তোমার ই হাত ধরে রবের পথে
লেখক: নাহিদ মাতাব্বর
পর্ব: ১৫
সেদিনের পর থেকে মাহিরা নিজের মধ্যে একটা অদ্ভুত পরিবর্তন টের পাচ্ছিল। মুসআবের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ না পেলেও তার কথা মনে পড়ত। তবে সে এখনো নিজের কাছে স্বীকার করতে রাজি নয় যে এই অনুভূতিটা শুধু শ্রদ্ধা নয়।
অন্যদিকে আয়াতও নিজের মনের কথাটা কাউকে জানায়নি। মুসআবকে দেখলেই তার ভেতরে এক ধরনের শান্ত অনুভূতি তৈরি হয়, কিন্তু সে জানে—সব অনুভূতি প্রকাশ করার জন্য নয়। তাই দূর থেকেই সে মুসআবকে সম্মান করে, তার ভালোটা চায়।
সেদিন দুপুরে তিনজনেরই দেখা হলো কলেজের লাইব্রেরির সামনে।
মুসআব হাতে কয়েকটা বই নিয়ে বের হচ্ছিল। সামনে আয়াতকে দেখে থেমে সালাম দিল।
— “আসসালামু আলাইকুম।”
আয়াত মৃদু হেসে বলল, “ওয়ালাইকুমুস সালাম।”
মাহিরাও পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। সে একটু হেসে বলল, “আজ এত বই?”
মুসআব বলল, “পরীক্ষা সামনে। প্রস্তুতি নিতে হবে।”
মাহিরা বলল, “আপনাকে দেখে মনে হয় আপনি সবসময় পড়াশোনা নিয়েই থাকেন।”
— “সবসময় না।”
— “তাহলে?”
— “মাঝে মাঝে মানুষের সঙ্গে কথাও বলি।”
হামজা দূর থেকে বলে উঠল, “ওই কথাটাও খুব কম বলে!”
মাহিরা হেসে ফেলল।
আয়াতও মুচকি হাসল।
কিন্তু সেই মুহূর্তে আয়াত লক্ষ্য করল—মাহিরার হাসিটা মুসআবের কথা শুনেই এসেছে।
তার বুকের ভেতর অল্প একটা ব্যথা হলো।
সে সঙ্গে সঙ্গে চোখ নামিয়ে নিল।
“আমি কেন কষ্ট পেলাম?”
নিজেকেই প্রশ্ন করল আয়াত।
তার উত্তর জানা ছিল।
কিন্তু সে উত্তরটা স্বীকার করতে চাইল না।
কিছুক্ষণ পর আয়াত বলল, “আমার একটু কাজ আছে। তোমরা কথা বলো।”
মাহিরা অবাক হয়ে বলল, “কোথায় যাচ্ছিস?”
— “একটু লাইব্রেরিতে।”
আয়াত চলে গেল।
মুসআব তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর মাহিরাকে বলল, “আয়াত কি ঠিক আছে?”
মাহিরা বলল, “হ্যাঁ। কেন?”
— “আজ একটু চুপচাপ লাগছিল।”
মাহিরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল, “ও এমনই। নিজের কথা খুব একটা বলে না।”
মুসআব মাথা নাড়ল।
— “কিছু মানুষ নিজের কষ্ট অন্যকে বুঝতে দেয় না।”
কথাটা শুনে মাহিরার মনে হলো, মুসআব যেন শুধু আয়াতের কথা বলছে না। যেন কথাটা তার নিজের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
সে বলল, “আপনিও কি নিজের কষ্ট কাউকে বলেন না?”
মুসআব একটু থেমে মৃদু হেসে বলল, “সব কথা সবাইকে বলতে নেই।”
মাহিরা তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তার মনে হলো, এই মানুষটার ভেতরে এমন অনেক গল্প আছে, যেগুলো সে এখনো জানে না।
---
লাইব্রেরির ভেতরে আয়াত একটা বই খুলে বসেছিল। কিন্তু একটা লাইনও পড়তে পারছিল না।
তার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছিল মাহিরার হাসিমুখ।
মুসআবের সঙ্গে কথা বলার সময় মাহিরার চোখে যে স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা, সেটা আয়াতের চোখ এড়ায়নি।
আয়াত ধীরে বইটা বন্ধ করল।
“হয়তো আমার কিছুই বলা উচিত হবে না।”
তার চোখে পানি চলে এসেছিল, কিন্তু সে দ্রুত চোখ মুছে ফেলল।
“মুসআব যদি মাহিরাকে পছন্দ করে, তাহলে আমি তাদের মাঝে দাঁড়াব না।”
তারপর সে আবার বই খুলল।
“কখনো ভালোবাসার সবচেয়ে কঠিন রূপ হলো—নিজের মনের মানুষটির সুখের জন্য নিজের ইচ্ছেটাকে নীরবে সরিয়ে রাখা।”
আয়াত জানত না, তার এই নীরবতাই একদিন তাকে আরও বড় পরীক্ষার সামনে দাঁড় করাবে।
---
বিকেলে মাহিরা বাসায় ফিরেই নিজের ঘরে ঢুকল।
ব্যাগ থেকে বই বের করতে গিয়ে একটা ছোট কাগজ মাটিতে পড়ে গেল।
সে তুলে দেখল, সেখানে মুসআবের হাতের লেখা।
কয়েকটা সাধারণ কথা।
কিন্তু কাগজটা হাতে নিয়েই মাহিরার মুখে অজান্তে হাসি ফুটে উঠল।
সে আয়নার দিকে তাকিয়ে বলল,
— “তুই কি সত্যিই পাগল হয়ে যাচ্ছিস?”
নিজেই আবার উত্তর দিল,
— “না।”
কিন্তু এবার তার নিজের উত্তরটা নিজের কাছেই বিশ্বাসযোগ্য লাগল না।
সেদিন রাতে মাহিরা অনেকক্ষণ নামাজের পর বসে রইল।
সে আল্লাহর কাছে বলল,
“আল্লাহ, যদি কোনো মানুষ আমার জন্য ভালো হয়, তাহলে তাকে আমার জীবনে হালালভাবে রাখবেন। আর যদি ভালো না হয়, তাহলে আমার মনকে তার থেকে ফিরিয়ে দেবেন।”
এই প্রথম সে মুসআবকে নিয়ে সরাসরি আল্লাহর কাছে কিছু বলল।
আর অন্যদিকে, একই রাতে আয়াতও নিজের ঘরে বসে দোয়া করছিল।
তার দোয়া ছিল আরও নীরব।
“আল্লাহ, আমার মনের কথা আপনি জানেন। আমি কাউকে কষ্ট দিতে চাই না। আমার জন্য যা ভালো, সেটাই লিখে দিন।”
দুটি মেয়ে।
একই মানুষকে ঘিরে দুই রকম অনুভূতি।
একজন নিজের অনুভূতিকে ধীরে ধীরে স্বীকার করতে শুরু করেছে।
আরেকজন নিজের অনুভূতিকে লুকিয়ে রেখে শুধু আল্লাহর ওপর ভরসা করছে।
কেউ জানে না সামনে কী আছে।
তবে গল্পের পথ ইতিমধ্যে বদলাতে শুরু করেছে।
চলবে...