#প্রণয়বেলায়_তোমার_আগমন (৪৫)
#জেরিন_আক্তার
সকাল সকাল আদ্র ঘুম থেকে উঠে ড্রইং রুমে এসে বসলো। তারপরে অনিমা নিচে নেমে আদ্রকে বললেন,
“কিরে তোর শরীর কেমন এখন?”
আদ্র নরম গলায় বলল,
“একটু ভালো। তবে কেমন যেনো শরীর ম্যাচম্যাচ করছে। ভালো লাগছে না।”
অনিমা আদ্রর কপালে হাত রেখে দেখলো জ্বর আছে নাকি। কিন্তু নেই। তিনি বললেন,
“জ্বরও তো নেই বাবা। তু্ই ভালো ডাক্তার দেখাতে যা।”
“মেঝো আম্মু কালকে ডাক্তার দেখিয়ে ওষুধ নিয়ে এসেছি। খেয়েছি তাই একটু ভালো।”
অধরা নিচে নেমে এসে আদ্রর কাছে এসে বলল,
“কি হয়েছে আম্মু?”
“তোর আদ্র ভাইয়ের শরীর ভালো লাগছে না।”
অধরা বলল,
“এখনও ঠিক হয়নি? কি হলো?”
আদ্র মনে মনে বলল—তোর অভিনয় জাস্ট অস্থির রে। নিশ্চই নাটক করলে এতদিনে অ্যাওয়ার্ড পেতিস অনেকগুলো।
রুদ্র নিচে এলো, অধরার দিকে তাকিয়ে আদ্রর পাশে বসলো। আদ্রকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পরখ করলো। এরপরে আর মাথা ঘামালো না।
…..
রুদ্র আর আরিফ নেওয়াজ খাবার খাচ্ছে। আদ্র নিচে নেমে রুদ্রকে বলল,
“ভাইয়া, আজকেও আমি যেতে পারবো না। শরীরটা ঠিক নেই।”
রুদ্রর আগে আরিফ নেওয়াজ বললেন,
“ঠিক আছে রেস্ট নাও। আমাদের কাজের এতো দরকার নেই যে তোমার অসুস্থ শরীর নিয়ে কাজ করতে হবে। আমরা ম্যানেজ করে নিবো। দরকার হলে তুমি ডক্টরের কাছে যাও আবার। অসুস্থ শরীর নিয়ে বসে থাকা ঠিক না।”
অনিমা বললেন,
“ওষুধ তো খাচ্ছেই। এর উপরে দিয়ে আবার ওষুধ আনতে যাবে কেনো? ওগুলোই খেয়ে দেখুক।”
আরিফ নেওয়াজ বললেন,
“আজকের দিন খেয়ে দেখো। তোমার মেঝো আম্মু তো বড় ডাক্তার, সে তো বললই।”
অনিমা চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে রইলেন আরিফ নেওয়াজের দিকে। আদ্র মাথা নাড়িয়ে বলল,
“ঠিক আছে।”
সন্ধ্যার আগ দিয়ে রুদ্র আরিফ নেওয়াজ ফিরে এলেন। রুদ্র রুমে এসে অধরাকে না পেয়ে ডাকতে থাকলো। অধরা কোথায় থেকে যেনো দৌড়ে এলো। রুদ্রর সামনে দাড়িয়ে বলল,
“চলে এসেছেন?”
“হুমম। কোথায় গিয়েছিলি?”
“ছাদে আপনার জামাকাপড় মেলে দিয়েছিলাম সেগুলো আনতে।”
“ওহহ।”
অধরা রুদ্রর শার্ট-প্যান্টগুলো সোফায় রেখে দিয়ে বলল,
“ফ্রেশ হয়ে নিন।”
“হুমমম।”
রুদ্র শাওয়ার নিয়ে বের হয়ে এসে জামাকাপড় পড়ে নিচে আসে। অধরা বাধ্য বউয়ের মতো রুদ্রকে পরম যত্নে খাবার বেড়ে দিলো। রুদ্র খাবার খেয়ে আবার রুমে ফিরলো। অধরাও ফিরলো। রুদ্র বিছানায় হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে বসে সোহাকে কল দিলো। সোহা রিসিভ করে বলল,
“হ্যালো ভাইয়া কেমন আছো?”
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো। তু্ই কেমন আছিস?”
“আলহামদুলিল্লাহ।”
“কি করছিস?”
“কিছুনা বসে আছি। তুমি কি করছো?”
“আমিও বসে আছি।”
“ভাইয়া অধরা আপু কোথায়?”
“পাশেই আছে। কথা বলবি?”
“হ্যা একটু দাও!”
রুদ্র অধরার দিকে ফোনটা দিয়ে দিলো। অধরা কানে নিয়ে বলল,
“হ্যা সোহা বল!”
“আপু আদ্র ভাই বলল সে নাকি অসুস্থ?”
“হুমম। ঠিকই বলেছে।”
“আব্বু ফিরে এলেই বলবো চলে যাবো। আমার ভালো লাগছে না।”
একথা শুনে রুদ্র বলল,
“অধরা তোর খালাতো বোন, মানে আদ্রর হবু বউকে বলেছিস? ও এসে আদ্রকে দেখে যেতো।”
অধরা চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে ব্যালকনিতে চলে গেলো। সোহাকে বলল,
“নারে সোহা ঝিলিক আসবে না। ওর এক্সাম শুরু হয়েছে।”
“ওহ। আমি আব্বুকে বলে চলে আসবো।”
“ঠিক আছে। তাহলে রাখছি।”
অধরা কল কেটে দিয়ে রুমে ফিরে এসে রুদ্রকে বলল,
“আপনি জানেন না আদ্রকে ভালোবাসে। ওদের প্রেম চলে জানেন না?”
রুদ্র না বোঝার ভান করে বলল,
“তাই নাকি? আগে তো জানতাম না।”
“আপনি জানতেন, পইপই করে বলে বুঝিয়েছি। তাও ওদের মাঝে ঝিলিকের নাম নেন।”
অধরা বিছানার এককোণে বুকে হাত গুজে বসে রইলো। রুদ্র এগিয়ে এসে হেসে বলল,
“রাগ করেছিস?”
অধরা কিছু বলল না। অন্যদিক ঘুরে রইলো। রুদ্র বৃদ্ধাঙুল দিয়ে কপাল ঘষতে ঘষতে বলল,
“যা সরি আর বলবো না।”
“এই টুকুতে আমার রাগ ভাঙবে না।”
রুদ্র অধরার গালে চুমু দিয়ে বলল,
“এবার রাগ কমেছে?”
“উহু।”
“তো কি করলে কমবে?”
“সোহাকে বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে আসুন। আর আদ্র, সোহার বিয়ের ব্যাপারে কথা বলবেন। ওদের বিয়েটা যেনো তাড়াতাড়ি হয় সাহায্য করবেন।”
এই শুনে রুদ্র বলল,
“পারবো না। তু্ই ওদের প্রেমে ওকালতি করেছিস তুইই ওদের বিয়েতে সাহায্য করবি। আমি ওসব পারবো না।”
অধরা ঘাড় ঘুরিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে বলল,
“পারবেন না?”
“না।”
“পারবেন না?”
“না।”
“আরেকবার বলবো পারবেন না?”
“পারবো না।”
অধরা উঠে গট গট করে চলে যেতে যেতে বলল,
“পারতে হবে না। থাকুন আপনি।”
রুদ্রও বলল,
“হ্যা পারবোই না। যা যা।”
মিনিট দুই যাওয়ার পরে রুদ্র বুঝলো তার আতঙ্ক আসলেই রেগে গিয়েছে। ভাবলো, ও রাগ করতে থাকুক, একটু পরে নাহয় রুমে নিয়ে আসবে।
এদিকে আদনান নেওয়াজ বাসায় ঢোকার পরপরই সোহা রুম থেকে বেরিয়ে তার সামনে এলো। কিছু একটা বলার জন্য দাঁড়িয়ে রইলো। আদনান নেওয়াজ মেয়ের চোখ-মুখ দেখে বললেন,
“তোমার মন খারাপ নাকি? কি হয়েছে?”
“আব্বু একটা কথা বলি?”
“হ্যা বলো না।”
“আব্বু বাড়িতে যাবো।”
“এলে দুদিন হলো আর এই বলছো চলে যাবে?”
সোহা নিচু গলায় বলল,
“হুমম। ভালো লাগছে না।”
“থাকতে থাকতে ভালো লেগে যাবে।”
“না আব্বু আমি চলে যাবো।”
আদনান নেওয়াজ বসলেন। সোহা এগিয়ে এসে বলল,
“আব্বু শুনলাম আদ্র ভাই আজ দুদিন ধরে অসুস্থ।”
আদনান নেওয়াজ বুঝলেন ওর ভালো না থাকার কারণই আদ্র। অবশ্য রুদ্র কল দিয়ে বলেছে আদ্র অসুস্থ।
তিনি স্বাভাবিক গলায় বললেন,
“ঠিক আছে যেও।”
সোহা আশাবাদী হয়ে বলল,
“কবে যাবো?”
“ভেবে জানাচ্ছি।”
“ঠিক আছে।”
আদনান নেওয়াজ আবার রুদ্রকে কল দিয়ে শুনলেন সোহাকে কবে পাঠাবেন। রুদ্র বলল ও ভেবে জানাবে।
…..
রাত ১০ টা,
অধরা চকলেট খেতে খেতে টিভি দেখছে। সবাই রুমে চলে গিয়েছে। রুদ্র নিচে এসে সোজা অধরার কাছে এসে বসলো। অধরা মুখ ভেঙচি দিয়ে টিভির দিকে তাকালো। রুদ্র বলল,
“রুমে চল!”
“যাবো না।”
“কেনো?”
অধরা রুদ্রর দিকে না তাকিয়ে বলে দিলো,
“যে স্বামী তার স্ত্রীর কথা শুনে না, আমি তার ঘরে গিয়ে কি করবো? সে থাকুক তার জেদ নিয়ে।”
রুদ্রর নিজের কপাল নিজেরই চাপড়াতে ইচ্ছে করছে। কেনো যে তখন ওর সাথে জেদ দেখাতে গেলো। এখনও রেগে আছে। রুদ্র অধরার হাত ধরে বলল,
“ওদের বিয়ে ওরাই বাড়িতে বলুক আমাদের কি?”
অধরা এবার ওর দিকে ঘুরে পা উঠিয়ে বসে বলল,
“আমাদের কি মানে? আপনার কথায় চাচ্চু সোহাকে নিয়ে গিয়েছে।”
রুদ্র বলল,
“তু্ই কি করে জানলি আমার কথায় নিয়ে গিয়েছে?”
“কি মনে করেছেন আমি জানবোনা। সেদিন চাচ্চু যে ডেকে নিয়ে গেলো। তারপরে আবার বড় আম্মু আপনাকে ডাকতে এসেছিলো। আমাকে বলেছিলো আপনাকে ডেকে নিয়ে আসতে। আমি আপনাকে ডাকতে গিয়েই শুনেছি।”
রুদ্র অবাক কণ্ঠে বলল,
“তাও আমাকে বলিসনি কেনো?”
অধরা বলল,
“এসব রাখুন। আপনি যেহেতু সোহাকে নিয়ে যেতে বলেছেন এখন আপনিই সোহাকে এনে দিবেন।”
“যা দিবো। এখন রুমে চল!”
“আমাকে ছুঁয়ে বলুন!”
রুদ্র হেসে অধরাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“যা ছুঁয়ে না জড়িয়ে ধরেই বললাম সোহাকে এনে দিবো।”
অধরা চকলেট রেখে রুদ্রর পিঠে হাত উঠিয়ে বলল,
“জানেন ভালোবাসার মানুষ দূরে থাকলে কতটা কষ্ট লাগে। আমারও কষ্ট লেগেছে কারো জন্য। সে বুঝতে বুঝতে অনেক দেরি করে ফেলেছে। এখন তাকে পেয়েছি আমি। সবশেষে আলহামদুলিল্লাহ।”
রুদ্র নিরেট কণ্ঠে বলল,
“তোকে ছেড়ে আর কোথাও যাবো না, আই প্রমিস।”
রুদ্র অধরাকে ছাড়িয়ে টিভি টা অফ করলো। এরপরে অধরাকে পাঁজা কোলে তুলে নিয়ে উপরে গেলো।
পরদিন সন্ধ্যার দিকে রুদ্র বেরোলো সোহাকে আনতে। কাউকে বলে যায়নি সোহাকে আনতে যাবে। অধরা আর ওর মাকে বলে গিয়েছে বন্ধুদের সাথে দেখা করতে গিয়েছে।
রাত ৯ টার দিকে ফিরলো। সোহাকে নিয়ে। অধরা রুমে ছিলো। রুদ্র সোহাকে নিয়ে উপরে এলো। কোনো শব্দ না করে সোহাকে বলল,
“যা অধরার সাথে কথা বল। তোকে দেখলে খুশি হবে।”
সোহা দেরি না করে রুমে ঢুকে অধরাকে পেছনে থেকে জড়িয়ে ধরে রইলো। অধরার বুঝতে বাকি নেই কে ধরেছে। সোহাই ধরেছে নিশ্চই। অধরা সোহাকে দেখে খুবই খুশি হলো। ওকে জিজ্ঞাসা করলো,
“কিরে তু্ই এলি কে নিয়ে এলো তোকে? নাকি চাচ্চু এসেছে?”
“রুদ্র ভাইয়া নিয়ে এসেছে।”
“সে না বলল বন্ধুদের সাথে দেখা করতে গিয়েছে।”
“মিথ্যে বলেছে তোমাকে সারপ্রাইস দিতে।”
রুদ্র রুমে ঢুকে অধরাকে বলল,
“তোকে আমি সারপ্রাইস দিলাম এখন তু্ই সোহাকে নিয়ে গিয়ে আদ্রকে সারপ্রাইস দে।”
অধরা রুদ্রর দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে সোহাকে নিয়ে বেরিয়ে গেলো। রুদ্র পেছনে থেকে অধরাকে বলল,
“একটু তাড়াতাড়ি আসবেন রুমে। আপনাকে এখন রুদ্র নেওয়াজের ভীষণ প্রয়োজন।”
রুদ্র শুনতে পেয়ে মুচকি হেসে সোহার হাত ধরে আদ্রর রুমের উদ্দেশ্যে হাঁটা দিলো।
চলবে....