তোমার ই হাত ধরে রবের পথে
লেখক: নাহিদ মাতাব্বর
পর্ব: ৩৪
পরদিন সকাল থেকেই কলেজে একটা অদ্ভুত ব্যস্ততা। সামনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান না থাকলেও বিভিন্ন বিভাগের কাজ নিয়ে সবাই ছুটোছুটি করছে।
মাহিরা আর আয়াত একসঙ্গে ক্লাসে ঢুকল। দুজনের বন্ধুত্ব আগের মতোই আছে, কিন্তু মুসআবকে ঘিরে যে নীরব সত্যটা তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে, সেটা দুজনেই অনুভব করছে।
আয়াত নিজের জায়গায় বসে বই খুলল।
মাহিরা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— “আয়াত?”
— “হুম?”
— “তুই কি আমার ওপর কখনো রাগ করবি?”
আয়াত অবাক হয়ে তাকাল।
— “হঠাৎ এমন কথা বলছিস কেন?”
মাহিরা মৃদু হেসে বলল,
— “এমনি জিজ্ঞেস করলাম।”
আয়াত বলল,
— “তুই এমন কিছু করিসনি যে রাগ করব।”
মাহিরা কিছু বলল না।
তার মনে হলো, ভবিষ্যতে যদি কখনো তাকে আর আয়াতকে একই সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড়াতে হয়, তখন এই বন্ধুত্বটা ধরে রাখা কঠিন হয়ে যেতে পারে।
কিন্তু সে সেই ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনই ভাবতে চাইল না।
---
ক্লাস শেষে মুসআব আর তার বন্ধুরা লাইব্রেরিতে গেল।
হামজা একটা বই খুঁজতে খুঁজতে বলল,
— “মুসআব, তোর কাছে কি ইসলামী ইতিহাসের ওই বইটা আছে?”
মুসআব বলল,
— “আমার কাছে নেই। লাইব্রেরিতে থাকার কথা।”
দুজন আলাদা আলাদা তাক খুঁজতে লাগল।
কিছুক্ষণ পর মুসআব বইটা পেয়ে গেল।
— “এইটা দেখ।”
হামজা বইটা নিয়ে বলল,
— “পেয়ে গেলাম!”
মুসআব হেসে বলল,
— “আলহামদুলিল্লাহ।”
দূরে বসে মাহিরা আর আয়াত নিজেদের পড়াশোনা করছিল।
মাহিরা একবার তাকিয়ে আবার বইয়ে চোখ নামিয়ে নিল।
আয়াত সেটা লক্ষ্য করল।
কিন্তু কিছু বলল না।
---
বিকেলে কলেজ ছুটির পর আয়াত একা বের হচ্ছিল। গেটের কাছে মাহিরা তাকে ধরে ফেলল।
— “আমার সঙ্গে যাবি?”
— “হুম, চল।”
দুজন পাশাপাশি হাঁটতে লাগল।
কিছুক্ষণ পর মাহিরা বলল,
— “আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
আয়াত তাকাল।
— “কী সিদ্ধান্ত?”
— “আমি এখন মুসআবকে নিয়ে আর কোনো স্বপ্ন দেখব না।”
আয়াত থেমে গেল।
— “কেন?”
মাহিরা বলল,
— “কারণ আমি জানি, তুই ওকে কতটা ভালোবাসিস।”
আয়াত কিছু বলতে পারল না।
মাহিরা আবার বলল,
— “আমি চাই না আমার জন্য তোর মনে কষ্ট থাকুক।”
আয়াত ধীরে বলল,
— “মাহিরা, তুই নিজের মনকে জোর করে থামাতে পারবি না।”
— “চেষ্টা তো করতে পারি।”
— “কিন্তু যদি সত্যিই অনুভূতি থাকে?”
মাহিরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
— “তাহলে আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেব।”
আয়াত তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল,
— “আমিও।”
দুজনের কথার শেষে কোনো সিদ্ধান্ত হলো না।
শুধু দুজনেই বুঝল—মুসআবকে নিয়ে তাদের অনুভূতি যতই লুকানো হোক, সেটা আর আগের মতো ছোট কোনো বিষয় নেই।
---
সেদিন রাতে মুসআবের বাবা তার সঙ্গে বসে কিছু পারিবারিক কথা বললেন।
— “তোমার পড়াশোনা কেমন চলছে?”
— “আলহামদুলিল্লাহ, ভালো।”
— “আর দাওয়াতের কাজ?”
— “সেটাও চলছে।”
বাবা সন্তুষ্ট হয়ে বললেন,
— “ভালো। তবে মনে রেখো, দ্বীনের কাজের পাশাপাশি পরিবারের দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ।”
মুসআব মাথা নাড়ল।
— “জি, আব্বু।”
বাবা আর কিছু বললেন না।
কিন্তু মুসআবের মনে কথাটা থেকে গেল।
সে বুঝতে পারল, সামনে জীবনের নতুন কিছু দায়িত্ব আসতে পারে।
এখনও সে জানে না, সেই দায়িত্বের সঙ্গে একদিন মাহিরা, আয়াত আর তার নিজের জীবন কীভাবে জড়িয়ে যাবে।
---
অন্যদিকে মাহিরা রাতে নিজের ডায়েরি খুলে বসেছিল।
অনেকক্ষণ পর লিখল—
“আমি ওকে চাই কি না জানি না। শুধু জানি, ওর মতো হতে ইচ্ছে করে।”
লেখাটা পড়ে সে নিজেই থেমে গেল।
হয়তো এটাই তার অনুভূতির সবচেয়ে সত্য রূপ।
মুসআবকে পাওয়ার চেয়ে তার কাছে মুসআবের চরিত্রটাই বড় হয়ে উঠছে।
আর আয়াত?
সে সিজদায় গিয়ে শুধু বলল,
“আল্লাহ, আমার মনের কথা আপনি জানেন। আমি শুধু চাই, আমার কারণে কারও ক্ষতি না হোক।”
তিনজনের জীবন তিনভাবে এগোচ্ছে।
কেউ নিজের অনুভূতি লুকাচ্ছে।
কেউ নিজের অনুভূতি থেকে সরে আসার চেষ্টা করছে।
আর কেউ কিছুই জানে না।
কিন্তু সময় ধীরে ধীরে এমন এক জায়গায় এগিয়ে যাচ্ছে, যেখানে লুকিয়ে রাখা অনুভূতিগুলো আর এত সহজে লুকিয়ে রাখা যাবে না।
চলবে...!