ফন্ট সাইজ:
থিম:
হৃদয়ের কোণে শুধু তুই

৬ষ্ঠ পর্ব

লেখক: Afifa Maksura Esha

হৃদয়ের কোণে শুধু তুই

আফিফা মাকসুরা এশা 
পাঠ—৬

ফারদিন তখন মাটিতে পড়ে কাতরাচ্ছে। মার খেয়ে তার শরীরের যেন আর কোনো শক্তিই অবশিষ্ট নেই। চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসছে।
বাইকার ছেলেটির কথাগুলো শুনে ফারদিন অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। কিন্তু কিছু বলার মতো শক্তি তার নেই।
বাইকার ছেলেটি পকেট থেকে ফোন বের করে কাউকে কল দিল।
—এখানে চলে আয়। জরুরি কাজ আছে।
কথাটা বলেই সে ফোন কেটে দিল।
প্রায় পাঁচ মিনিট পর একজন ছেলে সেখানে এসে উপস্থিত হলো। ততক্ষণে ফারদিন মার খেয়ে জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে আছে।
বাইকার ছেলেটি নতুন আসা ছেলেটির দিকে তাকিয়ে বলল,
—ওকে হাসপাতালে ভর্তি করে দিয়ে আসবি। আর চিকিৎসার যত খরচ হবে, সব তুই দিয়ে দিবি।
ছেলেটি মাথা নেড়ে বলল,
—ঠিক আছে।
বাইকার ছেলেটি আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। বাইকে উঠে দ্রুত সেখান থেকে চলে গেল। অন্য ছেলেটি ফারদিনকে গাড়িতে তুলে হাসপাতালে নিয়ে গেল।
পরদিন সকাল।
ইরা, রিদি আর নুরি প্রতিদিনের মতো স্কুলে গেল। স্কুলে পৌঁছাতেই তারা একটি খবর শুনতে পেল—ফারদিনকে কে বা কারা যেন মারধর করেছে। মার খেয়ে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
খবরটা শুনে ইরা, রিদি আর নুরি ভীষণ খুশি হলো। তবে নুরির মনে কোথাও একটা খটকা লাগল।
ফারদিনকে কে মারল? আর কেনই বা মারল?
ক্লাস শেষ করে বাড়ি ফিরে নুরি সরাসরি ইশানের কাছে গেল।
—ভাইয়া, জানো? ফারদিন ভাইয়াকে কে বা কারা যেন মেরেছে!
ইশান খবরটা শুনেও তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। নুরি কিছুক্ষণ ইশানের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
—ইশান ভাইয়া, তুমি কি কিছু জানো? কে মারতে পারে? আমার তো মনে হচ্ছে তুমি কিছু জানো।
ইশান নুরির দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
—নুরি, তুই ছোট। তোর এসব জানতে হবে না, বুঝতেও হবে না।
নুরি আর কিছু বলল না। তবে ইশানের কথায় তার সন্দেহ আরও বেড়ে গেল।
এভাবেই কেটে গেল কয়েকটা দিন।
আজ ১৪ সেপ্টেম্বর। আগামীকাল ১৫ সেপ্টেম্বর তাসফিয়ার বিয়ের অনুষ্ঠান।
চৌধুরী বাড়িতে আজ থেকেই শুরু হয়েছে বিশাল আয়োজন। বাড়ির একপাশে বাগানের দিকে সাজসজ্জার কাজ চলছে। একের পর এক আত্মীয়স্বজন এসে হাজির হচ্ছে। ইশানের নানাবাড়ি থেকেও অনেক মানুষ এসেছে। তাসফিয়ার নানাবাড়ির লোকজনও সবাই এসে পৌঁছেছে।
পুরো বাড়ি যেন আনন্দে মেতে উঠেছে।
নুরি ইশানের কাছে এসে বলল,
—ভাইয়া, ইরাকেও নিয়ে আসো না।
ইশান সাফওয়ানকে ফোন দিয়ে বলল,
—তোরা আসবি কখন? তুই আর ইরা আজই চলে আয়। নুরিও বলছিল ইরাকে নিয়ে আসতে।
সাফওয়ান বলল,
—আমি আজ যেতে পারব না। কাল একেবারেই যাব।
নুরি পাশেই ছিল। সে সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
—সাফওয়ান ভাইয়া, ইরা আপুকে তাহলে দিয়ে যাও।
সাফওয়ান বলল,
—আচ্ছা, দেখছি।
কথাটা বলে ফোন কেটে দিল। কিছুক্ষণ পর সাফওয়ান ইরার রুমে গিয়ে বলল,
—বনু, রেডি হয়ে নে। চৌধুরী বাড়িতে যেতে হবে। তুই আজকে যাবি শুধু, আর আমরা কাল যাব।
ইরা কথাটা শুনে চোখ বড় বড় করে বলল,
—না, আমি যাব না! একা ওই বাড়িতে গিয়ে যদি কিছু হয়? কেউ যদি কিছু বলে?
সাফওয়ান ইরাকে বুঝিয়ে বলল,
—কিছু হবে না। নুরি আর ফারহানা তো আছেই। তা ছাড়া ইশানও থাকবে। তুই চিন্তা করিস না।
অনেক বুঝিয়ে শেষ পর্যন্ত ইরাকে রাজি করাল সাফওয়ান।
—তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নে। আমরা এখনই বের হব। আমি বাবা-মাকে বলে আসি।
ইরা তৈরি হতে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর সাফওয়ান বাবা-মাকে জানিয়ে ইরাকে সঙ্গে নিয়ে চৌধুরী বাড়ির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ল।
চৌধুরী বাড়িতে পৌঁছে সাফওয়ান ইরাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে ইশানের দিকে তাকিয়ে বলল,
—আমার বোনকে দেখে রাখিস। ওর যেন কোনো সমস্যা না হয়।
ইশান মাথা নাড়ল।
নুরি ছুটে এসে ইরাকে ভেতরে নিয়ে গেল। সাফওয়ানও ইশানের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলে চলে গেল।
নুরি ইরাকে নিয়ে ভেতরে ঢুকতেই ইরা সবার সঙ্গে কুশল বিনিময় করল। এরপর নুরি, ফারহানা ও ইরা তাসফিয়ার কাছে গেল। সেখানে সব কাজিন মিলে হাসি-ঠাট্টা আর আড্ডায় মেতে উঠল।
কিছুক্ষণ পর নুরি এসে ইরাকে বলল,
—ইরা আপু, ইশান ভাইয়া তোমাকে ডাকছে।
ইরা একটু চমকে গেল। নুরির সঙ্গে করে সে ইশানের কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
নুরি বলল,
—তোমরা কথা বলো, আমি একটু ওইদিকে যাচ্ছি।
কথাটা বলে নুরি সরে গেল।
ইরা আজ ইশানের খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছে। অজানা এক ভয়ে তার দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম। ইশান বেশ লম্বা। পরনে কালো শার্ট, শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো, এক হাতে ঘড়ি, সিল্কি চুলগুলো কপালের ওপর এলোমেলো হয়ে আছে আর হালকা বাদামি চোখ দুটো যেন আরও গভীর লাগছে। চারপাশের রঙিন আলোর মাঝে আজ ইশানকে অসম্ভব সুদর্শন লাগছে।
ইরা অন্যমনস্ক হয়ে কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। হঠাৎ ইশান আঙুলে তুড়ি বাজিয়ে বলল,
—কোন ভাবনার রাজ্যে ডুবে যাচ্ছো, হুম?
ইরা চমকে বাস্তবে ফিরে এলো।
—ইশান ভাইয়া, কিছু বলছিলেন? সরি, আমি বুঝতে পারিনি।
ইশান বলল,
—নুরি আর ফারহানার সঙ্গেই থেকো।
কথাটা বলে ইশান সেখান থেকে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর নুরিও ফিরে এলো।
এদিকে ফারহানা একটু দূরে দাঁড়িয়ে পুরো ঘটনাটা দেখছিল। নুরি ফারহানার কাছে গিয়ে বলল,
—কী হয়েছে আপু? ওখানে দাঁড়িয়ে আছো কেন?
ইতিমধ্যে ইরাও তাদের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। ফারহানা মৃদু স্বরে বলল,
—না, কিছু না। এমনিই তো।
কথা না বাড়িয়ে তিনজন বসার ঘরের দিকে চলে গেল।
সন্ধ্যার দিকে হঠাৎ ইরার মনটা খারাপ হতে লাগল। নুরি বিষয়টা বুঝতে পেরে ইরা আর ফারহানাকে নিয়ে ছাদ-এ গেল গল্প করতে।
কিছুক্ষণ পর নিচ থেকে ফারহানাকে কেউ ডেকে পাঠাল। ফারহানা ছাদ থেকে নেমে গেল। বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেলেও ফারহানা আসছে না দেখে নুরি বলল,
—ইরা আপু, তুমি এখানে থাকো। আমি ফারহানা আপুকে ডেকে নিয়ে আসছি।
কথাটা বলে নুরি নিচে চলে গেল।
ইরা একা একা ছাদের দেওয়ালে কনুই রেখে, গালে দুই হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে নিচের দৃশ্য দেখতে লাগল। চারপাশে রঙিন আলোয় পুরো ছাদটা ঝলমল করছে। হালকা হালকা মৃদু বাতাস বইছে
হঠাৎ কোথা থেকে যেন ইশান ছাদে এসে হাজির হলো। ইরা কারও উপস্থিতি টের পেয়ে পেছনে ফিরে তাকাতেই দেখল—ইশান ভাইয়া।
আজ ইরার পরনে মেরুন রঙের একটি গাউন। মেয়েটাকে এমনিতেই সুন্দর লাগে, তবে খোলা চুল বাতাসে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। চারপাশের রঙিন আলোর মাঝে আজ যেন তাকে একটু বেশিই মায়াবী লাগছে। ইশানের হৃদয়ে যেনো তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে এই রমনির মুগ্ধতায়। 
ইশান ইরার দিকে তাকিয়ে বলল,
—ইরা, তুমি এখানে একা একা কী করছো? কিছু কি হয়েছে? মন খারাপ? কেউ কিছু বলেছে?
ইরা নিচু স্বরে বলল,
—না, ইশান ভাইয়া। তেমন কিছু না, এমনিই দাঁড়িয়ে আছি।
ঠিক তখনই হঠাৎ পুরো বাড়িতে লোডশেডিং হয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যে চারপাশ অন্ধকারে ডুবে গেল।
ইরা ভয় পেয়ে গেল। নিচে তখন সবার মধ্যে হৈচৈ পড়ে গেছে। এদিকে ইশানের ফোনের ব্যাটারিও লো, কী একটা অবস্থা!
ইরা অন্ধকারে ছাদ থেকে নামার জন্য সিঁড়ির দিকে এগোতে লাগল। কিন্তু কিসের সঙ্গে যেন হোঁচট খেয়ে পড়ে যেতে নিলে ইশান চট করে এগিয়ে এসে ইরার কোমর ধরে ফেলল।
ঠিক সেই মুহূর্তেই নুরি আর ফারহানা ছাদে এসে হাজির হলো। চোখের সামনে এই দৃশ্য দেখে দুজনেই যেন বরফের মতো জমে দাঁড়িয়ে রইল!
ইরা লজ্জায় দ্রুত সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।
ইশান গম্ভীর গলায় বলল,
—বি কেয়ারফুল।
কথাটা বলে ইশান ছাদ থেকে নেমে চলে গেল।
ইশান চলে যেতেই নুরি আর ফারহানা সামনে এল। নুরি মুচকি হেসে বলল,
—লোডশেডিং হয়েছে, পুরো বাড়ি অন্ধকার। তুমি ভয় পাবে বলে নিতে এসেছিলাম। এখন তো দেখি ইতিহাস হয়ে গেল!
ইরা লজ্জায় আমতা আমতা করে বলল,
—আমি তো কিছু ইচ্ছে করে করিনি! আমি নিচে চলে যেতে চাইছিলাম, কিন্তু কীভাবে যেন পড়ে যেতে নিলাম। পরে তো তোমরা দেখলেই...
নুরি হেসে বলল,
—আচ্ছা, এসব বাদ দাও। যা হওয়ার হয়েছে। এবার চলো ইরা আপু, ফারহানা আপু, আমরা নিচে যাই।
ইরা আর নুরি নিচে চলে গেল।
কিন্তু ফারহানা কিছু বলল না। তার মনের ভেতর তখন প্রচণ্ড রাগ আর হিংসে কাজ করছিল। কারণ, সে যে মনে মনে তার ইশান ভাইয়াকে ভালোবাসে! আজ নিজের চোখের সামনে ইশানের সঙ্গে ইরাকে এতটা কাছাকাছি দেখে তার বুকটা যেন জ্বলে-পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে।
(চলবে...)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৬ষ্ঠ পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন