#প্রণয়বেলায়_তোমার_আগমন (২৭)
#জেরিন_আক্তার
আরিফ নেওয়াজের সকালটা শুরু হলো মেয়ের হাতে বানানো কফি দিয়ে। বেশ গুমোট বেধে বসে কফি খাচ্ছেন। অনিমা রাত থেকে এইপর্যন্ত রুদ্রর সেই কথা নিয়ে কিছু বলেননি তাকে। ওদের জামাই-শশুরের ঝামেলা ওরাই সামলাবে, এতে অনিমাই বা কি বলবেন।
অধরা আরেক কাপ কফি বানিয়ে নিয়ে গেলো রুদ্রর জন্য। আরিফ নেওয়াজ মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“অধরা কফি এদিকে নিয়ে এসো!”
অধরা বাধ্য মেয়ের মতো ফিরে এসে দাড়ালো বাবার সামনে। আরিফ নেওয়াজ বললেন,
“কফিটা এখানে রেখে রুদ্রকে ডেকে নিয়ে এসো। একসাথে বসে কফি খাই।”
“ঠিক আছে।”
অধরা চলে গেলো। রুদ্রর রুমে এসে দেখলো দরজা অর্ধেক খোলাই। দরজা খুলে রুমে ঢুকতেই দেখলো রুদ্র শার্ট পড়লো। অধরা পেছনে থেকে বলল,
“কফি বনিয়েছি নিচে আসুন!”
“কেনো? তু্ই এলি, নিয়ে আসতি।”
“আব্বু বলল কফি রেখে রুদ্রকে ডেকে আনো।”
“ওমা শশুরআব্বু তাই বলেছে। চল যাই!”
“এসব আবার কেমন কথাবার্তা?”
“কেমন আবার। তোর বাপকে আতঙ্ক বললে তু্ই ক্ষেপে যাস তাই তো শশুরআব্বু বলে ডাকছি। আর রাতে যে কাহিনী হলো….”
রুদ্র থামলো। অধরা কপালে ভাজ ফেলে জিজ্ঞাসা করলো,
“কি কাহিনী?”
রুদ্র রুম থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল,
“কফি ঠান্ডা হলো চল তো।”
অধরা পেছন পেছন এলো। রুদ্র এমন ভাব নিয়ে এলো যেনো ও জানেই যে রাতে কি কথা বলেছে। আরিফ নেওয়াজ তখনও গম্ভীর। রুদ্র কফিটা নিয়ে তার পাশে গিয়েই বসলো। আরিফ নেওয়াজ থেকে থেকে আড়চোখে রুদ্রর দিকে তাকাচ্ছেন। রুদ্র শয়তানি করেই বলল,
“মেঝো আব্বু ভালো আছো?”
অধরা সেখানে থেকে কেটে পড়লো। না জানি রুদ্রর মাথায় কি ঘুরপাক খাচ্ছে। আবার কি না কি বলে দেয়। এর থেকে ওর এখানে না থাকাই ভালো। আরিফ নেওয়াজ গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
“হুম।”
রুদ্র দোপাটি দাঁত বের করে হেসে বলল,
“আমাকে জিজ্ঞাসা করো?”
আরমান নেওয়াজ হাসার চেষ্টা করে বললেন,
“কেমন আছো?”
“অনেক ভালো। তবে তোমার মেয়েকে পেলে আরও ভালো থাকতাম।”
রুকাইয়া কিচেনে থেকে রুদ্র আরিফ নেওয়াজের বন্ধুত্বপূর্ণ আলাপচারিতা দেখে অনিমাকে বললেন,
“দুজনের মাঝে এতো বন্ডিং ভালো হলো কবে থেকে?”
“রাতে থেকে ভাবি।”
“মানে?”
অনিমা আস্তে করে বললেন,
“রাতে অধরার ফোনটা আমাদের ঘরে ছিলো। তোমার ছেলে রাত ১ টার সময় কল দিয়ে আমার মেয়েকে কি বলে জানো! না বাবা আমি বলতে পারবো না। যে কথাগুলো বলেছে ওগুলো শুনলে যেকেউ ভাববে ওদের বিয়ে হয়েছে।”
“তোর আর বলতে হবে না রে আমার ছেলেই তো, আমি বুঝতে পেরেছি কি বলবে।”
“অধরার বাবা এই নিয়েই দেখো কেমন গুমোট বেধে আছে।”
“ওহহ, এখন বুঝলাম।”
আজ অফিসে রুদ্র কাজের ফাকে ফাকে যখনই সুযোগ পেয়েছে তখনই আরিফ নেওয়াজের সাথে এরকম ভাবেই কথা বলেছে। বিকেলের দিকে রুদ্র ওর কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরে আসে। শুরুতে ড্রইং রুমে অধরাকে দেখতে পেলো। হাতে-পায়ে নেলপালিশ নিবে মনে হয়। রুদ্র এগিয়ে এসে ওর হাতটা ইচ্ছাকৃত ভাবে নাড়িয়ে দেয়। শুরুতেই নেলপালিশটা ভালোভাবে দিতে পারলো না। অধরা ঠান্ডা মেজাজে বলল,
“এটা কোনো কাজ করলেন?”
