#পরিণীতা
#পর্ব :০৮
#তানজিনা ইসলাম
বেলকনির ডিভাইনের উপর হাত রেখে মুখ গোমরা করে দাঁড়িয়ে আছে রিধিতা।দৃষ্টি তার অদুর আকাশে। সাদা তুলার মতো মেঘ পুঞ্জীভূত হয়ে ভাসছে আকাশে।নীল বিস্তির্ণ আকাশে পেঁজা তুলার মতো মেঘগুলা দেখতে দৃষ্টি কাড়া।রিধিতা আনমনে মনোনিবেশে তাকিয়ে ছিলো আকাশের দিকে।পেছন থেকে দুটো হাত আকড়ে ধরে ওঁকে। রিধিতা প্রথমে হকচকালেও পরক্ষণে হাতের অধিকারী মানুষটি কে ধরতে পেরে শান্ত হয়ে যায়।প্রহর শক্ত করে জড়িয়ে ধরে পিঠের মধ্যে নাক ঘষে ওর।রিধিতা মুখ ফুটে কিছু বলে না।রিধিতা কে কথা বলতে না দেখে প্রহর সামনে এগিয়ে যায়।এক হাতে রিধিতাকে জড়িয়ে কাছে টেনে, বুকের মধ্যে মিশিয়ে বলে
-"আমার বউটার মন খারাপ কেন?"
রিধিতা মিশে থাকে ওর বুকের মধ্যে।এই মধুর ডাকে মনের মধ্যে সুখ সুখ অনুভব হয়। ক্ষণকাল নিরব থেকে নম্র কন্ঠে বলে
-"কই! মন খারাপ হবে কেন?"
-"তাহলে আমি কী ভুল দেখছি!"প্রহর চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে বলে।
রিধিতা ঠোঁট টিপে হাসলো।প্রহরের দিকে তাকিয়ে ওর নাক টেনে দিয়ে বললো
-"হয়তো দেখছো।"
প্রহর মুখ গম্ভীর করে সামনে তাকালো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো
-"নানুর কথায় কষ্ট পেয়েছো তাই না?"
-"নাহ।কষ্ট পাবো কেন! উনি আমার গুরুজন,ভুল করলে শাসন করতেই পারে।"
-"কিন্তু আমি যে কাউকে আমার বউকে শাসন করার অধিকার দিই নি।তুমি যদি ভুল করেও থাকো, আমি ব্যাতীত কেও তোমাকে শাসন করার অধিকার রাখে না।সেখানে তুমি ভুল না করেও এতোগুলো কথা শুনেছো।"
-"এভাবে বলো না প্রহর।তোমার পরিবার তো আমারও পরিবার।ওরা আমার আপনজন।নানুর কথায় কিছু মনে করিনি আমি।"
-"তাহলে হাসো একটু।আমার হাসিমুখের মানুষটাকে এভাবে গম্ভীর দেখতে ভালো লাগে না আমার।আমি তার এক চিলতে হাসি দেখার জন্য যুদ্ধ করতেও প্রস্তুত।"
রিধিতা মুগ্ধ চোখে তাকালো ওর দিকে।প্রহরের মুখে হাত বুলিয়ে মহোময় কন্ঠে বললো
-"আর কতবার প্রেমে পরবো বলো! একটা মানুষের প্রেমে আর কত বার পরা যায়?"শতবার,সহস্রবার!"
-"জানি না জান।শুধু এটুকু জানি, বার বার আমার প্রেমেই পরো।নয়তো যেদিন অন্য জনের দিকে মন ঘুরবে সেদিন খুন করে ফেলবো তোমাকে।"
রিধিতা লাজুক হাসলো। প্রহর কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললো
-"নানু যে আমাকে বকেছে সেটা তোমাকে কে বলেছে?আমি তো বলিনি, জানলে কী করে!"
-"কে আবার!আমার পর এ বাড়িতে যে তোমাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে।আমি কিছু না দেখলেও,সে সব কিছু দেখেছে।"
-"প্রাণেশা!"
-"হুম।আর কে?জান্টু আমাকে বলেছে সব। সকালে ঘুম থেকে উঠেই আমার কাছে দৌড়ে এসেছে।তার ভাবীপুর নাকি মন খারাপ! তুমি নাকি কালকে থেকে কথা বলছো না ওর সাথে,মিশছো না।সারাক্ষণ খালি কিচেনে মা আর ছোট মার সাথে কাজ করছো,এ নিয়ে আফসোসের শেষ নেই ওর।কেন ওর ভাবীপু ওর সাথে না থেকে মুখ গোমরা করে দুরে দুরে থাকছে,কেন হাসছে না এ নিয়ে নানুর উপর অনেক অভিযোগ ওর।আমাকে এটাও বলেছে ও ছোট তাই নানু কে কিছু বলতে পারেনি, প্রতিবাদ করতে পারেনি আমি যাতে নানুকে বলে দি ওর ভাবীপু কে যাতে আর না কাঁদায়। ওর ভাবীপু কাঁদলে ওর কষ্ট হয়।"
রিধিতা মাথা নুইয়ে হাসলো।প্রাণেশার ভালোবাসাই সত্যিই সিক্ত ও।মেয়েটা জানপ্রাণ এক করে ভালোবাসতে জানে।ওর আপন মানুষদের খেয়াল রাখতে জানে।একটা ছোট্ট বনু ওর।কখনো তো ননদের চোখে দেখেনি ওঁকে। ওর নিজের বোন থাকলে যতটা ভালোবাসতো ততটাই ভালোবাসে প্রাণেশাকে।
-"কালকে তো সাজোনি।মাথা ব্যাথা বলে কাটিয়ে দিয়েছিলে। যদিও সত্যিটা জানতাম না আমি।কিন্তু আজকে সাজতে হবে।হাসতেও হবে।"
প্রহর রিধিতার গাল টেনে দিয়ে বললো।
রিধিতা বড় করে শ্বাস ফেললো। প্রহরের কাঁধে দুহাত রেখে ন্যাকা কন্ঠে বললো
-"সাজবো।তবে শর্ত আছে মিস্টার। সাজিয়ে দিতে হবে আমাকে।একটুও খাটতে মন চাচ্ছে না আমার।"
প্রহর কোমড় ধরে আরেকটু কাছে টানলো ওঁকে।রিধিতার চোখের মণিতে মনোনিবেশ করে বললো
-"ঠিক আছে।আজকে নাহয় তোমার মেকআপ আর্টিস্ট হলাম।তবে ফ্রি তে কিছু করবো না আমি।পে করতে হবে এর জন্য। "
-"এখন নিজের হাসবেন্ড কেও পে করতে হবে?"রিধিতা ঠোঁট উল্টে বললো।
-"ইয়েস।"
-"আচ্ছা বলো কী দিতে হবে!"
প্রহর ওকে বুকের সাথে মিশিয়ে ক্ষুদ্র দুরত্ব টুকু মিটিয়ে ফেললো। ফিসফিসিয়ে বললো
-"রাতে চেয়ে নিবো, কেমন!"
প্রহরের ফিসফিসিয়ে বলা বাক্যটি ঝঙ্কার তুলে রিধিতার বুকে।হৃৎপিণ্ডের গতি স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে যায়।হাসফাস করে ওঠে শরীরের সমস্ত সত্তা।
আরিশা গালে হাত রেখে অসহায় চোখে তাকিয়ে আছে রওশার দিকে।কয়েকজন মেকআপ আর্টিস্ট মিলে এখনও সাজাচ্ছে ওঁকে।মালিহা বেগম আরিশাকে দায়িত্ব দিয়ে গেছে রওশাকে সাজানোর তদারকি করার জন্য। সেই যে মেয়ে দুটো মুখের উপর এশিয়ান পেইন্ট মাখছে তো মাখছে।যদিও সাজানো এখন শেষের দিকে, কিন্তু আরিশার বিরক্তির শেষ সীমা অতিক্রম হয়ে গেছে। মনে মনে কন্টিনিউয়াসলি গালি দিয়ে যাচ্ছে প্রাণেশাকে।মেয়েটাকে যে বললো ওরা দুজন একসাথে শাড়ি পরবে, একসাথে সাজবে এখন কোথায় গিয়ে মরেছে কে জানে!যদিও ওর শাড়ি পড়া শেষ, তবে এখনও সাজেনি প্রাণেশার সাথে সাজার জন্য। ওকে যে বেরিয়ে খুজবে সে সুযোগও নেই।মালিহা বেগম পইপই করে বলে গেছেন এই কক্ষ ছেড়ে যাতে কোথাও না বেরোই।আচ্ছা ও নাহয় বেরোতে পারছে না, কিন্তু প্রাণেশা তো একবার আসতে পারতো দেখা করার জন্য।
আরিশা বিরক্তিকর শ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ালো। বসতে বসতে কোমড় ধরে গেছে ওর।তখনই শাড়ির আঁচল ঠিক করতে করতে রিধিতা ঢুকলো কক্ষে। আরিশা রিধিতাকে দেখে অবাক হয়ে তাকালো।
রিধিতা ওর দিকে ন্যাকা চোখে তাকালো।সামনে এসে রিনরিনে কন্ঠে বললো
-"কী গো ননদিনী এভাবে তাকিয়ে আছো কেন?"
-"ওয়াও ভাবীপু! সেরা সেরা।"
রিধিতা দু' হাতে মুখ ঢাকলো। লাজুক স্বরে কানে কানে বললো
-"জানো তোমার ভাইয়া সাজিয়ে দিয়েছে।"
-"সত্যি! "
আরিশা একটু জোরেই বলে ফেলে।পার্লারের মেয়েগুলো চমকে তাকালো ওর দিকে।আরিশা ওদের দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে হাসলো।ওরা দুজন আবার মনোযোগী হলো নিজের কাজে।আরিশা ফোস করে শ্বাস ফেলে আরিশার গালুটো টেনে দিয়ে বললো
-"কিউটের ডিব্বা লাগছে গো ভাবীপু তোমাকে।এতো সুন্দর কেন তুমি!"
রিধিতা লাজুক হেঁসে বললো
-"আরে আমি জানি তো আমি সুন্দর। এতো প্রশংসা করার প্রয়োজন নেই।"
আরিশা হেঁসে দেয়।পরক্ষণেই নাক ফুলিয়ে বলে
-"ঐ প্রাণেশার বাচ্চা কোথায় ভাবীপু?"
-"কী বলো, প্রাণেশার বাচ্চা আসলো কোত্থেকে?"
রিধিতা না বোঝার ভান ধরে বললো।আরিশা কোণা চোখে তাকিয়ে থাকে ওর দিকে।আরিশার চাহনি দেখে রিধিতা বলে
-"আমি তো জানি না।দেখিনি ওঁকে অনেক্ষণ! "
-"কী অলুক্ষুণে মেয়ে দেখেছো ভাবীপু!কতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছি ওর জন্য। কোনো খবরই নেই ওর।কোথায় গিয়ে মরেছে কে জানে!"
-"হয়তো নিজের রুমে আছে,রেডি হয়ে একেবারে নামবে।তুমিও তো সাজোনি।সেজে নাও।পরে আবার৷ সময় পাবে না।"
-"হ্যাঁ,সাজবো এখন।আর অপেক্ষা করতে পারবো না ওর জন্য। "আরিশার কন্ঠে বিরক্তি ঝরে পরে।
.
প্রত্যুষ চোখ-মুখ লাল করে পা ঝুলিয়ে বসে আছে খাটের উপর।দৃষ্টি মেঝেতে নিবদ্ধ।খানিক দুরে আলমিরার সাথে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আদনান।আহত চোখে দেখছে প্রত্যুষকে।ছেলেটান জন্য কষ্ট হচ্ছে ওর।গলায় কাটা বেঁধে ছটফট করছে ছেলেটা, কিন্তু না পারছে গিলতে না পারছে উগড়াতে।বড় মামা যে কেনো ওর সাথে এমন করছে বুঝে আসেনা আদনানের।প্রত্যুষ না পারছে সইতে না পারছে বলতে।একদিকে প্রেমিকাকে চিরতরে হারিয়ে ফেলার এক বুক যন্ত্রণা। অন্যদিকে নিজের বাবার একের পর এক জেদে শেষ হয়ে যাচ্ছে ছেলেটা।
আদনান ঢোক গিলে এগিয়ে এলো ওর কাছে।কাঁধে হাত রেখে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলো।প্রত্যুষ পূর্বের ন্যায় মাথা নিচু করে থাকে।আদনান জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বললো
-"আমি বুঝতে পারছি রে তোর কষ্ট। কিন্তু কী করবি বল!বড় মামার কথাটাও ভাবতে হবে তোর।পরিবারের কথাটা ভাব।ভাবীর বাপের বাড়ির লোকজন কালকে আসেনি কিন্তু আজকে তো আসবে। তোকে ওর সাথে না দেখলে কী বলবে!"
-"আমি আর সহ্য করতে পারছি না আদনান।এসব থেকে মুক্তি চায় আমার।"
প্রত্যুষ ভাঙ্গা গলায় বললো।
আদনান কিছু না বলে একটা হোয়াইট গোল্ড মিশ্রণের পাঞ্জাবি রাখলো ওর পাশে।প্রত্যুষ ফিরেও চাইলো না সেদিকে। আদনান কাঠকাঠ কন্ঠে বললো
-"তোর মতো বুঝদার ছেলেকে বোঝানোর ক্ষমতা আমার নেই।তারপরও কেন অবুঝের মতো বিহেভ করছিস সেটা আমি জানি।কিন্তু তবুও বলছি এখানে রওশা ভাবীর তো কোনো দোষ নেই।মেয়েটা কেন কষ্ট পাবে!একটা মেয়েকে কষ্ট দেওয়ার মতো কাপুরুষতা দেখাস না।সে মেয়েটা আবার তোর বউ হয়।তিন কবুল বলে বিয়ে হয়েছে তোদের।আমি তোকে জোর করবো না, তোর যদি মনে হয় আজ তোর নিচে যাওয়া উচিত তাহলে যাস।ডিসিশন সম্পূর্ণ তোর উপর।"
বলেই আদনান একপলক প্রত্যুষের দিকে তাকালো।প্রত্যুষ মাথা তুলে তাকালো না ওর দিকে।আদনান দীর্ঘশ্বাস ফেলে কক্ষের বাইরে বেরিয়ে যায়।
.
রওশা কে নিয়ে আরিশা আর রিধিতা নিচে নামে।পুরো ড্রইংরুম অতিথিদের আনাগোনায় গিজগিজ করছে।আজকে রওশার পরিবারের লোকজনও এসেছে।রওশার চাচী কোত্থেকে এসে হুট করে ঝাপটে জড়িয়ে ধরে রওশাকে।রওশার সাথে সাথে রিধিতা আর আরিশাও হকচকিয়ে যায়।রওশার চাচী আসমা বেগম কুমিরের কান্নায় জর্জরিত হয়ে বলে
-"রওশা কেমন আছিস তুই? তুই বাড়িতে না থাকায় আমাদের বাড়িটা যে খালি খালি হয়ে আছে!তোকে খুব মনে পরেছে রে!"
রওশার কান্না চলে আসে চাচীর কান্না দেখে।ওর চাচীর নাহয় নাটকে ভরা কান্না আর মিথ্যায় ভরা আকুতি।কিন্তু ওতো ভালোবাসতো তাকে, নিজের মায়ের মতো ভালোবাসতো।রওশা কান্নাভেজা গলায় বললো
-"চাচী কেমন আছো তুমি?"
-"তোকে ছাড়া কি করে ভালো থাকি বল!তোর চাচাও সারাক্ষণ খালি তোর কথা বলে।"
ওদের দু'জনের কথার মাঝেই রওশার চাচা আনিসুর রহমান এগিয়ে আসেন।রওশার হাত ধরে কেঁদেই দে ফেলেন উনি। রওশা এবার জোরেই কান্না করে দিলো।শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো নিজের বাবার মতো চাচাকে।আনিসুর রহমান অশ্রুসিক্ত চোখে হাত বুলিয়ে দিলো ওর মাথায়। ভেজা গলায় বললো
-"কেমন আছিস আম্মু?"
-"ভালো আছি চাচু অনেক ভালো আছি।"
রওশা কাঁদতে কাঁদতে বললো।আনিসুর রহমান অপরাধী কন্ঠে বললেন
-"আমাকে মাফ করে দিস। আমি তোকে দেখে রাখতে পারিনি।আমার ভাইয়ের শেষ স্মৃতি টুকু আগলে রাখতে পারিনি আমি। "
-"এভাবে বলো না চাচু।তুমি না থাকলে আমিতো মরেই যেতাম।"
আনিসুর রহমান নিজের চোখ মুছলেন।বুক থেকে রওশার মাথা তুলে বললেন
-"এখন যে শুধু আমি নই আম্মু। এখন তোর আরেকটা পরিবার আছে, বাঁচার কারণ হিসেবে একজন মানুষ আছে।"
রওশা মুচকি হাসলো।একে একে ওর সব আত্মীয় স্বজন এসে কুশল বিনিময় করলো ওর সাথে।
আনিসুর রহমান ক্ষণকাল পর রওশাকে জিজ্ঞেস করলেন
-"জামাই কোথায় আম্মু? এখনো আসেনি যে?"
রওশা চুপ করে গেলো।কী জবাব দেবে ও ওর চাচাকে?কী বলবে যে তার স্বামীর পছন্দ না তাকে!বিয়ের রাতেই তার স্বামী তাকে দুরে ঠেলে দিয়েছে।জানিয়ে দিয়েছে সে অন্য কাউকে ভালোবাসে।এমনকি কালকে হলুদের রাতে পর্যন্ত তার পাশে ছিলো না সে।তার চাচা যে সহ্য করতে পারবে না সেসব কথা।নিজেকেই দোষারোপ করবে কেন নিজের হাতে রওশার জীবনে এমন দুর্ভোগ ডেকে আনলেন তিনি। রওশার কান্না পেলো।হয়তো আজকেও আসবেনা প্রত্যুষ।দরজায় খিল দিয়ে বসে থাকবে।কালকে যেহেতু আসেনি আজ আসার তো প্রশ্নই উঠে না।আচ্ছা! এতোটা মন্দ ভাগ্য কেন ওর।কোনো খুশিই কেন ধরা দিতে চায় না ওর কাছে! ওর চাচি আসলে ঠিকই বলতো।ও সত্যিই দুর্ভাগা! নয়তো এ দুর্ভাগ্য ওর শেষ হয় না কেন!
রওশার এসবের ভাবনার মাঝেই আরিশা চিৎকার করে বললো 'ঐ তো প্রত্যুষ ভাইয়া নামছে।'
রওশা চমকে তাকালো সিড়ির দিকে।পাঞ্জাবির হাত কনুই পর্যন্ত গোটাতে গোটাতে নিচে নামছে প্রত্যুষ।রওশা বিহ্বল হয়ে চেয়ে থাকে।কয়েক বার চোখের পলক ফেলতে ভুলে যায়।আচ্ছা ও কী ভুল দেখছে?হয়তো এটা ওর স্বপ্ন। রওশা চিমটি কাটলো নিজের হাতে।ফের সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো প্রত্যুষ ইতোমধ্যে নেমে এসেছে।
প্রত্যুষ এসে কুশল বিনিময় করলো সবার সাথে।রওশা চোখ পিটপিট করে তাকালো ওর দিকে।কিন্তু প্রত্যুষ তাকিয়ে দেখলো না ওর পানে।তাকালো হয়তো দেখতে পেতো একটি মেয়ে কতটা আকুলতা নিয়ে সদ্য জন্মানো প্রেম নিয়ে কীভাবে তাকিয়ে আছে ওর দিকে!
প্রত্যুষ সবার সাথে আলাপ শেষ করে একপাশে এসে দাঁড়ালো। কাঁধে কারো হাতের ছোঁয়া পেয়ে পাশ ফিরে চাইলো ও।পলক ভূইয়াকে দেখে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালো।পলক ভূইয়া বিভ্রম কন্ঠে বললেন
-"কথা রাখার জন্য ধন্যবাদ।
প্রত্যুষ তাচ্ছিল্য করে হাসলো।পলক ভূইয়া এলোমেলো দৃষ্টি ফেললেন। আর কী বলবেন ভেবে পেলেন না তাই পাশ কাটিয়ে চলে গেলেন।প্রত্যুষ গাট হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো সেখানে।আদনান এসে দাড়ালো ওর পাশে।বাহু দিয়ে ধাক্কা মেরে বললেন
-"শেষমেশ এলি তাহলে!"
প্রত্যুষ কোণা চোখে তাকালো ওর দিকে।আদনান দাঁত কেলিয়ে হেঁসে তাকালো ওর দিকে।
প্রত্যুষ বিরক্তিকর ভাব নিয়ে এক কোণায় দাঁড়িয়ে থাকলেও ওর চোখদুটো ক্রমাগত প্রাণেশাকে খুঁজে বেড়াচ্ছিলো।পুরো পরিবারের লোকজন ড্রইংরুমে উপস্থিত থাকলেও প্রাণেশা নেই,সেটা বেশ ভাবাচ্ছে প্রত্যুষকে।নিজের চিন্তা নিজের মধ্যেই চেপে রাখলো প্রত্যুষ।এতোগুলো মানুষের মাঝে ওর প্রাণেশাকে খোঁজা সম্ভব নয় ওর পক্ষে।
ড্রইংরুমে সুন্দর একটা মুহূর্ত কাটছিলো সবার।সবাই গল্পে মাতোয়ারা নিজেদের মধ্যে। পলক ভূইয়া আর পিয়াস ভূইয়া সোফায় বসে কুটুমদের সাথে কথা বলছিলেন।প্রহর রাহাতকে কোলে নিয়ে বসেছিলো।এক কোণায় প্রত্যুষকে দাড়িয়ে থাকতে দেখে, পলক ভূইয়া ডাকলেন ওঁকে। প্রত্যুষের মেজাজ খারাপ হলো।তারপরও নিজেকে সংযত করে এগিয়ে গেলো ও।যখন দাঁতে দাঁত চেপে এতোটুকু আসতে পেরেছে তখন নাহয় আরেকটু কথা শুনলো।এখন যদি বাবার কথা অমান্য করে এখানে দাঁড়িয়ে থাকে সব আত্মীয় কী ভাববে!তীরে এসে তরী ডোবানোর দরকার কী!প্রত্যুষ কাছে যেতেই পলক ভূইয়া ওকে ইশারা করে নিজের পাশে বসালেন।
রাহাত বাবার কোলে বসে মনোযোগ দিয়ে শুনছিলো বড়দের কথা।হঠাৎ ওর মনে আসে প্রাণেশার কথা।ওর ছোট মনে প্রশ্ন আসে,আরে! এখানে সবাই আছে কিন্তু ওর মাম্মাম কই!
রাহাত তার চঞ্চল কন্ঠে প্রহরকে উদ্দেশ্য করে বললো
-"পাপা আমার মাম্মাম কোথায়?"
রাহাতের কথা শুনে প্রহর আশেপাশে থাকালো। আসলেই তো প্রাণেশা কোথাও নেই!রাহাতের কথায় সবার টনক নড়ে।পলক ভূইয়া চিন্তিত কন্ঠে বললেন
-"আসলেই তো প্রাণেশা কোথায়? ও কী এখনো নামেনি?"
-"প্রাণেশা কে?"
আনিসুর রহমান চিনতে না পেরে বললেন।
পিয়াস ভূইয়া বললেন
-"আমার মেয়ে।"
-"ও আচ্ছা, আচ্ছা।"
পলক ভূইয়া রাহাতকে উদ্দেশ্য করে বললেন
-"দাদুভাই,যাও তোমার মাম্মাম কে ডেকে নিয়ে এসো।"
প্রহর রাহাতকে কোলে নিয়ে উঠে দাঁড়ালো। বললো
-"আমি যাচ্ছি ডাকতে।"
প্রত্যুষ বাঁকা চোখে তাকালো সেদিকে।মনে মনে স্বস্তি পেলো এই ভেবে, এবার অন্তত প্রাণেশাকে ডাকতে যাচ্ছে কেও।
বাবা-ছেলে মিলে তিনতলায় এসে উঠে।প্রহর প্রাণেশার কক্ষের সামনে এসে দাঁড়ালো।রাহাত কে কোল থেকে নামিয়ে কড়া নাড়লো দরজায়।ডেকে বললো
-"বনু এখনো হয়নি তোর?"
ভেতর থেকে কোনো প্রতিত্তোর আসলো না।প্রহর কপাল কুঁচকালো। বার কয়েকবার দরজায় আঘাত করে ডাকলো ওঁকে।তারপরও ভেতর থেকে কোনো শব্দ নেই।
প্রহরের মনে ভয় ঢুকে।আশ্চর্য এই মেয়ের কোনো সাড়াশব্দ নেই কেন!ভেতরে আবার কোনো বিপদ-আপদ হলো না তো।প্রহর দরজায় জোরে জোরে আঘাত করলো।উচু স্বরে ডাকলো প্রাণেশাকে।প্রহরের আওয়াজ শুনে মানারা বেগম দৌড়ে আসেন।তিনিও প্রাণেশা কে খুঁজতে এসেছিলেন।মানারা বেগম প্রহরের কাছে এসে আতঙ্কগ্রস্থ গলায় বললেন
-"কী হয়েছে প্রহর?এভাবে চিৎকার করছো কেন?প্রাণেশা দরজা খুলছে না?"
-"বুঝতে পারছি না ছোট মা।অনেক্ষণ ধরে দরজা ধাক্কাচ্ছি আমি।ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দই আসছে না ওর।"
প্রহর চিন্তিত কন্ঠে বললো। মানারা বেগম ছলছল চোখে তাকালেন ওর দিকে।সকাল থেকেই ওনার মনটা কু ডাকছিলো।প্রাণেশার জন্য মন খারাপ হচ্ছিল বারংবার।প্রত্যুষের বিয়ের দিন মেয়েটা এসব কীভাবে সহ্য করবে সেটা নিয়েও চিন্তার শেষ ছিলো না ওনার!প্রহরকে সরতে বলে মানারা বেগম এগিয়ে গেলেন দরজার দিকে।দরজায় বাড়ি দিয়ে ভেজা গলায় ডাকলেন প্রাণেশাকে।প্রাণেশা নিজের মায়ের গলা শুনেও দরজা খুললো না।মানারা বেগম এবার জোরেই কেঁদে দিলেন।প্রহর জড়িয়ে ধরলো তাঁকে। স্বান্তনা দিয়ে বললো
-"কেঁদো না ছোট মা। তোমার মেয়ে মজা করছে আমাদের সাথে।কিছুদিন পরপরই তো ওর এসব শয়তানি মাথা চাঁড়া দিয়ে উঠে।"
প্রহর মানারা বেগমকে শান্ত করার চেষ্টা করলেও নিজে শান্ত হতে পারলো না।প্রাণেশা মজা করে এটা ঠিক।কিন্তু এতোবার ডাকার পরও দরজা খুলবে না, এমন মেয়ে তো প্রাণেশা নয়।প্রহর কী করবে বুঝতে পারছে না!এদিকে মানারা বেগম একাধারে কেঁদেই যাচ্ছে।
রাহাত একবার বাবার দিকে তাকাচ্ছে, একবার ছোট দাদির দিকে।কী হচ্ছে বুঝতে না পারলেও, ওর ছোট্ট মস্তিষ্কে এটুকু ধরলো যে ওর মাম্মার কিছু একটা হয়েছে, ওর মাম্মা দরজা খুলছে না।
রাহাত তার ছোট ছোট পায়ে দৌড় দিলো সবাইকে ডাকার জন্য।ক্ষণকাল বাদে আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে দৌড়ে আসে সবাই।বাইরে মানারা বেগম আর প্রহরকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে
প্রত্যুষের বুক ধ্বক করে উঠলো।দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেলো ও।পলক ভূইয়া ভয়কাতর স্বরে জিজ্ঞেস করলো
-"কী হয়েছে প্রহর?"
-"বনু দরজা খুলছে না বাবা।"
পিয়াস ভূইয়া বললেন
-"দরজা ভেঙে ফেলো।"
প্রহর অপেক্ষা করলো না।নিজের গায়ের সর্বশক্তি দিয়ে দরজা ভাঙার চেষ্টা করলো।চেষ্টার এক পর্যায়ে দরজা ভাঙতে সক্ষম হয় ও।
ভেতরে ঢুকে হতবাক হয়ে গেলো সবাই।প্রাণেশা লাল টুকটুকে একটা শাড়ি গায়ে জড়িয়ে মেঝেতে পড়ে আছে।রক্তে পুরো ফ্লোর ভেসে যাচ্ছে। প্রহর দৌড়ে গিয়ে ফ্লোর থেকে কোলে তুললো।বুকের মাঝে চেপে ধরে বসলো ওঁকে। ভেজা গলায় ডাকলো
-"প্রাণেশা,প্রাণেশা। কী হয়েছে তোর বনু?মজা করছিস আমাদের সাথে তাই না!"
প্রাণেশা উত্তর দেয় না।প্রহর বুক থেকে উঠিয়ে ওর মুখে হাত বুলিয়ে দিলো।কালক্ষেপণ না করে কোলে নিয়ে উঠে দাড়ালো।কান্নারত অবস্হায় সবাইকে রেখে কক্ষের বাইরে বেরিয়ে গেলো।
প্রত্যুষ গাঁট হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।হার্টবিট কয়েকটা মিস হয়ে যায় ওর।ঘটনা মাথায় ঢুকতে সময় নেয় কিছুটা।ইতোমধ্যেই পুরো রুম খালি হয়ে গেছে।প্রহরের পিছুপিছু সবাই বেরিয়ে গেছে।কিন্তু প্রত্যুষের পায়ের শক্তি যেন ফুরিয়ে গেছে।বোধশক্তি লোপ পেয়েছে যেন।প্রত্যুষ টলমল চোখে তাকালো রক্তমাখা ফ্লোরে।ওর প্রাণের রক্ত।কীভাবে হাতে ছুরি বসালো মেয়েটা!বুক কাঁপেনি ওর?একটা ফুলের টোকাও তো লাগতে দেয়নি কোনোদিন মেয়েটার গায়ে!তাহলে কেন এভাবে নিজেকে নিজে আঘাত করলো ও।বুকের ভেতরের অনুশোচনার যে দহন সে দহন যে সহ্য করার মতো না!
#চলবে
(আমার এসব হাবিজাবি গল্পের জন্যও যে কেও অপেক্ষা করবে সেটা কল্পনাও করতে পারিনি আমি।মেসেঞ্জারে রীতিমতো থ্রেট দিচ্ছে আমাকে।আর হ্যাঁ যারা শুধু প্রত্যুষ, রওশা আর প্রাণেশার কাহিনী দেখতে চান তাদেরকে বলে দি,গল্পটা সামাজিক। অনেকগুলা কাপল থাকবে এখানে।গল্প সাজানোর তাগিদে মাঝেমধ্যে মেইন ক্যারেক্টারগুলার কাহিণি খুবই কম পরিমাণে থাকতে পারে।পরবর্তী পর্বগুলোই আরো অনেকগুলো কাপল আসতে পারে।)