গল্প : "হৃদয়ের কোণে শুধু তুই"
পর্ব : ০১
লেখিকা : আফিফা মাকসুরা এশা
সেদিন গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছিল। আকাশ মেঘলা থাকলেও ইরা কোচিংয়ের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হলো। কিন্তু কোচিংয়ে পৌঁছে দেখল, বৃষ্টির দাপটে আজ আর কেউ আসেনি। অগত্যা দেরি না করে সে আবার বাড়ির পথ ধরল।
কিন্তু ততক্ষণে বৃষ্টির বেগ অনেকটাই বেড়ে গেছে। ইরা মাথার ওপর ছাতা মেলে ধীরপায়ে হাঁটতে শুরু করল। বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেও কোনো গাড়ি মিলল না। মন বলছিল ছাতাটা বন্ধ করে ঝুম বৃষ্টিতে একটু ভিজে নেয়, কিন্তু পরক্ষণেই মায়ের কড়া বকার কথা মনে পড়তেই সে নিজেকে সামলে নিল।
ঠিক তখনই একটি দ্রুতগতির গাড়ি ওকে পাশ কাটিয়ে তীব্র বেগে চলে গেল। চোখের পলকে রাস্তার জমে থাকা নোংরা পানি ছিটকে এসে ভিজিয়ে দিয়ে গেল ইরার পুরো শরীর। আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন পথচারীর নজর পড়ল ওর ওপর। চরম লজ্জা আর অস্বস্তিতে ইরার মুখটা ছোট হয়ে এল। রাগে-ক্ষোভে কিছু বলার আগেই গাড়িটি দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে গেছে।
তবে অদ্ভুত বিষয় হলো, মনটা কিন্তু ওর দমে গেল না। বরং ভিজে একসার শরীর নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সে মনে মনে হেসে ভাবল—
"ইশ! আমার বেস্টিটা যদি আজ সঙ্গে থাকত, তাহলে দুজন মিলে বৃষ্টিতে ভিজে কী আনন্দটাই না হতো!"
এবার একটু পরিচয় করিয়ে দেওয়া যাক গল্পের মূল চরিত্র আয়রা ইসলাম ইরা-র সঙ্গে।
আয়রা ইসলাম ইরা— মির্জা পরিবারের ছোট মেয়ে। বাবা আহসান মির্জা ও মা মেহেরুন্নেসার চোখের মণি। বয়স সবে সতেরো ছুঁয়েছে, পড়ছে দশম শ্রেণিতে। তারা দুই ভাই-বোন। ইরার বড় ভাই সাফিন আহমেদ সাফওয়ান মির্জা। বয়স চব্বিশ, পড়ালেখা শেষ করে সবেমাত্র বাবার ব্যবসার হাল ধরেছে।
মির্জা পরিবারটি একটি যৌথ পরিবার। আহসান মির্জা ও তাঁর ছোট ভাই রিজওয়ান মির্জা একই ছাদের নিচে থাকেন। রিজওয়ান মির্জার স্ত্রী সুলতানা রাজিয়া। এই দম্পতিরও দুই সন্তান— চৌদ্দ বছরের ছেলে ইজান, যে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে; আর দশ বছরের ছোট মেয়ে আরিয়া, পরিবারের সবার আদুরে ছোট বোন।
ভিজে ভিজে হাঁটতে হাঁটতেই হঠাৎ ইরার মনে পড়ল এক জরুরি কথা— আজ তো বড় ভাই সাফওয়ানের সঙ্গে এয়ারপোর্টে যাওয়ার কথা! সাফওয়ানের শৈশবের সবচেয়ে কাছের বন্ধু ইশান আজ বিদেশ থেকে ফিরছে।
কথাটা মনে হতেই ইরা আর এক মুহূর্তও দেরি করল না, পা চালিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিল।
বাড়িতে পা দিতেই মা মেহেরুন্নেসা আঁতকে উঠে বললেন,
"কিরে ইরা! একদম চপচপে হয়ে ভিজেছিস যে? যা, তাড়াতাড়ি গিয়ে জামাকাপড় বদলে নে।"
"আচ্ছা, মা।"
বলেই ইরা মায়ের কথা এড়িয়ে সোজা গিয়ে ঢুকলো সাফওয়ানের রুমে।
সাফওয়ান ব্যস্ত ভঙ্গিতে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,
"ইরা, দ্রুত রেডি হয়ে নে। আমাদের এখনই বের হতে হবে, দেরি হয়ে যাচ্ছে।"
ইরা চুপচাপ মাথা নেড়ে নিজের রুমের দিকে পা বাড়াল।
ঠিক তখনই সাফওয়ানের ফোনটা সশব্দে বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে নাম— ইশান।
কলটা রিসিভ করে কানে তুলতেই ওপাশ থেকে ভেসে এল ইশানের ভারী ও গম্ভীর কণ্ঠ—
"কী বলেছিলাম, মনে আছে তো, সাফওয়ান?"
সাফওয়ান ঠোঁটের কোণে একটি রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে তুলে শান্ত স্বরে জবাব দিল,
"হ্যাঁ... প্রতিটা শব্দ মনে আছে।"
(চলবে...)