-"জানো মাম্মা প্রত্যুষ চাচ্চু একটা লাল টুকটুকে বউ নিয়ে এসেছে।"
ছোট বাচ্চাটার কথায় ভ্রু কুঁচকে তাকালো অষ্টাদশী। এমনিতেই কলেজ থেকে এসে ঘুমানোর ফলে মাথাটা ধরে আছে।তারউপর আবার এইসব উদ্ভট কথা-বার্তা। রাহাত বিছানায় দুহাত আঁকড়ে মেঝেতে বসে আছে। প্রাণেশা এগিয়ে গিয়ে দুহাতে তুললো ওঁকে। যত্ন করে কোলে বসালো। মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করলো
-"এসব কী বলছো বাবা?তোমার চাচ্চু বউ আনবে কোত্থেকে?দুষ্টুমি করছো মাম্মার সাথে।"
রাহাত দু'পাশে মাথা নাড়ালো।বাচ্চাসুলভ কন্ঠে আবার বললো
-"সত্যি বলছি মাম্মা।আম্মু বলেছে প্রত্যুষ চাচ্চু বউ এনেছে। কী সুন্দর দেখতে! চলো না তুমিও দেখবে।"
প্রাণেশার চিত্ত কেঁপে উঠে।রাহাতের মুখাবয়ব দেখে মনে হচ্ছে না,ও কোনো দুষ্টুমি করছে।পাঁচ বছরের ছোট বাচ্চাটা নিশ্চয়ই এতো সিরিয়াসভাবে দুষ্টুমি করতে পারবে না।প্রাণেশা বিচলিত হলো।রাহাতকে সাথে নিয়ে বিছানা ছেড়ে নামলো।এখনো ঘুমের রেষ কাটেনি।পুরো রাত প্র্যাক্টিকাল নোট করার চক্করে ঘুমোতে পারেনি।সকালে ঘুম থেকে উঠা মাত্রই দৌড় দিয়েছে কলেজে। তারপর কলেজ থেকে এসে সেই যে ঘুমালো,ঘুম ভাঙলো রাহাতের ডাকে।প্রাণেশা ওয়াশরুমে গিয়ে মুখে পানি ছিটিয়ে আসলো। রাহাতকে কোলে নিয়ে কক্ষ ছেড়ে বেরোলো।মনে মনে ভেবে নিলো
-"হয়তো রাহাত অন্য কাউকে প্রত্যুষ ভাইয়ার বউ ভেবে নিয়েছে।ওর ভাবীপু তো পারেনা দুনিয়ার সব মেয়েকে তার দেবরের বউ বানিয়ে দিতে।হয়তো নতুন কোনো মেয়ে এসেছে,তাই সে পায়তারা করছিলো মেয়েটি সুন্দর,প্রত্যুষের সাথে মানাবে।হয়তো এসব কথায় রাহাতের কানে এসেছে,তাই সে এসব বলছে।তার ভাবীপুর এসব ঘটনা তো নতুন না।"
প্রাণেষা এসব ভেবে হাসলো।আবার কোন মেয়েকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করতে হবে কে জানে!প্রাণেশা তিনতলার সিড়ি বেয়ে নিচে নামলো।ড্রইংরুমে আসতেই অবাক হয়ে গেলো সে।ড্রইংরুমের সোফায় লাল শাড়ি পরিহিতা একটি মেয়ে মাথা নুইয়ে বসে আছে।মাথায় কপাল পর্যন্ত লম্বা করে ঘোমটা টানা।তার পাশেই বসে আছে তার বড় ভাইয়ার বউ রিধিতা স্নেহা।হেঁসে হেঁসে কিছু বলছে লাল শাড়ি পরিহিতা রমনীকে।প্রাণেশার পা থেমে গেলো।তার আম্মু আর বড় আম্মু কয়েকজন সার্ভেন্টের সাথে কিচেনে রান্না করছে কিছু।রান্নার সুবাসে পুরো ড্রইংরুম ম ম করছে যেন।
প্রাণেশা অবাক হয়ে দেখছে সব।রাহাত কোল থেকে নেমে দৌড়ে গেলো মায়ের কাছে। রিধিতা, রাহাত কে কাছে টেনে প্রাণেশা কে চিৎকার দিয়ে ডাকলো।প্রাণেশা দেনামোনা করে এগিয়ে গেলো দুজনের কাছে।ভ্রু কুঁচকে ইশারায় রিধিতাকে জিজ্ঞেস করলো
-"এ কে?"
রিধিতা উচ্ছ্বসিত হেসে হাতে টান দিয়ে নববধূর পাশে বসালো ওঁকে। গদগদ স্বরে বললো
-"তোর ছোট ভাবীপু!"
প্রাণেশা প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকায়।রিধিতা সহজ করে বললো
-"আরে তোর প্রত্যুষ ভাইয়ার বউ।আজ বিয়ে হয়েছে দুজনের।শেষমেশ আমার ভাইটা বিয়ে করলো তবে!দেখে বল,ছোট ভাবী পছন্দ হয়েছে কিনা!"
প্রাণেশার হৃৎপিণ্ড ছলকে উঠে।সোফা ছেড়ে চকিতে উঠে দাঁড়ায়। আতঙ্কিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে, কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বললো
-"কী বলছো এসব ভাবীপু?এভাবে হুট করে কীভাবে কারো বিয়ে হয়ে যেতে পারে?"
রিধিতা মুখ কালো করে বললো
-"হ্যাঁ রে।কীভাবে যেন হুট করেই বিয়েটা হয়ে গেলো।ধুর! কত কিছু প্ল্যান করে রেখেছিলাম ভাইয়ার বিয়ে নিয়ে।কিছুই হলো না।সমস্যা নেই বাবা বলেছে পরে বড়ো করে অনুষ্ঠান করবে,তখন দুজন মিলে সেই চিল করবো।"
অষ্টাদশীর পা কাপে।অস্হির অস্হির লাগে নিজেকে।চোখ ঝাপসা হয়ে আসে।কী করে বিয়ে করতে পারে তার প্রত্যুষ ভাই?এতই সোজা বিয়ে করা!তাকে ছেড়ে অন্য কাউকে কীভাবে বউ রূপে গ্রহণ করতে পারে!যার জন্য তার হৃদয় সবসময় ব্যকুল হয়ে থাকে,যাকে পাওয়ার আশায় তার দিন-রজনী কাটে তাকে অন্য কেও নিজের করে নিলো,এ যেন মন-মস্তিষ্ক মানতে নারাজ।না,সব মিথ্যা। সব।সব ওর বিভ্রম। এ হতে পারে না,তার প্রত্যুষ ভাইয়া অন্য কারো হতে পারেনা।
প্রাণেশা পিছিয়ে গেলো।বিভ্রান্ত চিত্তে দৌড়ে সিড়ি বেয়ে উপরে চলে গেলো।রিধিতা অবাক হলো ভারী,সাথে অবাক চোখে তাকালো নববধূ। তাকে দেখে এভাবে দৌড়ে চলে যাওয়ার কাহিনীটা ধরতে পারলো না।
প্রাণেশার পুরো নাম অদ্রিকা ভূইয়া প্রাণেশা। প্রত্যুষ, প্রাণেশার জেঠাতো ভাই।পুরো নাম আবরাহাম ভূইয়া প্রত্যুষ।এ বাড়ির বড় কর্তা পলক ভূইয়ার ছোট ছেলে।তার বড় ছেলের নাম প্রহর ভূইয়া। এবং প্রহর ভূইয়ার স্ত্রীই হলো রিধিতা স্নেহা।তাদের দুজনের বাচ্চার নাম রাহাত। প্রাণেশার বাবা এ বাড়ির ছোট কর্তা পিয়াস ভূইয়া।এদের যৌথ ফ্যামিলি নিয়ে ভূইয়া পরিবার।
প্রাণেশা এক দৌড়ে তিনতলায় এলো।উদ্ভ্রান্তের ন্যায় ছুটে গেলো প্রত্যুষের কক্ষের দিকে।প্রত্যুষ উল্টো পিঠে ঘুরে কিছু একটা করছে।দরজার দিক থেকে তার পিঠ দৃশ্যমান। প্রাণেশা দৌড়ে গিয়ে উল্টো দিক থেকে জড়িয়ে ধরলো তাকে।কাঁদতে কাঁদতে ভিজিয়ে ফেললো পরণের শার্ট। সামনের মানুষটা সটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।প্রাণেশা হিচকি তুলে বললো
-"ভাই,তুমি বিয়ে করেছো?নিচে বসা মেয়েটা নাকি তোমার বউ?"
উত্তর আসলো না ক্ষণকাল।প্রাণেশার কান্নার বেগ বাড়তেই সামনের মানুষটা রাশভারী কন্ঠে বললো
-"ছাড় আমাকে।"
প্রাণেশার মাথায় ঢুকলো না কথাটা।সে কেঁদেই যাচ্ছে এক নাগাড়ে।সামনের মানুষটা পেশিবহুল হাত পেছনে এনে নিজের পিঠ থেকে ছাড়ালো প্রাণেশাকে।বাহু ধরে সামনে এনে ঝাঁঝালো স্বরে চিৎকার করে বললো
-"একবার বলেছি শুনতে পাসনি?কথা অমান্য করিস কেন?ঠাটিয়ে তোর গাল লাল করে দেব আমি।"
অকস্মাৎ থেমে যায় প্রাণেশার কান্না।সিক্ত চোখে ভীতু নজরে তাকায় সামনে ফুঁসতে থাকা মানুষটার দিকে।প্রত্যুষ ছেড়ে দিলো প্রাণেশার হাত।একপ্রকার ছুঁড়ে ফেললো যেন। আবার তার শক্ত কন্ঠে চিৎকার করে বললো
-"বেয়াদব মেয়ে।লাজ-লজ্জা নেই? একটা ছেলের রুমে ঢুকে তাকে এভাবে জড়িয়ে ধরতে লজ্জা লাগলো না তোর?কোন সাহসে আমাকে জড়িয়ে ধরলি তুই?"
প্রাণেশা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকে।নিজের কান্নাটুকুও যেন ভুলে গেছে ও।প্রিয় মানুষের এসব কঠিন কথা যে সহ্যসীমার বাইরে।তার প্রত্যুষ ভাই তাঁকে ধমকাচ্ছে,শুধুমাত্র তাকে জড়িয়ে ধরার অপরাধে এ যেন কোনোমতেই মেনে নিতে পারছে না প্রাণেশা।আবার জোরে কান্না করে দেয় ও।ফোপাঁতে ফোঁপাতে বলে
-"আমি জড়িয়ে ধরলাম তাতে দোষ হয়ে গেলো,আর তুমি যে বউ নিয়ে এসেছো তার বেলা!"
-"বেশ করেছি বউ নিয়ে এসেছি।বিয়ে করার বয়স যখন হয়েছে বিয়ে তো করতেই হবে।আমি বিয়ে করেছি তাতে তোর কী?"প্রত্যুষ রাগী গলায় বললো।
প্রাণেশা অবাক চোখে তাকিয়ে থাকিয়ে থাকে।আজ তার চমক যেন শেষই হচ্ছে না।একটার পর একটা চমক।প্রাণেশা উগরে আসা কান্না ঢোক গিললো।ভাঙ্গা গলায় বললো
-"আমার কিছু না?সত্যিই কী আমার কিছু না!তুমি এটা কী করে বলতে পারো?কী করে বিয়ে করতে পারো আরেকজনকে? "
-"আমার যাকে মন চায়,তাকে বিয়ে করবো।বিয়ে করার আগে তোর পারমিশন নিতে হবে নাকি!তুই কে হোস?"
প্রাণেশার ছোট্ট হৃদয় ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়।চোখ ছাপিয়ে সীমাহীন জল নামে।ভেজা গলায় বলে
-"আমি কেউ না?"
-"না,কেউ না তুই।"প্রত্যুষ শক্ত কন্ঠে বললো।
প্রাণেশা টালমাটাল পায়ে আরেকটু এগিয়ে গেলো ওর কাছে।চোখে চোখ রেখে বললো
-"কেউ না আমি তোমার?তাহলে আমাকে এতটা গুরুত্ব কেন দিলে এতোদিন?কেন আমার মনে অনুভূতি জন্মাতে দিলে?"
-"কীসের অনুভূতি? আমি তোকে বলিনি আমাকে নিয়ে আকাশ-পাতাল ভেবে রাখ।যদি কিছু ভেবে থাকিস, তাহলে সেটা তোর দোষ।এতে আমার কিছু করার নেই। আমি তোকে সবসময় আমার কাজিন হিসেবেই দেখেছি।"প্রত্যুষ কাঠকাঠ গলায় বললো।
প্রাণেশার মস্তিষ্ক মেনে নিতে পারে এসব বিষাক্ত কথা।ভেজা গলায় অভিযোগের সুরে বলে
-"তুমি না বলেছিলে আমাকে তোমার বউ বানাবে?"
প্রত্যুষ কুটিল হাঁসলো।ঠোঁট বাঁকিয়ে ফেলা করে বললো
-"এমন অনেক কথায় আমরা বলি যার কোনো মানে থাকে না।তোকে বলা কথাটারও কোনো মানে নেই।সবসময় আমার পিছনে ছ্যাচড়ার মতো ঘুরতি তুই,ভালোবাসি ভালোবাসি বলে জাস্ট মাথাটা খারাপ করে ফেলতি।তাই আমিও ভেবে নিয়েছিলাম তোর থেকে ছাড়া পেতে হলে তোর নিয়মেই খেলতে হবে আমাকে।তাই বলেছিলাম তোকে বউ বানাবো,আর একটু ভালোবাসা,একটু কেয়ারের নাটকও করলাম। আর সেটাও তুই সত্যি ভেবে বসলি।বলিহারি তোকে! তুই ভাবলি কী করে তোর মতো একটা মেয়েকে ডক্টর আবরাহাম ভূইয়া প্রত্যুষ বিয়ে করবে!তোর লেভেল আছে কোনো!এখনো উচ্চ মাধ্যমিকের এক্সাম পর্যন্ত দিতে পারিসনি তাতেই যে বেলেল্লাপনা তোর,নিজের চেয়ে সাত বছরের বড় ভাইকে প্রেমের প্রস্তাব দিস। ফিউচারে কী হবে তা ভাবলেও ভয় হয় আমার, কোনদিন পরিবারের মান-সম্মান সব ডুবিয়ে দিস।তোর কোনো যোগ্যতা আছে রে আমাকে বিয়ে করার!যে ঢ্যাং ঢ্যাং করে চলে এলি বিয়ে কেন করেছি সেটা জিজ্ঞেস করতে!বেহায়া মেয়ে কোথাকার!"
প্রাণেশার নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থাকলো তার প্রাণপ্রিয় পুরুষের দিকে।গলবিল ভেদ করে কোনো কথা আসছে না,সব কথা যেন ফুরিয়ে গেছে।সামনের মানুষ টাকে চিনতে পারছে না প্রাণেশা।তার প্রত্যুষ ভাইয়ের এই রূপ যে ভীষণ অচেনা তার কাছে।এই অচেনা রূপ মানতে যে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে তার। প্রাণেশা মাথা নিচু করে পায়ের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো।আসলেই তো তার কী যোগ্যতা আছে সামনের মানুষটা কে বিয়ে করার!তার প্রত্যুষ ভাই একজন ডাক্তার।দেশের নাম করা একজন 'হার্ট সার্জন '।এমনকি মেডিকেলে সব ইয়ারে টপার্স ছিলো সে।হসপিটালের জবে না ঢুকেও শুধুমাত্র নিজের মেধা-মনন এর ভিত্তিতে যে টুকু নাম কুড়িয়েছে সে, তা প্রাণেশার জন্য সোনার হরিণ বৈ কিছুই নয়।সেখানে প্রাণেশা এখনো এইচএসসি পর্যন্ত দিতে পারেনি।তারউপর প্রত্যুষের মেধার ধারে কাছেও নেই সে।আসলেই তার প্রত্যুষ ভাইয়ার সাথে তার যায় না।কিন্তু মন কী এতো সহজে মানে!
প্রাণেশা চোখ তুলে তাকালো তার দিকে।অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সামনের মানুষটা। তবে সে দৃষ্টিতে কোনো অনুভূতি নেই,কোনো ভাষা নেই।কেমন যেন,ভাষাহীন দৃষ্টি। প্রাণেশা বিচলিত হলো।প্রিয় পুরুষের বিয়ের কথাটা মেনে নিতে পারলো না।মানুষটা এখন অন্যের হয়ে গেছে, অন্যকেও তাকে নিজের পুরুষ বলবে,অন্য কেও তার উপর অধিকার খাটাবে এ তিক্ত সত্য যেন ভাঙা হৃদয় টা মেনে নিতে পারলো না।
প্রাণেশা কে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে,আবার ধমক দিলো প্রত্যুষ।কেঁপে উঠলো প্রাণেশা।প্রত্যুষ দাঁতে দাঁত চেপে বললো
-"কীরে খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে আছিস কেন তুই?এতো কথা বলার পরও লজ্জা লাগলো না তোর?বেহায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছিস কেন?বেরো আমার রুম থেকে!"
নিঠুর অপমানে আর দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি পেলো না প্রাণেশা। কাঁদতে কাঁদতে ছুটে বেরিয়ে গেলো কক্ষ ছেড়ে। একেবারে কর্ণারে নিজের কক্ষে ঢুকে দরজায় খিল দিলো।
প্রত্যুষের চিৎকারে দৌড়ে আসলো রিধিতা আর তার শাশুড়ি
মালিহা বেগম।প্রাণেশা কে কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে যেতে দেখে অবাক চোখে চাওয়াচাওয়ি করলো দুজন।কাগজপত্র গোছাতে ব্যস্ত প্রত্যুষকে তার মা মালিহা বেগম জিজ্ঞেস করলেন
-"মেয়েটাকে আবার কী বলেছিস তুই?এভাবে কাঁদতে কাঁদতে চলে গেলো কেন?"
-"অতিরিক্ত লাই দিয়ে মাথায় তুলে ফেলেছো তোমরা।গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছিলাম আমি এসে বাগড়া দিলো।আদরের সাথে শাসনেরও দরকার পরে,কিন্তু না তোমরা তো আদর দিয়ে দিয়ে বজ্জাত বানিয়ে ফেলেছো।তোমাদের সামনে ওকে কিছু বললে তোমরা উল্টো আরো তাকে সাইজ করো।দুষ্টামির লিমিট ক্রস করে ফেলে মাঝে মাঝে।বয়স বাড়ার সাথে সাথে ছেলেমানুষী পাল্লা দিয়ে বাড়ছে যেন।"
-"ও কখনই সীমা লঙ্ঘন করে দুষ্টামি করে না যে,ওকে শাসন করতে হবে আমাদের।আর কী এমন রাজকার্য করছিস যে,ওর ডিস্টার্বে এভাবে বকলি ওঁকে। একটু আগেই বিয়ে হলো,নতুন বউয়ের পাশ থেকে হনহনিয়ে উঠে চলে এলি কাজের দোহায় দিয়ে।কী এমন কাজ তোর?"
প্রত্যুষ একপ্রকার ছুঁড়ে মারলো কাগজগুলো বিছানার উপর।মায়ের দিকে ফিরে রাশভারী কন্ঠে বললো
-"এখন কী করতো বলছো আমাকে?বিয়ে করেছি বলে কোলে নিয়ে বসে থাকবো? কিছুক্ষণ প্রাণেশার জন্য কথা শোনাচ্ছো।আবার কিছুক্ষণ তোমাদের তথাকথিত বউয়ের জন্য! শান্তি দেবে না আমাকে তোমরা?কী চাও বাড়ি ছেড়ে চলে যায়?"
মালিহা বেগম ধমকে উঠলেন ছেলেকে। কাঠকাঠ গলায় বললেন
-"কীভাবে কথা বলছিস তুই?বাচ্চা মেয়েটাকে এভাবে কেন বকলি?তুইতো জানিস,কতটা চঞ্চল ও। শুধু হাতে পায়েই বড় হয়েছে।মন-মস্তিষ্ক এখনো বাচ্চাদের মতো থেকে গেছে।তাই একটু দুষ্টুমি করে।এজন্য এভাবে ধমকাবি ওকে?"
-"ধমক খাওয়ার মতো কাজ করেছে তাই ধমক খেয়েছে।রাহাত ও?যে বাচ্চামো করছে? আর কতো বড় হলে বাচ্চামো কমবে ওর?পড়তে বসার নাম নেই সারাদিন বাচ্চাদের মতো ছুটোছুটি করে।এক জায়গায় বসে থাকতে পারে না,পুরোদিন বাড়িটাতে দাপিয়ে বেড়াবে ও।একটু শান্তিতে নিজের কাজটুকুও করতে পারি না।তোমাদের আশকারাতেই ওর বাড় এতটা বেড়েছে।"
মালিহা বেগমের অবাকের নিচে নিজের রাগটুকু চাপা পড়ে গেলো যেন।প্রাণেশাকে নিয়ে এসব কথা কে বলছে, তার ছোটো পুত্র!যে নিজেই ওকে একটা বাচ্চার মতো ট্রিট করে।যে নিজেই সবসময় ওর দুষ্টামিকে প্রশ্রয় দেয়।এমনকি ও অন্যায় করলে পর্যন্ত সেটার ঢাল হয়ে দাড়ায়,আশকারা দেয় ওঁকে। সে আজ বকলো ওঁকে এভাবে!তারউপর এসব কথাও বলছে।
মালিহা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।ছেলের মনের অবস্হা টুকুু বোঝার চেষ্টা করলেন।তার ছেলেটা যে শান্তিতে নেই।কিছু একটা হয়েছে তার প্রত্যুষের সাথে।হয়তো খারাপ কিছু যা তার ছেলে মেনে নিতে পারছে না। যার কারনে ছেলেটা এতটা ডিপ্রেসড, এতটা রেগে গেছে।পুরো ঘটনা না জানলেও অনেক কথায় কানে এসেছে তার।
মালিহা বেগম ছেলের বউকে নিয়ে কক্ষ ছেড়ে বেরোলেন।রিধিতা ছিলো এতোক্ষণ মা-ছেলের মাঝে নিশ্চুপ দর্শক। তার মাথায় আপাদত কিছুই ঢুকছে না।কী হচ্ছে এই বাড়িতে এসব? সকাল থেকে যেসব ঘটনা ঘটছে তার অদ্যোপ্রান্ত কিছুই বুঝতে পারছে না ও!
দুজনে নিচে নামলো।মানারা বেগম বসে ছিলেন নববধূর সামনে।দুজনকে নামতে দেখে,প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালো ওদের দিকে।রিধিতা এবং মালিহা বেগম এসে সোফায় বসলেন দুজনের পাশে।
মালিহা বেগম দুঃখী দুঃখী মুখ করে বললেন
-"ছেলেটা বকেছে আমার মেয়েটাকে।কাঁদতে কাঁদতে রুমে চলে গেলো।দরজায় খিল দিয়ে বসে আছে। কাঁদছে নিশ্চয়ই। "
-"এমনি এমনি বকেনি নিশ্চয়ই। বকা খাওয়ার মতো কাজ করেছে তাই বকেছে।কোথাও যদি শান্তিতে বসতে পারে মেয়েটা।সবসময় তার দস্যিপনা করা চায় চায়।"
মানারা বেগম নিজের বড় জা কে উদ্দেশ্য করে বললেন।অবশ্য বড় জা নয়,বড় বোন।দুজন বোনের মতই।কখনো দুজন দুজনকে জায়ের চোখে দেখেনি।বড়জন ছোটোজনকে ছোটোবোনের মতো স্নেহ করেছে, আর ছোটোজন বড়জনকে নিজের বড় বোনের মতো সম্মান করেছে।
মালিহা বেগম এতক্ষণে খেয়াল করলেন লাল শাড়ি পরিহিতা মেয়েটিকে।মাথা নিচু করে বসে আছে সে।সুন্দর একটা গোলগাল মুখ। ঠোঁট লাল রঙের লিপ্সস্টিক দিয়ে রঞ্জিত করে রাখা।বাকি কোনো সাজসজ্জা নেই আর।পরণে লাল রঙের কাতান শাড়ি।আর হাতে একগোছা লাল চুড়ি।অন্য কোনো অলংকার নেই দেহে।শুনেছে,চাচা-চাচির সংসারে মানুষ হয়েছে মেয়েটা।মা-বাবা সেই ছোটো থাকতেই মারা গেছে।মা-বাবা বিহীন এই দুনিয়ায় আর কেই বা আদর-যত্ন করে পাঠাবে?মা ছাড়া কেই বা সুন্দর করে সাজিয়ে গুছিয়ে পাঠাবে শশুড়বাড়ি?তাদের ছাড়া এই দুনিয়া যে সাদা কালো ক্যানভাস ছাড়া আর কিছুই নয়।মালিহা বেগমের মায়া হলো ভীষণ। হাত দিয়ে চিবুক ধরে সুন্দর মুখটি উঠালো।মায়া ভরা কন্ঠে প্রশ্ন করলো
-"নাম কী তোমার মা?"
-"রওশা রেহমান।"নম্র কন্ঠে মাথা নিচু করে উত্তর দিলো মেয়েটি।
-"রওশা।বাহ!খুব সুন্দর নাম তো।আমি তোমার শাশুড়ী,বুঝেছো?"
মেয়েটি উপর-নীচ মাথা ঝাকালো। মালিহা বেগম আবার বললেন
-"রিধিতার মতো আমাকে মা বলে ডেকো তুমি।ভেবে নিয়ো আমি তোমার আরেকটি মা।আজ থেকে প্রাণেশা আর রিধিতার মতো আমার আরেকটি মেয়ে হলো।"
ছলছল নয়নে তাকালো মেয়েটি।শাশুড়ী, মা হয় বুঝি কখনো?ছোটোবেলা থেকেইতো মা-বাবা বিহীন বড় হয়েছে সে।চাচার সংসারে প্রতিনিয়ত চাচির চক্ষুশূল হয়ে পরে থেকেছে।তার চাচি কখনো তাকে এভাবে মেয়ের মতো করে বলেনি! তবে কী এখানে এসে একটা মা পেলো সে?
রওশাকে কাঁদতে দেখে নিজের সাথে জড়িয়ে নিলেন মালিহা বেগম।পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন
-"একি,পাগল মেয়ে!কাঁদছো কেন?পরিবারের কথা মনে পরছে?"
রওশা দু-পাশে মাথা নাড়ালো।মানারা বেগম নিজের পরিচয় দিলেন।হাসি হাসি মুখ করে বললেন
-"শুনো মেয়ে,আমি তোমার চাচী শাশুড়ী। তোমার শাশুড়ী না জ্বালালেও আমি কিন্তু খুব জ্বালাবো তোমাকে।আমি তোমার শাশুড়ীর মতো ওতো ভালো মানুষ নই।তুমি প্রস্তুত হও,আমার জ্বালানো সহ্য করার জন্য।"
-"ছোট মা।আমিও কিন্তু তোমার সাথে আছি।যেদিন বাড়িতে বড় বউ হয়ে এসেছিলাম সেদিনিই ভেবে নিয়েছিলাম, আমার শাশুড়ী আম্মা নিজের জা কে না জ্বালালেও আমি কিন্তু নিজের জা কে খুব জ্বালাবো।"
রিধিতা গদগদ কণ্ঠে বললো।তিনজনে জোরে হেসে দিলো।রওশা ঠোঁট টিপে হাসলো।মনে যেন শান্তির ফোয়ারা বয়ে গেলো।আসা মাত্রই স্বামী উঠে চলে যাওয়ায় মনের মধ্যে যে ভয়টা সৃষ্টি হয়েছিলো তার অনেকটাই কমে গেছে।
মানুষগুলো ভীষণ মিশুক।সবাই সবার সাথে কতো সুন্দর হেঁসে হেঁসে কথা বলে।রিধিতা এই বাড়ির বউ হওয়া সত্বেও তার দুই শাশুড়ীর সাথে তার যে সুন্দর বন্ডিং তা দেখেই প্রফুল্ল চিত্তে হাসলো রওশা।রিধিতাকে যেভাবে ভালোবাসে ওরা সেভাবে নিশ্চয়ই ওকেও ভালোবাসবে সবাই।একটু ভালোবাসা হয়তো এবার জুটবে ওর কপালে।ছোটোবেলা থেকেই যে ভালোবাসার কাঙাল ও।পরিচিতি, আপনমানুষের দ্বারে দ্বারে ছুটে বেরিয়েছে সে,শুধুমাত্র একটু ভালোবাসা পাওয়ার আশায়,কিন্তু বাপ-মা মরা মেয়েকে কেওই ভালোবাসতে চাই নি।এবার নিশ্চয়ই সবাই ভালোবাসবে ওকে।একটু সুখের দেখা হয়তো পাবে সে!
#চলবে
#পরিণীতা
#পর্ব :০১
#তানজিনা ইসলাম