তোমার ই হাত ধরে রবের পথে
লেখক: নাহিদ মাতাব্বর
পর্ব: ১৬
সকালের ক্লাস শেষ হওয়ার পর আয়াত আর মাহিরা করিডোর দিয়ে হাঁটছিল। সামনে কয়েকজন ছাত্রছাত্রী দাঁড়িয়ে কথা বলছিল। তাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মুসআবও অন্য দিক থেকে আসছিল। মাহিরা একবার স্বাভাবিকভাবেই তার দিকে তাকাল।
মুসআব তাদের দিকে তাকাল না। নিজের পথেই হাঁটতে হাঁটতে পাশ কাটিয়ে চলে গেল।
মাহিরা কয়েক সেকেন্ড তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।
আয়াত সেটা লক্ষ্য করল।
— “কী দেখছিস?”
মাহিরা সঙ্গে সঙ্গে চোখ ফিরিয়ে বলল, “কিছু না।”
আয়াত হেসে বলল, “আবার ‘কিছু না’!”
মাহিরা একটু চুপ করে থেকে বলল, “একটা বিষয় লক্ষ্য করেছিস?”
— “কী?”
— “মুসআব কাউকে অযথা তাকায় না।”
আয়াত মৃদু হেসে বলল, “হ্যাঁ। আমিও লক্ষ্য করেছি।”
মাহিরা ধীরে বলল, “আজকাল এমন ছেলেও আছে, ভাবতেই অবাক লাগে।”
আয়াত কিছু বলল না।
মাহিরা আবার বলল, “মানে... ভালো লাগে ব্যাপারটা।”
কথাটা বলেই সে থেমে গেল।
আয়াত তার দিকে তাকাল।
মাহিরা দ্রুত বলল, “ভালো লাগে মানে ভালো গুণ। অন্য কিছু না।”
আয়াত মৃদু হেসে বলল, “আমি তো কিছু বলিনি।”
মাহিরা এবার চুপ করে গেল।
কিছুক্ষণ পর তারা ক্লাসরুমে ঢুকে পড়ল।
দুপুরের দিকে কলেজের একটা অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি চলছিল। বিভিন্ন বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা কাজ করছিল। মুসআবও ছেলেদের সঙ্গে কিছু কাজ করছিল। মাহিরা দূর থেকে একবার তাকিয়ে দেখল, সে সবার সঙ্গে প্রয়োজনীয় কথা বলছে, কিন্তু মেয়েদের সঙ্গে আলাদা করে কোনো কথা বলছে না।
একজন মেয়ে এসে মুসআবকে একটা ফাইল দিতে চাইল।
মুসআব ফাইলটা নিয়ে শুধু বলল,
— “ধন্যবাদ। এটা অফিসে দিয়ে দেব।”
তারপর সে আবার নিজের কাজে ফিরে গেল।
মাহিরা দৃশ্যটা দেখে অজান্তেই হেসে ফেলল।
আয়াত পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
— “কী?”
মাহিরা বলল, “কিছু না।”
আয়াত বলল, “তোর ‘কিছু না’ আজ অনেক বেড়ে গেছে।”
মাহিরা এবার হেসে বলল, “চুপ কর।”
তারপর একটু থেমে বলল,
— “সত্যি বলছি, ওর এই ব্যাপারটা আমার ভালো লাগে।”
আয়াতের মুখের হাসি একটু ফিকে হয়ে গেল।
সে জানত, মাহিরা এখনো নিজের অনুভূতির গভীরতা বুঝতে পারছে না।
আয়াত ধীরে বলল,
— “মাহিরা, একটা কথা মনে রাখিস।”
— “কী?”
— “কাউকে ভালো মানুষ মনে হওয়া খুব সুন্দর ব্যাপার। কিন্তু নিজের মনকে নিয়ে তাড়াহুড়ো করিস না।”
মাহিরা মাথা নাড়ল।
— “আমি করব না।”
কিন্তু তার চোখ তখনও দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মুসআবের দিকে চলে যাচ্ছিল।
---
সন্ধ্যায় মুসআব বাড়িতে বসে কুরআন পড়ছিল। তার মা এসে পাশে বসলেন।
— “মুসআব?”
— “জি, আম্মু।”
— “তোর পড়াশোনা কেমন চলছে?”
— “আলহামদুলিল্লাহ, ভালো।”
মা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
— “একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”
মুসআব বই বন্ধ করে মায়ের দিকে তাকাল।
— “জি।”
— “তোর বিয়ের ব্যাপারে কখনো ভেবেছিস?”
মুসআব কিছুটা অপ্রস্তুত হলো।
— “এখনো না।”
মা মৃদু হেসে বললেন,
— “এখনই কিছু করতে বলছি না। তবে সময় হলে তো ভাবতেই হবে।”
মুসআব মাথা নাড়ল।
— “যখন সময় হবে, ইনশাআল্লাহ পরিবার যা ভালো মনে করবে, সেটাই হবে।”
মা বললেন,
— “আর তুই কী চাস?”
মুসআব একটু ভেবে বলল,
— “এমন একজন মানুষ, যে দ্বীনের ব্যাপারে আন্তরিক হবে। যার সঙ্গে একে অপরকে আল্লাহর পথে এগিয়ে নিতে পারব।”
মা সন্তুষ্ট হয়ে বললেন,
— “আল্লাহ তোকে উত্তম জীবনসঙ্গী দান করুন।”
মুসআব বলল,
— “আমিন।”
---
অন্যদিকে মাহিরা নিজের ঘরে বসে বই পড়ছিল।
হঠাৎ তার মনে হলো, সে আজ সারাদিন মুসআবকে নিয়ে কতবার ভেবেছে।
সে বই বন্ধ করে নিজের কপালে হাত রাখল।
“এটা ঠিক হচ্ছে না।”
তারপর নিজেই ধীরে বলল,
“আমি তো ওর সঙ্গে ঠিকমতো কথাই বলি না। তাহলে এত ভাবছি কেন?”
সে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
বাইরে রাতের আকাশ।
মাহিরা মনে মনে বলল,
“হয়তো আমি ওর প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছি।”
কথাটা স্বীকার করতেই তার বুকের ভেতর কেমন একটা অদ্ভুত অনুভূতি হলো।
কিন্তু সে সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে মনে করিয়ে দিল—
“না। এখনই কোনো সিদ্ধান্ত না।”
সে আবার জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজ পড়তে দাঁড়াল।
---
পরদিন আয়াত কলেজে এসে দেখল মাহিরা বেশ চুপচাপ।
— “কী হয়েছে?”
— “কিছু না।”
— “আবার?”
মাহিরা এবার হেসে বলল,
— “আচ্ছা, একটা কথা বলি?”
— “বল।”
— “তুই যদি কখনো কাউকে পছন্দ করে ফেলিস, কিন্তু জানিস যে তাকে পাওয়া সম্ভব না—তাহলে কী করবি?”
আয়াতের বুকটা কেঁপে উঠল।
কারণ প্রশ্নটা যেন তার নিজের জীবনেরই প্রশ্ন।
তবু সে শান্ত গলায় বলল,
— “আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেব।”
মাহিরা বলল,
— “আর যদি খুব কষ্ট হয়?”
আয়াত একটু নিচের দিকে তাকিয়ে বলল,
— “তাহলেও।”
মাহিরা তার হাত ধরল।
— “তুই অনেক শক্ত।”
আয়াত মৃদু হেসে বলল,
— “না। আমি শুধু বিশ্বাস করি, আল্লাহ যা রাখেননি, সেটা জোর করে পাওয়ার চেষ্টা করা উচিত না।”
মাহিরা কিছু বলল না।
দূরে মুসআব কয়েকজন ছেলের সঙ্গে দাঁড়িয়ে ছিল।
সে একবারও এদিকে তাকাল না।
মাহিরা সেই দৃশ্য দেখে আবার মৃদু হাসল।
তার মনে হলো—
“এই ছেলেটার প্রতি সম্মানটা কেন যেন প্রতিদিন একটু একটু করে বাড়ছে।”
আর আয়াত তখন চুপচাপ দাঁড়িয়ে বুঝতে পারছিল—
তার নিজের হৃদয়ে যে অনুভূতিটা এতদিন লুকিয়ে ছিল, সেটা হয়তো আর খুব বেশিদিন লুকিয়ে রাখা যাবে না।
কিন্তু সে জানে না, সেই অনুভূতি প্রকাশ করার আগেই সময় তাদের তিনজনের জীবনকে কোন দিকে নিয়ে যাবে।
চলবে...