#বসন্ত_বিলাসিনী
#ইশরাত_জাহান_জেরিন
#পর্ব_১০
চাঁদনী অঝোরে কাঁদছে। চোখের জল তার ভেতরের সব ভীতিকে প্রকাশ্যে টেনে আনছে। স্নিগ্ধর কিছু হবে না তো? এহেন প্রশ্নে বুকটা বারবার ধক করে উঠছে। স্নিগ্ধকে এখনো কত কথা বলা বাকি। নিজের অস্তিত্বের সমস্ত শক্তি দিয়ে নাদিয়া চাঁদনীকে শান্ত করার চেষ্টা করে।বলে,
'দেখ স্নিগ্ধ ভাইয়ের কিছুই হবে না। সে ঠিকই সুস্থ হয়ে উঠবে। বিশ্বাস রাখ।'
'আমি ওকে ছাড়া বাঁচতে পারব না রে নাদিয়া। জানিস তো আমি ওকে ভালোবাসি। আমাকে ছেড়ে চলে যাওয়ার কোনো অধিকার ওর নেই!'
বলেই চাঁদনী কাঁপতে কাঁপতে আবারও কান্নায় ভেঙে পড়ে। নাদিয়া কী বলবে বুঝে ওঠার আগেই পেছন থেকে এক চেনা কোমল কণ্ঠ ভেসে আসে,
'ভালোবাসো তা আগে বললে কী সর্বনাশ হতো?'
চমকে ওঠে চাঁদনী। পেছন ফিরে তাকায় সে। দেখতে পায় দাঁড়িয়ে থাকা স্নিগ্ধকে।
স্নিগ্ধ? ওর তো এখন হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে থাকার কথা! এই জায়গায় কীভাবে এলো?চাঁদনীর ভেতর হাজারো প্রশ্ন।অথচ স্নিগ্ধ তার পানে চেয়ে মুচকি হেসে বলে,
'এত অবাক হচ্ছো কেন? আমি তোমার স্নিগ্ধ। কোনো ভূত নই!'
'তুমি...তুমি কি ঠিক আছো?'চাঁদনী কাঁপা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে।
সময় না নিয়ে স্নিগ্ধ তার দিকে এগিয়ে আসে। তার ঠান্ডা হাত চাঁদনীর উষ্ণ হাতের স্পর্শ নেয়। নিজের গালে চাঁদনীর হাত রেখে বলে,
'দেখো আমি একদম ঠিক আছি। আমার কিছুই হয়নি।'
চাঁদনীর শরীর হালকা হয়ে আসে। বুকের সব ভার ভেঙে পড়ে। সে স্নিগ্ধকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদতে শুরু করে। তার চোখের জল মিশে যায় স্নিগ্ধের শার্টে।
'আমি আর কখনো তোমার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করব না। আমি আর কখনোই অবাধ্য হব না। আমাকে ছেড়ে কোথাও যাবে না কথা দাও! স্নিগ্ধ আমি তোমাকে ভালোবাসি...আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি।'
স্নিগ্ধের মনে এক অপার্থিব অনুভূতির জন্ম হয়। এ কি বাস্তবতা নাকি নিছক কোনো স্বপ্ন? তবে যাই হোক না কেনো এই মুহূর্ত যেন চিরকাল চলমান থাকে।
-
রাতে হোটেলে ফিরে যে যার মতো ক্লান্ত শরীর নিয়ে নিজেদের রুমে চলে যায়।যদিও স্নিগ্ধর মন এক অদ্ভুত আলোড়নে আন্দোলিত।স্নিগ্ধর প্রতি সবার ক্ষীণ অভিমান থাকলেও পরিস্থিতির কারনে তাদের অসহায়ত্ব স্বীকার করা ব্যাথিত বিকল্প কোনো উপায় ছিল না।মূলত আদিপ আর স্নিগ্ধ সন্ধ্যায় বাইক রাইডে বের হয়েছিল।কিন্তু রাস্তায় তাদের চোখের সামনেই শান্ত নামক এক ছেলে এক্সিডেন্ট করে।তাকেই সকলে ধরাধরি করে হাসপাতালে নিয়ে আসে।ছেলেটার অবস্থা জটিল।তারই পেছনে দৌড়াতে গিয়ে স্নিগ্ধর আর ফোন দেখা হয় নি।তবে ঘটনাস্থলে অনেক লোক জমা হয়ে গিয়েছিল।তাদের মধ্যে থেকেই হয়তো কেউ স্নিগ্ধ আর শান্ত নামে গড়মিল লাগিয়ে হোটেলে খবর পৌঁছে দিয়েছে।কিন্তু এতে মন্দ হয় নি।কারন ভুল খবর যদি আজ হোটেলে না দেওয়া হতো তবে হয়তো চাঁদনীর লুকিয়ে রাখা অনুভূতি সম্পর্কেও স্নিগ্ধর জানা হতো না।কথায় আছে না আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করে থাকেন।
রাত গভীর হলেও স্নিগ্ধর চোখে ঘুম নেই। চাঁদনীর মনের কথাগুলো বারবার তার অন্তরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।ইতিমধ্যে আদিপ সহ সকলেই জেনে গেছে যে আজ থেকে তাদের স্নিগ্ধ আর সিঙ্গেল নয় বরং ডাবল লিস্টে যোগদান করেছে।সবাই এতে অনেক খুশী।যেন এই আনন্দ শুধু চাঁদনী আর স্নিগ্ধর একার নয়।তবে প্রতিটি গল্পে একজন রুদ্ধপ্রাণ দর্শক থাকে, যার আশা আর স্বপ্ন কখনো পূর্ণতা পায় না। এই গল্পে সেই চরিত্র অধোরা। তার চোখে স্নিগ্ধ কেবলই এক ব্যর্থ আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।আজ চাঁদনী আর স্নিগ্ধর মিলন তার ভেতরের সমস্ত স্বপ্নকল্পকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে।
-
ভোর রাত। নিস্তব্ধতায় আচ্ছন্ন পৃথিবী তখন গভীর ঘুমে নিমজ্জিত। এ সময় সবাই ঘুমিয়ে থাকার কথা কিন্তু স্নিগ্ধর চোখে ঘুম নেই।মনে তার এক অদ্ভুত অস্থিরতা। চিন্তার ভারে ক্লান্ত হয়ে শেষমেশ সে ফোন তুলে নেয়। নম্বর টিপে কল করে চাঁদনীকে।কল দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রিসিভ হয়।যেন অপর প্রান্তে কেউ তারই অপেক্ষায় ছিল।চাঁদনী হিসহিসিয়ে প্রশ্ন করে,
'এত রাতে কল করলে যে?'
'ময়না তোমাকে দেখার তৃষ্ণায় আমি তৃষার্ত। যদি এই অধমের প্রতি করুণা করো তবে আজীবন ঋণী থাকবো।'
এত সুন্দর করে কেউ কথা বলে?কই অন্য কারো কথা তো চাঁদনী কাছে আহামরি লাগে না।তবে কি এমন আছে এই স্নিগ্ধ ছেলেটার মধ্যে?নিজেকে সংবরণ করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয় চাঁদনী। কঠোর হতে চাইলেও পারে না। শেষমেশ নরম স্বরে বলে ওঠে,
'রুমের দরজা খুলে রাখছি। আমি বারান্দায় অপেক্ষা করব। তবে মনে রেখো তোমার হাতে বেশি সময় নেই।'
স্নিগ্ধর ঠোঁটে পুরো বিশ্ব জয়ের হাসি।চুপচাপ রুম থেকে বেড়িয়ে পড়ে সে।তার রুমে শুয়ে থাকা আদিপ ঘোড়া বেচে ঘুমাচ্ছে।স্নিগ্ধ ধীরপায়ে চাঁদনীর রুমের সামনে এসে দরজার হাতল স্পর্শ করতেই দেখতে পায় সত্যিই দরজা খোলা।রুমে প্রবেশ করেই নাক ডাকার ভয়ানক শব্দে হৃদয়ের কম্পন বেড়ে যায় ছেলেটির।দেখতে পায় বিছানায় ঘুমিয়ে আছে নাদিয়া।স্নিগ্ধ মনে মনে শুধায়,
'বাপরে এই মেয়ে দেখি পুরোই একটা আধজ্যন্ত ভূমিকম্প। এমন দুই-চার পিছ দেশে থাকলে এক্সট্রা কোনো ভূমিকম্পের দরকার পড়বে না।'
হঠাৎ স্নিগ্ধর খেয়াল হয় এসব নাক ডাকুনি মেয়ে দেখতে সে এখানে আসে নি।তার উদ্দেশ্য বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা চাঁদের দর্শন।স্নিগ্ধ একপা দুপা করে বারান্দায় গিয়ে পেছন থেকে আলতো করে জড়িয়ে ধরে চাঁদনী কে।
'আহা কি করছো ছাড়ো? '
স্নিগ্ধ নিজের থুতনি চাঁদনীর কাঁধে ঠেকিয়ে জবাব দেয়,
'দেখতে পাচ্ছো আমি আমার হবু বউকে জড়িয়ে ধরেছি?শীতকালে শীত নিবারণের একমাত্র উপায় হচ্ছে এমন উষ্ণতাকে জড়িয়ে ধরা।'
'তুমি কি এসব করতেই এসেছো?'
'না অন্য কিছুও তো করবো।'
'করবে মানে?কি করবে আমার সঙ্গে?'
'আরে ময়না গল্প করবো।গল্পের কথা বলছি।তোমার দেখি নাউজুবিল্লাহ মার্কা ব্রেন।উফস সরি ময়না। আসলে তোমার প্রেমে পাগল হয়ে গেছি তো তাই ভুল সময়ে মুখ থেকে সত্য বেরিয়ে যাচ্ছে।’
চাঁদনী ভ্রুকুটি করে স্নিগ্ধর দিকে তাকায়।রাতের আকাশ আজ এক গভীর নৈঃশব্দ্যে নিমজ্জিত। চাঁদের আলো হারিয়ে গেছে মেঘের ভারী আচ্ছাদনে।গাছেরা লুকিয়ে আছে কুয়াশার অন্তরালে।
'ছাড়ো।'
'হিসসসসসসসস যেভাবে বলছো আমি মনে হয় জোর করে আদর করছি?আমি তো শুধু তোমায় একটু ভালোবাসা দিচ্ছি আর কিছুটা আবার নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য নিচ্ছি।❝মানুষ ভালোবাসা ছাড়া বাচেঁ না।ভালোবাসার জন্মই হয়েছে মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য।হোক তা অপেক্ষার মাধ্যমে,স্পর্শের মাধ্যমে কিংবা আশার মাধ্যমে।❞
হঠাৎ স্নিগ্ধের মধ্যে এক অদৃশ্য নেশা প্রবলভাবে ঝেঁকে বসে। এই নেশার প্রতিটি স্তরে লুকিয়ে আছে প্রিয়শীকে আরও কাছাকাছি পাওয়ার অব্যক্ত তৃষ্ণা, এক নিঃশেষ চাওয়া-পাওয়া। সে ধীরে ধীরে চাঁদনীর নরম চুলে মুখ গুঁজে দেয়।নারীর চুলের মাদকতায় সে আজ মাতাল। কী এক অদ্ভুত সুখ! কী এক অদ্ভুত নেশা। যা শরীরের প্রতিটি অঙ্গ,প্রতিটি নিউরনকে প্যারালাইজড করার ভয়ানক ক্ষমতা রাখে।হঠাৎ আলতো করে স্নিগ্ধ চাঁদনী কে সামনের দিকে ঘুরায়।চাঁদনী নিচের দিকে চেয়ে অনবরত কাঁপছে। এ কাঁপন কি কেবলই শীতলতার জন্য নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য কিছু?স্নিগ্ধ চাঁদনীর থুঁতনিতে হাত রেখে ধীরে তার মুখ ওপরের দিকে তোলে।চাঁদনীর কম্পন বেগ পায়।স্নিগ্ধ ধীরে ধীরে এগোয় তার দিকে।ঠোঁটে ঠোঁট ডুবে যেতে আর কিছু লহমা বাকি।দু'জনেই এখন ভালোবাসার দুনিয়ায় হারিয়ে গেছে।চাঁদনী ভয়ে চোখ-মুখ খিঁচে আছে। খামছে ধরে রেখেছে স্নিগ্ধর জ্যাকেট।স্নিগ্ধ চাঁদনীর ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ডুবাতে যাবে এমন সময় কেউ একজন বারান্দার সামনে এসে অপ্রত্যাশিত কণ্ঠে বলে উঠে,
' দেইখা লাইছি কইয়া দিমু'
চাঁদনী ভয়ে ছিঁটকে স্নিগ্ধর কাছ থেকে দূরে সরে যায়।হঠাৎ দুজনেই দেখতে পায় বারান্দার সামনে নাদিয়া চোখ বুঁজে দাঁড়িয়ে ।এক লাইন গেয়েই মেয়েটা পুনরায় ঘুমের ঘোরে টলতে টলতে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ে।চাঁদনীর অন্তরাত্মা এখনো ধুকপুক করছে।
'এই মেয়ের মাথার কয়টা তাড় ছিঁড়া একটু বলবে?'
'আরে তাড় ছিঁড়া একটু কেনো হতে যাবে?নাদিয়ার ঘুমের মধ্যে হাঁটা চলা আর কথা বলার অভ্যাস আছে।'
'তাই বলে মক্ষোম সময়ে এন্ট্রি মে*রে সব জগাখিচুরি বানিয়ে দিবে?ময়না চলো আমরা আবার শরু থেকে সব শুরু করি।আমার যে এখনো চুমু খাওয়া হলো না।'
'ইশ যাও তো নিজের রুমে।আসছে চুমু খেতে… যাও বের হও।’
কথাটা বলেই চাঁদনী ধাক্কা মে*রে স্নিগ্ধকে রুম থেকে বের করে দেয়।বেচারা স্নিগ্ধ না খেতে পারলো চুমু আর না পারলো নিজেকে একটু উষ্ণ করতে।কপাল পোড়া।নারীরা প্রতিনিয়ম এভাবেই পুরুষদের মনে আগুন জ্বালিয়ে পালাই পালাই খেলে।শীগ্রই এই নিয়ে পুরুষদের শাহবাগের মোড়ে আন্দোলন করা উচিত।এত কষ্ট মেনে নেওয়া যায় না।
চলবে?