তোমার ই হাত ধরে রবের পথে
লেখক: নাহিদ মাতাব্বর
পর্ব: ১২
সকালের নরম রোদটা জানালার পর্দা ভেদ করে মাহিরার ঘরে ঢুকছিল। ঘুম ভাঙার পরও সে কিছুক্ষণ বিছানায় চুপচাপ শুয়ে রইল। গতকালের ঘটনাগুলো বারবার মনে পড়ছে। বিশেষ করে মুসআবের সঙ্গে শেষ কথোপকথনটা। সে নিজেই অবাক হচ্ছিল—একজন মানুষের সঙ্গে দু-একবার কথা বললেই কেন তার কথাগুলো এত মনে থাকে?
মাহিরা হঠাৎ উঠে বসে নিজেকেই বলল, “ধুর! মানুষটা ভালো ব্যবহার করেছে, তাই বলে এত ভাবার কী আছে?”
তারপর দ্রুত তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়ল।
কলেজের গেটে পৌঁছাতেই আয়াতকে দেখা গেল। আয়াত দূর থেকেই হাত নাড়ল।
— “এইদিকে আয়!”
মাহিরা কাছে গিয়ে বলল, “কী?”
— “আজ তোকে খুব তাড়াতাড়ি আসতে দেখছি।”
— “বাসায় থাকতে ভালো লাগছিল না।”
আয়াত একটু অবাক হয়ে তাকাল। “কিছু হয়েছে?”
— “না।”
— “আবার?”
মাহিরা হেসে বলল, “তুই না একদম গোয়েন্দা হয়ে যাচ্ছিস।”
দুজন হাঁটতে হাঁটতে ভেতরে ঢুকে গেল।
কিছুদূর যাওয়ার পর আয়াত হঠাৎ থেমে গেল।
— “মাহিরা, একটা কথা বলব?”
— “বল।”
— “তুই কি বদলাচ্ছিস?”
মাহিরা ভ্রু কুঁচকে বলল, “কীভাবে?”
— “আগে কেউ একটু কিছু বললেই তুই ঝগড়া করতিস। এখন অন্তত দুইবার ভাবিস।”
মাহিরা একটু চুপ করে বলল, “হয়তো... বড় হওয়ার চেষ্টা করছি।”
আয়াত মৃদু হেসে বলল, “আলহামদুলিল্লাহ।”
মাহিরা তার দিকে তাকিয়ে বলল, “এত খুশি হচ্ছিস কেন?”
— “কারণ তুই নিজের রাগের বিরুদ্ধে লড়তে শুরু করেছিস।”
মাহিরা আর কিছু বলল না।
ঠিক তখনই সামনে থেকে মুসআব আর হামজাকে আসতে দেখা গেল।
হামজা দূর থেকেই আয়াতকে সালাম দিল। মুসআবও সালাম দিয়ে পাশ কাটিয়ে যেতে চাইল।
কিন্তু আজ মাহিরাই তাকে থামাল।
— “মুসআব ভাই।”
মুসআব থেমে তাকাল।
— “জি?”
মাহিরা একটু ইতস্তত করে বলল, “আপনার কাছে একটা বই আছে না?”
— “কোন বই?”
— “গতকাল যেটা পড়ছিলেন।”
মুসআব একটু ভেবে বলল, “আচ্ছা। ওই বইটা?”
— “হ্যাঁ।”
— “আপনি পড়তে চান?”
মাহিরা সঙ্গে সঙ্গে বলল, “না, মানে... চাইলে দিতে পারেন।”
হামজা মুখ ঘুরিয়ে হাসি চেপে রাখল।
মাহিরা সেটা দেখে বলল, “আপনি হাসছেন কেন?”
হামজা গম্ভীর হয়ে বলল, “না, আমি কিছুই করছি না।”
মাহিরা বলল, “আপনাদের দুজনের ‘কিছু না’ বলার অভ্যাস আছে দেখছি।”
মুসআব মুচকি হেসে বলল, “বইটা আমার কাছে আছে। চাইলে পরে দিতে পারি।”
— “আজ?”
— “আজ সন্ধ্যায় লাইব্রেরিতে থাকব।”
মাহিরা মাথা নাড়ল। “ঠিক আছে।”
মুসআব চলে গেল।
আয়াত ধীরে ধীরে বলল, “তুই বইটা সত্যিই পড়বি?”
মাহিরা বলল, “হ্যাঁ।”
— “নাকি অন্য কোনো কারণ আছে?”
মাহিরা চোখ বড় বড় করে তাকাল। “আয়াত!”
আয়াত হেসে ফেলল।
— “আচ্ছা, কিছু বললাম না।”
---
সেদিন ক্লাসে মাহিরার মন বসছিল না। শিক্ষক বোর্ডে লিখছেন, সবাই নোট নিচ্ছে, অথচ তার মাথায় ঘুরছে একটা কথাই—সন্ধ্যায় লাইব্রেরি।
সে নিজের ওপরই বিরক্ত হয়ে গেল।
“আমি তো বই নিতে যাচ্ছি। এত নার্ভাস হওয়ার কী আছে?”
কিন্তু কেন যেন মনে হচ্ছিল, বিষয়টা শুধু বইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
অন্যদিকে মুসআবও লাইব্রেরিতে বসে বই পড়ছিল। হামজা পাশে এসে বসে বলল, “আজ একটা বই কার জন্য রাখা হয়েছে?”
মুসআব চোখ না তুলে বলল, “কী বলতে চাস?”
— “যে বইটা তুই গতকাল থেকে এত যত্ন করে রাখছিস।”
— “বইটা এমনিতেই ভালো।”
হামজা মুচকি হেসে বলল, “হুম। বুঝলাম।”
মুসআব এবার বই বন্ধ করে বলল, “তুই বেশি ভাবিস।”
— “আর তুই কম ভাবিস?”
মুসআব কিছু বলল না।
হামজা বলল, “যাই হোক, একটা কথা বলি—কাউকে ভালো মনে হওয়া আর তার প্রতি অনুভূতি তৈরি হওয়া এক জিনিস নয়।”
মুসআব শান্ত গলায় বলল, “আমি জানি।”
— “তাহলে ঠিক আছে।”
---
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামল।
লাইব্রেরির ভেতর মানুষের ভিড় কমে এসেছে। মাহিরা ধীরে ধীরে দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। ভেতরে ঢোকার আগে একবার নিজের ওড়নাটা ঠিক করল। তারপর নিজেই বিরক্ত হয়ে বলল, “আমি কী করছি!”
ভেতরে ঢুকতেই দেখল মুসআব এক কোণে বসে আছে।
সে উঠে দাঁড়াল।
— “আপনি এসেছেন?”
মাহিরা মাথা নাড়ল।
— “হ্যাঁ।”
মুসআব ব্যাগ থেকে বইটা বের করে তার দিকে বাড়িয়ে দিল।
— “এই নিন।”
মাহিরা বইটা হাতে নিয়ে মলাটের দিকে তাকাল।
— “কতদিনের জন্য?”
— “যতদিন লাগে।”
— “আপনি কি বই ফেরত নিতে তাড়া দেবেন?”
— “না।”
— “ভালো।”
মুসআব মৃদু হাসল।
মাহিরা কিছুক্ষণ বইটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর বলল, “আপনি কি সত্যিই মনে করেন মানুষ বদলাতে পারে?”
মুসআব এবার একটু গম্ভীর হলো।
— “মানুষ নিজের শক্তিতে সবসময় বদলাতে পারে না। কিন্তু আল্লাহর সাহায্য চাইলে অবশ্যই চেষ্টা করতে পারে।”
মাহিরা নিচু গলায় বলল, “আমি মাঝে মাঝে নিজের ওপর খুব রাগ করি।”
— “কেন?”
— “কারণ আমি রাগের সময় অনেক কিছু বলে ফেলি। পরে মনে হয়, কথাগুলো বলা উচিত ছিল না।”
মুসআব বলল, “ভুল বুঝতে পারা ভালো লক্ষণ।”
— “সবাই তো এটা বলে।”
— “সবাই বললেও সত্যিটা বদলে যায় না।”
মাহিরা তার দিকে তাকাল।
মুসআব ধীরে বলল, “রাগ আসা মানুষের স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু রাগের কারণে অন্যায় করা ঠিক নয়। আপনি যদি প্রতিবার রাগের পর নিজেকে একটু একটু করে ঠিক করার চেষ্টা করেন, একদিন দেখবেন আগের মতো থাকছেন না।”
মাহিরা চুপ করে শুনছিল।
কিছুক্ষণ পর সে বলল, “আপনি কি কখনো রাগেন না?”
মুসআব হেসে বলল, “আমি মানুষ। অবশ্যই রাগি।”
— “তাহলে?”
— “রাগকে আমি সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দিই না।”
কথাটা মাহিরার মনে গভীরভাবে গেঁথে গেল।
“রাগকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দিই না।”
কত সহজ একটা কথা, অথচ তার নিজের জীবনের জন্য কত কঠিন।
মাহিরা বইটা বুকে চেপে ধরে বলল, “চেষ্টা করব।”
মুসআব বলল, “আল্লাহ আপনার চেষ্টা কবুল করুন।”
মাহিরা একটু থেমে বলল, “আমার জন্য দোয়া করবেন?”
মুসআব এক মুহূর্ত নীরব থেকে বলল, “অবশ্যই। আপনি আমার জন্যও করবেন।”
মাহিরা মাথা নাড়ল।
দুজনের মাঝে কিছুক্ষণ নীরবতা নেমে এল।
তারপর মাহিরা চলে গেল।
লাইব্রেরির দরজা দিয়ে বের হওয়ার পর সে থেমে গেল।
তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি।
কোনো উত্তেজনা নয়।
কোনো স্বপ্ন নয়।
শুধু এক ধরনের শান্তি।
সে নিজের মনে বলল, “এই মানুষটার সঙ্গে কথা বললে কেন যেন নিজের ভুলগুলো দেখতে ইচ্ছে করে?”
সে উত্তর পেল না।
---
বাসায় ফেরার পথে আয়াত ফোন করল।
— “কোথায়?”
মাহিরা বলল, “বাসায় যাচ্ছি।”
— “বই পেয়েছিস?”
মাহিরা একটু হেসে বলল, “হ্যাঁ।”
আয়াত কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “মাহিরা?”
— “হুম?”
— “একটা কথা মনে রাখিস।”
— “কী?”
— “কোনো মানুষকে ভালো লাগা বা শ্রদ্ধা করা অপরাধ না। কিন্তু নিজের হৃদয়কে কারও হাতে দেওয়ার আগে আল্লাহর কাছে জিজ্ঞেস করতে হয়—এই মানুষটা আমার জন্য কল্যাণকর কি না।”
মাহিরা চুপ হয়ে গেল।
তারপর বলল, “আমি এখনো কাউকে ভালোবাসি না।”
আয়াত মৃদু হেসে বলল, “আমি তো সেটা বলিনি।”
মাহিরা জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।
তার হাতে মুসআবের বই।
তার মনে মুসআবের কথাগুলো।
আর হৃদয়ের একেবারে অচেনা কোণে জন্ম নিচ্ছে এমন এক অনুভূতি, যার নাম সে এখনো জানে না।
সে শুধু জানে—
মুসআবকে নিয়ে তার আগের ধারণাটা আর আগের মতো নেই।
আর এই পরিবর্তনটাই একদিন তাকে এমন জায়গায় নিয়ে যাবে, যেখানে সে নিজেই আয়াতকে বলবে—
“তুই ওকে নিয়ে ভাবিস না। এমন ছেলেদের প্রেমে পড়া ঠিক না।”
কিন্তু ভাগ্যের সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো—
যে উপদেশ সে একদিন আয়াতকে দেবে, একদিন সেই উপদেশের সবচেয়ে বড় পরীক্ষায় তাকেই পড়তে হবে।
চলবে...