ফন্ট সাইজ:
থিম:
কিশোরী কন্যা

২৯তম পর্ব

লেখক: হামিদা আক্তার ইভা Hayat

#কিশোরী_কন্যা

#হামিদা_আক্তার_ইভা_Hayat

২৮.

দখিনা হওয়া বইছে আজ।আকাশে কিছু ঝাঁক ধরে পাখি উড়ে যাচ্ছে।তাদের দেখে মনে হচ্ছিল সবাই একসাথে কণ্ঠে ছন্দ মিলিয়ে গান গাইছিল।অষ্টাদশী তখন নিজের ঘরে বসে বাইরের দৃশ্য দেখতে ব্যস্ত।হঠাৎ দরজায় শব্দ হলো।সে অনুমতি দিতেই ঘরে প্রবেশ করল তাহসিন।পেছনে ময়ূরী।কনক চমকে হতবুদ্ধি হয়ে এগিয়ে আসতেই তাহসিন শান্ত গলায় বলল,

“ভালো আছিস?”

কনক শুষ্ক গলা ভিজিয়ে বলল,

“জি!”

কনক ময়ূরীর দিকে তাকাল।মেয়েটার মুখ দেখে সব স্বাভাবিক মনে হচ্ছে।তবু বুকে ভয় বাঁধল।তাহসিন এগিয়ে গিয়ে বসল বিছানায়।চোখের ইশারায় কনককে সামনে ডাকল।সে গুটি গুটি পায়ে সামনে আসতেই গম্ভীর গলায় প্রশ্ন ছুঁড়ল,

“আমার স্ত্রী তোর কী হয়?”

“ভা..ভাবি।”

“আমি তোর কী হই?”

“ভাই।”

এবার তাহসিন দাঁত চাপল।বলল,

“তুই ময়ূরীকে গালি দিয়েছিস?”

তাহসিনের ধমক শুনে চমকে উঠল সে।ভয় পেলেও দৃঢ় গলায় বলল,

“এসব বাজে কথা কে বলেছে আপনাকে?আমি কেন ময়ূরীকে গাল দিতে যাব?”

পেছন থেকে ময়ূরীর গম্ভীর গলা ভেসে এলো।

“আমি তোমার বড় ভাইয়ের বউ।নাম ধরে ডাকছ কেন?”

কনক স্তব্ধ।সে কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছে না।তাহসিন তখন বলল,

“প্রথম কথা হচ্ছে তুই তোর ভাবিকে গালা-গালি করেছিস,বাজে ব্যবহার করেছিস,এমনকি গায়ে হাতও তুলতে চেয়েছিস।কোন সাহসে এই চিন্তা মাথায় এলো?” তাহসীনের ধমকে মেয়েটা ঠোঁট কামড়ে মাথা নিচু করল।

“তোর সাহস দেখে অবাক না হয়ে পারছি না।কেন এমন নোংরা একটা কাজ করেছিস?ক্ষমা চা এক্ষণই।”

কনক মাথা না তুলেই বলল,

“পারব না আমি।”

“থাপ্পড় চিনিস?হাত-পা ভে’ঙে ফেলব একদম।ক্ষমা চাইবি আমার সামনে এবং এক্ষণই।”

কনক দাঁত চেপে মাথা নত করে ময়ূরীকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ভাবি,আমাকে মাফ করো দিয়ো।আমার ভুল হয়েছে।”

ময়ূরী বলল,

“ঝামেলা আমার পছন্দ নয়।তোমার ভাই আমায় নিজ ইচ্ছায় বিয়ে করে নিয়ে এসেছেন।সে আমার স্বামী।তাকে নিয়ে উল্টো-পাল্টা চিন্তা মাথায় আনলে আমি ভুলে যাব তুমি আমার ননদ হও।একবার দুঃসাহস দেখিয়েছ,পরেরবার আর এমন সাহস দেখিও না।আজ শুধু একটা মেরেছি,পরেরবার কোনো জায়গা বাকি রাখব না।”

ময়ূরী থামতেই তাহসিন বলল,

“নেহাত তুই মেয়ে মানুষ।নাহলে তোর গালে ঠাটিয়ে কয়েকটা বসিয়ে দিতাম।আবেগের বয়স চলে গেছে,এখন বাস্তবতা মেনে নিতে শিখ।”

তাহসিন বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।ময়ূরীর নিকট এগিয়ে গিয়ে বউয়ের কাঁধ আঁকড়ে ধরল যত্ন করে।ময়ূরী মাথার কাপড় ঠিক করে পিছু ফিরল।ঘরের বাইরে যাওয়ার আগে একবার পিছু ফিরে শক্ত গলায় বলল,

“তোমার বড় ভাইয়ের বউ আমি।এইটুকু মনে রাখলেই হবে।”

তাহসিন আর ময়ূরী ঘর থেকে বের হতেই কনকের বুকের ভেতরটা ধপাধপ করতে লাগল।ঘরটা হঠাৎ অন্ধকার মনে হলো তার কাছে।মেয়েটা টলমল পায়ে গিয়ে জানালার পাশে দাঁড়াল।সামনে ময়ূরী আর তাহসিন পাশাপাশি হাঁটছে।তাহসিন ময়ূরীর দিকে একটু ঝুঁকে কিছু বলল।ময়ূরী মাথা নাড়ল।দূর থেকেও বোঝা যাচ্ছিল দু’জনের বোঝাপড়া আর অদ্ভুত এক আশ্রয়-ভরা সম্পর্ক।

কনক ঠোঁট চেপে তাকিয়ে রইল।মনে হচ্ছিল বুকের ভেতর কিছু কুঁকড়ে ধরছে তাকে।

রাগে মেয়েটা নিজের মাথার চুল খামছে ধরল।তাহসিন তার ভাই নয়।ভাই হয় কী করে?বড় চাচার ছেলে সে।চাচাতো ভাইকে সে কখনোই ভাই মানেনি।কিন্তু আজ স্বীকার করতে হয়েছে তাহসিন তার ভাই হয়। কনক হঠাৎ মাথা তুলে আয়নার দিকে তাকাল।চোখ দু’টো লাল হয়ে আছে রাগে, অপমানে, আর অদ্ভুত এক বাঁধা কষ্টে।নিজের প্রতিচ্ছবিটাকে দেখে মনে হলো সে যেন পরাজিত।মনে হলো কেউ তার মুখের উপর দরজা আছাড় মেরে দিয়েছে।

দোতলা সিঁড়ির উপরে দাঁড়িয়ে আছে তাহসিন আর ময়ূরী।ময়ূরীর চোখ-মুখ স্বাভাবিক।তাহসিন আড়চোখে মেয়েটার স্বাভাবিক মুখশ্রী পর্যবেক্ষণ করে বলল,

“আমাকে মা’রার চিন্তা করছো নাকি?তোমাকে দেখে এখন নিজেরই ভয় করছে আমার।”

ময়ূরী বিরক্ত হলো।

“মেজাজ খারাপ!বেশি কথা বলবেন না।”

“মেজাজ ঠান্ডা করো এখন।বলে তো এলাম ওকে।মেয়ে মানুষের গায়ে তো আর হাত দেয়া যায় না।যতই হোক শুদ্ধ পুরুষ আমি।বউকে ছাড়া কাউকে ধরি না।ঘরে চলো,একটু ধরাধরি খেলি।”

ময়ূরী নাক-মুখ কুঁচকে দূরত্ব রেখে দাঁড়াল।বিরক্ত হয়ে বলল,

“মুখে সে’লাই করে দিব বেহায়া লোক।”

“তুমি আমার মনের দুঃখ বোঝো না কেন?আমার বাচ্চা-কাচ্চার মুখে কবে আব্বা ডাক শুনব বলো তো?ধরাধরি না খেললে তারা তোমার কোলে আসবে কোত্থেকে?”

“আপনি বেশি কথা বলেন।বাড়ি ভর্তি মানুষের সামনে আজ অন্তত মুখটা বন্ধ রাখুন।দোয়া করে মুখ খুলবেন না।”

ময়ূরী সিঁড়ির ধাপে নেমে গেল এক ধাপ, কিন্তু তাহসিন ঠিক পিছনে দাঁড়িয়ে।মেয়েটা যতটা দূরত্ব রাখতে চাইছে, লোকটা ততটাই কাছে আসছে।ময়ূরী বিরক্ত হয়ে পেছনে তাকাতেই তাহসিন নিচু গলায় বলল,

“দোয়া করব,মুখও বন্ধ রাখব,কিন্তু তুমি যদি আমার থেকে এত দূরে থাকো,তখন দোয়া–মোনাজাত সবই বৃথা হয়ে যাবে,জানো তো?”

“আপনি কি চান আমি এখানেই সিঁড়ি থেকে লা’ফ দেই?”

“তোমার এত দুঃসাহস? আগে ধরাধরি খেলতে দাও,পরে লাফিও।”

“চুপ!”

“চুপ তো আছি।কথা তো তুমিই চালাচ্ছ।”

ময়ূরী আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না।ঝট করে নেমে গেল নিচতলায়।তাহসিনও পেছনে অনুসরণ করছে, কিন্তু পা টিপে টিপে।

নিচে নামতেই ময়ূরী দেখল রান্নাঘরের দিকে কয়েকজন মহিলা তাকিয়ে আছে।তাহসিন বুঝে গেল মানুষজন তাকিয়ে আছে তাদের দিকে।

লোকটা ময়ূরীর পাশে এসে দাঁড়িয়ে নিচু গলায় বলল,

“রাগ কমেছে?”

“না।”

“তাহলে আরেকটু কাছে আসো,তখন কমবে।”

ময়ূরী চোখ রাঙাল।

“আপনি আমার থেকে দূরে থাকবেন।এত মানুষের মধ্যে হাসির পাত্রী বানাবেন না দয়া করে।”

তাহসিন গম্ভীর মুখে দু’সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইল।তারপর মৃদু গলায় বলল,

“এত মানুষ আছে তাই ধরছি না,কিন্তু ঘরে গিয়ে পালাবে কোথায়?”

ময়ূরী থমকে গেল।বলল,

“আপনি ঠিক কী করতে চান?”

তাহসিন আড়চোখে সদর দরজার দিকে তাকাল।সে বাইরে যাবে এখন।কাজ আছে বাড়িতে।ময়ূরীর প্রশ্নের জবাব দিতে সে একটু ঝুঁকে এসে বউয়ের নাক টেনে দিয়ে ফিসফিস করে বলল,

“আজ দিনটা তোমার ছিল,লম্বা রাতটা আমার হবে।”

ময়ূরী সঙ্গে সঙ্গে মুখটা সরিয়ে নিল।নাকে লাগা তাহসিনের ছোঁয়া গরম হয়ে লেগে রইল।গাল দু’টো তেতে উঠল লজ্জায়, সে সেটা এমনভাবে চেপে রাখল যেন কিছুই হয়নি।মেয়েটা শক্ত গলায় বলল,

“বেহায়া মানুষ।দূরে যান।”

তাহসিন হালকা হাসল,তারপর ঠিক সেই পুরনো ভঙ্গিটায় বলল,

“দূরে যাব,কিন্তু আজ রাতে দূরে থাকতে পারব না।শোনো? আজ একটু সেজে নতুন বউ হয়ে অপেক্ষা করবে আমার জন্য।”

বাড়ির লোকজনের চোখ এড়াতে দ্রুত হাঁটতে শুরু করল।ড্রয়িংরুম পেরিয়ে সামনে যেতেই মেয়েটা অনুভব করল তাহসিনের চোখ তার উপরই।পিছনে না তাকালেও বোঝা যাচ্ছিল লোকটা হাসছে!একটা দুষ্টু,আত্মবিশ্বাসী,আর নিজের বউকে দেখে নরম হয়ে যাওয়া হাসি।সামনের দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতেই তাহসিন ফোন বের করল।কারো সঙ্গে জরুরি কথা বলতে হবে।ময়ূরী একবার আড়চোখে তাকিয়ে দেখল,তাহসিনের চোখে একটু তড়িঘড়ি, একটু দায়িত্বের ছাপ।

তাহসিন বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এলো বাগানে।সওদাগর বাড়ির বাগানটা বিশাল বড়।সব সময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকে।আজ সেখানে কাজ চলছে।রাতে বৃষ্টি হলেও সমস্যা হবে না।আদনান বাগানে চেয়ারে বসে বসে কাজ দেখছে।ছেলেটার বোধহয় মন খারাপ।তাহসিন এগিয়ে গেল নিকটে।বাড়ির চারপাশে মানুষজন কাজে ব্যস্ত।গ্রামে বিশাল বড় করে বিয়ের আয়োজন করা হচ্ছে।সওদাগর বাড়ি প্রথম কোনো মেয়ের বিয়ে হচ্ছে।কাল-পরশু রাজনীতির মানুষ দিয়ে বাড়ি ভর্তি থাকবে।

তাহসিন বসল আদনানের পাশে।আদনান চোরা চোখে তাহসিনকে দেখে নাক টেনে বলল,

“গিয়েছিলি?”

“হু।”

“চল ঢাকা ফিরে যাই।এই বা’লের চাকরি করতে হবে না।ঢাকা গিয়ে তুই আর আমি ঝালমুড়ির ব্যবসায় নেমে পড়ব।”

“তোকে দিয়ে কোনো কাজই হবে না।তুই এক কাজ কর!হিমিকে নিয়ে পাবনা চলে যা।সেখানে আশা করি দু’জনে ভালো থাকবি।”

আদনান সোজা হয়ে বসল।হাতে তালি দিয়ে বলল,

“ফাঁপর মারো?দুইদিন আগেও তুই সিঙ্গেল ছিলি।আজকে বউ আছে বলে ভাব বেড়েছে?”

তাহসিন চুপ রইল এবার।বিয়ে করেও বেচারা কাঙাল।বিয়ে তো করেছে সেই বাচ্চা একটা মেয়েকেই।ঘটে আক্কেল থাকলেও স্বামী নেই।বাড়ির কাজ প্রায় শেষের দিকে।বিয়ে বাড়ি দেখেই মনে হচ্ছিল।কাল কাঁচা ফুল দিয়ে বাড়ির ভেতরে সাজানো হবে।সওদাগর বাড়ির একটা নিয়ম আছে।যদিও তাহসিনের ক্ষেত্রে তেমন কিছু হয়নি,তবে নুপুরের ক্ষেত্রে সেটা হবে।বিয়ের দিন বাসর হয় মেয়ের বাড়ি।বিয়ের পরের দিন বউ নিয়ে ফিরে যায় ছেলের বাড়ি।নুপুরের বাসর সাজানো হবে এই বাড়িতেই।তাহসিন আদনানের সাথে মিলে কিছু কাজ করে দিল।সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে।বাইরের আলো আঁধারে ঢাকার সাথে সাথে বাড়ির রঙিন লাইট গুলো জ্বলে উঠল জ্বলজ্বল করে।বাড়ির ভেতর থেকে পুতুল আর ফাহাদের খিলখিলিয়ে হাসির শব্দ শোনা যাচ্ছিল।

ময়ূরীকে সজীব পড়াতে এসেছিল।রজনী বেগম কিছুদিন আসতে বারণ করেছেন তাকে।ময়ূরী কিছু বলতে গিয়েও চুপ ছিল।সে চাইলেই প্রতিবাদ করে বলতে পারত কিছু।কিন্তু তার ধারণা সব সময় সব জায়গায় প্রতিবাদ মানায় না।এটা তার শ্বশুর বাড়ি।বিয়ে বাড়িতে অনেক কাজ থাকে,দায়িত্ব থাকে।বাড়ির বউ হিসেবে তারও একটা দায়িত্ব আছে।সন্ধ্যার আযান দিয়েছে খানিকক্ষণ আগেই।ময়ূরী তাহসিনের ঘরে নামাজে দাঁড়িয়েছে।ছোট্ট পুতুল মামুর সাথে খেলতে খেলতে ছোট দাদার ঘরে এসেছে।রমজান সওদাগর উপস্থিত ছিলেন না সেখানে।চম্পা ঘরে কীযেন করছিল।পুতুল চম্পাকে খেয়াল করেনি সে যে এই ঘরে উপস্থিত।বাচ্চাটা বুকে চেপে রাখা পুতুলটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে ভীতু চোখে ঘর পর্যবেক্ষণ করছিল।এই ঘরে আসলে তার ভয় হয়।ভীষণ ভয় হয়।বাচ্চাটা ভাবল বেরিয়ে যাবে ঘর থেকে।ছোট ছোট পায়ে পিছু ঘুরতেই চম্পার শক্ত চোয়াল দেখে ভয়ে আঁতকে উঠল বাচ্চাটা।ঘরের দরজা বন্ধ।এই ঘর থেকে কোনো শব্দ বাইরে যাওয়ার জো নেই।পুতুল ভয়ে চিৎকার করে কেঁদে উঠল।চম্পা দাঁত চেপে মেয়েটার ছোট্ট শরীর মুঠোয় নিয়ে মুখ চে’পে ধরল গায়ের জোর দিয়ে।দেখে মনে হচ্ছিল কোনো প’শু হামলে পড়েছে বাচ্চা’টার উপর।

পুতুলের ছোট্ট দে’হটা চম্পার মুঠোয় কাঁপছে।মেয়েটা কাঁদছে নিঃশব্দে।চিৎকার করবার শক্তিটুকুও যেন শুকিয়ে গেছে ভয়ে।চম্পার চোখদু’টো সেই পুরনো,রাগে অন্ধকারে ভরা চাহনি।মনে হচ্ছিল বাচ্চাটার ক্ষুদ্র শরী’রটা তার কাছে খেলনা, আর সে খেলনাটাকে ছিঁ’ড়ে ভা’ঙার আনন্দ খুঁজছে।

চম্পা ঝুঁকে এলো আরও কাছে,গায়ের ওপর থরথর কাঁপতে থাকা পায়ের লা’থি থামিয়ে গম্ভীর, ফোঁসফোঁস গলায় বলল,

“চুপ কর! একদম চুপ! বাইরে কেউ শুনে ফেললে দেখবি কি করি তোরে!”

পুতুলের মুখ চে’পে ধরা তার হাতটা কাঁপছিল জোরে।মেয়েটা শ্বাস নিতে পারছে না।নাকটা লাল হয়ে উঠছে।চম্পার পায়ের লা’থিতে শরীর ব্যথায় ভে’ঙে এসেছে দেহটা।

চম্পা হঠাৎ আবার ধাক্কা দিয়ে তাকে বিছানার উপরে ফেলে দিল।বাচ্চাটা গড়িয়ে পড়ে কেঁদে উঠতেই চম্পার মুখে তীক্ষ্ণ,বিকৃত হাসি ফুটল।

“তোরে বারণ করছি না আমার সামনে আসবি না?”

পুতুল ঠোঁট কাঁপাতে কাঁপাতে বলল,

“মা-মা’র কাছে…যাব…”

চম্পার রাগ হঠাৎ প্রচণ্ডভাবে জ্বলে উঠল।সে দরজার দিকে একবার তাকাল।তারপর আবার পুতুলকে হাত ধরে টেনে তুলল।

“মা? তোর মায়ের কাছে যাবি?যাবি না?তোর মা আছে?এতিম একটা!”

পুতুল চিৎকার করতে গিয়ে থেমে গেল।চম্পার ভ্রু-কুঁচকে উঠতেই বাচ্চাটা আরও জড়োসড়ো হলো।একটা নিঃশব্দ ভয়ের ঝড় বয়ে যেতে লাগল ছোট বুকের ভেতর।শরীর ব্যথা করছে তার।চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে।চম্পার ভয়ে ছোট্ট বাচ্চা’টা কিছু বলতে পারছে না।চম্পা পুতুলের গা’ল চেপে ধরে দাঁত চেপে বলল,

“কাউরে কিছু বললে তোরে মাই’রা ফেলমু।বা’ন্দির

বাচ্চা!”

চম্পা শাড়ির আঁচল ঠিক করে ঘরের দরজা খুলে হনহন করে বেরিয়ে গেল।চম্পা বের হতেই পুতুল গলা ফা টিয়ে চিৎকার শুরু করল।বাচ্চাটা বিছানায় গড়িয়ে কাঁদছে।ময়ূরী নামাজ শেষে ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ির দিকেই আসছিল।পুতুলের চিৎকার শুনে চমকে উঠল সে।ড্রয়িংরুমে অনেকেই কোনো বাচ্চার কান্নার শব্দে থমকে গিয়েছিল।অরুণিমা বেগম দৌঁড়ে আসার আগেই ময়ূরী সিঁড়ি বেয়ে দৌঁড়ে নামতে নামতে গলা চওড়া করে বলল,

“আমার মেয়ে কই?ও কাঁদছে কেন?আমার মেয়ের গলা না এটা?”

ময়ূরী দৌঁড়ে নেমে কান্নার শব্দ অনুসরণ করে ছোট শ্বশুর আব্বার ঘরের দিকে ছুটে গেল।পিছু পিছু বেশ কয়েকজন ছুটলেন।ময়ূরী দরজা ঠেলে ঢুকতেই পুতুলকে বিছানায় গড়িয়ে এভাবে কাঁদতে দেখে ছুটে গিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরল।অরুণিমা বেগম হাপাচ্ছেন।ময়ূরী পুতুলের মাথায় হাত বুলিয়ে ঘন শ্বাস ফেলে বলল,

“কী হয়েছে মা?এভাবে কাঁদছ কেন?”

ভয়ে মেয়েটা থরথর করে কাঁপছে।দরজার সামনে তখন চম্পা এসে দাঁড়িয়েছে।পুতুলের চোখ সেদিকে যেতেই আবার চিৎকার শুরু করল।মায়ের বুকে গুটিয়ে এলো।ময়ূরী পুতুলের ফরসা গালে আঙুলের স্পষ্ট ছাপ পেয়ে ভ্রু-কুঁচকে ফেলল।চোয়াল শক্ত হয়ে এলো আপনা-আপনি।ঘরে তখন অনেক মানুষ হাজির হয়েছেন।এক মহিলা বললেন,

“কেমন মা তুমি?মাইয়ার খোঁজ-খবর রাখো না নাকি?ওর বাপে জানে,তুমি যে এমন হেঁয়ালি করো?”

অরুণিমা বেগম মহিলাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন,

“আপা,চুপ করো।”

“চুপ করমু কেন?তাহসিন কই থিকা এই মাইয়া বিয়া কইরা নিয়া আইছে?মাইয়ার খেয়ালই যদি রাখতে না পারে তাইলে বিয়া করছে কেন?মাইয়া কী জানত না বিয়ার পর বাচ্চা পালা লাগব?”

ময়ূরী এবার না চাইতেও বিরক্ত হয়েই নরম গলায় বলল,

“আপনাদের সমস্যা কী ফুপু?ওকে পেটে ধরিনি এটাই কি আমার দোষ?আমি নামাজে দাঁড়িয়েছিলাম।ফাহাদের সাথে পুতুল খেলছিল,আমি জানব কী করে এসব হবে?”

“বাহানা দেখাইও না।”

অরুণিমা বেগম এবার গলা চওড়া করলেন।

“আপা,দয়া করে চুপ থাকো।তোমরা বের হও দেখি ঘর থেকে।বাইরে আরও কাজ আছে,সেগুলো গিয়ে করো তোমরা।”

ঘরের মানুষ কমে এলেও পুতুলের কান্না থামল না।কুসুম বাইরে গিয়ে তাহসিনকে খবর দিতেই সে ছুটে এলো বাড়ির ভেতর।মেয়ে আর বউকে নিয়ে এলো নিজের ঘরে।পুতুল ময়ূরীর কোলে বুকে মাথা রেখে হেঁচকি তুলছে।মাঝে কেটেছে ঘণ্টা খানিক।ময়ূরী হাজারবার প্রশ্ন করেছে তাকে কে মেরেছে!বাচ্চাটা উত্তর দেয়নি।সারাক্ষণ কেঁদে গেছে।তাহসিন বাড়িতে হাঙ্গামা করেছে এটা নিয়ে।এত মানুষ বাড়িতে থাকতেও এমন একটা ঘটনা ঘটে কী করে?তাহসিনের মুখ গম্ভীর।ময়ূরীর চোখটাও ছলছল।পুতুলের গাল ফুলে উঠেছে ব্যথায়।বাচ্চাটা কতই না ব্যথা পেয়েছে।সে সাবধানে পুতুলকে বালিশে শুইয়ে দিল।গাল বেয়ে গড়গড় করে গড়িয়ে পড়ল চোখের জল।কেন কাঁদছে মেয়েটা?তাহসিন ভারী নিঃশ্বাস ফেলে হাত বাড়িয়ে বুকে টানল বউকে।মাথায় ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল,

“তোমার কী হলো?”

ময়ূরী নাক টেনে নিচু স্বরে বলল,

“আমি খেয়াল রাখতে পারিনি।সবাই বলে গর্ভে ধারণ করিনি বলে ওর খেয়াল রাখি না।আপনি বিশ্বাস করুন,আমি ঘরে এসে নামাজে দাঁড়িয়েছিলাম।পুতুল ফাহাদের সাথেই খেলছিল।কিন্তু হঠাৎ করেই এমন একটা কান্ড ঘটে গেল।”

তাহসিন ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।

“আমিও তো ওকে জন্ম দেইনি।তাই বলে কী আমি ওর বাবা না?মানুষ অনেক কথাই বলে ময়ূরী!আমরা ঠিক থাকলে মানুষের কথায় কী আসে-যায়?আমি তো জানি তুমি ঠিক কতটা ভালোবাসো ওকে।”

“ভয় হয় আমার।মানুষের এমন বি’ষযুক্ত কথা শুনে মেয়েটা না আবার ভুল বুঝে বসে।”

তাহসিন চুপ রইল।ঘরের মধ্যখানে নীরবতা নেমে আসতেই ময়ূরী বলল,

“পুতুলকে কে মা’রল?মেয়েটার পুরো শরীর ব্যথা।জ্বরে শরীর জ্ব’লছে।”

তাহসিন ঠোঁট কামড়ে বলল,

“সেটাই বুঝতে পারছি না।”

#চলবে…?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন