#বসন্ত_বিলাসিনী
#ইশরাত_জাহান_জেরিন
#পর্ব_১৫
ভালোবাসা পাপ নয়। ভালোবাসা তো হৃদয়ের শুদ্ধতম অনুভূতি, আত্মার গভীরতম সংলাপ। কিন্তু ভুল মানুষকে ভালোবাসা?তা যে শুধু পাপ নয় বরং মূর্খতারও চূড়ান্ত রূপ।আচ্ছা রাগী ও জেদি প্রকৃতির মানুষের অন্তর নাকি কোমল হয়?তবে স্নিগ্ধ কেন এর ব্যতিক্রম?তার মন কেন কঠোর?আচরণ কেনো কঠিন?কেন সে বারবার অধোরাকে দোষারোপ করছে? অধোরা তো কখনো স্নিগ্ধ আর চাঁদনীর মাঝে আসতে চায়নি, দূরেই থেকেছে। নিজেকে গুটিয়ে রেখেছে, শুধু এই ভয়ে যে তার উপস্থিতি হয়তো ভুল বোঝার এবং সম্পর্ক ভাঙ্গার কারন হবে।তবু এতকিছুর পরেও সেই দোষের দায়ভার অধোরার কাঁধেই চাপিয়ে দেওয়া হলো। যে দোষ এড়াতে সে নিজের ভালোবাসা গোপন করে দূরে সরে এসেছে,তাকেই সেই দোষের ভাগীদার বানানো হলো। যে দোষ সে কখনো করেই নি।
রাতের ঘটনার পর থেকে নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে অধোরা অশ্রুধারায় ভাসছে। জীবনের পথচলা তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?এ জীবন তাকে কোনোদিন নিজের কথা বলার সুযোগই দেয়নি।শুধু দিয়েছে অন্যের কথা শোনার এবং কষ্ট সহ্য করার অন্তহীন ক্ষমতা। রাতের সেই ভয়াবহ ঘটনায় পরিবারের মধ্যে যে অশান্তি দানা বেঁধেছে, তার জন্য কি সত্যিই অধোরা দায়ী?চাঁদনী আর স্নিগ্ধের বিষয়টি তো রবিউল চাচা নিজেই আনোয়ার আংকেলকে জানিয়েছিলেন। অথচ, পুরো সত্য না জেনেই স্নিগ্ধ কী নির্দ্বিধায় সমস্ত দোষ তার ঘাড়ে চাপিয়ে দিল!এখন তো মনে হচ্ছে দিনকে দিন সে এক বোঝায় পরিণত হচ্ছে।এভাবে চলতে থাকলে একদিন তার জন্য শেখ পরিবার নষ্ট হয়ে যাবে।তখন সেই পাহাড় সমান কষ্ট কি করে অধোরা সইবে?হঠাৎ অধোরার প্রচন্ড পানির পিপাসা পায়।কাঁদতে কাঁদতে গলাটা খরায় পরিনত হয়েছে।রুমে পানিও রাখা নেই।অধোরা চোখ মুছে ঘড়ির দিকে তাকায়।তিনটার কাছাকাছি বাজে।সবাই এতক্ষণে হয়তো ঘুমিয়ে গিয়েছে।অধোরা টিপটিপ করে রুম থেকে বের হয়।পানি নিয়ে রুমের ভেতর প্রবেশ করতেই তার পা থমকে যায়।মুখ থেকে বেড়িয়ে আসে,
'স্নিগ্ধ ভাইয়া?'
-
বিছানার সঙ্গে লেপ্টে আছে চাঁদনী। চোখে জল।ভিতরে ভয়ের শঙ্কা। গায়ের ওরনাটা কোথায় পড়ে আছে তা জানা নেই।চুল গুলো উসকোখুসকো।ঠোঁটের লাল লিপস্টিক ছড়িয়ে।জারিফ তার সঙ্গে কিছু করেনি।তবে তার বিষাক্ত বাক্যবাণ চাঁদনীকে ভেতরে ভেতরে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে। লোকটা চলে গেছে কিন্তু রেখে গেছে ভয় আর সন্দেহের এক দুর্বিষহ জঞ্জাল। চাঁদনীর মাথার ভেতর চিন্তার ঘূর্ণি থামছে না।হয়তো একটা উপায় আছে। যদি জারিফ ভাইকে সরিয়ে ফেলা যায়? এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, এটাই সব সমস্যার সমাধান। জারিফের মৃ*ত্যু মানে ভয় ও আতঙ্কের অবসান। কিন্তু খুন? এ চিন্তা তার শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল স্রোতের মতো নেমে আসে। সাহস কোথায়? খুন তো আর সহজ ব্যাপার নয়।চিন্তার ভারে তার মাথা আরও ভারী হয়ে আসে। হঠাৎ ভেতরের সব যন্ত্রণা চিৎকার হয়ে বেরিয়ে আসে। এই মধ্যরাতে তার করুণ কান্না শূন্য ঘরটিকে নি:সঙ্গ করে তুলেছে। অথচ আশপাশে কেউ নেই তার এই কান্না শোনার জন্য।কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায়≈এই ভয়ের, এই অব্যক্ত যন্ত্রণার শেষ কোথায়? কতদিন তাকে এভাবে কাঁদতে হবে?কারন কাঁদানোর মানুষ তো কম নেই, নেই কষ্ট দেওয়ার লোকের অভাব।
-
'আপনি আমার রুমে কেন?তাও আবার এত রাতে?'
'আমার বাড়ি, আমি কখন কোন রুমে যাবো তার অনুমতি কি তোর থেকে নিতে হবে?'
স্নিগ্ধর কাঠকাঠ জবাবে কেঁপে উঠে অধোরার শরীর।এমনিতেই কান্নার ফলে চোখ-মুখ ফুলে উঠেছে। তার উপর এই স্নিগ্ধ তাকে আবারো কাঁদাতে চলে এসেছে।স্নিগ্ধ ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে অধোরার কাছে।কিছু বুঝার আগেই হাত মুচড়ে ধরে স্নিগ্ধ। ব্যথায় কুকিয়ে উঠতেই স্নিগ্ধ অধোরার মুখ চেপে ধরে। নিজের শাহাদাত আঙুল ঠোঁটের ওপর রেখে তীক্ষ্ণ কন্ঠে বলে,
'হিশশশশশশশশশশশশশ।তোর লেকচার শুনতে আসি নি।তোর জন্য এখন আমার পরিবার আমার বিরুদ্ধে। সবাইকে তুই তাবিজ করে বশ করতে পারলেও এই শেখ শাহরিয়ার স্নিগ্ধকে পারবি না।আর তোদের মতোন মেয়েদের না আমার চেনা আছে।তোরা এতিম হওয়ার সুযোগ নিয়ে বড়োলোক পরিবারের পেছনে লেলিয়ে দেয়া কুত্তার মতো ঘুরিস।তোর অবস্থাও সেইম।এগুলাই তো তোদের ব্যবসা।ভিতরে লজ্জা সরম থাকলে এই বাড়িতে এত কিছুর পরেও পরে থাকতি না।আশা করছি আমি কিছু করার আগেই চলে যাবি।আর আমাদের সবাইকে শান্তিতে থাকতে দিবি।'
কথাটা বলে স্নিগ্ধ অধোরাকে ছেড়ে দিয়ে রুম থেকে বেড়িয়ে পড়ে।অধোরা দরজার লাগায় দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে পুনরায় কান্নায় ভেঙে পড়ে।তবে এবারের যন্ত্রণা আগের থেকেও বেশি হচ্ছে।
'আম্মু-আব্বু কেনো আমায় রেখে তোমরা চলে গেছো?আমি যে আর সহ্য করতে পারছি না।আমি আর থাকতে পারছি না।'
-
সকাল পেরিয়ে গেছে। চৈত্রের রোদ আকাশ জুড়ে মেলে দিয়েছে সোনালি এক চাদর। বাতাসে বসন্তের শেষ সুরেলা পরশ।যা একদিকে শুষ্ক, অন্যদিকে কোমল।কৃষ্ণচূড়া আর রাধাচূড়ার রক্তিম ফুলে ঢেকে গেছে গাছের ডালপালা। শালিক পাখির কাকলিতে ভরে উঠেছে আকাশ।কলেজে আজ ফ্যাস্টিবাল ছিলো।চাঁদনী সকাল সকাল তৈরি হয়ে নাদিয়ার বাড়িতে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়।নাদিয়া সাজতে পারে না।তাই চাঁদনী তাকে সাজিয়ে দিবে।চোখে তার ঘুম।কিন্তু ঘুমের কথা মনে করলেই রাতের কথা মনে পড়ে যায়।আর রাতের কথা ভাবলে সেই ভয়ানক মুহুর্তের কথা।চাঁদনী বাড়ি থেকে বের হবে এমন সময় জারিফ বাইক নিয়ে বের হয়।চাঁদনীকে দেখে হিসহিসিয়ে বলে,
'বাহ আকাশের চাঁদ দেখি আর লাল কৃষ্ণচূড়ায় বদলে গেছে?তো কই যাওয়া হচ্ছে?'
চাঁদনী জবাব দেয় না।চাঁদনীকে নিশ্চুপ থাকতে দেখে জারিফের মেজাজ খারাপ হয়।সে কিড়মিড় করে বলে,
'প্রশ্ন কি কানে যায় নি?'
'ক..কলেজ যাচ্ছি।তবে আগে নাদিয়ার বাসায় যাবো।'
'এইতো গুড গার্ল।বাইকে উঠে বসো। আমি নামিয়ে দিচ্ছি।'
'আ..আমি একা যেতে পারবো?'
'উঠে বসো।'
দাঁত কিড়মিড়িয়ে কথাটা বলতেই চাঁদনী ভয়ে ভয়ে বাইকে উঠে বসে।তবে চাঁদনীর ভয় কিছুতেই কমছে না।এই ছেলের অন্য কোনো পরিকল্পনা নেই তো?
-
শেখ বাড়ির সকলে নিজ নিজ কাজে চলে গিয়েছে।তবে আজ আনোয়ার সাহেব কাজে যেতে পারেন নি।শরীরটা তার ভালো নেই।ঔষধেও কাজ হচ্ছে না।হবেই বা কেমন করে?যতদিন স্নিগ্ধ ঠিক না হচ্ছে ততদিন এসব ঔষধ খেলেও কোনো কাজ হবে না।
'চা খাবে? চা করে দিবো?'স্বামীকে পরম যত্নে প্রশ্ন করেন রোকেয়া।তবে আনোয়ার জবাব দেয় না।খানিকক্ষণ কি একটা চিন্তা করতেই তার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে।শেষ বার নিজের মায়ের মৃ*ত্যুতে কাঁদতে দেখেছিলেন আনোয়ারকে।আর আজ ছেলের কারনে বাবা কাঁদছে। রোয়েকার চোখেও জল চলে আসে।এত ভালোবেসে যেই সন্তানকে মানুষ করেছেন আজ সেই সন্তানই বাবা-মায়ের চোখে জল এনেছে।এর থেকে কষ্টের বুঝি আর কিছু হয়?
'কেঁদো না।সব ঠিক হয়ে যাবে।'
'কি ঠিক হবে?আর কবে?আমি ম*রলে?অধোরাকে কত কষ্ট দিয়েছে স্নিগ্ধ।অথচ মেয়েটা তাকে কত সম্মান করে,রাত জেগে মেয়েটা কত কি করেছে স্নিগ্ধর জন্য।তার পরও ছেলেটার শুকরিয়া নেই।আমি বলে রাখছি স্নিগ্ধকে অধোরার কাছে ক্ষমা চাইতেই হবে।আর বিয়ে করলেও ওকেই করতে হবে।'
'কিন্তু ছেলে তো অন্য কাউকে ভালোবাসে।এভাবে জোর করে যদি আমরা তাকে অধোরার সঙ্গে বিয়ে দেই তাহলে দু'জনের জীবনই নষ্ট হবে।মেয়েটাকে তুমি আর কষ্ট দিও না।'
'তবে তাই হবে।ওই মেয়ের খোঁজ নাও।'
-
নাদিয়ার সঙ্গে করে ক্লাব মোড়ের দিকে হেঁটে চলছে চাঁদনী।ভাগ্যিস আজকে সে স্নিগ্ধকে আগ থেকেই এখানে থাকতে বলেছিলো।তা না হলে তাকে স্নিগ্ধ জারিফ ভাইয়ের সঙ্গে দেখে ফেললে একটা কান্ডও ঘটে যেতে পারত।এখনো চাঁদনী স্নিগ্ধকে জানায় নি যে জারিফ তার খালাতো ভাই।স্নিগ্ধ আদিপের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে।বার বার চোখ বোলাচ্ছে হাত ঘড়ির দিকে।সেই কখন থেকে বাইক নিয়ে সে দাঁড়িয়ে আছে অথচ তার বসন্ত বিলাসিনীর তো আসার খবরই নেই।হঠাৎ দূরে কি একটা দেখে স্নিগ্ধ হুট করে হেসে উঠে।
'কিরে তোকে ভূতে ধরলো নাকি?সকাল সকাল হাসছিস কোন দুঃখে?'
'আরে ওই যে দূরে দু'টো যমুনা সিলিন্ডার দেখা যাচ্ছে।'
স্নিগ্ধ আদিপকে ইশারা করতেই আদিপ সামনের দিকে তাকায়।দেখতে পায় শাড়ি পড়া দু'টো মেয়ে বোধহয় এদিকটায় আসছে।
'ওরা তো মেয়ে।'
'তো কি হয়েছে?একেতো খাটো।তার ওপর পড়েছে লাল শাড়ি।পুরোই যমুনা গ্যাস সিলিন্ডার লাগছে।'
কথাটা বলেই স্নিগ্ধ ফোনে মনোযোগ দেয়।হঠাৎ আদিপ বলে উঠে,
'আরে শা*লা!একটা যমুনা গ্যাস সিলিন্ডারের মালিক দেখি তুই।'
স্নিগ্ধ ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে প্রশ্ন করে,
'মানে কি?'
'সামনে দেখ ভাই তোর ফিউচার বাচ্চার মা।ওফস সরি যমুনা গ্যাস সিলিন্ডার।'
স্নিগ্ধ তৎক্ষনাৎ সামনের দিকে তাকিয়ে চোখ বড় বড় করে বলে,
'বাল! এটা দেখি আমার মাল।'
চলবে?