ফন্ট সাইজ:
থিম:
পরিণীতা

৯ম পর্ব

লেখক: তানজিনা ইসলাম স্রোতিস্বিনী

#পরিণীতা

#পর্ব:০৯

#তানজিনা ইসলাম

নিস্তব্ধ রাত।নিকষ কালো আধারে ছেয়ে আছে চারিদিক।আশেপাশে ঝিঁঝিপোকার ডাক শোনা যায়।রাস্তার পাশের ল্যাম্পপোস্টের কৃত্রিম আলোয় পথটা ঠাওর করা যায়।ভর সন্ধ্যা তাই রাস্তায় মানুষের আনাগোনা প্রচুর।পিচঢালা রাস্তার মাঝ দিয়ে শা শা করে সামনে এগিয়ে চলে একটি গাড়ি।প্রিয়ম জানালা দিয়ে মুগ্ধ চোখে দেখছে বাইরের দৃশ্য।বাইরে থেকে বাতাস ঢুকছে।প্রিয়ম চোখ বন্ধ করে অনুভব করে গ্রামের স্নিগ্ধতা। কতদিন পর নিজের গ্রামে পা রেখেছে ও তার ইয়ত্তা নেই!যতই পড়াশোনার তাগিদে শহরে থাকুক না কেন তারপরও নিজের গ্রামের প্রতি আলাদা যে টান, ভালোবাসা হৃদয়ে থেকে যায় তা সত্যিই অনন্য। প্রিয়ম হাতঘড়িতে সময় দেখে নিলো।ঘড়ির কাটায় নির্দেশিত সময় দেখে মন খারাপ হয়ে যায় ওর।যে কাজের জন্য এলো সে কাজটাই তো সম্পন্ন হয়ে গেছে এতোক্ষণে।গাড়ির স্পিড বাড়ানোর জন্য প্রিয়ম ড্রাইভার কে তাগাদা দিলো।

গাড়ি এসে প্রিয়মের গন্তব্যে থামলো।প্রিয়ম গাড়ি থেকে নেমে টাকা পে করে,হাস্যজ্বল চোখে তাকায় ভূইয়া বাড়ির দিকে।পরক্ষণে আবার ঠোঁট উল্টালো।এতোক্ষণে বিয়ের সব অনুষ্ঠান নিশ্চয়ই শেষ।এসব ভেবে কাঁধে ব্যাগ চাপিয়ে হাঁটা ধরলো ও।চোখ ঘুরিয়ে চাইলো চারিদিকে।রঙবেরঙের লাইট জ্বলছে বাড়ির আঙিনা জুড়ে।কিন্তু কয়েকজন ক্যাটারিং এর মানুষ ছাড়া আত্মীয় স্বজন কাউকে চোখে পরলো না প্রিয়মের।এখনো তো সবে সন্ধ্যা, ওর যত বড় পরিবার আর যতগুলো আত্মীয় স্বজন সাথে আরো আছে গ্রামের লোকজন, এতো তাড়াতাড়ি তো সবার চলে যাওয়ার কথা না।

প্রিয়ম নিজের চিন্তা ছেড়ে হাসিমুখে বাড়ির ভেতরে ঢুকলো।ড্রইংরুমের সোফায় বসে আছে কয়েকজন মুরব্বি।চিন্তিত মুখশ্রী তে নিজেদের মধ্যে কিছু আলোচনা করছে তারা।প্রিয়ম চেনে না তাদেরকে।একান্নবর্তী পরিবার হওয়ার সুবাধে অনেক দূরসম্পর্কের আত্মীয়দের সাথেও ওদের এখনো গলায় গলায় সম্পর্ক।প্রিয়ম তাদের বেশিরভাগ কেই চেনে না।প্রিয়ম কপাল কুঁচকে তাকালো।বিয়ে বাড়ির নিশ্চয়ই এরকম বেশভূষা থাকে না।এভাবে নিস্তব্ধতা আর বিষণ্ণতা ঘিরে থাকে না।প্রিয়ম সিড়ি বেয়ে উপরে উঠলো।ওর মা -বড় মা ওরা কোথায়।পরশু থেকে ফোন দিয়ে দিয়ে পাগল বানিয়ে ফেলা ওর মা আজ দুপুর থেকে একবারো কল দেয়নি।আসার তাগাদা দেয়নি ওঁকে। এমনকি পরিবারের কারো কলই যায়নি ওর কাছে।প্রিয়ম নিজের মায়ের কক্ষের দিকে হাটা ধরলো।মানারা বেগমের রুমের কাছাকাছি আসতেই পা থেমে যায় ওর।বাইরে ছোটখাটো ভিড়, ভেতর থেকে অনবরত কান্নার শব্দ আসছে।প্রিয়মের বুক ধ্বক করে উঠলো।কাধের ব্যাগ মেঝেতে ফেলে,দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেলো। সবাইকে সরিয়ে ভেতরে ঢুকলো ও।

