ফন্ট সাইজ:
থিম:
বসন্ত বিলাসিনী

১১তম পর্ব

লেখক: ইশরাত জাহান জেরিন

#বসন্ত_বিলাসিনী

#ইশরাত_জাহান_জেরিন

#পর্ব_১১

(আগেই ওয়ার্নিং দিচ্ছি আজকের পর্বে এমন অনেক কিছুই থাকবে যা সবাই নিতে পারবেন না।আগেও বলেছি গল্পটা শুধুমাত্র বিনোদনের জন্য তৈরি করা।তাই যারা বিনোদন নিতে পারবেন তারাই গল্পটা পরবেন আর বাকিরা স্কিপ করবেন।ধন্যবাদ)

আজ রাতে সকলে বাড়ির উদ্দেশ্য রৌওনা হবে।সবার তাই একটু মন খারাপ।যদিও আজ সকাল সকাল সবাই শ্রীমঙ্গলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। বাসে চাঁদনী আর স্নিগ্ধ দু'জনেই আজ সময় কাটিয়ে দেয় ঘুমিয়ে।নাদিয়ার তাতে একটু সন্দেহ হচ্ছে।একসঙ্গে দুজনেই পড়ে ঘুমাচ্ছে।ব্যাপারটা তো সুবিধার নয়।যদিও তাতে তার কিছু আসে যায় না।নাদিয়া নিজের ব্যাগটা খুলে চেক করে বস্তাটা ঠিকঠাক আছে কিনা।কারন আজকেও তাকে একটা বড় মিশন কমপ্লিট করতে হবে।

দেখতে দেখতে বাস শ্রীমঙ্গলের কাছে চলে আসে।বাস থেকে নামতে না নামতেই চারিদিকে কত সবুজতা।ইচ্ছে করছে সারাজীবন এখানেই থেকে যেতে।খানিকক্ষণ আগেই স্নিগ্ধ আর চাঁদনীর ঘুম ভেঙেছে।ঘুম ভাঙতে না ভাঙতেই তাদের সামনে হাজির হয় নাদিয়া।ভ্রুকুটি করে গান ধরে,

'দেইখা লাইছি কইয়া দিমু।'

আবারে বিপাকে পড়ে যায় চাঁদনী আর স্নিগ্ধ। বার বার এই মেয়ে কোথা থেকে উদয় হয়?

'এই মেয়ে কি দেখো ফেলেছো?যখন না তখনি খালি এই এক গান।’

স্নিগ্ধর কটমট কথায় নাদিয়া ছ্যাঁত করে উঠে।পরক্ষণেই নিজেকে সামলে বলে,

'আরে ইতনে রাগ কিউ কারতে হো?মে ভয় পা গেয়া না?'

'ধ্যাত! কি সব বা*লছাল বলে।'

-

শ্রীমঙ্গল প্রকৃতির এক নৈসর্গিক কাব্য। এই ভূমি চায়ের গন্ধমাখা বাতাসে ভাস্বর।যেখানে চিরসবুজ পাহাড় ও নিবিড় বাগান সৃষ্টি করেছে এক অপার্থিব অনুভূতি। "চা-রাজধানী" শ্রীমঙ্গলের প্রাকৃতিক শোভা কেবল নয়নাভিরাম নয় বরং এটি হৃদয়ের গভীরে এনে দেয় অনির্বচনীয় প্রশান্তি।

চা-বাগানের সবুজ গালিচার মাঝে হাত ধরে হাঁটছে চাঁদনী আর স্নিগ্ধ। চাঁদনীর ছোট পার্সটি স্নিগ্ধর হাতে। কোনো অনুরোধ ছাড়াই, বিন্দুমাত্র লজ্জা না করে, প্রেমিকার ব্যাগ নিজের হাতে তুলে নিয়েছে সে। এ যেন সাক্ষাৎ জেন্টেলম্যান।হঠাৎ চাঁদনী থেমে গিয়ে বলল,

'একটা ছবি তুলে দাও তো।'

স্নিগ্ধ তার দিকে এক পলক তাকিয়ে মুচকি হাসল। এরপর কোনো পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই চাঁদনীর দিকে ঝুঁকে এলো। আশেপাশে কেউ আছে বা নেই, তাতে কিছুই যায় আসে না তার। চাঁদনী দ্রুত তাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলে উঠল,

'তুমি কি করছো? চারপাশে এত লোকজন আছে দেখতে পাচ্ছো না? আমি বলেছি ছবি তুলে দিতে চুমু খেতে বলিনি!'

স্নিগ্ধ নির্লজ্জ ভঙ্গিতে হাসল। তারপর বলল,

'ওই কথাই তো বলেছ! আমি শুনলাম তুমি বললে, এটা চুমু দাও না।তাই তো আমি....'

স্নিগ্ধ কথাটা সম্পুর্ন না করেই আবারো মুচকি হাসে।হঠাৎ তার চোখ যায় নাদিয়ার দিকে।মেয়েটা বস্তা নিয়ে বের হয়েছে।চোখেমুখে কেমন যেন গম্ভীরতা।কারো সঙ্গে কথা না বলে তরতর করে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

'তোমার এই বান্ধবী কি কোনো সাইকো কিলার নাকি?যেখানেই যায় বস্তা নিয়ে যায়?গোপনে আবার কাউকে খু*ন করছে না তো?কালকেও দেখলাম বাস থেকে বস্তা নিয়ে নামছে।জিজ্ঞেস করেছিলাম তবে পাত্তা দিলো না।'

'আরে আরে সাইকো কিলার হতে যাবে কেন?'

কথাটা বলেই চাঁদনী নাদিয়াকে হাঁক ছেড়ে ডাকে।নাদিয়া কথা না বলে এগিয়ে আসে।

'কিরে ওকে বলতো তো তুই বস্তা দিয়ে কি করিস।'

নাদিয়া একবার হেসে তাকায় দুজনের দিকে।তারপর বলে,

'কি করি মানে?কালকে কত বড় মিশন কমপ্লিট করেছি জানেন?জাফলং এর সব পাথর কুড়িয়ে বস্তায় ভরে নিয়ে এসেছি।আর আজকে নেমেছি চা পাতা মিশনে।এক বস্তা চা পাতা না নিয়ে আমি এখান থেকে আজ যাচ্ছি না।ওকে মে যাতা হু জিজু বাই।'

স্নিগ্ধ হতবাক।কি না কি ভেবেছিল সে অথচ এই মেয়ে দেখি পাথর আর চা-পাতা দিয়ে বস্তা ভারী করছে।কিন্তু এসব দিয়ে সে করবে কি?হঠাৎ স্নিগ্ধর খেয়াল হয় নাদিয়া তাকে জিজু বলে সম্বোধন করেছে।এত খুশী খুশী কেনো লাগছে?নাদিয়া চলে যেতে নিলে সে আবারো তাকে পেছন থেকে ডাকে,

'ইদার আও শালিকা।'

'কিয়া হুয়া জিজু।'

ওমা আবারো জিজু বলল?খুশী হয়ে স্নিগ্ধ মানিব্যাগ বের করে ২ হাজার টাকার দু'টো নোট বের করে নাদিয়ার হাতে তুলে দিয়ে বলে।

'দীর্ঘজীবি হয় শালিকা।চিল করো যাও।'

কথাটা বলেই স্নিগ্ধর চাঁদনী হাতটা আরো শক্ত করে চেপে ধরে খুশী মনে বুক ফুলিয়ে সেখান থেকে চলে যায়।কিন্তু নির্বোধ নাদিয়া এখনো বুঝে উঠতে পারছে না হুট করে স্নিগ্ধ তাকে ২ হাজার ধরিয়ে দিয়ে কেন চলে গেলো?

-

চা বাগানের নিকটেই একটা চা দোকান।লোকাল মানুষদের কাছ থেকে শুনেছে এখানে নাকি বিভিন্ন স্বাদের চা পাওয়া যায়।চায়ের টং দোকানটি ছোট্ট অথচ একেবারে প্রাণচঞ্চল একটি জায়গা। বাঁশ আর টিন দিয়ে তৈরি দোকানটি চা-বাগানের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে। ছাদের টিনে কালের ছাপ পড়ে গেছে।জায়গায় জায়গায় মরিচা ধরেছে।দোকানের সামনে দু-তিনটি বাঁশের বেঞ্চ আর কাঠের পুরনো টেবিল রাখা। টেবিলগুলোর কোণে দাগ পড়া যা দিনের পর দিন চায়ের কাপে ভেজা কাহিনির সাক্ষ্য বহন করছে।দোকানের একপাশে মাটির চুলা জ্বলছে। তাতে কালো কেতলি ধোঁয়া ছাড়ছে আর তীব্র উষ্ণতায় ফুটছে চা। দোকানের দেয়ালে পুরনো সিনেমার পোস্টার আর কিছু রঙচটা বিজ্ঞাপন লটকে আছে। স্নিগ্ধ চাঁদনীকে নিয়ে বাঁশের বেঞ্চে বসে।বৃদ্ধ দোকানদারের ভালোই বয়েস হয়েছে।সে স্নিগ্ধ কে দেখে বলে উঠে,

'আপনাকে চু দিই...?'

স্নিগ্ধ মুহুর্তেই রেগে যায়।বলা নেই কওয়া নেই একটা লোক তাকে আন্দাজে কি করে গালি দিতে পারে?স্নিগ্ধ তেড়েফুঁসে কিছু বলতে যাবে সঙ্গে সঙ্গে দোকানে বসে থাকা একটা ছেলে বলে উঠে,

'হেয় আমনেরে গালি দেই নাই।হেয় আসলে চা রে চু উচ্চারণ করে।উচ্চারণে সমস্যা। বংশগত রোগ জনাব।রাগ কইরেন না।'

কি অদ্ভুত সমস্যারে বাবা।জীবনে প্রথম এমন সমস্যার কথা শুনছে সে।কি আর করার যেহেতু সমস্যাই তাহলে তো আর কিছু বলা যাবে না।লোকটি পুনরায় বলে উঠলেন,

'দিবো?'

'হ্যাঁ কাকা বেশি করে দুধ-চিনি দিয়া আমাকে একটু চু দেন।'

'বসেন চু দিই...'

চাঁদনী লজ্জায় লাল হয়ে যায়।কি সব নাউজুবিল্লাহ মার্কা কথা বলছে এরা?কোনো মতে সে এখান থেকে যেতে পারলেই বাঁচে।

-

অধোরা দোলনায় বসে একগুঁয়েভাবে চিপস চিবোচ্ছে। শরীর খারাপের অজুহাতে আজ ঘুরতে যায়নি সে। স্নিগ্ধ আর চাঁদনীর ঘোরাফেরা, প্রেমময় আলাপচারিতা এসব সহ্য করার মতো মানসিকতা তার আর নেই। এমনিতেই কি কম যন্ত্রণা সহ্য করেছে?হঠাৎ দোতলা থেকে আদিপের কণ্ঠ ভেসে আসে,

'এখন শরীর বেটার লাগছে?'

অধোরা চাইলেও সত্য বলতে পারবে না। যদি শরীর খারাপের কথা না বলত তবে সবাই তাকে ঘুরতে যাওয়ার জন্য জোর করত। বাধ্য হয়ে মিথ্যা উত্তর দেয় সে,

'হুম আগের থেকে ভালো।'

'তাহলে তৈরি হয়ে নাও। বাইরে একটু ঘুরতে যাব। খাওয়া-দাওয়া করব। দেখবে শরীর পুরোপুরি ঠিক হয়ে গেছে।'

অধোরা নিশ্চুপ। আদিপের এই অনুরোধ উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। নিজের আনন্দ-উৎসব মাটি করে সে এখানে রয়ে গেছে শুধু তারই জন্য। তাকে ফিরিয়ে দেওয়ার শক্তি অধোরার নেই।

'আচ্ছা। আমি পাঁচ মিনিটের মধ্যে তৈরি হচ্ছি।'

প্রেম এক বিচিত্র অনুভূতি। প্রেম আমাদের অতি কাছে থেকেও ধরা দিতে চায় না।মানুষ সারাজীবন প্রেম খুঁজে বেরায় অথচ প্রেমের বসবাস মানুষের চার প্রকোষ্ঠের হৃদয়ে।আদিপ মুচকি হাসে। মনে মনে শুধায়, প্রেম আমার চারিপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে।তবে তাকে ছোঁয়ার সাধ্য কি আমার আদৌও হবে?

-

আধার নেমে গেছে।বাকিরা চলে গেছে।তবে স্নিগ্ধ আর চাঁদনী ফিরবে একেবারে বাস ছাড়ার সময়।যদিও তারা এখন হোটেলের খুব একটা দূরে নেই।দুজনে একটা সান বাঁধানো পুকুরঘাটে বসে আছে।স্নিগ্ধর কাঁধে চাঁদনী মাথা। দু'জনে গুনগুন করে গল্প করছে।চারিদিকে রাতের কি অপূর্ব পরিবেশ।এদিকটা বেশ নিরিবিলি।গ্রাম্য এলাকা। হয়তো তাই সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ সব ঘরের ভেতর দরজা লাগিয়ে বসে আছে।

'এই শীতেই বিয়েটা করে নেওয়া দরকার।বেশি দেরি করলে আবার ঝামেলা।'

'হুম তাও ঠিক।'

স্নিগ্ধ একটা সিগারেট ধরিয়ে ধোঁয়া উড়িয়ে দেয়।আজ তার রাজা-রাজা ফিলিংস হচ্ছে।পাশে তার রানি বসে।হাতে আছে সিগারেট। পুরুষ মানুষ এতটুকুতেই সন্তুষ্ট। হঠাৎ চাঁদনী স্নিগ্ধর কাঁধ থেকে নিচের মাথা সরিয়ে তার পানে চায়।অদ্ভুত চাহনী তার।কি যেন চাইছে এই চোখজোড়া। চাঁদনী একবার স্নিগ্ধর সিগারেটের ধোঁয়ায় জ্বলসে যাওয়া ঠোঁটের দিকে তাকায়।তারপর স্নিগ্ধর হাত থেকে সিগারেটটা ছোঁ মে*রে নিজের আয়ত্তে নিয়ে ফেলে দেয়।স্নিগ্ধ কোনো প্রশ্ন করে না।তার যে নেশা ধরে যাচ্ছে।সিগারেটের নেশা নয়, এ নেশা নারীর নেশা।ভয়ানক এক নেশা।চাঁদনী স্নিগ্ধ জ্যাকেটের কলার টেনে ধরে।দু'জনের ঠোঁট এক হতে যাবে সেই মুহুর্তেই এক লোক টর্চ মারে তাদের মুখের ওপর।

‘করিম নি? দাদারে এক বদনা পানি আইন্না দে।ম*রার কলেরা আইবার সময় পাইছেনা।ও আম্মা পড়ি গেলো রে।’

চলবে?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন