ফন্ট সাইজ:
থিম:
তোমায় না চিনেও চেনা

৪২তম পর্ব

লেখক: এইশাত রাদিয়া

গল্প: #তোমায়_না_চিনেও_চেনা

লেখিকা: #সুহাসিনী (এইশাত রাদিয়া)

#পর্ব: ৩৯ (শেষাংশ)

দেখতে দেখতে অনেকদিন কেটে গেছে। চৌধুরী বাড়ির পরিবেশেও কিছুটা বদল হয়েছে। চৌধুরী বাড়িতে এখন দুই পুত্র বধু,ধরতে গেলে এক দিক দিয়ে তিন পুত্র বধু। ইরা, নিশি,রূপা। সবাই অনেক আনন্দেই জীবন অতিবাহিত করছে

চৌধরী বাড়িতে নতুন অতিথি আসতে চলেছে।রূপা প্রেগন্যান্ট। ইরা রূপার প্রেগন্যান্ট হওয়ার কথা শুনে সোজা উদয়ের কাছে গেলো। কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,

ইরা:"আপনি এমন কেনো? স্বার্থপর লোক একটা।"

উদয়:"আমি আবার কি করলাম?"

ইরা:"নিজের স্বার্থের জন্যে অন্যকে কষ্ট দেন।"

উদয়:"আরে কাকে কষ্ট দিয়েছি বলবে তো।"

ইরা:"আমার ভবিষ্যৎ সন্তানদের। ওদের আর কতদিন অপেক্ষায় রাখবেন?আপনি কি ওদের ডাক শুনতে পান না?"

উদয়:"তুমি শুনতে পাও?"

ইরা:"হ্যাঁ শুনতে পাই, ওরা বলছে মাম্মা পাপাকে বলো আমাদের তাড়াতাড়ি দুনিয়াতে আনার ব্যবস্থা করতে।আমাদের আর অপেক্ষা করতে ভালো লাগছে না।"

ইরার কথায় বেশি পাত্তা দিলো না উদয়।নিজে ল্যাপটপের মুখ গুঁজে বসে কাজ করতে থাকল।এতে ইরার রাগ যেনো আকাশচুম্বী হলো। রাগে গজগজ করতে করতে ইরা চলে গেলো নিচে।

~~

রাত বাজে সাড়ে এগারোটার কাছাকাছি।

এখনও ইরা রুমে আসেনি।খাওয়ার টেবিলেও ইরা কেমন যেনো চুপচাপ ছিল। একবারও উদয়ের দিকে মুখে তুলে তাকায়নি।এমন ভান ধরে ছিল যেনো এখানে উদয় বলে কোনো জীব নেই।তখন বিষয়টা উদয় পাত্তা না দিলেও এখন বুঝতে পারছে তার বউ তার উপর অভিমান করে আছে।সে এতক্ষণ মনে করেছে ইরা হয়তো রূপার রুমে আছে তাই মাথা ঘামায়নি। কিন্তু এই শরীরে তো রূপা এতক্ষণ জেগে থাকার কথা না।সে জেগে থাকবে কি সিয়ামই হয়তো এতক্ষনে ওকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে। যবে থেকে ছেলেটা শুনেছে যে সে বাবা হবে তবে থেকে তার কি পরিবর্তন।রূপার প্রতি যত্ন আগের চেয়ে দশ গুণ বেড়ে গেছে। নিজের মধ্যেও অনেক পরিবর্তন এনেছে।

ইরাকে এখনো না আসতে দেখে উদয় নিজেই বেরোলো ইরাকে খুঁজতে। সারা বাড়ি খুঁজে ফেলেছে কিন্তু ইরা কোথাও নেই। উদয় কিছুটা ঘাবড়ে গেলো।কিন্তু পরমুহূর্তেই নিজেকে শান্ত করে ছুটে চলল ছাদের দিকে।ইরাকে ছাদের এক কোনায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকত দেখে চোখ বন্ধ করে লম্বা একটা নিশ্বাস নিল সে।এরপর ধীর পায়ে এগিয়ে গেল ইরার দিকে। পিছন থেকে আলতো হাতে ইরাকে জড়িয়ে ধরে ইরার খোলা চুলে নাক ডোবালো। ইরার কোনো হেলদোল নেই।কেমন পাথর হয়ে আছে। ইরাকে রেসপন্স করতে না দেখে উদয় বললো,

"কাপাকাপির রোগ কি সেরে গেলো নাকি বেটারহাঁফ?"

ইরা নিশ্চুপ। উদয় ইরার অভিমানের কারণ ধরতে পারল ইরাকে নিজের দিকে ঘুরালে দেখতে পেলো ইরার চোখে পানি চিকচিক করছে। উদয় যেনো এবার উতলা হয়ে গেলো।দুহাতের মধ্যে আলতো করে ইরার আদল খানি জড়িয়ে শান্ত কণ্ঠে বললো,

"ডোন্ট ক্রাই, আই সে ডোন্ট ক্রাই বেটারহাঁফ। ওকে বেবি এনে দিবো, আই প্রমিজ বেবি এনে দিবো তোকে। তবুও আমাকে পোড়ানো বন্ধ কর।তোর চোখের পানি আমাকে ভীষণ ভাবে পোড়ায় জানিস তো তুই।"

ইরা এবার উদয়কে নিজের সবটুকু দিয়ে জড়িয়ে ধরলো। উদয়ও নিজের মাঝে ইরাকে ঠাঁই দিলো। কান্নামিশৃত কণ্ঠে ইরা বললো,

"আপনি খুব বাজে জামাইজান।"

ইরার মুখে এমন সম্বোধন শুনে কিছুটা অবাক হলো উদয়। কিন্তু আজকে ইরার আগ্রহ দেখে উদয় আর দেরি করলো না। ইরাকে এক ঝটকায় কোলে তুলে নিলো।দুজনে পারি জমালো নিজেদের সুখের রাজ্যে।

~~

দেখতে দেখতে দশ মাস কেটে গেছে। সুন্দর সময় এবং মুহূর্ত গুলি হয়তো খুব তাড়াতাড়িই শেষ হয়ে যায়। ইরা সোফায় বসে আছে।হাতে পেয়ারার প্লেট। পেটটা অনেক উঁচু। উঁচু তো হবেই নয় মাসের গর্ভবতী বলে কথা।উদয় আর ইরার আবদারে না করতে পারেনি।কিছুদিনের মাথায় ইরাও কনসিভ করে। আজ দুই মাস হলো রুপা আর সিয়ামের ছেলে হয়েছে। এতো খুশির মধ্যে আবার আর একটা নতুন অথিতি আসতে চলেছে। চৌধুরী বাড়িতে সুখ যেনো উপচে পড়ছে।

উদয় বাড়িতে এসে দেখলো ইরা ড্রয়িংরুমে বসে বসে পেয়ারা খাচ্ছে।মেয়েটা একদমই কিছু খেতে পারে না।খেতে গেলেই বমি করে।সারাদিন এই ফলমূল খেয়েই কাটে।একটা রাতেও ঠিক করে ঘুম হয়না। ইরার এই কষ্ট দেখে উদয় ও ঘুমাতে পারে না। ইরার কষ্ট উদয় সহ্য করতে না শুধু নিজেকে দোষারোপ করে।কেনো যে সে ইরার কথা শুনতে গেলো।এখন ইরাকে এতো কষ্ট সহ্য করতে হচ্ছে।

উদয় এসে ইরার পাশে বসলো।ইরা উদয়কে দেখে মলিন হাসলো। আজ কাল খুব বেশি একটা ইরার শরীর ভালো লাগে না। আর মাত্র এক সপ্তাহ পরেই ইরার ডেলিভারী।উদয় আলতো করে ইরার কপালে চুমু খেলো, এরপর পেটে হাত বুলিয়ে সেখানেও চুমু খেলো।এটা তার রোজকার অভ্যাস।বাইরে থেকে আসলেই প্রথম কাজ হচ্ছে এটা।ইরা উদয়কে ফ্রেশ হয়ে আসতে বললো। উদয় চলে গেলো ফ্রেশ হতে।

কিছুক্ষণ পর ইরা আস্তে আস্তে উঠে ডাইনিংয়ে গেলো পানি খেতে।রোকেয়া বেগম কাজ করছেন কিচেনে।এখন ড্রয়িং রুমে কেউ নেই।তাই রোকেয়া বেগমকে ডিস্টার্ব না করে নিজেই গেলো পানি খেতে।চেয়ারে বসে এক গ্লাস পানি শেষ করলো। হঠাৎ রূপার রুম থেকে বাচ্চার কান্না ভেসে এলে ভাবলো হয়তো এমনেই কান্না করছে। কিন্তু অনেকক্ষণ হয়ে যাওয়ায় কান্না না থামায় বুঝলো রূপা হয়তো ওয়াশরুমে। আর লুৎফা বেগম আর লতিফা বেগম এর রুমে উপর তারা শুনবেন না বাচ্চার কান্না।তাই নিজেকে আর ধরে রাখতে না পেরে নিজেই রূপার রুমের দিকে এগিয়ে গেলো।বাচ্চার কান্না তোপ বাড়তে লাগলে ইরা নিজের অজান্তেই পায়ের গতি বাড়িয়ে দিলো।তখনই উদয় সিঁড়ি বেয়ে নামছিল।ইরাকে এতো দ্রুত হাঁটতে দেখে উদয় ভয় পেয়ে যায়।চিৎকার করে বলে উঠে,

"আস্তে পড়ে যাবে।"

উদয়ের কথা শেষ হওয়ার আগেই পায়ে পা বেঁধে ইরা উপর হয়ে পরে গেলো টাইলস মেঝেতে। পড়েই গগন বিদারক চিৎকার করে উঠল সে।মুহূর্তেই ব্লিডিং শুরু হলো।মুহূর্তের জন্য উদয় মাথা চক্কর দিয়ে উঠলো। ইরার চিৎকারে কিচেন থেকে রোকেয়া বেগম বেরিয়ে এলেন।উদয় তাড়াতাড়ি ইরাকে নিজের কোলে তুলে নিলো।ইরা সেন্স হারিয়েছে।রোকেয়া বেগম চিৎকার করে সবাইকে ডাকলেন।এতক্ষনে উদয় ইরাকে নিয়ে গাড়িতে উঠে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে।

ভেতরে অপারেশন চলছে। উদয় বাইরে বসে আছে। ওর কোনো নড়াচড়া নেই।পাথরের মতো জমে গেছে। চোখ জোড়া লাল হয়ে আছে। রোকেয়া বেগম পাশে বসে ফুপাচ্ছেন। সাথে লুৎফা বেগম এসেছেন। এতো বড়ো দুর্ঘটনা ঘটবে কেউ চিন্তাও করতে পারেনি।

প্রায় দুই ঘন্টা পড় ডাক্তার বেরিয়ে জানালো মেয়ে বাচ্চা হয়েছে। মা বাচ্চা দুজনেই ভালো আছে। উদয় চোখ বন্ধ করে দীর্ঘ সময় নিয়ে আলহামদুলিল্লাহ্ পাঠ করলো।

কেবিনে ঢুকে দেখলো ইরা চোখ বন্ধ করে আছে তার পাশেই শুয়ে আছে ছোট্ট একটি প্রাণ। ইরার এমন বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে উদয় আর নিজেকে সামলাতে পারলো না। এতক্ষণ যাবৎ আটকে রাখা আবেগ অনুভূতি বেরিয়ে এলো।ইরার পাশে বসে বাচ্চাদের মতো হাউমাউ করে কাদতে শুরু করলো।উদয়ের এরকম বাচ্চামি দেখে ইরার খুব হাসি পেলো।তার প্রিয় পুরুষটাও যে এভাবে কাদতে পারে এটা তার ধারণার বাইরে।আজ ইরার নিজেকে খুব ভাগ্যবতী মনে হচ্ছে।নিজের বাবা মাকে হারানোর কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব হয়েছে নিজের মেয়েকে পেয়ে। মা হওয়ার অনুভূতি যে এত অদ্ভুত ও সুন্দর সেটা সে ধারণাও করতে পারেনি।নিজের সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরার সাথে সাথে সে এ যাবৎ দুনিয়ায় পাওয়া সকল কষ্ট ভুলে গেছে।ইরা উদয়কে শান্ত হতে বলে ইশারায় বাবুকে কোলে নিতে বললো।উদয় ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে ছোট্ট প্রাণটা ভয়ে ভয়ে নিজের দু হাতের আদলের মাঝখানে খুব যত্ন সহকারে তুলে নিলো। কেমন শীতল অনুভূতি হলো তার মধ্যে।নিজের অংশকে বুকে পেয়ে কলিজাটা কেমন ঠাণ্ডা হয়ে গেলো।এটায় বোধহয় বাবা হওয়ার অনুভূতি।

~~

"ওকে আমার কোলে দেন।খাওয়ার সময় হয়েছে আপনার মেয়ের।"

ইরার কথায় উদয় মুখ ফিরিয়ে তাকায়।তার কোলে তার সাত মাসের মেয়ে ইবনাত।সে বাবার কোলেই থাকতে বেশি পছন্দ করে।এতে ইরার অভিযোগের শেষ নেই।সে দশ মাস পেটে রেখে কষ্ট করলো, ডেলিভারির এতো কষ্ট সহ্য করলো অথচ তার বজ্জাত মেয়ে বজ্জাত বাপ ছাড়া কিছুই বুঝে না। ইবনাতের আচরণে তো ইরার মাঝে মাঝে মনে হয় সে ইবনাতের সৎ মা।

উদয় কথা না বাড়িয়ে মেয়েকে ইরার কোলে দিতে চাইলো।কিন্তু বিপত্তি বাঁধলো তখন যখন ইবনাত মাকে দেখে নাক মুখ কুঁচকে বাবাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো।মেয়ের এই কাণ্ডে উদয় গা দুলিয়ে হেসে উঠলো। এবার ইরার রাগ আর দেখে কে।সে রাগে গজগজ করতে করতে খাবারের বাটি টেবিলে রেখে দাঁতে দাঁত পিষে বললো,

"আপনার বাচ্চাকে আপনিই খাওয়ান।আমাকে যদি এর পর ওর কোনো দরকারে ডাকেন তাহলে কিন্তু আমি আপনার মাথা ফাটিয়ে দিবো।"

উদয়কে কথা বলার সুযোগ না দিয়েই ইরা গট গট পায়ে বেরিয়ে গেলো রুম থেকে। উদয় নিজের মেয়ের দিকে তাকিয়ে দেখলো তার মেয়ে খিলখিল করে হাসছে।সে এই কাণ্ড দেখে ফোঁস করে শ্বাস ছাড়ল। এখন তাকে সব কাজ ফেলে মেয়ের যত্ন করতে হবে।

উদয় বসে খুব যত্ন সহকারে ইবনাত কে খাওয়াতে লাগলো।এর মাঝে ইরা এসে দেখে গেছে বাবা মেয়েকে।

তাঁদের এই ভালোবাসায় যেনো অদূরে আকাশে থাকা চাঁদটাও মিটি মিটি হাসছে। ভালোবাসা জিনিসটা কি অদ্ভুত সুন্দর তাই না।এতো কষ্ট,দহনের পরও মানুষ ভালোবাসার কাঙাল। এতো পড়ানোর মাঝেও ভালোবাসা ঠিকই কোনো এক সময় নতুন করে বাঁচতে শেখায়। তাই তো মানুষ সবসময় সবজায়গায় ভালোবাসা খোঁজে।

-------🌸------ সমাপ্ত ------🌸------

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন