তোমার ই হাত ধরে রবের পথে
লেখক: নাহিদ মাতাব্বর
পর্ব: ৩৫
পরদিন কলেজে ঢুকেই মাহিরা বুঝতে পারল, আয়াত আজ একটু অস্বাভাবিক চুপচাপ। গতকালের কথাগুলো যেন দুজনের মনেই ঘুরছে।
মাহিরা পাশে বসে বলল,
— “কালকের কথা নিয়ে বেশি ভাবছিস?”
আয়াত বই খুলতে খুলতে বলল,
— “না।”
— “মিথ্যা বলছিস।”
আয়াত হেসে বলল,
— “তুইও তো অনেক কিছু লুকাস।”
মাহিরা এবার চুপ হয়ে গেল।
দুজনেই বুঝল, একে অপরের মনের কথা তারা এখন আগের চেয়ে বেশি বুঝতে পারছে।
কিছুক্ষণ পর মুসআব ক্লাসে ঢুকল। হাতে কয়েকটা বই, সঙ্গে হামজা।
হামজা বলছিল,
— “ভাই, আজকে ক্লাসের পর কিন্তু আমাদের বসতে হবে।”
মুসআব বলল,
— “কাজটা শেষ করে ফেলব ইনশাআল্লাহ।”
সে নিজের জায়গায় বসে পড়ল।
মাহিরা একবার তাকিয়ে আবার খাতায় চোখ রাখল।
আয়াতও কিছু বলল না।
---
ক্লাসের মাঝখানে শিক্ষক সবাইকে একটা দলগত কাজ দিলেন। প্রত্যেক দলকে আলাদা বিষয় নিয়ে প্রস্তুতি নিতে হবে।
মুসআবের দলকে একটা বিষয় দেওয়া হলো, যেটা নিয়ে ভালোভাবে গবেষণা করতে হবে।
হামজা বলল,
— “আজকে তাহলে লাইব্রেরিতে বসতেই হবে।”
মুসআব মাথা নাড়ল।
ক্লাস শেষে তারা লাইব্রেরিতে চলে গেল।
মাহিরা আর আয়াতও সেখানে পড়তে গেল।
লাইব্রেরিতে সবাই নিজের নিজের কাজে ব্যস্ত।
কিছুক্ষণ পর আয়াত একটা বই খুঁজতে গিয়ে তাকের সামনে দাঁড়াল। ঠিক তখন মুসআবও একই তাকের কাছে এসে একটা বই খুঁজছিল।
মুসআব একটু সরে দাঁড়িয়ে বলল,
— “আপনি আগে নিন।”
আয়াত বলল,
— “না, আপনি নিন।”
মুসআব বলল,
— “আমি অন্যটা দেখছি।”
আয়াত বইটা নিয়ে বলল,
— “ধন্যবাদ।”
— “জি।”
মুসআব নিজের কাজে চলে গেল।
আয়াত বইটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর নিজের জায়গায় ফিরে এল।
মাহিরা সবকিছু দেখেছিল।
কিন্তু সে কিছু বলল না।
---
বিকেলে লাইব্রেরি থেকে বের হওয়ার সময় মাহিরা হঠাৎ বলল,
— “আয়াত, তুই কি কখনো ভেবেছিস, মুসআব যদি কোনোদিন জানতে পারে?”
আয়াত থেমে গেল।
— “কী জানতে পারে?”
মাহিরা ধীরে বলল,
— “তোর মনের কথা।”
আয়াত কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— “জানি না।”
— “তুই কি কখনো ওকে বলতে চাইবি?”
আয়াতের চোখে এক মুহূর্তের জন্য দ্বিধা দেখা গেল।
— “হয়তো কোনোদিন।”
মাহিরা আর কিছু বলল না।
আয়াত এবার তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— “কিন্তু তার আগে অনেক কিছু ভাবতে হবে।”
— “কী?”
— “ও কী চায়, আমার পরিবার কী চায়, আর সবচেয়ে বড় কথা—এই বিষয়টা সঠিকভাবে করা সম্ভব কি না।”
মাহিরা মাথা নাড়ল।
— “তুই ঠিক বলেছিস।”
---
সেদিন রাতে মাহিরা নিজের ঘরে বসে ছিল।
আয়াতের কথাগুলো বারবার মনে পড়ছিল।
হঠাৎ তার মনে হলো, সে যদি নিজের অনুভূতির কথা মুসআবকে জানায়, তাহলে হয়তো আয়াত আরও কষ্ট পাবে।
কিন্তু অনুভূতিটা কি সত্যিই এত সহজে সরিয়ে ফেলা যায়?
সে নিজের মনকে প্রশ্ন করল।
উত্তর এল না।
শেষে সে শুধু বলল,
“আল্লাহ, আমি জানি না আমার জন্য কী ভালো। আপনি যদি এই অনুভূতিটা আমার জন্য ভালো না করেন, তাহলে আমার মনটা সরিয়ে দিন।”
---
অন্যদিকে মুসআবও সেদিন রাতে নিজের পড়াশোনা শেষ করে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে ছিল।
বাবার সঙ্গে আগের দিনের কথাটা মনে পড়ল।
পরিবারের দায়িত্ব।
ভবিষ্যৎ।
বিয়ে।
সে এসব নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।
তার কাছে এখনো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজের পড়াশোনা, পরিবার আর দ্বীনের পথে থাকা।
সে জানে না, তার জীবনের ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে অন্য দুইজনের হৃদয়ে কত বড় গল্প তৈরি হয়ে গেছে।
---
পরদিন সকালে কলেজে একটা নতুন খবর ছড়িয়ে পড়ল।
মুসআবদের কয়েকজন বন্ধু আবার তিন দিনের দাওয়াতি সফরে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে।
মুসআবও যাওয়ার কথা ভাবছে।
খবরটা শুনে মাহিরার বুকটা হঠাৎ ভার হয়ে গেল।
আয়াতও চুপ করে গেল।
তিন দিন আগেও তারা মুসআবকে না দেখে থাকতে পেরেছিল।
কিন্তু এবার কেন যেন বিষয়টা আলাদা মনে হলো।
কারণ এর মধ্যে তাদের অনুভূতিগুলো অনেক বদলে গেছে।
আর সেই তিন দিনের সফরই হয়তো সামনে এমন কিছু ঘটনার শুরু করবে, যার প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত যাবে।
চলবে...