তোমারই হাত ধরে রবের পথে
পর্ব–২
> "যে ভালোবাসা রবের সন্তুষ্টির জন্য অপেক্ষা করতে জানে, সেই ভালোবাসাই একদিন জান্নাতের দরজা পর্যন্ত হাত ধরে নিয়ে যায়।"
ফজরের আজান ভেসে আসতেই পুরো মহল্লাটা যেন এক অন্যরকম প্রশান্তিতে ভরে উঠল। চারপাশে এখনো সূর্যের আলো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। গাছের পাতায় জমে থাকা শিশিরবিন্দুগুলো হালকা বাতাসে কেঁপে উঠছে। দূরে কোথাও কয়েকটা পাখি ডাকছে। এমন ভোরে পৃথিবীকে দেখে মনে হয়, আল্লাহ যেন নতুন করে সবকিছুকে রহমতের চাদরে ঢেকে দিয়েছেন।
মুসআবের ঘুম ভাঙল আজানের প্রথম ধ্বনিতেই। বিছানা ছেড়ে উঠে বসে কিছুক্ষণ চুপচাপ চোখ বন্ধ করে রইল। তারপর আস্তে করে বলল,
— "আলহামদুলিল্লাহিল্লাযি আহইয়ানা..."
ঘুম থেকে জাগার দোয়া পড়ে ওজু করতে চলে গেল।
মুসআব ছোটবেলা থেকেই এমন। তার বাবা সবসময় বলতেন,
— "দিনের প্রথম ডাক যদি রবের হয়, তাহলে পৃথিবীর কোনো ডাক তার আগে হতে পারে না।"
এই কথাটাই ছেলেটা নিজের জীবনের নিয়ম বানিয়ে ফেলেছে।
নামাজ শেষে সে কিছুক্ষণ কুরআন তিলাওয়াত করল। প্রতিটি আয়াত ধীরে ধীরে পড়ে অর্থ ভাবার চেষ্টা করছিল। তার বিশ্বাস, মানুষের হৃদয়কে বদলানোর শক্তি যদি কোনো কিছুর মধ্যে থাকে, তাহলে তা আল্লাহর কালামেই আছে।
কুরআন বন্ধ করে জানালার পাশে দাঁড়াতেই পূর্ব আকাশটা লালচে রঙে রাঙতে শুরু করেছে।
তার মনে অজান্তেই ভেসে উঠল বাসস্ট্যান্ডে দেখা সেই মেয়েটির মুখ।
এক মুহূর্ত।
শুধু এক মুহূর্ত।
তারপরই নিজের মনকে শক্ত করল।
— "হে আল্লাহ, আমার অন্তরকে আপনার জন্যই পবিত্র রাখুন। যদি কোনো কিছু আমার জন্য কল্যাণকর হয়, আপনি নিজেই তা হালাল পথে আমার কাছে পৌঁছে দিন।"
ইস্তিগফার পড়তে পড়তে সে নিচে নেমে এল।
---
অন্যদিকে...
আয়াতের ঘরেও একই রকম ভোরের ব্যস্ততা।
মা রান্নাঘরে নাস্তা তৈরি করছেন। বাবা নামাজ শেষে তাসবীহ পড়ছেন।
আয়াত নিজের কক্ষে বসে কুরআন তিলাওয়াত করছে।
তার কণ্ঠে ছিল প্রশান্তি। মনে হচ্ছিল, প্রতিটি শব্দ হৃদয় ছুঁয়ে যাচ্ছে।
তিলাওয়াত শেষ করে সে কুরআনটা আলতো করে তাকের ওপর রাখল।
হঠাৎই গতকালের ছোট্ট ঘটনাটা মনে পড়ে গেল।
অপরিচিত এক ছেলে...
অল্প কিছু মুহূর্ত...
একটা টিস্যুর প্যাকেট...
আর ভদ্রভাবে বলা,
— "আপনি চাইলে এটা নিতে পারেন।"
আয়াত নিজের অজান্তেই হালকা হাসল।
পরক্ষণেই নিজেকে ধমক দিল।
— "আয়াত! শয়তান খুব ছোট ছোট বিষয় দিয়েই মানুষের হৃদয়ে প্রবেশ করে। সাবধান হও।"
সে সঙ্গে সঙ্গে "আস্তাগফিরুল্লাহ" পড়তে লাগল।
---
নাস্তার টেবিলে বসতেই বাবা বললেন,
— "মা, আজ কলেজ শেষে সরাসরি বাসায় চলে আসবে। সন্ধ্যায় তোমার খালামণি আসবেন।"
— "জি আব্বু।"
মা মুচকি হেসে বললেন,
— "আর বাইরে বেশি সময় দাঁড়িয়ে থেকো না।"
আয়াত শুধু মাথা নাড়ল।
---
কলেজে যাওয়ার পথে আজও সেই একই বাসস্ট্যান্ড।
আয়াত এসে দাঁড়াল একটু দূরে।
ঠিক কয়েক মিনিট পর...