রুদ্র পাশে বসে আবদার করে বলল,
“আমি দিয়ে দেই?”
“আপনি পারবেন?”
“আরে দে তো!”
অধরা নেলপালিশটা দিয়ে দিলো। রুদ্র ভালোমতোই হাতে নেলপালিশ দিয়ে দিলো। এরপরে পায়ের দিকে হাত দিতেই অধরা একটু সরে গিয়ে বলল,
“ছি ছি পায়ে হাত দিবেন না।”
“হাত দিবো না। জাস্ট নেলপালিশ দিবো।”
“লাগবে না। আমাকে দিন! আমি নিতে পারবো।”
রুদ্রও কথাছাড়াই দিয়ে দিলো। অধরা পায়ে নেলপালিশ নিতে নিতে বলল,
“এর আগেও কি কাউকে নেলপালিশ দিয়ে দিয়েছেন?”
“দিয়েছিলাম একবার।”
অধরা সোজা হয়ে কেমন একটা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“কাকে দিয়েছেন?”
“ওই বিদেশে একটা ফ্রেন্ডকে।”
“দেশে কাকে দিয়েছেন?”
“তোকেই প্রথম।”
অধরা সন্দীহান দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“আপনার ওই ফ্রেন্ড কেমন দেখতে? আমার থেকেও সুন্দরী কি?”
রুদ্র বিড়বিড় করে বলল,
“আতঙ্ক আবার সন্দেহ করতেও জানে দেখছি।”
রুদ্র একটা ছবি বের করলো। ওইটা ওর বিদেশী একটা ফ্রেন্ড বলতে রুদ্ররই ক্লাসমেট আবার ওর বন্ধুর বউও। অধরা ছবিটা দেখে বলল,
“ঠিক আছে।”
“বিশ্বাস হয়েছে?”
“হুমমম। আপনি ফ্রেশ হয়ে আসুন খাবার বাড়ছি।”
“তু্ই?”
“হুমম।”
“বাড়ির সবাই কোথায়? মা কই?”
“বড় আম্মু আর আমার আম্মু দুজনে শপিংয়ে বলতে নিজেদের জন্য কিছু জিনিস আনতে গিয়েছে। আর সোহা কোচিংয়ে থেকে আসেনি।”
রুদ্র অধরার কাঁধে একটু ধাক্কা দিয়ে শয়তানি হেসে বলল,
“তাহলে আমি আর তু্ইই শুধু বাড়িতে? এখন তো কু-প্রস্তাব দিতেই পারি বল!”
অধরা চোখ রাঙিয়ে তাকিয়ে বলল,
“আপনাকে মান হানির মামলা দিয়ে জেলে ঢুকিয়ে দিবো।”
“তোর জন্য দুনিয়ার যেকোনো জেলেই যেতে রাজি আছি।”
অধরা নেলপালিশ নিয়ে উঠে সিঁড়ির দিকে যেতে যেতে বলল,
“আমি এগুলো রেখে এসে খাবার বেড়ে দিচ্ছি। আর আপনাকে এর মধ্যে খাবার টেবিলে চাই।”
রুদ্র বুকের বা পাশে হাত রেখে বলল,
“ভালো না বাসলে অন্তত একটা মামলা দিও প্রিয়, তারিখে তারিখে দেখা তো হবে।”
অধরার সিঁড়ির মাঝখানে দাড়িয়ে বলল,
“আপনাকে যাবজ্জীবন জেল দিবো।”
রুদ্র হেসে বলল,
“তু্ই দিলে না করবো না।”
সন্ধ্যার সময় আরমান নেওয়াজ আর আরিফ নেওয়াজ এলেন। দুজনেই ফ্রেশ হয়ে নিচে এসে বসলেন। অনিমা আর রুকাইয়াও বাড়িতে এসে পড়েছে। আরিফ নেওয়াজ আশেপাশে তাকিয়ে রুদ্রকে খুঁজছেন। কিন্তু ও বাড়িতে নেই। ইফতির সাথে দেখা করতে গিয়েছে।
অধরা আর সোহা ছাদে রয়েছে। ছাদের ফুল গাছগুলোর অপ্রয়োজনীয় ডাল পরিষ্কার, গাছের নিচে পরে থাকা শুকনো পাতা সরিয়ে রেখেছে আরও দুই একটা গাছ লাগিয়েছে। এগুলো করতে করতেই ওদের সন্ধ্যা হয়ে যায়। দুজনেই কাজ শেষ করে ছাদের পানির কল থেকে হাত ধুয়ে, ওখানেই বসেছিলো। সোহা আবার থেকে থেকে আদ্রর সাথে মেসেজ করছিলো। অধরা কালকে থেকে আজ পর্যন্ত আদ্রর সাথে কথা বলেনি। খুব বড়সড়ো রাগই করেছে।
রুদ্র কল দিলো অধরার ফোনে। অধরা মুচকি হেসে কলটা রিসিভ করে কানে নিলো। রুদ্র আগেই কথা বলল না। কালকের মতো যদি আরিফ নেওয়াজ থাকে তখন আবার কি বলবে। অধরা হ্যালো বলতেই রুদ্র মনে মনে হাফ ছেড়ে বলল,
“অধরা কি করছিস?”
“ছাদে বসে আছি।”
“তু্ই কি একা?”
“না সোহা আছে।”
“একটু সাইডে যা তো।”
অধরা উঠে দোলনায় গিয়ে বসলো। রুদ্র বলল,
“তোর সাথে ইফতি কথা বলবে।”
“আমার সাথে?”
“হুমম।”
“কি বলবো আমি।”
রুদ্র ইফতিকে ফোনটা দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। ইফতি শুরুতেই বলল,
“অধরা ভালো আছো?”
“হুমম। আপনি?”
“ভালো। আসলে তোমার সাথে কথা বলবো বলবো ভাবছিলাম কিন্তু হয়ে উঠছিলো না। আসলে আমি সেদিন কথাগুলো যে বলেছিলাম, তোমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য বলিনি। জাস্ট রুদ্রকে বোঝানোর জন্যই বলেছিলাম। কথাগুলোর জন্য যে তুমি কষ্ট পাবে সেটা কখনোই চাইনি। এর জন্য আমি সরি অধরা।”
“সরি বলতে হবে না। আমি কিছু মনে করিনি।”
ওদের কথা হতে হতে রুদ্র একটু দূরে গেলো। ইফতি অধরাকে বলল,
“অধরা আরেকটা কথা বলবো?”
“বলুন।”
ইফতি অবলীলায় বলে উঠল,
“রুদ্র তোমাকে অনেক ভালোবাসে। আমি ওর বন্ধু হিসেবে বলছি ও না আগে কোনো মেয়েকে এতটা ভালোবাসেনি বা সেরকম কোনো কিছু ওর জীবনে ঘটেনি। তোমাকে ও এক দেখার পরে এতো ভালোবাসবে আমিও ভাবতে পারিনি। খুব ভালোবাসে ও তোমাকে। আমিও এই নিয়ে সেদিন কথা বললাম ওকে। আর তুমি শুনে নিলে। আমি আবারও এর জন্য সরি অধরা।”
অধরা হালকা হেসে বলল,
“ভাইয়া আর সরি বলবেন না। আমি কিছু মনে করিনি।”
রুদ্র এসে ইফতিকে বলল,
“কিরে কথা বলা হয়নি?”
“হয়েছে।”
ইফতি অধরাকে বলল,
“অধরা যা বললাম সেগুলো সত্যিই। তুমি কখনও ঠকবে না। আর কালকে আমার ফ্লাইট। আমার জন্য দোয়া করো।”
“অবশ্যই। দোয়া রইলো আপনার জন্য। ভালো ভাবে থাকবেন।”
“হুম। তাহলে রাখছি হ্যা। ভালো থেকো।”
“আচ্ছা। আপনিও ভালো থাকবেন।”
ইফতি ফোনটা রুদ্রকে দিয়ে দেয়। রুদ্র অধরাকে বলল,
“তাহলে পরে কথা বলবো রাখছি। আর মাকে বলে দিস রাত হবে ফিরতে।”
“ঠিক আছে।”
রুদ্র কল কেটে দিয়ে গাড়িতে উঠে বসলো। ইফতিও উঠে ডেস্কে তাকিয়ে বলল,
“এখন বেলী ফুল আনতে গিয়েছিলি তাইনা।”
“হুমম।”
অধরা ছাদে থেকে আসার আগ দিয়ে ঝরে যাওয়া গোলাপ ফুলের পাঁপড়িগুলো দিয়ে দোলনায় R+A লিখে রেখে গেলো। ওর আর রুদ্রর নামের ফার্স্ট লেটার। কিন্তু কি যেনো মনে করে লিখাটা নষ্ট করে লিখলো, চোর-R, লেখা পড়ে নিজেই হাসতে হাসতে সোহার কাছে এলো। আদ্র আবার কলে ছিলো। সোহা বলল,
“আদ্র ভাই কথা বলবে তোমার সাথে।”
অধরা সুযোগ হাতছাড়া করলো না। মুখের উপরে বলে দিলো,
“আমি কেনো কথা বলবো? ও কম মারে আমাকে।”
আদ্র ওপাশে থেকে বলল,
“বাড়ি গেলে আরও মার খাবি।”
অধরা বলল,
“এসো না শুধু। আমি সবাইকে বলে দিবো তোমরা প্রেম করছো।”
………………………….
রাতে যখন রুদ্র ছাদে এলো তখন দোলনায় বসতে গিয়ে চোর-R লেখাটা দেখে কিছুক্ষন ভাবলো এটার মানে কি? পরক্ষনেই মনে পড়লো অধরাই ওকে চোর চোর বলে। আর এখানে ওর নামের ফার্স্ট লেটারও লিখে রেখে গিয়েছে। রুদ্র পাঁপড়িগুলো সরিয়ে বসলো। এরপরে অধরাকে কল দিলো। অধরা রিসিভ করলো। রুদ্র কয়েক সেকেন্ড চুপ রইলো। এরপরে অধরার কণ্ঠ পেয়েই বলল,
“অধরা।”
“হ্যা বলুন!”
“কি করছিস?”
“শুয়ে পড়বো এখন।”
“ওহ। খেয়েছিস?”
“হুমম। আপনি?”
“হুমম। আচ্ছা সোহা তোর পাশে শুয়েছে কি?”
“নাতো।”
“তাহলে একটু ছাদে আয়। একটা জিনিস দেখাবো।”
“পারবো না এখন। ছবি তুলে দেন দেখি।”
“না তু্ই আয়। আমি একা একা জিনিসটা দেখছি তাই তোকেও ডাকছি। বেশি সময় লাগবে না, জাস্ট আসবি, দেখবি, চলে যাবি।”
“ঠিক আছে আসছি।”
অধরা ফোনটা রেখে চলে গেলো ছাদে। রুদ্র অধরাকে পাশে বসতে বললে অধরা বলল,
“কি যেনো দেখাবেন বলছিলেন।”
“কই কি দেখাবো?”
“আপনি না বললেন।”
“আমার পাশে বস। তাহলে দেখাবো।”
“পারবো না। এমনে দেখালে দেখান নাহলে চলে গেলাম।”
রুদ্র অধরার হাত টান দিয়ে পাশে একটু দূরত্ব রেখেই বসালো। নাহলে অধরা আবার বলতেও পারে অসস্তি হচ্ছে। রুদ্র ঘাড় ঘুরিয়ে অপলক দৃষ্টিতে অধরার দিকে তাকিয়ে রইলো। অধরা এই রুদ্রর দিকে তাকাচ্ছিলো, আবার নিচের দিকে নয়তো ডানেবামে। এরপরে রুদ্রর এই দৃষ্টি সরাতে আবারও বলল,
“আচ্ছা কি যেনো দেখাবেন বলছিলেন?”
রুদ্র হেয়ালি কণ্ঠে বলল,
“যা দেখাতে চেয়েছিলাম তা চলে গিয়েছে।”
“একটু ধরে রাখতেন।”
রুদ্র হেসে বলল,
“তোকে রাখি। যদি চাস তু্ই!”
“আমি সেটা বলিনি তো। আমি….”
রুদ্র ওকে থামিয়ে দিয়ে জড়ানো গলায় বলল,
“অধরা তু্ই যদি একবার এই রুদ্রর কাছে থাকার বায়না ধরিস তাহলে এই রুদ্র নেওয়াজ দুনিয়ার বিপক্ষে গিয়ে হলেও তোকে ধরে রাখবে।”
অধরা পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো রুদ্রর দিকে। খুব করে রুদ্রর হাতটা একবার ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করছে ওর। রুদ্র দোলনার মাঝখানে রাখা অধরার হাতের উপরে হাত রাখলো। অধরা চোখ বন্ধ করে রইলো কয়েক সেকেন্ড। মনে মনে যা চেয়েছিলো তাই পেলো। অবশ্য খুশিও হয়েছে।
চলবে....