পড়লো। রুদ্রও তাই করলো। তবে এতো সুন্দর সময় কাটিয়ে দুজনের চোখেই ঘুম নেই। রুদ্র মেসেজ দিলো অধরাকে,
—আতঙ্ক কি করছিস?
অধরা এই মেসেজের অপেক্ষা করছিলো। মুচকি হেসে লিখলো—কি আর করবো, আপনার জন্য কফি বানাচ্ছি।
—আর ইউ সিরিয়াস? তোর মাথা ঠিক আছে, এই রাত্রিবেলা কফি কে খাবে?
—আপনার মাথা ঠিক নেই, এই রাত্রিবেলা আমি শুয়ে পড়া ছাড়া কি বা করবো। আর বলছেন কি করছিস!
—ওহহহ। কালকে কলেজে যাবি?
—হ্যা যাবো।
—ওই রাকিব তো মনে হয় তোর সাথে কথা বলার চেষ্টা করছে।
—হুম। আপনি কি করে জানলেন?
—জেনেছি।
—কি করে?
—ওসব তোর জানতে হবে না।
—ঠিক আছে নাই জানলাম। এখন ঘুম পাচ্ছে।
—ওকে, ঘুমা। আমার কাছে এলে তো আর ঘুমাতে দিবো না।
—অসভ্য লোক।
—তোর জন্যই তো অসভ্য হয়ে গিয়েছি।
—রাখছি, গুড্ নাইট।
—ওকে, গুড্ নাইট আতঙ্ক।
—আপনি চোর।
—কি চুরি করেছি শুনি?
—পরে বলবো, ঘুমান।
—বেশ।
_____________________
সকালবেলা আরমান নেওয়াজ, আরিফ নেওয়াজ একটু হাঁটতে বেরোলেন। সাথে রুদ্রও আছে। কিছুদূর যাওয়ার পরে তিনজনের সামনে এসে দাঁড়ালেন রহমান মিয়া। নেওয়াজ পরিবারের আত্মীয়। আরমান নেওয়াজ আর আরিফ নেওয়াজের সাথে কুশল বিনিময় করে রুদ্রকে বললেন,
“রুদ্র না। কত বড় হয়ে গিয়েছো। কবে এলে?”
“এইতো ২০-২২ দিনের মতো হলো।”
“ওহ ভালোই হয়েছে দেশের ছেলে দেশে এসেছো।”
রহমান মিয়া আরিফ নেওয়াজকে বললেন,
“আরিফ অধরাকে বিয়ে দিবে না?”
আরিফ নেওয়াজ হালকা হেসে বললেন,
“হ্যা দিবো তো। মেয়ে মানুষ যখন বিয়ে তো দিতেই হবে।”
রহমান মিয়া বললেন,
“আমার ছেলে রাফিকে তো দেখেছোই। ওর সাথে বিয়ের প্রস্তাব দিলাম কি বলো আরিফ?”
রুদ্র তৎক্ষণাৎ সামনে এসে বলল,
“ওই মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে।”
রহমান মিয়া হেসে বললেন,
“কি বলো রুদ্র। মজা করছো!”
রুদ্র সোজা গলায় বলল,
“না আংকেল মজা করছি না। ওকে আমি বিয়ে করেছি। ও আমার বিয়ে করা বউ।”
রহমান মিয়া হেসেই বললেন,
“ভালোই। দোয়া করি তোমাদের দাম্পত্য জীবন সুখের হোক। আর আরিফ কিছু মনে করো না।আমি না জেনেই প্রস্তাবটা দিয়েছি।”
আরিফ নেওয়াজ হেসে বললেন,
“না সমস্যা নেই।”
তিনজনেই বাড়িতে ফিরে এলো। আরিফ নেওয়াজ এর মাঝে রুদ্রর সাথে কথা বলেননি। রুদ্রও না। তবে রুদ্র শুধু থেকে থেকে উনাকে জ্বালাতে ইশারা করেছে।
দুপুরে লাঞ্চ টাইমে রুদ্র বসেছিলো ওর বাবা-চাচার সাথে। আরমান নেওয়াজ বাহিরে গেলেন। আরিফ নেওয়াজ কফি খেতে খেতে ফোন স্ক্রল করছিলেন। রুদ্র চেয়ারে হেলান দিয়ে অধরাকে কল দিলো। অধরা কল ধরতেই রুদ্র আরিফ নেওয়াজকে শুনিয়ে বলল,
“কিগো কি করছো শশুরের একমাত্র আতঙ্ক?”
আরিফ নেওয়াজ আড়চোখে তাকালেন। বুঝতেও পারলেন তার মেয়েকেই কল দিয়েছে। এপাশে অধরা নাক-মুখ কুঁচকে বলল,
“গিরগিটিও এতো রঙ পাল্টায় না যতটা আপনি পাল্টান। একবার তু্ই, একবার আপনি, একবার তুমি।”
“আরে রাগ করিস না। আমারই তো তু্ই। তোকে একেকসময় একেকভাবে ডাকতে ভালো লাগে বলেই ডাকি।”
আরিফ নেওয়াজ ভ্রু উঠিয়ে তাকালেন রুদ্রর দিকে। রুদ্র হেসে হেসে অধরাকে বলল,
“তোকে ছাড়া একটা মুহূর্তও ভালো লাগে না রে! এই কাজবাজও মাথায় ধরে না।”
আরিফ নেওয়াজ শয়তানি হেসে বললেন,
“তাহলে বাবা বাড়িতে চলে যাও কেমন!”
অধরা ওর বাবার কণ্ঠ পেয়ে তাড়াহুড়ো করে বলল,
“আপনি বাবার পাশে বসে কথা বলছেন।”
“হ্যা। কথা বলবে তোমার বাবার সাথে?”
“রাখুন তো ফোন।”
অধরা কল কেটে দিলো। রুদ্র ফিচেল হেসে আরিফ নেওয়াজকে বলল,
“তোমার মেয়ে না তোমার মতোই হয়েছে। প্রকাশ করে না কিছুই।”
আরমান নেওয়াজ রুমে ঢুকতে ঢুকতে বললেন,
“দুজনে কিছু নিয়ে আলোচনায় মগ্ন নাকি?”
রুদ্র ফট করে বলে দিলো,
“হ্যা, যৌতুক নিয়ে কথা বলছিলাম।”
আরিফ নেওয়াজ কপাল কুচকালেন। ভাবলেন এই ছেলে নিশ্চই পাগল হয়ে গিয়েছে তার মেয়ের জন্য। কখন কি বলছে তার ঠিক পাচ্ছেন না। আর লাজ-লজ্জা তো ভুলেই গিয়েছে এই ছেলে। এউ ভাবলেন, বিয়ের আগেই যে অবস্থা বিয়ের পরে কি যে হবে আল্লাহ ভালো জানে।
রুদ্র বাড়িতে ফিরলো বিকেলেই। ফ্রেশ হয়ে খেতে এলো। অধরা, রুকাইয়া, অনিমা তখন নিচেই ছিলো। দারোয়ান এলো একটা পার্সেল হাতে নিয়ে। বলা যায় একটা বড় বক্স। অধরাকে তিনি বললেন,
“মামনি পার্সেল আছে তোমার নামে।”
অনিমা এগিয়ে গেলেন। অধরা এগিয়ে গিয়ে বলল,
“আংকেল এতো বড় বক্সে পার্সেল।”
“হুমম। ডেলিভারি ম্যান দিয়ে গেলো। উপরে তোমার নাম লেখা।”
অনিমা অধরাকে বললেন,
“অর্ডার করে এখন না জানার ভান করছিস না?”
অধরা মাথা নাড়িয়ে বলল,
“আম্মু আমি শাড়ি, আর দুটো ড্রেস অর্ডার করেছি। তাই কি সেগুলো এতো বড় বক্সে দিবে।”
রুদ্র সে খেয়ালেই নেই। ও খাওয়ায় মনোযোগ দিয়েছে। মনে হচ্ছে এখন খাবারের থেকে কোনো জিনিস ইম্পরট্যান্ট নয়।
এদিকে অনিমা তো রেগে-ফুলে এক হয়ে আছেন। অধরা বক্সটা খুলতে শুরু করলো। সেখানে দেখলো কয়েকপ্রকার সি-ফুড। অধরা একটু জোরেই রুকাইয়াকে ডেকে বলল,
“বড় আম্মু দেখো সি-ফুড।”
রুকাইয়া এগিয়ে এলেন। অধরা বলল,
“বড় আম্মু এগুলো মনে হয় আদ্র ভাই পাঠিয়েছে।”
রুদ্রর মেজাজ কেমন চড়া হয়ে গেলো। খাওয়ার গতি বাড়িয়ে দিলো। অধরা তখনই রুকাইয়ার ফোন দিয়ে আদ্রকে কল দিলো। আদ্র কল রিসিভ করতেই অধরা বলল,
“এই ভাইয়া তুমি সি-ফুড অর্ডার করেছো?”
“কই নাতো!”
“মিথ্যে বলছো কেনো?”
“যা মিথ্যে বলবো কেনো?”
“কোথায় তুমি এখন? আজ সকালে না তোমার আসার কথা ছিলো।”
“আমি আসছি। দুইঘন্টার মতো সময় লাগবে।”
“ঠিক আছে এসো।”
প্রায় আড়াই ঘন্টা পরে আদ্র এলো। তখন সন্ধ্যা সন্ধ্যা। অধরাও ওর জন্য অপেক্ষা করছিলো। সাথে রুদ্রও বসে ছিলো। আদ্র বাড়ির ভিতরে ঢুকলো সাথে একটা বক্স নিয়ে এসেছে। রুকাইয়া এগিয়ে গিয়ে বললেন,
“কেমন আছিস?”
“ভালো। তুমি কেমন আছো মা?”
“ভালো। তোর আসতে এতো দেরি হলো কেনো?”
“অধরার জন্য সি-ফুড আনতে গিয়েই দেরি হয়েছে। বাস মিস হয়ে গিয়েছে। তাই আবার গাড়ি ভাড়া করে আসতে হয়েছে।”
অধরা বলল,
“তুমি সি-ফুড এখন নিয়ে এসেছো। তাহলে ডেলিভারি ম্যান যে দিয়ে গেলো সেগুলো কে অর্ডার করেছে?”
আদ্র সোফায় বসে বলল,
“কই আমি তো অর্ডার করিনি। আমিতো ওইখানে শপ থেকে কিনে নিয়ে এসেছি।”
অধরা ভাবুক গলায় বলল,
“তাহলে কি আব্বু অর্ডার করেছে। কিন্তু আব্বু তো শুনেইনি। তাহলে কি রুদ্র ভাই আপনি!”
রুদ্র অধরার মাথায় গাট্টা মেরে বলল,
“এইটুকু বুঝতে এতক্ষন লাগে?”
রুদ্রই যে অর্ডার করেছে অধরার বুঝতে বাকি রইলো না। অনিমা পাশ থেকে অধরাকে বললেন,
“এগুলো তোকে তিনবেলা রান্না করে দিবো। দেখি কত খেতে পারিস।”
“উফ বকো না তো আম্মু।”
আদ্র আশেপাশে তাকিয়ে সোহাকে খুঁজছে। সোহা নিচে নেই। ইচ্ছে করেই নিচে আসেনি। কারণ ওর জন্যই আদ্র রাগ করে ঘুরতে চলে গিয়েছে। আদ্র ভাবছে সোহা কি জানে না ও এই সময়ে আসবে তবুও দেখা কেনো দিচ্ছে না। অতঃপর আদ্র অধরাকে টেনে নিয়ে গেলো উপরে। আদ্র ওর রুমে এসে অধরাকে জিজ্ঞাসা করলো,
“সোহা কোথায় রে?”
“রুমে আছে।”
“ঘুমিয়ে আছে কি?”
“না। তুমি গিয়ে দেখা করে এসো।”
“পরে, ফ্রেশ হয়ে যাবো।”
“ঠিক আছে ফ্রেশ হও তাহলে আমি আসছি।”
আদ্র শাওয়ার নিয়ে নিচে এলো। সোহা নিচেই ছিলো তখন। রুকাইয়া রান্না করছেন। তাই সোহাকে বললেন আদ্রকে খাবার বেড়ে দিতে। সোহা তো তাই চাইছিলো। ও আদ্রর পাশে এসে দাড়িয়ে খাবার বেড়ে দিলো। আদ্র সোহার পায়ের উপরে পা রাখলো। সোহা লাজুক হাসলো। উপরে থেকে রুদ্র ওদের এই দৃশ্য দেখে বিড়বিড় করে বলল,
“আর তো কয়টা দিন। এরপরে তোরা দেখবি আমাদের রোমান্টিক দৃশ্য। বউটা আমাকে যত্ন করে খাবার বেড়ে দিবে, মিষ্টি মিষ্টি করে কথা বলবে উফ ভাবতেই কি যে খুশি খুশি লাগছে।”
_____________________
রাতের খাবার খেয়ে আরমান নেওয়াজ, আরিফ নেওয়াজ আর অনিমা তিনজনে বসে কথা বলছেন। অধরা কিচেনে টুকটাক জিনিস দেখছিলো। এরপরে থেকে রান্না-বান্নায় ফোকাস দিবে। তাই একটু-আধটু জিনিসগুলো দেখছিলো। রুদ্র সিঁড়ির উপরে থেকে একটু জোরেই অধরার উদ্দেশ্যে বলল,
“বউ বউ ডাক পারি,
বউ তু্ই কার বাড়ি,
আয়রে বউ ঘরে আয়!
তোর জামাই তোরে দেখতে চায়।”
রুদ্রর এই গান শুনে ড্রইং রুমে থাকা আরমান নেওয়াজ, আরিফ নেওয়াজ ও অনিমা তিনজনেই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। তবে ওর কোনো হেলদোল নেই। যেনো কিছুই বলেনি। অধরা একবার ড্রইং রুমে বসে থাকা বাবা-মা-চাচাদের দিকে তাকাচ্ছে আবার রুদ্রর দিকে তাকাচ্ছে। লজ্জাও লাগছে। ও মাথাটা নত করে উপরে চলে এলো। রুদ্রর মুখে ছিলো বাকা হাসি। অধরা ওকে পাত্তা না দিয়ে হনহন করে নিজের ঘরে ঢুকে গেলো। রুদ্রও পিছু পিছু চলে এলো।
অধরা সোজা ব্যালকনিতে চলে এলো। রুদ্রও এলো। অধরা আবারও রুমে ফিরে এলো। রুদ্র অধরার ওড়নার মাথাটা ধরে বাচ্চাদের মতো করে বলল,
“শোন না, চল আমরা বিয়ে করে ফেলি! বাড়ির কেউ বিয়ে নিয়ে এগোবে না রে। আমাদেরই কিছু একটা করতে হবে।”
অধরা পেছন ফিরে চোখ পিটপিট করে তাকালো। আর বলল,
“আপনি যা শুরু করেছেন না, দেখবেন কালকেই বিয়ে পড়িয়ে দিবে।”
রুদ্র ফিচেল হেসে বলল,
“তোর জন্য একটু বেহায়া হতেই হলো। তবে আই প্রমিস বিয়েটা হলে একদম সিরিয়াস হয়ে যাবো।”
চলবে....