ফন্ট সাইজ:
থিম:
বসন্ত বিলাসিনী

১৪তম পর্ব

লেখক: ইশরাত জাহান জেরিন

#বসন্ত_বিলাসিনী

#ইশরাত_জাহান_জেরিন

#পর্ব_১৪

ছাদের মুক্ত প্রাঙ্গণে জড়ো হওয়া মানুষের দল কথোপকথনের স্রোতে মগ্ন। হঠাৎ এক অজানা মাধুর্যে পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। কাঁচা হলুদ রঙের শাড়ি পরিহিতা এক নারী ছাদে প্রবেশ করতেই মুহূর্তে চারপাশের গুঞ্জন স্তব্ধ হয়ে যায়। উপস্থিত সকলে বিস্ময়ভরা মুগ্ধতা নিয়ে তার দিকে তাকায়।তার সূক্ষ্ম সাজ,অলংকারবিহীন হালকা আভায় মোড়ানো। হাতে কাঁচের রেশমি চুড়ির। খোঁপায় গাঁথা বেলী ফুল তাকে করে তুলেছে অনন্য।তার চোখের গভীরতায় মিশে যাওয়া কাজলের কালো রেখা এক বিস্মৃত অতল গহ্বরের প্রতিচ্ছবি। তার রূপের সরলতায় লুকিয়ে থাকা অনির্বচনীয় শোভা ছাদভর্তি মানুষের হৃদয়ে নিঃশব্দতার ঝড় তুলে।হ্যাঁ, এই শ্যামাঙ্গিনী আর কেউ নয় বরং অধোরা।আদিপ হা করে তাকিয়ে আছে অধোরার দিকে।তার নড়চড় নেই।হঠাৎ পেছন থেকে আদিবা তাকে খোঁচা মারে।হুঁশ ফিরে আদিপের।সঙ্গে সঙ্গে বসা থেকে উঠে অধোরার কাছে গিয়ে বলে,

'শেষমেশ তাহলে তুমি এসেছো?'

আদিপের মাও সেখানেই ছিলেন। অধোরাকে আজ একেবারে ভিন্ন রুপে দেখে সে নিজেও চোখ ফিরাতে পারছেন না।এই মেয়েকে দেখলে এত শান্তি কেনো লাগি?চোখ, মন দু'টোই জুড়িয়ে যায়।সকলে খুশী হলেও বোধ হয় চাঁদনী আর স্নিগ্ধ খুব একটা খুশী হতে পারে নি।সকলের মাঝ থেকে স্নিগ্ধ আদিপকে ডেকে ছাদের কর্ণারে নিয়ে যায়।তারপর কি একটা বলেই সকলের কাছ থেকে বিদায় নেয়।অতঃপর চাঁদনীকে নিয়ে সেখান থেকে চলে যায়।সকলের আর বোঝার বাকি রয় না।এদিকে স্নিগ্ধ আর চাঁদনীকে দেখে অধোরাও বেশ অস্বস্তিতে পড়ে গিয়েছিলো। যাক তারা চলে গিয়েছে এতে মন্দ হয় নি।কিন্তু মনে মনে আবার কিছুটা খারাপও লাগছে। অধোরা নিজেকে দোষারোপ করে বলছে,আমার জন্যই তারা চলে গেলো।আগে জানলে আমি কি এখানে আসতাম?কখনোই না।

-

চাঁদনীর বাড়ির সামনে এসে থেমে যায় স্নিগ্ধর বাইক। চাঁদনী নেমে সতর্ক দৃষ্টিতে চারপাশ একবার পরখ করে নেয়।আগেই স্পষ্ট করে বলেছিল স্নিগ্ধকে,রাস্তার মোড়েই নামিয়ে দিতে। কিন্তু স্নিগ্ধ একগুঁয়ে জেদের কারনে কিছু বলেও কোনো লাভ হয় নি।স্নিগ্ধর বাইক সোজা তার বাড়ির দোরগোড়ায় এসেই থামে। এ মানুষটিকে কে বোঝাবে? এমন অনধিকার সাহস কতটা বিপজ্জনক হতে পারে!এমনিতেই এখন অনেক কিছু বদলে গেছে।সবাই তাদের হাতেনাতে ধরার অপেক্ষায়।চৈত্রের বাতাসে ধুলো আর শূন্যতার গন্ধ।রাতের আকাশ চৈত্রের উষ্ণ মাদকতায় ঢেকে গেছে।চাঁদনী হেসে স্নিগ্ধকে বলল,