মুসআবও এসে দাঁড়াল।
দু'জনেই একে অপরকে দেখল।
আবার চোখ ফিরিয়ে নিল।
না কোনো হাসি।
না কোনো অযথা কথা।
শুধু শালীন দূরত্ব।
এটাই যেন দু'জনের নীরব ভাষা।
ঠিক তখনই একজন বৃদ্ধ লোক রাস্তা পার হতে গিয়ে হঠাৎ ভারসাম্য হারিয়ে ফেললেন।
চারপাশে অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে থাকলেও কেউ এগিয়ে এল না।
মুসআব দৌড়ে গিয়ে বৃদ্ধকে ধরে ফেলল।
— "চাচা, সাবধানে..."
বৃদ্ধ কাঁপা কণ্ঠে বললেন,
— "বাবা, আল্লাহ তোমাকে উত্তম প্রতিদান দিন।"
মুসআব হেসে বলল,
— "দোয়া করবেন চাচা।"
দূর থেকে পুরো ঘটনাটা দেখছিল আয়াত।
তার মনে এক অদ্ভুত শ্রদ্ধা জন্ম নিল।
সে ভাবল,
"ভালো মানুষকে চেনার জন্য অনেক কথা লাগে না। কখনো কখনো একটি ছোট কাজই যথেষ্ট।"
---
বাস এসে থামল।
যথারীতি দু'জন আলাদা দরজা দিয়ে উঠে গেল।
মুসআব দাঁড়িয়ে ছিল।
একজন ছোট্ট স্কুলপড়ুয়া ছেলে বাসে উঠতেই বসার জায়গা না পেয়ে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিল।
মুসআব নিজের সিটটা ছেড়ে দিয়ে বলল,
— "এখানে বসো।"
ছেলেটা হেসে বলল,
— "ধন্যবাদ ভাইয়া।"
আয়াত আবারও দেখল।
সে বুঝতে পারল, ছেলেটা কাউকে দেখানোর জন্য ভালো নয়।
ভালো হওয়াটাই যেন তার স্বভাব।
---
কলেজে পৌঁছে আয়াত তার বান্ধবী সুমাইয়ার সঙ্গে ক্লাসে ঢুকল।
সুমাইয়া বলল,
— "তুই আজ এত চুপচাপ কেন?"
— "কই? কিছু না তো।"
— "মিথ্যা বলিস না। তোর মুখই বলে দিচ্ছে কিছু একটা ভাবছিস।"
আয়াত হেসে বিষয়টা এড়িয়ে গেল।
সে কাউকে কিছু বলতে চাইল না।
কারণ নিজের মনকেও তো সে পুরোপুরি বুঝতে পারছে না।
---
অন্যদিকে...
মুসআব বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছে বন্ধু হামজার পাশে গিয়ে বসল।
হামজা হেসে বলল,
— "আজকাল তোকে খুব চিন্তিত লাগে।"
মুসআব শান্ত গলায় উত্তর দিল,
— "মানুষ যত বড় হয়, দায়িত্বও তত বড় হয়।"
হামজা মুচকি হেসে বলল,
— "এই জন্যই তুই আলাদা।"
---
বিকেলের দিকে আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গেল।
ক্লাস শেষ হতেই শুরু হলো প্রবল বৃষ্টি।
সবাই ছুটে আশ্রয় নিচ্ছে।
আয়াতও কলেজের গেটের পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
ঠিক তখনই সে দেখল রাস্তার ওপারে একটি ছোট্ট মেয়ে বৃষ্টির মধ্যে কাঁদছে। তার হাতে থাকা বইগুলো পানিতে ভিজে গেছে।
কিছু বুঝে ওঠার আগেই মুসআব ছুটে গিয়ে নিজের ব্যাগ খুলে বইগুলো ভেতরে রেখে শিশুটিকে রাস্তা পার করিয়ে দিল।
তার জামা পুরো ভিজে গেল।
কিন্তু মুখে কোনো বিরক্তি নেই।
শুধু প্রশান্তি।
দূর থেকে দাঁড়িয়ে থাকা আয়াতের বুকের ভেতরটা কেমন যেন নরম হয়ে এল।
সে ধীরে ধীরে আকাশের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
— "হে আল্লাহ... যদি এই মানুষটিকে আপনি আপনার প্রিয় বান্দাদের একজন বানিয়ে থাকেন, তাহলে তাকে সবসময় হেফাজত করুন।"
সে জানে না কেন এই দোয়া তার ঠোঁটে চলে এল।
হয়তো একজন ভালো মানুষের জন্য দোয়া করতে কোনো পরিচয়ের প্রয়োজন হয় না।
বৃষ্টি তখনও ঝরছে।
কিন্তু দু'জনের মাঝখানে ছিল শুধু দূরত্ব আর লজ্জাশীল নীরবতা।
তারা কেউই জানত না, তাদের জীবনের গল্পের পাতায় আল্লাহ ইতোমধ্যে এমন কিছু লিখে রেখেছেন, যা সময়ের আগে কেউ পড়তে পারে না।
> "সবচেয়ে সুন্দর মিলন সেই, যেখানে আগে ভালোবাসা নয়— আগে রবের সন্তুষ্টি স্থান পায়।"
চলবে...