বিছানা ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে সবাই।

মানারা বেগম কে দেখে পিলে চমকে উঠে ওর।অস্হির পায়ে এগিয়ে এসে শোয়া অবস্হায় মানারা বেগম কে জড়িয়ে ধরলো প্রিয়ম।কাঁপা গলায় বললো

-"আম্মু,আম্মু কী হয়েছে তোমার?কথা বলা আমার সাথে!"

মানারা বেগম উত্তর দিতে পারলেন না।মনের শব্দ গুলো

কন্ঠ নালী ভেদ করে বের হলো না আর।প্রিয়মের পুরো শরীর কেঁপে উঠে।মানারা বেগমের চোখের কার্ণিশ বেয়ে পানি গড়ায়।ঠোঁট নাড়িয়ে কিছু বলার চেষ্টা করেন তিনি।প্রিয়ম কাঁপা হাতে চোখের পানি মুছিয়ে দিলো ওনার।বিছানার একপাশে বসে থাকা আরিশা কে জিজ্ঞেস করলো

-"আম্মুর কী হয়েছে আরিশা?এতটা অসুস্থ হয়ে পরলো কীভাবে !"

আরিশা কান্নার চোটে কথা বলকে পারলো না।উত্তর না পেয়ে প্রিয়ম তাকালো রিধিতার দিকে।ছলছল চোখে তাকিয়ে বললো

-"ভাবীপু তুমি অন্তত বলো।কী হয়েছে আমার আম্মুর!কথা বলছে না কেন আমার সাথে!কেউ তো কিছু বলো।"

শেষ বাক্যটা জোরে বললো প্রিয়ম।

রিধিতা ভাঙা গলায় বললো

-"প্রাণেশা..

বলেই মুখ চেপে ধরে কাঁদলো রিধিতা।

-"কী হয়েছে আমার বনুর?ভাবীপু বলো আমাকে।ও এখানে নেই কেন?ও তো আম্মু কে ছাড়া এক পাও নড়ে না কোথাও!কোথায় ও?কিছু তো বলো।"

রিধিতা তা হিচকি তুলে কাঁদলো। অনেক কষ্টে উচ্চারণ করলো

-"প্রাণেশা,প্রাণেশা সুইসাইড করেছে।"

.

মালিহা বেগম প্রাণেশার কক্ষের ফ্লোর মুছছেন।চোখ দিয়ে অবিকল ধারায় পানি গড়াচ্ছে তার।কিছুক্ষণ পরপর গলা দিয়ে শব্দ বেরিয়ে আসছে।ছড়ানো ছিটানো রক্তে দেখে বুকের মধ্যে অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে ওনার।তার মেয়েটা এমন কেন করলো,এখনো পর্যন্ত বুঝতে পারলো না কেও।কীসের এতো কষ্ট ছিলো ওর।সকাল থেকেই তো হাসিখুশি ছিলো।চঞ্চল পায়ে হেঁটে বেড়াচ্ছিলো।তাহলে কী এমন হয়ে গেলো যে,আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হলো মেয়েটাকে!মালিহা বেগম একহাতে ভেজা কাপড় দিয়ে ফ্লোর মুছছেন আবার বালতির পানিতে ভিজিয়ে পরিষ্কার করে আবার মুছছেন।বালতির পানিগুলোও এতোক্ষণে রক্তলাল হয়ে গেছে।মালিহা বেগম হাতের ভেজা কাপড় টুকু বালতিতে রাখলেন।

বালতিটা নিয়ে কক্ষের বাইরে রেখে আসলেন।এলোমেলো পায়ে হেঁটে এসে আবার খাটের সাথে হেলান দিয়ে পরিষ্কার মেঝেতে বসলেন।হু হু করে কেঁদে উঠলেন তিনি।মেয়েটার কী অবস্থা এখন কে জানে!পুরো বাড়ির একমাত্র মেয়ে প্রাণেশা।কোনোদিন তো নিজের মেয়ে ছাড়া কল্পনা করেননি তিনি।তাহলে কেন একজন মা হয়ে বুঝতে পারলেন না কীসে এতো কষ্ট পেয়েছে মেয়েটা!মালিহা বেগম চোখ মুছে বিছানার উপর মাথা রাখলেন।কাঁদতে কাঁদতে ক্লান্ত লাগছে নিজেকে। দরজার পাশে একটুকরো কাগজ পড়ে থাকতে দেখে কপাল কুঁচকে আসে ওনার।কাগজটা হাতে নিয়ে আবার মেঝেতে বসলেন তিনি।কিছু লেখা থাকতে পেরে এই ভেবে কাগজ খুললেন।

পুরো কাগজটাতে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ। কাগজের প্রতিটি শব্দ হতভম্ব হয়ে পড়লেন তিনি।প্রাণেশা ভালোবাসে প্রত্যুষকে এটা কস্মিনকালেও বিশ্বাস করতে পারলেন না তিনি।কই কোনোদিন তো এমন কিছু দেখেনি দুজনের মধ্যে। উল্টো প্রাণেশা মিনিটে মিনিটে এসে প্রত্যুষের নামে বিচার দিয়ে যেতো ওনার কাছে।প্রাণেশা অসম্ভব সম্মান করতো তার প্রত্যুষ ভাইকে আর প্রত্যুষ সবসময় একটা বাচ্চার মতো আগলে রাখতো ওঁকে। কিন্তু ভালোবাসা তো চোখে পরেনি কোনোদিন।

মালিহা বেগম অসহায় অনুভব করলেন নিজেকে।মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে তার।লেখাগুলো প্রাণেশার, আর কাগজটা পাওয়া গেছে প্রাণেশার কক্ষ থেকে।ওনি বিশ্বাস করতে না চাইলেও এটাই সত্যি। ওনার অবিশ্বাসে সত্যি টা তো বদলে যাবে না।এই জন্যই প্রত্যুষের বিয়ের দিন মেয়েটা ওভাবে কেঁদে ছিলো,দরজা বন্ধ করে বসেছিলো।আর ওনারা ভেবে নিলেন প্রত্যুষ বকা দিয়েছে তাই এমন করছিলো প্রাণেশা।

মালিহা বেগমের এবার আরো বেশি কান্না পেলো। প্রাণেশার আত্মহত্যার কারণ প্রত্যুষ।প্রত্যুষও ভালোবাসত প্রাণেশাকে।ইশ!এটা কেন আগে জানতে পারলেন না তিনি!প্রত্যুষের ভালোবাসার মানুষটা কে সেটা কেন আগে জানতে পারলেন না!কেন ছেলে-মেয়ে দুটোর জীবন নষ্ট হয়ে গেলো!না নষ্ট হয়নি, ওনারা নষ্ট করে দিয়েছেন।সবাই মিলে অন্যায়ভাবে আলাদা করে দিয়েছেন।আর সেটা সহ্য করতে পারেনি প্রাণেশা।তাই আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে।

মালিহা বেগম ঢোক গিলে উঠে দাঁড়ালেন। কাগজটাতে হাত বুলিয়ে দিলেন তিনি।প্রাণেশার রক্ত লেগে আছে পুরো কাগজ জুড়ে।মালিহা বেগম চোখ মুছে কাগজটা ডাস্টবিনে ফেলে দিলেন।দ্রুত পায়ে কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন।

.

প্রত্যুষ মাথা নিচু করে বসে আছে চেয়ারে।চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পরছে,কিন্তু টু শব্দ হচ্ছে না।কাঁদতে কাঁদতে চোখমুখ লাল হয়ে গেছে ওর।চুলগুলো এলোমেলো হয়ে কপালের উপর পরে আছে।একপ্রকার বিধ্বস্ত অবস্থা ওর। প্রহর পলক ভূইয়াকে জড়িয়ে ধরে বসে আছে চেয়ারে।প্রহরের সাদা শার্ট রক্তে লাল হয়ে গেছে।পলক ভূইয়া একাধারে কেঁদে যাচ্ছেন। নিজের শক্ত মনের বাবাকে এভাবে বাচ্চাদের মতো কাঁদতে দেখে কষ্ট হচ্ছে প্রহরের।

কাঁদবেন স্বাভাবিক,প্রাণেশার ব্যাপারে উনি ভীষণ নাজুক।প্রত্যুষ আর প্রহরের চেয়েও বেশি ভালোবাসেন প্রাণেশাকে তিনি।পিয়াস ভূইয়া চুপচাপ দাড়িয়ে আছেন দরজার বাইরে।আসা থেকে এভাবে দাঁড়িয়ে আছেন। কিছুক্ষণ পরপর শার্টের হাতা দিয়ে চোখ মুছছেন তিনি।দরজার উপরের কাচ দিয়ে বেডে শোয়া অচেতন প্রাণেশাকে দেখছেন তিনি।নিজের আদরের মেয়ের এহেন অবস্থা দেখে বুক ফেটে যাচ্ছে ওনার।বার বার দায়ী করছেন নিজেকে।কেন তিনি মেয়েটাকে চোখে চোখে রাখলেন না।যেখানে তার মেয়ে নিজের একটা প্রিয় জিনিস হারিয়ে গেলে হাত-পা ছড়িয়ে কাঁদতো,সেখানে প্রিয় মানুষ হারানোর যন্ত্রণা কীভাবে সহ্য করতো!

পলক ভূইয়া একদৃষ্টে চেয়ে থাকলেন কেবিনের ভেতরে।ব্লাড দেওয়া হচ্ছে প্রাণেশাকে।একটু আগেই ব্লাড জোগাড় করতে পেরেছে তারা।বি নেগেটিভ ব্লাড হওয়ায় অনেক কসরত করতে হয়েছে। তখন সবার পাগলপ্রায় অবস্হা হয়েছিল।

ক্ষণকাল বাদে ডক্টর বেরোলো।সবাই উদ্বিগ্ন হয়ে এগিয়ে এলেই ডক্টর জানালো

-"শি ইজ আউট অফ ডেঞ্জার নাউ।কিন্তু বডি থেকে অনেক রক্ত বেরিয়ে গেছে।কতটুকু বিপদমুক্ত বাকিটা সেন্স আসার পরই বলতে পারবো।"

-"ডক্টর আমি কী আমার মেয়েকে দেখে আসতে পারবো?"

পিয়াস ভূইয়া ভেজা গলায় বললেন।

ডক্টর মাথা নাড়লো। বললো

-"অফকোর্স। কিন্তু খেয়াল রাখবেন যাতে শব্দ না হয়।"

বলেই চলে গেলেন তিনি।

পিয়াস ভূইয়া কেবিনে পা বাড়ানোর আগে থেমে গেলেন।পিছন ফিরে চাইলেন প্রত্যুষের দিকে।বললেন

-"প্রত্যুষ তুমি এসো না।"

প্রত্যুষ থমথম খেলো। শুঁকনো ঠোঁটে উচ্চারণ করলো

-"কেন চাচ্চু?আমি দেখতে যাবো না প্রাণকে?"

-"না।ও যদি চোখ খুলে তোমাকে দেখে তাহলে অনেক কষ্ট পাবে!"

প্রত্যুষ আহত চোখে তাকালো নিজের চাচার দিকে।প্রহর আর পলক ভূইয়া বুঝতে পারলেন না কিছু।পলক ভূইয়া জিজ্ঞেস করলেন

-"ওকে দেখলে প্রাণেশা মা কষ্ট পাবে কেন?"

-"সেটা ওই জানে।"

বলেই গটগট পায়ে হেঁটে কেবিনের ভেতরে ঢুকে গেলেন তিনি।

প্রহর কিছু না ভেবে কেবিনের ভেতরে ঢুকে গেলো।পলক ভূইয়া একপলক প্রত্যুষের দিকে তাকিয়ে নিজেও চলে গেলেন।এই মুহূর্তে পিয়াস ভূইয়া কেন এমন করছেন সেটা ভাবার সময় বা মানসিকতা কোনোটাই নেই। প্রত্যুষ অসহায় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো বাইরে।

পিয়াস ভূইয়া প্রাণেশার হাত ধরে বসলেন।চুলে হাত বুলিয়ে দিলেন ওর।শাড়ি বদলে মেয়েটাকে পেশেন্ট ড্রেস পরানো হয়েছে।দু'হাতে দুটো ক্যানোলা লাগানো।এক হাতে স্যালাইন চলছে আরেক হাতে ব্লাড। মুখে অক্সিজেন মাক্স লাগানো।পিয়াস ভূইয়া টলমল চোখে তাকালেন ওর দিকে। ভাঙা গলায় বললেন

-"সরি আম্মু। মাফ করে দিও আমাকে।"

প্রহর অবাক চোখে তাকালো পিয়াস ভূইয়ার দিকে।কেমন যেন অনুভব হচ্ছে ওর!কিছু একটা সন্দেহ হচ্ছে।কিন্তু মনে প্রাণে চাইছে সে সন্দেহ যাতে সত্যি না হয়!

প্রত্যুষ দেওয়ালের সাথে হাত ঠেকিয়ে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলো।সামনে থেকে প্রিয়ম কে আসতে দেখে অবাক দৃষ্টিতে তাকালো ও।প্রিয়ম দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরলো ওঁকে।প্রত্যুষ পরতে পরতে সামলায় নিজেকে।নিজেও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ওঁকে। প্রিয়ম ভাঙা গলায় বললো

-"প্রত্যুষ ভাই,প্রাণেশা কোথায়?আমার বনু কেমন আছে?"

প্রত্যুষ নিজের কান্না আটকালো।জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বললো

-"আউট অফ ডেঞ্জার। কেবিনের ভেতরে আছে। যা দেখে আয়।"

প্রিয়ম দ্রুত পায়ে কেবিনের ভেতরে ঢুকলো।সবাই অবাক হয়ে তাকালো ওর দিকে।প্রহর অবাক হয়ে বললো

-"কীরে তুই?"

প্রিয়ম মলিন হাসে।পিয়াস ভূইয়া প্রাণেশার হাত জড়িয়ে বসে ছিলেন।প্রিয়মকে দেখে উদ্বিগ্ন চোখে তাকালেন তিনি।প্রিয়ম গিয়ে জড়িয়ে ধরলো বাবাকে।কাঁধে মাথা রেখে বললো

-"বাবা,বনু এমন কেন করলো?"

পিয়াস ভূইয়া উত্তর দিতে পারলেন না। শুধু নিশ্চুপ চোখের পানি ফেলে গেলেন।

প্রত্যুষ আর ধৈর্য ধরতে না পেরে হন্তদন্ত হয়ে কক্ষের ভেতরে ঢুকে যায়।পিয়াস ভূইয়া একপলক প্রত্যুষের দিকে তাকালেন।গলার স্বরে যথেষ্ট গাম্ভীর্যতা ঢেলে বললেন

-"প্রত্যুষ আমি তোমাকে মানা করেছিলাম না এখানে আসতে।"

-"আমি আসলে সমস্যা কী চাচ্চু!কেন এমন করছো?"

প্রত্যুষ এবার পাল্টা উত্তর দিলো।

পিয়াস ভূইয়া ফোঁস করে শ্বাস ছাড়লেন।গুরুগম্ভীর কন্ঠে বললেন

-"কেন এমন করছি জানো না তুমি?বাচ্চা নও তুমি যে সবকিছু ভেঙে ভেঙে বুঝিয়ে দিতে হবে তোমাকে।একটা কাজ করো বাড়ি চলে যাও তুমি, আমি চাইছি না তুমি আর এখানে থাকো।"

-"আমি থাকলে সমস্যা টা কী? কোথাও যাবো না আমি।"

প্রত্যুষ জেদি কন্ঠে বললো।পিয়াস ভূইয়ার রাগ উঠলো ওর কথা শুনে।কঠিন কথা বলতে যেয়েও থেমে গেলেন তিনি।নিজেকে সামলে বললেন

-"প্রত্যুষ।দেখো আমরা এখানে সবাই আছি প্রাণেশার জন্য। তোমার এখানে না থাকলেও চলবে। কিন্তু নতুন বৌমা বাড়িতে অপেক্ষা করছে তোমার জন্য। অনুষ্ঠানও তো সম্পন্ন হয়নি।প্রাণেশার জন্য চলে এসেছো তুমি।এবার তোমার উচিৎ বাড়ি ফিরে যাওয়া।"

-"আমি এখান থেকে এক পা-ও নড়বো না চাচ্চু।"

পিয়াস ভূইয়া নিজের মেজাজ খোয়ালেন। একে তো তার বাচ্চা মেয়েটার এ অবস্থা। তারউপর প্রত্যুষ একের পর এক ত্যাড়া কথা বলে যাচ্ছে। যদিও তিনি জানেন প্রত্যুষও নিরুপায় ছিলো এতে।তবুও কেন যেন সবকিছু অসহ্য লাগছে ওনার।ছেলেটা কেন এতো অতি ভালোবাসা দেখালো প্রাণেশাকে, কেন ওয়াদা দিলো যদি রক্ষা না-ই করতে পারবে।ও কী জানে না প্রাণেশা কতটা নরম মনের!প্রিয় জিনিস হারানোর ক্ষমতা রাখে না ও। ওনার বারংবার মনে হচ্ছে প্রত্যুষকে দেখলে প্রাণেশা আবার উত্তেজিত হয়ে পরবে,আবার কষ্ট পাবে।এই মুহুর্তে প্রাণেশাকে ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারছেন না তিনি।প্রাণেশা থেকে যে করেই হোক দুরে রাখতে হবে ছেলেটা কে।কোনোভাবেই প্রত্যুষকে প্রাণেশার কাছে যেতে দেবেন না তিনি।

পিয়াস ভূইয়া দাঁতে দাঁত চেপে বললেন

-"প্রত্যুষ।কথা অমান্য করছো তুমি।চলে যেতে বলেছি মানে চলে যাবে তুমি।"

প্রত্যুষ এক পা-ও নড়লো না।ও বুঝে গেছে পিয়াস ভূইয়া সব জানে।প্রাণেশা তার বাবার থেকে কোনোদিন কিছু লুকাই না।কিন্তু এখানে ওর দোষ কোথায়!ওর সাথেই কেন এমন করছে! জেদ চেপে বসেছে ওর মাথায়।পণ করে নিয়েছে প্রাণেশার সাথে কথা না বলা পর্যন্ত এখান থেকে নড়বে না ও।অপরদিকে অন্যরা একবার প্রত্যুষের দিকে তাকাচ্ছে তো একবার পলক ভূইয়ার দিকে।দুজনের কারো কাহিনীই মাথায় ঢুকছে না ওঁদের।দুজনে যেন নিরব যুদ্ধ ঘোষণা করে দিয়েছে।আর সে যুদ্ধ চলছে চোখের দৃষ্টি দিয়ে।

পরিস্থিতি বেগতিক দেখে পলক ভূইয়া বিহ্বল কন্ঠে বললেন

-"কী হয়েছে তোমাদের দুজনের? এরকম করছো কেন?"

-"ভাইজান ওঁকে এখান থেকে চলে যেতে বলো।"

পিয়াস ভূইয়া ফুঁসে বললেন।

-"ও এখানে থাকলে সমস্যা কোথায়?"

পিয়াস ভূইয়া কথার খেই হারালেন।চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন

-"যার জন্য আমার মেয়ের এই অবস্থা,তাকে ওর

আশেপাশেও ঘেষতে দেব না আমি।"

সবাই অবাক হয়ে তাকালো পিয়াস ভূইয়ার দিকে।প্রাণেশার আত্মহত্যার জন্য প্রত্যুষকে দায়ী করার কারণ খুঁজে পেলো না।

প্রিয়ম হতভম্ব হয়ে বললো

-"প্রত্যুষ ভাইয়া কী করেছে বাবা?তুমি প্রত্যুষ ভাইয়াকে দায়ী করছো কেন?"

-"সেটা ওর থেকেই জিজ্ঞেস কর?কেন আমার মেয়েটার সাথে এমন করেছে ও?কী দোষ করেছিলো আমার প্রাণেশা।যার জন্য ওঁকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিলো?"

প্রত্যুষের মনোবল কাঁচের মতো ভেঙে যায়।এতোক্ষণ জেদের যে অভিব্যাক্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো তা মুহুর্তেই হারিয়ে ফেলে ও।প্রত্যুষ ভাঙা গলায় বললো

-"আমি কিছু করিনি চাচ্চু বিশ্বাস করো।তুমি তো জানি আমি অপারগ ছিলাম।"

-"কেমন অপারগ ছিলে তুমি?বলো আমাকে।বাচ্চা তুমি?নিজের জীবনের ডিসিশন নিজে নিতে পারো না।যদি নিতে না-ই পারবে তাহলে কথা দিলে কেন?তুমি জানো না ও কেমন!তুমি জানতে না ও তোমাকে কতটা ভালোবাসে!ও নিজের ভালোবাসার জিনিসগুলো হারাতে পারে না জানো না তুমি!কেন ওর হাতটা মাঝপথে ছেড়ে দিলে। যে পথটুকু তোমার সাথে চলেছে ও,সে পথে আমার বাচ্চা টা একা ফিরে আসতে পারেনি।আর ফলস্বরূপ নিজের ক্ষতি করে বসেছে। আজ যদি আমার মেয়ের কিছু হতো খুন করে ফেলতাম আমি তোমাকে।"

পলক ভূইয়া হতভম্ব হয়ে শুনলেন ভাইয়ের কথা।এ মাত্র যা শুনলেন তা অবিশ্বাস্য ঠোকলো তার কাছে। প্রিয়ম আর প্রহরও কিংকর্তব্যবিমূঢ়।

প্রত্যুষের চোখ দিয়ে এক ফোঁটা পানি গড়ায়। হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে মুছে নেয় ও।ভেজা গলায় বলে

-"আমার দোষ চাচ্চু। আমি মেনে নিলাম আমার দোষ।কিন্তু সব কী আমার দোষ?খালি আমাকেই কেন দায়ী করছো।তোমার ভাই নিজের অসুস্থতা দেখিয়ে বাধ্য করেছে আমাকে বিয়েটা করতে।কিন্তু বিশ্বাস করো প্রাণেশা আমার কাছে সবকিছুর উর্ধ্বে ছিলো।আমি মনে করেছি সময়ের সাথে ঠিক হয়ে যাবে সব,ঘৃণা করবে ও আমাকে।কিন্তু ও আমাকে ঘৃণা করেনি চাচ্চু। উল্টো নিজের ক্ষতি করে বসেছে।"

প্রত্যুষ অক্লিষ্টে ঢোক গিললো। আবার বললো

-"কথা বলতে না দাও অন্তত একটা বার ওঁকে দেখতে দাও চাচ্চু। আমি ওঁকে একবার দেখেই চলে যাবো।"

পিয়াস ভূইয়া চুপ থাকলেন ক্ষণকাল।পরক্ষণেই কাঠকাঠ স্বরে বললেন

-"কথা রাখতে না পারলে কথা দেওয়া উচিত না প্রত্যুষ।তুমি যতই ভাইজানের উপর সম্পূর্ণ দোষ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করো না কেন,দোষী কিন্তু তুমিও!আমি আমার মেয়েকে সামলে নেবো প্রত্যুষ।তোমার এবার নিজেকে সামলানো উচিত।চলে যাও প্রত্যুষ,প্রাণেশার আশেপাশেও আসবে না তুমি কোনোদিন।"

#চলবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৯ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন