৩."এই বারো বছরের বাচ্চাকে আমি বউ হিসেবে মানি না! আর কতবার বলতে হবে।"
তীব্রর বিকট চিৎকারে ফ্ল্যাটের ড্রয়িং রুমের দেয়ালগুলো যেন এক মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠল। তার গলার রগগুলো ফুলে উঠে কালচে রূপ ধারণ করেছে। চোখ দিয়ে যেন আগুনের ফুলকি বের হচ্ছে। বারো বছরের অর্শী ভয়ে আসমান চৌধুরীর শার্টের পেছনের অংশ এতটাই শক্ত করে চেপে ধরেছে যে কাপড়ের ভাঁজগুলো কুঁকড়ে গেছে। মেয়েটির ছোট্ট বুকের ভেতরটা যেন একটা খাঁচাবন্দী পাখির মতো উঠানামা করছে। চোখের কোণ বেয়ে টপটপ করে পানি গড়িয়ে নিচে পড়ছে, কিন্তু টু শব্দ করার সাহসটুকুও তার নেই।
আসমান চৌধুরী এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
তিনি আগে থেকেই জানতেন কাজটা সহজ হবে না, কিন্তু তীব্রর এমন রাগী রূপ তিনি আগে কখনো দেখেননি। যে ছেলে ছোটবেলা থেকে শান্ত, সংযমী এবং নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণে সিদ্ধহস্ত, সেই ছেলে আজ চরম রূপ ধারণ করেছে।
"তীব্র, তুই শান্ত হ,"
আসমান চৌধুরী নম্র গলায় বলার চেষ্টা করলেন। "কথাটা শোনার চেষ্টা কর একবার..."
"কী শুনব কাকাই? আর কী শোনার বাকি আছে?"
তীব্র হাত উঠিয়ে আসমানকে থামিয়ে দিল। তার গলার স্বর রাগে কাঁপছিল।
"তুমি ভালো করেই জানো, গ্ৰামে আমার সাথে কী হয়েছে! একটা বিশ্রী, নোংরা জালিয়াতি! দাদী অসুস্থতার ভান করে আমাকে গ্রামে ডেকে পাঠাল, আর তোমরা সবাই মিলে ছক কষে একটা ১২ বছরের বাচ্চাকে আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিলে! তুমি তো সেখানে একমাত্র মানুষ ছিলে কাকাই, যার যথেষ্ট শিক্ষাদীক্ষা আছে! তুমি দাদীকে বোঝাতে পারতে, আমার বাবাকে বলতে পারতে! কিন্তু তুমি কী করলে? উল্টো দাদীর হুকুমের গোলাম হয়ে এই বাচ্চাটাকে নিয়ে আজ আমার ফ্ল্যাটের দরজায় এনে হাজির করলে?"
আসমান চৌধুরী মাথা নিচু করে রইলেন। তাঁর মুখে কোনো উত্তর ছিল না। চৌধুরী পরিবারে তাসলিমা বেগমের হুকুমের ওপর কথা বলার সাহস কারো নেই, এমনকি তীব্রর বাবা আজমল চৌধুরীরও না। আসমান নিজেও তো মায়ের বাধ্য সন্তান হিসেবেই আজ এই মেয়েটিকে নিয়ে ঢাকায় এসেছে।
তীব্র ড্রয়িং রুমে পাইচারি করতে লাগল। তার পরনের শার্টের ওপরের দুটো বোতাম খোলা, হাত দুটো পকেটে গুঁজে সে বিষাক্ত দৃষ্টিতে ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে থাকা অর্শীর দিকে তাকাল।
"তোমরা কি ভেবেছ? এই বাচ্চা মেয়েটাকে এখানে এনে আমার সামনে দাঁড় করিয়ে দিলেই আমি সব আইন-কানুন ভুলে একে 'স্ত্রী' বলে বরণ করে নেব?" তীব্র বিদ্রূপের হাসি হাসল।
"কাকাই, আমি একজন কার্ডিয়াক সার্জন! যে হাত দিয়ে মানুষের জীবন-মরণ ফয়সালা করি, সেই হাত দিয়ে একটা বাল্যবিবাহের মতো সামাজিক অপরাধকে আমি সম্মতি দেব এটা তোমরা ভাবলে কীভাবে?"
অর্শী আরও কিছুটা গুটিয়ে গেল। তার মনে হচ্ছে, সে হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অপরাধটা করে ফেলেছে। তার গ্রামে পড়ালেখার ইচ্ছা ছিল, বন্ধুদের সাথে খেলার বয়স ছিল, কিন্তু কাল রাতে তাকে রক্তবর্ণ বেনারসি পরাণো হলো, আর আজ সে এই বিশাল অচেনা শহরের এক রাগী মানুষের মুখোমুখি হতে হলো! অর্শীর খুব ইচ্ছে করছে নিজের বাবার কাছে ফিরে যেতে, কিন্তু সে জানে, তার গরিব বাবা তাকে এখন আর ফেরত নেবে না।
আসমান চৌধুরী পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য সুর কিছুটা নরম করলেন।
সে নরম গলায় বললেন,
"তীব্র, তুই যা বলছিস তা আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু পরিস্থিতিটা একটু বোঝার চেষ্টা কর। গ্রামে তোকে নিয়ে, এই বিয়েটা নিয়ে কী পরিমাণ কানাঘুষা হচ্ছে তা তুই কল্পনাকাতর হতে পারবি না।আর আমি কি বলছি ও তোর গলায় চিরদিনের মতো ঝুলে থাকবে? আমি তোকে একটা সমাধান দেওয়ার জন্যই এসেছি। তুই এত ভাবছিস কেন? আমি তো আছি! আমি নিজে এখানে তোর ফ্ল্যাটে কয়েকটা দিন থাকব। অর্শীকে আমি আমার কাছেই রাখব। তুই তো দিনে হাসপাতালে থাকবি, তোর সাথে ওর মুখোমুখি হওয়ারও দরকার নেই। কিছুদিন পর পরিস্থিতি একটু শান্ত হলে আমি ওকে অন্য কোথাও নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করব। আপাতত কয়েকটা দিন আমাদের এখানে থাকতে দে।"
"কয়েকদিন? এক দিনও না! এক ঘণ্টাও না!
তীব্র সঙ্গে সঙ্গে গর্জে উঠল। সে আসমানের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে কাঠখোট্টা গলায় বলল,
"একদম না! আমার এই ফ্ল্যাটে ওই গ্রামের নোংরা নাটকের কোনো অংশ প্রবেশ করবে না! আমি এখন হাসপাতালে যাচ্ছি, আমার দুটো ব্যাক-টু-ব্যাক সার্জারি আছে। বিকাল পাঁচটার মধ্যে আমি যখন ডিউটি শেষ করে ফ্ল্যাটে ফিরব, তখন যেন এই রুম তো দূর, আমার ফ্ল্যাটের আশেপাশেও তোমাদের দুজনের ছায়াও না দেখি! বিকালের মধ্যেই একে নিয়ে তুমি এখান থেকে বিদায় হবে। দ্যাট ইজ মাই লাস্ট ওয়ার্ড!"
"বিকেলের মধ্যেই?!"
আসমান চৌধুরী চোখ দুটো বড় বড় করে নাটকীয় ভাবে চিৎকার করে উঠলেন।
"তীব্র, তুই কী বলছিস এসব? সকালের প্রায় সারে পাঁচ ঘণ্টা জার্নি করে আমি এইমাত্র ঢাকায় পা রাখলাম! শরীরটা ক্লান্তিতে ভেঙে আসছে, বাচ্চা মেয়েটাও কাল রাত থেকে কিছু খায়নি ঠিকমতো! আর তুই বলছিস বিকেলের মধ্যে চলে যেতে? এখন আমি কোথায় যাব এই নতুন শহরে এই মেয়েকে নিয়ে?"
"সেটা আমার দেখার বিষয় না কাকাই !"
তীব্র রাগে গজগজ করতে করতে বললো,
আসমান চৌধুরী তখন চূড়ান্ত চালটা দেওয়ার চেষ্টা করলেন। বিষণ্ন ও অসহায়ের মতো মুখ করে বললেন, "কী আর বলব ভাতিজা... তোর ছোটকাকা তো তোর মতো বড় ডাক্তার নয়, ধনাঢ্যও নয়। পকেটে টাকা-পয়সা যা ছিল, কালকের ট্রেনের টিকিট আর কিছু টুকটাক জিনিষ কিনতেই শেষ হয়ে গেছে। এখন আমার কাছে সামান্য টাকাও নেই যে তোর ফ্লাট ছাড়া অন্য কোথাও গিয়ে উঠব! তাই অগত্যা ভাবলাম, তোর ফ্ল্যাটেই তো কদিন থেকে..."
কথা শেষ করতে পারল না আসমান চৌধুরী। তার আগেই তীব্র তার সাইড ব্যাগ থেকে চেক বই বের করল। দ্রুত হাতে কলম চালিয়ে টাকার একটা অঙ্ক লিখে, নিজের স্বাক্ষরটা বসিয়ে চেকটি ছিঁড়ে আসমান চৌধুরীর হাতে একপ্রকার গোঁজে দিল।
"এই নাও!"
তীব্রর কন্ঠম্বর কঠিন বরফের মতো ঠান্ডা ও ধারালো শুনাল।
"এক লাখ টাকার চেক। ঢাকার যেকোনো ভালো হোটেলে গিয়ে ওঠো, ট্রেনের টিকিট কাটো, কিংবা একে আবার শেওড়াতলীতে ওর বাপের বাড়ি পৌঁছে দিয়ে এসো সেটা তোমার বিষয়! কিন্তু বিকেলের পর এই ফ্ল্যাটের আশেপাশে যেন আমি তোমাদের কারো ছায়াও না দেখি!"
চলবে...!
ভুল ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
#অন্তিমে_তুমি
#Rabeya_Sultana_Urmi