তোমারই হাত ধরে রবের পথে
পর্ব–১
সকাল সাড়ে আটটা।
ঢাকার ব্যস্ত রাস্তাগুলো তখন গাড়ির হর্ন আর মানুষের কোলাহলে মুখর। কেউ অফিসে ছুটছে, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে, কেউবা নিজের জীবনের স্বপ্ন পূরণের দৌড়ে ব্যস্ত।
একটি কালো রঙের প্রাইভেট কার এসে থামল একটি নামকরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে।
গাড়ির দরজা খুলে নামল একটি মেয়ে।
সাদা স্নিকার্স, নীল জিন্স, কালো ওভারসাইজ শার্ট, চোখে কালো সানগ্লাস। আত্মবিশ্বাসে ভরা তার প্রতিটি পদক্ষেপ।
মেয়েটির নাম মাহিরা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সবাই তাকে চেনে।
কেউ তার সৌন্দর্যের জন্য, কেউ তার তীক্ষ্ণ কথাবার্তার জন্য, আবার কেউ তার রাগী স্বভাবের জন্য।
— "এই মাহিরা!"
পেছন থেকে ডাক দিল তার বান্ধবী তানহা।
মাহিরা ঘুরে দাঁড়াতেই তানহা দৌড়ে এসে বলল,
— "আজকে কিন্তু ক্লাস বাদ। সবাই মিলে নতুন ক্যাফেতে যাবো।"
মাহিরা হেসে বলল,
— "ক্লাস করে কী হবে? জীবন একটাই, এনজয় করতে হবে।"
কথাটা শুনে সবাই হেসে উঠল।
হাঁটতে হাঁটতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল গেটের কাছে আসতেই দেখতে পেলেন একজন মধ্যবয়সী মানুষ। সাদা পাঞ্জাবি, মাথায় টুপি, মুখভর্তি সুন্নতি দাঁড়ি। হাতে কয়েকটি ইসলামিক বই।
তিনি কারও সঙ্গে জোর করে কথা বলছিলেন না। শুধু আগ্রহীদের হাতে একটি ছোট বই তুলে দিচ্ছিলেন।
মাহিরার এক বান্ধবী ফিসফিস করে বলল,
— "দেখ... আবার শুরু হয়েছে।"
অন্যজন হেসে বলল,
— "এদের দেখলেই আমার ঘুম পায়।"
মাহিরা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
— "চলো, না হলে আবার একটা বই ধরিয়ে দেবে।"
সবাই হেসে দ্রুত সেখান থেকে চলে গেল।
লোকটি শুধু তাদের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
— "আল্লাহ তোমাদের হেদায়াত দান করুন।"
কথাটা মাহিরার কানে গেলেও সে কোনো গুরুত্ব দিল না।
বরং বন্ধুদের উদ্দেশে বলল,
— "দেখেছো? এরা সবাই ভাবে, পৃথিবীর সব ভালো মানুষ শুধু ওরাই!"
আবারও হাসির রোল উঠল।
কিন্তু ভাগ্যের লিখন মানুষ জানে না।
আজ যেই কথাগুলো বলে মাহিরা হাসছে, একদিন ঠিক সেই কথাগুলো মনে করে সে নিজেই অশ্রু ফেলবে।
...
শহরের অন্য প্রান্তে।
একটি ছোট্ট, পরিপাটি কক্ষে বসে আছে এক যুবক।
চারপাশে বইয়ের তাক।
ইসলামিক ইতিহাস, কুরআনের তাফসির, হাদিসের গ্রন্থ, আর নিজের লেখা পাণ্ডুলিপির স্তূপ।
টেবিলের ওপর খোলা ল্যাপটপ।
সেখানে লেখা—
"মানুষকে বদলাতে চাইলে প্রথমে তাকে ভালোবাসতে শিখুন। কারণ কঠোর ভাষা মানুষকে দূরে সরিয়ে দেয়, কিন্তু উত্তম চরিত্র মানুষকে আল্লাহর পথে ফিরিয়ে আনে।"
শেষ লাইনটি লিখে যুবকটি গভীর শ্বাস ফেলল।
তার নাম—
মুসআব।
পেশায় একজন ইসলামিক লেখক।
দেশের বিভিন্ন প্রকাশনী থেকে তার বই প্রকাশিত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তার লেখার অসংখ্য পাঠক।
কিন্তু পরিচিতি নয়, তার সবচেয়ে বড় পরিচয়—সে চায় তার লেখার মাধ্যমে অন্তত একজন মানুষও যদি আল্লাহর পথে ফিরে আসে, তবেই তার কলম সার্থক।
সে জানে না...
পৃথিবীর কোথাও একজন মেয়ে আছে, যে দাঁড়ি-টুপি দেখলেই বিরক্ত হয়, দ্বীন নিয়ে ঠাট্টা করে, আর ইসলামিক লেখকদেরও পুরোনো চিন্তার মানুষ মনে করে।
আর সেই মেয়েটিই একদিন তার জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয়ে উঠবে।
দুটি ভিন্ন পৃথিবী...
দুটি ভিন্ন চিন্তাধারা...
দুটি ভিন্ন জীবন...
কিন্তু আসমানের মালিক যখন দুটি ভাগ্যকে এক সুতোয় বেঁধে দেন, তখন হাজারো দূরত্বও তাদের গল্প লেখা থামাতে পারে না।
চলবে...