'কাল দেখা হবে।জলদি বাসায় গিয়ে মেসেজ করো।'

'কাম হেয়ার।'

'হুম বলো।'

'একটা সত্য কথা বলবো?'

চাঁদনী প্রশ্নবোধক চাহনিতে স্নিগ্ধর দিকে তাকায়।স্নিগ্ধ হেসে জবাব দেয়,

'আই লাভ ইউ।'

'হায়রে।আমি ভাবলাম কি না কি।আচ্ছা আই লাভ হউ টু।এখন যাও জলদি।'

'কাছে আসো।একটা চুমু দিবো।'

'আরে?'

কিছু বলার আগেই স্নিগ্ধ চাঁদনীর হাত ধরে টান দিতেই স্নিগ্ধর আয়ত্তে চলে যায়।ভয়ে ঠোঁট কেঁপে উঠে মেয়েটার।স্নিগ্ধ তার ভয়ার্ত চেহারার দিকে একবার তাকায়।মুচকি হাসে।তারপর চাঁদনীর কপালে চুমু দিয়ে বলে,

'তোমাকে ছাড়া অন্য কাউকে ভালোবাসা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।তুমিই হবে আমার শুরু আর তোমাতেই আমার শেষ। শুধু একটা কথা মাথায় রাখবে,বেইমানদের আমি অসম্ভব ঘৃণা করি।দুনিয়া উল্টে গেলেও স্নিগ্ধ বেইমানদের প্রতি করুণা করে না।এখন সেই মানুষ যদি তার ভালোবাসার মানুষও হয়ে থাকে না কেন এই স্নিগ্ধ তার ছায়ার দিকেও ফিরে চাইবে না।'

'আমার চোখে তুমি বুঝি ভালোবাসা দেখো না?বেইমানি দেখো?'

'আরে ময়না মন খারাপ করছো কেন?আমি শুধু বলে রাখলাম।যাতে কখনো তোমার ভেতর ওইসব করার চিন্তাও না জাগে।'

চাঁদনী স্নিগ্ধর গালে চুমু দিয়ে বলে,ওইসব চিন্তা আমার আসবেও না।'

কথাটা বলেই চাঁদনী স্নিগ্ধর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ির মধ্যে চলে আসে।স্নিগ্ধও দেরী না করে চলে যায়।চাঁদনী বাড়ির মধ্যে প্রবেশ করতেই কেউ একজন তার হাত টেনে ধরে।কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই নিজের রুমে নিয়ে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়।

-

ড্রয়িং রুমে সকলে বসে আছে।বাড়িতে প্রবেশ করতেই কিছুটা অবাক হয় স্নিগ্ধ। আজ সবাই একসঙ্গে? নিশ্চয়ই তার উপর দিয়ে আজ আরো একটা ঝড় বইতে চলেছে।স্নিগ্ধ সকলকে তোয়াক্কা না করে রুমের দিকে পা বাড়ায়।তবে হঠাৎ করেই থমকে যায় তার পা।আনোয়ার দরাজ গলায় বলেন,

'স্নিগ্ধ শুনে যাও।'

স্নিগ্ধ এটারই অপেক্ষায় ছিলো।আজ তার সঙ্গে কিছু না কিছু তো একটা ঘটবেই।হঠাৎ সকলের মাঝে বসে থাকা অধোরার দিকে চোখ যেতেই স্নিগ্ধর শরীর জ্বলে উঠে।নিশ্চয়ই এই মেয়েই কোনো না কোনো প্যাঁচ লাগিয়েছে।এছাড়া ওর দ্বারা আর কি সম্ভব? ওই একটা কাজই তো ভালো করে করতে পারে।স্নিগ্ধ তার বাবার সাথে বসতেই তিনি বলে উঠেন,

'আমাকে কি তুমি সুস্থ ভাবে মরতেও দিবে না?এত কষ্ট করে অর্জন করা সম্মান তোমার জন্য শেষ।বংশের সম্মানটা তোমার জন্যই ধ্বংস হচ্ছে।'

'কেনো কি এমন করলাম যে সব সম্মান একেবারে ধ্বংস হয়ে গেছে?'

'আবার প্রশ্ন?মেয়ে নিয়ে রাত বিরেতে বাহিরে ঘুরতে লজ্জা লাগে না?আর ওই মেয়েই বা কেমন পরিবারের যে নিজের সম্মানের কথা চিন্তা না করে তোমার সঙ্গে ঘুরে বেড়ায়?আর এত মোহাব্বত কেনো যে তাকে নিয়ে বন্ধুর বারবিকিউ পার্টিতেও যেতে হবে?এভাবে চললে এই বাড়ির দরজা আমি সত্যি একদিন তোমার জন্য বন্ধ করে দিবো।পুরোনো কথা কিন্তু আমি এখনো ভুলি নি।সময় আছে সব বাদ দিয়ে ব্যবসার হাল ধরো।আরেকদিন যদি দেখি তুমি ওই মেয়ের সঙ্গে তাহলে আমি আগে ওই মেয়েকে গিয়ে জিজ্ঞেস করবো তোমার মতো বেকার,অসভ্যের সঙ্গে সম্পর্কে জড়াতে তার রুচিতে কি করে বাঁধলো?'

স্নিগ্ধর রাগে শরীরের রগ ফুলে উঠেছে।মাঠের মুঠো শক্ত করে ফেলেছে। বাবার জায়গায় অন্য কেউ হলে বোধহয় এখানেই জিন্দা কবর দিতো সে।তবে পরিবার তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। সে সবাইকে সম্মান করে।হয়তো সেই কারনেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে।

'এসব ওই অধোরা বলেছে তাই না?ওর তো কাজই অশান্তি লাগানো।'

কঠমঠ করে কথাটা বলেই স্নিগ্ধ তেড়ে যায় অধোরার দিকে।হঠাৎ স্নিগ্ধর এমন আচরণ কেউই আশা করি নি।স্নিগ্ধ অধোরার কিছু করতে যাবে তখনি সায়েম তাকে জোর করে বাঁধা দেয়।এরপর একএক করে সকলেই।স্নিগ্ধ চেঁচিয়ে বলে উঠে,

'অধোরা তুই যেমন আমাকে আগুনে পোড়াচ্ছিস ঠিক তোকেও একই আগুনে পুড়তে হবে। এই স্নিগ্ধ তোর জীবন জাহান্নাম বানিয়প ছাড়বে।জাস্ট ওয়েট এন্ড সি।'

-

চাঁদনীর মুখটা শক্ত করে চেপে ধরেছে জারিফ।গোঙাচ্ছে চাঁদনী।হঠাৎ জারিফ তার শরীরে বাজে ভাবে স্পর্শ করে।নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে মেয়েটা। কিন্তু পারছে না।একসময় ধাক্কা মেরে জারিফ তাকে বিছানায় ফেলে দেয়।নিরেট কন্ঠে বলে,

'নতুন ভাতার জুটিয়েছিস মা**? তাও আবার স্নিগ্ধ?'

'ম..মা..মানে?কি বলছো?তুমি স্নিগ্ধকে কেমন করে চিনো?'

'স্নিগ্ধকে চিনে না গাজীপুরে এমন কোনো মানুষ আছে?যাই হোক এত জীবন নষ্ট করে এখন ওই স্নিগ্ধর পিছনে পড়েছিস?ওফস আমি তো ভুলেই গেছি স্নিগ্ধ বড়োলোক , সুন্দর। তোর তো এইসবই চাই।ঠিক বললাম না চাঁদ?'

'আমি রুমে যাবো।জায়গা দাও আমাকে।' ক্ষিপ্ত কন্ঠে বলে উঠে চাঁদনী।'

মুহুর্তেই গালে একটা চড় বসে যায়।চোখ দিয়ে চাঁদনী জল গড়িয়ে পড়ে।সে কুরুণার্ত স্বরে প্রশ্ন করে,

'কেন করছো তুমি এসব?অতীতে তো সবাই ভুল করে?তাই বলে তুমি সেই ভুলকে কাজে লাগিয়ে যা ইচ্ছে তাই করবে?'

'এটাই তো পৃথিবীর নিয়ম।এখানে একজন ভুল করবে।আর অন্য জন সেই ভুলকে কাজে লাগাবে।বাসায় কেউ নেই।তুমি সোনা আজ একাই বাসায় থাকবে।কিন্তু কথা হলো তোমাকে না দেখে আমার কোথাও যেতে মন চাইছিলো না।তাই বাহানা করে বাড়ি এলাম।'

'কি চাই তোমার?দয়াকরে স্নিগ্ধ আর আমার মাঝে কোনো ঝামেলা তৈরি করো না।হাত জোর করছি।'

'ঝামেলা করার শখ আমার নেই।তবে একটা শর্ত আছে।যদি তুমি আমার শর্ত পূরণ করো তাহলে স্নিগ্ধ আর তোমার বিষয়ে বাড়ির কেউ জানবে না।আর স্নিগ্ধও তোমার অতীত সম্পর্কে জানতে পারবে না।এখন দেখো তোমার কি চাই।'

'কি শর্ত?'

'আমার সঙ্গে শুতে হবে।'

জারিফ কথাটা বলেই হাসে।তবে এই হাসি সুবিধার নয়।ওদিকে চাঁদনীর তো ঘৃণায় শরীর কেঁপে উঠছে।মানুষ কতো নোংরা হলে এমন প্রস্তাব দিতে পারে?

'চুপ কেনো?শর্ত পছন্দ হয় নি?'

'আমি জানতাম তুমি নোংরা।তবে এতটা যে তা ভাবতে পারে নি।কি করে ভাবলে তুমি এসব শর্ত দিবে আর আমি তা মেনে নিবো?'

'ওকে ওকে।না মানতে পারলে নেই।'

জারিফ নিজের ফোন হাতড়ে একটা নাম্বার বের করে।তারপর ফোন ঘুড়িয়ে চাঁদনীকে দেখায়।স্নিগ্ধর নাম লেখা।তারই নাম্বার।

'দয়াকরে ভাই এমন করো না প্লিজ।তুমি আমাকে যা বলবে আমি তাই করবো।প্লিজ।স্নিগ্ধ সব জানতে পারলে কিছুতেই এই সম্পর্ক রাখবে না।'

জারিফ মুচকি হাসে।চাঁদনীর শুষ্ক ঠোঁটে হাত বুলিয়ে বলে,

'তাহলে তুমি প্রস্তুত তো চাঁদ? '

চলবে?

(অনেক হাসাহাসি হইছে এবার একটু গল্পে টুইস্ট দেওয়ার পালা।যাই হোক এই গল্পের অনেক চরিত্র কিন্তু জীবন্ত।যদি কখনো গাজীপুর আসেন তাহলে চরিত্রগুলোর দেখা পেতে পারেন।)

(যাই হোক সবাইকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা। সকলের নতুন বছর সুন্দর কাটুক।নতুন বছরের প্রথম দিন কেমন কাটলো অবশ্যই জানাবেন।ধন্যবাদ।)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন