#বসন্ত_বিলাসিনী
#ইশরাত_জাহান_জেরিন
#পর্ব_৯
'ভাগ্যিস তোয়ালের নিচে ইয়ে পড়ে ছিলি তাই এবারের মতো তোর ইজ্জতটা বেঁচে গেছে।তা না হলে তোর হবু বউ বিয়ের আগেই ওটা দেখে ভয় পেয়ে যেত।'
কথাটা বলেই আদিপ শব্দ করে হাসে।স্নিগ্ধ এতে আরো ক্ষেপে যায়।আর একটুর জন্য তার সম্মান হানি হতে চলেছিল।আজ কালকারযুগে তো নারীরা শুধুমাত্র পুরুষদের দেহ চায়।যদি আজ চাঁদনী ওটা দেখে নিজের কন্ট্রোল হারিয়ে স্নিগ্ধর সঙ্গে জোর-জবরদস্তি করতো।তাহলে কি সর্বনাশটাই না হতো।
'এসব বাদ দে ভাই।কেও তোর ওসব দেখে কুমারত্ব শেষ করতে পারে নি।এখন সকাল হয়েছে আর কত বিছানায় টিকটিকির মতো লেপ্টে থাকবি?'
'যতদিন তোর ভাবী না আসছে।'
-
'মাছের কোন পিছটা দেবো?'
ছেলেকে কথাটা বলেই রোকেয়া মাছের পেটিটা তুলে দেন তার পাতে।
'স্নিগ্ধকে আজকাল দেখছি না যে?সে কি ভোরে ঘর থেকে বের হয় আর মাঝ রাতে ফিরে নাকি?'
সায়েমের কথায় রোকেয়া তার স্বামীকে তরকারি বেড়ে দিতে দিতে উত্তর দেন,
'আরে তা কেনো হবে?স্নিগ্ধ তো বন্ধুদের সঙ্গে সিলেট ট্যুরে গেছে।এই তো কাল পরশু ফিরেও আসবে।'
স্নিগ্ধর বাবা এখনো চুপচাপ। সে শুধু সকলের কথা শুনেই যাচ্ছেন।আর তার বলার মতো মুখই বা কোথায় আছে?এত করে ছেলেকে বুঝানোর পরও সে নিজের মর্জি মতো চলছে।তবে এখন সময় হয়ে গেছে তার নিজ থেকে একটা পদক্ষেপ নেওয়ার।তা না হলে ছেলেটার ভবিষ্যৎ শেষ হয়ে যাবে।যে করেই হোক স্নিগ্ধ এবার বাড়ি ফিরলে তিনি কঠোর হবেন।অনেক সহজ হয়ে দেখেছেন।ভালো করে বুঝিয়েছেন।কিন্তু তাতে লাভের লাভ তো কিছুই হয় নি।উল্টো ছেলের দিনকে দিন সাহস বাড়ছে।
'আপনার আর কিছু লাগবে?আরেক টুকরো মাছ দেই?'
স্বামীকে জিজ্ঞেস করতেই তিনি জবাব দেন,
'না না লাগবে না।শুধু একটু জল দাও। মাছের পাতলা ঝোলটা অনেক স্বাদের হয়েছে।'
রোকেয়া বেগম মনে মনে খুশী হলেন।স্বামীর প্রশংসা মানে তার কাছে বিশ্বজয়ের সমান।
'একটা কথা বলি বাবা?'সায়েম বলল।
'বলে ফেলো।'
'স্নিগ্ধকে একটা বিয়ে করিয়ে দাও।বিয়ে করলে যখন দায় দায়িত্ব এসে কাঁধে পড়বে তখন সে নিজ থেকেই সবটা বুঝতে শিখবে।কথায় আছে না শান্ত সমুদ্রে কেউ দক্ষ নাবিক হতে পারে না।খুব তো স্বাধীন আছে তাই এখনো বাস্তবতা কি তা বুঝে উঠতে পারছে না।একবার বিয়ে হলে সব ঠিক হয়ে যাবে।'
শেখ আনোয়ার কিয়ৎক্ষণ কি যেন একটা ভেবে জবাব দিলেন,
'ঠিকি বলেছো।এবার ফিরুক,বিয়ে একটা করিয়ে দিবোই।'
'তবে তো আগে মেয়ে খুঁজতে হবে!'
শেখ আনোয়ার দৃঢ়স্বরে জবাব দেন,
'মেয়ে খুঁজব কেন? খাঁটি সোনা তো আমাদের ঘরেই আছে।'
-
বাসটি তার গতিময় ছন্দে এগিয়ে চলেছে। বাসে মেয়েদের গান গাইছে।মিষ্টি আড্ডার ঝংকার মিশে যাচ্ছে বাতাসে। চাঁদনী আর নাদিয়া পাশাপাশি বসে। সামনের দিকে বসেছে তারা। চাঁদনী ভেবেছিল স্নিগ্ধ তার পাশে বসবে, কিন্তু সে গিয়ে ঠাঁই নিয়েছে একেবারে লাস্ট সিটে। রাতের ঘটনার পর হয়তো লজ্জায় চাঁদনীর মুখোমুখি হওয়ার সাহস তার হয়নি। তবে এটা কি সত্যি? স্নিগ্ধ আর লজ্জা?এ দুটি শব্দ তো কখনো এক ফ্রেমে বাঁধা যায় না। সে তো একরকম ঠোঁটকাটা পুরুষ।লজ্জা-শরম তো মুসলমানির সঙ্গেই বিসর্জন দিয়েছে।
চাঁদনী আড়চোখে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনের দিকে তাকায়। দেখে, লাস্ট সিটের কোণে স্নিগ্ধ বসে আছে। সঙ্গে অধোরা আর আদিপও আছে। আদিপ মাঝখানে, আর স্নিগ্ধ ও অধোরা দু'প্রান্তে। হেডফোনে মগ্ন স্নিগ্ধ গান শুনছে। চোখ বন্ধ। বাইরে থেকে দেখে কিছুই বুঝা যাচ্ছে না অথচ তার ভেতরে চলছে শয়তানি কোনো পরিকল্পনা।
স্নিগ্ধের মনে হঠাৎ ভেসে ওঠে সিলেটে আসার কাহিনি। যারা জানে না তাদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে স্নিগ্ধ কীভাবে সবার সঙ্গে সিলেট আসার অনুমতি পেল। কিন্তু তারা তো আর জানে না স্নিগ্ধ পাতায় পাতায় চলে।এসব ম্যানেজ করা স্নিগ্ধর বা হাতের খেল।সে তো শুধুমাত্র অধ্যক্ষ স্যারের কাছে গিয়ে অধ্যক্ষ স্যার এবং ইংরেজি ম্যাডামের কিছু অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিও দেখিয়ে বলেছিল,
'স্যার, আমি কলেজের মেয়েদের সঙ্গে সিলেট যেতে চাই।'
ব্যাস এরপর স্নিগ্ধকে আর কিছুই করতে হয় নি। বাকিটা অধ্যক্ষ নিজেই সামলেছেন।
মনে মনে এই কথাগুলো ভেবে স্নিগ্ধ একবার হেসে ওঠে। হাসি শেষে চোখ মেলে সামান্য উঁকি মারে চাঁদনীর দিকে। ভাবনায় বলে ওঠে,
'দেখো হবু বউ, তোমার জন্য তোমার হবু স্বামী কী না কী করছে। অথচ তুমি বলদি কিছুই বুঝো না।'
-
জাফলং প্রকৃতির এক অপরূপ সুধা। শীতের মিঠে রোদে জাফলং যেন তার আপন সুষমায় নবজীবনের আবাহন ঘটায়। সবুজ পাহাড়ের আলিঙ্গন, স্ফটিকস্বচ্ছ নদীর ছলছল ধ্বনি আর শীতল বাতাসের কোমল ছোঁয়ায় এখানে সময় যেন থমকে দাঁড়ায়। মানুষ এই নিসর্গের মুগ্ধতায় ডুবে যায়। প্রকৃতির নিঃশব্দ ভাষায় নিজেদের মন সিক্ত করে।
তবে স্নিগ্ধর দৃষ্টি আচমকা স্থির হয়ে যায় এক ভিন্ন দৃশ্যপটে।তার চোখ আটকে যায় নাদিয়ার ওপর। বাস থেকে নামছে সে, হাতে একটি ছোট্ট বস্তা।স্নিগ্ধ ভ্রুকুটি করে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
'এই বস্তা দিয়ে আবার কী করবে?'
নাদিয়া স্নিগ্ধের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়। তার দিকে তাকিয়ে মুখে একপ্রকার বিদ্রূপের হাসি ফুটিয়ে চলে যায়।এ যেন এক অমোঘ তাচ্ছিল্যের বার্তা দেয়। কোনো কথা না বলে সে দ্রুত পা বাড়ায়।
স্নিগ্ধ হতবাক।
'মেয়েটার সাহস দেখো! আমাকে উপেক্ষা করছে!'
নাদিয়া চপল পায়ে চলে যেতেই স্নিগ্ধ মনে মনে তাকে উদ্দেশ্য করে শুধায়,
'তাড় ছিঁড়া।'
-
চারপাশে প্রেমের উৎসব লেগেছে। সবাই জোড়ায় জোড়া।হাত ধরে গল্প, ছবি তোলা, নির্জনে সময় কাটানো কিছুই তাদের বাদ পড়ছে না। অথচ এত চমৎকার পরিবেশে স্নিগ্ধ একাই।চারিদিকে কত মেয়ে অথচ চাঁদনীর মতো মনে আর কাউকেই ধরছে না।ওই তো দূরে দাঁড়িয়ে আছে চাঁদনী। হাতে ক্যামেরা, মগ্ন ছবির খেয়ালে। কী অপার্থিব সে দৃশ্য।চাঁদনী নিজের মতো সুখী, যেন স্নিগ্ধের অস্তিত্বই নেই। স্নিগ্ধ এক মুহূর্তের জন্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
'ইশ! আমার মনের এই রঙহীনতার মাঝেও ওর কি নিঃসঙ্গ আনন্দ!'
ঠিক তখনই, দুটি মেয়ে এগিয়ে আসে স্নিগ্ধের দিকে। অনেকক্ষণ ধরে তারা দূরে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করছিল, কখনো হাসছিল, কখনো স্নিগ্ধের দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছিল।
একজন প্রশ্ন করে, "আপনার নাম কী?"
'স্নিগ্ধ।'সংক্ষেপে জবাব দেয় স্নিগ্ধ ।
'সিঙ্গেল, নাকি মিঙ্গেল?'
স্নিগ্ধ ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি এনে বলে,
'তা জেনে কী লাভ?'
মেয়েগুলোর একজন গালভরা হাসি দিয়ে বলে,
'এখন না বললেও পরে বুঝবেন। আচ্ছা, আপনার নম্বরটা দেওয়া যাবে?'
স্নিগ্ধ তখন একপলক চাঁদনীর দিকে তাকায়। দেখে, চাঁদনী তার দিকেই তাকিয়ে আছে। "আহা, হিংসে হচ্ছে বুঝি? আরও জ্বল, সুন্দরী।" এসব শুধিয়ে মনে মনে হাসে সে।তারপর মেয়েগুলোর দিকে ফিরে বলে,
'ফোন দাও, নাম্বার সেভ করে দিচ্ছি।'
একজন দ্রুত ফোন এগিয়ে দেয়।বলে,
'আমাকে দিলেই হবে।'
স্নিগ্ধ নিঃসন্দেহে ফোনটি নেয়।কিছুক্ষণ তাতে ব্যস্ত থাকে।তারপর তা ফিরিয়ে দিয়ে বলে,
'নাও, কাজ শেষ।'
এরপর কোনো কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই স্নিগ্ধ দ্রুত স্থান ত্যাগ করে।মেয়েগুলো তৎক্ষণাৎ ফোনে নম্বর চেক করতে গিয়ে চমকে ওঠে। ফোনের স্ক্রিনে বড় অক্ষরে কেবল লেখা,
"বারো ঘাটের পানি স্নিগ্ধ খেতে অব্যস্ত নয়। ধন্যবাদ।"
বাকরুদ্ধ মেয়েগুলো কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে চারপাশে তাকায়, স্নিগ্ধকে খুঁজতে চেষ্টা করে। কিন্তু ততক্ষণে সে তাদের দৃষ্টির সীমানার বাইরে চলে গেছে।
-
হোটেলে ফিরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়েই স্নিগ্ধ বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। সঙ্গে ছিল আদিপ। রাত গভীর হতে থাকে।ঘড়ির কাঁটা দশটা ছাড়িয়ে যায়, তবুও স্নিগ্ধর ফেরার নাম গন্ধ নেই। চাঁদনীর ভেতরে চিন্তার কালো মেঘ জমে পাহাড় হয়বুক ধকধক করে।ওদিকে অধোরার ভেতরেও অশান্তির ঢেউ আছড়ে পড়ছে।
চাঁদনীর কাছে স্নিগ্ধের নম্বর নেই, ফলে কোনোভাবেই সে যোগাযোগ করতে পারছে না। একরকম বাধ্য হয়েই সে অধোরার কক্ষের দিকে পা বাড়ায়। দরজায় কড়া নেড়ে ভেতরে ঢুকেই অধোরাকে স্নিগ্ধের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করে। অধোরা একগাল চিন্তা নিয়ে বলে,
'আমি বহুবার কল করেছি, কিন্তু আদিপ ভাই কিংবা স্নিগ্ধ ভাই কেউই ফোন ধরছে না।'
চাঁদনীর উদ্বেগ আরও তীব্র হয়। বুকের ভেতর ভারী অশনি সঙ্কেত তাকে ঘিরে ধরে। এমন মুহূর্তে হঠাৎ করেই নাদিয়া রুমে ছুটতে ছুটতে রুমে ঢুকে। হাঁপাতে হাঁপাতে কিছুক্ষণ দম নেয়।তারপর কাঁপা গলায় বলে ওঠে,
'স্নিগ্ধ ভাইয়ার এক্সিডেন্ট হয়েছে।অবস্থা খুব একটা ভালো নয়।'
চলবে?
(রিচেক দেওয়া হয় নি।ভুল-ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।ধন্যবাদ)