#দহনচক্র
#পর্ব_২
#ইশরাত_জাহান_জেরিন
সকাল থেকে দেওয়ান বাড়িতে মানুষের আনাগোনা লেগেই আছে। আসবেই বা না কেন? এই বাড়ির কর্তা যে নিজের মেজো মেয়েকে নিয়ে কত বড় বড় আদর্শের কথা বলতেন! আজ সেই কথাগুলো সবই মিলিয়ে গেছে—ফানুসের মতো আকাশে ভেসে উধাও হয়ে গেছে।
অরণ্যার মুখটা ভার হয়ে আছে। বাবা তার সঙ্গে একটি কথাও বলছেন না। সকালে ভাই আরিশের জন্য চা নিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু আরিশ সেই চা-টুকুও তার হাত থেকে নেয়নি। মাও মুখ গোমড়া করে নিশ্চুপ বসে আছেন।
হঠাৎ করেই অরণ্যার মনে পড়ে গেল গত রাতের ঘটনা। সে তনয় জেইদীকে দুই দিনের সময় দিয়েছে। এভাবে তো হুট করে কোনো সিদ্ধান্ত জানানো যায় না! তবুও তার মনে বিস্ময়ের শেষ নেই তারই বোন তানিশা এমন কাজ করতে পারে, তা ভাবতেও কষ্ট হচ্ছে।
সকালে তানিশার মুখের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিল অরণ্যা। মনে হচ্ছিল, এই নিষ্পাপ মেয়েটি কি সত্যিই এমন কিছু করতে পারে? তানিশা তো সব সময় তার সঙ্গে সব কথা ভাগ করে নিত, কোনো কিছুই লুকাত না। তাহলে হঠাৎ এমন কী ঘটল, যা তাদের সম্পর্কের এই দৃশ্যপটটাকে এভাবে বদলে দিল? অরণ্যার চোখ আলনায় ঝুলিয়ে রাখা তার অফিস ইউনিফর্মের দিকে গেল। তনয় জেইদী বলেছেন, সিদ্ধান্ত যেহেতু ২ দিন পরেই জানাবে তাহলে অফিসেও পা রাখবে ২ দিন পর। কত বড় অসভ্য একটা লোক। তার বাবা থাকাকালীন অরণ্যা ভালো সুযোগ-সুবিধা পেয়েছিল কিন্তু হুট করে এই লোক এসে সব শেষ। অরণ্যার এখনো মনে আছে সেদিনের কথা, অফিসে তাড়াহুড়ো করে প্রবেশ করেছিল সে। কাজের সময় দেরি করা তার মোটেও পছন্দ নয়। সেদিন লিফটে ভুল করে এই লোকের সাথে ধাক্কা লেগেছিল। সামান্য একটু গায়ে ছোঁয়া লেগেছিল। তার ফলে কি করল লোকটা? তাকে অফিসের চেম্বারে এনে সবার সামনে পরিবার তুলে বকাবাধ্য করল! সেই থেকেই দেখতে পারে না সে এই লোককে। খালি কি তাকে নাকি? তার আবার একজন পার্সোনাল সিকিউরিটি আছে। নাম কৌশান তালুকদার! ওটাও সেইম টু সেইম। দেখলেই গা জ্বলে। এখন দেশ-বিদেশের নামকরা আইটি কোম্পানি না হলে জীবনেও এখানে চাকরি করত না অরণ্যা। কি নেই এখানে? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ভিত্তিক সিসিটিভি, স্মার্ট ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট, ফেস রিকগনিশন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা সব আছে। তবে এত খুশি হওয়ার কিছু নেই! অরণ্যা তো সবচেয়ে নিচের লেভেলের কর্মচারী। তবে মাঝে মাঝে অরণ্যা বেশ অবাক হয়। কারন এই অফিসে জেইদী বংশের আরো তিনজন ছেলে আছে। এই যেমন এই কোম্পানির সিইউর পর যেই পদটি তাতে রাজ করছেন চিফ অপারেটিং অফিসার কায়ান জেইদী। তার পরে আছেন, চিফ টেকনোলজি অফিসার ভিরান জেইদী। আর সবচেয়ে ছোট যেইজন আছে, বেশিদিন হয়নি কোম্পানি জয়েন করেছে। তবুও কোম্পানির মালিকের ছেলে বলে কথা! তারা কোম্পানি জয়েনই করে বড় পদে রাজত্ব করার জন্য। সারহান জেইদী হচ্ছে ভাইয়েদের মধ্যে সবার ছোট, তবে সে এই কোম্পানির প্রোগ্রামিং ডিপার্টমেন্টের হেড ডিরেক্টর। তবে অবাক করার বিষয় হলো, এই যে মিস্টার তনয় জেইদী সে যে চেয়ারম্যানের বড় ছেলে এটা তো তার কোম্পানি জয়েন করার পর সবাই জেনেছে। নইলে কে জানত? তার ওপর সে নামক একটা ছেলে যে আছে তাও জানা ছিল না অথচ সে হুট করে এসেই চেয়ারম্যানের পরের পদে নিজের অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে। যাক ব্যাপার না তবে তৌহিদ জেইদী মানুষও বটে। এক একটা রত্নের জন্ম দিয়েছেন যদিও নায়কের মতো সুন্দর আর বড়লোক হলেই রত্ন হয়না মানুষ। গত ৩ বছরে এই কোম্পানির সাথে থেকে এসব ভালো মতোই বুঝতে পেরেছে। হঠাৎ বাইরে থেকে চেঁচামেচির শব্দ ভেসে এলো।
“এইভাবে চলতে পারে না!”
“মান-সম্মান বলে কিছু আছে!”
“ডাকেন আপনার মেয়েকে!”
অরণ্যা চমকে উঠল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আবার একটা ধাক্কার শব্দ। তার বুক ধকধক করতে লাগল।
“কি হচ্ছে বাইরে…?” সে আর এক সেকেন্ডও দেরি করল না। দরজা খুলে প্রায় দৌড়েই বাইরে বেরিয়ে গেল। বাড়ির উঠোনে পা দিতেই সে থমকে দাঁড়াল। কয়েকজন এলাকার মুরব্বি তার বাবাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। কারও মুখ রাগে লাল হয়ে আছে, কেউ আঙুল তুলে আবার চিৎকার করছে। “আপনার মেয়ে তো নোংরা!"
“এইসব লজ্জার কাজ করে আমাদের সামনে মুখ দেখাবেন? এত বড় বড় আদর্শের কথা বলতেন এটাই সেই আদর্শ?”
অরণ্যার চোখ বড় হয়ে গেল। “বাবা…” তার গলার স্বর বেরোল না ঠিকমতো। ঠিক তখনই একজন লোক তার বাবাকে ধাক্কা দিল। “আপনি চুপ কেন? উত্তর দেন!”
অরণ্যার আর নিজেকে থামাতে পারল না।
“এই! আপনারা” সে ছুটে এগোতেই হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়াল আরিশ। “তুই যাহ ঘরে!” আরিশের গলা বজ্রের মতো।অরণ্যা থমকে গেল।
“ভাই, বাবা ওরা—”
“কথা শুনতে পাসনি? ভিতরে যা!” আরিশ দাঁতে দাঁত চেপে বলল। মুরব্বিদের মধ্যকার একজন বলে উঠল,
“এই যে, এই মেয়ে! এই মেয়েকেই তো জিজ্ঞেস করতে হবে!” আরেকজন কটাক্ষ করল, “বেশ সাহস তো! প্রেম করে বিয়ে করতে বসে আবার নাটক করছে!” চারপাশের সব চোখ তখন অরণ্যার দিকে। অরণ্যার বুক কেঁপে উঠল। কিন্তু সে পিছু হটল না। “আপনারা আমার বাবার সাথে এইভাবে কথা বলবেন না!
“ওহ! এখন বাবার সম্মান মনে পড়ছে? নিজের কাজ করার সময় মনে ছিল?” অরণ্যার চোখে পানি চলে এলো, কিন্তু সে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ঠিক তখনই আরিশ আবার সামনে এসে তাকে আড়াল করল।
“আপনারা যা বলার আমাকে বলেন। ওর সাথে কেউ কথা বলবেন না!”
“কেন বলব না?” এলাকার মুরব্বি সাদির মিয়া গর্জে উঠলেন। “এইসব কাজ করে, আর প্রশ্ন করলে লুকাবে?” পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে যাচ্ছে বুঝে আরিশ এবার অরণ্যার দিকে না তাকিয়েই বলল, “শেষবার বলছি, ভিতরে যা।" অরণ্যার বুকটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠল। সে কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল।
ধীরে ধীরে পেছনে সরে গেল। কিন্তু যাওয়ার সময় তার চোখ একবার বাবার দিকে গেল। মাথা নিচু করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন মানুষটা। সেই দৃশ্যটাই অরণ্যার বুক চিরে দিল। ভিতরে ঢুকে দরজার আড়ালে দাঁড়াতেই বাইরে থেকে আবার চিৎকার ভেসে এলো, "আরো দেও মেয়েকে বড়লোকি কোম্পানিতে ঢেঙঢেঙিয়ে কাজ করতে যেতে। নিশ্চয়ই চরিত্র দোষ আছে। তার প্রেমিক যদি বিয়ের আগে আরেক মেয়ের সাথে ফষ্টিনষ্টি করতে পারে, তাহলে সে যে তার প্রেমিকের সাথে ওইসব করবে না তার কি গ্যারান্টি? এই নোংরা আর্বজনা আমাদের এলাকায় থাকতে পারেনা। কাল এর থেকে আমাদের মেয়ে কি শিখবে? সমাজে থাকতে হলে নিয়ম মানতে হবে! এখানে থাকা চলবে না।"
অরণ্যা ধীরে ধীরে দেয়ালের সাথে হেলে বসে পড়ল।চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। তার মাথার ভেতর শুধু একটাই চিন্তা ঘুরছে,
“সবকিছু কি আজকেই শেষ হয়ে যাবে…?”
-
ড্রয়িং রুমে বাড়ির সবাই জড়ো হয়েছে। মাঝখানে মাথা নিচু করে বসে আছেন অরণ্যার বাবা। পাশে তার স্ত্রী তাহমিনা হাফিজ। আরিশ একটু দূরে দাঁড়িয়ে, কিন্তু সেও চুপ। দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে অরণ্যা।
সবাই তাকিয়েই আছে তারই দিকে। হঠাৎ তাহমিনা মুখ বাঁকিয়ে বললেন, “এই মেয়ের জন্যই আজ এই অবস্থা। এতদিনের মান-সম্মান মাটিতে মিশে গেল।”
পাশ থেকে হঠাৎ তানিশা বলল, “প্রেম করে বিয়ে করতে বসে আবার নিজেই ভাঙে! এখন রাস্তায় আমি বের হলে মানুষ আমায় কত কী বলবে? আল্লাহ এমন পরিস্থিতি থেকে সবাইকে দূরে থাকার তৌফিক দান করুক। অরণ্যার বুকের ভেতরটা ধকধক করছে। কিন্তু সে কিছু বলল না। শুধু দাঁড়িয়ে রইল। হঠাৎ তার বাবা ধীরে মুখ তুললেন।চোখ দুটো রক্তিম, ক্লান্ত… আর তাতে একটা কঠিন রাগ জমে আছে। “তুই যা করেছিস, তার জন্য আজ আমাকে সবার সামনে মাথা নিচু করতে হলো।”
অরণ্যার গলা শুকিয়ে গেল, “বাবা, আমি”
“চুপ! একটা কথাও বলবি না তুই। যা বলার ছিল, সব তো বলে ফেলেছিস।”
অরণ্যার চোখে পানি চলে এলো। “কিন্তু বাবা, বিয়েটা ভাঙার কারণটা”
“কারণ?”
বাবা তাচ্ছিল্য করে হেসে উঠলেন, “কারণ যা-ই হোক, শেষটা কী? তুই বিয়ে ভেঙেছিস। এইটাই সত্যি!”
পাশ থেকে অরণ্যার ফুফু বললেন, “ভাই, মেয়েদের বেশি ছাড় দিলে এইটাই হয়। মাথায় উঠায় রাখলে এমনই করে।”
তাহমিনা হাফিজ এবার ধীরে বললেন, “আমরা তোকে কখনো আটকাইনি। তুই যাকে পছন্দ করেছিস, তার সাথেই বিয়েতে রাজি হয়েছি। এখন এই অপমানটা আমাদের প্রাপ্য ছিল?”
অরণ্যা কেঁপে উঠল। “মা, তুমি জানো না”
“কি জানব? তুই কি একবারও আমাদের কিছু বলেছিস? সব নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নিয়ে এখন আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে ব্যাখ্যা দিচ্ছিস!”
অরণ্যা অসহায়ের মতো চারদিকে তাকাল। "আমি বলার সুযোগ পাইনি… যখন সুযোগ হয়েছে তখন তো সবকিছুই বলেছি।"
আরিশ এবার নিচু গলায় বলল, “তুই চাইলে সুযোগ বানাতে পারতিস, অরণ্যা।”
“তুমিও, ভাই…?” তার গলা কেঁপে উঠল।
আরিশ চোখ সরিয়ে নিল। ঠিক তখনই অরণ্যার বাবা ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। “অনেক হয়েছে।”
সবাই চুপ। তিনি সরাসরি অরণ্যার দিকে তাকালেন।
“এই বাড়িতে এখন তোর থাকার দরকার নেই।”
কথাটা যেন বজ্রপাতের মতো পড়ল।
অরণ্যা স্তব্ধ। “বাবা…?”
“কাল সকালেই তুই তোর খালার বাসায় চলে যাবি। কিছুদিন বাইরে থাক। মানুষ কী বলে, তা আমি সামলাই।”
অরণ্যার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। “তুমি আমাকে… বাড়ি থেকে বের করে দিচ্ছো?”
বাবা চোখ সরিয়ে নিলেন। “এখন এইটাই ঠিক।”
“কিন্তু আমার দোষটা কী?” অরণ্যা এবার আর নিজেকে থামাতে পারল না, “তুমিই তো রাজি হয়েছিলে এই বিয়েতে! তুমি পছন্দ করোনি, তাও কিছু বলোনি! বিয়ে ভাঙার সময়ও তো তুমি আমাকে থামাওনি!”
বাবার মুখ শক্ত হয়ে গেল। “তুই এখন আমাকে দোষ দিচ্ছিস?”
অরণ্যা মাথা নাড়ল। “আমি দোষ দিচ্ছি না… আমি শুধু বলছি, সব দোষটা আমার না।”
তাহমিনা চোখ বন্ধ করলেন। ফুফু আকলিমা আবার বলল, “দেখছো? এখনো জেদ যায়নি।”
বাবা ধীরে ধীরে বললেন, “আমি যা বলেছি, সেটাই শেষ কথা। কাল সকালে তুই চলে যাবি।”
অরণ্যা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর খুব ধীরে বলল, “ঠিক আছে।”
সবাই অবাক হয়ে তাকাল। সে আর কিছু বলল না।
শুধু একবার সবার দিকে তাকাল। তার নিজের মানুষগুলো… অথচ আজ সবাই অপরিচিত। তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে বেরিয়ে গেল ড্রয়িং রুম থেকে।
পেছনে আবার পুরো বাড়ি, তার ভাই বোনেরা তাকে নিয়ে কথা বলতে শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু অরণ্যা আর কিছু শুনল না। তার কানে তখন শুধু একটা কথাই বারবার বাজছে, “এই বাড়িতে এখন তোর থাকার দরকার নেই…” অথচ বিয়ের বিষয়ে সবাই রাজি হয়েছিল। যখন বিয়ের আসরে প্রবাহের কথা বলল, তখন সবাই যা-তা বলে প্রবাহকে আসর থেকে তাড়িয়েছে। এমন নোংরা ছেলের সাথে তারা দেওয়ান বাড়ির মেয়ের বিয়ে দিবে না। আর এখন? তাকেও ওই নোংরা আসনে তার বাড়ির লোক বসিয়ে দিয়েছে? বড় আপা আগে চাকরি করত, তার বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর চাকরি তাকে ছাড়তে হয়। আগে সে সংসার সামলাত! আরিশ ভাই সবার বড় হয়ে তখনও বেকার। বাবা তো কাজকর্ম ছেড়েছে সেই কত আগেই। পুরো একটা পরিবার চালানো কি মুখের কথা? সংসারের খরচ, তানিশার স্কুল-কোচিং এর ফি আবার নিজের তো পড়ালেখা আছেই। সব একা হাতে সামাল দিয়েছে। ইন্টানসিপে কোম্পানিতে ঢুকেছিল। তৌহিদ জেইদী থাকলে এতদিনে চাকরি পার্মানেন্ট হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু এখন যা হয়ে গেল তনয় জেইদী চাকরিতে স্থায়ী তো দূরের কথা, রাখতেই তো ভয়ানক শর্ত দিচ্ছে। কিন্তু তার মতো বদনাম হয়ে যাওয়া নারীকে এত বড় একজন মানুষের এত কিসের দায় যে বিয়ে করতে হবে? আর তার ওপর এই বিয়ে করার জন্য এত নিচু রকমের ব্ল্যাকমেইল?
-
সন্ধ্যা তখন। অফিসের ফ্লোর প্রায় ফাঁকা। সবাই ছুটির প্রস্তুতিতে। দেয়ালের ঘড়িতে কাঁটা আটটার দিকে এগোচ্ছে। কাঁচে ঘেরা কর্নার চেম্বারের ভেতরে বসে আছে তনয় জেইদী। টেবিলজুড়ে ফাইল, পাশে ল্যাপটপ। স্ক্রিনের আলো তার তীক্ষ্ণ চোখে পড়ছে।
ঠিক তখনই দরজায় শব্দ হতেই সে বলল, "কাম ইন।"
দরজা ধীরে খুলে ভেতরে ঢুকল তার পিএস কৌশান তালুকদার। “স্যার, আপনার নেক্সট শিডিউল”
“বলো” চোখ তুলল না তনয়।
“আজ রাত ৯টায় ক্লায়েন্ট মিটিং ছিল, কিন্তু তারা রিশিডিউল চাচ্ছে কাল সকালে…” কীবোর্ডে টাইপ করা থামল। এক সেকেন্ড, দুই সেকেন্ড চলে গেল। তারপর ধীরে মাথা তুলল তনয়। “কেন?”
“স্যার… ফাইল আপডেটটা সময়মতো যায়নি… তাই”
“কে দায়িত্বে ছিল?” এইবার সরাসরি তাকাল তনয়।
“স্যার… সোহেল”
“ওকে ভেতরে পাঠাও।”
কৌশান দ্রুত বেরিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর দরজার সামনে দাঁড়াল সোহেল। হাত কাঁপছে তার, সেই সঙ্গে শরীরটাও।
“স্যার… ডেকেছিলেন?” তনয় চেয়ারে হেলান দিল। আঙুল দুটো একসাথে জোড়া করে রাখল।
“আপনি কতদিন ধরে এখানে কাজ করছেন?”
“জি… তিন বছর, স্যার।”
“তিন বছরে একটা জিনিসও শিখেননি?”
“স্যার, আমি—”
“আমি শুনতে চাই না।” কথা কেটে দিল তনয়।
“আপনার একটা ভুলে কোম্পানির একটা ডিল ঝুলে গেছে। আপনি জানেন, এই ডিলের ভ্যালু কত?”
সোহেল চুপ।
"জানেন না। কারণ আপনার মত ভ্যালুলেস ব্যক্তি ভ্যালুর মূল্য কি বুঝবে?" চোখ নামাল তনয়, তারপর আবার তাকাল, “আজকে রাত।” একটু থামল।
“আপনি অফিস ছাড়বেন না।”
সোহেলের বুক ধক করে উঠল। “সব ফাইল আপডেট করবেন। রিপোর্ট রেডি করবেন। আর কাল সকাল ৮টার আগে আমার টেবিলে রাখবেন।”
“স্যার… আজকে আমার মেয়ের জন্মদিন। ওর প্রথম জন্মদিন।"
“ মেয়ের জন্মদিন আগে, নাকি নিজের চাকরি বাঁচানো? আর এত ন্যাকামির কি আছে? দুনিয়ায় কি আপনার মেয়ের একা জন্মদিন? কাল মরবেই, সো এত আর জন্মদিনের কিছু হয়ে যায়নি। এখন বলুন আপনি কি কোনো সমস্যা ফেস করছেন?” একটু ঝুঁকে এল তনয়।
“না… স্যার।”
“গুড।”
চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল সে। ধীরে ধীরে টেবিলের চারপাশ ঘুরে সোহেলের সামনে এসে দাঁড়াল।
“আর একটা কথা”
চোখে চোখ রেখে বলল, “এই কোম্পানিতে ভুল করার সুযোগ একবারই দেওয়া হয়।” চুপ থেকে আবার বলল,
“দ্বিতীয়বার হলে… বাইরে বের হওয়ার দরজাটা নিজেই খুঁজে নেবেন।”
সোহেল মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। গলা শুকিয়ে গেছে। "নাউ গো এন্ড ফিক্স ইউর মিস্টেক।"
সোহেল প্রায় দৌড়ে বেরিয়ে গেল।তনয় ফিরে এসে চেয়ারে বসল। ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ রাখল। হঠাৎ তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কৌশান বলল, "আরেকটা কাজ কিন্তু আছে আপনার।"
তনয় নিজের কাজ থামিয়ে দিল। চুপ হয়ে গেল। তার হঠাৎ করে বলল, "হুম সব ব্যবস্থা যেন করা হয়ে যায়। র*ক্তের ক্রেভিংস হচ্ছে খুব।"
কৌশান তনয়ের দিকে তাকাল। তনয় হেসে বলল, "মজা করেছি।"
-
রাত তখন ঠিক এগারোটা। মোহাম্মদপুর-এর সরু গলিটা আজ অস্বাভাবিক চুপচাপ। রাস্তার মোড়েই রিকশা নামিয়ে দিয়েছে আফিফাকে। রাতের বেলা কেউ এখানে আসতে চায়না। চারপাশে কোনো মানুষের শব্দ নেই, কুকুরের ডাকও নেই। দূরে একটা পুরনো ল্যাম্পপোস্ট কাঁপতে কাঁপতে আলো দিচ্ছে। আফিফা জলদি পা ফেলছে। তার হাতে ছোট একটা ব্যাগ, গলায় ঝুলছে অফিসের আইডি কার্ড। হঠাৎই সে থেমে গেল।
বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধক করে উঠল। পেছনে… কেউ আছে। অনুভূতিটা এতটাই স্পষ্ট যে, সেটা আর কল্পনা বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সে কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে থাকল, তারপর ধীরে ধীরে পেছনে ঘুরল।
অন্ধকারের ভেতর একটা অবয়ব দাঁড়িয়ে। একজন পুরুষ। মুখ পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে না, কিন্তু তার স্থির দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গিটা অস্বাভাবিক, অস্বস্তিকর।
আফিফা নিজেকে শক্ত করল। গলার কাঁপনটা চেপে রেখে বলল, “কে? কী চান?”
লোকটা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। কয়েক মুহূর্ত নিস্তব্ধতা। তারপর খুব নিচু স্বরে বলল, “আপাতত… একটা নারী।” আফিফার চোখে আতঙ্ক স্পষ্ট হয়ে উঠল। আর কোনো কিছু ভাবার সুযোগ না দিয়ে সে হঠাৎই ঘুরে দৌড় দিল। তার জুতার শব্দ ফাঁকা গলিটা জুড়ে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। শ্বাস দ্রুত হয়ে উঠছে, বুক ধড়ফড় করছে। সে পেছনে তাকাল না। শুধু দৌড়াচ্ছে।
কিন্তু হঠাৎই একটা ভারী আঘাত অনুভব করল। পেছন থেকে কেউ ঝাঁপিয়ে পড়ল তার ওপর। লোকটা তার গলার আইডি কার্ডের স্ট্র্যাপটা শক্ত করে টেনে ধরলো। মুহূর্তেই সেটা গলায় চেপে বসল। শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে।
আফিফা দুই হাতে স্ট্র্যাপটা আঁকড়ে ধরল, মরিয়া হয়ে খুলতে চেষ্টা করছে। “ছাড়ুন… প্লিজ…!” তার গলা দিয়ে অস্পষ্ট শব্দ বের হলো। লোকটা আরও জোরে টান দিল। “এত তাড়াহুড়ো কেন?” আফিফার চোখে পানি এসে গেল। শ্বাস নিতে পারছে না ঠিকমতো। হাত কাঁপছে, আঙুলগুলো অসহায়ভাবে স্ট্র্যাপের গিট খুঁজছে। শ্বাস… আটকে যাচ্ছে তার। শেষ শক্তিটুকু জড়ো করে সে হঠাৎই একটা জোরালো ঝাঁকুনি দিল।
হঠাৎ ছিঁড় শব্দ হয়ে স্ট্র্যাপটা গলা থেকে ছিটকে খুলে গেল। আইডি কার্ডটা মাটিতে পড়ে রইল। আফিফা হাঁপাতে হাঁপাতে সামনে এগোতে যাবে, ঠিক তখনই পেছন থেকে আবার সেই শক্ত হাত। এইবার তার মুখ চেপে ধরা হলো। “চুপ।” কানের পাশে ঠাণ্ডা নিঃশ্বাস লাগল তার। আফিফা চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু শব্দ বের হলো না। তার হাত দুর্বল হয়ে আসছে, শরীর ঢিলে হয়ে যাচ্ছে। হঠৎ একটা তীব্র গন্ধ নাকে এলো। কেমন যেন রাসায়নিক… ঝাঁঝালো… ধরনের। তার মাথা ঘুরতে লাগল। ল্যাম্পপোস্টের আলোটা চোখের সামনে দুলে উঠছে। সবকিছু ঝাপসা প্রায়। আর তারপর.... অন্ধকার। সব অন্ধকার। আফিফার নিশ্বাস, চোখ দু'টো বন্ধ হয়ে গতি হওয়ায় মিলিয়ে গেলেও মাটির ওপর পড়ে রইল তার আইডি কার্ডটা। যেখানে স্পষ্ট করে লিখা, হেক্সোনোভা কোম্পানি লিমিটেড।
চলবে?
( সবাই রেসপন্স করবেন এবং কমেন্ট করে জানাবেন কেমন হয়েছে। আর আপনাদের কি মনে হয় আফিফার খুনি কে হতে পারে? খুনটা কি স্বাভাবিক?