#পরিণীতা
#পর্ব :০২
#তানজিনা ইসলাম
ফ্লোরে পা ছিটিয়ে বসে আছে প্রাণেশা।দৃষ্টি সিলিংয়ের দিকে নিবদ্ধ । চোখের কার্ণিশ বেয়ে জল গড়িয়ে বেডশিট ভিজিয়ে দেয়।এতোক্ষণ চিৎকার করে কাঁদলেও এখন আর চিৎকার করে কাঁদার শক্তি পাচ্ছে না।সব শক্তি যেন ফুরিয়ে গেছে।কাঁদতে কাঁদতে গলা ভেঙে গেছে। মেঝেতে কিছু কাগজের ছেড়া পৃষ্ঠা যাতে লেখা আছে শত শত অনুভূতি, কোনো এক শ্যামপুরুষের প্রতি তার প্রাণেশার রাত্রি যাপন।
এছাড়াও কিছু হাতে আকা ছবি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।পাশেই পড়ে আছে একটা অর্ধেক ছেঁড়া ডাইরি আর একটা সুন্দর সিন্ড্রেলা ডল।প্রাণেশা মাথা তুলে নিজের আর্ট বুকটা হাতে নিলো।পাতা উল্টিয়ে এক জায়গায় গিয়ে হাত থেমে গেলো প্রাণেশার। মোহময় দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো নিজের প্রিয় পুরুষের স্ক্যাচের দিকে।তাঁর প্রত্যুষ ভাইয়ের হাসিমুখ দেখে এতোক্ষণের নিশ্চুপ কান্না যেনো শব্দ করে বেরিয়ে আসলো।প্রাণেশা হাত দিয়ে মুখ ঢেকে আওয়াজ কমানোর চেষ্টা করে।কেন তার প্রাণপ্রিয় পুরুষ এভাবে ঠকালো তাকে?কেন এভাবে তার ছোট্ট হৃদয় টা খন্ড -বিখন্ড করে দিলো?যদি তার প্রত্যুষ ভাইয়া আশকারা না দিতো তবে তার অনুভুতি এভাবে ডালপালা ছড়াতো না।সে মানুষটাইতো প্রতিনিয়ত আরো বেশি ভালোবাসতে শিখিয়েছে তাকে।বুঝিয়েছে ভালোবাসার মানে।তাহলে এখন কেন এই অবহেলা!প্রাণেশা ফোপাঁতে ফোপাঁতে হাত বুলিয়ে দিলো স্কেচের উপর।খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে, মনোযোগের সহিত দেখলো তার প্রিয় পুরুষের হাসিমুখ।
তার প্রত্যুষ ভাই।যার কাছে চিত্রকর্ম শিখেছে সে,শুধুমাত্র তার ছবি আকার জন্যই। প্রাণেশা বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলো স্কেচটি।মন-মস্তিষ্কে উঁকি দিলো কিছু অতি প্রিয় স্মৃতি।
সিক্ত-ভেজা পিচঢালা রাস্তায় হেঁটে চলেছে প্রাণেশা।পরণে তার সাদা কলেজের ড্রেস,দুপাশে দুটি বিনুনি করা।কয়েকদিন আগেই ভর্তি হয়েছে সে কলেজে।প্রাণেশা অতি সাবধানতার সহিত হাটছে রাস্তায়।সাদা কেডসে কাঁদা উঠে অন্য বর্ণ ধারণ করেছে।প্রাণেশার কষ্ট লাগলো ভীষণ, ওর নতুন কেডসের কী অবস্থা!কালকে রাতে অতিবৃষ্টির ফলে রাস্তাঘাটে পানি উঠে গেছে।শুনেছে এলাকার অনেক ক্ষয়ক্ষতিও হয়েছে। গাছপালা ভেঙে পরেছে অনেক যায়গায়।নদীর বাঁধও ভেঙেছে নাকি!এলাকার যারা একটু নিম্নমধ্যবিত্ত, তাদের তো আরো খারাপ অবস্থা।
প্রাণেশার মন খারাপ হলো ভীষণ।মানুষের কষ্ট দেখলেই ওর কান্না পায়।মনে মনে ভাবে,ইশ!ও নিজেও যদি দেশের জন্য কিছু করতে পারতো।দেশের মানুষের জন্য কিছু করতে পারতো।
'সুন্দরী চলেছে একা পথে
সঙ্গী হলে দোষ কী তাতে!"
বাজখাঁই গলার বিচ্ছিরি গানে প্রাণেশা তার ভাবনা ছেড়ে বেরিয়ে এলো।গানের উৎস খুঁজে পিছনে ফিরে তাকালো।চারটা ছেলে, তন্মধ্যে দুইটা বসে আছে বাইকের উপর।দেখতেই গাঞ্জুটিয়ার মতো!সবার চুলগুলো হরেকরকমের কালার করা।হাতে চার-পাঁচ রকমের ব্রেসলেট। দুইজন আবার সিগারেটের ধোঁয়া শূন্যে ছাড়ছে।প্রাণেশা ভ্রু কুঁচকে তাকালো।ছেলেগুলোর মধ্যে একজন বললো
-"কোথায় যাওয়া হচ্ছে সুন্দরী? "
আরেকজন বললো
-"আমাদেরও সাথে নিয়ে যাও তােমার,এভাবে একা একটা সুন্দরী মেয়ে পথে হাঁটছে তা দেখতেই কেমন বেমানান লাগে!"
বলেই নিজের হলুদ দাঁত দেখিয়ে বিশ্রী হাসলো সে।প্রাণেশার শিরার রগ গুলো দপ দপ করে জ্বলে উঠলো।কয়েকদিন ধরেই এলাকায় ইভটিজিংয়ের খবর ছড়াচ্ছে। বাপ-জেঠার কাছে শুনেছিলো এলাকায় বখাটে ছেলেদের উৎপাত বাড়ছে,যার ফলে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া মেয়েরা বাড়ির বাইরে বেরোতে পারছে না।
এতোদিন শুধু শুনেছিলো।আজ সে পরিস্থিতির স্বীকার হলো।দেশের সেবা করার আগে এই বেয়াদব গুলাকে সাইজ করতে হবে!আগে এলাকার মেয়েগুলোর সম্মান বাচাতে হবে,তারপর নাহয় ভাবা যাবে দেশের মানুষের কথা। প্রাণেশার মন চাইলো,এগিয়ে গিয়ে কয়েকটা জুতা দিয়ে বারি দিতে।কিন্তু দিলো না,সেই সাহস নেই ওর।এদিকের জায়গাটা খুঁব বেশিই নির্জীব। মানুষের আনাগোনা খুঁব কম।এখনতো আশেপাশে একটা কাকপক্ষী ও দেখতে পাচ্ছে না।
প্রাণেশা ভয় পেলো কিছুটা।মনে মনে কিছু ভয়ঙ্কর গালি দিলো নিজেকে।এই সাহস নিয়ে নাকি ও রাজনীতি করার স্বপ্ন দেখে। রাজনীতিবীদরা তো অনেক সাহসী হয়।তারা নিজেদের সাহস দিয়েই সব কিছু জয় করতে পারে।তাদের মনে ভয় -ডর বলে কিছু নেই।অন্যায় দেখলেই তারা ছুটে যায় প্রতিবাদ করতে।কিন্তু প্রাণেশা নিজের জন্য চিমটি পরিমান প্রতিবাদ করতে পারলো না।প্রাণেশা নিজেকে ধিক্কার দিয়ে বললো
-"ছি!ছি!প্রাণেশা।এই তোর সাহস!ছোট মামা তোকে এই শিক্ষা দিয়েছে।ছোট মামাকে যে বড় মুখ করে বলতি রাজনীতিবীদ হবি, তার মতো।এই কাহিনী শোনার পরতো তোর উপর হাসতে হাসতেই লুটিয়ে পরবে সে।"
প্রাণেশা সামনে ফিরে মাথা নিচু করে হাঁটা ধরলো।পিছনে ছেলেগুলো একটা থেকে একটা জঘন্য কথা বলছে।প্রাণেশা নিজের পায়ের গতি বাড়ানোর চেষ্টা করলো।কিন্তু তার সাথে সাথে পিছনেও কিছু পায়ের শব্দ পাচ্ছে সে।অসম্ভব কান্না পেলো ওর।ছেলেগুলো পিছুপিছু আসছে ।
পিছনে জুতোর আওয়াজ মিলিয়ে যেতেই প্রাণেশা থেমে গেলো।ভয়ে ভয়ে পিছনে ফিরে দেখলো রাস্তায় ফেলে ছেলে একটাকে মারছে তার প্রত্যুষ ভাই।নাকমুখ দিয়ে গলগলিয়ে রক্ত পরছে ছেলেটার।হাত দিয়ে যে ঠেকাবে সে শক্তিটুকুও গ্রাস করে নিয়েছে প্রত্যুষ।
অন্যরা আহাজারি করছে ছেড়ে দেওয়ার জন্য।আরেজন ছাড়াতে গেলেই তাকে নাক বরাবর ঘু*ষি মারলো।ছেলেটা দুরে ছিটকে পরলো। ছেলেগুলোর গগনবিদারী চিৎকারে প্রাণেশার বুকের মধ্যে কেঁপে উঠে। চোখ খিচে বন্ধ করে নেয় ও।রক্ত দেখলেই কাঁপা-কাঁপি শুরু হয়ে যায় ওর।সবার উপর একে একে সুনামি বইয়ে দিয়ে থামলো প্রত্যুষ।ছেলেগুলো ব্যাথাতুর শব্দ করে মা-বাবা চৌদ্দগুষ্ঠির নাম নিচ্ছে। একজনতো পিছঢালা রাস্তার উপর থেকে উঠতেই পারছে না। প্রত্যুষ এগিয়ে এসে চোখ বন্ধ করে থাকা প্রাণেশার হাত ধরলো।তারপর এক প্রকার ট্রলির মতো টেনে নিয়ে গেলো ওকে।ছেলেগুলোর সামনে হাত ছেড়ে দিয়ে চারজনকেই উদ্দেশ্য করে বললো
-"পা ধরে ক্ষমা চা।"
সবাই সমস্বরে ক্ষমা চেয়ে বললো
-"মাফ করে দাও আপু।আর কখনো এই ভুল হবে না।"
যে রাস্তায় আধমরা হয়ে পরে আছে সে ঠোঁট নাড়িয়ে ক্ষমা চাওয়ার চেষ্টা করলো।আসলে ছেলেটা একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলেছিলো।সেই সবচেয়ে বেশি জঘন্য কথা বলেছিলো প্রাণেশাকে।যখনই পিছু নিয়ে প্রাণেশার হাত ধরতে যেতো,তার আগেই প্রত্যুষ এসে চোখে সরষে ফুল দেখিয়ে দিলো।
প্রত্যুষ রাশভারী কন্ঠে চিৎকার করে বললো
-"পা ধরে ক্ষমা চাইতে বলেছি।"
যেই একজন এসে পা ধরতে যাবে তার আগেই প্রাণেশা পিছিয়ে গেলো।প্রত্যুষের পিছনে লুকিয়ে তার পরণের শার্ট খামচে ধরলো।বিভ্রান্ত গলায় বললো
-"না,না।পা ধরার দরকার নেই।আমি ক্ষমা করে দিয়েছি।"
-"ঠিক আছে, ও যখন বলছে ক্ষমা করে দিয়েছে,তাই ছেড়ে দিলাম তোদেরকে।কিন্তু পরেরবার যদি এই ভুল হয়,এইবারতো জীবন নিয়ে ফিরে যেতে পারছিস।কিন্তু পরেরবার লাশ হয়ে ফিরে যেতে হবে।"
ছেলেগুলো আবার আহাজারি করে ক্ষমা চাইলো।একজন বললো
-"আমরা জানতাম না বড়ভাই যে,ও আপনার বোন হয়!যদি জানতাম ও ভূইয়া বাড়ির মেয়ে তবে কখনই এই সাহস করতাম না।"
প্রাণেশা চোখ খিচেই ছিলো,ছেলেটার কথায় চোখ পিট পিট করে খুললো।এতোক্ষণ ভয়ে জবুথুবু হয়ে থাকলেও ওবার যেন সেই ভয় শূণ্যে মিলিয়ে গেলো।ভয়ের জায়গায় এসে জমা হলো একরাশ ক্ষোভ। ভয়ঙ্কর গালি দিয়ে মনে মনে বললো
-"বোন না হাঁদারাম। বউ, বউ।আমি তোদের বড় ভাইয়ের একমাত্র বউ হই।তুই কোন সাহসে আমাকে তার বোন বললি!"
কিন্তু মুখে উচ্চারণ করতে পারলো না তা।দাবাং মার্কা চড় খাওয়ার কোনো ইচ্ছে আপাদত তার নেই।পরে দেখা গেলো এই কথা গুলো প্রত্যুষ ভাই শুনলে,ছেলেগুলোর মতো অবস্থা হলো ওর।ভাবতেই কেঁপে উঠল প্রাণেশা।
প্রত্যুষ আবার গম্ভীর কন্ঠে বললো
-"শুধু আমার পরিবারের মেয়ে না,এলাকার কোনো মেয়েকেই যেন আমি তোদের বিরক্ত করতে না দেখি।যদি দেখি তাহলে সেদিনই তোদের শেষ দিন।"
ছেলেগুলো ভয়ে ভয়ে মাথা নাড়ালো।আধমরা হয়ে থাকা ছেলেটাকে তুলতে যাবে তার আগে প্রত্যুষ ডাক দিলো একজনকে। ভয়ে ভয়ে সামনে আসলো সে।প্রত্যুষ মানিব্যাগ থেকে হাজার টাকার কয়েকটা নোট বের করে ছেলেটার হাতে দিলো।ছেলেটা ভয়ে ভয়ে গ্রহণ করলো তা।প্রত্যুষ আবার তার রাশভারী কন্ঠে বললো
-"ভালো একটা হসপিটালে এডমিট করিস ওঁকে। তোরাও মেডিসিন নিয়ে নিস।"
ছেলেটা বাধ্যের ন্যায় মাথা ঝাকালো। রাস্তায় পরা ছেলেটাকে তুলে সবাই আস্তে আস্তে চোখের সামনে থেকে মিলিয়ে গেলো।
প্রাণেশা এখনো প্রত্যুষের পিঠের দিকের শার্ট আষ্টেপৃষ্টে ধরে আছে।একপ্রকার শক্ত করে জড়িয়ে ধরে পিঠের মধ্যে মুখ গুঁজে আছে।আসলে ওর ভয় অনেক আগেই কেটে গেছে।মানুষটার কন্ঠ শোনার পর থেকেই তার সব ভয় উবে গেছে।কিন্তু তার প্রাণপ্রিয় পুরুষের কাছে থাকার এটা একটা বাহানা মাত্র। যখনই সুযোগ পেয়েছে মানুষটাকে কাছে পাওয়ার তখনই সুযোগটা লুফে নিয়েছে।
প্রত্যুষ গম্ভীর স্বরে বললো
-"সামনে আয়।চলে গেছে ওঁরা।"
প্রাণেশা পিঠ থেকে মাথা তুলে খরগোশের মতো উঁকি দিলো সামনে।ওরা নেই দেখে প্রত্যুষের সামনে এসে দাঁড়ালো।ঠোঁট উল্টে চাইলো গম্ভীর পুরুষটির দিকে।প্রত্যুষের দৃষ্টি নরম হয়ে আসে।মাথায় হাত বুলিয়ে কন্ঠ যথেষ্ট নরম করে বলে
-"কোথাও ব্যাথা পেয়েছিস,প্রাণ?"
প্রাণেশা দুদিকে মাথা নাড়ালো। প্রত্যুষ আবার বললো
-"এদিকে একা যেতে মানা করেছিলাম না।কথা অমান্য করিস কেন সবসময়? একটা কথা শুনলে কী তোর জাত যায়?কত বড় বিপদ থেকে বেঁচেছিস জানিস?তোর বান্ধবীরা কেও যাচ্ছে না আজ কলেজে।"
এতোগুলো প্রশ্নের কোনটার উত্তর আগে দেবে সেটার সিদ্ধান্ত নিতে পারলো না প্রাণেশা। তাই সে নিজ থেকেই জিজ্ঞেস করলো
-"তুমি এদিকে আসলে কেন?"
-"প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে উল্টো প্রশ্ন করছিস?এই স্বভাবটা কোনদিন যাবে তোর বলতো?"
-"যাবে না কোনোদিন। বলো না।এদিকে তো যাওনা তুমি।আজকে এলে যে হঠাৎ! "
-"তোকে খুঁজতে খুঁজতেই এসেছি এদিকে। ছোটমা বললো তুই একা বেরিয়েছিস,তাই তোর খোঁজে এসেছিলাম।এবার বল একা কেন?"
-"সবাই কোচিং-এ গেছে সকাল সকাল।কিন্তু আমিতে কোচিং পড়ি না তাই যায় নি।"
-"গাড়ি নিয়ে আসবি না তো?"
-"আজকে পরিবেশটা সুন্দর ছিলো,হাঁটার জন্য নিই নি গাড়ি।"
-"হ্যাঁ।তারপর দেখলি তো কী হলো!"
প্রাণেশা মুখ কালো করে তাকালো।প্রত্যুষ আবার বললো
-"চল তাহলে পৌঁছে দি তোকে।"
প্রাণেশা খুশিতে আটখানা হয়ে মাথা নাড়লো।প্রত্যুষ শক্ত করে ধরলো ওর হাত।পুরোটা পথই সে ছিলো নিশ্চুপ। প্রাণেশা শুধু কিছুক্ষণ পরপর আড়চোখে তাকিয়েছে তার দিকে।আর কোনো কথা হয়নি দুজনের মাঝে।অবশেষে কলেজের গেইট পর্যন্ত এসে পৌঁছালো দুজনে।প্রাণেশা গেইটের ভিতর ঢুকতে যাবে তার আগেই প্রত্যুষ ডাক দিলো ওকে।প্রাণেশা আবার এসে ওর সামনে দাঁড়ালো। প্রত্যুষ ওকে পিছনে ঘুরিয়ে ব্যাগের ভেতর টাকা ঢুকিয়ে দিয়ে বললো
-"টিফিন টাইমে কিছু কিনে খাবি।খবরদার যেন,খালি পেটে না থাকিস।"
-"আম্মু টাকা দিয়েছে।"
-"এটাও রাখ।"
তারপর নিজের ব্যাগ থেকে ছাতা বের করে ওর হাতে দিলো।বিনুনি দুটো ঠিক করে দিয়ে বললো
-"ছাতাটাও আনিসনি।কেন যে এমন করিস তুই!যেকোনো সময় বৃষ্টি নামতে পারে।ভুলেও যাতে না ভিজিস।যদি ছোটমার কাছে শুনি আমি যে ভিজেছিস তুই।তাহলে তোর একদিন কী আমার যে কয়দিন লাগে।মাথায় ঢুকেছে কথাটা।"
প্রাণেশা মুখ কালো করে মাথা নাড়লো।
-"যা তাহলে।"
প্রাণেশা যেতে গিয়েও আবার ফিরে তাকালো। বললো
-"তুমি যেতে যেতে যদি বৃষ্টি নামে,তাহলে?তোমার ছাতা লাগবে না।"
-"আমার চিন্তা তোকে না করলেও চলবে।যা এবার।"
প্রাণেশা, প্রত্যুষের অগোচরে মুখ বাকালো।মনে মনে বললো
-"কেন রে?তুমি আমার চিন্তা করতে পারলে, আমি কেন তোমার চিন্তা করতে পারবো না?"
গেইটের ভেতরে ঢুকে ক্লাসের দিকে যেতেই মুখে হাসি ফুটলো ওর।কে বলেছে ওর প্রত্যুষ ভাই ওকে ভালোবাসে না?ভালোবাসা ছাড়াই বুঝি এতো কিছু করা যায় কারো জন্য। শুধু তার অহংকারী পুরুষটা স্বীকার করছে না সেটা,
স্বীকার করলে তো আবার জাত যাবে তার।প্রাণেশা এতোক্ষণে বুঝলো ওর ভীতু থেকে যাওয়ার আসল কারণটা।সেটা হলো তার প্রত্যুষ ভাই।এই যে সবসময় ওকে একটা বেবির মতো ট্রিট করে তাইতো নরম থেকে যাচ্ছে ও।না,না শক্ত হতে হবে ওঁকে।আজকেই ছোট মামাকে কল করতে হবে ওকে।একমাত্র ছোট মামাই ওঁকে ট্রেনিং দিয়ে সাহসী করতে পারবে।নয়তো তার শ্যামপুরুষের জন্য কখনই সাহসী হয়ে উঠা হবে না তার।ক্লাসরুমে যাওয়ার পুরো পথটা প্রত্যুষের গুষ্টি উদ্ধার করতে করতে গেলো প্রাণেশা।
পুরোনো কথা মনে পরতেই প্রাণেশার কান্না পাল্লা দিয়ে বাড়ে।এই বিরহ যে সহ্য করার মতো না।কীভাবে সে সহ্য করবে তার প্রাণভোমরা কে অন্যের সাথে?এই বাড়িতে থাকলে যে মরে যাবে ও!প্রতিনিয়ত তার প্রত্যুষ ভাইকে অন্যের সাথে দেখতে হবে।এই ব্যাথা কীকরে সইবে প্রাণেশা?প্রাণেশা স্ক্যাচটা বুকের সাথে জড়িয়ে ধরেই শুয়ে পরলো মেঝেতে।হিচকি তুলে কাঁদছে ও।সবকিছু বিষাক্ত লাগছে।মৃত্যুযন্ত্রণা অনুভব হচ্ছে যেন।আচ্ছা নিজের পুরুষকে অন্যের সাথে দেখার চেয়ে মৃত্যু যন্ত্রণা কী বেশি কষ্টের?
প্রাণেশা উঠে বসলো।স্ক্যাচবুকটা নিচে রেখে ডলটা হাতে তুলে নিলো।পুতুলটা তার প্রত্যুষ ভাই তার আঠারোতম জন্মদিনের দিন দিয়েছিলো।এবং সেদিনিই জানিয়েছিলো ওঁকে, প্রত্যুষ ভাই প্রাণেশাকে তার বউ বানাবে।প্রাণেশা কাঁদতে কাঁদতে পুতুলটার দিকে তাকিয়ে বললো
-"কেন প্রত্যুষ ভাই কেন?কেন এভাবে ঠকালে আমাকে?আমি যে মানতে পারছি না এ সবকিছু মিথ্যে ছিলো।তুমি আমার থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য এসব বলেছো এটা যে আমি সহ্য করতে পারছি না।কোথায় গেলো তোমার এতো এতো ওয়াদা প্রত্যুষ ভাই?সব কিছু মিথ্যা ছিলো?সবকিছু ভুলে গেলা তুমি?একবারে বলে দিলা আমি তোমার কেও হইনা!"
প্রাণেশা কাঁদতে কাঁদতে ক্লান্ত হয়ে গেলো।বুকের মধ্যে অসহ্য যন্ত্রণায় ছিড়ে যাচ্ছে ।অসহায় লাগছে নিজেকে ভীষণ। সৃষ্টিকর্তা কেন করলো এমন?কেন ওর প্রিয় মানুষ টাকে ওর করলো না?সময় পেরিয়ে যায় নিজের মতো করে। কিন্তু কোনো এক রমনীর প্রিয় মানুষকে হারানোর যন্ত্রণাগুলো চার দেয়ালের মাঝে চাপা পড়ে থাকে।চাপা পড়ে থাকে তার চিৎকার,অসহায়ত্ব, হাহাকার আর যন্ত্রণাগুলো।
বাড়ির পুরুষেরা সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরলো ।পলক ভূইয়া, পিয়াস ভূইয়া আর প্রহর ভূইয়া এসে সোফায় বসলেন।মালিহা বেগম এসে তাঁদের তিনজনকে শরবত দিলেন।তারপর এসে ছেলের পাশে সোফায় বসলেন।জিজ্ঞেস করলেন
-"কোথায় গিয়েছিলে তোমরা সবাই?"
পলক ভূইয়া এক ঢোকে শরবত শেষ করলেন।স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন
-"জানো তো প্রত্যুষের বিয়েটা কীভাবে হয়েছে!যেভাবে হুট করে বিয়ে হলো কাউকেই তো জানাতে পারিনি।এখন যদি বড় করে অনুষ্ঠান না করে আত্মীয় স্বজন, এলাকার মানুষগুলো কে দাওয়াত না দি তাহলে তারা কী ভাববে বলোতো?সেটারই বন্দবস্ত করতে গিয়েছিলাম।"
মালিহা বেগম মাথা নাড়লেন।পরক্ষণেই চিন্তিত কন্ঠে বললেন
-"এভাবে যে বিয়েটা দিলে সেটা কী ঠিক করেছো তুমি?
এভাবে জোরজবরদস্তি করে বিয়ে দেওয়ার কোনো মানে হয়?আমার ছেলেটা কী আদোও ভালো থাকতে পারবে?"
পলক ভূইয়া দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।উৎকন্ঠা নিয়ে বললেন
-"তাতো,জানি ঠিক হয়নি।কিন্তু আমি কী করতাম বলো,মেয়েটা যে কতটা যন্ত্রণায় ছিলো নিজের চাচা-চাচীর সংসারে সেটা তো আমি দেখেছি।আমার বন্ধুটা যে তার মৃত্যুর আগে বলে গেছে আমাকে আমি যেন তার মেয়েটাকে দেখি।আমি যে ওয়াদা দিয়েছিলাম ওকে, আমি দেখে রাখবো তার মেয়েকে। আমার ছেলের সাথেই তার মেয়ের বিয়ে হবে।এই কথাটা কীভাবে খেলাপ করি বলতো?"
-"শুধুমাত্র একটা ওয়াদা রাখার জন্য এতটা অন্যায় করলে আমার ছেলের প্রতি।সংসারটা তো ওরা করবে।আমরাতো আর না।যদি মেয়েটাকে মেনেই নিতে না পারে তাহলে কীভাবে সংসার করবে বলতো!"
পলক ভূইয়া উত্তর দিলেন না।ঐ সময়ে ঐ পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে তার যেটা ঠিক মনে হয়েছে সেটাই করেছেন তিনি।তখন অতো ঠিক ভুল বিচার করার সময় পাননি তিনি।
পলক ভূইয়া স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে আবার বললেন
-"রওশা কই?"
-"রিধিতার সাথে আছে।"
-"কী বলো,প্রত্যুষের রুমে যেতে বলোনি?"
-"তোমার ছেলে যে ক্ষেপাটে বাঘের মতো গর্জন করছে।ওর রুমের আশেপাশেও তো কেও যেতে পারছে না।মেয়েটাকে ওর রুমে পাঠালে আবার কী না কী করে বসে!"
-"কেন কী করেছে ও?"
-"প্রাণেশা ওর রুমে গিয়েছিলো বলে,কীভাবে ধমক দিয়েছে ওকে!মেয়েটা এখনো দরজায় খিল দিয়ে বসে আছে।কত করে বললাম বেরোতে কিন্তু দরজা বন্ধ করে রেখেছে।"
পলক ভূইয়া ভয়ংকর রেগে গেলেন এবার।প্রাণেশা ওনার প্রাণ।ভাতিজী হলেও প্রাণেশাকে উনি নিজের ছেলেদের চেয়েও বেশি ভালোবাসেন।বাড়ির একমাত্র মেয়ে ও।তার মেয়েকে কীভাবে অন্য কেও বকতে পারে!
তিনি রাগী কন্ঠে বললেন
-"তার রাগ নাহয় আমার উপর।কিন্তু আমার রাগ মেয়েটার উপর ঝাড়লো কেন?কোন সাহসে বকলো আমার মেয়েকে!"
পলক ভূইয়া কে রেগে যেতে দেখে পিয়াস ভূইয়া সামলান ওনাকে।শান্ত করতে বলেন
-"রাগ করো না ভাইজান।তুমি তো জানো প্রত্যুষের রাগ বরাবরই একটু বেশি।সেখানে ওর রাগের ভিতর মেয়েটা গেলো বলেইতো বকা খেলো।ওর রাগ জায়েজ আছে ভাইজান।যে অন্যায়টা করা হয়েছে ওর সাথে তাতে ওর রেগে যাওয়ারই কথা।"
পলক ভূইয়া শান্ত হওয়ার চেষ্টা করলেন।বড় বড় করে শ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত করলেন।প্রহর এতোক্ষণ বসে বসে মোবাইল টিপছিলো,আর নিশ্চুপ হয়ে সবার কথা শুনছিলো।কিন্তু এবার তার মনে একটা কৌতুহলী প্রশ্ন এলো।কৌতুহল চেপে রাখতে না পেরে বললো
-"কিন্তু আমি বুঝছিনা প্রত্যুষ এমন করছে কেন?আচ্ছা মানলাম বিয়েটা হুট করে হয়েছে।কিন্তু মেয়েটাতো দেখতে খারাপ না।দেখতে যথেষ্ট সুন্দর। আর যতটুকু বুঝলাম খুবই নম্র,ভদ্র।তাহলে মেনে নিতে সমস্যা কোথায়?এমন করছে কেন আমার ভাইটা?"
-"ভুলটা আসলে আমাদেরই হয়েছে! জোরজবরদস্তি করায় হয়তো জেদ চেপেছে! আগেভাগে বলে রাখা উচিত ছিলো।বাট ওর সাথে কথা বলার সুযোগ হয়নি আমার!
তাইতো এমন করতে হলো আমাকে।"
-"কিন্তু বিয়ে করতে সমস্যা কী?"প্রহর জিজ্ঞেস করলো আবার।
-"ভালোবাসে কাউকে!"
পলক ভূইয়ার কথায় ড্রইং রুমে যেন বিস্ফোরণ হলো।তিন জোড়া চোখ অবাক চোখে তাকালো তার দিকে।পলক ভূইয়া দ্বিধান্বিত হয়ে যান সবার তাকানোর ধরন দেখে।মালিহা বেগম এবার যেন রণচণ্ডী রূপ ধারণ করলেন।রেগে বললেন
-"আমার ছেলেটার ভালোবাসা কেঁড়ে নিলে তুমি!ও তােমাকে বলেছে পর্যন্ত নিজের ভালোবাসার কথা। কিন্তু তুমি কী করলে,আরেকজনের সাথে বিয়ে বসতে বাধ্য করলে ওঁকে।আমার ছেলের সুখের চেয়ে তোমার ওয়াদা বড় হয়ে গেলো।"
-"এইরকম সবাই ভালোবাসে।কিন্তু তাকেই যে বিয়ে করতে হবে তার,এমন কোনো কথা নেই।আমার জবান আমার কাছে সবচেয়ে বড়।"
মালিহা বেগম ধৈর্যহারা হন।ভাঙা গলায় বলেন
-"আমার ছেলেটার সাথে এতো বড় অন্যায় কীভাবে করতে পারলে তুমি!কতটা অসহায় হয়ে গেলে আমার ইন্ট্রোভার্ট ছেলেটাও তোমাকে তার ভালোবাসার কথা জানালো!কিন্তু তুমি কী করলে শেষমেশ! মেয়েটা কে?"
-"জানি না আমি।শোনার প্রয়োজনবোধ করিনি।আমার পছন্দের মেয়েকেই বিয়ে করতে হতো ওকে।ও যাকেই ভালোবাসুক না কেন তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না।"
প্রহরের খারাপ লাগলো ভীষণ নিজের ভাইয়ের জন্য। ও নিজেও তো রিধিতাকে ভালোবাসে বিয়ে করেছে।
ভালোবাসার মর্ম বোঝে ও।ভার্সিটির সেকেন্ড ইয়ারে থাকতেই রিধিতাকে বিয়ে করেছিলো ও,কারণ রিধিতার মা-বাবা অন্যত্র তাদের মেয়ে বিয়ে দিচ্ছিলো। তারপর ভয়ে ভয়ে বাড়ির চৌকাঠে এসে দাঁড়িয়েছিলো। ভেবেছিলো হয়তো ওর বাবা বাড়ি থেকে বের করে দিবে ওঁকে। কিন্তু না,সেদিন তার বাবা তার উপর প্রচন্ড রেগে গেলেও রিধিতাকে দেখা মাত্রই মেনে নিয়েছিলো ওকে।নিজের মেয়েরূপে গ্রহণ করেছিলো সেদিন।নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তাদের ভালোবাসার পূর্ণতা দিয়েছিলো।এমনকি রিধিতার মা-বাবার কাছে পর্যন্ত তার বাবা-ই বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিলেন।তাদেরকে মানিয়েছিলেন। তাহলে প্রত্যুষের বেলায় এমন কেন?কেন ওর বেলায় এতটা কঠোর হচ্ছে তার বাবা!শুধুমাত্র বন্ধুর মেয়ে বলে!শুধুমাত্র নিজের কথা রাখার জন্য ওর ভালোবাসাকে কেড়ে নিলো।অসহায় করে দিলো ওর ভাইটাকে। ওর বেচারা ভাইটা!
মালেহা বেগমের চোখ ঝাঁপিয়ে পানি এলো।ছেলের উপর এতো বড় অন্যায় সইতে পারলেন না তিনি।চোখের পানি লুকাতে সিড়ি বেয়ে উপরে চলে গেলেন তিনি।প্রহরও মায়ের পিছু পিছু মাকে সামলাতে উপরে চলে গেলো।
পলক ভূইয়া গম্ভীর মুখ করে বসে থাকলেন।পিয়াস ভূইয়া চিন্তিত স্বরে বললেন
-"এটা ঠিক হলো না ভাইজান।ছেলেটার ভালোবাসা কেড়ে নেওয়া উচিত হয়নি তোমার।"
ঘড়ির কাটায় এগারোটা বাজে।বাড়ির দুই গৃহিণী টেবিলে খাবার সাজাচ্ছেন। তাদের হাতে হাতে সাহায্য করছে কয়েকজন সার্ভেন্ট।পলক ভূইয়া আর পিয়াস ভূইয়া নিচে নামলেন।তাদের পিছু পিছু প্রহর রাহাতকে কোলে নিয়ে নামলো।এবং শেষে রিধিতা, রওশা কে সাথে নিয়ে নামলো।সকলকেই রাত এগারোটায় খাবার টেবিলে উপস্থিত হতে হবে।এটাই বাড়ির নিয়ম।বাড়ির সকলেই একসাথে বসে খাবার খায়।অসুস্থ হওয়া ছাড়া বা অন্য কোনো প্রয়োজন ছাড়া কেউই আলাদা খাবার খায় না।
পলক এবং পিয়াস ভূইয়া দুজনে গিয়েই খাবার টেবিলে বসলো।বিশাল ডাইনিং টেবিল ডাইনিং রুমে রাখা।অর্থাৎ বাইরে থেকে যদি কোনো অতিথি আসে তারাও একসাথে বসে খেতে পারবে।
প্রহর রাহাতকে চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে নিজেও তার পাশের চেয়ারে বসলো।রিধিতা চেয়ার টেনে বসিয়ে দিলো রওশা কে, পাশের চেয়ারে নিজেও বসলো।পলক ভূইয়া রওশাকে দেখে মিষ্টি হাসলেন।নম্র কন্ঠে বললেন
-"সব ঠিক আছে মা?এখানে কোনো অসুবিধা হচ্ছে নাতো তোমার?"
রওশা দুপাশে মাথা নাড়লো।মৃদু হেসে বললো
-"সব ঠিক আছে আঙ্কেল। কোনো অসুবিধা হচ্ছে না আমার।বাড়ির সবাই অনেক ভালো,আমার অনেক যত্ন করছে।"
-"কিন্তু ডাকটাতো মনপুত হলো না।রিধিতা আমাকে বাবা বলে ডাকে।তুমিও আমাকে বাবা ডাকবে কেমন!"
রওশা বাধ্যের ন্যায় মাথা ঝাকালো। পলক ভূইয়া সব চেয়ারে চোখ বুলিয়ে বললেন
-"প্রত্যুষ কই?নিচে নামেনি ও?"
-"রুমে খাবার পাঠিয়ে দিতে বলেছে।নিচে নামবে না।"
মালিহা বেগম মুখ গোমরা করে বললেন।পলক ভূইয়া গম্ভীর কন্ঠে বললেন
-"তোমার ছেলে বাড়ির এতো বছরের নিয়ম পাল্টাতে চাইছে নাকি?ও জানে না বাড়ির নিয়ম?এই বাড়িতে কেও রুমে বসে নিজের খাবার খায় না সেটা জানে না ও?"
-"যেখানে ও নিজের জীবনের নিয়মেই চলতে পারছে না,সেখানে এই বাড়ির নিয়মে চলবে সেটা কেমন জানি বিলাসিতা ঠেকায় না।আর ঠিকিই বলেছো শুধু আমারই ছেলে, তাইতো ওকে নিয়ে সব চিন্তা আমার।"
স্ত্রীর কথায় দমে যান তিনি।আর ঘাটালোনা ওনাকে।মালিহা বেগম একজন সার্ভেন্টকে দিয়ে প্রত্যুষের ঘরে খাবার পাঠিয়ে দিলেন।রওশা অবাক চোখে তাকিয়ে দেখলো সবকিছু। আসা থেকেই স্বামী নামক মানুষ টাকে একবারো দেখেনি ও।সেই যে হনহনিয়ে উঠে চলে গেলো ওর পাশ থেকে তারপর একবারো দেখা মেলেনি মানুষটার।আচ্ছা ওকে কী পছন্দ হয়নি ওনার?নয়তো এমন করছে কেন?তার বুকের ভেতর যে তাকে দেখতে চাওয়ার তীব্র আকাঙ্খা। শুধু একবার দেখে যে মন ভরেনি।প্রথম দেখাতেই যে প্রেমে পড়ে গেছে রওশা।কীভাবে ঐ শ্যামপুরুষের প্রেমে পড়ে গেলো ও সেটা বুঝতেও পারলো না।তার জীবনের প্রথম প্রেম,প্রথম প্রণয়।প্রথমবার সে কাউকে দেখে তার হৃদয় হারিয়েছে।কিন্তু সেই মানুষটাই যে তাকে একবার চোখের দেখাও দেখতে দিচ্ছে না।
মালিহা বেগম সবাইকে খাবার বেড়ে দিতে শুরু করলেন।পলক ভূইয়া প্রতিটি চেয়ারে একনজর তাকিয়ে আবার বললেন
-"আমার প্রাণ মা কই?আসবেনা ও?"
-"ডেকেছি অনেক।দরজা খুলছে না।"মানারা বেগম খাবার বাড়তে বাড়তে বললেন।
-"একি!এখনো দরজা খোলেনি ও?নিশ্চয়ই অনেক কষ্ট পেয়েছে আমার মেয়েটা যার কারণে এখনো পর্যন্ত দরজা খোলেনি।এখন ওকে ছাড়া কীভাবে খায়?"
-"তুমি খেয়ে নাও ভাইজান!আমি খেয়ে উঠে ডাকবো ওকে।আমার কথা ফেলতে পারবে না।"পিয়াস ভূইয়া বললেন।
-"না,না।ওঁকে ছেড়ে আমার গলা দিয়ে খাবার নামবে না।দুপুর থেকে খাইনি ও, তোমরা খাও আমি গিয়ে ডেকে আনছি ওকে।"
বলেই চেয়ার ছেড়ে উঠে গেলেন তিনি।তিনতলায় উঠে প্রাণেশার কক্ষের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন।দরজায় বারকয়েক বারি দিয়ে ডাকলেন ওঁকে। প্রাণেশা খুললো না দরজা।আবার ডাকলেন তিনি
-"প্রাণ মা। দরজা খোলো।দেখো তোমার বড় বাবা এসেছে। শুনবে না আমার কথা?তুমি দরজা না খুললে কষ্ট পাবো আমি।"
প্রাণেশা দরজা খুললো না।ওনার ডাক শুনে নিচ থেকে চলে এলো প্রায় সবাই।সবাই ডাকতে লাগলো প্রাণেশাকে।ছোট রাহাত ভয়ে কান্না করে দিলো।'ওর মাম্মা দরজা খুলেনা কেন?'
অবশেষে সবার ডাকাডাকিতে সপাটে দরজা খুললো প্রাণেশা।সবাই সস্হির নিশ্বাস ফেললো।পলক ভূইয়া নম্র কন্ঠে বললো
-"দরজা খুলছিলে না কেন তুমি?জানো কতটা ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম আমরা সবাই।"
-"ঠিক আছি আমি।"প্রাণেশা ভাঙা গলায় বললো।
-"খেতে এসো।"
-"খিদে নেই আমার।যাও তোমরা,খেয়ে নাও।"
-"দুপুর থেকে কিচ্ছু খাওনি তুমি।এরকম করলে তো অসুস্থ হয়ে পরবে।অনুরোধ করছি তোমাকে আমি।বড় বাবার কথা রাখবে না?"
-"আচ্ছা আমি মুখ ধুয়ে আসছি।"
সবাই একে একে নিচে নেমে গেলো।প্রাণেশা মনে দুঃখ পেলো ভীষণ। দরজা খোলার পর থেকেই সে সকলের ভীড়ে তার প্রত্যুষ ভাইকে খুঁজছিলো। ভেবেছিলো হয়তে সবার মতো তার প্রত্যুষ ভাইও এসেছে তার খোঁজে।কিন্তু না,আসলোনা মানুষটা।এখন তার কোনো দাম নেই মানুষটার কাছে।সে মরে গেলেও বা তার কী!তার কিছুই যায় আসেনা।
প্রাণেশা আরেকবার তাকালো প্রত্যুষের কক্ষের দিকে।দেখলো সে উৎসুক হয়ে তাকিয়ে আছে এইদিকে।সবার মতো সেও ভয় পেয়েছিলো ভীষণ। শুধুমাত্র নিজের জিদ ধরে রাখতেই আসেনি।কিন্তু যখন দেখলো সবার ডাকেও দরজা খুলছে না প্রাণেশা,তখন ভয় পেয়ে গেলো।তাই ঐখান থেকেই উঁকিঝুঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করছিলো।প্রাণেশার দিকে চোখ পরতেই দেখলো ও ছোট ছোট চোখে তাকিয়ে আছে।প্রত্যুষ আবার নিজের কক্ষে ঢুকে দরজায় খিল দিলো।
#চলবে