ঠিক কবুল বলার আগ মুহূর্তে আমি অরণ্যা দেওয়ান নিজের জাত-কুল ভুলে ভালোবাসা পুরুষটিকে সকলের সামনে অপমানিত করে বিবাহ নামক সুন্দর সম্পর্কটা নিজে নষ্ট করে দেই। প্রবাহ এহসানের সঙ্গে তিনটা বছর যাবৎ সম্পর্ক ছিল আমার। এটা কী করলাম আমি? বাকিটা জীবন আমাকে আফসোস আর গ্লানি বয়ে বাঁচতে হবে না তো?
দেওয়ান বাড়ির বিবাহ আসরে মুহূর্তের মধ্যেই হইহট্টগোল বেঁধে গেল। কারণ কনে নিজেই সকলের সামনে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে, পাত্রের সঙ্গে তার বিবাহ করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই। অরণ্যা দেওয়ান তখন এক পা এগিয়ে এসে নিজের ফোনটা সবার সামনে তুলে ধরল। এক ক্লিকেই চালু হলো একটি ভিডিও ক্লিপ। স্ক্রিনে ভেসে উঠল প্রবাহ এহসান ও তার এক কলিগের ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের দৃশ্য। চারপাশে ফিসফাস, বিস্ময়, অবিশ্বাস। “দেওয়ান বাড়ির মেয়ের সঙ্গে এই নষ্ট ছেলের কখনোই বিয়ে হতে পারে না!” যদিও নামেই কেবল এরা দেওয়ান, এখন কিছুই নেই বলতে গেলে। তবুও সাদিক দেওয়ানের উগ্র মেজাজ তখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে। শুধু অরণ্যাকে ভালোবাসে বলেই, নিজের মত না থাকলেও এই সম্পর্কটাকে মেনে নিয়েছিলেন সে। নইলে কী দেওয়ান পরিবারের সঙ্গে বংশ-পরিচয়ে ওই ছেলের পরিবার যায়? নিচু জাত ওরা! পুরুষ মানুষের টাকা কামাই না করে ভালো ঘরের মেয়ে বিয়ে করাও যেন পাপ। টাকা যার—নারী তার। বরযাত্রীদের অপমানিত করে, অপদস্ত করে এক প্রকার তাড়িয়েই দেওয়া হলো বিবাহ আসর থেকে। আর প্রবাহ? সে তখন বেহায়ার মতো একের পর এক সবার পায়ে পড়ছে। কাঁদছে, বোঝাচ্ছে এই ছবি, এই ভিডিও—সব মিথ্যা। এসব সত্য নয়। কতটা অসহায় হলে একজন পুরুষ এভাবে শিশুর মতো ভেঙে পড়ে? এই চোখের পানি কি এতটাই ঠুনকো? আজ যদি দেওয়ান বাড়ির মতো
প্রবাহের হাতে টাকা থাকত, নাম থাকত, ক্ষমতা থাকত—তবে কি সবকিছু এভাবে শেষ হয়ে যেত? টাকার মূল্য যে জীবনে কতটা ভয়ংকর, তা এই মুহূর্তে এসে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে প্রবাহ। কিন্তু এখন? ভাঙা কপালের আর্তনাদ নিয়ে সবকিছু চোখের সামনে শেষ হতে দেখা ছাড়া তার আর কোনো উপায় নেই। তিন বছরের ধৈর্যের ফল শেষ মুহূর্তে এসেও তার দিকে ফিরে তাকাল না। প্রবাহের কান্না, হাহাকার অরণ্যার কানে কিছুতেই পৌঁছাল না। সকলের সামনে দাঁড়িয়ে হাহাকার করে, ভিক্ষার মতো সে অরণ্যার কাছেই মিনতি জানাল। কিন্তু পরিশেষে কিছুই মিলল না। প্রবাহ কাঁপা কণ্ঠে বলল, “এর চেয়ে ভালো আমার মরণ চাইতে অরণ্যা। চাও না, অরণ্যা। তবুও এই বিচ্ছেদের কারাগারে আমাকে বন্দী করো না। আগুনের শিকল জোড়া আমার হাতে পরিও না। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে, আমার শ্বাসনালী জ্বলে ছারখার হয়ে যাচ্ছে। এমন দুঃখ দিও না যাতে খোদার দরবারেও
তোমার দেওয়া যন্ত্রণার কথা ভেবে এই বান্দার চোখের জল পড়ে।” অরণ্যা ফিরেও তাকাল না। চোখ দুটো স্থির রইল অন্যদিকে। পাপ করলে শাস্তি মেনে নেওয়া যায়। কারণ সেখানে অন্তত অপরাধের স্বীকারোক্তি থাকে। কিন্তু যে মানুষ পাপ না করেও শাস্তি পায়, তার জন্য এই শাস্তি মেনে নেওয়াটাই সবচেয়ে নির্মম, সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক। কারণ সেখানে দোষ নেই আছে শুধু নিজের আত্মার আহত ধ্বংস।
—
রাত তখন প্রায় দুইটা। বিয়ের লাল বেনারসিটা এখনো অরণ্যার গায়ে জড়ানো। বাইরে সে নির্বাক, অথচ ভেতরে ভেঙেচুরে একেবারে নিঃশেষ। তিন বছরের যত্নে গড়া সংসার যে এত সহজে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে, সে কল্পনাও করেনি। ভাগ্যিস, যেই মেয়ের সঙ্গে প্রবাহ নোংরা খেলায় মেতেছিল, সেই মেয়েটিই বিয়ের আগে ভিডিও আর ছবিগুলো অরণ্যার হাতে তুলে দিয়েছিল। নইলে আজকের পরিণতি আরও ভয়াবহ হতে পারত। তিন বছর আগের কথা। পড়ালেখা শেষ করে সদ্য যোগ দিয়েছিল আন্তর্জাতিক আইটি প্রতিষ্ঠান হেক্সানোভা টেকনোলজিস লিমিটেডে। নিম্নপদ থেকে ধীরে ধীরে ওপরে উঠছিল সে। গুলশানে অবস্থিত রাজকীয় অফিস, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ, এই প্রতিষ্ঠানের একজন সাধারণ কর্মচারী হওয়াটাই অনেকের স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের ভেতরেই অরণ্যার জীবনে প্রবেশ করেছিল প্রবাহ। সিনিয়র, স্মার্ট, সদাচারী সহকর্মীর সঙ্গে কাজ করতে করতেই কখন যে ভালোবাসা জন্ম নিয়েছিল, তা সে নিজেও বুঝতে পারেনি। অফিসের সবাই তাদের ‘সুইট ক্যান্ডি’ বলে ডাকত। সবকিছু স্বাভাবিকই চলছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই কোম্পানির চেয়্যারম্যানের আদুরে ছেলে স্পেন থেকে ফিরে এসে সিইওর আসনে বসে পড়ল। আর সেখান থেকেই সবকিছুর গায়ে একে একে প্যাঁচ লেগে যেতে শুরু করল। প্যাচ তো লাগবেই অফিসের কলিগদের মধ্যে প্রেম নিষিদ্ধ করেছিল সে। এসবের কারনে অরণ্যাকে প্রবাহের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলতে হয়েছে। ভাবনার মাঝেই হঠাৎ ফোন বেজে উঠল। এত রাতে কে? প্রবাহ? তার নম্বর তো অনেক আগেই ব্লকলিস্টে। তাহলে কে এই সময় ফোন করছে? শোকের ভারে মন যখন ভারাক্রান্ত, তখন কি আবার কোনো পুরোনো হিংসুটে বন্ধুর বিষাক্ত খোঁচা? ফোন হাতে নিতেই অরণ্যার মুখে আতঙ্ক জমে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে সেই নাম—তনয় জেইদী। এই মাঝরাতে এই মানুষটার ফোন না এলেই কি ভালো হতো না? যে তার জীবন তছনছ করে দিয়েছে, সে আবার কী চায়? কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো এক কঠোর, গম্ভীর কণ্ঠ, “আধ ঘণ্টার মধ্যে আমার অফিস লাউঞ্জে আসো। জাস্ট কাম ফাস্ট।”
আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই ফোন কেটে গেল। ঘাড়ত্যাড়া লোকটা বরাবরের মতোই। বসের সামনে চুপ থাকলেও, নীরবতার আড়ালে অন্য হিসাব আছে অরণ্যা তা জানে। ক্লান্ত নিঃশ্বাস ছাড়ল সে। রাগ, অপমান আর অসহায়ত্ব একসঙ্গে বুকের ভেতর জমাট বাঁধছে। নিজের চুল মুঠোয় চেপে ধরে শব্দহীন এক চিৎকার আটকে রাখল। চোখের নিচে কাজল গলে কালচে দাগ। ওয়াটারপ্রুফ কাজলও আজ বেইমানি করল। মানুষই বা কম কী করেছে? পাশের বিছানায় ছোট বোন তানিশা গভীর ঘুমে। অরণ্যা নিঃশব্দে উঠে দাঁড়াল। বেরোনোর আগে একবার তানিশার মুখের দিকে তাকাল। এই মানুষগুলোর জন্যই তো সে এখনো শক্ত। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে আরেকবার দেখল। জীবনের মোড় ঘুরে গেছে। বদলে যাওয়া জীবনকে মানিয়ে নিতে পারলেই হয়তো জীবন সুন্দর হয়। কিন্তু সেই সৌন্দর্য কি ক্ষতের বিনিময়ে অর্জিত? পরিবারের ঊর্ধ্বে অরণ্যার কাছে কিছুই নেই। সব হার মানা যায়, কিন্তু পরিবারের অসম্মান নয় কারণ পরিবারের অসম্মান মানেই নিজের অপমান। বিয়ের শাড়িটা গায়ে রেখেই নিজেকে শক্ত করল সে। চোখের জল মুছে, দৃঢ় পায়ে পা বাড়াল তার গন্তব্য "হেক্সানোভা টেকনোলজিস লিমিটেডের" দিকে।
-
এই বিরাট অফিসটা এখন একেবারে নিরিবিলি। সব কিছু কেমন যেন মরা মরা লাগছে। অরণ্যা গায়ে বেনারসিটা ভালো করে জড়ালো। বাইরে ভালো শীত পরেছে। শাড়ির ওপর চাদর জড়িয়ে রাখা তার। এই অফিসের ১০ তলায় তনয় জেইদীর ক্যাবিন। লিফটের সামনে যেতেই দেখল লিফট বন্ধ। কী করে এতগুলো সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠবে? সে তো মহাজগতের কোনো এলিয়েন না। রক্তে-মাংসে গড়া মানুষ। তার ওপর আজকে তার ওপর কত ঝড় বয়ে গিয়েছে! কোথায় এই সময় তার বাসর ঘরে থাকার কথা ছিল আর দেখো ভাগ্য কি খেলাটাই না খেলছে তার সাথে৷ বাসর তো দূরের বিষয়। বিয়েটাও হতে দিলো না আর দেখো এই শীতের রাতে ঘুমের বদলে অফিসে আনিয়েছে বেকার খাটুনির জন্য। এই লোকের এখনই ডাকার দরকার কী ছিল? বিয়ের জন্য তো পায়ে পড়ে তিনদিনের একটা ছুটি নিয়েছিল। তাও ওই খাটাশ লোক বেতন থেকে পনেরোশো টাকা কেটেছে৷ এক দিনের জন্য ৫০০ করে কেটেও যদি শান্তি পাওয়া যেত। অসহ্যকর!
কোনো মতে সিঁড়ি বেয়ে উঠল অরণ্যা। বসের ক্যাবিনের সামনে এসে কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিলো। পানির দরকার তার খুব। কিন্তু এখানে কোনো পানি নেই। গায়ের চাদর
টা খুলে হাতে নিয়েছে সে। গায়ে একেবারে গরম ধরে গেছে। ক্যাবিনের সামনে গিয়ে দরজায় নক করতেই ভেতর থেকে সেই গম্ভীর গলাটা ভেসে এলো, "কাম ইন।"
যাক ভেতরে ঢুকতে তো দিয়েছে এটাই অনেক। অরণ্যাকে তার বস আধঘন্টা সময় দিয়েছিল। সে একেবারে ২ ঘন্টা ব্যয় করে ফেলেছে। রসকষহীন লোকটার বোধ-হয় আজ মন গলেছে। অরণ্যা ভেতরে প্রবেশ করে চেয়ারে দেখতে পেলো না তনয় জেইদী কে। শেষে তার চোখ গেল জানালার কাছে। সেখানেই উল্টো দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তনয়। ব্যাক সাইট থেকে কেবল কালো সুট-প্যান্ট পড়া এক জেন্টেলম্যানকে দেখা যাচ্ছে। অরণ্যা গলা নিচু করে বলল, "আমি এসেছি স্যার।"
তনয় ফিরল না পেছনে, কিছু বললও না। আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে সে। এমা বস আবার কোম্পানি ছেড়ে তারা গোনার ব্যবসায় নেমেছে নাকি? অরণ্যা কিছু বলতে যাবে তার আগেই তনয় পেছন ঘুরল। কালো ব্লেজারের নিচে সাদা শার্ট, কালো ভেস্ট। হাতে রয়াল ঘড়ি। চুলগুলো পেছনে ব্যাকব্লাশ করা। গায়ের রং মিডিয়াম উজ্জ্বল। একেবারে ফর্সা আর শ্যামলার মধ্যকার একটা রঙ। তীক্ষ্ণ চোয়াল, নিস্প্রাণ ঠোঁট, মোটা ভ্রু। চোখের পাপড়ি গুলোও অমায়িক সুন্দর। এত ঘন পাপড়ি তো মেয়ে মানুষেও হয় না। মানুষ এই পাপড়ির জন্য কত্ত কী করে! লম্বায় এই মহাজন নির্গাত ছয় ফুট দুই তো হবেই পাক্কা। তনয় ব্লেজার খুলে চেয়ারের দিকে এগিয়ে এসে বসল। ব্লেজার রেখে শার্টের হাতার বোতাম খুলে হাতা তুলল কনুই অবধি। অরণ্যার চোখ তার আঙুলের দিকে চলে গেল। আঙুলের ওপর সাপের ট্যাটু করা। সাপ তো সাপেরই ট্যাটু করবে। অরণ্যা মনে মনে আরেকবার নাক ছিটকালো। তারপর তনয়কে জিজ্ঞেস করল, "আমি এসেছি তো স্যার।"
"ডিড ইউ কাম অ্যান্ড রেসকিউ মি?"
"নো স্যার।"
"তাহলে মুখটা জাস্ট বন্ধ রাখো ইস্টুপিট।"
অরণ্যা চুপ হয়ে গেল। ভেতরে ভেতরে বিস্ফোরণ হচ্ছে। এই লোকটা আসলেই অসহ্যকর। এমন বস কারো হয়?
"স্যা..র আমার কাজটা কী?"
"শুনলাম তোমার স্বামীর নাকি বিয়ের আগে অন্য কারো সঙ্গে চক্কর ছিল? বিয়ে ভেঙে গেছে?"
অরণ্যার মাথায় বাঁশ পড়ল। বিয়ে ভাঙতে দেরি আর এই লোকের কানে পৌঁছাতে দেরি হলো না। "তোমার এই নিউজ যদি পাবলিকের কানে পৌঁছায় তো আমার কোম্পানির কতোবড় ক্ষতি হবে জানো?"
অরণ্যা এবার সাহস করে বলেই ফেলল, "আমার জানামতে একজন কর্মচারীর পার্সোনাল বিষয়ের কারনে কোম্পানির ওপর কোনো প্রভাব পড়েনা।"
"হোয়াট ডু ইউ মিন? তুমি আমার থেকে বেশি জানো? তোমার ওই এক্স বয়ফ্রেন্ড, প্রবাহ না ঢেউ সে যে আমার পিএর সাথে পরকীয়া করেছে এটা যদি পাবলিকের কানে পৌঁছায় তাহলে কী হবে? সবাই ভাববে এই অফিসে বোধ-হয় পরকীয়া হয় আর তাদের বস তা দেখে মজা নেয়। মিডিয়া তিল থেকে যে তাল বানিয়ে ফেলে আই থিংক সেটা জানা আছে?"
"তাহলে এসব তো স্যার আমাকে নয় যারা পরকীয়া করেছে তাদেরকে বলা উচিত।"
"এই মেয়ে মুখ চালাবে না। কার সামনে দাঁড়িয়ে আছো জানা আছে তো? আমি তনয় জেইদী বেশি কথা পছন্দ করি না। যতটুকু তোমায় বলতে বলা হবে ঠিক ততটুকুই বলবে এর বেশি একটি কথাও নয়। মাইন্ড ইট।"
অরণ্যাকে চুপ থাকতে দেখে তনয় জেইদী পুনরায় বলল, "তুমি রিজাইনমেন্ট লেটারে সাইন করো।"
অরণ্যা অবাক হলো। তার অপরাধ কী? এই চাকরিটা পাওয়ার জন্য কত কী করেছে সে। চাকরি চলে গেলে তার পরিবার চলবে কী করে? অরণ্যার বাবা আজ যতই বড়লোকিপানা করুক না কেন বস্তুত তাদের কিছুই নেই। হ্যাঁ এক সময় দেওয়ানদের অনেক কিছুই ছিল। অরণ্যা এখন মিডেলক্লাস পরিবারের মেয়ে। বড় বোন তনিমার বিয়ে হয়ে গেছে। নিজে সারাদিন পড়ালেখা করে, পাবলিক ভার্সিটি থেকে পড়া শেষ করে, টিউশনি করিয়ে এই অবধি এসেছে। বড় ভাই আরিশ দেওয়ান পড়ালেখায় ভালো ছিল, তবে সেই পড়ালেখা আর তার শেষ করা হয়নি। স্বপ্ন ছিল বিমানের পাইলট হবে। সেই সরকারি চাকরিটাও পাওয়া হলো না আর বাংলার আকাশে আরিশেয়ের আর উড়াও হলো না। আর ছোট বোনটা এখন ইন্টারে উঠল। বাবা একসময় আর্মিতে ছিল। সেই কবেই চাকরির অবসান হলো। অরণ্যা শুনেছে সরকারি চাকরির মানুষগুলো বয়স হতে হতে আরো উন্মাদ হয়ে যায়। মা নাকি সরকারি চাকরিজীবীদের অপছন্দ করতেন, যে জানি নাকি বলেছিল সরকারি চাকরিজিবি বিশেষ করে ডিফেন্সের লোকেদের মাথায় নাট বলটু ঢিলা থাকে। মায়ের মামা মিথ্যা বলে বাবার সঙ্গে মায়ের বিয়ে ঠিক করে, পারিবারিক ভাবে বিয়ে পড়ান। মা পরে জানতে পারে কোথায় এসে পড়েছে। এখনো মা বাবার ওপর প্রায় ক্ষেপে গিয়ে বলেন, "এক পাগলের সঙ্গে মামায় আমায় বিয়ে দিলো রে। জীবনটা শেষ। এমন স্বামী আরে কারো না৷ হোক।" এসব বলার কারন আছে। সবই জানা যাবে তবে আপাতত জেনে রাখো বাবা নামক লোকটা আস্ত একজন স্বার্থপর, কিপ্টে আর মহা লোভী। সে অরণ্যাকে ভালোবাসে? কখনোই না। তার ভালোবাসা কেবল মাস শেষে পাওয়া অরণ্যার পাওয়া কাগজের নোট গুলোর প্রতি। মধ্যবিত্তের বাবা স্বার্থপর হলে বুঝা যায় দুনিয়া কত্ত নিষ্ঠুর! চাকরি গেলে পেটে লাথি পড়বে। বেকার সংসারটা এখন পুরোপুরি অরণ্যার কাঁধে। পেটের কারনে মানুষ সম্মানের কথাও ভাবে না তাই না? এই পেট না থাকলে চুরি থাকত না, লোভ থাকত না, বিশ্বাসঘাতকা থাকত না। অরণ্যা মাথা নিচু করে বলল," স্যার আমাকে ক্ষমা করুন ভুল থাকলে তবুও চাকরি থেকে চলে যেতে বলবেন না।"
"একটা শর্তে রাখতে পারি।"
"আপনিই বলেই দেখুন না।"
"বউ হতে পারবে? তনয় জেইদীর মিসেস হওয়ার হওয়ার সাহস আছে?"
অরণ্যা কিছুক্ষণের জন্য চুপসে যায়। মাথা ঠিক আছে এই লোকের? মানে ছেড়ে কথা বলছে দেখে যা ইচ্ছা তাই বলবে? দরকার নেই এই কোম্পানিতে তার চাকরির৷ সে যোগ্য, কোথাও না কোথাও চাকরি তো অবশ্যই পাবে। অরণ্যা বিয়ের বিষয় নিয়ে কোনো প্রশ্ন না করে বলল,"কাগজ কোথায়? আমি স্বাক্ষর করে দিচ্ছি।"
তনয় আরো শক্ত হলো। সে এবার পকেট থেকে নিজের ফোনটা বের করে একটা ভিডিও ক্লিপ চালু করে অরণ্যার দিকে বাড়িয়ে বলল,"আগে এটা দেখো তারপর সিদ্ধান্ত তোমার ওপর। বিয়ে করবে কী করবে না।"
অরণ্যা ভদ্রতার খাতিরে ফোনটা হাতে নিলো। ভিডিওর দিকে চাইতেই চোখ ছানাবড়া। শরীর কেঁপে উঠল তার। পুরোটা ভিডিও শেষ করার আগেই তনয় হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিয়ে বলল,"ছোট বোনকে খুব ভালোবাসো? দেখো যেই কাজ করার জন্য প্রেমিক কে ছেড়ে দিলে, অপমান করলে সেই একই কাজ তোমার মায়ের পেটের বোনও অন্যের বিছানায় শুয়ে করল। এখন কী করবে? যাই হোক কালকের নিউজ শিরোনামে তোমার বোনকে দেখতে প্রস্তুত তো?" অরণ্যার শরীর ঝাঁকুনি দিলো। এসব কী হচ্ছে তার সাথে। চোখের পানি বাঁধা সহ্য করতে পারছে না। তবুও শক্ত হয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। "আপনি আমার থেকে কী চান স্যার?"
"তোমাকে।"
"আপনি বাড়াবাড়ি করছেন এইবার।"
"বিকজ আই লাইক ইট ডেয়ার।"
চলবে?
#দহনচক্র
#ইশরাত_জাহান_জেরিন
#পর্ব_১
( ফারাজ এলাহী তো নিজের প্রতিশোধের আগুনকে ভালোবেসে একটা সুন্দর সমাপ্তি আপনাদের দিয়ে এইতো বিদায় নিবে নিবে, তাই ভাবলাম আরেকটা থ্রিলার-রোমান্টিক গল্প শুরু করা যায়? তবে মুড শুইং হলে এটা কালকে ডিলিটও করে দিতে পারি🙂 আপনারা সবাই বলুন গল্পটা কেমন লেগেছে? গল্পটা চালিয়ে যাবো কি না? আর শুনন এটাও চিত্রাঙ্গনার মতো একটা প্রতিশোধ মূলক গল্প হতে চলেছে, তবে ভায়োলেন্স চিত্রাঙ্গনার থেকেও বেশি। আর নায়ক পাপিষ্ঠ নাকি ভালো মানুষ সেটা সময়ের সাথে দেখা যাবে।)