ফন্ট সাইজ:
থিম:
কিশোরী কন্যা

৩০তম পর্ব

লেখক: হামিদা আক্তার ইভা Hayat

#কিশোরী_কন্যা

#হামিদা_আক্তার_ইভা_Hayat

২৯.

রাত পেরিয়ে ভোর নেমেছে।বাইরে তখন মিটিমিটি আলোয় আলোকিত চারপাশ।তাহসিন নামাজ পড়ে সবে ঘরে ঢুকেছে।ময়ূরী ঘরের মধ্যখানে জায়নামাজ পেতে সেখানে বসে বসে কুরআন তিলাওয়াত করতে ব্যস্ত।তাহসিন দরজা আঁটকে বিছানার নিকট গিয়ে মেয়ের কপালে হাত রাখল।জ্বরটা বেড়েছে বোধহয়।বুকের ভেতরটায় কেমন চিনচিন ব্যথা করছে।সে মেয়ের পাশে শুয়ে বুকে টেনে নিল তাকে।সে বাইরের কাজে এতই ব্যস্ত যে ঘরের ভেতরে কী হচ্ছে সেদিকে নজর দেয়ার সময় পায়নি।মেয়েটার সাথে কে এমন করতে পারে?কেনই বা পুতুল এই সওদাগর বাড়ি আসতে এত ভয় পায়?কত কত প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে মাথায়।

ময়ূরী উঠে এলো।দোয়া পড়ে মেয়ের মাথায় ফুঁ দিয়ে তাহসিনকে বলল,

“আপনি একটু ডাক্তারকে ডেকে আনুন বাড়িতে।সারাটা রাত বাচ্চাটা কেঁদেছে।”

“এখন তো সম্ভব নয়।আর একটু বেলা হোক তারপর যাব।তুমি এক কাজ কোরো,পুতুল উঠলে ওর শরীর মুছিয়ে দিয়ো।”

“ঠিক আছে।আমার কিছু কথা ছিল আপনার সাথে।”

“কী?”

ময়ূরী পাশে গিয়ে বসল।শুষ্ক ঠোঁট ভিজিয়ে হাতের তাজবীহ পাশে রেখে বলল,

“চম্পা খালাকে এই বাড়িতে আপনার চাচা এনেছিলেন শুনেছি।”

“হ্যা।”

“কবে থেকে উনি এই বাড়ি থাকেন?”

“দুই বছরের একটু বেশিই হয়েছে বোধহয়।”

“উনি কে আপনি জানেন?উনার ব্যপারে কোনো খোঁজ-খবর নিয়েছেন?”

তাহসিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

“আমি গ্রামে থাকি না।বছরে একবার এসে দুই-তিন দিন থেকেই ফিরে যাই।ওসব দেখার সময় কই আমার?”

ময়ূরীর রাগ হলো খুব।লোকটা তার কথার মানে বুঝতে পারে না।মেয়েটা বিরক্ত হয়ে বলল,

“গ্রামে এসেছেন আজ কতদিন?অন্য কাজ নিয়ে পড়ে থাকলে হবে?আগে বাড়ির দিকে নজর দিন তারপর বাকি সব।”

তাহসিন মাথা নাড়ল।ময়ূরী আয়নার সামনে গিয়ে মাথার হিজাব খুলে আঁচল চাপল মাথায়।এখনই রজনী বেগম গলা ছেড়ে ডাকবেন তাকে।মেয়েটা আগেই ঘর থেকে বের হলো।ঘরের বাইরে বের হতেই আফিয়ার সাথে দেখা হলো।সে ছাদে গিয়েছিল ভেজা কাপড় ছড়িয়ে দিতে।

“এই সাতসকালে যাচ্ছ কোথায়?”

ময়ূরীর প্রশ্নে আফিয়া উত্তর দিল,

“ছাদে গিয়েছিলাম ভেজা কাপড় দিতে।”

“এই ঠান্ডার দিনে সাতসকালে গোসল করো কেন শুনি?ঠান্ডা লেগে গেলে বুঝবে পরে।”

মেয়েটার বোকা কথায় আফিয়া চোখ পাঁকাল।

“একটা মারব চড়।বিয়ে হয়েছে এখনো ঘটে বুদ্ধি আসেনি।কারোর সামনে এমন প্রশ্ন করে বোসো না যেন।চলো নিচে যাই।”

নিচে আজ সকাল সকাল ব্যস্ততায় ঘিরে ধরেছে সবাইকে।ডাইনিং টেবিলে বসে আছেন রমজান সওদাগর ও বোরহান সওদাগর।এই সাতসকালে তাদের নাস্তা দেয়া হয়েছে।ময়ূরী আশ্চর্য হয়ে কনকের মায়ের কান্ড দেখছেন।মহিলা স্বামীকে খাবার পরিবেশন না করে পাশে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছেন।অন্যদিকে চম্পা কাজ করছে।সে আফিয়ার সাথে এগিয়ে যেতে যেতে চম্পার দিকে নজর রাখল।চম্পা হঠাৎ চোখ তুলে তাকায় ময়ূরীর দিকে।চাহনিটা কেমন অদ্ভুত।

বোরহান সওদাগর খাওয়া শেষে ময়ূরীকে ডাকলেন কাছে।ময়ূরী এগিয়ে এলো দাদা শ্বশুরের নিকট।সোফায় বসে তিনি কিছু কাজ করছিলেন।ময়ূরী আসতেই তিনি গম্ভীর গলায় তাকে বসতে বলল অপর পাশের সোফায়।ময়ূরী বেশ আশ্চর্য হয় লোকটার আচরণে।এই বাড়ির কোনো মেয়ের সাহস নেই তার মুখের উপরে কথা বলার।বোরহান সওদাগরের সামনে কোনো মেয়ে কখনো এভাবে বসেছে কিনা তারও সন্দেহ আছে।সেখানে ময়ূরী তার নাতির বউ হলেও তাকে সবার থেকে বেশি প্রায়োরিটি দেয়া হয়েছে।সে বসল সোফায়।দাদার পাশে ছোট চাচা বসেছিলেন।ময়ূরী চোখ তুলে একবার তাকাল।লোকটাকে তার পছন্দ নয়।একপ্রকার বাধ্য হয়ে তার সামনে স্বাভাবিক থাকার আচরণ করতে হয় তার।মেয়েটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

বোরহান সওদাগর বললেন,

“তাহসিনকে বলে দিস ডাক্তারকে আমি আসতে বলেছি।”

ময়ূরী মাথা নাড়ল।তিনি ফের বললেন,

“কাল যা হয়েছে এসব নিয়ে তাকে ভাবতে মানা করবি।বাড়িতে কত বাচ্চা-কাচ্চা আছে,হয়তো তাদের থেকেই ব্যথা পেয়েছে।”

ময়ূরীর কপালে ভাঁজ পড়ল।মেয়েটা কখনো তাহসিন ছাড়া কারোর চোখে চোখ রেখে কথা বলে না।আজ দাদা শ্বশুরের কথা শুনে অবাক হলো।প্রথম তার চোখের দিকে শক্ত নজর রাখল।

“মাফ করবেন দাদা,তবে এই ঘটনা কী আপনার কাছে স্বাভাবিক মনে হচ্ছে?”

“স্বাভাবিক নয়?”

“অবশ্যই নয়।পুতুল আপনার নাতির মেয়ে,তাকে ছোট থেকে আপনারা মানুষ করেছেন।আমার থেকে ভালো আপনারাই ভালো জানেন পুতুল কেমন ধরনের বাচ্চা।”

“জানি বলেই বলছি।ওর বাবা আমার কথা শুনবে না।তুই বরং বুঝিয়ে বলবি একবার।”

ময়ূরীর চোয়াল শক্ত হলেও ঠান্ডা গলায় বলল,

“এটা যদি স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে থাকে তাহলে এসব নিয়ে আমি কিংবা উনি একটা কথাও বলব না।কিন্তু এমন যদি হয়,পুতুলকে কেউ মেরেছে কিংবা ভয় দেখিয়েছে তাহলে কী হবে দাদা?”

“এমন কিছু হয়নি।শুধু শুধু ঝামেলা বাড়াচ্ছিস।বিয়ে বাড়িতে কোনোরূপ ঝামেলা হোক আমি চাই না।”

“সেটা আমিও চাই না।কিন্তু ওই ব্যক্তি ধরতে পারলে তার হাত-পা ভে’ঙে নদীতে ভাসিয়ে দিতে দু’বার ভাববো না আমি।”

পাশ থেকে রমজাম সওদাগর ঠান্ডা গলায় বললেন,

“ছোট বউমা,এত রেগে যাচ্ছ কেন?বাবা যা বলছে করতে সমস্যা কোথায়?”

ময়ূরী বলল,

“বাচ্চাটা তো আমার চাচা।আজ যদি ওকে আমি পেটে ধরতাম তাহলে কী আমার পরাণ পু’ড়ত না?আমার কষ্ট হতো না আমার বাচ্চার কষ্ট দেখে?কাল সারাটা রাত সে ঘুমায়নি শরীর ব্যথায়।এত কিছু চোখের সামনে ঘটেছে তবু আপনাদের চোখে কিছু পড়ছে না?”

“বেশ!কে পুতুলের সাথে এমন করেছে ধরতে পারলে তোমার কথাই মেনে নিব।তবে এই দুইদিন একটু তাহসিনকে শান্ত থাকতে বলো।সে নিচে নামলেই বাড়ি মাথায় তুলবে।আশা করি তুমি আমার কথা বুঝতে পারছ।”

ময়ূরী বাধ্য হয়ে মাথা নাড়ল।সকালে সে ঘরে গিয়ে তাহসিনের সাথে কথা বলে এসেছে।ডাক্তার এসেছিলেন এবং ঔষধ দিয়ে গেছেন পুতুলকে।বাচ্চাটা কিছুতেই নিচে নামবে না।ময়ূরী সকালে দু’জনের জন্য খাবার নিয়ে ঘরে এলো।পুতুল বাবার সামনে বসে আছে।তাহসিন মেয়ের মাথার চুল আঁচড়ে দিচ্ছে।শেষে বেণী গেঁথে দিয়ে মেয়েকে কোলে নিয়ে বসল।ময়ূরী বলল,

“খাবার খেয়ে নিন,আমি পুতুলকে খাইয়ে ঔষধ খাইয়ে দিচ্ছি।”

তাহসিন হাত ধুইয়ে এলো।মাংস দিয়ে খিচুড়ি রান্না হয়েছে সকালে।অরুণিমা বেগম পুতুলের জন্য ঝাল ছাড়া আবার আলাদা করে মাংস-খিচুড়ি রেঁধে দিয়েছেন।ময়ূরী খাবারে হাত দেয়ার আগে বিছানায় এসে ভালো করে বসল।

ময়ূরী পুতুলকে কোলে নিয়ে খাইয়ে দিচ্ছিল।ছোট্ট হাত দিয়ে পুতুল কখনো মায়ের আঁচল ধরে,কখনো বাবার দিকে তাকাচ্ছে।জ্বরের কারণে চোখ দু’টো একটু ভারী,তবু মা-বাবাকে কাছে পেয়ে শান্ত।

হঠাৎ তাহসিন খিচুড়ির লোকমা তুলে ময়ূরীর মুখের সামনে ধরে বলল,

“হা করো তো বেগম সাহেবা।বেগমকে রেখে একা একা খাই কী করে?”

ময়ূরী এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।চোখ তুলে তাকাল তাহসিনের দিকে।লোকটার মুখে অদ্ভুত এক দৃঢ়তা,যেন আজ না খাইয়েই ছাড়বে না।

“আমি খেয়েছি।”

“আবার খাও।”

“আপনি খান।”

“সকালে না খেয়েই ঘুরঘুর করছো কেন?সামনে সপ্তায় পরীক্ষা মানে আছে?পারলে ঘণ্টায় ঘণ্টায় খাবার খাবে।পরীক্ষার প্রত্যেকদিন মাছের মাথা দিয়ে ভাত খাবে বুঝলে?পরীক্ষায় ভালো নাম্বার না পেলে খবর আছে তোমার।”

“এইসব এখন করার সময় হয়েছে?পুতুল..”

“পুতুল দেখছে বলেই তো!” তাহসিন শান্ত গলায় বলল,

“ওকে বুঝতে দাও,বাবা-মা একসাথে থাকলে কেমন হয়।”

পুতুল হেসে উঠল।

“মা,তুমি হা করো না কেন?”

এই কথাটুকুতেই ময়ূরীর সব আপত্তি গলে গেল।সে একটু লজ্জা লজ্জা মুখে ধীরে মুখ খুলল।তাহসিন খুব যত্ন করে লোকমাটা তার মুখে তুলে দিল।ময়ূরী খাওয়া শেষ করতেই তাহসিন নিজের আঙুলে লেগে থাকা ভাত নিজের আঁচলেই মুছে নিল।

“আরো এক লোকমা।”

সে নরম গলায় বলল।

ময়ূরী চোখ নামিয়ে বলল।

“না,আপনি খান।”

“আমি খাচ্ছি তো।”

তাহসিন হালকা হাসল,

“তোমার খাওয়াতেই।”

ময়ূরীর বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল।এই মানুষটা বাইরে যত শক্ত,ভেতরে ঠিক ততটাই নরম।আজ যেন সেটা নতুন করে টের পেল সে।অদ্ভুত ধরনের মানুষ তাহসিন।দু’দিন আগেও এই লোকটা একটা বাচ্চার ভয়ে কিভাবে নিজের শখের বউয়ের সাথে সংসার ভাঙতে যাচ্ছিল।আবার বউকে হারানোর ভয়ে বাচ্চাদের মতো বউকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিল।মেয়েটা ঠোঁট কামড়ে ধরল।এমন একটা সংসার কী করে তার হলো বুঝতেই পারে না।

খাওয়া শেষ হলে ময়ূরী ঔষধ বের করল।

“এই নাও,এটা খেতে হবে।”

পুতুল মুখ বাঁকাল।

“তিতা।”

তাহসিন মেয়েকে একটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।

“আমার সাহসী মেয়েটা না?একবারে খেয়ে ফেলেন আম্মা।তারপর আমি গল্প বলব।”

ময়ূরী চোখের কোণে তাকিয়ে দেখল,বাবা-মেয়ের এই দৃশ্যটা।বাচ্চাটা ঔষধ খাওয়ার সময় নাক-মুখ কুঁচকে রেখেছিল।ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে তাহসিন গল্প বলছে।ময়ূরী কপাল কুঁচকে শুনছে তাহসিনের আজ-গোবি গল্প।গল্পের কোনো আগা-মাথা নেই বললেই চলে।নিচে সে আর যাবে না হলুদ হওয়ার আগে।মানুষের খোঁচা দেয়া কথা তার পছন্দ নয়।

ঘরের দরজা দিয়ে ফাহাদ ঢুকল তখন।হাতে ইয়া বড়-বড় দুইটা চকলেটের প্যাকেট।আদনান কিনে দিয়েছে।সে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে এলো।ময়ূরী তাকিয়ে রইল ছোট্ট ভাইয়ের দিকে।বাচ্চাটা তাহসিনের কোলে পুতুলকে দেখে বলল,

“ওও দুলাবাই,আমারে কুলে নিবা না?”

তাহসিন ঘাড় বাঁকিয়ে নিচে দৃষ্টি রাখল।ছোট্ট ফাহাদকে বিছানায় উঠিয়ে আনতেই সে একটা চকলেট পুতুলের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,

“ইডা তুমার।”

পুতুল নিল সেটা।ছোট্ট করে বলল,

“শুকরিয়া।”

ময়ূরী হেসে ফেলল পুতুলের মুখে ‘শুকরিয়া’ বলা শুনে।সে কয়েকদিন আগেই বলেছিল কেউ কিছু দিলে তাকে শুকরিয়া বলতে।

সে পুতুলকে কাছে টেনে মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।আড়চোখে তাহসিনের দিকে তাকিয়ে আদুরে গলায় বলল,

“মা,কাল কী হয়েছিল বলবে না আমায়?কেউ তোমায় মেরেছিল?আমাকে বলো,আমিও তাকে মেরে দিব।”

পুতুল ভয়ে গুটিয়ে এলো।কিছুতেই বাচ্চাটা নাম মুখে আনল না।ময়ূরী ভাবল পুতুলের একটু ভয় কাটতে দেয়ার সময় দেয়া উচিত।তার আগে জিডি সে ধরতে পারে তাহলে তো হলোই!

দুপুরের আগ দিয়ে নুপুরের হলুদের ব্যবস্থা করা হলো।নুপুরকে সওদাগর বাড়ির পুকুর পাড়ে হলুদ দেয়া হয়েছে।সেখান থেকে মহিলারা মিলে তাকে নিয়ে বাড়ির ভেতরে গেছে চেঞ্জ করাতে।

•

মধু উঠোনে বসে বসে কাঁথা সেলাই করছে ওয়াহিদের জন্য।পুলিশ সাহেব খালার কাছে আবদার করেছে নতুন কাঁথা সেলাই করে দিতে।মেয়েটার চোখে-মুখে বিরক্ত।সামনেই ওয়াহিদ বড় পাটির মধ্যে বালিশ বিছিয়ে শুয়ে শুয়ে মধুকে বিরক্ত করছে।মধু আড়চোখে তাকাল তার দিকে।ওয়াহিদ ভ্রু নাচিয়ে বলল,

“কিরে,ওমন করে তাকাচ্ছিস কেন?আমার কী লজ্জা লাগে না?”

মধু চোখ পাকিয়ে বলল,

“আপনি খুব বেহায়া।আমার পেছনে লেগে আছেন কেন বলুন তো?যান না থানায়।থানায় গিয়ে আসামি ধরুন।”

“তোকে একদিন ধরব ভাবছি।এমন ভাবে ধরব,না ছুটতে পারবি আর না ছুটতে চাইবি।”

“বাজে কথা বলবেন না।আপনার ধারের কাছে যেতে আমার বয়েই গেছে।”

“অথচ আমার পাশেই বসে আছিস।”

“চুপ করবেন?আমাকে আমার কাজ করতে দিন।ঘরে বিছানা থাকতে আবার এখানে এলেন কেন?”

ওয়াহিদ দুইহাত মাথার নিচে দিয়ে আকাশ পানে তাকাল।

“ঘরে গেলে তো আর মধুমিতাকে দেখতে পারব না।”

মেয়েটা মাথা নিচু করে ঠোঁট কামড়ে ধরল।ওয়াহিদের সব কথার মানে সে এখন বোঝে।কেমন যেন অদ্ভুত অনুভূতি হয়।বাড়িতে বক্কর নেই।তিনি গেছেন ক্ষেত দেখতে।ফিরোজা বেগম ঘরেই বোধহয় শুয়ে আছেন।শরীরটা বেশি ভালো যাচ্ছে না তার।

মধু কাঁথা সেলাই করতে করতে প্রশ্ন করল,

“আপনার কাজ কবে শেষ হবে?”

“জানি না।”

“ততদিন এই বাড়িতেই থাকবেন?”

“হু।” ওয়াহিদের ভ্রু কুঁচকে এলো।বলল,

“তুই আবার আমাকে তাড়িয়ে দেয়ার বুদ্ধি পাকাচ্ছি?”

মধু মুখ ফুলিয়ে বলল,

“হ্যা তাই!আপনি আজ-কাল বড্ড বেশি লাগামছাড়া হয়ে যাচ্ছেন।আমি যে আপনার বোন হই মনে আছে?কাল রাতে কী করেছেন মনে আছে আদৌ?”

ওয়াহিদ আশ্চর্য হলো।সে আবার রাতে কী করেছে?

“কী করেছি আমি?”

“রাতে তো ঠান্ডা পড়েছিল খুব।আম্মা বলল মোটা কাঁথা বের করে আপনাকে দিয়ে আসতে।”

“তো?”

“কাল রাতে আপনার ঘরে গিয়েছিলাম আমি।”

ওয়াহিদ হতভম্ব হয়ে উঠে বসল।শুকনো ঢোকও গিলে ফেলল অগোচরে।দাঁত খিঁচে মিনমিন গলায় বলল,

“ওটা স্বপ্ন ছিল না?”

মধু নাক ফুলাচ্ছে থেকে থেকে।শরীর জ্বলে যাচ্ছে মেয়েটার।ওয়াহিদ কান চেপে ধরল।তওবা করে বলল,

“আমি ভেবেছি ওটা স্বপ্ন ছিল।ঘুমের ঘোরে আমার কিছু খেয়াল ছিল না।”

মধু দাঁত কিরমির করে বলল,

“তার মানে স্বপ্নেও আপনি আমার সাথে ওসব ঠোঁটে চুম্মা-চুম্মি দেখেন?ছিঃ!”

“ছিঃ আবার কী?বিয়ে করলে কী কাছে আসবি না?থাপ্পড় মেরে চোয়াল ভে’ঙে ফেলব,ফাজিল।”

“আগে বিয়েটা করুন না।বিয়ে না করেই..ছিঃ!”

“সত্যি বিয়ে করবি?চল আজই কাজী অফিসে যাই।”

মধু হঠাৎ থমকে গেল।সুঁইটা আঙুলে ফোটেনি,তবু বুকের ভেতর কেমন একটা খোঁচা খেল।সে দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে নিল।গলার স্বর কাঁপা কাঁপা,

“এইসব ফাজলামি বন্ধ করুন।কাজী অফিসে যাওয়া কি ছেলেখেলা নাকি?”

ওয়াহিদ পাটি থেকে নেমে উঠে বসল।এই প্রথম তার মুখের হাসিটা একটু সিরিয়াস হলো।মধুর দিকে সোজা তাকিয়ে বলল,

“আমি ফাজলামি করছি না।তুই রাজী থাকলে আমি আজই যাব।”

মধু সেলাই থামিয়ে দিল।ঠোঁট কামড়ে ধরে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।মেয়েটার লাজুক কণ্ঠস্বর ভেসে এলো গলা দিয়ে,

“কিসব বাজে কথা।”

তখন বাড়ির বাইরে শব্দ হলো।তাহসিনের গলা ভেসে এলো বাইরে থেকে।মধু দৌঁড়ে গেল সেদিকে।তাহসিনকে দেখেই হাসি ফুটলো মুখে।সে ভাবল ময়ূরীও এসেছে বোধহয়।কিন্তু না!ময়ূরী আসেনি।তাহসিন ভেতরে প্রবেশ করল।ঘাড়ের উপর ফাহাদ তখন পিটপিট করে তাকিয়ে দেখছে সব কিছু।ওয়াহিদ উঠে এসে ফাহাদকে কোলে নিয়ে বলল,

“কিরে শালা,কী খবর তোর?”

ফাহাদ হেসে বলল,

“ভালো।”

তাহসিন বলল,

“আব্বা-আম্মা বাড়িতে নেই?”

মধু বলল,

“আম্মা ঘরেই আছে।ভেতরে আসুন।”

তাহসিন ঘরে যেতেই ফিরোজা বেগমকে ডেকে আনল মধু।তাহসিন সালাম করল।

“আম্মা পাঠাল আমায়।আপনার মেয়ে আমার মাথা ব্যথা বানিয়ে দিয়েছে মধুকে আজ নিয়ে যাওয়ার জন্য।”

ফিরোজা বেগম কিছু বলার আগেই ওয়াহিদ বাঁধা দিল,

“আমার সংসার কী আপনাদের সহ্য হয় না?মধু কোথাও যাবে না।”

তাহসিন চোখ ছোট-ছোট করে বলে,

“অফিসার,আপনাকে কিছু বলেছি আমি?আমি নিয়ে যাব আমার বউয়ের বোনকে,তাতে আপনার এত জ্বলছে কেন?”

“জ্বলবে না কেন?আপনার বউকে কী আমি আপনার বাড়ি থেকে এভাবে তুলে এনেছি?”

“মধু বুঝি আপনার বউ?”

থমথমে খেয়ে গেল ওয়াহিদ।ফিরোজা বেগম বসলেন দুর্বল শরীর নিয়ে।তাহসিনের কপালে ভাঁজ পড়ল।

“আম্মা,আপনার শরীর খারাপ?”

“একটু খারাপ বাবা।সকালে ওয়াহিদ হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল।এখন একটু ঠিক আছি।”

“আব্বা কোথায়?”

“তিনি মনে হয় খেতে গেছেন।ফিরতে রাত হবে বাবা।ক্ষেত শেষে বাজারে যাবেন দোকানে।”

“আপনি তাহলে আমার সাথে চলুন।কাল তো এমনিতেও যাওয়া হবে।ময়ূরী সেখানে আছে।আপনার এই অবস্থা শুনলে সে ব্যাকুল হবে খুব।”

“তা বললে হয় বাবা?তোমার শ্বশুর আছে না?মধু নাহয় আজ থাক বাবা।কাল আমাদের সাথেই যাবে।”

তাহসিন জোর করতে পারল না।মধুকে নিয়ে গেলে আম্মার যত্ন নেয়ার কেউ নেই।তাহসিন বেশ কিছুক্ষণ কথা বলে বাড়ি থেকে বের হলো ওয়াহিদের সাথে।বাড়ির কাঁচা রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে ওরা মেম্বার বাড়ির সামনের রাস্তায় এসে দাঁড়াল।দূরে দেখা যাচ্ছে মেম্বার বাড়ির গেটের সামনে কিছু লোক রাজুর সাথে দাঁড়িয়ে কথা বলছে।তাহসিন ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল।

#চলবে…?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩০তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন