ফন্ট সাইজ:
থিম:
হৃদয়ের কোণে শুধু তুই

৫ম পর্ব

লেখক: Afifa Maksura Esha

 "হৃদয়ের কোণে শুধু তুই"

আফিফা মাকসুরা এশা 
পাঠ–৫

পরদিন সকাল।
চৌধুরী বাড়িতে সকালের স্নিগ্ধ রোদের সঙ্গে সঙ্গেই রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে টুংটাং শব্দ। চারপাশে যেন সকালের চা-পানের আমেজ।
ইশান ফ্রেশ হয়ে নীল রঙের একটি শার্ট পরে নিচে নামল। ড্রয়িংরুমে এসে বসতেই নুরিও ইশানের পাশে এসে বসল। মুখে মিষ্টি হাসি ঝুলিয়ে বলল,
—ইশান ভাইয়া, একটা কথা ছিল। শোনো না!
ইশান চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে নুরির দিকে তাকাল।
—কী ব্যাপার? এত সকালে এত মিষ্টি কথা! কোনো আবদার আছে বুঝি?
নুরি গাল ফুলিয়ে বলল,
—আবদার না, কাজ। আমি আর ফারহানা আপু আজ ইরা আপুকে দেখতে মির্জা বাড়িতে যাব। তুমি আমাদের নিয়ে যাবে, কিন্তু!
ইশান চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে বলল,
—ঠিক আছে। বিকেলে বের হব। আমি সাফওয়ানকে জানিয়ে দিচ্ছি।
বিকেল চারটায় বের হবে নুরি, ইশান ও ফারহানা। সকালের খাওয়া-দাওয়া শেষ করে সবাই যার যার কাজে চলে গেল।
ওদিকে মির্জা বাড়িতে আজ সকাল সকাল রিদি এসেছে ইরার সঙ্গে দেখা করতে। দুজন মিলে গল্প করছিল।
হঠাৎ রিদি বলল,
—কাল সাফওয়ান ভাইয়ার বন্ধু ইশান ভাইয়া তোমাকে কোলে তুলে গাড়িতে উঠিয়েছিল, তাই না?
রিদির কথা শুনে ইরা লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল।
রিদি মুচকি হেসে বলল,
—ইশান ভাইয়া লোকটা বেশ গম্ভীর মনে হলো।
ইরা মৃদু স্বরে বলল,
—হ্যাঁ, আমি ইশান ভাইয়াকে দেখেছি। দেখতে বেশ ভালোই।
ঠিক তখনই ইরার মা এসে হাজির হলেন। রিদির জন্য নাস্তা নিয়ে এসেছেন। ইরাও তখন পর্যন্ত কিছু খায়নি। তাই ইরার মা জোর করে তাকেও কিছু খাইয়ে দিয়ে চলে গেলেন।
ইরা আর রিদি আরও কিছুক্ষণ গল্পগুজব করল। একসময় রিদি বাড়ি যাওয়ার জন্য উঠল। সবাইকে বিদায় জানিয়ে সে বেরিয়ে পড়ল।
রুমে শুয়ে থাকতে থাকতে ইরার বেশ বিরক্ত লাগছিল। তাই ধীরে ধীরে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে ঠান্ডা বাতাস বইছে। ইরা কিছুক্ষণ সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল।
বিকেল চারটা।
চৌধুরী বাড়ি থেকে ইশান, নুরি ও ফারহানা তৈরি হয়ে বের হলো। গাড়ি আপন গতিতে ছুটে চলছে। ইশান ড্রাইভ করছে। ফারহানা জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে, আর নুরি ইশানকে একের পর এক প্রশ্ন করে যাচ্ছে।
এভাবেই একসময় তারা মির্জা বাড়িতে পৌঁছে গেল।
গাড়ি থেকে নেমে ভেতরে ঢুকতেই দেখল, সাফওয়ান তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। সবাই সাফওয়ানের মা ও চাচির সঙ্গে কুশল বিনিময় করল।
এরপর নুরি ও ফারহানা গেল ইরার রুমে। আর ইশান নিচে বসে সবার সঙ্গে কথা বলতে লাগল।
নুরি ও ফারহানা ইরার রুমে গিয়ে বেশ কিছুক্ষণ গল্প করল। কিছুক্ষণ পর তারা রুম থেকে বেরিয়ে এলো।
তারা চলে যাওয়ার পর ইশান ধীরে ধীরে ইরার রুমের দিকে গেল।
ইশানকে রুমে ঢুকতে দেখে ইরার যেন হঠাৎ হার্টবিট বেড়ে গেল। অকারণেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধকধক করতে লাগল।
ইশান ইরার দিকে তাকিয়ে বলল,
—ভয় পেয়ো না। এখন শরীর কেমন আছে?
ইরা মৃদু স্বরে উত্তর দিল,
—হ্যাঁ, এখন ঠিক আছি।
ইশান কিছুটা গম্ভীর হয়ে বলল,
—উঠে যাওয়ার পর থেকে দেখে-শুনে চলাফেরা করবে। আর রাস্তায় হাঁটার সময় কী, চোখ হাতে নিয়ে হাঁটো নাকি, যে এমন দুর্ঘটনা ঘটাও? আর কখনো যেন এমন না হয়। নেক্সট টাইম সাবধানে থাকবে। দেখেছ তো, তোমার জন্য কতগুলো মানুষ কষ্ট পেয়েছে?
একটু থেমে ইশান বলল,
—ওকে, বাই। টেক কেয়ার।
ইরাও বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নেড়ে বলল,
—হ্যাঁ।
ইশান রুম থেকে বেরিয়ে যেতেই ইরা নিজের মনেই বলে উঠল,
—ইশান ভাইয়া কি আমাকে হুমকি দিল, নাকি শাসন করল?
সন্ধ্যা সাতটা।
ইশান, নুরি ও ফারহানা বাড়িতে ফিরে এসেছে। নুরি ও ফারহানা পড়তে বসে গেল। আর ইশান নিজের রুমে ল্যাপটপে কী যেন কাজ করছিল।
রাত নয়টার দিকে ইশানের মা ও চাচি সবাইকে খাবারের জন্য ডাকলেন। সবাই এক টেবিলে বসে খাওয়া-দাওয়া শেষ করল।
খাওয়া শেষে সবাই কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলে ইশানের বাবা শাহরিয়ার চৌধুরী বললেন,
—ইকবালের মেয়ে তাসফিয়ার বিয়ের অনুষ্ঠানটা আমরা ভালোভাবে আয়োজন করব। তাসফিয়ার বিয়েটা সেভাবে অনুষ্ঠান করে করা হয়নি। তার ওপর ইশান তখন দেশেও ছিল না। আরও কিছু কারণ ছিল। তাই ভাবছি এবার সবাইকে নিয়ে সুন্দর করে অনুষ্ঠানটা করব।
সবাই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে লাগল।
শেষ পর্যন্ত ঠিক হলো, দুই সপ্তাহ পর, অর্থাৎ সেপ্টেম্বরের ১৫ তারিখে তাসফিয়ার বিয়ের অনুষ্ঠান করা হবে।
আলোচনা শেষ হলে সবাই যে যার রুমে চলে গেল।
নুরি আর ফারহানা তো ভীষণ খুশি। বিয়ের অনুষ্ঠান নিয়ে দুজনের মধ্যে তখন থেকেই নানা পরিকল্পনা শুরু হয়ে গেল।
দেখতে দেখতে কেটে গেল এক সপ্তাহ।
ইরাও পুরোপুরি সুস্থ হয়ে স্কুলে যাওয়া শুরু করেছে। অন্যদিকে ইশানও ভীষণ ব্যস্ত। বাবাকে যে বলেছিল, সে নিজে ব্যবসা করবে—সেই কারণেই এখন নিজের ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।
একদিন স্কুলে টিফিন টাইমে ইরা আর রিদি একটু বাইরে গিয়েছিল। সেই ফাঁকে কে যেন ইরার ব্যাগের ভেতর একটি চকলেট আর একটি চিঠি রেখে গেছে।
ক্লাসে ফিরে ব্যাগ খুলে চিঠি আর চকলেট দেখে ইরা ও রিদি দুজনেই অবাক হয়ে গেল।
রিদি বলল,
—এগুলো কে দিল?
ইরা মাথা নাড়িয়ে বলল,
—জানি না!
দুজনেই কৌতূহলী হয়ে চিঠিটা নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল।
রিদি চিঠিটা খুলে পড়তে শুরু করল।
চিঠির শুরুতেই লেখা—
“প্রিয় ইরাবতী,
কী বলে শুরু করব বুঝতে পারছি না। আগেই বলে রাখি, কোনো ভুল হলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখো। আমি কিছুদিন যাবৎ তোমাকে নজরে রাখছি। তোমার হাসি, তোমার দুষ্টুমি—সবকিছুই আমার বেশ ভালো লাগে।
আসল কথা বলেই ফেলি। সত্যি বলতে, ইরাবতী, আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি। আমাকে ফিরিয়ে দিয়ো না, প্লিজ…”
এরপরের লেখাটা আর পড়া হলো না। কারণ এর মধ্যেই ম্যাম ক্লাসে চলে এসেছেন। তাই ইরা আর রিদি তাড়াতাড়ি চিঠিটা নিয়ে ক্লাসে চলে গেল।
শুধু চিঠির শেষ নামটা চোখে পড়েছিল—
“ইতি,
ফারদিন।”
ছুটি শেষে ইরা আর রিদি হেঁটে বাড়ি ফিরছিল। হঠাৎ একটি ছেলে এসে তাদের সামনে দাঁড়াল।
ছেলেটি ইরার দিকে তাকিয়ে বলল,
—ইরা, চিঠিটা পড়েছ?
ইরা অবাক হয়ে বলল,
—কে আপনি? আর চিঠি আর চকলেটগুলো আপনি দিয়েছেন?
ছেলেটি মৃদু হেসে বলল,
—হ্যাঁ, আমিই দিয়েছি।
ইরা চিঠি আর চকলেটগুলো ফিরিয়ে দিতে চাইলে ফারদিন সেগুলো নিতে চাইল না।
ইরা তখন রিদির হাতে দিয়ে বলল,
—রিদি, এসব ওনাকে ফিরিয়ে দে। আমি এসব নেব না।
রিদি ইরার কথা মতো সবকিছু ফারদিনকে ফিরিয়ে দিল।
এরপর ইরা আর রিদি বাড়ির পথে হাঁটা দিল।
কিন্তু তাদের অজান্তেই পুরো ঘটনাটা নুরি দেখে ফেলেছিল।
নুরি বাড়ি ফিরে ফ্রেশ হয়ে বসার ঘরে গিয়ে ফারহানার সঙ্গে ঘটনাটা বলতে শুরু করল। তখনই ইশানও সেখানে এসে কিছু কথা শুনতে পেল।
ইশান নুরিকে ডেকে বলল,
—নুরি, আজ স্কুলে কী হয়েছিল? ইরাকে কে কী বলেছে?
নুরি ভ্রু কুঁচকে বলল,
—ভাইয়া, তোমাকে বলব কেন? তুমি শুনে কী করবে?
ইশান কিছুটা গম্ভীর হয়ে বলল,
—নুরি, বনু, বল কী হয়েছে।
নুরি এবার আর কিছু লুকাল না। স্কুলে কী হয়েছে, ফারদিন ইরাকে কী দিয়েছে, ইরা কীভাবে সেগুলো ফিরিয়ে দিয়েছে—সবকিছু খুলে বলল।
সবটা শুনে ইশানের পায়ের রক্ত যেন মাথায় উঠে গেল।
নুরি চলে যাওয়ার পর ইশান সঙ্গে সঙ্গে সাফওয়ানকে ফোন দিল।
—কাল একটা ছেলেকে উত্তম-মধ্যম ধোলাই দিতে হবে!
সাফওয়ান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
—কেন? কে আবার কী করল?
ইশান রাগী গলায় বলল,
—কেন, তুই জানিস না? ইরা বাড়িতে গিয়ে কিছু বলেনি?
সাফওয়ান আরও অবাক হয়ে বলল,
—ইরা কী বলবে?
ইশান এক মুহূর্ত নীরব থেকে সাফওয়ানকে জবাব দিল,
—"ফারদিন নামের একটা ছেলে ইরাকে চিঠি আর চকলেট দিয়ে প্রেম নিবেদন করার দুঃসাহস করেছে!"
সাফওয়ান তা শুনে কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। তবে সামলে নিয়ে বলল,
—"ইরা কি এসব গ্রহণ করেছিল? আমার মনে হয় না আমার বোন এসব ছাইপাশ নেবে। ইশান, তুই এখনই এত সিরিয়াস হোস না। আপাতত ছেড়ে দে। যদি ছেলেটা আবারও ওকে ডিস্টার্ব করে, তখন দেখা যাবে।"
ইশান ফোনের ওপাশে দাঁতে দাঁত চেপে রাগ সামলে নিল, কিন্তু মনে মনে ঠিকই নিজের সিদ্ধান্ত ছকে ফেলল।
পরদিন সকাল।
প্রতিদিনের মতোই সবাই চৌধুরী বাড়ির খাবার টেবিলে এক সঙ্গে বসল। ইশানের বাবা শাহরিয়ার চৌধুরী চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন,
—"তাসফিয়ার অনুষ্ঠানের আর মাত্র ছয় দিন বাকি। আজ থেকে আত্মীয়স্বজনদের আমন্ত্রণ জানানো শুরু করতে হবে। আর সাফওয়ানদের মির্জা বাড়িতে গিয়ে সবাইকে আসার অনুরোধ জানিয়ে এসো। আমার কিছু কাজ আছে, তাই আজ আমি নিজে যেতে পারছি না।"
ইশান শান্ত কণ্ঠে বলল,
—"বাবা, আমার অফিসে কিছু জরুরি কাজ আছে। আমি কাজ শেষ করে ফেরার পথে ওদের দাওয়াতটা দিয়ে আসব।"
কথা শেষে সবাই প্রাতরাশ সেরে নিজ নিজ গন্তব্যে বেরিয়ে পড়ল।
ওদিকে মির্জা বাড়িতে আজ সাফওয়ান নিজেই ইরাকে স্কুলে পৌঁছে দেওয়ার জন্য তৈরি হলো।
গাড়িতে উঠে সাফওয়ান আলতো করে বোনকে জিজ্ঞেস করল,
—"ইরা, কাল কি স্কুলে কোনো ঝামেলা হয়েছিল? যেকোনো সমস্যা হলে আমাকে নিঃসংকোচে বলতে পারিস।"
ইরা কিছুটা চমকে উঠে বলল,
—"না ভাইয়া, তেমন কিছু হয়নি তো!"
সাফওয়ান ইরার থমকে যাওয়া চেহারা দেখে আবার বলল,
—"তোর ভয় পাওয়ার কিছু নেই ইরা, সত্যি করে বল কাল কী হয়েছিল।"
সাফওয়ান যখন ছাড়লই না, তখন ইরা নিচু গলায় গতকালের পুরো ঘটনাটা খুলে বলল।
সব শুনে সাফওয়ান গম্ভীর হয়ে বলল,
—"ওই ছেলে যদি আবারও তোকে ডিস্টার্ব করে, সঙ্গে সঙ্গে আমাকে জানাবি। তারপর ওর যা করার আমি করব।"
কথা বলতে বলতে গাড়ি স্কুলের সামনে পৌঁছে গেল। সেখানে রিদি আগে থেকেই ইরার জন্য অপেক্ষা করছিল। ইরাকে নামিয়ে দিয়ে সাফওয়ান অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
টিফিন টাইমে ইরা আর রিদি ক্লাসে বসে গল্প করছিল। হঠাৎ একটি ছোট বাচ্চা মেয়ে এসে ইরাকে বলল,
—"আপু, বাইরে এক ভাইয়া আপনাকে ডেকেছেন। উনি বললেন উনি নাকি আপনার পরিচিত।"
ইরা আর রিদি বেশ অবাক হলো। সাফওয়ান ভাইয়া কিংবা ইশান ভাইয়া তো এত সকালে স্কুলে আসার কথা নয়! তাহলে কে হতে পারে?
কৌতূহল নিয়ে ইরা ও রিদি স্কুলের মাঠের নির্জন এক কোণে গেল। কিন্তু সেখানে গিয়ে যাকে দেখল, তাকে দেখে ইরার পায়ের তলার মাটি সরে যাওয়ার উপক্রম! কালকের সেই ফারদিন দাঁড়িয়ে আছে!
ইরা একমুহূর্তও না দাঁড়িয়ে সোজা উল্টো ঘুরে ক্লাসের দিকে হাঁটা দিল।
পিছন থেকে ফারদিন ডেকেই চলল,
—"ইরা! ইরা, একটু দাঁড়াও!"
কিন্তু ইরা কারও কথা না শুনে সোজা রিদিকে নিয়ে ক্লাসে ফিরে এল। ততক্ষণে শিক্ষকও ক্লাসে চলে এসেছিলেন, তাই পড়া শুরু হয়ে গেল।
স্কুল ছুটি হতেই ইরা ও রিদি দ্রুত বাড়ি ফেরার উদ্দেশ্যে বের হলো। কিন্তু স্কুলের গেট পেরোতেই আবার ফারদিন এসে তাদের পথ আটকাল।
ফারদিন ব্যাকুল গলায় বলতে লাগল,
—"ইরা, প্লিজ আমার প্রস্তাবটা একবার মেনে নাও! আমি তোমায় সত্যিই ভালোবাসি..."
রাস্তায় স্কুলের অন্য শিক্ষার্থীরা দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে তা দেখতে লাগল। ইরা বিরক্তি আর চরম অস্বস্তিতে একপা পিছু হটে যেতেই ফারদিন সব সীমা অতিক্রম করে বসল! সে হুট করে শক্ত করে ইরার ডান হাতটা চেপে ধরল!
ইরা আঁতকে উঠে চেঁচিয়ে বলল,
—"ফারদিন ভাইয়া, হাত ছাড়ুন! কী করছেন এসব?"
ফারদিন হাত না ছেড়ে আরও শক্ত করে ধরে বলল,
—"ইরা, আমি তোমায় প্রচণ্ড ভালোবাসি! প্লিজ না কোরো না!"
রিদি আর ইরা দুজনেই চিৎকার করে ফারদিনকে হাত ছাড়তে বলছিল। পুরো পরিবেশ থমথমে হয়ে উঠল।
এমন সময় নুরি দৌড়ে সেখানে এল। নুরি রেগে গিয়ে বলল,
—"ফারদিন ভাইয়া, আপনি ইরা আপুর হাত ছাড়ুন! আমাদের ভাইয়ারা জানতে পারলে আপনার কিন্তু আর রক্ষা থাকবে না!"
আশপাশে লোক জমতে শুরু করেছে, আর অন্যদিকে অপমানে-লজ্জায় ইরার চোখে টলমল করে পানি জমে উঠেছে। ইরার চোখের পানি দেখে অবশেষে ফারদিন হাতটা ছেড়ে দিল। তবে যাওয়ার আগে হুমকির সুরে বলে গেল,
—"ইরা, তোমাকে আমার হতেই হবে!"
ঘটনার পর ইরা কান্নায় ভেঙে পড়ল। নুরি আর রিদি ওকে কোনোমতে সামলে মির্জা বাড়িতে নিয়ে এল।
ইরা রুমে গিয়েই সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে ঝরনা ছেড়ে দিল। ফারদিন যে হাতটি স্পর্শ করেছিল, তীব্র ঘৃণায় সেই হাতটা বারবার সাবান দিয়ে ঘষে ঘষে ধুতে লাগল সে।
শাওয়ার নিয়ে বেরিয়ে ইরা ধীরপায়ে নিচের বসার ঘরে এসে বসল। তার কোমর অবধি লম্বা ভেজা চুলগুলো থেকে তখনও টুপটুপ করে পানির ফোঁটা ঝরছে।
সেখানে ছোট আরিয়া আর ইজান খেলা করছিল। ইরা তাদের পাশে এসে বসতেই বাইরে ইশানের গাড়ির শব্দ পাওয়া গেল। ইশান চৌধুরী বাড়ির পক্ষ থেকে মির্জা পরিবারকে দাওয়াত দিতে এসেছে।
ইরার মা মেহেরুন্নেসা ড্রয়িংরুমে ঢুকে ইশানকে বসতে বললেন।
ইশানকে দেখেই ইরা সেখান থেকে উঠে নিজের রুমে চলে যেতে চাইল। তা দেখে ইশান শান্ত কিন্তু গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
—"ইরা, বসো। এখন তোমার শরীর পুরোপুরি ঠিক আছে তো?"
ইরা মুখ নিচু করে ইশারায় মাথা নেড়ে জানাল যে সে ঠিক আছে, তারপর দ্রুত রুমে চলে গেল।
ছোট আরিয়া আর ইজান অবাক হয়ে বলল,
—"ইরা আপুর কী হলো আজ? আমাদের সঙ্গে একটুও দুষ্টুমি করল না কেন?"
ইশান বুঝতে পারল কোথাও একটা গভীর গোলমাল হয়েছে। মেহেরুন্নেসা ও সুলতানা রাজিয়ার কাছে ১৫ই সেপ্টেম্বরের তাসফিয়ার বিয়ের অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক নিমন্ত্রণ পৌঁছে দিল সে। ইরার মা শত জোড়াজোড়ি করা সত্ত্বেও ইশান নাস্তা না খেয়েই সেখান থেকে বেরিয়ে এল।
বাড়িতে ফিরেই ইশান নুরিকে নিজের রুমে ডেকে পাঠাল।
নুরি তখন ভয়ে ভয়ে স্কুলে ঘটে যাওয়া বিকেলের পুরো ঘটনাটা—ফারদিনের ইরার হাত চেপে ধরা থেকে শুরু করে ইরার কেঁদে ফেলার দৃশ্য পর্যন্ত সবটা বিস্তারিত বলল।
নুরির মুখ থেকে ঘটনাটি শোনামাত্র ইশানের চোখের দৃষ্টি হিংস্র রূপ নিল। রাগে তার মাথা ফেটে যাওয়ার উপক্রম হলো! তার চোখের সামনে ভেসে উঠল ইরার সেই করুণ মুখ আর ফারদিনের অসম্মানজনক স্পর্শ।
নুরি রুম থেকে বের হতেই ইশান সঙ্গে সঙ্গে সাফওয়ানকে ফোন করল। ক্ষোভে গমগম করে উঠল তার কণ্ঠ,
—"সাফওয়ান, ছেলেটার সব তথ্য আমার এক্ষুণি চাই! ও এই মুহূর্তে কোথায় আছে খোঁজ নে।"
সাফওয়ানেরও ভীষণ রাগ হচ্ছিল। সে তড়িঘড়ি খোঁজ নিয়ে ফারদিনের বর্তমান অবস্থান ইশানকে জানিয়ে দিল।
সন্ধ্যা সাতটা।
ইশান একটি কুচকুচে কালো শার্ট ও জিন্স পরে রুম থেকে বের হলো। তার চোখেমুখে তখন কোনো দয়ামায়ার চিহ্ন নেই, কেবল এক ভয়ংকর আক্রোশ।
কিছুক্ষণ পর...
রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা ফারদিনের সামনে এসে বিকট শব্দে একটা বাইক থামল।
বাইকারের পরনে কালো জ্যাকেট, কালো প্যান্ট আর মাথায় গাঢ় কালো রঙের হেলমেট—মুখ চেনার কোনো উপায় নেই। শুধু হালকা বাদামি চোখ গুলো দেখা যাচ্ছিলো।
বাইকার ছেলেটি হেলমেটের ভেতর থেকেই ভারী কণ্ঠে ফারদিনকে বলল,
—"বাইকে ওঠো। তোমার সঙ্গে একটা অত্যন্ত জরুরি কথা আছে।"
ফারদিন প্রথমে ইতস্তত করলেও ছেলেটির ব্যক্তিত্ব আর গম্ভীর মেজাজ দেখে আর না করতে পারল না। সে বাইকের পেছনে গিয়ে বসল।
বাইকার তাকে শহরের এক নির্জন, পরিত্যক্ত গলির ভেতর নিয়ে গেল। গাড়ি থামতেই ফারদিন কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাইকার ছেলেটি তাকে পটাপট কয়েকটা চড়-থাপ্পড় আর লাথি বসিয়ে দিল!
মার খেয়ে ফারদিন মাটিতে লুটিয়ে পড়লে বাইকার ছেলেটি তার ডান হাতটা ধরে এক নিমেষে মুচড়ে দিল! হাড় মড়মড় করার বিকট শব্দের সাথে সাথে ফারদিনের বুকফাটা চিৎকার পুরো নির্জন এলাকা কাঁপিয়ে তুলল।
হাত ভেঙে দিয়ে ফারদিনকে যন্ত্রণায় ছটফট করতে দেখে বাইকার ছেলেটি তার বুকের ওপর পা দিয়ে নিচু হয়ে শীতল কণ্ঠে বলল,
—"যে হাত দিয়ে তার সীমা লঙ্ঘন করেছিস, সেই হাত আর কোনোদিন কারও দিকে তোলার যোগ্য রইল না। এরপর যদি তার ধারেকাছেও তোকে দেখি, তবে জীবিত বাড়ি ফিরবি না।"
(চলবে...)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন